ফন্ট সাইজ:
থিম:
একগুচ্ছ শুকতারা

৩৭তম পর্ব

লেখক: শারমিন ইরান

একগুচ্ছ শুকতারা

শারমিন ইরান

৩৭.

প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে আজ বেশ বেলা করে ঘুম ছাড়ল মাহাথির। হাত-মুখ ধুয়ে বাহিরে বেরিয়ে দেখল টেবিলে কেউ নেই। বুঝল মা-বাবা ঘরে, হামিমও বিছানায় শুয়ে শুয়ে নিজের মতো সময় পার করছে। বিভা তাহলে কোথায়?

ওমনি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল বিভা। হাতে বড়সড় ব্যাগ। মাহাথির ব্যাগ দেখে শুধালো, ‘ কই গেছিলে তুমি?’

‘ এই যে পাইকারি মূল্যে এইগুলো কিনেছিলাম অনলাইন থেকে। আজকে ডেলিভারি দিলো। নিচে আনতে গেছিলাম।’

মাহাথিরের কী মনে হলো কে জানে! সে বলল, ‘ এতো কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। তুমি চাইলে বিজনেস ছেড়ে দিতে পারো। এখন তো আমি আছি।’

বিভা চোখে চোখে রাখল। কতো সহজেই কথাটা বলে দিল মাহাথির। সত্যিই কী সে আছে? বিভা মাহাথিরের বলা কথা গ্রহণও করল না, বর্জনও করল না। বলল,

‘ প্রয়োজন পড়লে কিংবা বেশি কষ্ট মনে হলে ছেড়ে দিব।’

মাহাথির নিরব সম্মতি দিল।

বিভা ব্যাগ সাইড করে রেখে বলল, ‘ বসুন, নাস্তা দিচ্ছি।’

মাহাথির গিয়ে টেবিলে বসল। বিভা হাত ধুয়ে প্লেটে খাবার দিল। খাবার সে এক প্লেটেই বাড়ল। মাহাথির তা দেখে বলল,

‘ তুমি খেয়েছো?’

‘ হ্যাঁ, খেয়েছি। আজ অনেক সকালে উঠেছিলাম। ক্ষুধা পেল, খেয়ে নিলাম। আজ সবার আগে আমি খেয়েছি।’

‘ ভালো করেছো।’

আগে বিভা মাহাথিরের জন্য অপেক্ষা করত। আজ করল না? অভিমান থেকে নাকি সত্যিই ক্ষুধা পেয়েছিল? যদি ক্ষুধা পেয়ে থাকে তাহলে ভালো করেছে খেয়ে। আর যদি অভিমান থেকে হয়ে থাকে তাহলে ওর খবরই আছে!

মাহাথিরের খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে পানি খেতে টেবিলে বসল। এরমাঝেই কফি দেওয়া হলো। মাহাথির ডাকল বিভাকে,

‘ খাবার কখন না কখন খেয়েছো, আমার সাথে কফি খাও?’

বিভা মাহাথিরের ব্যবহার হজম করতে পারছেনা। কষ্ট হচ্ছে। এই লোকের হয়েছেটা কী? কথা তো গম্ভীরমুখেই বলছে। তবুও কথার সুরে ভিন্নতা। বিভা বলল,

‘ খাবনা, মাহাব। খেলে বানিয়ে নিব। সমস্যা নেই।’

মাহাথিরের মনে হলো তার পুরো সকালবেলার ওপর কেউ নিম পাতার রস ছুঁড়ে মেরে সকালবেলাটাকে তিক্ত করে ফেলল। মাহাব! আবারো? এখন কী এই নামেই ডাকবে নাকি? মাহাথির বলেছিল মাহাথির নামে তার কাছের মানুষ ডাকে, সে যেন না ডাকে। সেই কথাকে কেন্দ্র করেই বুঝি এমন করছে? নিজেকে দূরের মানুষ বানাতে চাইছে? সাথে মাহাথিরকে কষ্ট দিতে চাওয়া তো আছেই।

আর কী বলল? খেতে মন চাইলে বানিয়ে খাবে? কেন ওর কফি অর্ধেক খেলে কী হতো?

ও কী সত্যি সত্যি মাহাথিরকে মন থেকে উঠিয়ে ফেলল? ওর মনের কোনো জায়গায় কী মাহাথিরের ছায়াও এখন অবশিষ্ট নেই?

মাহাথির বিরস মুখে কফির দিকে চেয়ে রইল। উদ্দেশ্য কফি ফেলে দিয়ে আসবে।

মিনিক সাতেক পর সে পুরো কফি ঢকঢক করে গিলল। ইসসস! ঠান্ডা শরবত…!

.

‘ শ্রুতি, এইসব আমি কী শুনছি? আপনি নাকি দুপুরে খাননি? কিন্তু কেন?’

শ্রুতি ঘুরল না। সে উল্টোঘুরে আছে। পার্থিব শ্রুতির এক বাহু ধরে নিজের দিকে ফিরাল। পার্থিব হতবাক হয়ে গেল শ্রুতির অশ্রুভরা চোখ দেখে। শ্রুতি ঘুরে পার্থিবের দিকে তাকাতেই টপটপ করে ঝড়ল চোখের বৃষ্টি। পার্থিব বিচলিত হয়ে গেল। অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘ আপনি কাঁদছেন কেন?’

শ্রুতি কিছু বললনা। পার্থিব শ্রুতিকে টেনে নিজের কাছে আনল। শ্রুতির মুখ থেকে কিছুই বের হচ্ছেনা। পার্থিব শ্রুতিকে এক হাতে জড়িয়ে বলল, ‘ শ্রুতি, কী হয়েছে আমাকে বলুন? প্লিজ? এইভাবে কাঁদলে আমি কী করে বুঝব?’

আচম্বিত শ্রুতি পার্থিবকে জড়িয়ে ধরল। শরীরের সব শক্তি দিয়ে। পার্থিব কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে গেল। বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখ দিয়ে কিছুই বের হলো না।

শ্রুতি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে ধমক দিল,

‘ আপনি আমার সাথে আগের মতো হয়ে যান প্লিজ। আমার ভালো লাগেনা এমন। আপনি আগে একটুও কাজ করতেন না। বাড়ি ফিরে আমার সাথে কথা বলতেন। অথচ এখন আমি কেউ'ই না আপনার কাছে। কেন? এতো কীসের কাজ আপনার? আমি তো জানতাম না ওই ফাইলে আপনাদের দরকারি কাগজ ছিল। জানলে ছিঁড়তামও না। ভুল করে ফেলেছি তাও মানছেন না। আমাকে ক্ষমা করছেন না। অথচ বিয়ের পরে বড় বড় কথা বলেছিলেন যে - ছোট মানুষদের ভুল ক্ষমা করতে হয়। বিয়ে মানে আত্মার সম্পর্ক। ঘোড়ার ডিমের সম্পর্ক! আপনি আমার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহারই করছেন না, আত্মা তো দূরের বিষয়। আমাকে ভালোওবাসেন না। অন্যকাউকে ভালোবাসেন? আমি ঠিকই ভাবি। আমাকে কেউ ভালোবাসে না। কেউ না।’

ধমকে ধমকে, কাঁদতে কাঁদতে নিজের কথা শেষ করল শ্রুতি। পার্থিব চুপ করে রইল। হাপ ছাড়ল। মেয়েটা এতো অবুঝ! অথচ ভাব এমন করে যেন পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে চতুর সে। পার্থিব নিজেও তার বউকে জড়িয়ে ধরল।

শান্তকণ্ঠে বলল,

‘ কান্না থামান, শ্রুতি। আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। শুধু চেয়েছিলাম আপনি সম্পর্কে এগিয়ে আসুন। একার জোড়ে কখনো সম্পর্ক টিকে না। সম্পর্কে দুইজনের চেষ্টা, যত্ন, তাগিদ থাকতে হয়। আমি যা চেয়েছিলাম আমি পেয়ে গেছি শ্রুতি। এইযে আপনি এক পা এগুলেন, এবার আমি একশো পা দৌড়ে যাব আপনার কাছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমি আপনার ওপর রাগ করিনি। পার্থিব তার শ্রুতির ওপর রাগ করতেই পারেনা।’

শ্রুতি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল মুখ উঠিয়ে, ‘ আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন?’

‘ উহুম! আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আগেও বাসতাম, এখনো বাসছি। ভবিষ্যতেও বাসব।’

‘ আর রাগ করবেন না? কাজের নাটক করবেন না তো?’ সরল প্রশ্ন।

পার্থিব অনেকদিন পর প্রাণখুলে হেসে দিল। শ্রুতিকে এক হাতে জড়িয়ে এনে এক আঙুল দিয়ে নাকের মাথা ধরে নাড়িয়ে দিল আর বলল, ‘ আমার বোকা বউ! আমি কাজের অভিনয় করিনি। সত্যিই আমি ব্যস্ত ছিলাম। ওইদিন বললাম না?’

শ্রুতি মাথা নিচু করে ফেলল। শুধু শুধু কতো চিন্তা করছিল সে। পার্থিব শ্রুতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই শ্রুতি ছটফটিয়ে উঠল, ‘ আমি শ্বাস নিতে পারছিনা তো। আসতে ধরুন।’

‘ এটা আপনার শাস্তি। এতোদিন ধরে আমার সাথে তিড়িংবিড়িং করার শাস্তি। এবার শ্বাস আটকে বসে থাকুন।’

.

হাসিনা ছাদে এসেছে কাপড় শুকা দিতে। সে লক্ষ্য করল তার পিছু পিছু মাহাথিরও এসেছে। মাহাথিরকে অসময়ে ছাদে দেখে বলল, ‘ তুমি এইখানে কেন আব্বা? কিছু লাগব?’

‘ আপনার সাথে আলাদা কথা বলতে চাচ্ছিলাম, আম্মা।’

‘ কী কথা?’

‘ আম্মা, আপনি বিভাকে বলেন ভালো হতে।’

‘ এইসব কী কও তুমি! বিভা কী খারাপ নাকি?’ নিজের ছেলের এমন কথায় আশ্চর্য হয়ে উঠলেন হাসিনা।

‘ ও আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলেনা।’

‘ ভালো তো। তুমিও বলোনা, ওয়'ও বলেনা। শোধবাধ।’

‘ আমি বলিই আম্মা। আমি ওর সাথে বলতে চাই। ও আমাকে এড়িয়ে গেলে কীভাবে বলব?’

‘ এড়াই যাওয়ার মতোন কাজ করলে তোমারে মাথায় তুইলা নাচব নাকি?’

মাহাথির রেগে উঠল। কী শুরু করেছে সবাই তার সাথে!

‘ আমার এইসব মোটেও ভালো লাগছেনা।’

‘ তো আমি কী করবো?’

‘ আপনি ওকে বলবেন, আমি আগের মতো নেই। আমি ওকে.. ওর সাথে স্বাভাবিক হতে চাচ্ছি।’

হাসিনার কাজ শেষ। সে মাহাথিরের দিকে তাকাল। মনে মনে হাসল। আগেও মাহাথিরের কিছু লাগলে সে এইভাবে পিছু পিছু ঘুরতো। আজও এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চা ছেলেটা নিজের প্রিয় জিনিসের অভাবে গাল ফুলিয়ে আছে। সে বালতি নিয়ে মাহাথিরের দিকে এগিয়ে এলো। বলল,

‘ শুনো বাজান। অনেক দোষ তুমি করসো। সেই শাস্তিও তুমি প্রাপ্য। আর কেমন পোলা তুমি? বউয়ের মান ভাঙাইতে মায়ের কাছে আসছো? যেই কথাগুলো আমারে বললা সেইগুলা বউরে বলো যাও।’

হাসিনা হাপ ছেড়ে আবারো বলল, ‘ কম অন্যায় করো নাই। নিজের চোখেই এতো দেখছি, আমি না থাকতে আরোও কতো করসো আল্লাহ মালুম। ওইদিন বললাম বউডার হাত কাটছে। ফিরাও চাইলা না। উচিত ছিল না নিজের বউরে খাওয়াই দেওয়ার? বলো, উচিত ছিল কিনা?’

মাহাথির উত্তর দিতে পারল না। কপালে অসহায়ত্বের ভাঁজ ফেলল। এতো এতো দোষ করেছে যে নিজের চোখেই চোখ মিলাতে পারছেনা। কী হবে তার? কী হবে তার সম্পর্কের? এর পরিণামে কী?

বিকেলবেলা। মাহাথির বাইরে গেছিল একটু। ঘরে ফিরে দেখল সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত আছে। মাহাথির নিজের ঘরে ঢুকল। হাত-মুখ ধুয়ে বের হতেই চোখ পড়ল বিছানায়। বিছানায় ভাঁজ করা কাপড়ের দু'টো স্তূপ। একটা স্তূপে মাহাথিরের কাপড় ভাঁজ করা। অন্যটায় বিভার কাপড়। মোক্ষম সুযোগ। মাহাথির কাপড় গুলো তুলে নিজে আলমারিতে রাখল। মাহাথিরের ভাঁজ করা পাঞ্জাবিগুলোর ওপর সুন্দর করে বিভার জামাগুলো রেখে দিল। আপাতত এইগুলো থাক, পরে অন্যান্য কাপড়ও ঢুকিয়ে রাখবে।

মাহাথিরের মনে হলো এখন আলমারিটা দেখতে সুন্দর লাগছে। আলমারিটাকেও বিবাহিত মনে হচ্ছে। বিবাহিত মাহাথিরের বিবাহিত আলমারি। মাহাথির মুখে সরু হাসির সাথে আলমারির দরজা বন্ধ করে ফেলল।

.

‘ মাহাব, উঠুন। এই… ৭ টা ২০ বাজে। খাবেন কখন, গোসল করবেন কখন আর অফিসে যাবেনই বা কখন? আটটায় না অফিস? এই মাহাথ..মাহাব।’

বিভা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সাতটা থেকে ডাকছে। এইবার হাত ধরে টানতে লাগল। উদ্দেশ্য উঠিয়ে বসানো। মাহাথিরের ঘুম হালকা হতেই সে বিভার হাতের স্পর্শ বুঝল। উল্টো সে টান দিল বিভাকে। বিভা এমনটা আশা করেনি। তাই নিজের ওপর নিজের আয়ত্ত রাখতে পারল না। পরে গেল মাহাথিরের ওপর। মুখ গিয়ে ঠেকল মাহাথিরের কাঁধে। চুল বাঁধা থাকায় অতিরিক্ত ঝামেলা হলোনা। ঘটনায় আকস্মিকতায় বিভা হতভম্ব!

অন্যদিকে সকাল সকাল মাহাথিরের মুখে হাসি ফুটল। এক হাত বিভার পিঠে। অন্য হাতে জড়িয়ে ধরতে যাবে ওমনি বিভা কর্কশ কণ্ঠ কানে এলো, ‘ মাহ্ থির সাতটা ছাব্বিশ বাজে। আটটায় আপনার অফিস। ভুলে গেছেন নাকি লেট হলে যে ফি কাটে?’

মাহাথির চমকে বিভার দিকে চাইল। বিভা নিজেকে সামলে উঠে পড়তেই মাহাথির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক লাফে উঠে পড়ল। সেদিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে স্থান ত্যাগ করল বিভা।

বাথরুম থেকে তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে হাতের কাছে সব পেয়ে মনটা খুশি হলো। মোজা পড়তে গিয়ে দেখল মোজাটা অনেক দিন ধরে পরা হয়। নষ্ট হয়ে গেছে। আলমারি খুলল নতুন মোজা বের করার আশায়। কাঙ্ক্ষিত জিনিস নিয়ে দরজা আটকানোর সময় চোখ আটকালো ওপরে। বিভার জামা নেই। কোথাও নেই আলমারির। মূহুর্তের মধ্যে সুন্দর মেজাজে ছাই পড়ে গেল। রাগে, দুঃখে দরজা আটকে ফেলল। এতো রাগ? এতো অভিমান? মাহাথির নিজের হাতে রাখল জামগুলো। তাও সরিয়ে ফেলল?

নিজের বদরাগের কারণে দুপুরের খাবারও নিল না মাহাথির। বেরিয়ে পড়ল অফিসের উদ্দেশ্যে।

_____

চলবে~

শব্দসংখ্যা - ১৪২৭

#একগুচ্ছ_শুকতারা

#শারমিন_ইরান

[ গল্পে একঘেয়েমি, বিরক্তি এলেও কিছু করার নেই। বিভা কষ্ট পেয়েছে, মাহাথিরও পাবে। এতো সহজে তার ছাড় নেই। কারো খারাপ লাগলে ইগনোর করার জন্য অনুরোধ করব।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন