ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

২০তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

২০.

সুখের সময় বুঝি একটু তাড়াতাড়িই শেষ হয়। হামিম, শ্রুতি, পার্থিব চলে গেছে ৪০ মিনিট হলো। খুব বেশি সময় নয়, তবে বিভার মনে হচ্ছে অনেক সময়।

বিভা সোফায় বসে পুরো ঘরের দিকে তাকাল। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। মাঝারি আয়তনের ফ্ল্যাট’টাকে বিভার কোনো রাজপ্রাসাদের মতো মনে হচ্ছে। যেখানে সে একা, শুধু সে, আর কেউ নেই। অথচ কিছুক্ষণ আগেও ছিল।

খারাপ লাগছে ভীষণ। ছোট ছোট ভাই-বোন দুটো কতো বড় হয়ে গেছে। মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। তিনজন একসাথে ঘুমানো, শ্রুতির অল্পতেই রে গে যাওয়া, কান্না করা, হামিমের যত্ন নেওয়া, নিজে মাঝে থেকে বাকি দু’জনকে দুহাতে আগলে রাখা – সব এক নিমিষে বিভার সামনে ভেসে উঠল। সময় এতো তাড়াতাড়ি কেন চলে যায়?

বিভার হঠাৎ মনে পড়ল শ্রুতির যাওয়ার আগের ঘটনা-

শ্রুতি যাওয়ার আগে বিভাকে অন্যঘরে ডেকে নিল। স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

‘মাহাথির ভাই কী তোমার সাথে খুব খারাপ আচরণ করে?’

বিভা চমকে গেল। তাদের ব্যাপারে সে তো কিছু বলেনি, তবে শ্রুতি এমন কথা কেন বলছে? তবে কী মাহ্থির বলেছে? বলতেই পারে।

বিভা কী বলবে ভেবে পেল না। সে মিথ্যা বলতে পারে না। আর শ্রুতি যেহেতু বুঝে গেছে ইনিয়ে-বিনিয়ে কিছু বলেও বিশেষ সুবিধা বিভা করতে পারবে বলে মনে হলো না। উত্তর দিল, ‘না।’

‘তারমানে উনি খারাপ ব্যবহার করে?’

‘না, খারাপ ব্যবহার করেনা শ্রুতি। শুধু আমাকে মেনে নিতে পারছেনা। তবে নিবেনা এমন'ও না। সে চেষ্টা করছে।’ সত্য মিথ্যা মিলিয়ে উত্তর দিল বিভা।

‘উনাকে ডিভোর্স দিয়ে দে, আপা।’ শ্রুতির ক্ষো/ভ মেশানো কণ্ঠস্বর।

এমন কথা শুনে চমকে উঠল বিভা। এমন কিছু সে আশা করেনি। ডিভোর্স? কীভাবে সম্ভব!

‘তোকে এতো করে থাকতে বলছি। কিন্তু থাকবি তো না। বাড়ি যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছিস। গেলে এখনই চলে যা, নয়তো রাত হয়ে যাবে।’

‘কথা ঘুরাচ্ছিস, আপা? তুই উনাকে ডিভোর্স দিয়ে দে। আমি জানি উনি তোকে কষ্ট দেয়। কী দরকার এইভাবে থাকার? উনার মতো খারাপ মানুষের সাথে থাকার কোনো দরকার নেই।’

এই পর্যায়ে বিভার মুখ থেকে সব প্রতিক্রিয়া চলে গেল। শব্দবিহীন ঠোঁট প্রসারিত করল, ‘উনি খারাপ নয় শ্রুতি। একদম খারাপ নয়। আমি বলছি, আমাকে বিশ্বাস কর। উনি খারাপ নয়। খারাপ হলে উনাকে মনে জায়গা দিতাম না। যেভাবে আমিন শিকদারকে মন থেকে উঠিয়ে দিয়েছি, সেভাবে উপড়ে দিতাম যার ছাপটাও অবশিষ্ট থাকতো না। এতো চিন্তা করিস না, ঠিকভাবে নিজের সংসার কর।’ বিভা শ্রুতিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশ্বস্ত করল। শ্রুতি কিছু বলল না, কেবল তাকিয়ে রইল।

তাদের কথোপকথন তারা বাদেও যে আরেকজন শুনেছে, তা দু’জনের কেউ'ই জানে নি।

শ্রুতির কথা ভাবা শেষেই বিভা মনে করল ওদের যাওয়ার সময়ের আশ্চর্যজনক ঘটনা। শ্রুতিরা যখন যাওয়ার কথা বলল তখন তাদের থাকতে বললেও রাজি হলো না। এরপর মাহাথির সবাইকে চমকে দিয়ে হামিমকে রেখে দিতে চাইল। সেখানে বাঁধ সাধল পার্থিব। মুখে হাসি রেখে বিনীতভাবে শুধু বলল, ‘ভাইয়া, আজ নিয়ে যাই। অন্যদিন ওর জামা-কাপড়, জিনিসপত্র সহ নিজেই নিয়ে আসব। আর কয়েকটা দিন ছোটবোনের বাড়িতে থাকুক। প্লিজ?’

পার্থিব ছেলেটা অতিরিক্ত ঠান্ডা, ভদ্র। এতো সুন্দর করে অনুরোধ করায় মাহাথির কিছু বলতে পারেনি। মাথা নেরে সায় দিয়েছে।

.

পার্থিব কাজ করছে। তবে কাজে মন বসছে না ভালোভাবে। সে খেয়াল করেছে সেই বাড়ি থেকে আসার পর থেকেই শ্রুতি তাকে এড়িয়ে চলছে। তেমন উগ্র কিছু করেনি, তবে শ্রুতির এড়িয়ে চলা পার্থিব বুঝে নিয়েছে।

আবার কী হলো এই মেয়ের? ভূত নামতে না নামতেই আবার নতুন কোন ভূত মাথায় উঠল কে জানে। পার্থিব কম্পিউটারের মাধ্যমে ফেসবুকে ঢুকে টাইপ করতে লাগল - আমার বাবুর নাম হবে ভূতু, ভূত এবং মানুষের বাচ্চা ভূতু। ভূতের বাচ্চা ভূতু।

এখানে, সে নিজেকে মানুষ এর কাতারে রাখল। নিজের স্ট্যাটাস পড়ে, নিজেই হেসে দিল পার্থিব। স্বচ্ছ, সুন্দর হাসি।

.

শ্রুতি শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে। ঘুমানোর চেষ্টা করছে, ঘুম আসছে না। ভীষণ রাগ, অস্বস্তি হচ্ছে। উঠে বসল। নিজের এক হাতের আঙুল দিয়ে অন্য হাতের মাংস খু/বলে ধরল। সে রেগে গেলে নিজেকে শাস্তি দেয়, এতে সে শান্তি খুঁজে পায়। পার্থিব ঘরে নেই। কোথায় গেছে কে জানে! পার্থিবকে ধরে অনেক নৃ/শংস ভাবে খু/ন করতে ইচ্ছে করছে। তার জন্য সে হেরে যাবে। কে বলেছিল বন্ধুত্ব করতে। লাগবে না তার কোনো বন্ধুত্ব, তবুও হারবে না। কিছুতেই না।

আমিন শিকদারের কথা মনে পড়ে গেল। শ্রুতি তখন তার পাশে বসা ছিল। আমিন শিকদার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, সুন্দরমতো সংসার করছো; দেখে ভালো লাগছে। ব্যাসসস…আমিন সাহেবের কথাটায় শ্রুতির মনে হলো ওর গায়ে কেউ জ্ব/লন্ত কয়লা ছুড়ে মেরেছে। তার মনে হলো আমিন শিকদার হয়তো তাকে খোঁচা দিল, উপহাস করল। সে বলেছিল ছয় মাসের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরত চলে যাবে। সাড়ে তিন মাস শেষ। অথচ তার ফেরার কোনো খবর নেই। কষ্টে শ্রুতির চোখে পানি চলে এলো। সে হারবে না। না মানে না।

.

‘উনি খারাপ নয় শ্রুতি। একদম খারাপ নয়। আমি বলছি, আমাকে বিশ্বাস কর। উনি খারাপ নয়। খারাপ হলে উনাকে মনে জায়গা দিতাম না। যেভাবে আমিন শিকদারকে মন থেকে উঠিয়ে দিয়েছি, সেভাবে উপড়ে দিতাম যার ছাপটাও অবশিষ্ট থাকতো না।’

কথাগুলো পোকার মতো কানে বেজে চলেছে। কেন বাজছে মাহাথির জানে না।

মন থেকে উঠিয়ে ফেলবে? এতো সাহস?

কথাটা বেশ ভালোভাবেই মাহাথিরের অহমে আঘাত হানলো। রাগ-ও হতে শুরু করল। তার রাগের কারণটা বেশ বৈষম্যমূলক। তার মতে, সে বিভাকে ভালোবাসুক বা নাই বাসুক, পছন্দ করুক বা নাই করুক। বিভার তার প্রতিই ভালোলাগা, ভালোবাসা আর যা কিছু হয় সব থাকতে হবে।

সে বিভাকে ভালোবাসে না, অথচ বিভা তাকে ভালোবাসে — ব্যাপারটা বেশ আনন্দের।

মাহাথির এমন কেন তা মাহাথির জানে না। বিভার সাথে খারাপ আচরণ-ই বা কেন করে তাও জানে না। শুধু জানে সে কোনো সম্পর্কে থাকতে চায় না, কোনো অদৃশ্য বাঁধনে বাঁধা পড়তে চায় না, সে থাকবে নিজের মতো। তার সাথে যেন অন্য কোনো জীবন না জড়ায়। তার কিছু হয়ে গেলে যেন অন্যকেউ কষ্ট না পায়। ‘কোনো সম্পর্কে থাকবে না’ - এই ভাবনা থেকেই বিভাকে দেখলে তার রাগ হয়। কিন্তু বললেই সব হয়না, সে চাক বা না চাক বিয়ে হয়ে গেছে। আজীবন তাদের একসাথেই থাকতে হবে।

হঠাৎ করে শ্রুতির কথা মনে পড়ল মাহাথিরের। বিভা যেমন শান্ত, শ্রুতি মেয়েটা ঠিক তার বিপরীত।

যাওয়ার সময় তখন। বিভা কোথাও গিয়েছিল, পার্থিব ফোনে কথা বলছিল। আচমকা শ্রুতি বলে বসে, ‘আপনি আমাকে যা ভুলতে বলেছেন তার কিছুই আমি ভুলিনি। ভুলবোওনা ভাইয়া। আপনি আমার আপাকে পছন্দ করেন না এইটা আমার মাথায় খুব ভালোভাবে গেঁথে গেছে।’

‘না ভুললে আমার কিছু করার নেই। সেদিন খারাপ ব্যবহার করেছি তার জন্য সরি। এর বেশি কিছু আমার বলার বা করার নেই।’ দায়সারা, নির্লিপ্ত কণ্ঠ মাহাথিরের।

শ্রুতির ভীষণ খারাপ লাগল। নিজের অবচেতন মনে আশা করেছিল মাহাথির তাকে বলবে ‘আমি বিভাকে ভীষণ পছন্দ করি, ভালোবাসি। আমি ওকে সুখে রাখব। তুমি চিন্তা করো না।’

বলল না কেন? শ্রুতি মনে হলো তার সামনে আরেক আমিন শিকদার। নিজের বাবার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে সে। সত্যিই সে আমিন শিকদারের মতো খারাপ? নাকি না? তার আপা তো বলেছে সে আমিন শিকদারের মতো নোংরা নয়। তার আপা হয়তো সত্যিই বলেছে। নিজের আপাকে বিশ্বাস করে ভীষণ বিশ্বাসের সাথে শ্রুতি বলতে শুরু করল,

‘আপনাকে একটা কথা বলি, আপনি খুব শীঘ্রই আমার আপাকে ভালোবাসবেন। মিলিয়ে নিয়েন।’

‘আমাকে দেখে তোমার মনে হয় তোমার কথা সত্যি হবে?’

‘আপনাকে দেখে কী মনে হয় তা আপাতত বলতে চাচ্ছি না। আর আপনি ভালোবাসবেন এইটা আমার বিশ্বাস। আপনার ওপর নয়, আমার আপার ওপর। আসলে সে মানুষটাই এমন। মায়ায় ভরা। সবাই তাকে ভালোবাসতে বাধ্য। সেখানে আপনিও বাধ্য, এবং আপনি তাকে ভালোবাসবেন’ই। দেখে নিয়েন।’

ভাবনা থেকে বের হলো মাহাথির। তার ভীষণ বিরক্ত লাগতে শুরু করল এখন। শব্দ পেয়ে পিছনে তাকাল। বিভা ধীর পায়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল।

‘আপনি কী শ্রুতি কে কিছু বলেছেন?’

কিছু সেকেন্ড পার হওয়ার পরেও কোনো উত্তর এলো না। বিভা নিজের মতো বলল,

‘আপনি ওকে কিছু বলবেন না। ও আমার বোন। ওর তো নিশ্চয়ই কোনো দোষ নেই। তার চেয়েও বড় কথা, আমার বোন আমাকে অনেক ভালোবাসে। ওকে কেউ কিছু বললে যতোটা না কষ্ট পায়, আমাকে বললে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পায়। তাই আশা করব আমার রাগ আমার বোনের ওপর দেখাবেন না।

মজার কথা কী জানেন, আপনি আর ও দু'জনের মাথাতেই সমস্যা। শালি-দুলাভাই শর্ট টেম্পারড। অল্পতেই রেগে আগুন।’

বলতে বলতে শব্দবিহীন হাসল বিভা।

মাহাথির বিভার কাছে গেল। বিভা হালকা চমকাল। দু'জনের দূরত্ব খুব সামান্য।

মাহাথির বিভার চুল কানে গুঁজে দিল সময় নিয়ে। বিভার বরাবর নিচু হয়ে শান্ত কণ্ঠে নিজের জেদ প্রকাশ করল, ‘আমি সেটাই করব যেটা আমি চাই। আমার চাওয়াতে তোমার মন মর্জি তো চলবে না বিভারাণি।’

____

চলবে~

শব্দসংখ্যা - ১২১৮

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

একজনের প্রশ্ন : মাহাথির এতো খা/টাশ কেন?

উত্তর : আমি খা/টাশ তাই।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন