একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৩৯.
মানুষের জীবন ধীরে ধীরে সহজ হয়, সুন্দর হয়। দুঃখ দূর হয়ে খুশিরা ডানা ঝাপটে আসে। অথচ মাহাথিরের মনে হলো তার জীবনে ঘটছে সব উলটো টা। তার জীবন সহজ ছিল, সুন্দর ছিল, নির্ঝঞ্ঝাট ছিল। এমন জীবনে হয়তো সে বোরিং ফিল করছিল। তাই তো নিজ দায়িত্বে জীবনটাকে এলোমেলো করেছে।
ছোটথেকেই তার দুনিয়া বেশ সংকীর্ণ। গুটি কয়েক মানুষকে নিয়ে তার দুনিয়া। ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ‘বিভা’ নামক রমণী কোথায় থেকে যেন উড়ে উড়ে চলে এলো। তার সহজ, পানসে জীবনকে ডানা ঝাপটে করে দিলো আরোও সুন্দর। দূর করল সব একাকীত্ব। চারদিকে মেলে দিলো যত্ন, ভালোবাসার ঘ্রাণ।
নিজের এলোমেলো অনুভূতিতে মাহাথিরের মনে হলো যদি একটা ভালোবাসার যন্ত্র থাকতো তবে বেশ হতো। তাকে এতো দোটানায়, ঝামেলায় পড়তে হতো না। সে সেই যন্ত্রকে প্রশ্ন করতো ‘ মাহাথির কবে বিভার সাথে এতোটা জড়িয়ে গেল? মাহাথিরের মনে কবে বিভাকে ঘিরে এতো অনুভূতি তৈরি হলো?’
ভালো লাগেনা। কিচ্ছু ভালো লাগেনা। প্রথমে তার আম্মা বিয়ের কথা বলতো যা সে এড়িয়ে চলতো। যেন বিয়ে কোনো অপরাধমূলক কাজ। এরপর যখন নিজের দোনোমনা মন নিয়ে বিয়ে করে বসল তখন আবার ঠিক করল সংসার করবেনা। বিভাকে স্ত্রী হিসেবে মানবেই না। খুঁত হিসেবে বের করল গায়ের রঙ যা মাত্রই ছিল একটা বাহানা। কতো খারাপ ব্যবহার, কতো অপমান করল বিভাকে! এরপর ধীরে ধীরে নিল সংসার করার সিদ্ধান্ত। সবশেষে ভালোবেসে ফেলল বিভাকে। ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ল। অনুভূতিরা ঝাপটে ধরল তাকে।
এতোকিছুর মাঝে কখন বিভার প্রতি অনুভূতি তৈরি হলো কে জানে!
অনুভূতির জন্ম বোধয় হয় বিভার করা যত্ন থেকে। প্রথম প্রথম বিভার দেওয়া যত্ন তার বেশ ভালো লাগতো। বিভা তার প্রতি যত্ন করছে তা সে অনুভব করতো। নিজের অজান্তেই ভালোলাগা তৈরি হতো। এরপর তার মনে চাপল কীভাবে বিভাকে খুশি করা যায়। কীভাবে মেয়েটার কষ্ট একটু দূর করা যায় তার প্রচেষ্টা। তাই তো প্রায় এটাসেটা কিনে নিয়ে যেত বিভার জন্য। উদ্দেশ্য বিভার মুখের একটু হাসি দেখা। তাও হতোনা। তাতে অবশ্য মাহাথিরের দোষই থাকতো। কারণ বিভা যখন প্রশ্ন করতো কার জন্য, তখন সে বলতে পারতো না ‘ তোমার জন্য’, মুখ থেকে স্বভাববশত গম্ভীর গলা বের হতো অথবা উলটোপালটা কথা বলে বসতো। কেন? কী হতো যদি সে দু'টি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করতো? সে যদি উচ্চারণ করতো — ‘ তোমার জন্য’। তাহলেই তো বিভা হাসতো। সুন্দর করে হাসতো। সে বলেনি কেন? যেই অপরমানুষ টাকে খুশি করতে সে দু'টো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনি, তার থেকে সে এতোকিছু আশা কীভাবে করছে? লজ্জা হওয়া উচিত তার।
মাহাথির ভীষণ অবহেলার সাথে দৃষ্টি মেঝেতে দিয়ে আছে। মেঝেতে তাকিয়ে ভাবছে নিজের জীবনের কথা। সেই মূহুর্তে আনাস এসে বসল সামনে। মুখে উৎফুল্লতা। নিশ্চয়ই ছুটি মঞ্জুর করেছে। মাহাথির আনাসের দিকে তাকালে আনাস উৎফুল্লতার সাথে বলল, ‘ কীরে! আগে গম্ভীর হয়ে থাকতি, এখন দেবদাসের মতো মুখ করে থাকিস। জীবনে মুখটা স্বাভাবিক করবি না?’
মাহাথির কিছু বলল না। আনাসের মনে হলো পরিস্থিতি বেশ গম্ভীর, সিরিয়াস। তাই সে কৌতূহলী কণ্ঠে জানার আশায় বলল, ‘ সব ঠিক হয়নি দোস্ত?’
মাহাথির হালকা দুপাশে মাথা নেড়ে জানালো, না! হয়নি।
‘ ভাবী কী বেশি রাগ?’
‘ আমাকে বিশ্বাস করেনা ও।’
‘ বুঝলাম না।’
‘ ওর ধারণা আমি মিথ্যা বলছি।’
‘ সবকথা বুঝিয়ে বল।’
‘ ও বলছে ও আমাকে ভালোবাসতো আমার স্বচ্ছতার কারণে। আমি আমার মনের কথা ওকে বলে দিতাম হোক সেটা খারাপ কথা - এই জন্য আমার প্রতি ওর সম্মান আসতো। কিন্তু এখনের কথা ওর কাছে মিথ্যা, বানোয়াট লাগে। তাই আমি এইসব বললে নাকি আমার সম্মানও ওর নজড়ে কমে যাবে। কী করব আমি বল? নিজের অনুভূতি বলতে গিয়েও আটকে যাচ্ছি।’ হতাশ গলায় নিজের দ্বিধাযুক্ত কথা শেষ করল মাহাথির।
‘ এখন এইসব কিছু মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এতোদিন এতোকিছুর পর হঠাৎ করে….’
‘ হঠাৎ করে?’ আনাসের কথা সম্পূর্ণ হতে না দিয়েই মাহাথির গর্জে উঠল। যার অর্থ - আনাস ভুল বলছে। তাই তাকে উল্টো প্রশ্ন করে বুঝানো হলো যে সে ভুল।
আনাস নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল,
‘ সরি। সরি। ভুল হয়েছে। হঠাৎ করে না। তবে হঠাৎ করে যে অনুভূতি হয়নি সেটা তুই জানিস, আমিও জানি। কারণ আমি তোর অস্থিরতা দেখেছি। কিন্তু বিভা তো জানেনা রে। ওকে জানা।’
মাহাথিরের জেদ চাপল। বলল,
‘ কেন জানবে না? ও কি অন্ধ? ও জানে। তাও আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’
‘ ব্যাপারটা এমন নয় মাহাথির। দেখ, বিয়ের পর থেকে তুই বিভার সাথে খারাপ ব্যবহার করছিস। ধীরে ধীরে ওর ওপর তোর ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করল। এরপর তুই বুঝলি ওকে ছাড়া তোর চলবেনা। কিন্তু এতোকিছু তো বিভা জানেনা। তুই জানতে দিসনি। তুই কী মনে করছিস ওর কষ্ট, অভিমান এতো সহজে গলে যাবে? তুই হঠাৎ করে ওকে গিয়ে বলছিস ওর আগের করা কাজ তুই মিস করছিস। এটাকে ও কী ভাববে বল? ভাববে তুই জাস্ট ওর ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছিস। আর কিছুনা।’
‘ তোরও কী মনে হয় আমি শুধু নিজের প্রয়োজনে এমন করছি?’ মাহাথিরের কণ্ঠে অসহায়ত্ব, যেন সে এইবার নিজেই নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।
‘ না বন্ধু। তুই ভাবির ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছিস এইটা সত্যি, ওর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে গেছিস এইটাও সত্যি। সাথে তোর মধ্যে সত্যিই বিভার জন্য ভালোবাসা আছে সেটা আমি জানি। ভালোবাসা আছে বলেই বিভার জন্য চিন্তা করতি, যত্ন করতি নিজের অজান্তেই, খুশি করতে চাইতি। এরপর বিভা যখন ওর কাজগুলো বন্ধ করে দিল তখন তুই কষ্ট পেতে শুরু করলি, একাকীত্ব বোধ করতে লাগলি। তোর এই ভেবেই খারাপ লাগল যে বিভা তোকে যত্ন করছেনা, তোর খেয়াল রাখছেনা। তোকে ভালোবাসছেনা। কারণ আমরা আমাদের প্রিয় মানুষের অবহেলা মানতে পারিনা। ঠিক বললাম?’
মাহাথির বাচ্চাদের মতো উপর-নিচ মাথা নাড়ল। বাচ্চাদের মতো স্বীকারোক্তি দিতে চেষ্টা করল, ‘ আমার, আমার এই ভেবে ভয় হয়েছে যে বিভা যদি সত্যি সত্যি ওর মন থেকে আমাকে উঠিয়ে দেয়?’
আনাস মলিন হাসল। যে বন্ধু আগে প্রয়োজনেও কথা বলতো না, কেবল শুনতো। তার সেই বন্ধুই আজ কতোটা উদ্বিগ্ন! কতোটা ভয় তার চোখে-মুখে! ভালোবাসা কী সুন্দর! কতোটা বদলে দেয় একটা মানুষকে! ভেবেই অবাক লাগে।
বেল বেজে উঠল। অর্থাৎ কাজের সময় শুরু। আনাস উঠতে উঠতে বলল, ‘ চিন্তা বাদ দিয়ে কাজ তাড়াতাড়ি শেষ কর। এরপর দ্রুত বাড়ি চলে যা। ভাবিকে অনুভব করা তোর অবস্থা। এইভাবে দেবদাস হয়ে কিছুই হবেনা।’
মাহাথির স্ক্রিনে তাকাল। তার বাকি কাজ দেখে মাথা ঘুরতে লাগল। এতো কাজ সে করবে কখন ভেবেই ইচ্ছে করল সামনের ল্যাপটপটা ভেঙে গুড়িয়ে দিতে।
.
বাড়িতে ঢুকেই দেখতে পেল আব্বা-আম্মা একসাথে বসে আছে। দৃশ্যটা কী সুন্দর! আব্বার শরীরটা আগের তুলনায় অনেক ভালো — ভেবেই এতো এতো যন্ত্রণার মাঝেও বুকের কোথাও একটু শান্তি পেল।
সিদ্দীক সাহেবও ছেলেকে দেখতে পেয়ে চোখে হাসলেন। বলল,
‘ যাও আব্বা হাত-মুখ ধুঁইয়া আসো। একসাথে পিঠা খাই। আমার আম্মা বানাইছে পিঠা।’
বিভাকে কী সুন্দর করে আম্মা ডাকছে তার আব্বা! শুনে ভালো লাগল মাহাথিরের। ‘হ্যাঁ’ বোধক মাথা নাড়তে যাবে তখনি হাসিনা বলে উঠল, ‘ কীসের পিঠা খাওয়া! দুপুরে খাবার নেয়নাই তোমার পোলা। যাও, তুমি হাত-মুখ ধুঁইয়া টেবিলে বসো আব্বা। আর শুনো ঘরে ঢুইকা বউরে ডাক দিও। বউ দুপুরে খায় নাই। খাবার নাকি ভালো লাগেনা। তাই পিঠা বানাইয়া, গোসল দিয়া সেই যে ঘুম দিসে এখনো উঠে নাই। যাও গিয়া দেখো।’
মায়ের কথায় চিন্তার ভাঁজ পড়ল কপালে। দুপুরে খায়নি কেন বিভা? মূহুর্তেই অন্য চিন্তা মাথায় আসতেই ভেতর থেকে খুশিরা হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠল। বিভা খায়নি। কেন খায়নি? সে দুপুরে খাবার নেয়নি বলে?
মাহাথির না চাইতেও হেসে ফেলল। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে মুখটা হয়ে উঠল উজ্জ্বল। যেখানে নিজের স্ত্রীর জন্য দুশ্চিন্তা করার কথা, সেখানে সে এই ভেবে খুশি হলো যে তার স্ত্রী এখনো তাকে ভালোবাসে। তার জন্য চিন্তা করে। মাহাথির নিজের উপচে পড়া খুশি থামাতে পারল না। আবার প্রকাশ করাও সম্ভব নয়। তাই সে যতোদ্রুত সম্ভব ঘরে চলে গেল। হাত-মুখ ধুঁয়ে খাবার খেতে বসতে হবে। সে আর বিভা একসাথে খাবে ভেবেই মাহাথিরের হাত-পা দ্রুত চলতে লাগল।
.
চোখ খুলে মুখের ওপর মাহাথিরের মুখ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল বিভা। ঘুম থেকে উঠেই সে এমনকিছু আশা করেনি। মস্তিষ্ক সচল হতে সময় নিল।
মাহাথিরের মুখ চিন্তিত। বিভাকে সুস্থ লাগছেনা। কেমন মলিন চোখ-মুখ। সত্যি সত্যি অসুস্থ নাকি না খাওয়ার কারণে এমন লাগছে। শান্তকণ্ঠে শুধাল, ‘ ঠিক আছো?’
বিভা কিছুই বলল না। বিভার ঘাড়ে ব্যথা করছে। শরীর অবশ লাগছে। হাত উঠিয়ে ঘাড়ে রাখতেই মাহাথির হয়তো বুঝল। কপালে ভাঁজ ফেলেই নিজের হাত বিভার ঘাড়ে দিয়ে মালিশ করতে লাগল। অবাকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় থাকা বিভা নির্নিমেষ চেয়ে রইল তার সামনে থাকা কয়েক ইঞ্চি দূরত্বের পুরুষের দিকে।
নিজের কাজ শেষেই বলল, ‘ দুপুরে খাওনি কেন? চলো খেয়ে নিবে। খাবার টেবিলে খাবে নাকি এখানে আনব?’
‘ খাবনা আমি।’
‘ বেশি কথা বললে ঘাড় ভেঙে দিব।’ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল মাহাথির।
বিভা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। অনেকদিন পর ধমক খেল সে। মাহাথির প্রশ্ন করল,
‘ খাওনি কেন তুমি?’
বিভা ঠোঁট চেপে ধরল। সে খায়নি দু'টো কারণে। প্রধান কারণ হলো মাহাথির খাবার নেয়নি কেন? তাই সেও খায়নি। খেতে ইচ্ছে করেনি। দ্বিতীয় কারণ হলো যখনি ভেবেছিল খাবে তখনি খাবারের গন্ধে অসহ্যবোধ হচ্ছিল। তাই ঘরে এসে ঘুম দিয়েছে। তবে এর কিছুই বিভা বলল না। বলল, ‘ এমনি।’
‘ এরপর থেকে এমন অনিয়ম করোনা।’
‘ কেন? করলে কী করবেন?’
‘ করবে কেন তুমি?’
পুরোনো চিন্তা মাথায় চেপে বসল বিভার। বলল, ‘ এতোকিছু করার কী দরকার বলুন তো? আমি তো আপনার সাথে আছি। আপনার ঘরে আছি, কাছে আছি। তবুও হঠাৎ এইসব কেন শুরু করেছেন আপনি?’
‘ মানে?’
‘ মানে এই যে নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে মানার চেষ্টা করার দরকার নেই আপনার, ভালোবাসার অভিনয়েরও দরকার নেই। শুধু শুধু চিন্তিত দেখানোরও প্রয়োজন নেই। আগে যেমন ছিলেন তেমনি থাকুন।’
বিভা খাট থেকে নেমে পড়ল। মাহাথির তখনো বসা। সে আটকে ধরল বিভার হাত। বিভা ঘুরলে দেখল মাহাথির তাকিয়ে আছে তার দিকে। মলিন, শান্ত মুখে। চোখের দৃষ্টিতে সামনের মানুষের কাছে নিজেকে বুঝাতে না পারার অসহায়ত্ব। মাহাথির বলল,
‘ আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে বুঝবে বিভা। আমার চলাফেরায়, কাজকর্মে, চোখের ভাষায় তুমি আমাকে বুঝতে পারবে। কিন্তু তুমি আমাকে বুঝলে না। বুঝলে না নাকি বুঝেও না বুঝার চেষ্টা করছো আমি জানিনা।’
বিভা অবহেলার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মাহাথির উঠে গেল। নিজের দুই বাহুতে বিভাকে আড়াল করে ফেলল। এক হাতে বিভার মাথা বুকে মিশিয়ে দিয়ে সে নিজের মাথা নামিয়ে আনল বিভার কাঁধে। নিজেকে বুঝানোর চেষ্টায়, নিজের ভুলগুলো শুধরানোর চেষ্টায় কাতর কণ্ঠে বলল,
‘ তোমাকে আমার কষ্ট দেওয়া উচিত হয়নি। তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করা উচিত হয়নি। তোমার অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন করা উচিত হয়নি। বিয়ের পর থেকে যা যা করেছি তার কিছুই করা উচিত হয়নি। আই এম সরি। আই এম সরি ফর এভ্রিথিং। আমাকে ক্ষমা করো তুমি। তবে এতো এতো অনুচিতের মাঝে তোমাকে ভালোবাসাটা উচিত হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করো বিভা। আমাকে বিশ্বাস করো।’
কাঁধে মাহাথিরের ঠোঁটের ছোঁয়ায় শক্ত হয়ে গেল বিভা। চুপচাপ শুনল মাহাথিরের কথা। চোখের কোলে জমতে থাকল বিন্দু বিন্দু অশ্রু। বুকের ভেতরে থাকা অবিশ্বাসদের ডানা গজালো। তবে উড়ে গেলনা। সাথে শক্ত পাথরের মতো অভিমান গুলোর মাঝে মাহাথিরের কথাগুলো ভীষণ ভারী হয়ে পড়ল। অভিমান গুলো ফেঁটে গেল। তবে ফাঁটলেই তো শুধু হবেনা। অভিমান গলে তরল হতে হবে। এরপর সেই অভিমান গুলো ভালোবাসার সাথে দ্রবীভূত হয়ে নিঃশ্বাস হতে হবে। এতোকিছু কী সত্যিই হবে?
বিভা মাহাথিরের পিঠে এক হাত রাখল। নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বলল, ‘ খাবেন চলুন। সেই সকালে খেয়েছেন। শরীর খারাপ করবে।’
.
মাহাথির ঘরে বসে নিজের কাজ শেষ করছে। অফিসে এখন তেমন কাজ করা হয়না বললেই চলে। সারাক্ষণ নানান চিন্তায় বিভোর থাকে সে। তার চিন্তার যে নিরানব্বই শতাংশ বিভাকে নিয়ে তা আর বলার প্রয়োজন রাখেনা। এখন তার বেশি বেশি কাজ করতে হবে। প্রমোশোন টা হয়ে গেলে বেতন বাড়বে। তখন জীবনটাকে আরোও গুছিয়ে নেওয়া যাবে। আরেকটু স্বচ্ছলতা বাড়বে। মাহাথির নিজের কাজ মনোযোগ দিয়ে করতে লাগল। কাজ প্রায় শেষের দিকে। আরেকটু আছে।
মিনিট বিশেক পর নিজের কাজের সমাপ্তি ঘটালো মাহাথির। উঠে পড়ল জায়গা ছেড়ে। হাত-পা দিয়ে কিছু শারীরিক ব্যায়াম করে শরীরের একঘেয়েমি ছুটালো। এখন উদ্দেশ্য হামিমের ঘরে যাওয়া। আজ একবারো দেখা হয়নি। খবর নেওয়া দরকার। নিজের ফোন উঠানোর ক্ষেত্রে হাত বাড়াতেই চোখে পড়ল দূরে ওয়াবড্রবের ওপর কিছু উলটো করে রাখা। পিছন দিক থেকে ছবি মনে হচ্ছে। অজ্ঞাত কারণবশত মাহাথির ভীষণ কৌতূহল বোধ করল। ফোন উঠিয়ে এগিয়ে গেল। হাত দিয়ে ছবিটা উল্টো করতেই চোখে পড়ল একটা শান্ত হাসিমাখা মুখ।
লাল জমিনের সাধারণ শাড়ি। সরু গোল্ডেন রঙের পাড়। চোখে-মুখে প্রসাধনীর ছোঁয়া নেই। মুখে নির্মল, স্বচ্ছ হাসি। মাহাথির ছবিটার মুখটার প্রতি ভীষণ মায়া অনুভব করল। বুঝাই যাচ্ছে যুবতী কালের কিংবা বিয়ের পর পরই তোলা ছবি। মাহাথির নিজমনে বলল,
‘ আপনি অনেক কষ্ট করে গিয়েছেন জীবনে। তবে চিন্তা করবেন না। আমি এতোটা খারাপ নই। আপনার মেয়েকে এতোটা কষ্ট আমি দিবনা। তাকে আগে ভালো না রাখতে পারলেও এখন ভালো রাখব। ওকে স্বামী হয়ে আগলে রাখব। বাকি দু'জনকে ভাই হয়ে। বিশ্বাস করেছেন? নাকি আপনার মেয়ের মতো আপনিও আমাকে বিশ্বাস করেন না?’
মাহাথির ভীষণ যত্ন করে ছবিটা রেখে ঘুরল। ঘুরে মনে হলো তার সবকথা শেষ হয়নি। ফিরে তাকাল। আবারো ছবিটা উঠিয়ে বলল, ‘ আপনার বদ মেয়েকে বলবেন ভালো হতে। নয়তো ওর ঘাড় ভেঙে ফেলব আমি।’
_____
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ১৮৬৩
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
ঘুম থেকে উঠে খারাপ লাগছিল তাই বলেছিলাম দিব না। না দিয়েও শান্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হলো লিখলে, আপনাদের মন্তব্য পড়লে শান্তি পাব তাই লিখে ফেললাম। অসংখ্য ভুল থাকতে পারে এই পর্বে।