#নেশাময়_আসক্তি
#লেখিকা_বন্যা_সিকদার
#পর্ব— ৩২
মাহি গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ মুখ লাল, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। আর আদিল ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ আদিল এগিয়ে এসে মাহি’র হাত ধরে ফেলল। মুহূর্তেই মাহি ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। এবং কর্কশ কণ্ঠে সে বলে উঠল,
"স্পর্শ করবেন না আমাকে!
কথাটা রুমের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল। মাহি’র বুক উঠানামা করছে। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
"আপনি আমার ভালোবাসাকে নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেললেন আদিল ভাইয়া? দিনের পর দিন কুত্তার মতো আপনার পেছনে পেছনে ঘুরেছি আমি আর আপনি? আপনি আমার ভালোবাসাকে এভাবে ছোট করলেন। মিথ্যা বলেছেন আপনি, সবটা মিথ্যা। কি হতো যদি সেদিন সত্যিটা বলতেন?
আপনি কিভাবে ভাবতে পারলেন আপনার ক্যান্সার হয়েছে জানার পর আমি আপনার জীবন থেকে হারিয়ে যাবো। আমার ভালোবাসা কি এতোটাই ঠুনকো যে ক্যান্সার হওয়ার জন্য আমার ভালোবাসা আপনার প্রতি থেকে চলে যাবে। আমাকে আপনি এতোটাই ঘৃণিত নারী মনে করেন? আমার ভালোবাসার কি দাম নেই?
আদিল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখে অপরাধবোধ স্পষ্ট। সে ধীরে ধীরে বলল,
“কুইন প্লিজ, একটু শান্ত হ! আমি তোকে কখনোই ছোট করে ভাবিনি কিংবা তুই আমার লাইফ থেকে হারিয়ে যাবি ভেবে তোকে সত্যিটা বলিনি এমনটা নয়।
"আমি কৈফিয়ত চায়নি, আমি আপনার কেউ না। চলে যান আমার রুম থেকে।
ততক্ষণে আদিল মাহি'র দু বাহু চেপে ধরে অসহায় কন্ঠে আওরায়,
“কুইন ট্রাস্ট মি আমিও তোকে ভালোবাসি! আমি জানি তুই আমাকে অসম্ভব ভালোবাসিস। তোকে মিথ্যা বলা ছাড়া আর কোনো ওয়ে ছিল না। আচ্ছা তুইই বল, আমার এই অবাঞ্ছিত জীবনে তোর মতো সুন্দর একটা জীবন টেনে এনে নষ্ট করি কীভাবে? নিজের দুই দিনের সুখের জন্য তোকে সারাজীবন কাঁদাতে পারতাম?
তোকে আমার কাছে টেনে নিলে তুই আরো আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়তি। তখন আমি চিরতরে হারিয়ে গেলে তুই আরো কষ্ট, যন্ত্রনা পেতি। আমি শুধু চেয়েছি আমার থেকে তুই দূরে থাকলে আমাকে ধীরে ধীরে ভুলে যেতে পারবি। তখন যদি আমি চিরকালের জন্য হারিয়েও যায় তাহলে আর কষ্ট পাবি না।
মাহি নির্বাক। তার চোখে অশ্রু জমে উঠেছে। সে এক ধ্যানে আদিলে'র দিকে মত্ত রয়েছে। এক সেকেন্ডের জন্যও দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যায়নি। আদিল ধীরে ধীরে আবারও বলল,
“তুই আমার কাছে খুব দামি, কুইন! তুই কষ্ট পেলে আমি সহ্য করতে পারি না। আমি সব সময় চেয়েছি তুই হ্যাপি থাক, কেউ একজন তোর লাইফে থাকুক যে আমার নাম তোর হৃদয় থেকে মুছে দেবে। তারপর আমার কুইন অনেক সুন্দর ভাবে লাইফ কাটাতে পারবে আর কষ্ট পাবে না।
মাহি আগের ন্যায় তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
"আপনি বলতে চাচ্ছেন, এতদিন আপনাকে ছাড়া আমি খুব খুশি ছিলাম? একটুও কষ্ট হয়নি আমার? কেউ একজন আসলে আমি আপনাকে ভুলে তার হয়ে যাবো?
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
আদিল আরেক ধাপ এগিয়ে এল।
“আমি এভাবে বলতে চাইনি, কুইন!
মাহি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
"বললাম না আমাকে স্পর্শ করবেন না।
কিন্তু কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আদিল আচমকা হাত বাড়িয়ে মাহি’র কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে টেনে নিল।
এত দ্রুত সবকিছু ঘটল যে মাহি প্রস্তুতই ছিল না। হঠাৎ টানে সে ঘাবড়ে গিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। মাহি চোখ খুলল না, কিন্তু আদিল তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
ওই মুখে ভয়, কষ্ট, অভিমান মিশ্রিত।
মাহি’র কপালের সামনে উড়ে আসা চুলগুলো আলতো করে ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল আদিল।
তারপর একটু ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে আওরায়,
“এ্যাহ, বললেই হলো নাকি? স্পর্শ করব না মনে? একবার নয়, শতবার, হাজারবার স্পর্শ করব। কী করবি তুই?
মাহির বুক ধক করে উঠল। সে চোখ নামিয়ে নেয়। অশ্রুসিক্ত নয়ন আদিল হাতের আগুল দিয়ে মুছে ফিসফিস করে বলল—
“তুই আমার, একান্তই আমার। আর আদিল নিজের জিনিস কখন, কীভাবে স্পর্শ করবে সেটা কাউকে বলে দিতে হবে না।
মাহি স্থির হয়ে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে আবারও ভিজে উঠছে। সময়ের সাথে এই মানুষটাই তার জীবনের সাথে মিশে গেছে। অথচ এই মানুষটাই আজ সকালে তাকে কত কঠিন কথা বলেছে।
মাহি’র বুক ভেঙে যাচ্ছে। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল আদিলে’র শার্ট। মাথা গুঁজে দিল তার বুকে। শার্টটা খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
"ভাইয়া ঠিকই বলে, আপনার কাছে আমরা কেউ আপন না। আমরা যদি আপনার আপন হতাম, তাহলে এতগুলো মিথ্যা বলতে পারতেন? আমি থাকব না আপনার কাছে, আর চাইও না আপনাকে। আপনি খুব খারাপ, খুবই খারাপ। চলে যাবো আমি সত্যি সত্যি চলে যাবো।
হঠাৎ আদিল ঠোঁট চেপে হেসে উঠলো,
“চলেই যখন যাবি তাহলে আমার বুকে লেপ্টে আছিস কেন? চলে যা, তারাতাড়ি চলে যা। তুই চলে গেলে আমি মৌরি’কে বিয়ে করে নেবো। তখন ওর সাথেই না হয় বা***
বাকি কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাহি ঝট করে আদিলে’র বুকে ঘুষি মেরে বসে। আদিল হালকা চিৎকার করে উঠল,
“আউচ! এভাবে মারলি, কুইন?
মাহি নাক ফুলিয়ে তার দিকে এগিয়ে এল।
"তো কি করব? একেই ওই ডাইনিটাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, তার জন্য কিছু বলিনি। আবার এখন তাকে বিয়ে করে বা'স'রও করতে চান?
আদিল ভ্রু তুলল।
“আমি কখন বললাম আমি বা'স'র করতে চাই?
মাহি রাগী চোখে তাকাল।
"বলতেই তো যাচ্ছিলেন! চোখের সামনে একটা পিচ্চি মেয়ে ছোটাছুটি করে তাতে আপনার নজর যায় না। অথচ কোন দেশের পেত্নী এলে তার দিকে ঠিকই নজর যায়!
হঠাৎ আদিল কিছু না বলে তাকে কোলে তুলে নিল। অপ্রস্তুত হয়ে মাহি ভয়ে তার গলা আঁকড়ে ধরল। আদিল কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর মাহি’র দু’হাত নিজের হাতের মধ্যে আটকে শীতল কণ্ঠে বলল,
“আমার কুইন যখন আমার সামনে ছোটাছুটি করে, তখন খুব ইচ্ছে হয় তার গালে দুটো চুমু খাই। কিন্তু সেই চুমু দিতে গিয়ে যদি কোনো অঘটন হয়ে যায় তখন কে সামলাবে শুনি? আমার পিচ্চিটা তো এখনও এত বড় হয়নি যে আমাকে সামলাতে পারবে।
মাহি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"তাহলে আহি কিভাবে ভাইয়াকে সামলায়?
কথাটা বলেই সে নিজের জিভে কামড় দিল। সে বুঝতেই পারেনি কী বলে ফেলেছে। আদিল ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মুহূর্তেই মাহি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। আদিল একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
“বুঝতে পারছি, আমার কুইন এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। আমাকে সামলানোর জন্য সে প্রস্তুত তবে....
"তবে কি, আদিল ভাইয়া?
“ছিঃ ছিঃ, পুরোপুরি তোর ভাইয়ের মতো নির্লজ্জ হয়ে গেছিস। যেমন তোর ভাইয়ের মুখে কোনো কথা আটকায় না, তেমন তোরও না। পঁচা মেয়ে! বিয়ের আগেই এত ইটিসপিটিস করতে চাস?
মাহি একেবারে চুপ হয়ে গেল। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। ঠিক তখনই আদিল একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা থাক আর লজ্জা পেতে হবে না। এবার একটু আমার দিকে তাকা তো। দেখি আমার লজ্জাবতীকে দেখতে কেমন লাগে।
হঠাৎ মাহি তার বুকের দিকে ঝুঁকে পড়ল। নিচু স্বরে বলল,
"একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাকে?
“হুম বল।
মাহি শুকনো ঢুক গিলে মিনমিন স্বরে আওরায়,
"আমাকে কতটুকু ভালোবাসেন আদিল ভাইয়া?
আদিল মাহি'র দিকে তাকায়। সে আদিলে'র দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। তারপর আদিল কোনো দ্বিধা ছাড়ায় উওর দেয়,
“মানুষ তার নিঃশ্বাস কে যতটা ভালোবাসে আমি তার চেয়েও দ্বিগুন ভালোবাসি তোকে। যদি বলিস কতটুকু চাই তোকে, তাহলে আমি বলব মানুষ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যতটা বাঁচতে চাই আমি তার থেকে অধিক পরিমাণ তোকে চাই। আমি নিশ্বাস ত্যাগ করার শেষ মূহুর্ত পর্যন্তও শুধু তোকেই চাই, শুধু তোকে!
আদিলে'র বলা প্রতিটি কথা মাহি মুগ্ধ নয়নে শুনছিল। এই প্রথম সে আদিলে'র মুখ থেকে এতোটা আদুরে স্বরে ভালোবাসার কথা শুনলো। আদিলে'র শব্দে বাস্তবে ফিরে আসে মাহি। আদিল আবারও ভ্রু জোগল কুঁচকে তাকায়,
“হয়েছে এবার চোখ দুটো নামিয়ে নে। অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পর কাল তো সকাল সকাল উঠতে হবে।
"কেন?
“আরে গাঁধি কাল যে প্রথম রোজা ভুলে গেছিস? বাই দ্য ওয়ে রোজা থাকতে পারবি তো, আই মিন সারাদিন কিন্তু কিছুই খাওয়া চলবে না। পারবি তো?
"হুম! কেন পারবো না, আমি তো প্রতি বছরই রোজা থাকি।
“হুম বুঝলাম, এবার বাচ্চা মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পর সকালে কথা হবে। আর যদি কোনো দিন ভুলভাল কিছু মাথায় আসে তারপর দেখবি কত ধানে কত চাল।
"ধান চাল আপনি দেখেন গিয়ে, আমি তো আমার আদিল ভাইয়াকে পেয়েই গেছি।
আদিল আর কথা বড়ায় না। সে মুচকি হেসে মাহি'র কপালে হালকা ঠোঁট ছুঁয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মাহিও শান্তিতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমায়।
_
_
🌸🖤
আহি গুটিগুটি পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে চলল। রুমে ঢুকেই সে একটু অবাক হয়ে গেল, লাইট অফ, আর অয়ন শান্ত ছেলে হয়ে নিজেই বিছানায় শুয়ে আছে। অন্ধকারে ড্রিম লাইটের আলোয় আবছা আবছা অয়ন’কে দেখা যাচ্ছে। আহি দেরি না করে ধীরে ধীরে অয়নে’র দিকে এগিয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে অয়নে’র টি-শার্টের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিল।
অয়ন তার উপস্থিতি টের পেলেও নিশ্চুপ থেকে গেল। অয়ন’কে স্থির দেখে আহি অয়নে’র বুকে আলতো চুমু দিল। অয়ন হঠাৎ নড়েচড়ে বসে ফিসফিস করে বলল—
“দোয়েল পাখি, বিরক্ত করিস না। অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমিয়ে পড়।
আহি টি-শার্টের ভেতর থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে তার মুখোমুখি শুয়ে পড়ল।
"কিহহহ? আপনি নিজে আমাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলছেন?
অয়ন চোখ বন্ধ রেখেই উওর দিল,
“হুম, এবার ঘুমিয়ে পড়।
"অয়ন ভাই, আপনি এখনও রেগে আছেন?
অয়ন ফিসফিস করে বলল,
“হোয়াই?
"ভাইয়া, আপনাকেও সত্যটা বলেনি সেই জন্য।
“ওহু, তেমন কোনো ব্যাপার নেই। তবে তুই কি আমার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছিস?
চলমান—
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#নেশাময়_আসক্তি
#লেখিকা_বন্যা_সিকদার
#পর্ব— বোনাস এপিসোড
"ভাইয়া আপনাকেও সত্যটা বলেনি সেই জন্য।
“ওহু, তেমন কোনো ব্যাপার নেই। আর তুই কি আমার কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছিস?
আহি ডুকরে কেঁদে উঠল। চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরছে। সে বরাবরই ভীষণ সেনসিটিভ একটা মেয়ে। অল্প কথাতেই তার মন ভেঙে যায়। আর সেই কথা যদি তার সবচেয়ে কাছের মানুষটা বলে তাহলে তো কষ্টটা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল,
"আপনি এমন করে কথা বলছেন কেন? আমি কি ভুল কিছু বলেছি?
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। ঠোঁট উল্টো করে কাঁদু কাঁদু কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
"আপনি এখন আর আগের মতো আমার সাথে কথা বলেন না, আগের মতো সময়ও দেন না। আচ্ছা অয়ন ভাই আমি কি পুরনো হয়ে গেছি বলে এমন করেন? আমিও কি ভাইয়ার মতো হারিয়ে গেলে আপনি খুশি হবেন?
কথাটা শুনে অয়নে’র বুকের ভেতর ধক করে উঠল। যেন কেউ হঠাৎ তার হৃদয়ে আঘাত করল। এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে বিদ্যুৎ গতিতে আহি’কে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এবং আহি’র সারা মুখে অজস্র চুমু দিতে লাগল। তারপর নিচু কণ্ঠে সে বলল,
“আই’ম সরি পাখি, আই’ম রিয়েলি রিয়েলি সরি! তোকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি কথাটা বলিনি। অনেক কষ্ট পেয়েছিস তাই না? তোর অয়ন ভাই দিন দিন সত্যিই অনেক পঁচা হয়ে যাচ্ছে। তোকে আর আগের মতো সময় দেয় না, উল্টো তোকে অকারণে কষ্ট দেয়।
সে একটু থামল। তারপর আহি’র চুলে হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে ফিসফিস করলো,
“পাখি, তুই পুরনো হবি কেন? বউ আর ভালোবাসা কখনো পুরনো হয় না। পুরনো হয় প্রেমিকা কারণ সে হুট করে আসে আবার হুট করে চলে যায়। আর বউ আসে পবিত্র কালেমা পড়ে!
কথাটা শুনে আহি’র চোখের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে লজ্জা পেয়ে আবার অয়নে’র টি-শার্টের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। অয়ন তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মৃদু হাসল।
“ওহু ঘটনা তো ঠিক লাগছে না। আজ এতো কাছাকাছি আসার মানে কি?
আহি গলা নিচু করে বলল,
"এমনি…
অয়ন সাথে সাথে মাথা নাড়ল।
“ওহু, আমি আমার দোয়েল পাখিকে চিনি। সে তো এমনি এমনি কিছু করে না, আর সেখানে আমি নো ওয়ে। তোর মাথায় কি চলছে বল তো?
আহি মেকি হাসি দিল।
"না মানে, কাল তো প্রথম রোজা। আমাকে ডেকে দিয়েন। আমিও আপনাদের মতো রোজা রাখবো।
কথাটা শুনে অয়ন যেন বজ্রাহত হলো। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
“না না, ওটা হচ্ছে না। যে মেয়ে দিনে সাতবার না খেলে থাকতে পারে না, সে আবার রোজা রাখবে? তারপর সকাল এগারোটা বাজতে না বাজতেই কান্নাকাটি শুরু করে দিবি। তার থেকে রোজা না থাকাই ভালো।
"উহু উহু আমি থাকতে পারবো! প্লিজ অয়ন ভাই, এটা আপনার সাথে আমার প্রথম রমজান। আমি আপনার সাথে সবগুলো রোজা করতে চাই। প্লিজ প্লিজ প্লিজ স্বামী জান!
কথাটা বলেই আহি যেন নিজেই একটু থেমে গেল। অয়ন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। এই প্রথম আহি তাকে “স্বামী জান” বলেছে। শব্দটা যেন সোজা গিয়ে অয়নে’র বুকের ভেতর ধাক্কা দিল। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত এক দোলা লাগল তার। সে একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,
“পাখি, কি বললি তুই?
"অয়ন ভাই…
অয়ন ভ্রু তুলে তাকাল।
“ওহু তারপর কি বললি?
"কি বললাম?
“একটু আগেই তো বললি আবার এখনই ভুলে গেলি। বল না সেটা আবারও।
আহি চোখ ঘুরিয়ে বলল,
"এটা আপনার সাথে প্রথম রমজান সেটাই তো বললাম।
“মাইর দেবো কিন্তু!
আহি চমকে উঠল। তারপর লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে গেল। তার গাল লাল হয়ে উঠেছে। মাথা নিচু করে খুব আস্তে বলল,
"স্বামী জান বলেছি!
কথাটা বলেই সে লজ্জায় দ্রুত অয়নে’র বুকের সাথে আরও মিশে গেল। অয়নে’র ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। সে আলতো করে আহি’র চিবুক তুলে ধরল। মেয়েটার লাজুক মুখটা দেখে তার বুকটা নরম হয়ে গেল। তারপর খুব যত্ন করে আহি’র কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল—
“বউ আমার এতো ভালো কবে হলো হুম? আমাকে স্বামী জান বলছে, লাইক সিরিয়াসলি! আমি এখন কোথায় যাবো বল তো?
আহি লজ্জায় নুয়ে গেল। তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। অয়নে’র চোখের দিকে তাকাতেও কেমন যেন সংকোচ লাগছে। হঠাৎ অয়ন একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে ঠোঁট এনে খুব ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“বউ, একটা কথা বলি?
আহি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
" না না! আপনি এখন পঁচা পঁচা কথা বলবেন, আমি জানি। তাই আপনি চুপ করে থাকেন।
মূহুর্তেই অয়নে’র ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে নিয়ে হুট করে আহি’র কোমর এক ঝটকায় জড়িয়ে নিল। আহি অবাক হয়ে উঠল।
"অয়ন ভাই না প্লিজ...
কিন্তু সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়ন তাকে নিজের খুব কাছে টেনে নিল। আহি’র বুকের ধুকপুকানি অয়ন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। অয়ন ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে তার গলার কাছে মুখ গুঁজে দিল। নরম গলায় আওরাল,
“আমি তোর কাছে যাইনি বরং তুই নিজে এসেছিস ধরা দিতে। সো আমি যতক্ষণ না ছাড়ছি, ততক্ষণ আমার আলিঙ্গনেই থাকবি!
আহি ছটফট করে উঠলো,
"কিন্তু অয়ন ভাই...
তার বাকিটা আর শেষ করতে পারল না। অয়ন আলতো ভাবে তার ঠোঁটে আগুল ছুঁয়ে তার কথা থামিয়ে দিল। তাদের দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আহি’র চোখ বন্ধ হয়ে এলো অজান্তেই। অয়ন মুচকি হেসে আহি'র থুতনিতে চুম্বন কাঁটে এবং ফিসফিস করে,
“বউ একটু বেশি পাগলামো করলে সামলে নিস প্লিজ!
•
•
🌸🖤
সেহরি খাওয়ার জন্য শেখ বাড়ির প্রায় সবাই উঠে পড়েছে। শুধু একজন বাদে, আর সে হচ্ছে আহি! সে এখনো গভীর ঘুমে ডুবে আছে। চাদর মুড়িয়ে একেবারে গোল হয়ে ঘুমাচ্ছে। যেন পৃথিবীর কোনো চিন্তাই তার নেই। অয়ন অনেকক্ষণ ধরেই তাকে ডাকছে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
সে আবারও বলল,
“এই পাখি উঠ না সেহরি খেতে হবে তো।
আহি একটু নড়ল, কিন্তু আবার আগের মতোই ঘুমে তলিয়ে গেল। অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ইয়া আল্লাহ, এ কেমন মেয়ে!
আরও কয়েকবার ডাকার পরও যখন কাজ হলো না, তখন বাধ্য হয়ে সে নিচে ডাইনিং টেবিলে চলে গেল। সবাই প্রায় খাওয়া শেষ করে ফেলেছে। অয়ন তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিল। তারপর একটা প্লেটে খাবার নিয়ে উপরে ফিরে এল। রুমে ঢুকেই আবার একই দৃশ্য। আহি ঠিক আগের মতোই ঘুমাচ্ছে। অয়ন মাথা নাড়ল।
সে প্লেটটা টেবিলে রেখে বিছানার কাছে গেল। তারপর দুহাত দিয়ে আহি’কে টেনে তুলে বসানোর চেষ্টা করল।
“দোয়েল পাখি প্লিজ এবার উঠে পড়। নয়তো আযান দিয়ে দেবে।
আহির মাথা দুলে আবার অয়নে’র কাঁধে পড়ে গেল। সে আধো ঘুমে বিড়বিড় করল,
"আর পাঁচ মিনিট ওয়েট করুন অয়ন ভাই।
“তোর পাঁচ মিনিটে তো দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে!
কিন্তু আহির ঘুম আর ভাঙে না। এভাবেই কিছু সময় কেটে গেল। হঠাৎ দূরের মসজিদ থেকে মাইকে ভেসে এলো ঘোষণা—
❝সেহরির আর পাঁচ মিনিট বাকি আছে!
কথাটা যেন বাজের মতো পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আহি লাফিয়ে উঠে বসে।
"কিহহহহ?
অয়ন কিছু বোঝার আগেই আহি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। অয়ন হতভম্ব হয়ে বসে রইল। এক মিনিটের মধ্যেই আহি আবার বের হয়ে এল। চুল এলোমেলো, চোখ আধো ঘুমে ভরা। সে দ্রুত এসে বসে বলল,
"অয়ন ভাই তারাতাড়ি খাইয়ে দিন! সময় নেই একদম। আরেকটু আগে ডাক দিতে পারলেন না? আপনার বউ রোজা থাকতে চেয়েছে আর আপনি আহাম্মকের মতো তাকিয়ে ছিলেন!
অয়ন কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ প্লেটটা হাতে তুলে নিল। তারপর নিজের হাতে আহি’কে খাওয়াতে লাগল। আহি তাড়াহুড়ো করে কয়েক লোকমা খেল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,
"অয়ন ভাই৷ আর খাবো না।
অয়ন চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
“খাবি না মানে? চুপচাপ পুরোটা খেয়ে নে। পরে খিদের জন্য কান্নাকাটি করলে কিন্তু মাইর দেবো।
আহি ভ্রু কুঁচকে বলল,
"আমাকে আপনার কি বাচ্চা মনে হয় নাকি?
অয়ন ঠোঁট চেপে হাসল।
“তা কয়েক ঘণ্টা পরেই দেখা যাবে।
অনেক বুঝিয়েও আর বেশি খাওয়াতে পারল না। ঠিক তখনই, মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। আহি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে উঠে বিছানার দিকে হাঁটতেই অয়ন তার হাত ধরে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছিস?
"ঘুমাবো।
অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।
“ঘুমাবো মানে?
"হুম!
“নামাজ কে পড়বে শুনি? আমি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসছি। তুই এখানেই পড়ে নে। আর নামাজ শেষ করে আবার ঘুমানো যাবে না।
আহি বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে রয়,
"কেন?
“আমি কুরআন পড়ব আর তুই শুনবি!
আহি আধো ঘুমে মাথা নাড়ল।
"আচ্ছা…
অয়ন ওযু করে জায়নামাজ হাতে নিল। তারপর ভোরের ঠান্ডা বাতাসে দরজা খুলে পাশের মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
আর এদিকে আহিও ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে এগোল,।
প্রায় আধ ঘণ্টা পর অয়ন জায়নামাজ হাতে নিয়ে রুমে ঢুকল। রুমে ঢুকেই চোখ পড়ে আহি এখনও তার জায়নামাজে বসে আছে। অয়নে’র মনে সেই দৃশ্যটা স্পর্শ করল; মুগ্ধতার এক অদ্ভুত অনুভূতি ভেসে উঠল। সে ধীরে ধীরে আহি’র পাশে এগিয়ে এল। সাবধানে বসে গিয়ে জায়নামাজের আহি’র পাশে। তারপর অয়ন কথা না বাড়িয়ে, ধীর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করল।
আহি, মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। সে কখনো এত শান্ত, এত মধুর কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শোনেনি। প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ের গভীরে ঢুকে মিশে গেল। তার হৃদয়ে এক অজানা শীতলতা, এক প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। অয়নে’র কুরআন পড়া শেষ হলে অমন আবেশে আহি আনমনে ফিসফিস করে বলল,
"অয়ন ভাই, আপনি এতো সুন্দর করে কোরআন তেলাওয়াত কিভাবে শিখলেন?
অয়ন কেবল মুচকি হাসল। চোখের কোণে নরম উজ্জ্বলতা ফুটল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
“কোরআন তেলাওয়াত সবার কণ্ঠেই সুন্দর লাগে কিন্তু তুই যখন যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসিস, অথবা যাকে নিজের জীবনের অংশ মনে করিস, তখন সেই কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আয়াত তোর কাছে আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে!
আহি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে সেই কথা মেনে নিল। তার চোখে মুগ্ধতা আর অজানা শান্তির মিশ্রণ। কিছুক্ষণ পর অয়ন উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে তার কাঁধে চাদর জড়িয়ে নিল এবং রাস্তায় হাঁটার জন্য বেরিয়ে গেল। আর আহি? সে ধীরে ধীরে আবারও ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
সকল দশ-টা বাজতে না বাজতেই আহি অয়নে'র পিছু পিছু ঘুরতেছে। আজ প্রথম রোজা বিধায় অফিসে যায়নি, না গিয়েও একটা বিপদে পড়েছে বটে। আহি তার দিকে তাকিয়ে থাকে, কাছে এসে বসে থাকে, এতে ভিষণ অস্বস্তি হয় তার। কিন্তু কিছু করার নেই, আহি তার কাছে আসে কারণ তার খিদে লেগে গিয়েছে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারবে না। অয়ন আগেই বারন করেছিল কিন্তু সে শুনেনি। আহি ধীরে ধীরে অয়নে’র মুখোমুখি হয়ে বসে পড়ে মুখ গোমড়া করা। এবার অয়ন চোখ তুলে বলল,
“কি চাই?
আহি নিচু স্বরে জবাব দেয়,
"কিছু না,
“তাহলে এসেছিস কেন?
আহি ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিসিয়ে আওরাল,
"আপনি আমার সোয়ামি হন না, তাই গল্প করতে আসলাম।
“রুম থেকে বের হ।
"কেন?
“ডিস্টার্ব করছিস ভিষণ।
"ওমা কখন আপনাকে আমি ডিস্টার্ব করলাম?
“নো টকিং, এবার রুম থেকে বেরিয়ে যা রাতে আসবি।
মূহুর্তেই আহি অয়নে'র পাশে এসে বসে যায় এবং মুখ বাকিয়ে বলে উঠে,
"বললেই হলো নাকি, রুম কি আপনার একার? আমি একশোবার রুমে আসবো তাতে আপনার কি?
“আমার কিছু না তবে আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বস।
আহি আরেকটু এগিয়ে এলো,
"আপনার কাছেই বসবো কি করবেন আপনি? দরকার হলে কোলে উঠে বসবো। আপনার বিয়ে করা বউ আমি বুঝতে পেরেছেন।
মূহুর্তেই অয়ন দাঁত খিঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
“ওই আলুর চপের বাচ্চা দিনে আমার থেকে দূরে দূরে থাকবি৷ তুই কাছে থাকলে আমার রোজা হালকা হয়ে যাবে। তোর মতো স্যা*** আস্তাগফিরুল্লাহ্ নাউজুবিল্লাহ্। আল্লাহ মাফ করো আমায়, এই মাতারী আমার রোজা খাইয়া ছাড়বে!
চলমান—
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]