মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
১৬.
গুমোট অন্ধকার বিশাল হলরুমের মাঝ বরাবর মাথা ঝুকিয়ে রক্তাক্ত একজন পুরুষ নিজের জীবনের জন্য ভিক্ষা চাইছে। কক্ষের চার কোণে থাকা আগুনের মাশালের জ্বলজ্বল করা আলোয় তার চেহারা মৃদু স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। বয়স হয়তো চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ছাব্বিশ জন ভয়ংকর রক্তচোষা পিশাচ। সকলের মুখেই বিদ্রুপের হাসি। রক্তাক্ত পুরুষটি আরেকবার অনুনয় করে বলে,
" আমি বিশ্বাসঘাতকতা করি নি। বিশ্বাস করুন কাউন্ট। আমি কোভেনদের সাথে প্রতারণা করার কথা সপ্নেও ভাবতে পারি না। আমার বংশ চার প্রজন্ম ধরে আপনার সেবায় নিয়জিত। "
বিশাল নিস্তব্ধ কক্ষে কারো পদচারণের শব্দ শুনা যায়। ধীরে ধীরে আধার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে আসে সেই ব্যক্তি। এক হাতে কাঁচের গ্লাস। সেই গ্লাসে লাল রঙের পানীয়। চোখের ইশারায় কাউকে ডাকতেই একজন মহিলা ট্রে হাতে এগিয়ে আসে তার দিকে। সেই ট্রে-তে গ্লাসটি রেখে এবার সেই রক্তাক্ত অবস্থায় নতজানু হয়ে থাকা পুরুষের দিকে এগোয় সে। অনুনয় করতে থাকা সেই পুরুষের চুলের মুঠি ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে বলে,
" হ্যাঁ এন্টন। একদম ঠিক বলেছ। তোমার বংশ চার প্রজন্ম ধরে বিশ্বস্ততার সাথে আমার সেবায় নিয়জিত ছিলো। "
এটা বলেই সাথে সাথে এন্টনের মাথা গর্দান থেকে আলাদা করে ফেলে সে। উপস্থিত অনেকের মুখে রক্ত ছিটে পড়ে। তাদের মাঝে এক যুবতী মুখে ছিটে আসা রক্ত আঙ্গুল দিয়ে নিয়ে মুখে পুরে নেয়। বিতৃষ্ণা স্বরে বলে,
" ছি! এর রক্তের স্বাদও কি পানসে। "
ড্যানিয়েল পাশ থেকে বলে,
" আহ রিকার্ডো! কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই একে মেরে ফেললে? ওর বংশ আমাদের সবথেকে বিশ্বস্ততার সাথে চাকরগিরি করেছে। "
রাগী দৃষ্টি মেলে রিকার্ডো ড্যানিয়েলের দিকে তাকায়। চোয়াল শক্ত করে বলে,
" বিশ্বাসঘাতকদের জীবন নেওয়ার আগে তাদের কোনো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করি না আমি। এন্টনের বংশের সকল পুরুষ গত চার প্রজন্ম ধরে বিশ্বস্ততার সাথে দাসত্ব করেছে। কিন্তু সেই ধারা এন্টন অব্যাহত রাখতে পারে নি৷ আমার দূর্গে আমার গোলামির নাম করে সে ওই হারামি জ্যাকসনের গুপ্তচর হিসেবে ছিলো। "
ক্যামিলো প্রশ্ন করে,
" তুমি কিভাবে নিশ্চিত যে ও জ্যাকসনের গুপ্তচর হিসেবে দূর্গে ছিলো? "
" সেটার কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না কাউকে। "
এটি বলেই নিচে পড়ে থাকা এন্টনের লাশ ডিঙিয়ে রিকার্ডো সেখান থেকে প্রস্থান করে। ড্যানিয়েল ও ক্যামিলো রিকার্ডোর পিছু পিছু যায়। রিকার্ডো নিজের কক্ষে প্রবেশ করে ঘাড়ে একহাত দিয়ে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ড্যানিয়েল ও ক্যামিলো কক্ষে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দেয়। ক্যামিলো এগিয়ে এসে রিকার্ডোর কাধে হাত রাখতেই রিকার্ডো বলে,
" কোভেনদের সামনে আমার থেকে কোনো ধরনের কৈফিয়ত চাইতে তোমায় হাজার দিন বারণ করেছি আমি মা। তোমাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করলে আমি নিজ থেকে জানিয়ে দিবো। আর এন্টন একজন বিশ্বাসঘাতক এটা বিশ্বাস করার জন্য তোমার আমার বলা যথেষ্ট মনে হয় নি? "
" তোমার কথায় আমি বিশ্বাস করি কিন্তু কোভেনদের মনে এই নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে যথাযথ প্রমাণ না দেখালে। "
" কার এতো সাহস যে আমার সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুলবে? "
ক্যামিলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার দুই ছেলেই যে এতোটা বেপরোয়া হবে তা সে কখনো ভাবেনি। এদের কিছু বুঝিয়েও লাভ নেই। পিশাচ স্বত্তার তবে এতো ক্ষমতা যে সে ভিতরের মানবতাকেও মেরে ফেলে? অবশ্য তার দুই সন্তানের ভিতর সে কখনোই মানব স্বত্তার ছিটেফোঁটাও দেখে নি। জন্মের পর থেকেই এরা রক্তের খেলার অংশ হয়ে গিয়েছে। আর রিকার্ডো! সে হয়ে গিয়েছে এই রক্তের খেলার সম্রাট।
ড্যানিয়েল এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে,
" তুমি কোথায় ছিলে এতদিন? "
রিকার্ডো বাকা হেসে জবাব দেয়,
" ম্যাথিউর থেকে যে কথা বের করতে পারো নি সেই কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করাটা বোকামি নয় কি? "
ড্যানিয়েল রাগ হয় ভিতরে ভিতরে। ম্যাথিউ রিকার্ডোর সাথে ফিরে এসেই সাথে সাথে আবার দূর্গের বাহিরে চলে গিয়েছে। তাই তাকে এই প্রশ্ন করার সুযোগ পায় নি সে। কিন্তু তার ভালো করেই জানা আছে প্রশ্ন করে বিশেষ লাভ নেই। কারণ ম্যাথিউ কখনোই এর উত্তর দিবে না। মাঝেমধ্যে ড্যানিয়েল ভাবে ম্যাথিউ আসলেই তারই ছেলে তো! নাহয় নিজের সবথেকে অপছন্দের ও ঘৃণার ব্যক্তির তথ্য নিজের পিতাকে জানাতে কেন আপত্তি করবে সে?
ড্যানিয়েল আর কিছু বলার আগেই রিকার্ডো বলে,
" তোমরা এখন আসতে পারো। "
ক্যামিলো হতাশ দৃষ্টি ফেলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ে। ড্যানিয়েলও তার পিছু পিছু যেতে নেয় তখনই রিকার্ডো পিছন থেকে বলে উঠে,
" ড্যানিয়েল! আর কখনো যেন ভরা মজলিসের মাঝে আমার নাম উচ্চারণ করতে না দেখি তোমায়। বাকি সবার মতোই কাউন্ট বলে সম্বোধন করবে। এটাই আমার প্রথম ও শেষ সতর্কীকরণ। "
রাগে অপমানে থমথমে মুখ নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ে ড্যানিয়েল। আপাততর জন্য সে মুখ বুজে এই অপমান গিলে নেয়। সময়মতো সে এর জবাব দিবে।
কক্ষের একপাশের দেয়ালের মাঝ বরাবর রয়েছে বিশাল গোলাকৃতির বিছানা। তার সামনের সম্পূর্ণ দেয়াল জুড়ে এক বিশাল জানালা। তারই একপাশের দেয়ালে একটি আয়না, একটি ক্যাবিনেট ও একটি আলমারি রয়েছে। তার অপর পাশের দেওয়ালে রয়েছে ফায়ারপ্লেসের ব্যাবস্থা ও বারান্দায় যাওয়ার জন্য বিশাল দরজা।
রিকার্ডো আলমারির কাছে এগিয়ে যায়। আলমারি খুলে সেখান থেকে একটি ছুড়ি বের করে। ছুড়ির হাতলের দিকটায় সবুজ পাথরের কাজ করা। দেখতে খারাপ না। রাজকীয় ভাব আছে। আনাস্তাসিয়াকে মনে মনে বোকা বলে সম্বোধন করে রিকার্ডো। শেষ দেখার দিন এই ছুড়ি সেই কাঠবাদাম গাছে রেখেই আনাস্তাসিয়া চলে গিয়েছিলো। কি ভেবে যেন রিকার্ডো এটা নিয়ে নেয় নিজের সাথে। এই মেয়ের অভ্যাস হয়তো প্রতিবার দেখা হলে কিছুনা কিছু ফেলে যাওয়ার। মাত্র তিনবার সাক্ষাৎ হয় রিকার্ডোর আনাস্তাসিয়ার সাথে। তিনবারই এই মেয়ে নিজের কিছু না কিছু ফেলে গিয়েছে রিকার্ডোর কাছে। প্রথম সাক্ষাতে আনাস্তাসিয়া নিজের চুলের চিকন এক সোনালী রঙের ফিতা ফেলে গিয়েছিলো, দ্বিতীয় সাক্ষাতে নিজের তলোয়ার ফেলে গিয়েছিলো এবং তৃতীয় সাক্ষাতে নিজের এই ছুড়ি ফেলে গিয়েছিলো। রিকার্ডো হাতের ছুড়িটা আলমারিতে রাখে। সেই ছুড়ির সাথেই থাকা তলোয়ার ও ফিতাটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
" ভুলো মনের মেয়ে। "
__________
বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে গতকালের কথা মনে করছে ক্যাথরিন। গতকাল প্রাসাদে ফিরে আসার সময় আরোণ হঠাৎ ক্যাথরিনকে বলে,
" রোমানিয়ায় একটা প্রচলিত রীতি আছে জানো? "
" কি? "
" এখানে নববধূরা চুলে বিনুনি করে রাখতে পছন্দ করে এবং কুমারীরা চুল খোলা রাখতে। "
আরোণের কথার মানে বুঝতে পেরে তাজ্জব বনে যায় ক্যাথরিন। তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে,
" আমি জানতাম না। "
দরজা খোলার শব্দে ভাবনা থেকে ফিরে আসে ক্যাথরিন। পাশ ফিরে দেখে আরোণ কক্ষে প্রবেশ করছে৷ আরোণ কাছে এসে সাথে সাথে ক্যাথরিনের হাত ধরে কক্ষের এক কোণায় নিয়ে যায়। আকস্মিক ঘটনায় ক্যাথরিন অবাক হয়। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। আরোণ ফিসফিসিয়ে বলে,
" এতো কথা বলার সময় নেই। তোমার প্রয়োজনীয় যা দরকার গুছিয়ে নাও। আজকে রাতে তুমি এখান থেকে চলে যাবে। "
ক্যাথরিন এবার আরো অবাক হয়। প্রশ্ন করে,
" চলে যাবো মানে? "
" আমাকে যেতে হবে ক্যাথ। গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। "
" আমিও কি তোমার সাথে যাবো? "
" না। আমি সহ পালের অনেকেই একটি কাজে সিবিউর বাহিরে যাবো। আমার অনুপস্থিতিতে তোমার এখানে থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। তোমাকে একাও আমি ছেড়ে দিতে পারবো না। তাই ক্রিয়াসকে রেখে যাবো। আজকে রাতে তুমি ক্রিয়াসের সাথে প্রাসাদ থেকে সকলের অগোচরে বেড়িয়ে যাবে। ক্রিয়াস আমার বিশ্বস্ত একজন। ওর উপর বিশ্বাস করতে পারো তুমি। আর এই বিষয়ে তুমি, আমি এবং ক্রিয়াস ব্যতিত অন্য কেউ অবগত নয়। "
খুবই ধীর স্বরে কথাগুলো বললেও আরোণের কণ্ঠে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট অনুভব করছে ক্যাথরিন। আরোণ ক্যাথরিনের সুরক্ষা নিয়ে এতো চিন্তা করছে কেন? তার অনুপস্থিতিতে তারই রাজ্যে কে ই বা ক্যাথরিনের ক্ষতি করবে? প্রশ্নগুলো ভাবায় ক্যাথরিনকে। আরোণ আবার বলে,
" আমার কথা বুঝতে পেরেছ? "
" তুমি আবার কোনো সাধারণ মানুষ শিকার করতে যাবে তোমার পাল নিয়ে? আমার মা বাবার মতো আবার কারো মা বাবাকে মেরে তাদের সন্তানকে অনাথ করে দিবে? "
ক্যাথরিনের কণ্ঠে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। আরোণ কিছুক্ষণ থেমে জবাব দেয়,
" আমি আমার শত্রুর কাছে যাচ্ছি ক্যাথ। মানুষ নয় রক্তচোষা পিশাচরা আমার শত্রু। সোফিয়ার মৃত্যুর জবাব দিতে হবে না? "
ক্যাথরিন এবার আরোণের থেকে খানিকটা সড়ে দাঁড়িয়ে বলে,
" এমন তো নয় যে আমার কথায় তুমি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবে। যদি ওখানে তুমি ওদের হাতে মারা যাও তাহলে? তখন কি করবো আমি? "
আরোণ এক মুহূর্তের জন্য ভাবে ক্যাথরিন হয়তো তার জন্য চিন্তা করছে। কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে ক্যাথরিন বলে,
" তোমার সেই নেকড়ে ক্রিয়াস কি তখন আমাকে আমার দেশে ফেরত যেতে দিবে? "
আরোণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
" আমি দুঃখিত ক্যাথ। কিন্তু কোনো পিশাচের এতো ক্ষমতা নেই যে আমার কোনো ক্ষতি করবে। আমি নেকড়ে পালের আলফা আরোণ রদ্রিগেজ। সর্বশক্তিমান আমি। শ'খানেক ভ্যাম্পায়ার এক হলেও আমার মোকাবেলা করার ক্ষমতা কারো নেই। তাই তুমি অপেক্ষা করবে। ফিরে আসবো আমি তোমার কাছে। "
আরোণের এভাবে নিজের ক্ষমতার কথা বলায় ক্যাথরিনের রাগ হয়। নেকড়ের জাত হাজার হোক। সবজায়গায় নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবা এদের রক্তে মিশে আছে। আরোণের নিজের হিংস্রতা নিয়ে এই অহংকার ও আত্মবিশ্বাসকে দূর্বল করার জন্য ক্যাথরিন কঠিন কণ্ঠে বলে,
" করবো না তোমার অপেক্ষা। আশা করছি কখনো না ফিরে আসো তুমি আমার জীবনে। "
আরোণ অসহায়ের মতো হাসি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে কক্ষ হতে। করিডোর দিয়ে নিজের কক্ষে যেতে যেতে আরোণ ভাবতে থাকে ক্যাথরিনকে নিয়ে। সে ভেবেছিলো হয়তো ক্যাথরিন কিছুটা হলেও নরম হয়েছে তার প্রতি। কিন্তু তার ধারণা ভুল। ক্যাথরিনের ঘৃণার পাহাড় এতোই বিশাল যে সেই পাহাড় কেটে ক্যাথরিনের মনে জায়গা করে নেয়া অসম্ভব বিষয়। অবশ্য ভালোই হয়েছে। সব ঝামেলা মিটিয়ে ক্যাথরিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এভাবেই আরোণ তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিবে। একসাথে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই৷ তাই ক্যাথরিনের আরোণের প্রতি কোনো অনুভূতি না থাকাই উত্তম।
__________
বিছানায় নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে আনাস্তাসিয়া। আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবছে। যা ভয় পাচ্ছিলো তাই হলো। নাথানের বলে যাওয়া সেই কথাগুলো পুরো কাস্টোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই ভাবছে আনাস্তাসিয়া ও ওরিয়নের মাঝে হয়তো কোনো সম্পর্ক আছে। নাহয় শান্ত চুপচাপ থাকা ওরিয়ন আনাস্তাসিয়ার জন্য এতোটা রেগে যাবে কেন? বিষয়টা এটুকু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। সবাই এখন আনাস্তাসিয়ার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। আনাস্তাসিয়া নাকি ছলনা করে ওরিয়নের মতো ছেলেকে হাত করেছে। গ্র্যানিকে সেদিনের নাথানের ব্যবহার সম্পর্কে বলার পর গ্র্যানি নিজে এই বিয়ে নিয়ে নাকোচ করেছে। কিন্তু এখন সকলের কানাঘুষায় গ্র্যানি যদি তাকে ভুল বুঝে? অসহ্যকর লাগছে সবকিছু আনাস্তাসিয়ার। কালকে ভোর হতেই তার ওরিয়নের সাথে দেখা করতে হবে। তাদের সম্পর্কে যে কুটনা রটছে তা নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হবে।
__________
রাত গভীর হয়েছে। চারিদিক নিশ্চুপ হয়ে আছে। দরজা খুলে নিশব্দে ক্যাথরিনের কক্ষে প্রবেশ করে আরোণ। ক্যাথরিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কোমরবন্ধ গির্ডেলসের বাধন বাধছিলো। হঠাৎ আরোণের প্রবেশে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। ক্যাথরিনের অস্বস্তি বুঝতে পেরে সাথে সাথে আরোণ অপর দিকে ফিরে যায়। ক্যাথরিন তাড়াতাড়ি গির্ডেলস পড়ে আরোণকে বলে,
" তৈরি আমি। এখন বেরোবো আমরা? "
আরোণ এবার ক্যাথরিনের দিকে ফিরে। কালো রঙের গাউন এবং তার উপর একটি খয়েরী রঙের গির্ডেলস পড়েছে সে। আজকে চুল খোলাই রেখেছে। আরোণ এগিয়ে আসে ক্যাথরিনের কাছে। ক্যাথরিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
" একটা জিনিস বাকি। "
ক্যাথরিন একবার আরোণের বাড়ানো হাতের দিকে তাকায় আবার আরোণের দিকে তাকায়। আরোণ চোখের ইশারায় হাত ধরতে বলে। ক্যাথরিন আরোণের হাতে হাত রাখতেই আরোণ তাকে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে নিজে হাটু গেড়ে ক্যাথরিনের সামনে বসে পড়ে। ক্যাথরিন চোখ কুচকে বুঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে। আরোণ এবার ক্যাথরিনের ডান পা নিজের হাঁটুর উপর রেখে তার গাউন হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে দেয়। ক্যাথরিন তেঁতে উঠে বলে,
" করছো কি তুমি? "
আরোণ ক্যাথরিনের দিকে না তাকিয়ে নিজের পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে। রুমালটা ক্যাথরিনের হাঁটুর খানিকটা নিচে বেধে দিয়ে নিজের বেল্টের পাশ থেকে একটা খঞ্জর বের করে। ক্যাথরিন দেখে খঞ্জরটির হাতলটা সম্পূর্ণ একটি গোলাপের মতো কারুকার্য করা। আরোণ বলে,
" এটা তোমার জন্য। আশা করছি প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু তবুও কোনো বিপদ হলে তোমার আত্মরক্ষার জন্য এটি সাথে রাখবে সবসময়। "
এই বলে আরোণ খঞ্জরটি ক্যাথরিনে পায়ের রুমালের বাধনের মাঝে সাবধানে বেধে দিয়ে গাউন নামিয়ে পা ঢেকে দেয়। ক্যাথরিনের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে। আরোণ উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
" ক্রিয়াস নিচে অপেক্ষা করছে। আর দেরি না করি। চলো। "
ক্যাথরিন একটি লম্বা ক্লক নিয়ে পড়তে থাকে। আরোণ বিছানার উপর রাখা ক্যাথরিনের থলে একহাতে নিয়ে আরেক হাতে ক্যাথরিনের হাত ধরে কক্ষ থেকে বের হয় সাবধানে। এই মুহুর্তে এখানে কারো থাকার কথা নয়। তবুও খুব সাবধানে একবার চারিপাশ দেখে ক্যাথরিনকে নিয়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে সে। ক্যাথরিন প্রশ্ন করে,
" তোমার কিছু নেওয়ার বাকি? তোমার কক্ষে কেন আসলাম আমরা? "
আরোণ কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে তার কক্ষের আলমারির সামনে দাঁড়ায়। আলমারির পাশে থাকা দেওয়ালের একটা বিশাল পাথর ধরে আরোণ টান মারতেই দেওয়ালের অংশ দু দিকে সড়ে গিয়ে একটি সুরঙ্গ সিঁড়ি দেখতে পায় ক্যাথরিন। ক্যাথরিন অবাক হয়ে কিছু প্রশ্ন করার আগেই আরোণ তাড়াতাড়ি তার কক্ষ হতে একটি লণ্ঠন হাতে নিয়ে ক্যাথরিনকে নিয়ে সেই সুরঙ্গের ভেতর প্রবেশ করে সেই প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আরেক দফা আরোণ একইভাবে পাথরটান দিয়ে দেওয়ালের একাংশ খুলে দেয়। এবার দেওয়াল সরতেই ক্যাথরিন দেখে ক্রিয়াস একটি কালো রঙের ঘোড়া নিয়ে দাঁড়ানো বাহিরে। জায়গাটা কিছুটা জঙ্গলের মতো। প্রাসাদের সামনে দিয়ে বের হওয়ার সময় এমন জায়গা কোথাও দেখে নি ক্যাথরিন। এটা হয়তো প্রাসাদের পিছনের দিকের রাস্তা। আরোণ তড়িঘড়ি করে ক্যাথরিনকে বলে,
" আমার পথ এটুকুই ছিলো। বাকি পথে ক্রিয়াস তোমার সাথে থাকবে। ও যেভাবে বলবে সেভাবে থাকবে। আর কাউকে বিশ্বাস করবে না। "
একটু দম নিয়ে আরোণ আবার বলে,
" এই ঘোড়া তোমার জন্য। খুব সহজে পোষ মানে। যেভাবে চালাবে সেভাবেই বাধ্যের মতো পথে চলবে। "
ক্যাথরিন প্রশ্ন করে,
" এর নাম কি? এটা তোমার ঘোড়া? "
আরোণ অকপটে জবাব দেয়,
" তোমার ঘোড়া আজ থেকে ও। তুমি যা ডাকবে তাই ওর নাম হবে। "
আরোণের এমন উত্তরে ক্রিয়াস চমকে তাকায়। আরোণ ক্রিয়াসের দৃষ্টি লক্ষ্য করে ঠান্ডা গলায় বলে,
" ওর কোনো ক্ষতি হলে আমি জবাবদিহিতা নিবো না ক্রিয়াস। জীবন নিবো। "
ক্রিয়াস মাথা ঝুঁকিয়ে আস্বস্ত করে বলে,
" আপনার আমানত হেফাজতের জন্য যা করণীয় সব করবো আলফা। "
আরোণ আর কথা না বাড়িয়ে ক্যাথরিনকে তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় উঠতে সাহায্য করে। ক্রিয়াস মুহূর্তেই রূপ বদলে নেকড়ে রূপ ধারণ করে। ঘোরায় উঠে ক্যাথরিন একবার আরোণের দিকে তাকায়। আরোণের বিচলিত দৃষ্টিতে হাজারটা অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে। ক্যাথরিন মনে মনে ভাবে ভালোবাসার হাজারটা রূপ থাকে। কিন্তু একজন নেকড়ের ভালোবাসা কেমন হয়? একজন হিংস্র নেকড়ের হৃদয়ও কি ভালোবাসা হারানোর ভয়ে দগ্ধ হয়? ক্যাথরিনের ভাবনার মাঝে আরোণ ক্যাথরিনের এক হাতের উপর হাত রেখে বলে,
" খেয়াল রেখো ক্যাথ! "
ক্যাথরিন কিছুক্ষণ আরোণের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
" এই ঘোড়ার নাম আজ থেকে ভ্যালেন্টাইন৷ "
চলবে…