ফন্ট সাইজ:
থিম:
মহাপ্রয়াণ

৩৭তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

মহাপ্রয়াণ

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৩৭.

স্তম্ভিত রিকার্ডো তাকিয়ে আছে ক্যামিলোর দিকে। ক্যামিলোর তাকে মাত্র বলা কথায় কিছু একটা ছিলো যা তাকে থামতে বাধ্য করে। ক্যামিলো মাত্র তাকে রিকার্ডো আলবার্ট বলে ডেকেছে? আলবার্ট তো তার পদবি নয়। ড্যানিয়েলের পদবি হলো ডি ক্রুজ। যদিও রিকার্ডো নিজের নামের সাথে ড্যানিয়েলের নামের পদবি যোগ করেনি। তাহলে ক্যামিলো তার নামের সাথে আলবার্ট বললো কেন? রিকার্ডো স্পষ্ট স্বরে প্রশ্ন করে,

" আলবার্ট? "

ক্যামিলো মাথা নেড়ে বলে,

" আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বে এই কক্ষতেই তোর জন্ম হয়েছিল। এই কক্ষেই তোর মা এবং বাবার মৃত্যু হয়েছিলো। "

রিকার্ডো থমকায়। সম্পূর্ণ কক্ষে সে একবার চোখ বুলায়। তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার মা বাবাতো জঙ্গলেই তাকে ক্যামিলোর কোলে তুলে দিয়েছিল। ক্যামিলোও সেখান থেকে রিকার্ডোকে নিয়ে চলে আসে। তাহলে এই কক্ষে তার মা বাবার মৃত্যু কিভাবে সম্ভব? সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় ক্যামিলোর দিকে। ক্যামিলো বলে,

" প্লেগ মহামারি যখন সম্পূর্ণ ট্রান্সিলভেনিয়াকে মাকড়সার জালের মতো আষ্টেপৃষ্টে নিয়েছিলো তখন তোর মা এবং আমি এই দূর্গেই ছিলাম। ড্যানিয়েলও ট্রান্সিলভেনিয়াতেই ছিলো। রাজ্যের বাকি শহরকে রক্ষা করার জন্য ঘোষণা দেয়া হয় যেন ট্রান্সিলভেনিয়াকে রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর মাঝে আমরা জানতে পারি এই প্লেগ রোগ আপনাআপনি ছড়ায় নি৷ এর পিছনে একদল রক্ত পিপাসু পিশাচদের হাত ছিলো। তাদের মূখ্য ছিলেন আদি ভ্যাম্পায়ার। তিনি ট্রান্সিলভেনিয়াতে এই প্লেগ রোগ ছড়িয়ে দেয় যেন সাম্রাজ্য থেকে ট্রান্সিলভেনিয়াকে আলাদা করে দেওয়া হয় এবং তিনি এখানে প্লেগ রোগে মৃত্যুবরণ করা মানুষদের ভ্যাম্পায়ার রূপে পুনরুজ্জীবিত করে কোভেনদের সদস্য সংখ্যা এবং নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। এবং এমনটাই হয় যেমনটা তিনি চাচ্ছিলেন। কিন্তু বিপত্তি বাধে তোর মায়ের বেলায়। এক ভ্যাম্পায়ার তোর মাকে জীবিত অবস্থায় কামড়ে রেখে ফেলে যায়৷ সেই মুহুর্তে তোর মায়ের প্রসব বেদনাও শুরু হয়। আমি এবং ড্যানিয়েল তোর মাকে লুকিয়ে এই গুপ্ত কক্ষে নিয়ে আসি৷ তোর মায়ের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু তখনই দূর্গে তোর বাবা এসে উপস্থিত হয়। ট্রান্সিলভেনিয়াকে সাম্রাজ্য হতে বিচ্ছিন্ন করার পরও তোর বাবা তোর মা এবং তোর টানে বুখারেস্ট ছেড়ে ট্রান্সিলভেনিয়া এসে পৌঁছায়। তারপর তোর বাবা এবং ড্যানিয়েল এই কক্ষের বাহিরে তখন অবস্থান করছিলো এবং এই কক্ষে আমার হাতে ভূমিষ্ট হস তুই। তোর বাবা তোর নাম রাখে রিকার্ডো আলবার্ট। কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝেই দূর্গে ভ্যাম্পায়াররা এসে উপস্থিত হয়। তোর মা তোকে আমার কোলে দিয়ে বলে আমরা যেন তোকে নিয়ে পালিয়ে যাই। তোর বাবা তোর মাকে ছেড়ে পালানোর জন্য রাজি হয় না। তাই বাধ্য হয়ে আমি এবং ড্যানিয়েল তোকে নিয়ে এই দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। "

রিকার্ডোর গলা ধরে আসে। তার মনে পড়ে না সে তার এতো দীর্ঘ জীবনে কখনো কেদেছে নাকি। কিন্তু আজ অনুভূতি দমিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার। গলায় আসা কান্না গিলে নিয়ে সে ভাঙা স্বরে প্রশ্ন করে,

" তারপর? "

" তোর বাবা এবং মা আমাদের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই বিষ খেয়ে ফেলেছিলো। ভ্যাম্পায়াররা এখানে পৌঁছে তোকে না পেয়ে তোর মা বাবার দেহের গর্দান আলাদা করে তাদের পুড়িয়ে ফেলে। আর তোকে খুঁজে পাওয়ার জন্য আমাদের পিছু নেয়। "

রিকার্ডো থমথমে স্বরে প্রশ্ন করে,

" আমাকে তারা কেন খুঁজছিলো? "

" কারণ যেদিন রাতে তোর জন্ম হয়েছিল সেদিন রাতে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহন ছিলো। এবং তুই তোর মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় তিনি ভ্যাম্পায়ারের কামড় খাওয়ায় পেটের ভেতরই তোর মাঝে ভ্যাম্পায়ারের শক্তি সঞ্চার হয়। তুই প্রথম ভ্যাম্পায়ার যে মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হয়েছিস ভ্যাম্পায়ার হয়ে। সেই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহনের রাতে ভ্যাম্পায়ার হয়ে ভূমিষ্ট হওয়ায় তুই বাকি ভ্যাম্পায়ারদের তুলনায় ভিন্ন। তাই তুই আদি ভ্যাম্পায়ারের তুলনায়ও বেশি শক্তিশালী ছিলি। "

এবার রিকার্ডো সবথেকে কঠিন প্রশ্নটা করে বসে ক্যামিলোকে। সে বলে,

" তোমরা আমার মা বাবার সাথে কিভাবে পরিচিত ছিলে? "

ক্যামিলো ছেলের মুখের দিকে তাকায়। রিকার্ডোর শক্ত মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই তার মনের মধ্যে কি চলছে। কিন্তু ক্যামিলো ভালো করেই জানে ছেলের মনে চলা তোলপাড় সম্পর্কে। আজকে তার সত্যিটা জানাতেই হবে রিকার্ডোকে। এটাই সঠিক সময়। ক্যামিলো একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,

" তোর বাবার নাম লিও আলবার্ট এবং তোর মায়ের নাম ম্যারি আলবার্ট। তারা এই রোমানিয়ান সাম্রাজ্যের কাউন্ট এবং কাউন্টেস ছিলেন। হেনরিকসরা এখন যেই সাম্রাজ্য শাসন করছে সেই সাম্রাজ্যের আসল উত্তরাধিকারী তুই। তোর মা বাবার ফেলে যাওয়া এই সাম্রাজ্যের উপর একমাত্র তোর অধিকার। "

রিকার্ডো কিছু বলতে পারে না। তার মস্তিষ্ক ফাঁকা লাগছে। তার মা বাবার পরিচয় তার কাছে ধোয়াশা ছিলো এতো বছর। তবুও সে কখনো কল্পনা করেনি বাস্তবতা এমনও হতে পারে। ক্যামিলো তাকে তার মা বাবা সম্পর্কে যা বলেছিলো তা বিশ্বাস করে সে জীবনের এতো গুলো বছর পার করে দিয়েছে৷ তার মনে পড়ে যায় আনাস্তাসিয়ার বলা সেই কথাটা,

" বিলাসিতা দেখে তো মনে হয় যেন সে নিজেই রোমানিয়ান প্রিন্স কোনো। "

তার ভাবনায় ফোড়ন কাটে ক্যামিলোর কথায়। ক্যামিলো বলে উঠে,

" সেদিন রাতে আমরা এই গুপ্ত কক্ষ হতে বেড়িয়ে জঙ্গলে যখন তোকে নিয়ে পালাচ্ছিলাম তখন ভ্যাম্পায়াররা আমাদের পিছু নেয়। তারা সফলও হয়। তোকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের এই তুষ দূর্গের কারাগারে বন্দী করে। আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম তাই তখন আমাকে ও ড্যানিয়েলকে তারা কিছুই করে নি। কিন্তু একমাস পর যখন ম্যাথিউর জন্ম হয় তখন আমাকে এবং ড্যানিয়েলকেও কামড়ে তারা ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে দেয়। আমি ভেবেছিলাম ভ্যাম্পায়ার হিসেবেও অন্তত বেঁচে থাকলে আমি তোর এবং ম্যাথিউর খেয়াল রাখতে পারবো। কিন্তু আদি ভ্যাম্পায়ার আমাকে এবং ড্যানিয়েলকে নতুন এক পরীক্ষার মুখে ফেলে। সদ্য জন্মানো ম্যাথিউকে ভ্যাম্পায়ার বানানোর জন্য তিনি আমাকে এবং ড্যানিয়েলকে বলে। আমি এবং ড্যানিয়েল রাজি হই নি। তখন তিনি আমাকে ভয় দেখিয়ে বলে যদি আমি ম্যাথিউকে কামড়ে নিজে নিজের ছেলের রক্ত না পান করি তাহলে উনি তোকে মেরে ফেলবে। আমি তোকে জন্ম না দিলেও যেই মুহূর্তে কাউন্টেস ম্যারি তোকে আমার কাছে সঁপেছিলো সেই মুহুর্ত থেকে মনে প্রাণে তোকে নিজের ছেলে মানি। কোন মা পারবে নিজের এক সন্তানকে রক্ষার জন্য অন্য সন্তানকে চোখের সামনে হত্যা হতে দেখতে? ম্যাথিউ যদি আমার নাড়ি ছেড়া ধন হয় তাহলে তুইও আমার আত্মার একটা অংশ। আমি ম্যাথিউকে কামড়াতে অস্বীকৃতি জানালে আদি ভ্যাম্পায়ারের আদেশে একটা দাসী তোর উপর পবিত্র পানি ছিটানো শুরু করে। পানির ঝাপটা তোর ছোট শরীরে পড়তেই তুই গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ছটফট করা শুরু করিস। তোর যন্ত্রণা দেখে না পেরে বাধ্য হয়ে আমি ম্যাথিউর ঘাড়ে কামড় বসাই। আমার কারণে ম্যাথিউ ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়। তখন থেকেই ড্যানিয়েল তোকে ঘৃণা করা শুরু করে। ড্যানিয়েল মনে করতো আমাদের এই দশার জন্য তুই দায়ী। তাই সে কখনো তোকে নিজের সন্তানের মতো কাছে টেনে নেয় নি। সবসময় মনে মনে তোর জন্য ঘৃণা পুষে রাখতো। এমনকি সে ম্যাথিউর বুঝ হওয়ার পর তাকেও জানিয়ে দেয় যে তোর কারণে আমি ম্যাথিউকে কামড়ে ভ্যাম্পায়ার বানাই। এজন্যই আজ এতো বছর ধরে ম্যাথিউ তোকে এবং আমাকে ঘৃণা করে। "

ক্যামিলোর এতসব কথার পিঠে রিকার্ডো কেবল প্রশ্ন করে,

" এসব আমাকে এতো বছর জানাও নি তুমি, তাহলে আজ কেন জানাচ্ছো? "

" কারণ ড্যানিয়েলের ঘৃণা এখন প্রতিশোধে রূপ নিয়েছে। তোকে মারার জন্য ও জ্যাকসনের সাথে হাত মিলিয়েছে। সেদিন রাতে জ্যাকসনের আমাকে বন্দী করার পিছনেও আমি নিশ্চিত ড্যানিয়েলের হাত আছে। আর ও জ্যাকসনকে হয়তো তোর আসল পরিচয়ও জানিয়ে দিবে। "

চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রিকার্ডোর। হাতের মুষ্টি দৃঢ় করে বদ্ধ করে সে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে,

" আমি যদি ড্যানিয়েলকে মেরে ফেলি তাতে তোমার কোনো আপত্তি থাকবে মা? "

ক্যামিলোর বুকে সূক্ষ্ম ব্যথা করে উঠে। ড্যানিয়েল তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা এবং তার স্বামী। সে কখনোই চাইবে না ড্যানিয়েলের কোনো ক্ষতি হোক। কিন্তু সে যেই ড্যানিয়েলকে ভালোবেসেছিলো তার আর বর্তমানের ড্যানিয়েলের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক। ড্যানিয়েল এখন হিংসা, লোভ এবং প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। ক্যামিলো চায় না ড্যানিয়েলের কারণে রিকার্ডোর কোনো ক্ষতি হোক। সে মনের ব্যথা বুকে চাপা দিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,

" না। "

রিকার্ডো এই উত্তরেরই অপেক্ষায় ছিলো। এখন তাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না। সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ক্যামিলো তাকে পিছু ডাকে। রিকার্ডো পিছনে ফিরে তাকাতেই ক্যামিলো হাতের কাঠের বাক্সটা এগিয়ে দেয়। রিকার্ডো প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে ক্যামিলো বলে,

" এটা কাউন্টেস ম্যারির। তোর জন্য তিনি নিজের শেষ স্মৃতি হিসেবে এটা দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি এতো বছর আমানত হিসেবে এটা সামলে রেখেছি। আজ থেকে তোর আমানত তোর কাছে থাকবে। "

রিকার্ডো কাঠের বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলে দেখে ভিতরে একটি কালো মুক্তা পাথরের লকেট। নিজের মায়ের লকেট হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখে সে। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে রিকার্ডো। নিজের মাকে কখনো সে দেখার সুযোগ পায় নি কিন্তু এই লকেটটা হাতে নিয়ে তার মনে হচ্ছে সে তার মাকে অনুভব করতে পারছে। রিকার্ডোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। রিকার্ডোকে হাসতে দেখে ক্যামিলোর মন খুশি হয়ে উঠে। মনে মনে সে বলে,

" কাউন্টেস ম্যারি, রিকার্ডো হাজার হলেও আপনারই ছেলে। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয় ওর মনটাও আপনার মতো নরম। কিন্তু এই নরম মনই এক শক্ত খোলসের আবরণে ঢাকা পড়ে ছিলো এতো বছর। আজ আপনার রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি হাতে পেতেই সে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা শুরু করেছে। আমার শুধু একটাই ইচ্ছে, ঠিক আপনার মতোই সুন্দর মনের একজন রিকার্ডোর জীবনে আসুক৷ ওকে সেই শক্ত খোলসের আবরণ থেকে পুরোপুরি বের করে জীবনের সকল সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় করাক। আপনার এবং কাউন্টের মতো আরো একটি সুন্দর প্রণয়কাব্য রচিত হোক রিকার্ডোর জীবনে। "

ক্যামিলোর এসব ভাবনার মাঝেই আচমকা রিকার্ডো তাকে জড়িয়ে ধরে। ক্যামিলো হেসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতেই রিকার্ডো বলে উঠে,

" অসংখ্য ধন্যবাদ মা। "

__________

বারান্দার এক কোণে থাকা আরামকেদারার উপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে আনাস্তাসিয়া। আজ রাতে তার ঘুম উড়ে গিয়েছে। বোনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার অস্থিরতা থেকেই হয়তো। জুন এবং জেনিকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আবার জঙ্গলের দিকে গিয়েছিলো সে। সেখানে ক্যাথরিন তাকে সব খুলে বলে। আরোণের ব্যাপারেও সব জানায় তাকে। প্রথমে যখন আনাস্তাসিয়া শুনে আরোণ একজন নেকড়ে তখন সে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু ক্যাথরিন তাকে আস্বস্ত করে যে আরোণের সাথে সে সম্পূর্ণ নিরাপদ। আরোণ এবং নিজের ভালোবাসা সম্পর্কেও জানায় ক্যাথরিন। আনাস্তাসিয়া চাইলেও বোনকে আরোণের থেকে দূর হওয়ার পরামর্শ দিতে পারে না। সে নিজেই এক ভ্যাম্পায়ারকে ভালোবেসে বসে আছে, ক্যাথরিন তাহলে এক নেকড়ে মানবকে ভালোবাসলে সমস্যা কোথায়?

এসব ভাবতে ভাবতেই মন খারাপ হয়ে আসে আনাস্তাসিয়ার। ক্যাথরিন তাকে সব কিছু খুলে বলেছে। কিন্তু আনাস্তাসিয়া কথা লুকিয়েছে। সে রিকার্ডো সম্পর্কে কিছুই ক্যাথরিনকে জানায় নি। ক্যাথরিন যখন তাকে প্রশ্ন করে সে রোমানিয়ায় কিভাবে পৌঁছেছে, তখন আনাস্তাসিয়া তাকে জানায় যুদ্ধের সময় তাকে তুলে আনা হয় রোমানিয়ায় এবং একটি দাস বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই জোসেফ তাকে কিনে বাসায় নিয়ে আসে। এই কথা শুনে আঁতকে উঠেছিলো ক্যাথরিন। আরোণও তাকে বলেছিলো আনাস্তাসিয়া চাইলে তাদের সঙ্গে যেতে পারে। কিন্তু আনাস্তাসিয়া রাজি হয় নি৷ সে তাদের জানায় এখানে কেউ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে না এমনকি তাকে দিয়ে কোনো কাজও করায় না। জোয়ান্দ্রা তাকে কতটা ভালোবাসে তাও জানায় সে। তারপর তারা ঠিক করে আগামীকাল আবার তারা জঙ্গলে দেখা করতে যাবে।

আনাস্তাসিয়া আসলে রিকার্ডো থেকে দূর হয়ে যাওয়ার ভয়ে ক্যাথরিনের সাথে যেতে রাজি হয় নি। রিকার্ডো যদি কখনো তাকে খুঁজতে আসে এবং এখানে না পায়? আর তাছাড়াও আনাস্তাসিয়া যতটুকু বুঝেছে তাতে এটুকু স্পষ্ট যে ভ্যাম্পায়ার এবং নেকড়েদের মাঝে কোনো ঝামেলা আছে। সে চায় না মোটেও তার কারণে রিকার্ডো এবং আরোণ সামনাসামনি আসুক। কাল ক্যাথরিনের সাথে দেখা হলে সে আলাদা করে এই বিষয়ে খুলে বলবে তাকে। তারা দুই বোন মিলে নিশ্চয়ই কোনো একটা বিহিত করতে পারবে।

হঠাৎ এক দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় আনাস্তাসিয়াকে। তুষার ঝড় হবে নাকি? আনাস্তাসিয়া উঠে বাসার ভিতরে ফিরে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ তার মনে হয় দূর হতে কেউ তাকে দেখছে। আনাস্তাসিয়া চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। তার চোখ গিয়ে আটকায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল নরওয়ে স্প্রুস গাছটির দিকে। আনাস্তাসিয়া সেদিকে তাকাতেই বাতাসের মতো তীব্র গতিতে একটি ছায়া সেখান থেকে দৌড়ে পালায় জঙ্গলের দিকে। আনাস্তাসিয়া বাহিরের দমকা হাওয়ার এবং তুষার ঝড়ের পরোয়া না করে বারান্দা হতে একটি লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে পড়ে। সেই ছায়াটি যেদিকে গিয়েছে আনাস্তাসিয়াও সেই পথ ধরে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে এগিয়ে যায়। অনেকক্ষণ দৌড়ে জঙ্গলের অনেকটা ভিতরে আসার পরও আনাস্তাসিয়া আর কাউকে দেখতে পায় না। কিন্তু তার স্পষ্ট মনে আছে সে একটি ছায়াকে এদিকে দৌড়ে আসতে দেখেছিলো।

লণ্ঠনের আলোয় চারিদিকের ঘুটঘুটে অন্ধকার তেমন একটা ঘুচছে না। তাড়াহুড়ো করে আসার চক্করে ক্লক বা চাদর কিছুই সাথে করে আনেনি আনাস্তাসিয়া। ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিপত্তি বাধে। তীব্র বেগে তুষার ঝড় শুরু হয় হঠাৎ করে। আনাস্তাসিয়া দৌড়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বাতাসের দমকে আরো কয়েক কদম পিছিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে বরফে পা পিছলে সে নিচে পড়ে যায়। আনাস্তাসিয়ার রাগ হয়। সে রিকার্ডো ভেবে সেই ছায়ার পিছু নিয়ে এখানে এসে ভুল করেছে। অন্তত আসার আগে একবার তার আবহাওয়ার কথা ভাবা উচিত ছিলো। আনাস্তাসিয়ার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ কিছু একটা ভাঙার শব্দ হয়। সে মাথা তুলে উপরে তাকাতেই দেখতে পায় বিশাল এক গাছের ডাল ঝড়ের প্রকোপে ভেঙে যাওয়ার অবস্থা প্রায়। বাতাসের তীব্রতায় চোখ খুলেও তাকিয়ে থাকতে পারছে না সে। আরেকটু জোরে ডালটা দোল খেয়েই ভেঙে পড়ে। আনাস্তাসিয়া দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চোখ বুজে ফেলে ভয়ে। ডালটা তার উপর পড়ার আগেই আচমকা কেউ একজন তার কোমর জড়িয়ে ধরে কয়েকটা ডিগবাজি দিয়ে তাকে দূরে নিয়ে আসে। আনাস্তাসিয়া সেই একজনের বুকে চোখ বুজে লেপ্টে থেকেই অস্ফুটে বলে উঠে,

" রিক। "

আজকে ধরা খেয়ে রিকার্ডোর মুখে বিরক্তি নেই। উল্টো হালকা হাসে সে। আরেকটু শক্ত করে একহাতে আনাস্তাসিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে আরেকহাত দিয়ে তার মাথা বুকের সাথে চেপে ধরে। ফিনফিনে এক হালকা গোলাপি গাউনে শীত মানছে না আনাস্তাসিয়ার। থেকে থেকে রিকার্ডোর বুকে কেপে উঠছে সে। রিকার্ডো ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

" ভয় নেই নাসিয়া। আমি আছি। "

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন