পর্ব ৫
#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_সামিয়া
---
ক্লাসরুমের ফ্যানটা ঘুরছে একটানা। তাসিফা ক্লাসে এসে বসতেই তিন মাথা ওর সামনে ঝুঁকে পড়ল।
তাসনিম, ইয়াশ আর সাদ একসাথে চোখ গোল গোল করে বলল,
-"কিরে লাইব্রেরিতে কে ডেকেছিল তোকে?"
তাসিফা বিরক্ত হয়ে মুখ ফুলালো,
-"জুয়িন ভাইয়া।"
হঠাৎ তিনজন একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল,
-"কিহ? কেন?"
-"উফ থাম তোরা!" তাসিফা কানে হাত দিয়ে বলল, "আমাকে বলার সময় দে আগে।"
তিনজন সাথে সাথে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ হয়ে গেল।
তাসিফা ঢোক গিলে ফিসফিস করে জুয়িনের সাথে লাইব্রেরিতে যা হলো, সব খুলে বলল। গাছ ছেঁড়া থেকে শুরু করে সব।
সাদ ঠোঁট টিপে হাসল,
-"ব্যাপারটা মজার তো!"
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"কিন্তু জুয়িন ভাই কি শাস্তি দিবে তোকে তাসিফা?"
তাসিফা আরও মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"ওই শালায় জানে কি শাস্তি দিবে, আমাকে কিছু বলেনি কি শাস্তি দিবে।"
তাসনিম চোখ টিপ দিয়ে বলল,
-"ওয়াও তাসিফা দোস্ত। ভার্সিটির ক্রাশ বয় আর তুই একই বিল্ডিং এ থাকিস।"
তাসিফা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"তো?"
সাদ ওর কাঁধে হাত রাখল,
-"শালি নিরামিষ, একই বিল্ডিংয়ে থাকলে তো তোদের মাঝে কিছু হতে পারে। সেটাও বুঝিস না।"
তাসিফা হতভম্ব হয়ে বলল,
-"কি হবে ভাই? সে খ্যাক খ্যাক ওয়ালা লোকটাকে তো আমি দুচোখে দেখতে পারি না। আর সে লোকটাও আমাকে একদম দেখতে পারেন না।"
ইয়াশ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
-"হুহ! দেখা যাবে পরে, ওই খ্যাক খ্যাক ওয়ালা লোকের এক বাচ্চার মা হয়ে যাবি।"
তাসনিম ফিক করে হেসে দিলো। তাসিফার চোয়াল ঝুলে গেল।
তাসিফা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-"আমার বয়ে গেছে উনার বাচ্চার মা হওয়া।"
তিনজন হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা।
---
ভার্সিটি থেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। ইয়াশ আর সাদ আজ ট্রিট দিলো, পেটপুরে ফুচকা খেয়ে তাসিফা বিল্ডিংয়ে ঢুকতে নিল।
হঠাৎ শোঁ করে একটা বাইক পাশ কেটে গেল। তাসিফা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সামনে তাকিয়ে দেখে জুয়িন। মাথা থেকে কালো হেলমেটটা খুলছে আস্তে আস্তে। ঘামে চুল লেপ্টে আছে কপালে।
জুয়িন ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলল,
-"এভাবে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
তাসিফা তেতে উঠল,
-"আপনি এতো বেপরোয়া ভাবে বাইক চালান কেন? আর একটু হলেতো আমাকে উড়িয়ে দিতেন।"
জুয়িন হেলমেট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
-"উড়িয়ে তো আর দেইনি।"
তাসিফা আর কথা বাড়ালো না। এক পা বাড়াতেই পেছন থেকে ডাক পড়ল,
-"এই দাড়া।"
তাসিফা জুয়িনের কথা কানে নিলো না।বাসার উদ্দেশ্যে হাটাঁ ধরল।
হঠাৎ তাসিফার ওড়নায় টান পড়ল সামান্য।
-"দাড়াতে বললাম না বেয়াদব মেয়ে।" জুয়িন গম্ভীর স্বরে বলল।
তাসিফার বুক ধুক করে উঠল। ঝট করে ওড়না ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল,
-"আপনি আমার ওড়না টেনে ধরেছেন কেন?"
-"তুই চলে যাচ্ছিস বলে।" জুয়িন শান্ত গলায় বলল।
-"তো আমি বাসায় যাবো না?"
-"যাবি। তবে আমার কথা আগে শুনে যেতে হবে।"
তাসিফা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
-"হোয়াই?"
জুয়িন এক পা এগিয়ে এসে ওর চোখে চোখ রাখল,
-"হোয়াই মানে? আমার গাছ ছিঁড়েছিস, ভুলে গিয়েছিস?"
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"আপনার কি কথা শুনব, বলুন?"
জুয়িন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে পকেট থেকে নিজের ফোন বের করল। আর বলল,
-"তোর নাম্বার বল?"
-"কেনো?"
জুয়িন চোখ পাকিয়ে বলল,
-"আবার প্রশ্ন করছিস?"
তাসিফা ভয়ে ঢোক গিলে দ্রুত নিজের নাম্বার বলে দিলো।
জুয়িন তাসিফার নাম্বার "ডাইনি" নামে সেভ করে নিলো।
-" ওকে ডান ।আমি কল দিলে ছাদে আসবি।"
বলেই হনহন করে নিজের বাসায় চলে গেল।
আর অন্যদিকে তাসিফার ইচ্ছে করছে হাত-পা ছড়িয়ে কান্না করতে।
---
তাসিফা বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে ড্রইং রুমে এলো। আলমগীর আলম আর আয়রা বেগম টিভি দেখতে দেখতে গল্প করছেন আর চা খাচ্ছেন। মেয়েকে দেখে আয়রা বেগম হাতের ইশারায় পাশে বসতে বললেন।
টিভির সাউন্ড কমিয়ে আয়রা বেগম বললেন,
-"শুনলাম ছাদে নাকি একটা ছেলে ভাড়া থাকে। আজ ভেবেছিলাম ছাদে কিছু জামা-কাপড় রোদ দিবো। ছাদে যেতে নিতেই দারোয়ান এসে বলল, এই ছাদের ফ্ল্যাটে নাকি একজন ছেলে থাকে, ছাদ সহ নাকি ভাড়া নিয়েছে। তাই এই বিল্ডিং এর কেউ ছাদে যায় না।"
তাসিফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"ছাদ পুরাটা কেন ভাড়া নিয়েছে?"
আয়রা বেগম চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
-"ছাদে ফুল-গাছ লাগিয়েছে ২০০টারও বেশি। তাই কেউ যাতে ফুল নষ্ট না করে তাই পুরা ছাদ ভাড়া নিয়েছে।"
তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-"তুমি এতো খবর কীভাবে জানলে?"
-"তোকে মাত্র না বললাম দারোয়ান বলেছে।" আয়রা বেগম হাসলেন।
---
সন্ধ্যায় তাসিফা পড়তে বসেছে। রুমের লাইট অফ করে টেবিল ল্যাম্পের আলো জ্বালালো। বই খুলতেই ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।
স্ক্রিনে ভাসছে "ভন্ডপার্টি" গ্রুপ থেকে ভিডিও কল। (এটি ইয়াশ, সাদ, তাসনিম আর তাসিফার ফ্রেন্ডস গ্রুপ)
তাসিফা কল ধরে "হ্যালো" বলল।
সাদ তাসিফাকে বলল,
-"তোর হ্যালো'এর মায়েরে চুদলিংপং।"
তাসনিম মাত্র জয়েন হয়ে বলল,
-"শালার পুত-রা তোরা কি ফুচকা খাওয়াইস? আমি বাথরুমে ৪ বার গেছি।"
তাসিফা ফিক করে হেসে দিলো।
ইয়াশ বলল,
-"কুত্তার পেটে ঘি হজম হয় নারে বান্ধুবি।"
সাদ বলল,
-"রেস্টুরেন্টের দামি ফুচকা খাওয়াইছি! তাও এডি কস শালি।"
তাসিফা হাসতে হাসতে বলল,
-"দোস্ত আল্লাহ বাঁচাইছে আমার কিছু হয় নাই।"
তাসনিম বলল,
-"তোর নজর লেগেছে। আমি খাওয়ার সময় তুই আমার ফুচকার দিকে তাকিয়ে ছিলি হুহ।"
তাসিফার মুখ হা হয়ে গেল,
-"ভাই তুই তো সেরা মাতারি। তুই উলটো আমার থেকে দুইটা ফুচকা নিয়ে খেয়ে ফেলেছিস।"
ইয়াশ মাথা চুলকে বলল,
-"ভাই বাসায় এসেছি ৪টা বাজে, বাসায় আসতে না আসতেই আম্মু বাজারের ব্যাগ হাতে ধরিয়ে দিলো। প্রায় এক ঘন্টা লেগেছে বাজার করতে।"
তাসনিম ন্যাকামো করে বলল,
-"আহারে সোনা! কত পরিশ্রমি।"
সাদ খোঁচা দিয়ে বলল,
-"বাজারের জন্য আন্টি যে টাকা দিয়েছে সে টাকার থেকে কত মেরেছিস?"
ইয়াশ লাজুক হাসি দিয়ে বলল,
-"বেশি না মাত্র পাঁচশত টাকা।"
তাসিফা চোখ বড় করে বলল,
-"শালা বাটপার।"
হঠাৎ তাসিফার ফোনের অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলো।তাই তাসিফা বন্ধুদের বলল,
-"দাঁড়া, একটা কল আসছে।"
কল কেটে দিয়ে অপরিচিত নাম্বারের কলটা ধরল। কানে দিতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বরে কেউ একজন বললেন,
-"২মিনিটে ছাদে আয়।" বলেই কল কেটে দিলো।
তাসিফা হতভম্ব হলো কিছুটা তবে বুঝতে পারল যে এই নম্বরটি জুয়িনের।
#চলবে