ফন্ট সাইজ:
থিম:
মহাপ্রয়াণ

১২তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

মহাপ্রয়াণ

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

১২.

জানালার কাঁচ ভেদ করে বাহিরের তুষারপাত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রিকার্ডো। কাস্টোরিয়ায় শীতকাল প্রায় শেষ হয়ে এলো। হয়তো এটাই বছরের শেষ তুষারপাত। ধীরে ধীরে বসন্তের আগমন ঘটবে। পরশু নাগাদই সে রোমানিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। ম্যাথিউও তার সাথে ফিরে যাবে। ব্যস এর আগে আর কোনো ভুল না করে বসুক সে। রিকার্ডো বারবার করে বলে দিয়েছে ম্যাথিউকে যেন পশু শিকার করে জঙ্গলে। যদিও ম্যাথিউ তার কথা শুনবে সেই আশা করাটাও বোকামি। তবুও রিকার্ডো চাচ্ছেনা এখান থেকে যাওয়ার আগে নতুন কোনো ঝামেলা হোক। বাহিরের দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিলো সে। যাওয়ার আগে শেষ একটা কাজ বাকি। হাতে থাকা কাগজের দিকে তাকায় সে একবার। রোমানিয়ায় ফিরে যাওয়ার আগে এই চিঠিও নিজ গন্তব্যে পাঠাতে হবে তার। চিঠিটা ভাজ করে প্যান্টের পকেটে রেখে দেয় সে। আবার বাহিরের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে। যেই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলো তা সফল হয় নি। কিন্ত এখানে এসে তার গন্তব্যে বিঘ্ন অবশ্যই এসেছে। আনাস্তাসিয়া। এই মেয়েটি তার গন্তব্যে কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আর নয়। একবার রোমানিয়ায় ফিরে গেলেই সে এখানকার সম্পৃক্ত সকল স্মৃতি মুছে ফেলবে মস্তিষ্ক হতে।

__________

বারান্দার সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি মেঝেতে বসে আছে ক্যাথরিন। পিছনে থাকা দেয়ালের সাথে পিঠ হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে সে। এই কনকনে শীতেও শরীরে শুধু পাতলা গোলাপি রঙের কাপড়ের একটা গাউন পড়ে আছে সে। কক্ষ হতে লণ্ঠনে জ্বলিত আগুনের আলোর বিকিরণ বারান্দায়ও এসে পৌঁছেছে সামান্য। মৃদু বাতাসে শীত যেন আরো বেশি অনুভব হচ্ছে। ক্যাথরিনের সামনেই হাটু গেড়ে বসে আছে আরোণ। গত বেশ কিছুদিন ধরেই ক্যাথরিন এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে। সারাদিন চুপচাপ থাকে, খাবার নিয়ে আসলে খায়না নাহয় ফেলে দেয় রাগ দেখিয়ে আবার এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার মাঝে বারান্দায় এসে বসে থাকে গায়ে কোনো শীতবস্ত্র না পড়েই। আরোণের মনটা পুড়ছে ক্যাথরিনের এহেন আচরণে।

" নিজেকে শাস্তি দিয়ে কি শান্তি পাচ্ছো তুমি? কেন করছো এমন? "

আরোণ করুণ কণ্ঠে বলে। ক্যাথরিনের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। আগের মতোই চোখ বন্ধ করে আছে সে।

" আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করো ক্যাথ। ভিতরে চলো। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলে পরে সেটা তোমারই পছন্দ হবে না। "

ক্যাথরিন এবার চোখ মেলে তাকায় আরোণের দিকে। মাথা সোজা করে বসে সে। সামান্য সামনে এগিয়ে প্রশ্ন করে,

" তোমার ধৈর্য্য? কি করবে তুমি? কি বাকি রয়ে গেছে তোমার করার? "

" আমাকে অযথা রাগিয়ে তুলো না। চুপচাপ ভিতরে চলো। "

" তোমার মতো জানোয়ার, খুনি, অমানুষ, পিশাচের সাথে একই প্রাসাদে একই ছাদের নিচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অধিক শ্রেয়। "

আরোণের চোখ দুটি মুহূর্তেই জ্বলে উঠে। ক্যাথরিন তা লক্ষ্য করে আবার বলে,

" তোমাকে দেখলেই আমার গা গুলিয়ে আসে। মনে পড়ে যায় তুমি আমার মা বাবার খুনী। না জানি কত হাজার মানুষের খুনের রক্ত তোমার হাতে লেপ্টে আছে। এসব ভাবলেই তোমার প্রতি এক কৃষ্ণ সাগর সমতুল্য গভীর ঘৃণা নিজের হৃদয়ে অনুভব করি। "

এতো ঠান্ডার মাঝেও আরোণের মনে হচ্ছে তার শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তার মন অশান্ত হয়ে পড়ে। আগে তো ক্যাথরিনের এসব ধারালো কথায় তার কিছুই অনুভব হতো না। তবে এখন কেন এতো কষ্ট হচ্ছে এটা জেনে যে ক্যাথরিন তাকে কি পরিমাণ ঘৃণা করে। সে তো সবসময়ই এটা জানতো যে ক্যাথরিনের মনে তার জন্য ঘৃণা ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতির জায়গা নেই। এখানে আর ক্যাথরিনের সামনে থাকতে পারবে না সে। আজ রাতে সে শিকারে বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু তার আগে ক্যাথরিনকে ভিতরে নিয়ে যেতে হবে। এখানে বসে থাকলে ঠান্ডায় জমেই মরে যাবে এই নির্বোধ মেয়ে।

আরোণ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ক্যাথরিনকে পাজাকোলে তুলে কক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। ক্যাথরিন আপত্তি না করায় কিছুটা অবাক হয় প্রথমে। কিন্তু তাকে আরো অবাক করে দিয়ে ক্যাথরিন নিজের দু'হাতে তার ঘাড় জড়িয়ে ধরে বলে,

" তুমি বারান্দায় প্রশ্ন করেছিলে না যে নিজেকে শাস্তি দিয়ে কি শান্তি পাচ্ছি আমি? "

আরোণ হাঁটা থামিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় ক্যাথরিনের দিকে। ক্যাথরিন বলে,

" আমি নিজেকে না তোমাকে শাস্তি দিয়ে শান্তি পাচ্ছি। "

আরোণের ভ্রু জোড়া এবার আরো কুচকে আসে। ক্যাথরিন স্মিত হেসে বলে,

" সমগ্র নেকড়ে পালের আলফা আরোণ রদ্রিগেজ। যার মনে দয়া, মায়া এবং মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটাও নেই সেই আরোণ কিনা শেষমেশ একজন তুচ্ছ মেয়ে মানুষকে মন দিয়ে বসলো? "

আরোণ এবার অবাক হওয়ার চূড়ান্ত সীমান্তে পৌঁছায়। মনে মনে ভয় পেলেও বাহিরে তা প্রকাশ করে না। গলার স্বর উল্টো কঠিন করে বলে,

" কি যা তা বকছো? "

" কেন বাসো না ভালো আমাকে? "

" নিজের ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত তোমার। "

" নিজের দূর্বলতা লুকানোর চেষ্টা করছো আমার থেকে? নাকি ভয় পাচ্ছো পাছে আমি আবার তোমার দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে তোমাকে মেরে পালাই কিনা? "

" তুমি এবং তোমার ধারণা উভয়ই ভুল। "

এই বলে আরোণ এগিয়ে গিয়ে ক্যাথরিনকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে দাঁড়ায়। ক্যাথরিন পিছন থেকে বলে,

" তোমার জীবনেও অপূর্ণতা রয়ে যাবে। যেভাবে তুমি আমাকে আমার পরিবার থেকে বঞ্চিত করেছ ঠিক একইভাবে তুমিও পুরো জীবন ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত থাকবে। তুমি যেমন আমার জীবনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছ তেমনই ভাবে এই ভালোবাসাও তোমার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। নিঃস্ব হবে তুমি। "

আরোণের মনে হয় তার গলায় কোনো বিষাক্ত কাঁটা আঁটকে আছে। তার সকল কথা গলায় এসে দলা পাকিয়ে যায়। কোনমতে পিছনে ফিরে ক্যাথরিনের দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাথরিনের পায়ের কাছে থাকা চাদরটা টেনে তার শরীরে দিয়ে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে ক্যাথরিনের চোখে চোখ রেখে বলে,

" এই প্রাসাদে দেয়ালেরও কান আছে। পরে আবার যেন এমন না হয়, তোমার এই ভুল ধারণা অন্য কেউ জেনে আমার সাথে শত্রুতার হিসাব মেটাতে তোমাকে বেছে নেয়। "

এইটুকু বলেই আরোণ সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আবার বলে,

" আর আমার নিঃস্ব হওয়ার মতো নতুন কিছু নেই। নিঃস্ব হওয়ার বদৌলতেই আমার সত্তা তোমার থেকে আলাদা। "

এতটুকু বলে আরোণ এগিয়ে গিয়ে ক্যাথরিনের বারান্দার দরজার লাগিয়ে দিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে চলে যায়। ক্যাথরিন বিছানায় একা বসে রয়। চাঁদরটা আরেকটু টেনে ভালো করে শরীরে পেচিয়ে নেয়। এতক্ষণ বাহিরে ঠান্ডায় বসে থেকে তার মনে হচ্ছিলো সারা শরীর বরফে জমে যাবে। মনে মনে ক্যাথরিন বলে,

" এই জানোয়ারকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি যেকোনো কিছু সহ্য করতে রাজি আছি। "

তার দৃষ্টি স্থির হয় বারান্দার বদ্ধ দুয়ার দ্বারের উপর। ক্যাথরিনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। ভালোবাসা অস্বীকার করেও এতো যত্ন নেওয়া হচ্ছে দেখে মনে মনে আরোণকে নির্বোধ বলে সম্বোধন করে। ক্যাথরিন সেই ভয়ংকর রাতের পর থেকে আরোণের ব্যবহারে এই অমূল পরিবর্তন দেখে প্রথমে ভেবেছিল আরোণ হয়তো নাটক করছে। কিন্তু পরে ঠান্ডা মাথায় ভাবার পর বুঝতে পারে যে আরোণের তার সাথে নাটক করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর আরোণের এতো দুশ্চিন্তা এবং যত্ন ক্যাথরিনের কাছে সত্যি মনে হতে থাকে। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য সেদিন রাতে সে বারান্দার রেলিঙের উপর দাঁড়ায়। যখন দেখে আরোণ তার কক্ষে প্রবেশ করেছে তখন নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে। আরোণ তাকে ভালোবাসে নাকি নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিজের জীবন ঝুঁকি নিয়ে ক্যাথরিন রেলিঙ থেকে নিজের পা পিছিয়ে নেয়। কিন্তু তার ভাগ্য ভালো যে আরোণ এসে তাকে বাঁচিয়ে ফেলে। সেই মুহূর্তেই ক্যাথরিন নিশ্চিত হয় আরোণ তাকে ভালোবাসে।

আরোণের একমাত্র দূর্বলতা সম্পর্কে জানতে পারায় বেশ আত্নবিশ্বাস কাজ করছে তার মধ্যে। এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়েই সে আরোণকে শেষ করবে। এই নেকড়ে পালের বিনাশ করার জন্য যা প্রয়োজন হয় তাই করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

__________

সবে মাত্র বাজার থেকে ফিরেছে আনাস্তাসিয়া। মূল দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় লম্বা চওড়া, কাধ সমান কোকড়ানো চুলের একজন পুরুষ বসার ঘরে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। তার পাশেই লিয়াম সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছে। হঠাৎ নাথানকে দেখে কিছুটা অবাক হলেও তা প্রকাশ করে না আনাস্তাসিয়া। স্বাভাবিক ভাবেই ঘরে প্রবেশ করে হাতের ব্যাগটা নিচে একপাশে রেখে বলে,

" তুমি কখন এলে নাথান? "

আনাস্তাসিয়াকে দেখেই সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়ে নাথান। দুঃখজনক ভাবে বলে,

" ওহ আনাস্তাসিয়া। আমি আসতে খুব দেরি করে ফেলেছি তাইনা? গত পরশু আমি কাভালায় ফিরে বাবার কাছ থেকে জানতে পারি সবকিছু। তারপর সাথে সাথেই রওনা দেই কাস্টোরিয়ার উদ্দেশ্যে। "

" তাহলে নিশ্চয়ই তুমি এটাও জানতে পেরেছ যে ক্যাথরিন, মা, বাবা তিনজনই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তবুও কষ্ট করে এখানে আসতে গেলে কেন তুমি? "

" আমি তোমার সাথে দেখা করার জন্য এসেছি এখানে। ইশ নিজের এ কি অবস্থা করেছ তুমি? তোমাকে দেখে মনেই হচ্ছে না তুমি কাভালা শহরের সনামধন্য বণিক মার্টিন অ্যালভেজের মেয়ে। "

আনাস্তাসিয়া উপহাসের সুরে বলে,

" আমার তো মনে হচ্ছে তুমি এখানে আমাকে আমার পিতৃ পরিচয় মনে করিয়ে দিতে এসেছ। "

নাথান কিছু বলার আগেই অফিলিয়া ট্রে-তে করে বিভিন্ন নাস্তা হাতে বসার ঘরে প্রবেশ করে। বেশ হাস্যজ্বল আজ তিনি। বেশ অমায়িকভাবে নাথানকে বলে,

" একি? দাঁড়িয়ে আছো কেন তুমি? বসো বসো। "

নাথান ব্যস্ত পায়ে অফিলিয়ার কাছে গিয়ে তার হাত থেকে ট্রে নিয়ে বলে,

" ওহো গ্র্যানি! আপনি শুধু শুধু এতো কষ্ট করতে গেলেন কেন? আমি তো আর মেহমান না, আপনাদের পরিবারেরই একজন। "

নাথানের এহেন আদিখ্যেতা দেখে বিরক্ত হয় আনাস্তাসিয়া। তার কাছে এসব নতুন কিছু না। নাথানের এই মাত্রারিক্ত ভালো মানুষি মুখোশের আড়ালে যে তার খারাপ রূপ লুকিয়ে আছে তা সম্পর্কে সে অবগত। তার মা, বাবা ও ক্যাথরিনকেও সে এই ভালো মানুষি রূপ দেখিয়ে বোকা বানিয়ে এসেছে এতো বছর। এখন আবার কোন উদ্দেশ্যে গ্র্যানিকে এতো মাখন মেরে কথা বলছে কে জানে। আনাস্তাসিয়া রাগ দেখিয়ে লিয়ামকে বলে,

" লিয়াম তুই উপরে যা। "

বোনের আদেশ পেতেই লিয়াম দাত বের করে হেসে ট্রে থেকে একটি সামালি ও লোকুমদেসের প্লেট হাতে নিয়ে দৌড়ে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। এবার আনাস্তাসিয়া দু হাত আড়াআড়ি ভাজ করে নাথানের দিকে তাকিয়ে বলে,

" আমার বোন আর নেই নাথান। তাই আমাদের সাথে কোন সূত্রে তোমার পারিবারিক সম্পর্ক এখনো আছে আমি কি জানতে পারি? "

অফিলিয়া হালকা ধমকে উঠে আনাস্তাসিয়াকে বলে,

" অ্যানা! কিভাবে কথা বলছো তুমি? আমার সাথে আসো তুমি। আমি তোমাকে বুঝিয়ে সব বলছি। "

নাথান অফিলিয়ার কথার মাঝে বাগড়া দিয়ে বলে,

" গ্র্যানি। আপনি কিছু মনে না করলে আমি আনাস্তাসিয়ার সাথে একা কথা বলতে পারি? আমিই ওকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি। "

" হ্যাঁ অবশ্যই। "

নাথান সামনে গিয়ে মূল দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়ার মোটেও ইচ্ছে করছে না এই নাথানের সাথে কথা বলার। কিন্তু অফিলিয়া চোখের ইশারায় যেতে বললে বাধ্য হয়ে সে নাথানের সাথে বের হয়।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই দূরে এসে পড়েছে আনাস্তাসিয়া ও নাথান। এখানে মানুষের সমাগম নেই বললেই চলে। আশেপাশে থাকা লম্বা পাইন গাছগুলোর কারণে জায়গাটা দেখতে কিছুটা জঙ্গলের মতো। অবশ্য সমগ্র কাস্টোরিয়ায় এরকম পাইন গাছের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এখানকার দৃশ্য অনেকটা জঙ্গলের মতো। আনাস্তাসিয়া হাঁটা থামিয়ে বলে,

" কি বলার জন্য এতো আদিখ্যেতা দেখিয়ে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ? "

নাথান দাত বের করে হেসে বলে,

" আমি এখানে আসার পরই গ্র্যানির সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি। গ্র্যানি আপত্তি করে নি। এখন তোমাকেও বুঝিয়ে বলছি। মন দিয়ে শুনো। যেহেতু এখন তোমার মা, বাবা, ক্যাথরিন কেউই আর জীবিত নেই সেহেতু তোমাদের বাসা ওখানে কাভালায় খালি পড়ে রয়েছে। আবার তোমার বাবার সব ব্যাবসাও বা এখন কে সামলাবে? তাই আমি ঠিক করেছি আমি তোমাকে বিয়ে করে এসব কিছু এবং তোমাদের দায়িত্ব নিবো। এতে কারো আপত্তিও থাকবে না আর। "

আনাস্তাসিয়ার এতক্ষণ দমিয়ে রাখা রাগ এখন সপ্তম আকাশে পৌঁছে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসে। সে ফুস করে উঠে। চেঁচিয়ে বলে,

" তোর মতো লোভীর নিয়ত সম্পর্কে আমার প্রথমদিন থেকেই সন্দেহ ছিলো। আজ তুই সেটার প্রমাণও দিয়ে দিলি। অসভ্য, লোভী কোথাকার। আমার বোনকে ভালোবাসিস বলে না মুখে ফেনা তুলতি তুই? কোথায় গিয়েছে তোর ভালোবাসা এখন? আমার বাবার ব্যাবসার প্রতি লোভ সামলাতে না পেরে এখানে এসে পড়েছিস আমাকে বিয়ে করতে? "

" আনাস্তাসিয়া। আবেগ দিয়ে না ভেবে বিবেক দিয়ে ভাবো। আমি এখানে তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিয়ে আরো তোমার উপকার করছি আর তুমি উল্টো আমাকে লোভী বলছো। "

আনাস্তাসিয়া রাগে ফুসতে ফুসতে বলে,

" তোর উপকার আর তুই কোনটারই প্রয়োজন নেই আমার এবং আমার পরিবারের। চুপচাপ কাস্টোরিয়া থেকে চলে যা তুই। "

নাথান এবার আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে ফেলে। কিন্তু এতে আনাস্তাসিয়া আরো রেগে চিৎকার করে উঠে। কিছু বুঝে উঠার আগেই নাথান নিজের মুখে শক্ত এক হাতের আঘাত অনুভব করে। আঘাতের ফলে সে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ে। নিজের নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখে তার নাক হতে রক্ত বের হচ্ছে। নাথানের চেহারা মুহূর্তেই পরিবর্তন হয়। হিংস্র চোখে সে পিছনে ফিরে তাকায়। আনাস্তাসিয়ার সামনে একটি যুবক দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষুদ্ধ চোখে সে নাথানকে একবার দেখে নিয়ে পিছনে ফিরে আনাস্তাসিয়াকে প্রশ্ন করে,

" তুমি ঠিক আছো আনাস্তাসিয়া? "

আনাস্তাসিয়া রাগে ফুসছে এখনো। সে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে,

" এই লোককে আমার চোখের সামনে থেকে যেতে বল ওরিয়ন। আর কখনো যেন কাস্টোরিয়ার আশেপাশেও সে না আসে। "

ওরিয়ন আবার নাথানের দিকে ফিরে তাকায়। সামনে এগিয়ে গিয়ে নাথানের শার্টের কলার ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে বলে,

" আর কখনো যেন তোর ছায়া আনাস্তাসিয়ার আশেপাশে কেন কাস্টোরিয়ার আশেপাশেও না দেখি। "

নাথান আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলে,

" ওহ তো এই কারণেই এতো রাগ? কাস্টোরিয়ার হাওয়া লেগেছে গায়ে। এখানে নতুন নাগর পেয়ে এতো তেজ বেড়েছে। মা বাবার ছায়াতল থেকে বেরিয়ে এতো স্বাধীনতা দুশ্চরিত্রা করে তুলেছে শেষমেশ। "

ওরিয়ন রেগে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। এগিয়ে গিয়ে নাথানকে মাটিতে ফেলে তার উপর বসে ইচ্ছেমতো এলোপাথাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে আনাস্তাসিয়া এগিয়ে এসে ওরিয়নের হাত ধরে তাকে টেনে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিশেষ লাভ হয় না। তাদের চেঁচামেচিতে আশেপাশের মানুষ জমা হয়ে যায়। দু চারজন পুরুষ এগিয়ে এসে ওরিয়নকে জোর করে সড়ায় নাথানের উপর থেকে। তবুও তারা ধরে রাখতে পারছে না ওরিয়নকে। তাই আরো দুজন এগিয়ে এসে ওরিয়নকে ধরে রাখে। নাথান ক্রোধে ফুসতে ফুসতে বলে,

" এই দুশ্চরিত্রা মেয়ে এই ছেলের মাথা নষ্ট করে দিয়েছে। কে জানে কি জাদু করেছে যে এই ছেলে অশরীরীর মতো আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে আক্রমণ করেছে। সবাই চিনে রাখো এই মেয়েকে। এই মেয়ে ছলনাময়ী। "

ওরিয়ন চিৎকার করে বলে,

" আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে আর একটা আজেবাজে কথা বললে তোর জিভ কেঁটে নেড়ি কুকুরদের খাওয়াবো আমি। "

ওরিয়নের এমন ব্যবহারে আনাস্তাসিয়া সহ সকলেই অবাক হয়। কাস্টোরিয়ায় সকলেই ওরিয়নকে চিনে। বেশ ঠান্ডা ও নরম স্বভাবের ছেলেটার হঠাৎ এমন অগ্নিরূপ দেখে সকলেই হতভম্ব হয়ে আছে। নাথান মনে মনে ওরিয়ন ও আনাস্তাসিয়াকে বেশ গালাগালি করতে করতে সেখান থেকে প্রস্থান করে। এখানে বেশি বাড়াবাড়ি করাটা যে মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না তা সে বুঝতে পারে। যারা এতক্ষণ ওরিয়নকে ধরে রেখেছিল তারা ওরিয়নকে ছেড়ে সড়ে দাঁড়ায়। ওরিয়ন সবার দিকে একবার চোখ রাঙিয়ে বলে,

" এই অসভ্যের কথার পুনরাবৃত্তি যদি অন্য কারো মুখে শুনি আমি তাহলে আমি মোটেও চুপ থাকবো না। "

এই বলে ওরিয়ন আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে সেখান থেকে প্রস্থান করে। আনাস্তাসিয়া কোনো শব্দ না করে চুপচাপ ওরিয়নের পিছনে হাঁটতে থাকে। সে এতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে যে তার জীবনে বিশ্বাসযোগ্য গুটিকয়েক মানুষের মাঝে ওরিয়ন অন্যতম।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন