মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৭.
গোঙ্গানির শব্দ ভেসে আসছে কামরার ভেতর থেকে। দরজার সামনে আসতেই এই শব্দ শুনে বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে ক্যামিলো। দরজা খুলে কামরায় প্রবেশ করতেই সে দেখতে পায় অর্ধনগ্ন একটি কিশোরীকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে আছে ম্যাথিউ। সে আপাতত নিজের রক্ততৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত। মেয়েটা ছটফট করছে গলা কাটা মুরগির মতো। নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ক্যামিলো হাওয়ার বেগে ম্যাথিউর কাছে গিয়ে একহাতে তাকে ছুড়ে দূরে নিয়ে ফেলে। ম্যাথিউ দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায়। সেই মেয়েটির দেহও নিস্তেজ হয়ে নিচে লুটিয়ে পড়ে। একহাতে ঘাড় চেপে ধরে রক্তপাত বন্ধ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে। ব্যথায় মুখ দিয়ে এখনো রা আওয়াজ করে যাচ্ছে। ম্যাথিউ মুহূর্তেই ক্ষুদার্ত প্রাণীর মতো হিংস্র শব্দ করে উঠে দাঁড়ায়। ক্যামিলোকে দেখে দৃষ্টি কিছুটা শিথিল করার চেষ্টা করে। হাত দিয়ে মুখে লেপ্টে থাকা রক্ত মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে বলে,
" উফফ মা। আমাকে ক্ষমা করো। তোমার জন্য কোনো শিকার নিয়ে আসি নি। তুমি চাইলে এই মেয়েকে আমি তোমার অধীনে ছেড়ে দিতে পারি। এর সব রক্ত এখনো শেষ করি নি আমি। "
" ম্যাথিউ! তোকে কতবার মনে করাতে হবে যে প্রাসাদের ভিতরে নিজের কোনো শিকার নিয়ে আসবি না। তোর ভাইয়ের নিষেধ কি তুই ভুলে যাস? "
" তোমার ছেলে গত দু সপ্তাহ ধরে রোমানিয়ায় নেই। কোথায় গিয়েছে সেই খোঁজও কেউ জানেনা। শুধু শুধু তার ভয় আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই। "
" সম্মান দিয়ে কথা বল ম্যাথিউ। সে শুধু তোর ভাই না কোভেনদের কাউন্টও। "
" সে কি আদৌ কাউন্ট হওয়ার যোগ্য মা? যার কোভেনদের নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই সে কিভাবে আমাদের কাউন্ট হওয়ার ক্ষমতা রাখে? আর তোমার এসব নীতিবাক্য তোমার প্রাণপ্রিয় পুত্রর জন্য জমিয়ে রাখো। আমাকে একা ছেড়ে দাও। "
" এই মেয়েকে ছেড়ে দে। ক্ষুধা মেটানোর হলে কোনো পশুর রক্ত পান কর শিকার করে। "
ম্যাথিউ কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ঘাড় বাকা করে চোখ বন্ধ করে। ক্যামিলো কিছু বলবে তার পূর্বেই ম্যাথিউ তীব্র বাতাসের গতিতে এসে সেই মেয়েটার পাশে বসে। ক্যামিলো আঁতকে উঠে মানা করে। ম্যাথিউ সেদিকে তোয়াক্কা না করে সেই মেয়েটির ঘাড় ভেঙে ফেলে। ক্যামিলো চেঁচিয়ে উঠে।
" আমার সন্তানদের এতো অধঃপতন দেখার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয় ছিলো। "
" এতে অধঃপতনের কি দেখলে মা? আমাদের অস্তিত্ব ও পরিচয় কি তুমি ভুলে গিয়েছ? এটাই তো স্বাভাবিক। তাই নয় কি? "
" আমি জানি আমি আমাদের স্বত্তা বদলাতে পারবো না। তাই বলে কারো ক্ষতি না করেও তো টিকে থাকতে পারি। তাই না? "
ম্যাথিউ বিছানায় আরাম করে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। কিছুটা বিদ্রুপের সুরে বলে,
" মানুষের মতো আচরণ আমাদের মানায় না। "
" আমরাও একটা সময় মানুষই ছিলাম। "
" ছিলাম। কিন্তু এখন আর নেই। তাই অযথা অতিতের কথা বলে আমায় বিরক্ত করো না। আর ভুলে যেও না আমি আজকে যা হয়েছি তা তোমার কারণেই হয়েছি। এই হিংস্র জীবন তুমি আমাকে দিয়েছো। "
ক্যামিলো আর কিছু বলতে পারে না। সে তাকিয়ে থাকে অবিকল তার মতোই দেখতে শ্যামবর্ণের ও রেশমের মতো কালো চুলের ছেলের দিকে। দেখতে ক্যামিলোর মতো হলেও যার স্বভাব ও অভ্যাস একদমই তার উল্টো। তার কথা গলায় এসে আটকে যায়। কিছু না বলে কামরা থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। ক্যামিলো বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ম্যাথিউ চোখ মেলে তাকায়। কিছুক্ষণ শূন্যে তাকিয়ে থেকে পাশ ফিরে নিচে পড়ে থাকা সেই মেয়েটির লাশের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে না আছে কোনো মায়া আর না আছে কোনো মনুষ্যত্বের ছায়া।
__________
জঙ্গলের গহীনে ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন চাঁদের আলোয় কিছুটা ঘুচেছে। লম্বাটে গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের ডালপালার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল নক্ষত্রপুঞ্জ। কিন্তু এসবের দিকে ক্যাথরিনের কোনো ধ্যান নেই। সে যতটা সম্ভব হচ্ছে রাস্তা মনে রাখার চেষ্টা করছে মুখস্থ বুলির মতো। এতোদিন পর সেই বন্দী প্রাসাদ থেকে মুক্তি পেয়েও প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়ার ফুরসত পাচ্ছে না সে। আরোণ যখন তাকে খবর পাঠালো যে এই মধ্যরাতে এই মুহুর্তে তাকে আরোণের সাথে বাহিরে যেতে হবে তখন সে মানা করতে নিয়েও কিছু একটা ভেবে রাজি হয়ে যায়। মূলত তার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাসাদের বাহিরে বের হওয়ার রাস্তা ও জঙ্গলের ভেতরটার সাথে পরিচিত হয়ে থাকা। যেন পরে পালানোর সময় সহজেই সে এখান থেকে পালাতে পারে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে কোনো গোলকধাঁধার মাঝে ঘুরছে। চারিদিক তার কাছে দেখতে একই মনে হচ্ছে। আরোণের তার দিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের মতো সামনে হেঁটে চলেছে। ক্যাথরিনের মাথায় অনেক চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন সে অনেকক্ষণ যাবত বুঝার চেষ্টা করছে তাকে এখানে নিয়ে আসার পিছনে আরোণের উদ্দেশ্য কি। আরোণ কি তাকে মারার জন্য এখানে নিয়ে এসেছে? কিন্তু এই অসভ্য জানোয়ার তাকে মারার হলে আরো আগেই মেরে ফেলতো। এখনো বাঁচিয়ে রাখার পিছনে উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না ক্যাথরিন।
হঠাৎ পিছনে ধপ করে পড়ার শব্দ হয়। আরোণ থেমে পিছনে না তাকিয়েই বলে,
" নিজের ধ্যান আমার প্রতি মননিবেশ করলে প্রতি কদমেই হোঁচট খেয়ে পড়বে। "
ক্যাথরিন কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকায় সামনে। এই অসভ্য কি মস্তিষ্কের ভাবনাও পড়তে পারে? পড়লে পরুক। তার কিছু যায় আসে না। ক্যাথরিন নিজের হালকা বেগুনী রঙের গাউনটা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আরোণ নিজের মতো আবার সামনে হেঁটে চলেছে। পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করে নি। আরোণের এমন ভাব দেখে ক্যাথরিন মনে মনে কিছু একটা ভাবে।
হাঁটতে হাঁটতে অনেকক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরেও কোনো শব্দ না পেয়ে খটকা লাগে আরোণের। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। কেউ নেই। স্মিত হাসে সে। কিছুটা উচ্চস্বরে বলে সে,
" আমার সাথে খেলার ইচ্ছে জেগেছে তারমানে। কিন্তু আলফার সাথে এসব বাচ্চাদের লুকোচুরি খেলাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত নিজেই ভেবে দেখো। "
কোনো উত্তর না পেয়ে আরোণ আবার বিদ্রুপের সুরে বলে,
" এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করাটা বোকামি। তাই শুধু শুধু ব্যর্থ প্রয়াস করো না আর। আমি তোমাকে খোঁজা শুরু করার আগেই নিজ থেকেই বেরিয়ে আসো সামনে। "
কোনো প্রতুত্তর না পেয়ে আরোণের মুখের হাসি মলিন হয়ে আসে। ভ্রু জোড়ার মাঝে সুক্ষ্ম ভাজ স্পষ্ট হয়। চোখ বন্ধ করে জোড়ে শ্বাস নেয়। না। ক্যাথরিনের গন্ধ পাচ্ছে না সে। চোখ মেলে আশেপাশে তাকায়। ধীর স্বরে বলে,
" ক্যাথ! ক্যাথ! আমি কিভাবে এই ভুল করলাম? "
__________
ড্যানিয়েল ও ক্যামিলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাথিউ। মাঝরাতে তাকে এভাবে ডেকে পাঠানোর কারণ খুঁজে পাচ্ছে না সে। ম্যাথিউ বিরক্তিমাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
" আমাকে কেন ডেকেছো কারণটা কি জানতে পারি? "
ড্যানিয়েল বলে,
" তুমি ভালো করেই জানো যে তোমার ভাই গত দু সপ্তাহ ধরে এখানে উপস্থিত নেই। সে কোথায় সেটাও কাউকে বলে যায় নি৷ এতদিন কোভেনদের এভাবে ফেলে রেখে দূরে থাকাটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শত্রুরা তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। "
" এখন আমি এই বিষয়ে কি করতে পারি? "
" আমি চাই তুমি সবার অগোচরে এখান থেকে গিয়ে তোমার ভাইকে যেখান থেকে পারো খুঁজে আনো। তুমি ছাড়া আর কাউকে আমি চোখবন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারবো না। "
" তুমি জানো যে তোমাদের ছেলের কোনো বিষয় নিয়েই আমি পরোয়া করি না। তাই আমার থেকে এই আশা করো না। "
ক্যামিলো কিছুটা রেগে ধমকে উঠে,
" ম্যাথিউ। হয় ভাই বল নাহয় কাউন্ট। বারবার তোমাদের ছেলে তোমাদের ছেলে এটা কোন ধরনের আদব? "
" আদব, মায়া ও করুণা এই তিনটা জিনিস আমার মাঝে নেই তা তুমি ভালো করেই জানো মা। তাই অযথা আমাকে এসব বলে সময় অপচয় করো না। "
ক্যামিলো কিছু বলতে নিবে তার আগেই ড্যানিয়েল বলে,
" তুমি কক্ষের বাহিরে অপেক্ষা করতে পারো ক্যামিলো। আমি ম্যাথিউর সাথে একা কথা বলতে চাই। "
ক্যামিলো আর কিছু না বলে ম্যাথিউর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ড্যানিয়েল বিশাল জানালার পাশে রাখা দুটি গদির একটিতে পায়ের উপর পা তুলে বসে আরেকটিতে ম্যাথিউকে বসার জন্য ইশারা করে। ম্যাথিউ কথা না বাড়িয়ে বসতেই ড্যানিয়েল তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
" তোমার নিজের মা এবং ভাইয়ের প্রতি রাগ ও ক্ষোভ সম্পর্কে আমি অবগত। কিন্তু তোমাকে এখন তাকে খুঁজতে যেতেই হবে। ভুলে যেও না আমাদের অস্তিত্বও তার সাথে জড়িত। শত্রুরা চারিদিকে ওঁত পেতে বসে আছে। সবাই তার গোলাম। কিন্তু এই মূর্খের দল এটা বুঝতে পারছে না যে তারা যা করছে ভুল করছে। যে কাউন্টের কোভেনদের নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই তাকে নিয়ে কিসের এতো আদিখ্যেতা? কাউন্ট হওয়া উচিত এমন কারো যে কোভেনদের ও আমাদের সর্বপ্রথম প্রাধান্য দেয়। যেমন তুমি। "
ড্যানিয়েলের কথার অর্থ বুঝতে পারে ম্যাথিউ। সে আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আবার পিছনে ফিরে বলে,
" আমি নিজের মতো যথেষ্ট ভালো আছি। কোভেনদের কাউন্ট হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমি পোষণ করছি না। আর বাকি রইলো আমাদের কাউন্টের বিষয় আমি এখনই বেরোচ্ছি তাকে খুঁজতে। এদিকটা আশা করছি তুমি ও মা সামলে নিবে। "
ম্যাথিউ এই বলেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। ড্যানিয়েল জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকে হতাশ দৃষ্টি মেলে।
চলবে…