ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

১৩তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

১৩.

রাত ১২ টা ২০ মিনিট।

যথেষ্ট রাত। তবুও বিভার চোখে ঘুম নেই। অচেনা, অজানা এক শূন্যতা গ্রাস করে নিয়েছে নিজের মনকে। পাশে তাকিয়ে দেখল মাহাথির কপালে বাম হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। মাহাথিরের নেওয়া গভীর নিঃশ্বাস’ই বুঝিয়ে দিচ্ছে কতো গভীর তার ঘুম।

বিভা উঠে বসল। কমলা রঙের ড্রিম লাইট জ্বালানো। ড্রিম লাইট অফ করে রুমের লাইট জ্বালিয়ে নিল। হঠাৎ আলো জ্বলায় চোখ আপনাআপনিই কুঁচকে গেল বিভার। ধীরে পায়ে হেটে খাটের নিচে থেকে তার আনা ব্যাগ বের করে নিল। জামাকাপড় যদিও আলমারিতে রেখেছে কিছু, তবুও ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আছে।

ব্যাগ থেকে কাঙ্খিত বস্তুটি বের করে ব্যাগটি আগের জায়গায় রেখে দিল।

ডায়েরির ওপর লেখা ‘তাহিরার খুশি’। ভীষণ পুরোনো ডায়েরি। কোণায় সাল লিখা ১৯…..। সালটা বুঝা যাচ্ছেনা। পুরোনো হওয়ায় তাহিরা নামটা তাহিবা হয়ে গেছে। ‘র’ এর নিচের ফোঁটার অস্তিত্ব বিলীন।

বিভা ডায়েরিটা প্রথম পাতা খুলল। ভীষণ পুরোনো ১ টা ছবি। মায়ের হাসিমুখ। বুকের মধ্যে হঠাৎ চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। এই মানুষটা পৃথিবীতে নেই। আর আসবেনা। এইভাবে হাসবে না। মাথায় হাত রাখবে না। কেমন না? এমন আজব কেন এই দুনিয়া? মহান আল্লাহ এতো কঠিন নিয়ম না বানালেও পারত। পারত না?

মায়ের স্কুল জীবন থেকে শুরু করে সব লেখা। কিছু পাতা উল্টানোর পরপরই মায়ের ইন্টারে পড়া জীবনে চলে গেল। যেখানে আমিন শিকদারের সাথে প্রথম পরিচিতি থেকে শুরু করে কতো অনুভূতি লেখা। হঠাৎ করেই মনটা বিষিয়ে উঠল বিভার। মনে পড়ে গেল কিছু বিষাক্ত স্মৃতি।

হামিম হওয়ার সময় মা মারা যান। হামিমের ৮ বছর। ৮ বছর আগের কিছু স্মৃতি ভেসে উঠল বিভার মানসপটে। ঠাস করে বন্ধ করে দিল ডায়েরিটা। এরপর ডায়েরিটা রেখে দিল টেবিলে কিছু বই খাতার নিচে।

লাইট বন্ধ করে বিছানায় বসল বিভা। একবার মাহাথিরের দিকে তাকাল। এখন কপালে হাত নেই। সুন্দরভাবে মুখটা দেখা যাচ্ছে। শ্যামবর্ণের মানুষটার মুখ দেখে বিভা আওড়াল, ‘পৃথিবীতে ভালোবাসা না থাকলেও পার‍ত।’

.

শ্রুতি বসে আছে হামিমের রুমে।

এই বাড়ির হালচাল একটু অদ্ভুত, কিছুটা আজব।

১১ তলার বিল্ডিং। ১ম তলায় নিজস্ব গাড়ি রাখার বিশাল বড় জায়গা, ২য় তলায় ড্রইং, ডাইনিং, রান্নাঘর। যেখানে সবাই সকালবেলা, বিকালবেলা, রাত্রিবেলা মিলিত হয় এবং একসাথে খাবার গ্রহণ করে। ৩য় তলায় বাবা-মা, প্রভা-প্রত্যাশা থাকে। ৪র্থ তলায় চাচ্চু-চাচিআম্মু, হিমেল-হিয়া থাকে। সবশেষে ৫ম তলায় পার্থিব-শ্রুতির ঘর, যেখানে বর্তমানে তাদের ফ্ল্যাটে হামিমও থাকে। যদি প্রভা-প্রত্যাশা না থাকত তবে হয়তো বাবা-মার সাথে তারা ৩য় তলায় থাকতো যেমনটা হিমেল ভাইয়া, হিয়া ভাবি থাকে। আচ্ছা এমন করার কারণ কী? এমন আজবভাবে কোনো পরিবার থাকে নাকি?

প্রতি তলাতে ১ টা করে ফ্ল্যাট যেখান সব আছে রান্নাঘর থেকে শুরু করে ড্রইং, ডাইনিং, ৩ টা বড় বড় বেড সাথে এক্সট্রা রুম, যেটাকে যে যেভাবে সাজাতে পারে। শৌখিন আসবাবে ভরপুর ঘর। আসল দরজা দুটো করে। যেকোনো দরজা দিয়ে ঢুকেই পুরো ফ্ল্যাট ঘোরা যায়।

সবচেয়ে আজব বিষয় ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম তলা ফাঁকা। সেগুলো নাকি গেস্টরুম। ১১ তলায় ছাদ। এমনটাই বিকাল বেলা বলছিল প্রভা।

প্রভা। প্রভা মেয়েটার সাথে পার্থিবের অনেক মিল। দুজনেই প্রাণখোলা ভাবে কথা বলে। শ্রুতি একবার ভাবল ধমক দিয়ে উঠিয়ে দিবে কিন্তু দিল না। মেয়েটা কী সুন্দর আগ্রহ নিয়ে কথা বলছিল, সেখানে ধমক দিতে ইচ্ছে হলোনা।

শ্রুতি উঠে দাঁড়াল। হামিমের রুমে লাইট জ্বালানোই থাকে। অন্ধকার ভয় পায়। দরজা খোলা রেখে যাওয়ার সময় চোখ পড়ল খাতায় যেখানে সুন্দর ১ টি ছবি আঁকা।

সোফার মধ্যে দুজন নারী বসে হাসছে। একজনের গায়ে কালো শাড়ি, আরেকজনের গায়ে সবুজ কামিজ। শ্রুতি ফট করে নিজের দিকে তাকাল। সবুজ ড্রেস। আর কালো শাড়ি পড়ে দাওয়াত খেতে এসেছিল বিভা। সন্ধ্যার দিকে ওরা দুজন এভাবে বসেই কথা বলছিল। আর সেটা হামিম কী সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে! শ্রুতি ভীষণ খুশি হলো।

হামিমের আঁকার হাত ভীষণ সুন্দর। শ্রুতি কল্পনা করল তার ভাই একদিন অনেক বড় আর্টিস্ট হবে, সবাই তার ভাইয়ের ড্রইং দেখবে।

শ্রুতি খুশিমনে খাতাটা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

.

শ্রুতি রুমে আসতেই দেখল পার্থিব নরম তোষক জাতীয় উঁচু বস্তু থেকে এক লাফে উঠল। হেসে দিয়ে বলল, ‘অবশেষে এসেছেন?’

শ্রুতির মনে হলো ছেলেটার হাসি ভীষণ সুন্দর। পরপরই নিজেকে ধাতস্থ করে নিল। কিছু না বলে চলে গেল বারান্দায়।

পার্থিব বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে নিজমনেই বলল, ‘চল পার্থিব, নিজে নিজেই বকবক শুরু কর। বার বার ভুলে যাস কেন তোর বউকে বোবা ভূতে ধরে।’

‘এই ওয়েদারে চা টা মজা লাগবে। নিন।’’

চায়ের কাপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পার্থিবের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ল। পার্থিব নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল, ‘ভয় পাচ্ছেন বিষ মিশিয়েছি নাকি? দাঁড়ান।’

বলেই শ্রুতির দিকে বাড়িয়ে ধরা মগটায় শব্দ করে চুমুক দিল। এরপর নিজের কাপেও চুমুক বসাল। দু হাতের মগ সামনে বাড়িয়ে বলল, ‘দুটোই পরীক্ষা করে দিয়েছি রাণী। আপনি আপনার মন মতো একটা কাপ গ্রহণ করে রাজাকে ধন্য করুন।’’

শ্রুতি কণ্ঠে বিরক্ত মাখিয়ে বলল, ‘এতো ড্রামা আপনি কীভাবে করেন?’’

‘কী আর করার! সবার বউ তো ড্রামা করে। সেখানে আমার বউ হচ্ছে রোবটিক আচরণ করে। তাই বাধ্য হয়ে আমিই ড্রামা করে সম্পর্কের ব্যালেন্স রাখছি।’

শ্রুতি অন্যদিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে চা নিল। সামনে তাকিয়ে দেখতে লাগল তারাদের।

এইভাবে চুপচাপ থাকতে কারো ভালো লাগে? পার্থিব কী দিয়ে কথা শুরু করবে আবার ভাবতে লাগল। অবশেষে ফট করে বলে উঠল,

‘দেখলেন! কেমন বুদ্ধি করে নিজের খাওয়া চা আপনাকে খাওয়ালাম।’

কথাটা শুনে শ্রুতি ভ্রু কুঁচকে ফেলল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায়। পার্থিবের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণের মিচকে হাসি দেখে রাগের পারদ বেড়ে বোধয় একশো ছুঁলো। অবাক কন্ঠে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করল,

‘একটা মানুষ এতোটা ফালতু কীভাবে হতে পারে!’

শ্রুতির ভঙ্গিমায় পার্থিব একইভাবে বলল, ‘১ টা মানুষের রাগ এতো সুন্দর কীভাবে হতে পারে!’

শ্রুতি চায়ের কাপ ঠাসস করে রেলিং এ রেখে দিল। পার্থিব তুলে নিয়ে সাথে সাথে চুমুক দিয়ে বাকিটা খেয়ে নিল।

এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয়না। গটগট করে রুমে চলে গেল শ্রুতি।

শ্রুতির দিকে তাকিয়ে ভীষণ মজা পেল পার্থিব। বোকা ১ টা!

.

আজকে শুক্রবার। অফিস বন্ধ। তবে দুটো কোচিং এ পার্ট টাইম জব করে সে। সপ্তাহের ২ দিন ২ ঘন্টা করে ক্লাস নেয়। ক্লাস টেনে জেনারেল ম্যাথ এবং ইন্টারের হায়ার ম্যাথ। এতে অন্তত মাস শেষে ৭ হাজার টাকা আসে। এই বা কম কীসে? শুয়ে বসে থেকে তো সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না।

মাহাথির কাঠের সোফার দিকে তাকাল। বিভা দু হাঁটু জড়িয়ে ধরে মাঝে নিজের থুতনি রেখে চুপচাপ বসে আছে। মন খারাপ নাকি? এই মেয়েটার মন খারাপ দেখলে পার্থিবের আলাদা প্রশান্তি আসে। কিন্তু কেন? মেয়েটা তাকে পছন্দ করে বলে?

হঠাৎ মাহাথিরের মনে পড়ল হাসিনার কথা। যাওয়ার দিন মাহাথিরের হাত ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল,

‘আব্বা, তোমার অমতে বিয়া আমি দেই নাই। তুমি মত দিসো, এরপরই দিসি। তাই মাইয়াডার সাথে কোনোপ্রকার অন্যায় তুমি করবানা। ভালোমতো মিশো, দেখবা কত ভদ্র, সভ্য সে। কষ্ট দিয়ো না বাজান। সে তোমার স্ত্রী হয়। সে সম্মানের যোগ্য।’

হাসিনা এক কথার কঠিন মানুষ। তার স্বরে প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিত্ববান মানুষটাকে মাহাথির বড্ড ভালোবাসে। ছোট থেকেই মাহাথির যেমন আদর পেয়েছে, তেমন পেয়েছে শাসন। এখনো এর কোনো হেরফের নেই। মাহাথির নিজেও মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে মায়ের সব কথা মানে। কিন্তু এই প্রথমবার হয়তো সে কোনো কথা মানছে না। অবশ্য মানার চেষ্টাও করছেনা। বউকে ভালোবেসে কী হবে? সেই তো একদিন ছাড়াছাড়িই হয়ে যায় সব।

______

চলবে ~

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

শব্দসংখ্যা - ১০৫৫

আন্তরিক ভাবে দু:খিত এতো ছোট হওয়ার জন্য। আগামী ২ দিন গল্প আসবে না। একদম মঙ্গলবারে দিব। এর কারণ গল্পটাকে একটু সাজাই। সাজানো হলে প্রতিদিন ২ পর্ব দিতেও আমার সমস্যা হবেনা।

শেষের দিকে বিভা-মাহাথির থাকবে প্রতি পর্বে, প্রতি অংশে। কিন্তু এখন ওরা তেমনভাবে থাকবে না। অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে ওদের কাহিনী লিখছিনা, কিন্তু প্রতি পর্বেই আমি ওদের রাখার চেষ্টা করি। গল্পটা ২ বোনের, ৩ পরিবারের। আশাকরি পাশে থাকবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন