ফন্ট সাইজ:
থিম:
মহাপ্রয়াণ

৫৪তম পর্ব

লেখক: নাফিসা তাবাসসুম খান

মহাপ্রয়াণ

লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান

৫৪.

বুখারেস্ট প্রাসাদকে ঘিরে আজ উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দুপুরের দিকে প্রাসাদে এসে পৌঁছেছে আনাস্তাসিয়া, ক্যাথরিন, আরোণ, ক্যামেলিয়া সহ সকল নেকড়েরা। আনাস্তাসিয়াকে ফিটনে করে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে আনা হয়েছে। তাই প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে ভিড় করে থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রজাই তাদের হবু কাউন্টেসকে দেখতে পারে নি। প্রাসাদে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত একবারো রিকার্ডোর সাথে দেখা হয়নি আনাস্তাসিয়ার। সবার মুখেই একটাই কথা বিয়ের লগ্নের আগে কেউ কাউকে দেখতে পারবে না। এদিকে আনাস্তাসিয়ার চোখ জোড়া যে ব্যকুল হয়ে কেবল তার প্রেমিক পুরুষকেই খুঁজে চলেছে এটা সকলের অজানা। গোধূলি লগ্নে আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডোর বিয়ে পড়ানো হবে।

আনাস্তাসিয়া এসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই দাসীরা এসে তাকে গোছলের জন্য নিয়ে যায়। এই প্রাসাদেও তুষ দূর্গের মতো গোছল করার জন্য বিশেষ জায়গা রয়েছে। এক বৃহৎ কক্ষের মধ্যিখানে বিশাল পুকুরের ন্যায়। সেই ধবধবে পানির উপর ভেসে আছে বিভিন্ন ধরনের ফুল। কক্ষের চারিদিকেই রয়েছে অসংখ্য সাদা পর্দা। তবে এই গোছলখানা কেবল কাউন্ট এবং কাউন্টেসের ব্যবহারের জন্যই। দাসীরা খুব যত্ন নিয়ে গোছল করায় নববধূকে।

__________

শুভ্র রঙের গাউন পড়ে আয়নায় নিজেকে বারবার ঘুরেফিরে দেখছে আনাস্তাসিয়া। গাউনের হাতার দিকটা কেবল চিকন একটি ফিতা দ্বারা তৈরি করা। যার ফলে আনাস্তাসিয়ার দু'হাতই সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার সোনালী চুলের বাহার। সেই চুলে সাদা হীরের পাথরের অলংকার দ্বারা সজ্জিত। কোমরে চিকন হীরের কোমরবন্দ পড়েছে। গাউনের পিছনের নিচের অংশ বেশ লম্বা। কক্ষের অর্ধেক মেঝে জুড়ে তা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে তাকে অপ্সরার ন্যায় দেখাচ্ছে৷ তবুও আনাস্তাসিয়ার মনে হচ্ছে কিছু একটা বাকি এখনো। আয়নায় নিজেকে দেখে তাই মনে করার চেষ্টা করছে সে। তখনই দরজায় করাঘাতের শব্দ হয়। আনাস্তাসিয়া অনুমতি দিতেই কক্ষে প্রবেশ করে ম্যাথিউ৷

কক্ষে প্রবেশ করতেই ম্যাথিউর চোখ আটকে যায় আনাস্তাসিয়ার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস থমকে যায়। ম্যাথিউকে দেখতেই আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,

" ভাগ্যিস অন্তত তুমি এসেছো ম্যাথিউ। কেমন দেখাচ্ছে আমাকে? "

ম্যাথিউ রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে জবাব দেয়,

" অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। "

আনাস্তাসিয়া যেন ম্যাথিউর উত্তরে সন্তুষ্ট হয় না। সে আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,

" উহু। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা বাকি। "

ম্যাথিউ এগিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার পাশে দাঁড়ায়। হাতে থাকা গয়নার বাক্সটা খুলে বলে উঠে,

" কেবল এটাই বাকি। "

আনাস্তাসিয়া তাকিয়ে দেখে বাক্সে একটি সাদা হীরের হার আর এক জোড়া দুল। ম্যাথিউ বলে উঠে,

" ভাই তোমার জন্য পাঠিয়েছে। "

আনাস্তাসিয়া সেই হারের দিকে তাকিয়ে বলে,

" কি সুন্দর! "

ম্যাথিউর দৃষ্টি আনাস্তাসিয়ার দিকেই নিবদ্ধ। সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বলে উঠে,

" অপরূপ সুন্দর! "

আনাস্তাসিয়া চোখ তুলে ম্যাথিউর দিকে তাকায়। একবার ম্যাথিউকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বলে উঠে,

" বাহ। তোমাকেও দেখতে সুন্দর লাগছে। "

ম্যাথিউ হেসে ফেলে আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে। প্রশ্ন করে,

" সুন্দর নাকি সুদর্শন? "

আনাস্তাসিয়া জিভ কেটে বলে,

" উফ! ভুল বলে ফেললাম। সুন্দর নয় সুদর্শন। "

ম্যাথিউ বলে উঠে,

" আমাকে যতই সুন্দর লাগুক না কেন আজ সকলের দৃষ্টি কেবল তোমার দিকেই থাকবে। আমার ভাই খুব ভাগ্যবান। তাই সে তোমাকে পাচ্ছে। "

আনাস্তাসিয়া উত্তর দেয়,

" ভাগ্যবতী তো আমিও যে আমি তোমার ওই জাদরেল ভাইটার মন পেয়েছি। "

" আমার সামনে আমার ভাইয়েরই বদনাম করছো? তাও তোমাদের বিয়ের দিন? "

আনাস্তাসিয়া হার এবং কানের দুল পড়তে পড়তে উত্তর দেয়,

" বদনাম নয় সত্যি বলছি কেবল। "

ম্যাথিউ হেসে বলে উঠে,

" তুমি তৈরি হও। আমি আসছি। "

আনাস্তাসিয়া তাড়াতাড়ি কানের দুল পড়া শেষ করে ম্যাথিউকে পিছু ডাকে। ম্যাথিউ দরজার কাছে চলে গিয়েছিলো। আনাস্তাসিয়ার ডাক শুনতেই পিছু ফিরে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। আনাস্তাসিয়া দু'হাতে গাউন কিছুটা উঁচু করে ধরে দৌঁড়ে এসে ম্যাথিউকে জড়িয়ে ধরে। আচমকা আনাস্তাসিয়ার এহেন কান্ডে ম্যাথিউ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। বক্ষস্থল শীতলও হয় বোধহয়। আনাস্তাসিয়া নিজেই বলে উঠে,

" তুমি আমার থেকে ধন্যবাদ প্রাপ্য ছিলে। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না ধন্যবাদ জানানোর। "

ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,

" কিসের জন্য? "

" আমার চিঠি পেয়ে সেদিন আমার রিকের কাছে পৌঁছানোর জন্য। নিজেদের মধ্যের সকল মান অভিমান মিটিয়ে ফেলার জন্য। "

ম্যাথিউ মলিন হাসে। কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল একহাত আনাস্তাসিয়ার পিঠে রেখে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রয়। কে জানে আনাস্তাসিয়া আর কখনো নিজ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরবে নাকি? তাই এই কিছু মুহুর্তটুকু সে নিজের প্রাপ্তির খাতায় তুলে নেয়। আনাস্তাসিয়ার সান্নিধ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। সে ম্যাথিউকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ম্যাথিউ হেসে বলে,

" তৈরি হয়ে নাও এখন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমায় নিতে আসবে। "

আনাস্তাসিয়া হেসে আয়নার সামনে চলে যায়। ম্যাথিউও আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে।

__________

প্রাসাদের পিছনের দিকে খোলা জায়গায় বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সাদা অর্কিড এবং লিলি ফুল দিয়ে সম্পূর্ণ বাগান সুসজ্জিত। অতিথিদের বসার জন্য বাগানের দুদিকে ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতিথির তালিকায় রয়েছে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়ার সকল কাছের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজ্যের উচ্চপদস্থ সেনা এবং মন্ত্রীরা। আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বেগুনি আভা। গোধূলি লগ্ন শুরু হয়ে গিয়েছে।

সাদা কালো রাজকীয় পোশাকে সুদর্শন রিকার্ডো অপেক্ষমান তার প্রেয়সীর জন্য। তার সবুজ নেত্রপল্লব আনাস্তাসিয়ার আগমনের অপেক্ষায় কাতর প্রায়। অবশেষে রিকার্ডোর অপেক্ষার অবসান হয়। সাদা জেসমিন ফুলের তোড়া হাতে আনাস্তাসিয়া এগিয়ে আসছে রিকার্ডোর দিকে। আনাস্তাসিয়াকে আসতে দেখে সকল অতিথি উঠে দাঁড়ায়। সকলেই বিমুগ্ধ হয়ে দেখছে আনাস্তাসিয়াকে। সাদা পাতলা পর্দার আড়ালে আনাস্তাসিয়ার মুখশ্রী স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। রিকার্ডোর মনে হলো সন্ধ্যা আকাশের তারার মেলা থেকে একটি জ্বলন্ত শুভ্র তারা পৃথিবীতে খসে পড়েছে। আনাস্তাসিয়া যতই তার দিকে এগিয়ে আসছে ততই রিকার্ডোর বুকের হৃদপিণ্ডের উঠানামার গতি বেড়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে আনাস্তাসিয়াও রিকার্ডোর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। তার স্বপ্নের রাজপুত্রকে আজ স্বপ্নের মতোই সুদর্শন দেখাচ্ছে। আনাস্তাসিয়ার চোখে যেন ঘোর লেগে গিয়েছে। রিকার্ডোর কাছাকাছি আসতেই রিকার্ডো একহাত বাড়িয়ে দেয় আনাস্তাসিয়ার দিকে। নিঃসংকোচে আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর বাড়িয়ে দেওয়া হাত গ্রহণ করে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাতের পিঠে অধর ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

" খুন হয়ে গেলাম। "

আনাস্তাসিয়া সামান্য লজ্জা পায় বোধহয়। সাথে সাথে দৃষ্টি নত করে ফেলে সে। তাদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা ফাদার রিকার্ডোর থেকে অনুমতি নিয়ে বিয়ের কার্যক্রম শুরু করে। শপথ বাক্য পাঠের পালা এলে রিকার্ডো প্রথম বলা শুরু করে।

" আমি রিকার্ডো আলবার্ট আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি জীবনের এপার এবং ওপার উভয় পারেই আমি কেবল তোমাকেই ভালোবাসবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি মরণের আগ পর্যন্ত আমার হৃদয় কেবল তোমার জন্যই স্পন্দিত হবে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ভালো খারাপ সকল পরিস্থিতিতে তোমার ঢাল হয়ে তোমায় রক্ষা করবো। আমি রিকার্ডো আলবার্ট নিজের বাকি জীবন আজ তোমার নামে লিখে দিলাম নাসিয়া। "

রিকার্ডো এতোটুকু বলে একটা প্রশান্তির হাসি দেয়। আনাস্তাসিয়ার ঠোঁটের কোণেও লেপ্টে আছে হাসি। হাসিমুখেই সে নিজের শপথ বাক্য পাঠ করা শুরু করে,

" আমি আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজ রিকার্ডো আলবার্টকে নিজের স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছি। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সকল পরিস্থিতিতে তোমার শক্তি হয়ে দেখাবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তোমার ক্লান্ত দিনের শেষের একটুকরো প্রশান্তির ছায়া হয়ে থাকবো। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি কেবল তোমারই থাকবো। আমি আনাস্তাসিয়া অ্যালভেজ আজ এই মুহুর্তে স্বীকারোক্তি দিচ্ছি পুণর্জন্ম যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে প্রতিটি জনমে আমি কেবল তোমাকেই ভালোবাসবো। "

রিকার্ডো ঠোঁটের কোণের হাসি দীর্ঘ হয়। তার কাছে মনে হচ্ছে সে সমগ্র পৃথিবী হাসিল করে ফেলেছে। ফাদার আংটিবদল করতে বললে জেনি এবং জুন আংটির থালা হাতে এগিয়ে আসে। রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া হেসে থালার উপর থাকা আংটির বাক্স হতে আংটি দুটো তুলে নেয়। দুজন দুজনের অনামিকা আঙুলে আংটি পড়িয়ে পুরো জীবনের জন্য নিজেদের এক নতুন বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার মুখের উপর পড়ে থাকা পর্দাটা তুলতেই তাদের স্বামী স্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো সরাসরি নয়নমিলন হয়। আজও সেই প্রথম দিনের মতো মুগ্ধতা দুজনের চোখে। রিকার্ডো দু'হাত আনাস্তাসিয়ার গালে রেখে তার কপালে সন্তপর্ণে অধর ছোঁয়ায়। আবেশে আনাস্তাসিয়া চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলে। মুহুর্তেই চারিদিকে করতালিতে মুখরিত হয়। প্রায় আধার নেমে আসা আকাশ মুহুর্তেই আতশবাজির আলোয় ভরে উঠে জানান দেয় সকলকে যে বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে।

ক্যাথরিন আরোণ মুগ্ধ নয়নে দেখে আরেক জোড়া অসম্ভব প্রেমিক যুগলের পবিত্র মিলন। স্মৃতিচারণ করে নেয় নিজেদের বিয়ের সেই মুহুর্ত। আরোণ ক্যাথরিনের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,

" অন্ধকারের অতলে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতার ওষুধ কেবল ভালোবাসা তা আবার প্রমাণ হলো। "

আরোণের কথা শুনে ক্যাথরিন মৃদু হেসে তার কাধে মাথা রাখে।

ম্যাথিউর অন্তর ভালোবাসার অনল দহনে দগ্ধ হচ্ছে। অদ্ভুতভাবে চোখ ফেটে অশ্রুও বেরিয়ে আসতে চাইছে। সবার দৃষ্টির আড়ালে সে তাড়াতাড়ি নিজের চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু মুছে নেয়। আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে তাদের ভালো থাকার জন্য প্রার্থনা করে।

ক্যামিলো এগিয়ে গিয়ে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়াকে জড়িয়ে ধরে। তাদের শুভকামনা জানিয়ে আনাস্তাসিয়ার কানে কানে বলে উঠে,

" যে জীবন থেকে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছো সেই জীবনে আর কখনো ফিরতে দিও না তুমি। আমার বিশ্বাসের মান রেখো। "

আনাস্তাসিয়া হেসে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করে ক্যামিলোকে। ক্যামিলো শুভকামনা জানিয়ে চলে যেতেই ক্যাথরিন এবং আরোণ এগিয়ে আসে তাদের শুভকামনা জানাতে। ক্যাথরিন তাদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলে,

" জীবনের সকল অবস্থায় এভাবেই একে অপরের পাশে থেকো। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন খুব শীঘ্রই তোমাদের পরিবারও পরিপূর্ণ করে দেন। "

ক্যাথরিনের কথার অর্থ বুঝতে পেরে রিকার্ডো হাসি হাসি মুখখানা মলিন হয়ে আসে। আনাস্তাসিয়ার চোখ এড়ায় না সেটা। তবুও সে এই বিষয়ে এখন কিছুই বলে না। একে একে সকলেই তাদের শুভকামনা জানিয়ে যাওয়ার পর শেষের দিকে আসে জোসেফ তার পরিবার সহ। যাওয়ার আগে জোসেফ রিকার্ডোকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

" আমি জানি এটা কঠিন তবে আনাস্তাসিয়ার মতো জংলী বিড়ালকে কেবল আপনিই কাবু করতে পারবেন। "

জোসেফের কথা শুনে রিকার্ডো হেসে দেয়। আনাস্তাসিয়া চোখ গরম করে তাকাতেই জোসেফ তাড়াতাড়ি সেখান থেকে কেটে পড়ে। রাগের বসে যদি আবার তাকে কৃষ্ণ সাগরে ভাসানোর হুমকি দেয়? তার চেয়ে ভালোয় ভালোয় কেটে পড়াই উত্তম।

__________

বিয়ে শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে হলরুমে এসে উপস্থিত হয়। আনাস্তাসিয়াকে সকল বিধি মেনে কাউন্টেসের মুকুট পড়ানো হবে। সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রিকার্ডোর সামনে এসে আনাস্তাসিয়া দু হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে। সবুজ হীরার পাথরের কাজ করা কাউন্টেসের মুকুট রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে পড়িয়ে দিতেই আনাস্তাসিয়া উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। বেশ অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে তার মধ্যে। তবুও সে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সহিত কাউন্টেস হিসেবে নিজের শপথ বাক্য পাঠ করে সকলের সামনে। আনাস্তাসিয়া শপথ বাক্য পাঠ করার সময় রিকার্ডো নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলো তার হৃদয়ের রাণীর দিকে। তার হৃদয়ের রাণী আজ কেবল তার নয় সমগ্র রোমানিয়ার রাণী হিসেবে শপথ গ্রহণ করছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে?

শপথ বাক্য পাঠ শেষে রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া প্রাসাদের সব থেকে উঁচু বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় প্রজাদের দেখা দেওয়ার জন্য। বারান্দায় প্রবেশের আগে আনাস্তাসিয়া কিছুটা ঘাবড়ে যায়। রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাত নিজের হাতে আবদ্ধ করে তাকে বলে উঠে,

" আমার তোমার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থা আছে যে তুমি নিজেকে একজন যোগ্য কাউন্টেস হিসেবে সকলের সামনে প্রমাণ করবে। তোমার মধ্যে সেই সাহস, সেই আত্মবিশ্বাস এবং সেই মনোবল আছে। যেই নারীর ভ্যাম্পায়ারদের বিনাশ করার সময় হাত কাপে না, যেই নারীর তলোয়ারের ধারে প্রতিপক্ষকে হারানোর ক্ষমতা রাখে সে নারী অবশ্যই এই সাম্রাজ্যের জন্য উত্তম কাউন্টেস হিসেবেই প্রমাণিত হবে। এই রাজ্য কেবল আর আমার নয় তোমারও এখন থেকে। আর আমি জানি আমি কখনো থাকি অথবা না থাকি তুমি এই সাম্রাজ্য একা হাতে সামলে নেওয়ারও ক্ষমতা রাখো। "

রিকার্ডোর কথা আনাস্তাসিয়ার মনে সাহস যোগায়। সে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে রিকার্ডোর হাত ধরে বারান্দায় প্রবেশ করে। সাথে সাথে প্রধান সেনাপতি স্টেফেন স্ব শব্দে ঘোষণা করেন,

" সাবধান! কাউন্ট রিকার্ডো আলবার্ট এবং কাউন্টেস আনাস্তাসিয়া আলবার্ট আসছেন। "

প্রাসাদের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রজারা সকলেই দর্শন করে সদ্য বিবাহিত কাউন্ট এবং কাউন্টেসের। দুজনকে একসাথে দেখে সকলেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঈশ্বরের সৃষ্টি দুই অপরূপ মানব মানবীকে একসাথে দেখে যে কেউ বলতে বাধ্য এরা কেবল একে অপরের জন্য তৈরি। প্রজারা সকলেই কাউন্ট এবং কাউন্টেসকে সম্মান জানাতে বুকে একহাত রেখে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সকলে একসাথে বলে উঠে,

" কাউন্ট রিকার্ডো এবং কাউন্টেস আনাস্তাসিয়া দীর্ঘজীবী হোক। "

আনাস্তাসিয়া এবং রিকার্ডো হেসে একে অপরের দিকে তাকায়। রিকার্ডো শীতল কণ্ঠে বলে,

" আজ নতুন করে আবার তোমার নীলকান্তমণির প্রেমে পড়ে গেলাম। "

আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর দিকে দৃষ্টিস্থির করে বলে,

" প্রথমদিনের মতো আজকেও নতুন করে তোমার সবুজ নেত্রের প্রেমে পড়ে গেলাম। "

রিকার্ডো হাসে মৃদু। তারপর বলে উঠে,

" আকাশের বিশালতার সমান ভালোবাসি। "

আনাস্তাসিয়া ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়,

" কৃষ্ণ সাগরের গভীরতার সমান ভালোবাসি। "

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন