মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
১. ( অবতরণিকা )
সাল ১৫১৪,
বিশাল কামরার মাঝে হীরা খচিত সিংহাসনে চিন্তিত হয়ে বসে আছেন কাউন্ট লিও। তার পাশেই থাকা আরেকটি সিংহাসনের দিকে তার বাদামী চোখের দৃষ্টি স্থির। প্রধান সেনাপতি লুকাস কাউন্টের চোখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পায়। কাউন্ট লিও বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে কখনো দ্বিতীয় বার ভাবেন না। এই প্রথম নিজের কাউন্টের চোখে এতো দ্বিধা এবং হতাশা দেখতে পায় লুকাস। সে খুব রয়েসয়ে কাউন্টকে প্রশ্ন করে,
" আমার কৌতুহল মার্জনা করবেন কাউন্ট, কিন্তু আপনার সিদ্ধান্ত কি আমি জানতে পারি? খুব শীঘ্রই কোনো সিদ্ধান্তে আমল না করলে সমগ্র রোমানিয়ান সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। "
চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে সিংহাসনের হাতলটা শক্ত করে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাউন্ট লিও। উঠে এসে রাজ জোতিষ্যীর সামনে দাঁড়ায় কাউন্ট লিও। কণ্ঠে আকুতি মিশিয়ে বলে,
" এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার আর কোনো পথই কি খোলা নেই রাজ জোতিষ্যী? "
" কাউন্ট অধিকাংশ প্রজাদের বাঁচাতে হলে আপনার ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের প্রজাদের সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করতেই হবে। নাহয় এই অশুভ শক্তি সম্পূর্ণ সাম্রাজ্যকে গ্রাস করে ফেলবে। আগামীকাল চন্দ্রগ্রহনের আগমুহূর্তেই এই সিদ্ধান্তে আমল না করলে সেই অশুভ শক্তি হতে কেউই নিস্তার পাবে না। "
" সিংহাসনে আরোহন করার সময় আমি প্রজাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে তাদের সকল নিরাপত্তা আমার দায়িত্ব। কাউন্টেস ম্যারিকে বিবাহের সময় ওয়াদা করেছি আমি যে তাকে কখনোই একা ছেড়ে দিবো না। বড় সব বিপদেও আমি তার পাশে থাকবো। আমার অনাগত সন্তান যে এখনো পৃথিবীর আলো দেখে নি তাকে আমি কিভাবে মরতে দিতে পারি? "
" আমার ইতিমধ্যে বহুসংখ্যক সৈন্য পাঠিয়েছি কাউন্টেসকে খুঁজে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ২ দিন পেরিয়ে গেছে এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। একটাও সৈন্য ফিরে আসে নি সেই মৃত্যুপুরি থেকে। রাজ্যের সুরক্ষার জন্য আপনাকে কঠিন হতেই হবে কাউন্ট। "
__________
লিও কিছু না বলে রাজসভা থেকে বেরিয়ে নিজের কামরায় চলে আসে। তার কামরার সঙ্গেই আছে একটা সুদীর্ঘ বারান্দা। প্রাসাদের সবথেকে উঁচু কামরাটাই হচ্ছে তার এবং ম্যারির। বারান্দা থেকে সম্পূর্ণ রাজ্যটাই তার দেখা যায়। কেবল ৭ বছরের শাসনে তার সাম্রাজ্যে এতো বড় অভিশাপ লাগবে তা সে কখনো কল্পনাও করেনি। মাত্র বিশ বছর বয়সে পিতা কাউন্ট কার্লস আলবার্টকে হারায় লিও। পিতা গত হওয়ার পরই সাম্রাজ্যের ভার তার উপর এসে পড়ে। আপন বলতে ম্যারি ছাড়া আর কেউই ছিলো না তার পাশে। ম্যারি এবং লিওর প্রণয়ের সম্পর্ক খুব ছোট থেকেই। রাজ পরিবারের কারোরই অবশ্য এতে আপত্তি ছিলো না। সিংহাসনে আহোরণের পরই এতো বছরের প্রণয়কে পরিণতি দেয় লিও। একসঙ্গে মিলে দুজনই সাম্রাজ্যের সকল দায়িত্ব পালন করে তারা। তাদের দাম্পত্য জীবনে সুখের অভাব ছিলো না কোনো। অবশেষে বিয়ের ৭ বছর পর ঈশ্বর ম্যারির গর্ভে একটি সন্তানও দেয়। কিন্তু অন্ত:সত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে ম্যারির শারিরীক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। প্রতি রাতেই দুঃসপ্ন দেখে মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর এই অবস্থা কোনো মতেই মেনে নিতে পারে না লিও। সাম্রাজ্যের সকল চিকিৎসক এনে সে হাজির করে। কিন্তু কেউই ম্যারির অসুখ ধরতে পারে না।
একদিন রাজ জোতিষ্যী জানায় যে কাউন্টনেস ম্যারির জন্য ট্রান্সিলভেনিয়া শহরে ভ্রমণ করা মঙ্গল হবে। তখন ম্যারির ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। লিও কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না। রাজ জোতিষ্যী বলে ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের আবহাওয়া, বিশুদ্ধ বাতাস এসব কিছুর মধ্যে থাকলে ম্যারির শারিরীক অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হবে। রাজ্যের কাজ রেখে ম্যারির সাথে লিওর যাওয়া হয়ে উঠেনা আর। তবে ম্যারির যেনো সেখানে কোনো কষ্ট না হয় তাই সব ব্যবস্থা করে লিও। ট্রান্সিলভেনিয়ার তুষ দূর্গে ম্যারির থাকার ব্যবস্থা করে। সেখানে দাসী থেকে শুরু করে সৈন্য সবাইকে ম্যারির সেবায় নিযুক্ত করা হয়।
লিওর সব দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে আসে যখন সে ম্যারির চিঠি পায়। ম্যারি চিঠিতে জানায় সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ অনুভব করছে এবং সে আরো ১ সপ্তাহ সেখানে থাকতে চায়। স্ত্রীর আবদার ফেলতে পারে না লিও এবং সিদ্ধান্ত নেয় এক সপ্তাহ পরে সে নিজে গিয়ে ম্যারিকে প্রাসাদে ফিরিয়ে আনবে। ম্যারির জন্য উপহার সরূপ নিজ হাতে কালো মুক্তা পাথরের একটি লকেট বানায়। এই কালো মুক্তা পাথর খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন । কৃষ্ণ সাগর থেকে পাওয়া এই পাথরটি লিও সযত্নে রেখে দিয়েছিলো তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম উপলক্ষে ম্যারিকে উপহার হিসেবে দিবে বলে।
কিন্তু গত তিনদিন আগে তার কাছে খবর আসে ট্রান্সিলভেনিয়া শহরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। মাকড়সার জালের মতো সম্পূর্ণ শহরটাকে গ্রাস করে ফেলেছে এই রোগ। কেউই রেহাই পাচ্ছে না। লিও সাথে সাথে সৈন্য পাঠায় ম্যারিকে নিয়ে আসার জন্য কিন্তু দুদিন পার হতে চললো এখনো কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না ম্যারির।
ট্রান্সিলভেনিয়া শহর এবং বুখারেস্ট শহরের মাঝে রয়েছে একটি নদী। ট্রান্সিলভেনিয়া শহরটির পশ্চিম ও উত্তর দিকটা পাহাড়ে ঘেরা। এর দক্ষিণ দিকে রয়েছে কৃষ্ণ সাগর এবং পূর্ব দিকে একটি নদী বহমান। বুখারেস্ট শহর থেকে ট্রান্সিলভেনিয়া শহরে পৌঁছাতে হলে নদী পথ হয়ে যেতে হয়। দু শহরের যাতায়াতের জন্য এই একটি পথ রয়েছে। বুখারেস্ট শহরের মূল ফটক বন্ধ করার আদেশ দিয়ে দিলেই ট্রান্সিলভেনিয়া শহর হতে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পরার আশঙ্কা দূর হবে।
লিওর এতো সব ভাবনার মাঝেই কামরার দরজায় কড়াঘাতের শব্দ হয়। লিও দু হাত পিছনে ভাজ করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
" ভিতরে প্রবেশ করো। "
প্রধান সেনাপতি লুকাস কামরায় প্রবেশ করে প্রথমে মাথা নত করে কুশল জানায়। তারপর বলে,
" কাউন্ট আপনার সিদ্ধান্ত কি জানতে পারি? কাল সকাল সূর্যোদয়ের পূর্বে আমাদের কিছু একটা করতে হবে। "
লিও আরেকবার পাশ ফিরে নিঝুম রাজ্যের দিকে তাকায়। রাজ্যকে মৃত্যুপুরিতে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য এই মুহুর্তে তার কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতেই হবে। সে তার পিতা আর প্রজাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা একবার মনে করে নেয়। লুকাসের দিকে তাকিয়ে বলে,
" প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নাও লুকাস। ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের সাথে মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দাও। ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের কারো এই শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো। এই শহর সহ সম্পূর্ণ রাজ্যে ঘোষণা করে দাও ট্রান্সিলভেনিয়া শহরে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। সুরিক্ষিত থাকার জন্য সবার ওই শহরে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হলো। যে এই নিষেধাজ্ঞা মানবে না তাকে যথার্থ শাস্তি দিবে। "
" যথা আজ্ঞা কাউন্ট। "
এই বলে মাথা নত করে বেড়িয়ে যায় লুকাস।
__________
রাজ জোতিষ্যী ভারতান আকাশের তারা দেখে কাগজে একটি সংকেত আঁকছে। সংকেত এঁকে তিনি আতংকে চোখ বড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,
" এই চন্দ্রগ্রহণ বদলে দিবে এই সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ। কাল সূর্যাস্তের পর থেকে ভোরের প্রথম কিরণ উদয় হওয়ার আগেই সাম্রাজ্যে নেমে আসবে ঘোর অন্ধকার। কাউন্টকে আমার এক্ষুনি জানাতে হবে বিষয়টি। "
এই বলে তিনি কাউন্ট লিওর কামরার সামনে গিয়ে প্রহরীদের বলে,
" কাউন্টকে জানাও আমি এসেছি। উনার সাথে আমার দেখা করা গুরুত্বপূর্ণ। "
" কাউন্ট বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেড়িয়ে গিয়েছেন। "
রাজ জোতিষ্যী ভারতান গলার ক্রুশ ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠে,
" ঈশ্বর রক্ষা করো। "
__________
ঘোড়া বড় বড় পা ফেলে গহীন অরণ্যের মাঝ দিয়ে দৌড়াচ্ছে। ঘোড়ার পিঠে বসা লিওর মাথার চুলগুলো বাতাসের তীব্রতায় উড়ছে। কাল রাতে সে সপ্ন দেখে ম্যারি তাকে বলছে তাকে এখান থেকে রক্ষা করতে। ম্যারির চোখে পানি টলমল করছে। তার কোলে তাদের সন্তান। ওইতো লিওর পৃথিবী। এরাইতো লিওর পরিবার। নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে লিও কিভাবে বেঁচে থাকবে?
মাঝরাতে এই সপ্ন দেখে এক প্রহরও অপেক্ষা করে না লিও। তখনই বেড়িয়ে পরে ঘোড়া নিয়ে ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের উদ্দেশ্যে। এখন অবশ্য বিকেল হয়ে এসেছে। ট্রান্সিলভেনিয়া শহরের এক অরণ্যের মাঝে সে ঘোড়া নিয়ে ছুটে চলেছে। আর কিছুক্ষণ। পরেই সে তুষ দূর্গে পৌঁছে যাবে।
শহরে প্রবেশ করতেই সে দেখতে পায় পুরো শহরের বিদ্ধস্ত অবস্থা। রাস্তাঘাটে সবকিছু এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। পথিমধ্যে অনেক মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে কেউই ভাবতে পারবে না এই শহরেও কখনো শিশুদের হাসিমাখা কলধ্বনি শোনা যেতো। পুরো শহর গোরস্থানে পরিণত হয়েছে। একটি উটকো গন্ধে লিওর পেট গুলিয়ে আসে। সে তাড়াতাড়ি এখান থেকে তুষ দূর্গের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করে।
সূর্য ডুবেছে বেশ ক্ষাণিকক্ষণ হলো। তুষ দূর্গে প্রবেশ করতেই বেশ অবাক হয় লিও। সম্পূর্ণ দূর্গ নিরব। কাউকে না পেয়ে লিও জোরে ডাকতে থাকে ম্যারির নাম ধরে। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পায় না সে। খুঁজতে খুঁজতে সে দোতলায় এসে পড়ে। হঠাৎ পিছনে কেউ কাউন্ট বলে দৌড়ে আসে। লিও চকিতে পিছনে ফিরে দেখে সেনাপতি এলেক্স দৌড়ে আসছে। এলেক্স লিওর সামনে আসতেই লিও ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে,
" এলেক্স তুমি ঠিক আছো? কাউন্টেস ম্যারি? সে কোথায়? ম্যারি ঠিক আছে? "
" কাউন্টেস গুপ্ত কক্ষে আছেন। উনার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে কাউন্ট। আপনি জলদি চলুন। "
সাথে সাথে লিও নিচে গুপ্ত কক্ষে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ম্যারি একটি মাদুরের উপর শুয়ে আছে। তার পাশেই একটি মহিলা বসা। সেও অন্তঃসত্ত্বা। ম্যারি লিওকে দেখেই অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলে,
" লিও। আমার লিও। "
লিও দৌড়ে গিয়ে ম্যারিকে জড়িয়ে ধরে।
" ম্যারি আমি এসেছি। আমি কিছু হতে দিবো না তোমাদের। আমাকে ক্ষমা করো। আমি আসতে দেরি করেছি খুব। "
এমন সময়ই হন্তদন্ত হয়ে কামরায় প্রবেশ করে ড্যানিয়েল। লিওকে দেখে তৎক্ষণাৎ হাটু গেড়ে মাথা নত করে কুশল জানায় সে। লিও উঠে এসে বলে,
" কি হয়েছে ড্যানিয়েল? "
" কাউন্ট এই দূর্দশার কারণ শুধুমাত্র প্লেগ রোগ নয়। "
" তুমি কি বলতে চাইছো ড্যানিয়েল? "
ড্যানিয়েল মাথা উঠিয়ে ম্যারির পাশে বসা নিজের স্ত্রী ক্যামিলোর দিকে তাকায়। লিও ড্যানিয়েলের দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকায়। ক্যামিলো ম্যারির ঘাড়ের পাশ হতে চুলগুলো সড়িয়ে দেয়। লিও দেখে ম্যারির ঘাড়ে কামড়ের দাগ। ঘাড়ের ক্ষত সম্পূর্ণ রক্তাত্ত হয়ে আছে। লিও অবাক হয়ে ম্যারির মুখশ্রী পানে তাকায়। ম্যারিকে বেশ ফ্যাকাশে লাগছে। যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ড্যানিয়েল বলে,
" আমাদের এখনই বুখারেস্ট প্রাসাদে খবর পাঠাতে হবে কাউন্ট। রাজ জোতিষ্যী এই সম্পর্কে আগেই আমাদের সতর্ক করেছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই প্রতিরোধের একটা বিহিত করতে পারবেন। "
এলেক্স বলে,
" আপনি অনুমতি দিলে আমি এক্ষুণি বুখারেস্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেই কাউন্ট? "
লিও মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই এলেক্স বুখারেস্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ক্যামিলো পিছন থেকে তাড়া দিয়ে বলে,
" আপনারা বাহিরে অপেক্ষা করুন। সময় ঘনিয়ে এসেছে। "
লিও এগিয়ে এসে ম্যারির ডান হাতটা ধরে হাতের উল্টো পাশে একটা চুমু খেয়ে বলে,
" আমি আছি ম্যারি। ভয় নেই কোনো। "
আধঘন্টা হয়ে গিয়েছে ম্যারি যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। লিও আর ড্যানিয়েল বাহিরে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ সবকিছু নিশ্চুপ হয়ে যায়। ভিতর থেকে ভেসে আসে এক সদ্য জন্মানো শিশুর কান্নার প্রতিধ্বনি। কামরায় প্রবেশ করে লিও দেখে ক্যামিলোর কোলে শুভ্র একটি কাপড়ে মোড়ানো একটি শিশু চোখ বন্ধ করে কাঁদছে। লিও এগিয়ে যেতেই ক্যামিলো বাচ্চাটিকে লিওর কোলে তুলে দিয়ে বলে,
" অভিনন্দন কাউন্ট। রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের উত্তারাধিকারী প্রিন্স ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। "
লিও বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে ম্যারির সামনে এসে বসে বলে,
" ম্যারি, আমাদের প্রিন্স। "
ম্যারি এক হাত বাড়িয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
" আমার ছেলে। "
লিও ছেলেকে ম্যারির কোলে দিয়ে পকেট থেকে সেই কালো মুক্তার লকেটটা বের করে ম্যারির গলায় পড়িয়ে দিয়ে ম্যারির কপালে আলতোভাবে অধর স্পর্শ করে। ম্যারির চোখ বুজে আসছে। ব্যাথায় কেপে উঠছে থেকে থেকে। ড্যানিয়েল বলে,
" কাউন্ট। প্রিন্সের জন্য কোনো নাম ভেবেছেন আপনি? "
লিও ছেলেকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
" রিকার্ডো আলবার্ট। প্রিন্স রিকার্ডো। "
এবার শিশুটি কান্না থামিয়ে চোখ মেলে তাকায় লিওর দিকে। রিকার্ডোর চোখের মণি একদম সবুজ রঙের। লিও খেয়াল করে দেখে রিকার্ডো একদম ম্যারির মতো দেখতে হয়েছে। ম্যারির চোখের মণির রঙও সবুজ রঙের। হঠাৎ উপরে দরজা ভেঙে পড়ার শব্দ হয়। ক্যামিলো, ড্যানিয়েল, লিও সবাই আতংকিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকায়। ড্যানিয়েল তড়িঘড়ি করে তলোয়ার বের করতে করতে বলে,
" কাউন্ট আপনি প্রিন্স, কাউন্টেস ও ক্যামিলো কে নিয়ে শীঘ্রই পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। সেখানে ২ টা ঘোড়া আছে। আমি এদিকে যতক্ষণ সম্ভব প্রতিরোধ করছি। "
ম্যারি ভাঙা গলায় বলে,
" লিও আমার কাছে আর বেশি সময় নেই তুমি রিকার্ডোকে নিয়ে পালাও। আমার সন্তানের জীবন বাঁচাও। "
লিও অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,
" আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না ম্যারি। আমি কখনোই তোমাকে একা ছেড়ে দিবো না। "
এই বলে লিও এগিয়ে গিয়ে ড্যানিয়েলের কোলে রিকার্ডোকে দিয়ে বলে,
" আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করবে না। আজ থেকে রিকার্ডো তোমার কাছে আমানত। রিকার্ডো ও ক্যামিলোকে নিয়ে এই মুহুর্তে তুমি প্রস্থান করবে। "
ড্যানিয়েল বলে,
" কাউন্ট এটা বলবেন না। আমি জেনে-বুঝে আপনাকে এদের মাঝে ফেলে যেতে পারি না। "
লিও গলা ভারি করে বলে,
" আমি তোমাকে আদেশ দিচ্ছি ড্যানিয়েল। আমার বিরোধিতা করো না। "
ড্যানিয়েল ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে কাউন্টের দিকে। লিও চোখের ইশারায় যেতে বলে তাদের। ড্যানিয়েল ক্যামিলোর কাছে এগিয়ে তার হাত ধরতে নিলেই ক্যামিলো দৌড়ে গিয়ে ম্যারির পাশে বসে নিজের পেটের উপর হাত রেখে বলে,
" কাউন্টেস আমি রিকার্ডো এবং নিজের সন্তানের মাঝে কখনো পার্থক্য করবো না। আজ থেকে সে আমার প্রথম সন্তান। "
ম্যারি নিজের গলা থেকে সেই কালো মুক্তা পাথরের লকেটটা খুলে ক্যামিলোর হাতে দিয়ে বলে,
" আমার কাছে আর কিছুই নেই ওকে দেয়ার মতো। এটা আমার শেষ স্মৃতি রিকার্ডোর জন্য। "
ক্যামিলো লকেটটা হাতে নিতেই ড্যানিয়েল ক্যামিলোর এক হাত ধরে পিছনের দরজা দিয়ে প্রস্থান করে। ড্যানিয়েল বের হওয়ার সাথে সাথেই লিও কাঠের কিছু টুকরো দিয়ে দরজাটা ঢাকার চেষ্টা করে। খুব কাছেই কিছু পদধ্বনির আওয়াজ পেতেই সে এগিয়ে গিয়ে ম্যারির মাথার কাছে বসে বলে,
" আমাদের আছে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই ম্যারি। তাদের হাতে মরে যাওয়ার থেকে আত্মহত্যাই শ্রেয়। "
এই বলে হাতের আংটির পাথরটা সড়িয়ে বিষ বের করে ম্যারিকে খাইয়ে নিজেও খেয়ে নেয়।
কামড়ার দরজা ভেঙে ৪ জন প্রবেশ করতেই দেখে ম্যারি এবং লিওর নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। আশেপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজে তারা। কিছু না পেয়ে সামনের জন বলে,
" আজ রাতের মাঝেই তাকে খুঁজে বের করতে হবে। এই চন্দ্রগ্রহণের সময় তার জন্মই আমাদের আরো শক্তিশালী করে তোলার একমাত্র পথ। সেই আমাদের কোভেন গোত্রের কাউন্ট। "
চলবে...