একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৬.
মাহাব বিরস মুখে বসে আছে৷ গায়ে অফিসের পোশাক৷ তার মুখ দেখে যে কেউই তার ভিতরের অপ্রসন্নতাকে আঁচ করতে পারবে৷ গত ১০ মিনিট ধরে বিছানায় বসে আছে সে। উদ্দেশ্য বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুবে। অথচ বাথরুমের দরজা খোলার নাম'ই নেই৷ নিশ্চয়ই ওই মেয়েটাই বাথরুমে ঢুকে বসে আছে। কি করছে সে? বাথরুমে কী সংসার পাতার স্বপ্ন দেখছে নাকি। যত্তসব!
মাহাব ছেলেটা তিরিক্ষি স্বভাবের৷ দিনের প্রায় শতভাগ সময়ে তার মন-মেজাজ খারাপ থাকে৷ কেবলমাত্র প্রিয় মানুষদের বেলায় তার ব্যবহার আলাদা৷ কিন্তু তার প্রিয় মানুষের তালিকা সীমিত। তার প্রিয় মানুষ মানে তার আম্মা, আব্বা, ইশিতা আপা, নাহিদ ভাইয়া আর আনাস৷
এখন কপালে জুটেছে আরেক ঝামেলা। ধৈর্য ক্ষমতার বিনাশ ঘটিয়ে যেই না উঠতে যাবে ওমনি ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো অর্ধভেজা গায়ের এক শ্যামাঙ্গিনী।
বিভা দ্বিধা মিশ্রিত দৃষ্টি দিল৷ মাহাব সেদিকে নজর দিল না৷ চলল নিজের কাজে৷ বিভা তার হাতের গামছা মেলে দিল বারান্দায়৷ তার মনটা কেমন যেন করছে। বিভা বুঝতে পারছে এই সম্পর্কে লোকটা খুশি নয়৷ কিন্তু কেন? সম্পর্কে খুশি নয় সেটা হয়তো তার স্বামী তাকে সরাসরি বলেনি, তবে বিভা বুঝে নিয়েছে৷ এতোটুকু তো জ্ঞান তার আছেই৷
‘শুনো…?’
বিভা পেছনে ফিরল৷ মাহাব দাঁড়ানো৷ কিন্তু মাহাব নাকি মাহাথির? বিভা কি একবার জিজ্ঞেস করবে?
‘তুমি দয়াকরে এই ওয়াশরুম টা ব্যবহার করবে না৷ আমার পছন্দ না এইসব৷ বাড়িতে আরেকটা ঘর আছে৷ সেই ওয়াশরুমটা ব্যবহার করতে পারো৷’
বলেই চলে গেল নাম না জানা তার স্বামী৷ বিভা শ্বাস ফেলল৷ তার স্বামীর যে তাকে পছন্দ হয়নি সে সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হলো৷ পছন্দ হয়নি? নাকি অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের জিনিস কাউকে ব্যবহার করতে দেয়না, সেই ধাঁচের লোক তার স্বামী? বিভা মাথা ঘামাল না৷ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
.
বিভা আর তার শ্বাশুড়ি হাসিনা কাজ করছেন রান্নাঘরে৷ বিভা কাজ করছে বললে ভুল হবে৷ সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে৷ বাড়ির চিন্তা তো আছেই, তবে এইভাবে চুপচাপ দাঁড়ানো দৃষ্টিকটু লাগছে। হাসিনা মরিচ কাটছে। বিভা এগিয়ে এলো, ‘দিন আমি করছি।’
‘কী দরকার কও? আমি যতোদিন আছি বাড়িতে আমি করুমু৷ কোনো সমস্যা নাই৷ আমি গেরামে গেলেই এই বাড়ি তুমার। সংসার তুমার৷ তখন তুমার যা করতে মন চায়, কইরো৷’
বিভা ভ্রু কুঞ্চিত করলো৷ হাসিনার দিকে তাকাল৷ সে গ্রামে চলে যাবে মানে? তবে কী তারা গ্রামে থাকে? নিজের মনের প্রশ্নটুকু করেই ফেলল বিভা, ‘আপনারা কি গ্রামে থাকেন?’
‘হ, বউ৷ গেরামে থাকি। মাঝেমধ্যি আসি এই বাড়িত। পোলাডারে দেখতে আসি৷ তয়, একলা আসি না৷ মাহাথির আব্বায় লইয়া আসে৷ প্রতিমাসে৷’
‘ও আচ্ছা৷ আচ্ছা, উনার নামটা আসলে কী? না মানে… যতোদূর জানি উনার নাম মাহাব৷ কিন্তু আপনি উনাকে 'মাহাথির' বলেন৷ কোনটা আসল?’ দ্বিধান্বীত কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল বিভা৷
‘ওর নাম হইলো গিয়া মাহাব মোহাম্মদ।’
‘তাহলে মাহাথির…?’
হাসিনা হাসল৷ সেই সাথে উত্তর দিল, ‘মাহাথির হইলো ওর ডাক নাম৷ আমরা কই৷ আমরা বলতে আমি আর ওর আব্বায়৷’
বিভা আশ্বস্ত হলো৷ এই তবে কাহিনী! হটাৎ তার মনটা খুশি হয়ে গেল৷ সে জেনেছে কাল সে এবং তার স্বামী তাদের বাড়িতে যাবে৷ সে তার বোন এবং ভাইকে দেখতে পাবে৷ ভাবতেই খুশিতে গলা ধরে এলো বিভার৷ সে এই বাড়িতে আছে এক রাত দুই দিন৷ অথচ মনে হচ্ছে শতজুগ পরে সে তার বাড়ি ফিরবে৷ বিভার খুশি তার মুখশ্রীতেও প্রকাশ পেল৷
.
সকালের আবহাওয়াটা সুন্দর৷ ভীষণ সুন্দর৷ কেমন গাত্র শীতল করা আবহাওয়া৷ মনটাকে নিমিষেই ফুরফুরে করে তোলে৷ শ্রুতি প্রতি সকালবেলা এই সময়টায় ভাবে। তার জীবনের ভাবনা ভাবে৷ নিজের জীবনে হিসাব-নিকাশের সমাধান করতে বসে৷ অথচ কোনোবারেই সমাধানে আসতে পারে না৷
এই যে আজকে সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠে, চুপচাপ নিচে নেমে এলো। এগারো তলা বিল্ডিং এর আশেপাশে সেম ডিজাইনের কতোগুলো বিল্ডিং। রঙ ও এক। বিল্ডিংগুলো সব নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের দূরত্ব মেনে অবস্থিত৷ যেন মনে হচ্ছে ইট পাথরের বিল্ডিং দিয়ে কেউ বৃত্ত এঁকেছে৷ বিল্ডিং এর মধ্যবর্তী জায়গায় একই রকমে বৃত্ত আকারের মাঠ৷ আর সরু গোলাকার রাস্তা৷ আর মাঠের তার চারপাশে নানান ফুল৷ শ্রুতি নির্বিকার চিত্তে সব দেখছে। দৃশ্যটা উপভৌগ্য। অথচ শ্রুতির নিকট পানসে৷ তাদের বিল্ডিং এর পাশেই আলাদা একটি জায়গা৷ যেখানে একটি বেঞ্চ রাখা। আর তার পাশেই নাম না জানা সুন্দর একটি ফুল গাছ। শ্রুতি এইবার অন্য বিল্ডিং গুলোর দিকে তাকাল৷ নাহহ! অন্যদিকের গুলোতে নেই৷ শুধু এদিকেই। শ্রুতি এগিয়ে গেল৷ বেঞ্চে বসল৷ বেঞ্চ'র জায়গাটা এমনভাবে যে কোনো মানুষ মাঠে এলে কিংবা বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়ালেও শ্রুতিকে দেখতে পাবে না৷
আজকে সে বাসায় যাবে৷ ভেবেই খুশি হলো৷ কিন্থ খুশির রেশ মুখে ফুটল না৷
‘তুমি এখানে?’’
শ্রুতি তাকাল৷ তার শ্বশুর আসাদুজ্জামান। আসাদ এগিয়ে এলো৷ গম্ভীর মুখে বলল, ‘তুমি এখানে?’
শ্রুতি দৃষ্টি নত করল৷ কী বলবে ভেবে পেল না৷ লোকটাকে রাগী মনে হচ্ছে। আসাদ গলা খাঁকারি দিলেন৷ সে স্বল্পভাষী মানুষ৷ অযথা কথা পছন্দ করেন না এবং বলেনও না৷ তবুও তার জানতে ইচ্ছে তার পুত্রবধূর কোনো সমস্যা হচ্ছে কি-না৷ মেয়েটা সুবিধা-অসুবিধা দেখা বাবা হিসেবে তার দায়িত্ব৷ সে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করে বলল, ‘সমস্যা হলে জানাবে। আমাকে না জানালেও, বাকিদের জানাবে৷ কোনোপ্রকার দ্বিধায় ভুগবে না৷ নিজের বাড়িতে দ্বিধা নিয়ে থাকা উচিত না৷ নিজের বাড়িতে রাজত্ব করতে হয়৷’
শ্রুতি তার যাওয়ার পানে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল৷ সে বুঝে পায়না সবাই তার সাথে এতো ভালো ব্যবহারের নাটক কেন করছে? নাটক নাকি সত্যিই তারা এমনি? শ্রুতি শ্বাস ফেলল৷ একটা সময় ছিল, যখন শ্রুতিকে ভালোবেসে কেউ একটা কথা বললেই সে মোমের ন্যায় গলে যেত। অথচ এখন সবার সবকিছু অভিনয় লাগে৷
.
বিভা-মাহাথির, শ্রুতি-পার্থিব দাঁড়িয়ে আছে খাবার টেবিলের সামনে৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা আয়োজন দেখছে৷ বহু পদের খাবার টেবিলে আসন পেতে বসেছে৷ শ্রুতি বাড়িতে ঢোকার আধাঘন্টার মাঝেই বিভা উপস্থিত৷ তারা তাদের সুখ-দুঃখের গল্প ইতিমধ্যে শেষ করে হামিমকে খাইয়ে এসেছে দুজনে৷ হামিম প্রথমে রাগ করে থাকলেও পরে আর রাগ করতে পারেনি তার প্রানপ্রিয় আপাদের ওপর৷ এখন সবার খাওয়ার পালা৷ শ্রুতি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছে তার বাবা আমিন তার বড় বোনের স্বামীর থেকে তার স্বামী পার্থিবকে বেশি যত্ন-আত্মি করছে৷ এর কারণ কী? আমিন তার নিজের পছন্দ করা পাত্রকেই দাম দিচ্ছে না? অবাক করা বিষয়!
আমিন নিজের পাশে পার্থিবকে বসালো৷ যত্নের কোনো ত্রুটি সে রাখবে না৷ মাহাথিরকেও যত্ন করা হলো৷ শাহিনা এবং বিভার দাদী করলো৷ তবে পার্থিবের মতো না৷ ব্যাপারটা শ্রুতির ভালো লাগল না৷ নিশ্চয়ই এর মাঝেও কোনো কারণ আছে। তার এই নিচু শ্রেনীর পরিবার স্বার্থ এবং কারণ ছাড়া কোনো কিছুই করে না৷ কিচ্ছু না।
.
আজ আকাশে অর্ধেক চাঁদ উঠেছে৷ আর বাকি অর্ধেক কই? ছোটবেলায় পার্থিবকে তার নানী বলেছিল, ‘পিষ্যাষ আসমানের চাঁদ খাইয়া ফালায়৷ আস্তে আস্তে খায়৷ যখন পুরাডা খাইয়া ফালায় তখন আসমানে চাঁদ থাকে না। অমাবস্যা আসে৷ তখন রাত-বিরাইতে বাইরে থাকন ঠিক না৷ সয়তানে ধরে।’
পার্থিব হাসল৷ পিশা চ নাকি আকাশের চাঁদ খেয়ে নেয়! একটা বৈজ্ঞানিক বিষয়কে তার নানি কি না কি বানিয়ে দিয়েছে৷ অথচ ছোটবেলায় দিব্যি এই ধরনের কথা সে বিশ্বাস করত৷ মজা পেত৷ হাস্যকর….!
হটাৎ পার্থিবের আজ দুপুরের ঘটনা মাথায় এলো৷ আজ দুপুরে কথাবার্তার পর শ্রুতি যখন তার ছোট ভাইয়ের খোঁজে গেল, সেও গেল পিছু পিছু৷ পার্থিব গিয়ে দেখল, শ্রুতি একটা আট/নয় বছরের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। ছেলেটার চোখের কার্নিশ বেয়ে ঝরছে অশ্রুকণা৷ ছেলেটার মাথাটা তুলনামূলক একটু বড়। একটা পা ভীষণ রকমের চিকন। এই ছেলেটা-ই কী তাহলে শ্রুতির ভাই? আচ্ছা বাচ্চাটা কী বিশেষ ভাবে কোনো শারীরিক অথবা মানসিক রোগে আক্রান্ত? ছেলেটাকে এর আগেও কোথাও দেখেছে সে। কিন্তু কোথায়? এখন বিষয়টা মনে করা দরকার৷ অথচ মনে পড়ছে না৷ মনে পড়বে এমন একটা সময়ে যখন মনে করার কোনো প্রয়োজনীয়তা-ই থাকবে না৷ যেমন, অফিসের কাজ করতে বসেছি৷ কোন কম্পানির কাজ করছি এটা মনে করতে গিয়ে মনে পড়ে যাবে বাচ্চাটাকে কোথায় দেখেছি কিংবা গোসল করার সময় সাবান মাখতে যাব তখন হটাৎ করেই মনে পড়বে আরেহহ! বাচ্চাটাকে তো এখানে দেখেছি অমুকের সাথে….। অসহ্যকর….. !
.
বিভা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে৷ হিমশীতল আবহাওয়া শরীর মন জুড়িয়ে যাচ্ছে৷ রাত বেশ অনেক হয়েছে অথচ ঘুমুতে যেতে ইচ্ছে করছে না। যাবে কি যাবেনা তাই নিয়ে দ্বিধাবোধ করছে সে। ঘুমুতে গেল, দেখা যাবে গতকালের মতো কাহিনী ঘটে বসে আছে৷
সে বিছানায় শুয়ে হাত নড়াচড়া করছে। ওমনি মাহাথির উঠে বসলো। গম্ভীরমুখে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে উঠবে, ‘বিভা, আমার এতোদিনের ব্যবহারে তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, আমি তোমাকে পছন্দ করতে পারছি না৷ তবুও কেন তুমি আমার আশেপাশে ঘুরাঘুরি করছো বলো তো? তুমি কী চাও যেই মানুষটা তোমাকে পছন্দ করে না তার সাথে তোমার শরীর স্পর্শ করুক?’
এই কথা পিঠে আর কিছু বলার থাকে না৷ মাহাথির তাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বিছানায় শুতে মানা করল সাথে উত্তমরূপে অপমান-ও করল৷ বিভা উঠে যাওয়ার উচিত ছিল অথচ সে উঠল না৷ শুয়েই রইল৷ মাহাথিরকে অবাক করে দিয়ে ৫ কি ১০ মিনিটের মাথায় গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল৷
আজও কী এমন কিছুই ঘটবে? নাকি কালকের থেকেও বাজে কিছু ঘটবে?
বিভা আজ ঠিক করেছে মাহাথিরকে কিছু প্রশ্ন করবে৷ প্রশ্নগুলো এরুপ- আমার মধ্যে কী কোনো সমস্যা আছে? আমাকে অপছন্দ করার কারণ? মাহাথির নিশ্চিত তখন বলবে, আমি কাউকে ভালোবাসি৷ আমি তাকে ঠকিয়ে তোমাকে ভালোবাসতে পারিনা৷ তোমাকে পরিবারের পছন্দে বিয়ে করেছি আমি। আর কিছুনা৷
বিভা মনে মনে ঠিক করলো মাহাথির এর মুখে এই কথা শোনামাত্রই সে এক বালতি গোবর মাহাথির এর মাথায় ছুড়ে মারবে৷ কিন্তু গোবর পাবে কোথায়? তাদের বাড়ির আশপাশে গরুর খামার থাকলে হতো৷ প্রয়োজনে মাহাথিরকেও সেখানে ভর্তি করা যেত৷ আর তখন সে তার স্বভাবতই গম্ভীরস্বরে ডাকত, ‘হাম্বায়ায়ায়া! হাম্বায়ায়ায়া!’
____________
চলবে~
#শারমিন_ইরান
#একগুচ্ছ_শুকতারা
শব্দসংখ্যা- ১৩৯০
(একটু মন্তব্য করলে কী হয়?🥺)