মহাপ্রয়াণ
লেখনীতে : নাফিসা তাবাসসুম খান
৬৯.
বাহিরে সূর্যের তীর্যক আলো ছড়িয়ে পড়তেই আনাস্তাসিয়ার ঘুম ভাঙে। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই সে বেশ অবাক হয়। রিকার্ডো তার সামনেই বসে ছিলো। সাধারণত এই সময় রিকার্ডো প্রাসাদে থাকে না। তবে আজ কি করছে?
আনাস্তাসিয়ার ঘুম ভাঙতে দেখেই রিকার্ডো তাকে উঠে বসতে সাহায্য করে। আনাস্তাসিয়া বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করে,
" তুমি এখনো প্রাসাদে? আজকে রাজধানীতে কোনো কাজ ছিলো না? "
রিকার্ডো বলে,
" সকাল সকাল উঠেই সব কাজ শেষ করে এসে তোমার ঘুম থেকে উঠার অপেক্ষায় ছিলাম। "
আনাস্তাসিয়া অবাক হয়। কিছু বলতে পারে না সে। আপাতত বেশ দূর্বল লাগছে তার। রিকার্ডো নিজেই প্রশ্ন করে,
" ক্ষিদে পেয়েছে? "
আনাস্তাসিয়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়। রিকার্ডো সাথে সাথে নিজের হাত পেতে দেয় আনাস্তাসিয়ার সামনে। আনাস্তাসিয়া প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রিকার্ডো বলে,
" আজকে প্রতি প্রহরেই আহার হিসেবে তোমাকে আমার রক্ত পান করতে হবে। "
আনাস্তাসিয়া বলে,
" হঠাৎ আজ? "
" কারণ একটা চমক আছে। আপাতত কথা না বলে তুমি পান করো। "
আনাস্তাসিয়া আর কথা না বলে চুপচাপ রিকার্ডোর হাত টেনে রক্ত পান করা শুরু করে। এভাবেও তার প্রচুর ক্ষিদে পেয়েছিলো। রক্তপান শেষ হতেই রিকার্ডো বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আনাস্তাসিয়াকে কোলে তুলে নেয়। আনাস্তাসিয়া সন্দিহান গলায় প্রশ্ন করে,
" আজকে তোমার কি হয়েছে বলো তো? "
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার কথার জবাবে কেবল হাসে সামান্য। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আনাস্তাসিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়৷ আনাস্তাসিয়া সামনে ফিরে আয়নার দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে যায় অনেকটা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার চমকে রিকার্ডোর দিকে তাকায় তো আবার আয়নার দিকে।
ফ্যাকাসেভাব অনেকটা কমে এসেছে তার চেহারায়। শরীরও অনেকটা কম শুকনো লাগছে তুলনামূলক। আনাস্তাসিয়া বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করে,
" কিভাবে সম্ভব? "
রিকার্ডো ফিসফিসিয়ে আনাস্তাসিয়ার কানে কানে বলে,
" তোমার স্বামীর রক্তের জাদু। "
আনাস্তাসিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রিকার্ডো বলে উঠে,
" এখন তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। আমরা একটা জায়গায় যাবো। "
আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
" এই অবস্থায় আমি কোথায় যাবো? "
" সেটা গেলেই দেখতে পারবে। কিন্তু আপাতত তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। "
বলেই রিকার্ডো চলে যায় আনাস্তাসিয়ার জন্য নিজের পছন্দ মতো গাউন বের করতে। আনাস্তাসিয়া আজকে অবাকের উপর অবাক হচ্ছে। সাধারণত তো রিকার্ডো তাকে বিছানা ছেড়েও নামার অনুমতি দেয় না তাহলে আজকে তার কি হলো?
__________
রাজসভার বাহিরে দাঁড়িয়ে ম্যাথিউ প্রধান সেনাপতি স্টেফেনের সাথে কথা বলছে। তাদের কথার প্রসঙ্গ হচ্ছে আজ সকালে ঘটে যাওয়া ঘটানা। আজ সকালেই রাজসভায় সকলের সামনে রিকার্ডো চারজন উচ্চপদস্থ মন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অবশ্য কারণ আছে। বেশ কয়েকমাস ধরেই ম্যাথিউ এই বিদ্রোহীদের খবরাখবর রাখছিলো। অবশেষে গতরাতে এই বিদ্রোহের ঘটনার পর সে গোপন সূত্রে জানতে পারে যে এসব বিদ্রোহীদের উস্কানোর পিছনে রাজ্যের উচ্চপদস্থ কিছু মন্ত্রীদের হাত রয়েছে। খবরটা সে সর্বপ্রথম রিকার্ডোর কানে দেয়। তাই আজ সকাল সকালই রিকার্ডো তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু ম্যাথিউর ভয় হচ্ছে অন্য জায়গায়। তার মনে হচ্ছে এই বিদ্রোহ এতো সহজে দমবে না। হয়তো এই বিদ্রোহে আরো কোনো মন্ত্রীরাও জড়িত। সুযোগ বুঝে তারা আবার প্রজাদের বিদ্রোহের জন্য উস্কে দিবে।
ম্যাথিউ চিন্তিত সুরে স্টেফেনকে বলে,
" প্রধান সেনাপতি, আমাদের এখন ভালো করে চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কাউকেই সন্দেহ তালিকার বাহিরে রাখা যাবে না। "
স্টেফেন মাথা নেড়ে বলে,
" তা অবশ্যই। কিন্তু আমাদের কি একবার কাউন্টকে আমাদের এই সন্দেহের বিষয়ে জানানো উচিত না? "
ম্যাথিউ বলে,
" ভাইকে আমি অবশ্যই সবার আগে জানাতাম। কিন্তু ভাই কাউন্টেস আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। পাশাপাশি রাজ্যের হাজারটা চিন্তাও উনার মাথায় ঘুরঘুর করছে। এসবের মাঝে উনাকে অযথা বিরক্ত করা অনুচিত হবে। তারচেয়ে ভালো আমরা চোখ কান খোলা রাখি। "
স্টেফেন এবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়৷ কোনো এক কারণে রিকার্ডোর প্রতি তার এক অদৃশ্য ভক্তি এবং বিশ্বস্ততা কাজ করে। যদিও সে কাউন্ট লোনেলের শাষণামল থেকেই প্রধান সেনাপতির দায়িত্বে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে৷ কিন্তু তার স্পষ্ট মনে আছে সেই সময় রাজ্যে কি হারে অপরাধের পরিমাণ বেড়েছিল। তার কানে প্রায়ই খবর আসতো প্রিন্স ড্রাগোসের করা অনেক অপরাধের খবর। কিন্তু স্টেফেন কখনো মুখ খুলে সেই বিষয়ে কিছু বলে নি। কিছু প্রতিবাদ করলে তার পরিণাম কেমন হতে পারে সেই সম্পর্কে ধারণা ছিলো বিধায়ই সে আর সাহস করে নি। অথচ তখন রাজ্য একজন মানুষের শাসনে ছিলো। অতঃপর একদিন সেই রাজার মৃত্যু ঘটলো। স্টেফেন ভাবলো এখন তার ছেলে সিংহাসনে বসবে। রাজ্য আরো রসাতলে যাবে। কিন্তু তখনই দেবদূত হয়ে আগমন হলো এক পিশাচের। যেই পিশাচ একজন যোগ্য কাউন্টের ন্যায় রাজ্য পরিচালনা করে চলেছেন। নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারও করেন নি। প্রজাদের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এসবের সামনাসামনি সাক্ষী হলো স্টেফেন। তাইতো সে রিকার্ডোর জন্য নিজের জীবন দিতেও কখনো পিছুপা হবে না। মাঝে মধ্যে তার মনে হয় মানুষ রূপী পিশাচদের তুলনায় এই পিশাচ রূপী দেবদূতও ঢের ভালো।
__________
রিকার্ডোর হাত ধরে ফিটন ছেড়ে সাবধানে নেমে আসে আনাস্তাসিয়া। সামনে তাকাতেই সে বেশ অবাক হয়। সে এই মুহুর্তে তুষ দূর্গের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রিকার্ডোর দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করে,
" এটাই ছিলো তোমার সেই বিশেষ জায়গা? "
রিকার্ডো মাথা নেড়ে বলে,
" হ্যাঁ। কেন তুমি খুশি হও নি? "
আনাস্তাসিয়া হালকা গলা ভিজিয়ে বলে,
" এতো বড় দূর্গে কেবল আমরা দুজন? "
রিকার্ডো মজা করে প্রশ্ন করে,
" ভয় পাচ্ছো? "
আনাস্তাসিয়া মুখ ছোট করে বলে,
" আমি কাউকে ভয় পাই না৷ কিন্তু তোমার এই দূর্গ দেখতে ভয়ংকর। আমার ছোট বাচ্চাটা যদি এখানে ভয় পায়? "
রিকার্ডো হো হো করে হেসে উঠে। আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুচকে রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে আছে। রিকার্ডো সাধারণত কখনো শব্দ করে হাসে না৷ তবে আজ কি হলো? নাকি সে নিজেই বেশি ভাবছে? রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পেটে হাত রেখে প্রশ্ন করে,
" কি বাবা? তুমি ভয় পাচ্ছো? "
পেটের ভেতর থেকে কোনো নড়াচড়া অনুভব না করে রিকার্ডো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,
" আমার ছেলে ভীতু না বুঝলে? "
আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
" তুমি কিভাবে জানো ও ছেলে? "
রিকার্ডো বলে,
" আমাদের বাপ ছেলের কথা তোমাকে কেন জানাবো? "
" যদি ও মেয়ে হয় আর রাগ করে তোমার উপর? "
" উহু। ও ছেলেই। আর ওর সাথে আমার একটা গভীর সম্পর্ক আছে না? "
আনাস্তাসিয়া ভেঙচি কেটে বলে,
" বাহ! পেটে রাখবো আমি আর সম্পর্ক গভীর তোমার সাথে? তাহলে তোমার ছেলে তুমি রাখো পেটে। "
রিকার্ডো একইভাবে আবার হেসে উঠে। এবার সে হাসতে হাসতে বলে,
" যথেষ্ট হয়েছে। এবার ভেতরে চলো। "
আনাস্তাসিয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
" যাবো না। "
রিকার্ডো আর আনাস্তাসিয়ার কথায় পাত্তা না দিয়ে তাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর বিদ্রুপ করে বলে উঠে,
" নাসিয়া যাবে। নাসিয়ার ছেলেও যাবে। "
__________
দূর্গের ভেতর প্রবেশ করতেই আরো অবাক হয় আনাস্তাসিয়া। কালো রঙের পাথরের তৈরি এই দূর্গকে আনাস্তাসিয়ার কাছে প্রেতাত্মাদের আস্তানা মনে হতো। কিন্তু এখন এই দূর্গ ভেতর থেকে বেশ রাজকীয় ভাবে সাজানো। যে কেউ দেখলেই তাদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় লাগবে দেখতে। আনাস্তাসিয়াকে অবাক করে দিয়ে তার সামনে হঠাৎ জোসেফ এসে দাঁড়ায়। মাথা নত করে সে বলে উঠে,
" স্বাগতম কাউন্ট। স্বাগতম কাউন্টেস। "
আনাস্তাসিয়া ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে,
" তুমিও এখানে? "
জোসেফ মাথা নত রেখেই বলে,
" জ্বি কাউন্টেস। "
রিকার্ডো জোসেফকে প্রশ্ন করে,
" সব ঠিকঠাক? "
জোসেফ বলে,
" জ্বি কাউন্ট৷ কেবল আপনাদের অপেক্ষায়ই ছিলাম। "
" আচ্ছা। "
বলেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। আনাস্তাসিয়া ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে,
" কিসের অপেক্ষা? "
" তা তুমি গেলেই দেখতে পাবে। "
এটুকু বলে রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার হাত ধরে হলরুমের দিকে এগিয়ে যায়। জোসেফ পিছন থেকে তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হলরুমে প্রবেশ করতেই আনাস্তাসিয়া দেখে একজন লোক ছবি আঁকার সরঞ্জাম হাতে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে এতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি বেশ ক্লান্ত। তবুও রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়াকে দেখতেই তিনি মুখে সৌজন্যতার হাসি ফুটিয়ে তাদের স্বাগতম জানায়৷ রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে লোকটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে,
" নাসিয়া, ইনি হলেন বিখ্যাত চিত্রকর সেভাস্টিন ডি' সোজা। "
আনাস্তাসিয়া হেসে লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলে,
" পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো। "
লোকটিও হেসে কুশল বিনিময় করে রিকার্ডোকে বলে উঠে,
" আপনার অনুমতি থাকলে আমরা শুরু করি কাউন্ট? "
রিকার্ডো জবাব দেয়,
" জ্বি অবশ্যই। "
রিকার্ডো এগিয়ে গিয়ে সিংহাসনে বসে৷ আনাস্তাসিয়া তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,
" তুমি তোমার চিত্র আঁকাবে? "
" আমার একার নয়। আমাদের তিনজনের। "
কথাটুকু বলেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে টেনে নিজের কোলে উরুর উপর বসিয়ে দেয়৷ আচমকা রিকার্ডোর এরকম কাণ্ডে আনাস্তাসিয়া লজ্জা পায় বেশ। সে মাথা নত করে নিচে তাকিয়ে থাকে। রিকার্ডো ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" লজ্জাটুকু আমার জন্য জমিয়ে রাখো। আপাতত সামনে তাকাও। "
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর কথা মানে। চুপচাপ চোখ তুলে এবার সে সামনের দিকে তাকায়। চিত্রকর সেভাস্টিন হাসিমুখে বিশাল কাগজে রঙ ব্যবহার শুরু করে। সর্বপ্রথমই সে আঁকে দু জোড়া অদ্ভুত সুন্দর চোখ। নীলকান্তমণি এবং সবুজনেত্র৷
__________
চিত্রকর্ম মোটামুটি শেষ হতেই রিকার্ডো সেভাস্টিন নামক লোকটাকে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ দেয় জোসেফকে৷ বাকিটুকু চিত্রকর্ম তিনি সম্পূর্ণ করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে পৌঁছে দিবেন৷ এতক্ষণ বসে থেকে আনাস্তাসিয়ার খুব পা ব্যাথা করছে। এভাবেও তার পায়ে কিছুটা পানি জমে ফুলে আছে। রিকার্ডো আর আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে হলরুমে অপেক্ষা করে না। তাকে কোলে তুলে নিজের কক্ষে নিয়ে আসে। আনাস্তাসিয়াকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে রিকার্ডোও তার সামনে বসে পড়ে। নিজের হাত আনাস্তাসিয়ার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
" তোমায় দূর্বল দেখাচ্ছে। "
আনাস্তাসিয়া রিকার্ডোর হাত ধরে নিজের মুখের কাছে নিয়েও থেমে যায়৷ একবার চোখ তুলে সে রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
" তোমার কষ্ট হয়না রিক? "
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জবাব দেয়,
" হয়। প্রচুর কষ্ট হয়। যখন তুমি কষ্টে থাকো তখন। "
আনাস্তাসিয়া এখনও রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে আছে। রিকার্ডো অপর হাত এগিয়ে আনাস্তাসিয়ার গালে রাখে আলতো করে। তারপর বলে উঠে,
" আমার সকল বাসনা তোমায় জুড়ে,
আমার সকল বেদনা তোমায় ঘিরে। "
আনাস্তাসিয়ার চোখের কার্ণিশ বেয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। তা দেখে রিকার্ডো তা পরম যত্নে মুছে দিয়ে বলে,
" আমার ছেলে আর ছেলের মা আপাতত ক্ষুদার্ত। তাড়াতাড়ি রক্তপান করে আমায় উদ্ধার করো। "
রিকার্ডোর কথা বলার ভঙ্গি দেখে আনাস্তাসিয়া হেসে দেয়৷ চুপচাপ সে রক্তপান শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ পর রক্তপান শেষ হতেই রিকার্ডো নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে আনাস্তাসিয়ার মুখ মুছে দেয়। মুখ মুছে রিকার্ডো উঠে যেতে নিলেই আনাস্তাসিয়া প্রশ্ন করে,
" কোথায় যাচ্ছো? "
রিকার্ডো হেসে উত্তর দেয়,
" কোথাও যাচ্ছি না তোমাকে ছেড়ে। "
এটুকু বলেই রিকার্ডো আলমারির সামনে এগিয়ে যায়৷ আলমারির দরজা খুলে সেখান থেকে কিছু জিনিস হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে বসে আনাস্তাসিয়ার সামনে। আনাস্তাসিয়া প্রথম কিছুক্ষণ জিনিসগুলোর দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকলেও পরে হঠাৎ তার মনে পড়ে এগুলো তারই জিনিস। সে বিস্মিত দৃষ্টিতে রিকার্ডোর দিকে তাকায়। রিকার্ডো হেসে আনাস্তাসিয়াকে বলে,
" মেসিডোনিয়ায় আমাদের প্রথম তিন সাক্ষাৎ শেষে তোমার ভুলক্রমে ফেলে যাওয়া কিছু জিনিস। "
আনাস্তাসিয়া একবার তলোয়ার তো একবার খঞ্জরটা তো আবার নিজের চুলের সেই সোনালী ফিতেটা ধরে দেখছে। মুহুর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠে তাদের সেই আকস্মিক সাক্ষাৎগুলো। তখন আনাস্তাসিয়া কখনো কল্পনাও করে নি একদিন তার এই স্বপ্ন পুরুষের সাথে সে চিরজীবনের জন্য বাধা পড়বে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আনাস্তাসিয়ার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠে। সেই হাসিমাখা মুখ লক্ষ্য করে রিকার্ডোর মুখের হাসিও চওড়া হয়। আচমকা আনাস্তাসিয়া নিজের হাতের তলোয়ার একপাশে রেখে রিকার্ডোর শার্ট ধরে কিছুটা নিজের দিকে টেনে তার অধরে অধর মিলিয়ে দেয়। রিকার্ডো চমকায় না উল্টো সে দু'হাতে আনাস্তাসিয়াকে গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে নেয়। আনাস্তাসিয়া কিছু মুহুর্তের জন্য একটু সরে এসে রিকার্ডোর মতো ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" আমার জীবনে আসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায় রিক। "
রিকার্ডো একইভাবে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" আর আমার মতো অধমকে ভালোবাসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায় জংলী বিড়াল। "
রিকার্ডোর জংলী বিড়াল সম্বোধনে আনাস্তাসিয়া রাগ হয় না আজ। সে উল্টো হেসে আবার রিকার্ডোর দিকে এগিয়ে যায়।
__________
মধ্যরাত। সম্পূর্ণ নির্জন ট্রান্সেলভেনিয়ার গহীনে এই নিস্তব্ধ তুষ দূর্গে কেবল রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়া ছাড়া আর একটা কাকপক্ষীও নেই। আনাস্তাসিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে বেশ অনেকক্ষণ হলো। রিকার্ডো বিছানার পাশে মেঝেতে বসে আনাস্তাসিয়ার ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আছে। এতো নির্জন এক দূর্গে থেকেও আনাস্তাসিয়ার ঘুমন্ত মুখশ্রী জুড়ে কোনো চিন্তা কিংবা ভয়ের ছাপ নেই। একদম শান্তশিষ্ট বিড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে সে। আনাস্তাসিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে রিকার্ডোর বুক মোচড় দিয়ে উঠে। আজীবন তার নাসিয়া এভাবেই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে তো?
খোলা বিশাল জানালা দিয়ে এখান থেকেই স্পষ্ট আকাশের অর্ধচন্দ্র দেখা যাচ্ছে। রিকার্ডো সেদিকে নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয়। চাঁদটাও কেন আজকে এরকম অর্ধ রূপ ধারণ করেছে? তবে প্রকৃতিও কি রিকার্ডোর মনের অবস্থা বুঝতে পারছে? আনাস্তাসিয়ার সাথে প্রথম সাক্ষাতের সেই রাতে রিকার্ডোর অনুভব হচ্ছিলো সব কিছু সেদিন তার সাথে এক মিষ্টি ষড়যন্ত্রে মত্ত হয়েছে। আজ আবার একই জিনিস অনুভব করছে রিকার্ডো। তবে আজ আর মিষ্টি ষড়যন্ত্র নয় বরং এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।
রিকার্ডোর বুক প্রবলভাবে কাঁপছে। আচমকা এলোমেলো ভঙ্গিতে সে অনেকটা দূরে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেক দিয়ে বসে। বুকের ভেতর বয়ে যাওয়া ঝড় তার নিঃশব্দে চোখ দিয়ে ঝড়ছে। তার দৃষ্টি এখনো আনাস্তাসিয়ার দিকে নিবদ্ধ। শান্ত স্বরে সে বলে উঠে,
" আমার নাসিয়া। "
রিকার্ডোর চোখ যেন তার বিপর্যস্ত অন্তরের দহনের জানান দিচ্ছে। সাথে সাথে সে হাঁটুর উপর রাখা দু'হাতের বাধনের মধ্যে মাথা ঠেকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে থাকে। এত পুড়ছে কেন অন্তর? রিকার্ডো তো কখনো কাপুরষ ছিলো না। তাহলে আজকে কিসের ভয় তাকে এতো কাঁদাচ্ছে?
রিকার্ডো আজকে প্রথমবারের মতো ভ্যাম্পায়ার হওয়ায় আফসোস করছে। ভ্যাম্পায়ার না হয়ে সে যদি ভাগ্য দেবতা হতো তাহলে কতোই না ভালো হতো? সে নিজ হাতে নিজেদের ভাগ্য লিখতো। তার, আনাস্তাসিয়ার এবং তাদের সন্তানের। যেই ভাগ্যের রেখার সূচনা আছে কিন্তু বিচ্ছেদ নেই। বেদনার গুঞ্জন যেখানে কখনো হানা দিতে পারবে না।
রিকার্ডো মুখ তুলে আবার তাকায় আনাস্তাসিয়ার দিকে। তার ঘুমন্ত চোখ, মুখ, গাল একবার দেখে নিয়ে ডুব দেয় অতীতে।
মেসিডোনিয়ায় রিকার্ডো এবং আনাস্তাসিয়ার প্রথম সাক্ষাতের পর এক গভীর রাতের নিশিকথা। আনাস্তাসিয়া তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিঃশব্দে তার কক্ষের জানালা খুলে কক্ষে প্রবেশ করে রিকার্ডো। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে আনাস্তাসিয়ার বিছানার পাশে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে। কিছুক্ষণ দু নয়ন ভরে আনাস্তাসিয়াকে দেখে নিয়ে রিকার্ডো একহাতে তার মুখের উপর এসে থাকা অবাধ্য সোনালী চুলগুলোকে সড়িয়ে দেয়। উন্মুক্ত হয় আনাস্তাসিয়ার ঘাড়। দপদপ করে রগ লাফাচ্ছে সেখানে। রিকার্ডো আকর্ষণ অনুভব করে। কিছুটা ঘোর মেশানো দৃষ্টি মেলে সে আনাস্তাসিয়ার ঘাড়ের কাছে মুখ নেয়৷ উষ্ণ অধর ছোঁয়ায় সেখানে। পরক্ষণেই অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,
" নাসিয়া। "
ঘোর কাটতেই রিকার্ডো চলে আসতে চায়। কিন্তু উঠতে নিলেই সে অনুভব করে আনাস্তাসিয়া তার একহাত জড়িয়ে তার উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। রিকার্ডোর আর সড়তে ইচ্ছে করে না। সে সারারাত সেভাবেই আনাস্তাসিয়ার পাশে মেঝেতে বসে তার দিকে তাকিয়ে থেকেই রাত পার করে দেয়। ভোরের আলো ফুটার আগে রিকার্ডো বাধ্য হয়ে আনাস্তাসিয়ার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
আনাস্তাসিয়ার অস্পষ্ট শব্দে অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে রিকার্ডো। সামনে তাকিয়ে দেখে আনাস্তাসিয়া পেটে হাত রেখে সামান্য নড়ে উঠেছে। ক্লান্ত পা জোড়া এগিয়ে নিয়ে আনাস্তাসিয়ার পাশে বসে রিকার্ডো। আলতোভাবে তার পেট ছুঁয়ে দিতেই অনুভব করে কারো নড়াচড়া। রিকার্ডো ধীর স্বরে বলে উঠে,
" বাবা তোমাদের জন্য সব করতে পারি। আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমার কাছে শ্রেষ্ঠ বাবা না হতে পারলেও, তুমি তোমার মায়ের কাছে শ্রেষ্ঠ সন্তান হয়ে দেখাবে তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। "
কথাটুকু বলেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার পেটে চুমু খায় একটা। তারপর মাথা তুলে আনাস্তাসিয়ার কপালে, মুখে, ঠোঁটে সময় নিয়ে চুমু খায়। ভাগ্যিস অন্তসত্তা হওয়ার পর থেকে আনাস্তাসিয়ার ঘুম গভীর হয়েছে। তাই সে টের পায়নি। শেষবারের মতো রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠে,
" আমার বিষণ্ণ সুন্দর তাপস্যা,
এটাই আমার শেষ ছোঁয়া।
আমার নিশি রাতের আরাধ্যা,
আর কোনো জনমেই হবেনা পাওয়া। "
চলবে…