ফন্ট সাইজ:
থিম:
মহাপ্রয়াণ

৩১তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

মহাপ্রয়াণ

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩১.

বাসকোভ প্রাসাদের হলরুমে আজ পিনপতন নীরবতা। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। ক্রিয়াস হলরুমে প্রবেশ করতেই আরোণ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। ক্রিয়াস আস্বস্ত করে বলে,

" লোল্যান্ডা আছে ক্যাথরিনের পাশে। "

আরোণ চুপচাপ বসে থাকে। হঠাৎ হলরুমের সকল নেকড়েরা এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আরোণ সামনে তাকিয়ে অবাক হয়। প্রশ্ন করে,

" কি করছো তোমরা? "

নেকড়েদের মাঝে একজন বলে,

" আমাদের জন্য ক্যাথরিন আপনাকে ঘৃণা করে। আমাদের ক্ষমা করুন আলফা। ওর মা বাবার খুনী আমরা ছিলাম, আপনি নন। "

আরোণ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

" খুনি এবং খুনের আদেশদাতা উভয়ই অপরাধী হয়। তোমাদের আর কি দোষ বলো? তোমরা তো কেবল আমার আদেশ পালন করো। "

ক্রিয়াস বলে উঠে,

" আপনি বললে আমরা সবাই মিলে ক্যাথরিনের কাছে ক্ষমা চাইবো আলফা। সকল শাস্তি মাথা পেতে নিবো। তবুও আপনাদের মাঝের ভুল বুঝাবুঝি দূর করবো আমরা। "

সকলেই একমত পোষণ করে। আরোণ হালকা হাসে। উঠে দাঁড়িয়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে সে বলে,

" নেকড়েদের জীবনে ভালোবাসা হচ্ছে অভিশাপ। আর আমি সেই অভিশাপে অভিশপ্ত। "

এটুকু বলে হলরুম থেকে বেরিয়ে পড়ে আরোণ। সকলেই তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার পানে। তাদের আলফাকে তারা কখনো পরাজিত হতে দেখে নি। কিন্তু অতিতে যত নেকড়েকে তারা ভালোবাসতে দেখেছে তারা সকলেই পরাজিত হয়েছে। ক্রিয়াস মনে মনে প্রার্থনা করে,

" আলফা যেন পরাজিত না হয়। "

__________

" সকল নারী কোভেনদের মেরে ফেলো। "

ম্যাথিউর কথা শুনে ভ্রু কুচকে তাকায় রিকার্ডো। ম্যাথিউ নিজেই আবার বলে,

" কোনো নারী ভ্যাম্পায়ার না থাকলে জ্যাকসনের সন্তান কে গর্ভে নিবে? তখন জ্যাকসনের হাইব্রিডে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যাবে। "

" আমার সাথে ঠাট্টা করছিস তুই? "

" তোমার সাথে আমার সম্পর্ক কি ঠাট্টা করার? "

" তাহলে আজেবাজে না বকে আমার কক্ষ থেকে বের হ। "

" আমি তোমার আদেশ মানতে বাধ্য নই। "

রিকার্ডো রেগে বলে উঠে,

" তুই কোভেনদের সদস্য। আর আমি তোর কাউন্ট। তাই তুই আমার আদেশ মানতে আলবাত বাধ্য। "

" তোমার এই এক কথা শুনতে শুনতে কান পঁচে গেলো আমার। নতুন কিছু বলো তো। "

রিকার্ডো বিরক্ত হয়ে আর কিছু বলে না। এই ছেলের সাথে কথা বলে লাভ নেই। সে নিজের তৈরি হওয়াতে মন দেয়। আজ অমাবস্যার রাত। এই রাতে ভ্যাম্পায়ারদের এখানে একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। সকল কোভেনদের উপস্থিতিতে যেকোনো সাতজন ভৃত্যকে ভ্যাম্পায়ারে রূপান্তর করা হয়। সেই সাতজন ভৃত্য অবশ্যই নিজ ইচ্ছায় ভ্যাম্পায়ার হওয়ার আবেদন জানায়। আর তাদের ভ্যাম্পায়ারে পরিণত করে রিকার্ডো নিজে।

তৈরী হয়ে হলরুমে একসাথে প্রবেশ করে রিকার্ডো এবং ম্যাথিউ। যে যার আসনে গিয়ে বসে পড়ে। রিকার্ডো একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। হলরুমে এখন সকল ভ্যাম্পায়ার এবং ভৃত্য উপস্থিত আছে। কেবল আনাস্তাসিয়া নেই। রিকার্ডো চোখের ইশারায় একজন ভৃত্যকে কাছে ডাকে। তারপর তার কানে কানে কিছু একটা বলে। সেই ভৃত্যটা বেরিয়ে যেতেই রিকার্ডো আবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। ক্যামিলো এবং ড্যানিয়েলও উপস্থিত নেই এখানে। আজকের রাতে তাদের শিকারে বের হতে কে বলেছিলো? এই রাতে সকলেরই এখানে উপস্থিত থাকা উচিত। নিশ্চিত ড্যানিয়েলই নিজের সাথে ক্যামিলোকে নিয়ে গিয়েছে। তারা ফিরলে তাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবে বলে ঠিক করে রিকার্ডো।

__________

ঘুমঘুম চোখে বিছানায় বসে টলছে আনাস্তাসিয়া। চোখেমুখে বিরক্তিও ফুটে আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জোসেফকে তার মন চাচ্ছে জানালা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে। ঘুমের মাঝে কারো বিরক্ত করাটা তার মোটেও পছন্দ নয়। জোসেফ আবার চেচিয়ে বলে,

" এই মেয়ে। উঠে চোখেমুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে আমার সাথে চলো। কাউন্ট সেই কখন ডেকে পাঠিয়েছে। যেই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছিলে তোমাকে ডেকে তুলতেই কত সময় পেরিয়ে গিয়েছে। "

আনাস্তাসিয়া একবার চোখ তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার বাহিরে। একদম মাঝরাত এখন। সে বিরক্ত স্বরে বলে,

" তোমার কাউন্ট ভ্যাম্পায়ার হতে পারে আমি না। সাধারণ মানুষের এটা ঘুমানোর সময়। তার যদি এই মাঝরাতে গোসল করার শখ জাগে তাহলে তাকে বলো তার প্রিয় কৃষ্ণ সাগরে গিয়ে ডুব দিয়ে গোসল করতে। আমি এই মাঝরাতে তার জন্য গিয়ে গোসলখানা তৈরী করতে পারবো না। "

এটুকু বলেই আনাস্তাসিয়া চাদর টেনে শুয়ে পড়ে। জোসেফ চেচিয়ে উঠে,

" এই মেয়ে। এক লাইন বেশি বুঝা কি তোমার স্বভাব? উঠো বলছি। কাউন্ট অপেক্ষা করছে। "

আনাস্তাসিয়া শোয়া থেকে লাফিয়ে বিছানার উপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

" এই মেয়ে বলে কাকে ডাকো তুমি? হ্যাঁ? আনাস্তাসিয়া আমার নাম। আমার নাম ধরে ডাকবে। আর তোমার কাউন্টের কোনো আদেশ নিয়ে আমার সামনে বেশি ভাষন দিতে আসলে তোমাকে তুলে নিচে ছুড়ে ফেলবো। একদম তোমার কাউন্টের কোলে গিয়ে পড়বে তুমি। "

আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে জোসেফ বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়া তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বলে উঠে,

" আমার ঘুমের সমাধি হয়ে গিয়েছে। জেগে থেকে কি আর করবো এখন। তুমি বাহিরে অপেক্ষা করো আমি তৈরি হয়ে আসছি। দেখি তোমার কাউন্টের মাঝরাতে কি ব্যামো হয়েছে। "

জোসেফ চুপচাপ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পরই আনাস্তাসিয়া বেরিয়ে এসে চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে হাঁটা ধরে। জোসেফও পিছনে পিছনে নামতে থাকে। আনাস্তাসিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করে,

" তোমার পরিবার নেই? "

" আছে। "

" কে কে আছে পরিবারে? "

" স্ত্রী, সন্তান। "

" তাহলে তুমি বাসায় যাও না? "

" যখন প্রয়োজন পড়ে যাই। "

" এই দূর্গে সব কি শুধু পুরুষ ভৃত্য? "

" দাসীও আছে। কিন্তু তারা সন্ধ্যার আগেই নিজেদের বাড়ি ফিরে যায়। "

আনাস্তাসিয়া হালকা চেচিয়ে বলে,

" তার মানে এই মুহুর্তে এই প্রাসাদে কেবল আমিই একমাত্র মানব কন্যা? "

" হ্যাঁ। "

আনাস্তাসিয়া আর কোনো প্রশ্ন করে না। চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে নিচে চলে আসে। হলরুমে প্রবেশ করতেই সবাইকে দেখে সে অবাক হয়ে যায়। জোসেফকে নিচুস্বরে প্রশ্ন করে,

" এই এতো রাতে সবাই এখানে কি করছে? "

জোসেফ কিছু বলার আগেই রিকার্ডো চোখের ইশারায় তাদের একপাশে দাঁড়াতে বলে। জোসেফ আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে বাকি ভৃত্যদের সাথে একদিকে গিয়ে দাঁড়াতে নিবে তখনই হঠাৎ হলরুমের দরজা খুলে বাতাসের বেগে একটি দেহ মাটিতে এসে ছুড়ে পড়ে। আকস্মিক ঘটনায় আনাস্তাসিয়া ভয় পেয়ে ভ্যাম্পায়ারদের সারির দিকে লাফ দিয়ে সড়ে দাঁড়ায়। রিকার্ডো সহ সকল ভ্যাম্পায়াররাই দাঁড়িয়ে পড়ে। হলরুমের মাঝে আহত ড্যানিয়েলের দেহ পড়ে আছে। সে কোনমতে উঠে দাঁড়াতেই হলরুমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে জ্যাকসন। সাথে সাথে সকল ভ্যাম্পায়াররা হিংস্র রূপ ধারণ করে। রিকার্ডো ঝড়ের গতিতে জ্যাকসনের উপর হামলা করে। এক হাতে তাকে তুলে ছুড়ে তাকে আরেক দেয়ালের কাছে নিয়ে ফেলে। জ্যাকসনের এতে কোনো ভাবান্তর হয় না। উল্টো সে হাসতে থাকে। রিকার্ডো আবার আঘাত করবে তার আগেই ড্যানিয়েল বলে উঠে,

" ক্যামিলো জ্যাকসনের কাছে বন্দী। "

সাথে সাথেই রিকার্ডো থেমে যায়। জ্যাকসন হেসে বলে উঠে,

" কাউন্ট রিকার্ডো। আমি আশা করেছিলাম আপনি আরো সুন্দর করে আমায় স্বাগতম জানাবেন। "

রিকার্ডো চোয়াল শক্ত করে বলে,

" কি চাচ্ছিস তুই? "

" চিন্তা করবেন না। চিন্তা করার কিছুই নেই। আমি আপনার মা কে অবশ্যই ফিরিয়ে দিবো। শুধু বিনিময়ে আমি এখান থেকে একজন নারী ভ্যাম্পায়ারকে বন্দী করে নিতে চাই। "

রিকার্ডো সহ সকল কোভেনরাই বুঝে যায় জ্যাকসনের উদ্দেশ্য কি। ম্যাথিউ বলে,

" জানোয়ারের বাচ্চা তুই ভ্যাম্পায়ারদের সাথে চুক্তি করতে এসেছিস? মেরে তোকে এমনভাবে গুম করবো কেউ তোর অস্তিত্বও খুঁজে পাবে না। "

জ্যাকসন ম্যাথিউর কথায় বিশেষ একটা পাত্তা দেয় না। উল্টো সকল কোভেনদের দিকে একবার তাকিয়ে বাতাসের গতিতে গিয়ে আনাস্তাসিয়াকে ধরে ফেলে। আনাস্তাসিয়া ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। জ্যাকসন বলে,

" এই মেয়েটাকে চাই আমার। কি সুন্দর জেসমিনের ঘ্রাণ ভেসে আসছে এর শরীর থেকে। "

আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে যায় সে বিকেলে জোসেফকে দিয়ে জেসমিন ফুল আনিয়েছিলো৷ তার কক্ষের জানালা দিয়ে দূর্গের প্রধান ফটকের দিকে যখন তার চোখ পড়ে তখন দেখে ফটকের দুপাশে গাছে ঝাকে ঝাকে জেসমিন ফুল ধরে আছে। সেই ফুল দিয়ে সে একধরণের সুগন্ধি বানিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে লাগিয়েছিলো। আনাস্তাসিয়ার ভাবনায় ফোড়ন কাটে ম্যাথিউর কথায়,

" মরার খুব শখ জেগেছে তোর? "

জ্যাকসন রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে,

" আপনার নিজের মা চাই নাকি সামান্য এক কোভেন নারী? "

রিকার্ডোসহ সকলেই বুঝতে পারে জ্যাকসন আনাস্তাসিয়াকে কোভেনদের সদস্য মনে করছে। তার শরীর থেকে আসা জেসমিনের তীব্র ঘ্রাণের ফলে তার মানব ঘ্রাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। রিকার্ডো স্পষ্ট বলে দেয়,

" নিয়ে যা এই মেয়েকে। কিন্তু আমার মা যেন দূর্গে ফিরে আসে। "

ম্যাথিউসহ হলরুমে উপস্থিত কেউই অবাক হয় না। সকলেই খুব ভালো করে জানে এই সামান্য মেয়ের জীবনের পরোয়া করে না রিকার্ডো। কিন্তু অবাক হয় আনাস্তাসিয়া। তার চোখে মুখে বিস্ময়। তার মনে হয় কেউ যেন তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। রিকার্ডোর দিকে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রিকার্ডো নির্লিপ্ত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে আনাস্তাসিয়ার বাঁচা মরা দিয়ে তার কিচ্ছু আসে যায় না। রিকার্ডোর নির্লিপ্ততা দেখে আনাস্তাসিয়া পরাজিত অনুভব করে। মুখ ফুটে আর কিছু বলে না সে। কোনো প্রতিবাদও করে না। জ্যাকসন সবার সামনে থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় কিন্তু একজনও বাঁধা দিতে আসে না।

আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ম্যাথিউ রাগে চিল্লিয়ে বলে উঠে,

" এই হচ্ছে ভ্যাম্পায়ারদের ক্ষমতা? শেষমেশ আমাদের এখন এই জ্যাকসনের মতো এক ময়লা নর্দমার কীটের সাথে চুক্তি করতে হবে? "

রিকার্ডো শান্ত ভঙ্গিতে বলে,

" জ্যাকসন একটা মূর্খ। নিজের মূর্খতার প্রমাণ দিয়ে গেলো সে এইমাত্র। ভ্যাম্পায়ারের জায়গায় এক মানুষ তুলে নিয়ে গিয়েছে সে। আমাদের কিছু করতে হবে না আর। মাও এখন ফিরে আসবে দূর্গে আর জ্যাকসনের ইচ্ছেও পূরণ হবে না। "

ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,

" আর আনাস্তাসিয়া? তার কি হবে? "

" মরুক সে। আমার কি আসে যায় তাতে? "

ম্যাথিউ এমন উত্তরের প্রত্যাশাই করছিলো। সে জানে এখানে কারো কিছু আসে যায় না আনাস্তাসিয়ার কি হলো তা দিয়ে। ম্যাথিউ চুপচাপ ফোসফাস করতে করতে বেরিয়ে যায়। জোসেফের যেন হালকা মন খারাপ হলো। আনাস্তাসিয়ার সাথে কি হতে পারে তা নিয়ে ভাবতেই তার খারাপ লাগছে। জ্যাকসন যখন উপলব্ধি করবে আনাস্তাসিয়া কোনো ভ্যাম্পায়ার না তখন নিজের সকল রাগ জেদ সে আনাস্তাসিয়ার উপর বের করবে সে।

সবার চক্ষুগোচরে ড্যানিয়েলের বিরক্তিতে মুখ দিয়ে একটি বিশ্রী গালি বেরিয়ে আসে। এই মূর্খ জ্যাকসন কিনা হাইব্রিড হতে চায়? যার কিনা সামান্য মানুষ এবং ভ্যাম্পায়ারদের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা নেই। জ্যাকসনের সাথে হাত মিলানোটাই তার ভুল হয়েছে। ক্ষমতার লোভে মূর্খের সাথে হাত মিলিয়ে বিপদ বাধানোটা বোকামি হবে।

__________

লোল্যান্ডাকে জোর করে কক্ষ থেকে বের করে দেয় ক্যাথরিন। সেই কখন থেকে সে বাহির থেকে দরজার কড়া নেড়ে যাচ্ছে। ক্যাথরিন কোনো প্রতুত্তর করছে না। প্রহরী নেকড়ে দুজন একবার লোল্যান্ডাকে বলেছে তারা কি দরজা ভাঙবে? কিন্তু লোল্যান্ডা মানা করে দিয়েছে। এসব করলে ক্যাথরিন আরো রেগে যাবে। তার হয়তো এখন একা থাকাই উত্তম হবে। নিজের কক্ষে প্রবেশ করছিলো আরোণ কিন্তু ক্যাথরিনের কক্ষের সামনে থেকে শব্দ পেয়ে সেদিকে ছুটে আসে সে। এসেই দেখে লোল্যান্ডা এবং প্রহরী দুজন দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। আরোণকে দেখে লোল্যান্ডা বলে উঠে,

" দরজা খুলছে না আলফা। "

আরোণ হালকা করে বলে,

" তোমরা যেতে পারো। "

লোল্যান্ডা এবং প্রহরীরা চলে যেতেই আরোণ দরজার কাছে এসে হালকা স্বরে ডাকে,

" ক্যাথ। "

ভেতর থেকে কোনো প্রতুত্তর ভেসে আসে না। আরোণ আর কোনো কথা না বলে দরজার সাথে পিঠ করে বসে পড়ে। তারপর নিজে একাই বলতে শুরু করে,

" আমি জানি দরজার ওপারে তুমি এখন বসে আছো আর আমার কথা শুনতে পাচ্ছো। বিশ্বাস করো ক্যাথ আমার কাছে যদি এমন কোনো শক্তি থাকতো যা দিয়ে আমি তোমার কষ্ট একাংশও দূর করতে পারতাম তাহলে বিনা সময় ব্যয়ে এক্ষুনি আমি তা করতাম। আমি জানি তোমার কাছে আমি নিকৃষ্ট কোনো জানোয়ারের থেকে কম নই। আমিও নিজেকে তাই মনে করি। কিন্তু আমার কি দোষ বলো? আমার এই জীবন তো আমি সাদরে গ্রহণ করি নি। আমার পিতার লোভের শাস্তি হিসেবে আমি এই জীবন পেয়েছি। নিজের হিংস্রতা এবং নেকড়ে সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে আসি সিবিউর এই গহীন অরণ্যে৷ অরণ্যের গহীনে আবিষ্কার করি পরিত্যক্ত এই বাসকোভ প্রাসাদ। ধীরে ধীরে হয়ে উঠি এই বাসকোভ প্রাসাদ এবং নেকড়েদের আলফা। এই অরণ্যের মালিক। যেই অরণ্যকে সকলে ভয়ে পরিত্যাগ করেছে আমি সেই অরণ্যকে আপন করে নিয়েছি৷ এইসব কিছুই আমি মন থেকে করিনি। বাধ্য হয়ে করেছি। তারপর একদিন শত্রুকে তাড়া করতে আমি এই অরণ্য ছেড়ে বের হই। পাশের দেশে গভীর রাতে শত্রুকে খুঁজে ফিরতে গিয়ে তোমাকে খুঁজে পাই। আমার হিংস্র হৃদয় মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তোমার দখলে চলে যায়। আমার হৃদয়ের হিংস্র ঝড়ের তান্ডব শীতল হাওয়ায় বদল হয়৷ "

এই পর্যায়ে আরোণ একটু থামে। দম নেয়। এতক্ষণ কথা বলার সময় তার কণ্ঠনালীতে সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করছিলো সে। কিন্তু এখন সেই ব্যথা অনেকাংশেই কমে আসছে। দরজার ওপাশ থেকে ক্যাথরিনের ফুপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। আরোণ আবার বলা শুরু করে,

" তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে না আমি তোমাকে ভালোবাসি নাকি? "

এবার অপাশ থেকে কান্নার শব্দ কমে আসে। আরোণ স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দেয়,

" আমি তোমাকে ভালোবাসি ক্যাথ। এই তিনটি শব্দ আমার কাছে কম মনে হচ্ছে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়ার জন্য। তবুও আমি বলছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার একটি সত্ত্বা যেমন শুধু হিংস্রতার জন্যই সৃষ্টি, তেমন আমার আরেকটি সত্ত্বার সৃষ্টি কেবল তোমায় ভালোবাসার জন্য। তুমি আমার জীবনে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছ যে এখন তোমায় ছাড়া জীবন কল্পনা করলে আমি শুধু একটাই উত্তর পাই। মৃত্যু। জীবন এবং মৃত্যু দুটোকে সাক্ষী রেখে আমি বলছি, আমি তোমায় ভালোবাসি। "

ওপাশ থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে আরোণ উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পিছন থেকে দরজা খোলার শব্দ পায় সে। সম্পূর্ণ শরীর ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায় সে। ক্যাথরিন দরজা খুলেছে। আরোণ তাকাতেই দুজনের দৃষ্টি মিলন হয়। আরোণ দুকদম এগিয়ে যায়। বারান্দার দরজা দিয়ে আসা ফিনফিনে বাতাসে ক্যাথরিনের দু একটা চুল উড়ছে। আরোণ এগিয়ে আসতেই ক্যাথরিন বলে,

" আমিও তোমাকে ভালোবাসি আরোণ। "

এটুকু বলেই আরোণের বুকে মুখ গুজে ক্যাথরিন। আকস্মিক ঘটনায় আরোণ নির্বাক হয়ে রয়। ক্যাথরিনের এই ছোট স্বীকারোক্তি যেন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে তাকে ছুঁয়ে গেলো। ক্যাথরিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলে,

" সবাইকে হারিয়েছি আমি। তোমার প্রতি ভালোবাসা আর অস্বীকার করা সম্ভব নয় আমার দ্বারা। তোমাকে হারাতে পারবো না আমি। পাহাড়সম পাপ যদি ঈশ্বর ক্ষমা করতে পারে তাহলে আমি কেন তোমায় ক্ষমা করতে পারবো না? সবাইকে হারানোর যন্ত্রণায় কাতর আমি। তোমাকে আঁকড়ে বাঁচতে চাচ্ছি। তুমি হারিয়ে যেও না অন্তত। "

আরোণ দু'হাতে ক্যাথরিনকে আগলে ধরে। তার কপালে অধর ছোঁয়ায়। তারপর বলে,

" পরিণতি যাই হোক শেষ পর্যন্ত ছেড়ে যাবো না কোথাও। নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করছি আজ আমি। আরোণের উপর শুধু তোমার অধিকার আছে। শুধু তোমার। "

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন