একগুচ্ছ শুকতারা
শারমিন ইরান
৪৭.
আবহাওয়ার বদল ঠান্ডা চোখে দেখছেন আমিন শিকদার। এই তো সারা সকাল খরখরে রোদ ছিল। রোদের তাপে চামড়া পুড়ে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছিল। আর এখন কেমন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে! অদ্ভূত ব্যাপার-স্যাপার! আবহাওয়ার মন-মেজাজের মতো আমিন সাহেবের মন-মেজাজও তেমন ভালো নেই। ইদানীং সে কেমন যেন হয়ে গেছে। কোনো কিছুই তাকে আকর্ষণ করে না। দুনিয়াবি কিছুই তাকে খুশি করতে পারেনা। সেদিন অফিসে তার ম্যানেজার তাকে নতুন প্রজেক্টের ব্যাপারে বলল। সেই প্রজেক্টটা নিয়ে কাজ করলে মাসে ভালোই একটা লাভের অংশ আসতো। তবে সে তা করল না। কেন করল না জানেনা। মন টানল না, আগ্রহ পেল না, করল না। ব্যাস! আসলে মনের ওপর কারোর জোর চলেনা।
আমিন সাহেব জানালায় এসে দাঁড়ালেন। এখন কেমন যেন হঠাৎ হঠাৎ করেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। শৈশব, কৈশোর, যৌবনকালের স্মৃতি সব এসে তার মস্তিষ্কে আন্দোলন করে। নিজেকে ভীষণ একা একা লাগে। কিন্তু সে কী একা? না তো। সে মোটেও একা নয়। এই তো পেছনেই তার স্ত্রী শুয়ে আছে। হয়তো ঘুমিয়েও পরেছে। স্ত্রী আছে, তিন ছেলে আছে। একা কোথায়?
তবে আসলেই কী তারা আছে? আগের কথায় একটু ভুল হলো। তার স্ত্রী নয়, এটা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তিন ছেলে নয়, তার সন্তান দুই মেয়ে এক ছেলে। আমিন সাহেব হঠাৎ করেই ভীষণ অস্থিরতা অনুভব করলেন। মাথার ভেতর সব কেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে। কিছুর হিসাবই সে মিলাতে পারছেনা। সে মানতে চাইছে তার সবকিছু আছে, অথচ কোথাও থেকে চিৎকার ভেসে আসছে যে, নেইইই! তার কিছুই নেই।
আমিন শিকদার তার কেনা শখের ইজিচেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিল। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে ভেসে উঠল তাহিরা আর তার যৌবনকালের প্রেমের কিছু মূহুর্ত। আমিন সাহেব স্বস্তি পেলেন না। আজকাল তাহিরা, মা, বিভা, শ্রুতি, হামিম সবাই বড্ড জ্বালাতন করছে। তার মাথায় পোকার মতো গিজগিজ করছে। একটু একটু করে তার মাথায় কামড় বসাচ্ছে আর ভাবনার অভ্যন্তরীণে প্রবেশ করছে। আমিন শিকদার এইবার একটা ভয়ংকর কাজ করলেন। উঠে গিয়ে আলমারি বের করলেন। এখানে একটা পুরোনো অ্যালবাম আছে। তাহিরা বানিয়েছিল শখ করে। সে আর ফেলেনি। রেখে দিয়েছে যত্ন করে। কারণ তাহিরার সাথে তার তেমন ঝগড়া বিবাদও হয়নি যে ফেলে দিবে। সে তো ভেবেছিল সে তার দুই স্ত্রীকে নিয়েই থাকবে।
অ্যালবাম বের করতেই তাহিরার হাসিমুখের একটি ছবি ভেসে উঠল চোখের সামনে। তাহিরার কোলে শ্রুতি। পাশে বসা বিভাকে তাহিরা এক হাত দিয়ে জড়িয়ে আছে। আমিন সাহেবের হঠাৎ করে মনে হলো, এই পৃথিবীতে এই তিনজনের সৌন্দর্যের কাছে সকল সৌন্দর্য হেরে যাবে নিঃসন্দেহে।
.
সিজারের পাঁচ দিনের মাথায় রিলিজ দেওয়ার কথা থাকলেও বিভাকে রিলিজ দেওয়া হলো চারদিনের বেলাতেই। এ’কদিন মাহাথিরই ছিলো বিভার কাছে। কখনো হাসিনা, কখনো শ্রুতি খাবার নিয়ে এসেছে। পার্থিবের চলাচল তো ছিলোই।
বিভাকে ধীরেসুস্থে বাসায় আনা হলো। সাথে এসেছিল শ্রুতি-পার্থিব। শ্রুতি নিজ দায়িত্বে দুপুর এবং রাতের খাবার রান্না করল হাসিনার সাহায্যে। সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে বিভা এবং বাবুর সাথে সময় কাটাতে কাটাতেই পার করে দিল দিনটা। পার্থিবকে অবশ্য কাজের তাড়নায় আগেই চলে যেতে হলো। সন্ধ্যাবেলায় শ্রুতিও চলে গেল। এরমধ্যে মাহাথিরও বেশ কয়েকদিনের ছুটি পেয়ে গেছে। ছুটি পেয়ে সে অন্যরকম এক স্বস্তি অনুভব করল। বিভা পুরোপুরি সুস্থ নয়। এই সময়ে তাকে সাহায্য করতে পারবে, নিজের সন্তানের সাথে সময় কাটাতে পারবে - এর থেকে স্বস্তির আর কী হতে পারে! তবে এখনো সে ততোটাও খুশি নয়। কারণ বিভা। বিভা এখনো তাকে মেনেছে কিনা, তার অভিমান ভেঙেছে কিনা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত সে। এই চারদিন বিভার সাথে প্রয়োজন ব্যতীত তেমন কথা হয়নি। টুকটাক যা হওয়ার তাই হয়েছে। তবে কথা মাহাথিরই বলেনি। সাহস হয়ে ওঠেনি। বিভার অসুস্থতা, মারা যাওয়ার কথা, অবিশ্বাস, কাটা পেট - সব ভাবতেই তার বুকের মাঝে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বিভার সকল ব্যথা নিজের মধ্যে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আচ্ছা বিভাকে দেখে মাহাথির যে মনে মনে কতোটা ভেঙে পড়েছে তা কী বিভা জানে? বিভার অসুস্থতা মাহাথিরকে যে কতোটা পুড়িয়েছে তা কী বিভা জানে? মাহাথির যে বিভার চোখে চোখ রাখতে পারেনা তা কী বিভা জানে? বিভা যদি এখনো তাকে বিশ্বাস না করে, তার ভালোবাসায় বিশ্বাস না করে? ভাবতেই তার চারপাশটা অসহ্য যন্ত্রণায় ছেয়ে গেল।
মাহাথির ঘরে ঢুকতেই দেখল তার ছোট্ট মাহতিম ঘুমিয়ে আছে। বিভা মাঝে। মাহতিম বিভার এক পাশে। ছেলের দিকেই চেয়ে আছে বিভা। বিভা মাহাথিরকে দেখেও তেমন কিছু বলল না। সে বসে ছিল। শুতে চেষ্টা করল। মাহাথির তা বুঝতে পেরে এসে বিভাকে ধরে শুইয়ে দিল। বিভা মাহাথিরের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। কী অবস্থা হয়েছে মানুষটার! এলোমেলো রুক্ষ চুলগুলো কিছুটা বেড়েছে। সাথে গালের চাপ দাঁড়িগুলো আরোও কিছুটা বড় হয়ে মুখের গাম্ভীর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে ঘুরতো নির্লিপ্ত মুখভঙ্গি নিয়ে, এখন ঘুরে গাম্ভীর্যের আবরণ পরে।
মাহাথির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বিভা কিঞ্চিৎ অবাক হলেও তেমন কিছু বললনা। পাশে তাকাল নিজের ছেলের দিকে। অন্যপাশের কোলবালিশ আরোও কিছুটা ঠেসে দিল বাচ্চার গায়ের সাথে। এরপর বুকের ওপর আলতো হাত দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল। বেশকিছুক্ষণ বাদে বিভা অনুভব করল মাহাথির তার পাশে শুয়েছে। বিভা সোজা হয়ে শুয়ে আছে। মাহাথির তার গা ঘেষে শুয়ে বলল,
‘ বিভা! ঘুমিয়েছো?’
বিভা ভাবল উত্তর দিবেনা। তবুও বলল,
‘ না।’
‘ আমি তোমার পেটের ওপরে হাত রাখি একটু? জোরে ধরবনা।’
মাহাথিরের এমন অনুরোধ বিভা আশা করেনি। চোখ বন্ধ করেই বলল, ‘ ধরুন।’
মাহাথির সাথে যাথে হাত বাড়িয়ে বিভাকে আগলে নিল। গলায় মুখ গুঁজে জড়িয়ে রইল। তলপেটের ক্ষতের দিকেও খেয়াল রাখল। বিভা চোখ পিটপিট করে চেয়ে রইল ফ্যানের দিকে। কী হচ্ছে তার মাথায় ঢুকছেনা। কিছুক্ষণ বাদেই বিভা তার গলা ভেজা ভেজা অনুভব করল। ব্যাপারটা তার বোধগম্য হতেই মধ্যম আওয়াজে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ মাহথির! এই মাহথির!’
মাহাথির উত্তর দিলনা। নিজের মুখ আরোও গুঁজে দিল গলায়। বিভা উদগ্রীব কণ্ঠে বলল, ‘ মাহথির! মাথা তুলুন। আপনি কী কাঁদছেন?’
মাহাথিরের কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না পেয়ে হাত উঠিয়ে মাহাথিরের মুখ সরাতে চাইল। কোনোরকমে সরিয়ে দিয়ে বিভা দেখল মাহাথিরের মুখের অবস্থা নাজেহাল। চোখের পানির ছাপ স্পষ্ট দু’গালে, কান্নার কারণে চোখ লালাভ বর্ণ ধারণ করেছে, নাকও সামান্য লাল হয়ে আছে। মাহাথিরের এমন অবস্থা দেখে বিভার বুকটা ধ্বক করে উঠল। বিভা উতলা কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
‘ আপনি কাঁদছেন কেন?’
মাহাথির কিছু না বলেই উঠে যেতে চাইল। তার আগেই বিভা অন্য হাত মাহাথিরের গালে রেখে আটকে ফেলল। আদর করে প্রশ্ন করল,
‘ কী হয়েছে মাহাথির? আমাকে বলুন। কাঁদছেন কেন আপনি?’
বিভার ভালো কথাতেও মাহাথিরের ভেতর জেদ চাপল। বলল, ‘ আমার আরোও দশটা বউ আছে। ওদের খুঁজে পাচ্ছিনা। তাই কাঁদছি।’
বিভা ভ্রু কুঁচকে নিল। মাহাথির প্রথমে রাগ করে জেদ থেকে বললেও এবার নমনীয় হয়ে গেল। ভাবল এইবার সে বলবেই মনের কথা। বলল,
‘ তোমার জন্য কাঁদছি, বিভা। আর কার জন্য কাঁদব? তুমি কেন বোঝোনা আমাকে? কেন আগেরমতো ভালোবাসোনা? তুমি আমার ভালোবাসাকেও বিশ্বাস করোনা। ওটিতে ঢোকার আগে কীসব আজেবাজে কথা বললে! তুমি জানোনা তোমার কথায় আমার খারাপ লাগতে পারে? কষ্ট হতে পারে? তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায় কে আছে আমার? তবুও তুমি আমার সাথে এমন করো। আমার ভালো লাগেনা বিভা। তুমি জানোনা আমি কয়দিন কীভাবে ছিলাম! প্রথমে তো ওটি, পরে এমন কাঁটা পেট, তাজা ঘা। সব মিলিয়ে আমার কেমন লেগেছে আমিই জানি।’
বিভার মনে হলো কোনো বাচ্চা তাকে অভিযোগ করছে। লোকটার কথায় এতো মায়া লাগে কেন? মায়াবতীর কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই কেন? শব্দ থাকলে ভালো হতো। এই মানুষটাকে নিঃসন্দেহে দেওয়া যেত। মানুষটার কথা প্রথমে অবাক হয়ে শুনলেও পরে মুচকি হাসল বিভা। পাশের হাত বাড়িয়ে গালে দিল। বলল, ‘ খুব ভালোবাসেন?’
‘ মোটেও ভালোবাসিনা।’
বিভা আবারো হাসল। মাহাথির নিজ থেকে বলল, ‘ কী করলে আমার ভালোবাসায় বিশ্বাস করবে বিভা? তোমার অবিশ্বাস আমি মানতে পারিনা।’
‘ এক শর্তে বিশ্বাস করতে পারি।’
‘ কী শর্ত?’
‘ আপনাকে সারাজীবন বসে বসে আমাকে অনেক ভালোবেসে অভিমান ভাঙাতে হবে। এরপর চাইলে আমার অভিমান ভাঙতেও পারে আবার নাও পারে। সেটা আপনার ভালোবাসার ওপর ডিপেন্ড করবে।’
মাহাথির বিভার কথার মাঝের লুকায়িত অর্থ বের করে নিল। মন্থর কণ্ঠে বলল,
‘ সারাজীবন ভালোবাসবো।’
বিভা এইবার নড়েচড়ে দু'হাত দিয়ে মাহাথিরের চোখের পানি মুছে দিল। মাথা এগিয়ে নিয়ে কপালে চুমু খেল। বিভার এমন আদুরে কাজে মাহাথিরের ভেতর ছেয়ে গেল আলাদা প্রশান্তি। বিভা হাসি হাসি মুখে বলল,
‘ শুধু শুধু এতো কষ্ট করলেন। এইভাবে কেউ কাঁদে?’
‘ কেন?’
‘ আপনার এতো কান্নাকাটির কোনো প্রয়োজন ছিলনা জনাব। আমার অভিমান তো সেই কবেই ভেঙে গেছিল।’ প্রফুল্ল কণ্ঠ বিভার।
‘ তাহলে এতোদিন আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলোনি কেন?’
‘ এমনি। অভিমানের নাটক করেছি যাতে বেশি বেশি ভালোবাসেন।’
মাহাথির ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল বিভার দিকে। বিভা হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল। মাহাথির বিভার গলায় নিজের মুখ আড়াল করল। বিভা ভালোলাগায় চোখ বন্ধ করে নিল। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে। তার একপাশে স্বামী, অন্যপাশে সন্তান। এইতো! তার জীবন পরিপূর্ণ। সে সুখী। সুখী হতে জীবনে আর কী লাগে!
.
চোখের পলকে পেরিয়ে গেছে দেড় মাস। ভোরবেলা। সূয্যিমামা উঁকিঝুঁকি দিতে চাইছে। নির্মল আলোয় আচ্ছাদিত চারপাশ।
হঠাৎ বাচ্চার কান্না কানে আসতেই মাহাথির উঠে পড়ল। ঘাড় উঁচু করে দেখল চার হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদছে মাহতিম। বিভার ঘুম ভাঙবে ভাঙবে ভাব। ঔষধের প্রভাবে তার ঘুম পূর্বের তুলনায় গাঢ় হয়েছে। মাহাথির তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ওপরপাশ দিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে তুলে নিলে কোলে।
বুকে জড়িয়ে হাঁটতে লাগল সারা ঘর। কান্না থামছেনা। ক্ষুধা লাগল নাকি? কিন্তু বিভা তো ঘুমোচ্ছে। কী করবে ভেবে পেলনা। মাঝরাতেও একবার উঠেছিল মাহতিম। বিভা তো তখন খাওয়ালো। আবার এতো তাড়াতাড়ি ক্ষুধা লাগবে? বাচ্চাকে দু'হাতে তুলে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে খেলতে লাগল মাহাথির। কখনো কখনোবা মুখভঙ্গি বিকৃত করে হাসাতে চাইল। কেউ জেগে থাকলে সে অবশ্যই এইসব করতে পারতো না। তার এমন ব্যবহার শুধুমাত্র তার ছেলের জন্য। হাজারকিছু করেও ছেলের মুখে হাসি ফুটল না। লাভ বলতে কান্না থামল। তবে মুখে হাসি ফুটল না। মাহাথির ভীষণভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকাল মাহতিমের দিকে। ধিমে কণ্ঠে বলল,
‘ বাবা! তুমিও কী তোমার বাবার মতো হবে নাকি? মোটেও কিন্তু বাবার মতো হইয়োনা। তাহলে বউকে সহজে নিজের মনের কথা বলতে পারবেনা। আর বউ যদি তোমার মায়ের মতো শয়/তান মহিলা হয়, তাহলে তো হলোই। বাবা! তোমাকে ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দিব। ঠিকাছে?’
বলেই হাঁটতে লাগল মাহাথির। আবার থেমে গেল। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ আব্বু মজা করেছি। তোমার আম্মু খারাপ নয়। সে ভীষণ ভালো। তোমার আব্বু তোমার আম্মুকে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। বুঝেছো আব্বু?’
বলেই মাহতিমের গলায় নাক দিয়ে গুতো দিলো মাহথির। বাবার কথা বুঝল নাকি সুড়সুড়ি লাগল কে জানে! মাহাথিরকে অবাক করে দিয়ে খিলখিল করে হাসল বাচ্চাটা। দাঁতবিহীন হাসি। শুধু মাড়ি দেখা যাচ্ছে। মাহথির নির্বাক হয়ে চেয়ে রইল নিজের সন্তানের দিকে। হাসি দেখে মনে হচ্ছে যেন মুক্তো ঝড়ছে! হাসিটা এতো সুন্দর লাগছে কেন? নিজের সন্তানের এমন হাসিতে মাহাথিরের বুকটা ভরে উঠল। পরমূহুর্তেই ভাবল, এতোক্ষণ এতোকিছু করেও হাসাতে পারল না। আর এখন নাকি একাই হাসছে। অদ্ভূত! মাহথির নরম গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। মাহতিমকে সযত্নে বুকে আগলে নিল। ওমনি মাহতিম নিজের ধারালো নখ দিয়ে খামচি বসালো বাবার উন্মুক্ত বাহুতে। সেদিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মুখের সম্মুখে আনল নিজের ছেলেকে। গম্ভীরমুখে বলল,
‘ ভয় পেয়োনা। আমি নিজের প্রমিস এর কথা ভুলিনি। আমার মনে আছে আমাদের ডিলের কথা। তুমি দুনিয়াতে এসে তোমার আম্মুকে ভালো বানিয়ে দিয়েছো। বিনিময়ে আমি তোমাকে মারব না। তোমার আম্মুকেও মারতে দেব না। খুশিতো?’
মাহতিম তার বুড়ো আঙুল মুখে পুরতে চাইল। মাহাথির তা হতে দিল না। হাত সরাতে সরাতে বলল, ‘ বাবার ডিল মেনে নিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করেছো। তবে ডিলটা যেহেতু দেড়িতে মেনেছো, সেহেতু মায়ের বকা থেকে আমি বাঁচাতে পারব না। এটা তোমার শাস্তি। ওকে?’
মাহাথিরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মাহতিম তার কোল থেকে উল্টে যেতে চাইল। মাহাথির দ্রুত আগলে নিল। হঠাৎ করে এমন নড়চড়ে কিছুটা ভড়কে গেছে সে। এতোক্ষণ তো শান্তই ছিল। এমন বলটে যেতে চাইছে কেন হঠাৎ করে? ঘাড় এদিক-ওদিক নিয়ে নড়চড় শুরু করে দিল মাহতিম। নিজের দেড় মাসের বাচ্চার এমন কুস্তিগিরি দেখে মাহাথির ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল।
.
বিছানায় শুয়ে আছে আমিন শিকদার। নড়চড় করার শক্তি নেই। মুখ ভীষণ তেঁতো হয়ে আছে। শরীরের উত্তাপে মাঝেমধ্যে অক্ষিকোটর থেকেও পানি নির্গত হচ্ছে। তবুও কিছু করার নেই। গত সাতদিন যাবত তার এই অবস্থাই। ডাক্তার এসেছিল। বলেছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তবে হাসপাতালে যাওয়ার মতো আক্রান্ত নয়। তাই বাড়িতেই সেবা নেওয়া হচ্ছে। পাশেই শাহিনা বসা। কিছুক্ষণ আগে জলপট্টি দিয়ে দিল। এখন বসে আছে বিরসমুখে।
শাহিনা বলল,
‘ ব্যবসা-বাড়ি নিয়ে কিছু ভাবলে?’
‘ কী ভাবব?’ আমিন সাহেব জানেন শাহিনার কথার অর্থ। তবুও জিগ্যেস করল।
শাহিনা বলল, ‘ কাগজ-পত্র ঠিকঠাক করে তিনজনের নামে লিখে দিলে ভালো হয়না?’
আমিন সাহেব ভীষণ রেগে গেলেন কথাটায়। তবে ঝগড়া করার মন-মানসিকতা নেই। শান্ত কণ্ঠে বলল,
‘ সুস্থ হয়ে নেই। ভাবা যাবে।’
শাহিনা হয়তো পছন্দ করল না আমিন সাহেবের কথা। মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে ঘর থেকে প্রস্থান করলেন। আমিন সাহেব চোখ বন্ধ করল। তার স্ত্রী, তিন সৎ পুত্র সবাই ধরেই নিয়েছে সে মারা যাবে। তাইতো এমন তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে সবকিছু লিখিয়ে নেওয়ার। এইতো সেদিন সুস্থ অবস্থায় থাকতে একবার কীভাবে যেন সম্পত্তির কথা উঠল। কথায় কথায় আমিন সাহেব রেগে বলে উঠলেন,
‘ আমার ব্যবসা-বাণিজ্যর ভাগ আমি কাউকে দিব না। আর সম্পত্তি ভাগাভাগি তো দূরের বিষয়।’
আমিন সাহেবের কথাটা শেষও হতে পারেনি। ওমনি তার সৎ মেজ ছেলে এসে তার কলার ধরে হুংকার দিয়ে উঠল,
‘ দিবা না মানে কী?’
এমনিতেই কিছুক্ষণ ধরে বাকবিতন্ডায় মাথা খারাপ ছিল। তার উপর আমিন সাহেবের এমন কথা মেনে নিতে পারেনি ঐ ছেলেটা।
তবে ঘটনার আকস্মিকতায় আমিন সাহেব কান্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়ল। বাকিরা এসে সেই ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতেই আমিন সাহেব সোফায় বসল। কেমন অনুভব হলো তার তা সে বুঝল না। ছেলেক শান্ত করে শাহিনা এগিয়ে এলেন। বলল, ‘ শুধু শুধুই রাগারাগি করছো তুমি। কেন ছেলেটাকে ওভাবে রাগিয়ে দিলে? আমাদের সবকিছু তো ওদেরই। তাইনা? ওদের জিনিস ওদের দিবেনা?’
এর পরিবর্তে আমিন সাহেবের কিছু বলার ছিল না।
আজও নেই। কী বলবে তিনি? বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মা মারা যাওয়াতে সে কষ্ট পেয়েছিলেন। তবে ভেঙে পড়ার মতো কষ্ট নয়। আজ মাকে ভীষণ মনে পড়ছে। সবাইকেই মনে পড়ছে। তার বাড়িতে এতো মানুষ! তাও তিনি মানুষের অভাববোধ করছে। মনে হচ্ছে নেই। কোথাও কেউ নেই। হঠাৎ করেই আসাদ সাহেবের একটা কথা মনে পড়ল। সে বলেছিল, মৃত্যুর সময় আমরা আপনজনের হাত খুঁজি। সেও কী তবে আপনজনদের হাত খুঁজছে? আমিন শিকদার চোখ বন্ধ করল। বন্ধ চোখ বেয়ে বের হলো অনর্গল অশ্রুকণা। এই অশ্রুকণা কীসের তা আমিন সাহেব তা জানেনা। দুঃখের নাকি জ্বরের….
.
দেড়/দুই মাসে বিভা বলতে গেলে কিছুটা সুস্থই। এখন টুকটাক কাজ করা শুরু করে দিয়েছে সে। যদিও হাসিনা বেগম তাকে করতে দেয়না, তবুও করে। বিভা খাটে সব জামা-কাপড় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে ভাঁজ করছে। আলমারি এলোমেলো। বাচ্চাকে দাদার কাছে দিয়ে এসেছে। তার সন্তানের সবচেয়ে ভালো গুণ হলো সবার কাছেই থাকে। কাঁদেনা তেমন। শুধু ক্ষুধা লাগলে দিন-দুনিয়া ভুলে যায় বাপের মতো। বিভা মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে হাতের কাজ করছে।
তখন মাহাথির এলো। ঘরের অবস্থা দেখে হঠাৎ করেই মুখটা শুকিয়ে গেল। বিভা পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। মাহাথির ধীরে ধীরে হেঁটে এসে হাঁটু গেড়ে বসল বিভার সামনে। ঠান্ডা আওয়াজে বলল,
‘ এখনো অভিমান মনে পুষে রেখেছো?’
বিভা বুঝতে চেষ্টা করল তার স্বামীর কথা। বুঝল না। মাহাথির বলল, ‘ আমি নিজের হাতে কাপড়গুলো রাখলাম। তাও বের করে নিয়েছো?’
এবার বিভা বুঝল আসল কাহিনী। ভ্রু কুঁচকে মাহাথিরের মাথায় টোকা দিল,
‘ বউকে ভালোবেসে বুদ্ধি কী বস্তায় ভরে ফেলে দিয়েছেন মাহতিমের আব্বু?’
বিভার এমন নতুন ডাকে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করলেও পাত্তা দিল মাহাথির। শান্তকণ্ঠে বলল,
‘ তুমি জামাকাপড় কেন বের করেছো তাহলে? আমার ওপর রাগ করেই তো।’
‘ আপনার যে একটা সন্তান আছে তা কী ভুলে গেছেন?’
‘ ভুলব কেন?’
‘ আপনার হাব-ভাবে তাই মনে হচ্ছে।’
‘ পরিষ্কার করে বলো বিভা। রাগ হচ্ছে আমার।’
‘ এ আর নতুন কী! করুন রাগ।’
মাহাথিরের মুখ মলিন। বিভা আর বিষয়টাকে বাড়তে দিল না। উঠতে উঠতে বলল, ‘ আপনার ছেলের কাপড়-চোপড় কী রশিতে রশিতে ঘুরবে? নাকি চেয়ারে, এখানে-সেখানে পড়ে থাকবে? ওর কাপড়চোপড় রাখার জায়গা বানাচ্ছিলাম।’
‘ মিথ্যা কথা! এই বলে তুমি নিজের কাপড় সরাতে চাইছো।’ একগুঁয়ে কণ্ঠে বলল মাহাথির।
বিভার এখন কপাল চাপড়াতে মন চাইছে। আলমারির দরজা ভালোমতো খুলে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে মাহাথিরকে বলল,
‘ এই যে আপনার কাপড়-চোপড় রাখার জায়গা। আর এই যে আমার কাপড় চোপড় রাখার জায়গা। আর এই মাঝখানে থাকবে বাবুর কাপড়। মাথায় ঢুকেছে? ছোট ছোট জিনিস খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই এইভাবে গুছিয়ে রাখছি। নাকি গুছাতেও পারবনা?’
মাহাথির ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ তোমার দোষ। আমাকে আগে বললেই বুঝে নিতাম।’
বিভা বাঁকা চোখে চেয়ে কাজে মন দিল। মাহাথির এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘ বাবুর জন্য ছোট ওয়ারড্রব অর্ডার করি?’
বিভা রাগী স্বরে বলল, ‘ মোটেও না মাহথির। মোটেও এইসব কিছু করবেন না। ধীরে ধীরে সব হবে। এতো তাড়াহুড়ো করে করার কোনো প্রয়োজন নেই।’
‘ তুমি আমাকে ধমক দিচ্ছো?’
‘ দিচ্ছি। কী করবেন? মারবেন?’
বিভার একরোখা কণ্ঠে মাহাথির বিভার গাল চেপে ধরল। নিজের মুখ সামনে নিয়ে বলল,
‘ মারব কেন? ভালোবাসব।’
.
দরজা খুলেই চেঁচিয়ে উঠল শ্রুতি,
‘ আমি এসে গেছিই পার্থিববব।’
আলোচনার মাঝে হঠাৎ এমন কথায় থেমে গেল সবাই। শব্দের উৎস খুঁজতে পিছনে ঘুরতেই চোখ পড়ল এক রমণীকে। পার্থিব স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে আছে গোলফ্রক পরিহিত, হিজাব বাঁধা, হিজাবের নিচে পেছনে থেকে ওড়না নিয়ে আসা শ্রুতির দিকে। শ্রুতির মুখ ইতোমধ্যে শুকিয়ে কাঠ। পার্থিবের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। বাকিদের দ্বিধাপূর্ণ দৃষ্টি দেখে পার্থিব উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল, ‘ মিট মায় ওয়াইফ শ্রুতি শিকদার।’
শ্রুতি আরেকটু ঘাবড়ে গেল। সে জানতো না পার্থিব কাজ করছে। প্রতিদিন তো এই টাইমে লাঞ্চ আওয়ার থাকে। তবে আজ কী হলো! পার্থিব হাসিমুখে অনুরোধ স্বরে বলল, ‘ শ্রুতি! আপনি কী একটু বাহিরে বসবেন? আমার কাজ পনেরো মিনিটেই শেষ হয়ে যাবে।’
শ্রুতি দ্রুত মাথা নেড়ে উলটো ঘুরল। পিছন ঘুরতে ঘুরতে শুনতে পেল পার্থিবের কথা,
‘ একচুয়েলি আমার ওয়াইফ জানতো না আমার এক্সট্রা মিটিং এর কথা। আ'ম সো সরি।’
‘ ইটস ওকে। ইটস নট আ বিগ ডিল। লেটস কন্টিনিউ…..?’
‘ শিওর।’
শ্রুতি ওয়েটিং রুমে বসে রইল। বিশ মিনিট পর পার্থিব বেরিয়ে এলো। শ্রুতির সামনে এসে বলল, ‘ সরি। পাঁচ মিনিট লেট হলো।’
শ্রুতি এতোক্ষণ ভয়ে ছিল যে পার্থিব নিশ্চিত তাকে বকা দিবে। অথচ পার্থিব এসে কিনা আদুরে স্বরে কথা বলছে! বকা না খেয়ে শ্রুতির সাহস বাড়ল। পার্থিবের এই অতিরিক্ত ভদ্রগিরি বাড়ি মেরে ছুটাতে ইচ্ছে হলো। এতোই যখন ভদ্র তখন বলতে পারল না কেন যে আজকে তার এক্সট্রা মিটিং আছে? অসভ্য! ভেবেই শুকনো মুখে আগে আগে চলল শ্রুতি।
পার্থিবের কেবিনে গিয়ে বসল দু'জনে। শ্রুতির রাগ দেখে বলল,
‘ আপনি আবার রেগে গেলেন কেন?’
‘ আপনি আমাকে বললেন না কেন যে আপনার কাজ আছে?’
‘ আমি কী জানতাম যে আপনি আসবেন?’ পার্থিবের সরল কণ্ঠ।
‘ ও! এরমানে আমার আসাও ভুল হয়েছে?’
‘ না আমি সেটা…..’
‘ থাকেন আপনি। চলে যাচ্ছি আমি।’
শ্রুতি উঠতে গেলেই পার্থিব কবজি আটকে ধরল। অসহায় মুখে বলল,
‘ সরি। ভুল হয়েছে। প্লিজ যাবেন না।’
‘ ঠিকাছে ঠিকাছে। এতো করে যখন বলেছেন, যাচ্ছিনা। এইভাবে ভুলগুলো মেনে নিলেই তো হয়। নিন, এখন খাওয়া শুরু করুন।’ শ্রুতির রাগী কণ্ঠ।
পার্থিবের হেসে ফেলল। শ্রুতি খাবার সামনে রেখে আগ্রহী কণ্ঠে বলল,
‘ মোরগ-পোলাও। আমি রেঁধেছি।’
‘ আমার জন্য?’ হাসিমুখে বলল পার্থিব।
‘ না। আমার অসভ্য জামাইয়ের জন্য।’
‘ নিন। তাহলে অসভ্য জামাইয়ের হাতে খেয়ে তাকে ধন্য করুন।’
শ্রুতি খুশিমনে পার্থিবের হাতে খেতে লাগল। পার্থিব শ্রুতিকে জ্বালানোর জন্য ফের প্রশ্ন করল,
‘ বললেন না তো না বলে এসেছেন কেন?’
শ্রুতি মধ্যম আওয়াজে ধমকে উঠল,
‘ আমি কী করব আমার আপনাকে ছাড়া ভালো না লাগলে? তাইতো এসে পড়েছি।’
পার্থিব হাসিমুখে শ্রুতির দিকে মুখ এগিয়ে বলল,
‘ প্লিজ এইভাবে প্রতিদিন চলে আসবেন। তাহলে আমার সকাল-রাতের সাথে দুপুরটাও সুন্দর হয়ে যাবে।’
_______
চলবে~
শব্দসংখ্যা - ২৬৭৬
#একগুচ্ছ_শুকতারা
#শারমিন_ইরান
[ লাস্ট পর্বের ২ অংশ হবে। কালই দুই অংশ দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। আজকের পর্বটা হয়তো এলোমেলো, খাপছাড়া হয়েছে। দুঃখিত। না দিয়েও পারছিলাম না। কাল আপলোড করিনি, কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল সব। তাই লোভী মন আজকে দিয়ে দিল।]