মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৬৬.
দূর্বল শরীর নিয়েই আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর হাত থেকে ঝামটি মেরে নিজের হাতটা সড়িয়ে ফেলে। ক্লান্ত গলায় বলে উঠে,
" ভুলেও এই সাহস করবে না তুমি। "
রিকার্ডো বলে উঠে,
" আমার প্রতি যত রাগ, অভিমান আছে তোমার সব মাথা পেতে নিবো কিন্তু আপাতত তোমার ভালোর জন্য যা প্রয়োজন আমি তাই করবো। "
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
" আমার ভালো মানে? তুমি আমার সন্তানকে মেরে আমার কি ভালো করবে? এরকম ভালো আমি চাই না। "
রিকার্ডোর চেহারা করুণ দেখায়। সে বলে উঠে,
" আমাকে ক্ষমা করো কিন্তু আমার আর কিছু করার নেই। "
এটুকু বলেই রিকার্ডো আরোণ এবং ম্যাথিউকে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা দেয়। সাথে সাথে তারা কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। দরজা লাগিয়ে চারজন দাসী এসে আনাস্তাসিয়ার দু'হাত এবং পা চেপে ধরে। সাথে সাথে আনাস্তাসিয়া চিৎকার শুরু করে। তার চিৎকারে প্রাসাদের প্রতিটি দেয়াল যেন ধ্বসে পড়ছে। রিকার্ডো সহ্য করতে পারে না। সে বারান্দায় এসে পড়ে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। আনাস্তাসিয়াকে সে কি করে বুঝাবে নিজের মনের অবস্থা? আনাস্তাসিয়ার তো মায়ের মন। সে কখনোই রিকার্ডোর কঠোরতার আড়ালে চাপা কষ্ট অনুভব করতে পারবে না।
হান্নাহর খারাপ লাগছে। তবুও তার কিছু করার নেই। সে চুপচাপ আনাস্তাসিয়ার দিকে এগিয়ে যায়। হান্নাহকে এগিয়ে আসতে দেখে আনাস্তাসিয়া ভয়ে কুঁকড়ে উঠে। চিৎকারের আওয়াজ আরো জোরে শোনা যায় তার। ক্যামিলো তড়িঘড়ি করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় রিকার্ডোর পাশে। আলতো স্বরে বলে উঠে,
" তুই কি ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস বাবা? "
রিকার্ডো ক্যামিলোর দিকে ফিরে তাকায়। তার চোখ ছলছল করছে। ক্যামিলোর বুক মুচড়ে উঠে। তার মনে নেই সে কখনো রিকার্ডোর চোখে পানি দেখেছে কিনা। রিকার্ডো করুণ স্বরে বলে উঠে,
" আমার কাছে নাসিয়া সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মা। ওকে ছাড়া সবকিছু অনর্থক আমার জন্য। "
রিকার্ডোর কথা শেষ হতে না হতেই কক্ষ থেকে আনাস্তাসিয়ার চিৎকার এবং আর্তনাদ ভেসে আসে। সে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
" আমার বাচ্চাকে মেরে তুমি কখনোই আমাকে বাঁচাতে পারবে না রিক। আমি নিজে নিজের জীবন নিয়ে নিবো। "
রিকার্ডো দু'হাতে কান চেপে ধরে। তার সহ্য হচ্ছে না এসব। কিন্তু সাথে সাথেই আনাস্তাসিয়ার চিৎকার থেমে যায়। কক্ষ থেকে ভেসে আসে হান্নাহর চিৎকার। হান্নাহ আনাস্তাসিয়ার নাম ধরে ডাকছে। রিকার্ডো কান থেকে হাত সরিয়ে ফেলে। ভয়ে তার শীতল শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। অনেক কষ্টে সে পা বাড়িয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। কক্ষে পা রাখতেই রিকার্ডোর ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠে। শরীরের তাল সামলানোর জন্য সে দরজায় একহাতে ঠেক দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
হান্নাহসহ সকলে আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে। হান্নাহ একটি ছোট কাঁচের আয়না আনাস্তাসিয়ার নাকের কাছে ধরে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করছে। এতক্ষণে তার চিৎকারে ম্যাথিউ এবং আরোণও কক্ষে প্রবেশ করেছে। আনাস্তাসিয়াকে চোখ বন্ধ অবস্থায় দেখে ম্যাথিউ ভয়ে সামনে এগোতে পারে না। তার শরীর অসাড় হয়ে আসে। আরোণ একবার আনাস্তাসিয়াকে দেখে আবার সামনে রিকার্ডোর দিকে তাকায়। সে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায় রিকার্ডোর কাছে। বলে উঠে,
" কিছু হবে না অ্যানার। নিজেকে সামলাও। "
রিকার্ডো যেন পাথরের ন্যায় জমে আছে। তার মন ব্যাকুল হয়ে আছে কেবল এটা শোনার জন্য যে তার নাসিয়া ঠিক আছে। অবশেষে তার ব্যাকুলতা কমিয়ে হান্নাহ বলে উঠে,
" নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কেবল জ্ঞান হারিয়েছে। কিন্তু এখনই ওকে রক্ত পান করানো প্রয়োজন। "
আনাস্তাসিয়া নিঃশ্বাস নিচ্ছে কথাটুকু শুনে রিকার্ডোর বুকে প্রাণের সঞ্চার হয়। বুকে হাত রেখে চোখ বুজে সে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এক মুহূর্তের জন্য তার মাথায় যা ভাবনা উঁকি দিয়েছিলো তা ঝেড়ে ফেলে আনাস্তাসিয়ার দিকে এগিয়ে যায়।
__________
আনাস্তাসিয়ার যখন জ্ঞান ফিরে তখন মধ্যরাত প্রায়। জ্ঞান ফিরতেই আনাস্তাসিয়া দূর্বল চোখ জোড়া মেলে তাকায়। চারিদিকে চোখ বুলাতে নিয়ে দেখে রিকার্ডো তার দিকে পিঠ করে বিছানায় বসে আছে। দু'হাতের উপর কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে রয়েছে সে। আনাস্তাসিয়া একবার রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে আবার নিজের দিকে তাকায়। তার মনে পড়ে যায় নিজের সন্তানের কথা। আনাস্তাসিয়া ভয়ে আঁতকে উঠে। নিজের পেটের উপর হাত রেখে কিছু অনুভব করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই অনুভব হচ্ছে না তার।
সাথে সাথে আনাস্তাসিয়ার ভয়ার্ত চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আর্তনাদ করে উঠে সে,
" আমার বাচ্চা! "
রিকার্ডো মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আনাস্তাসিয়ার দিকে। আনাস্তাসিয়া সাথে সাথে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে,
" মেরে ফেললে আমার বাচ্চাটাকে? শেষমেশ নিজের সন্তানের খুনিও হয়ে গেলে তুমি? "
রিকার্ডো শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় আনাস্তাসিয়ার দিকে। তারপর শীতল স্বরে বলে উঠে,
" বেঁচে আছে সে। "
আনাস্তাসিয়ার কান্নার বেগ কমে আসে৷ কিন্তু কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে,
" তাহলে আমার সব স্বাভাবিক অনুভব হচ্ছে কেন? "
রিকার্ডো একইভাবে শান্ত স্বরে জবাব দেয়,
" পিশাচটার রক্তের চাহিদা মিটেছে। তাই তোমাকে জ্বালিয়ে মারছে না আর। "
আনাস্তাসিয়ার হৃদয় আহত হয়। কম্পিত স্বরে বলে উঠে,
" যাকে তুমি পিশাচ বলছো সে তোমারও সন্তান রিক৷ তোমার মনের মায়া দয়া কি মরে গিয়েছে? "
রিকার্ডো রাগী স্বরে বলে উঠে,
" সে আমার সন্তান দেখেই তাকে পিশাচ বলছি। পিশাচের সন্তান তো পিশাচই হবে। আর তুমি আমার মায়া দয়ার কথা বলছো? এই বাচ্চা কি একবারও তোমার প্রতি মায়া দয়া দেখাচ্ছে? এক দিনেই তোমার কি অবস্থা করে ছেড়েছে দেখছো? তোমার শরীরের সব রক্ত শুষে নিজে বেড়ে উঠছে সে। "
আনাস্তাসিয়া বলে উঠে,
" ওর রক্তের তেষ্টা মেটানোর জন্য যা প্রয়োজন হয় তাই করবো আমি। তবুও ওকে মারার কথা বলো না আমায়। আমি পারবো না। "
আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে রিকার্ডো অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। বিস্মিত স্বরে বলে উঠে,
" এই কথা তুমি বলছো নাসিয়া? তুষ দূর্গে আমি তোমাকে জোর করে রক্ত পান করিয়েছিলাম দেখে সেদিন তুমি আমার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলে। আর আজ সেচ্ছায় রক্ত পান করতে চাইছো? "
আনাস্তাসিয়া মাথা নেড়ে বলে উঠে,
" ওর জন্য আমি সব পারবো। "
রিকার্ডো ছলছল নয়নে আনাস্তাসিয়ার পানে তাকিয়ে। অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
" আর আমার জন্য? "
আনাস্তাসিয়া জবাব দিতে পারে না। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়। রিকার্ডো আবার বলে উঠে,
" ওর জন্য তুমি নিজেকে উৎসর্গ করতে পারবে, কিন্তু আমার জন্য তুমি ওকে উৎসর্গ করতে পারবে না? "
আনাস্তাসিয়া এবার নিঃশব্দে কাঁদছে। সে কি বলবে? তার জন্যও এই পরিস্থিতি সহজ নয়। কিন্তু সে কখনো নিজের সন্তানকে মারার মতো পাপ করতে পারবে না। রিকার্ডো বলে উঠে,
" আমি এতদিন ভাবতাম তুমি আমাকে সবথেকে বেশি ভালোবাসো। কিন্তু আজ অন্য কেউ এসেছে যার প্রতি তোমার ভালোবাসার পরিধি আমার থেকেও বেশি। তুমি তাকে এতটাই ভালোবাসো যে তার জন্য তুমি নিজের জীবন শেষ করে দিতেও দ্বিধাবোধ করবে না। অথচ আমাকে ভালোবেসে তুমি আমার জন্য জীবিত থাকতে পারবে না। "
রিকার্ডোর গলার স্বর এবার গম্ভীর হয়। নিজের নমনীয়তা কাঁটিয়ে সে বলে উঠে,
" বেশ তবে থাকো তুমি তোমার সন্তানকে নিয়ে। জন্ম দাও ওকে। আমি তোমাকে আর কোনো বাঁধা দিবো না। কিন্তু মনে রাখবে যেই সন্তান আমার থেকে আমার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিবে সে কখনো আমার ভালোবাসা পাবে না। "
এটুকু বলেই রিকার্ডো সাথে সাথে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ে। আনাস্তাসিয়ার বুকের ভেতর ঝড় উঠে। উদাস চোখে পেটের উপর হাত রাখে সে আবার। ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" তুমি যা শুনেছো সব ভুল। তোমার বাবা তোমাকে ভালোবাসে। "
কথাটুকু বলে আনাস্তাসিয়া আবার নির্জীব নয়নে তাকিয়ে রয়। তার খুব ইচ্ছে করছে রিকার্ডোকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে। কিন্তু রিকার্ডো পাষাণ। নির্দয়। আনাস্তাসিয়ার প্রতি ভালোবাসা তাকে জগতের সবথেকে স্বার্থপর পিতা বানিয়ে দিচ্ছে। যা সহ্য হয় না আনাস্তাসিয়ার। সে চায় রিকার্ডোও তাদের সন্তানকে ভালোবাসুক। কাছ থেকে অনুভব করুক। আনাস্তাসিয়া না থাকলে তো তার বাচ্চার সবথেকে আপন বলতে কেবল রিকার্ডোই থাকবে। আনাস্তাসিয়া মনে মনে ভাবে সে কি দেখে যেতে পারবে তার সন্তানকে? নাকি সেই সুযোগটাও পাবে না সে? এসব ভাবনা আনাস্তাসিয়ার হৃদয়কে দূর্বল করে তুলে। মনে মনে বলে,
" ভাগ্য তুমি খুব নিষ্ঠুর। "
চলবে…