পর্ব ১০
#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_সামিয়া
--
হঠাৎ সামনে কারও উপস্থিতি টের পেল তাসিফা। ধীরে ধীরে সামনে তাকিয়ে ‘থ’ হয়ে গেল। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং ‘জুয়িন শিকদার’।
পকেটে হাত ঢুকিয়ে জুয়িন তাসিফার দিকে এগিয়ে গেল। তাসিফা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
জুয়িন আচমকা ধমকে বলল,
-"প্রবলেম কী তোর?”
তাসিফা কেঁপে উঠল জুয়িনের ধমক শুনে। এই একটা মানুষকেই তাসিফা প্রচণ্ড ভয় পায়। নাহলে তাসিফা ওর বাপকেও অত ভয় পায় না।
তাসিফা ঢোক গিলে বলল,
-“আমার কিসের প্রবলেম হবে?”
জুয়িন তাসিফার দিকে ঝুঁকে বলল,
-"তাহলে মাঠ থেকে লাইব্রেরিতে চলে এলি কেন?”
তাসিফার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল,
-“তো কী করব? আপনার আর আপনার প্রেমিকার ঢলাঢলি দেখব?”
জুয়িনের ভ্রু কুঁচকে গেল। হঠাৎ বাঁকা হেসে বলল,
-“উঁহু, জেলাস?”
তাসিফার মাথা ঘুরে উঠল। বিরক্ত হয়ে বলল,
-“কিসের জেলাস, আজব তো। দেখি সামনে থেকে সরুন তো।”
জুয়িন সরল না। তাসিফার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-“দেখা যাবে কে জেলাস হয়।”
বলেই হনহন করে লাইব্রেরি রুম ত্যাগ করল। আর অন্যদিকে তাসিফা ‘থম’ মেরে বসে আছে। এইমাত্র জুয়িন কী বলে গেল?...
---
আজ ভন্ডপার্টির কেউ ক্লাস অ্যাটেন্ড করল না।সবাই বৃষ্টির মধ্যে ঘুরতে চলে এসেছে। টিএসিতে এসে বসেছে সবাই।
ঢাকা ভার্সিটির টিএসি। বৃষ্টিতে পুরো জায়গাটা একদম অন্যরকম। চারপাশের শতবর্ষী বট-কড়ই গাছগুলোর ডাল থেকে টুপটাপ পানি ঝরছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, ক্যান্টিনের গরম সিঙাড়ার ঘ্রাণ আর বৃষ্টির গন্ধ মিশে বাতাসটা কেমন নেশা ধরানো লাগছে।
সামনেই লাল-সাদা রঙের ক্যান্টিন বিল্ডিং। দেয়ালে পুরোনো দেয়ালিকা, হাতে আঁকা পোস্টার। ক্যান্টিনের সামনের চায়ের দোকানে এখন পা ফেলার জায়গা নেই। স্টিলের গ্লাসে টং টং করে চা ঢালছে মামা, পাশের কড়াইতে সিঙাড়া-পুরি ভাজা হচ্ছে ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দে।
ডান পাশে মল চত্বর। ভেজা টাইলস বৃষ্টির পানিতে চকচক করছে। ছাতা মাথায় কেউ হাঁটছে, কেউ ব্যাগ মাথায় দিয়ে দৌড়াচ্ছে।
বাম পাশে কার্জন হলের গেট আবছা দেখা যাচ্ছে কুয়াশার মতো বৃষ্টির জন্য। পিচ ঢালা রাস্তায় পানি জমে গেছে। রিকশা যাচ্ছে ছলাৎ ছলাৎ করে, চাকা থেকে পানি ছিটকে এসে ছাউনির নিচে বসে থাকা মানুষগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কেউ বিরক্ত হচ্ছে না, বরং হাসছে।
ভন্ডপার্টিরা টিএসির মল চত্বরের ছাউনির নিচে বসে লম্বা বেঞ্চ দখল করে বসে আছে। টেবিলের উপর গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে, পাশে কাগজের ঠোঙায় সিঙাড়া। বৃষ্টির ছাঁট এসে মাঝে মাঝে ওদের গায়ে-মুখে লাগছে। ঠান্ডা বাতাসে শরীর কাঁপছে, তবুও কারও ওঠার নাম নেই।
ইয়াশ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
-"ভাই, ভার্সিটি মানেই চিল আর চিল।”
সবাই একসাথে বলল,
-“হ্যাঁ দোস্ত!”
তাসিফার মনটাও খুব ভালো। কারণ নিজের মেন্টালিটির মতো তিনজন বিশ্বস্ত বন্ধু ও পেয়েছে।
তাসনিম বলল,
-“আয়, ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি।”
ইয়াশ বলল,
-“হ্যাঁ, খেলা যায়।”
সবাই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলা শুরু করল।
তাসনিম তাসিফাকে জিজ্ঞেস করল,
-“ট্রুথ অর ডেয়ার?”
তাসিফা চট করে বলল,
-“ট্রুথ।”
তাসনিম শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
-"ক্রাশের নামের প্রথম অক্ষর কী?”
তাসিফা হতভম্ব হয়ে গেল। তাসনিম যে ইচ্ছে করে ওকে এই ট্রুথ দিল, সেটা ও বুঝে গেল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-"প্রথম অক্ষর কেন? পুরো নামটাই বলে দিই?”
ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,
-“হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই আপা।”
তাসিফা সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“জুয়িন শিকদার।”
সবাই একসাথে “ওহ হোও” বলে চিৎকার করে উঠল।
এবার তাসিফা ইয়াশকে জিজ্ঞেস করল,
-“ট্রুথ অর ডেয়ার?”
ইয়াশ নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে বলল,
-“অবভিয়াসলি ডেয়ার।”
তাসিফা দাঁত কেলিয়ে সামনের একটা মেয়েকে দেখিয়ে বলল,
-“ওই মেয়েটাকে গিয়ে বল ‘হেই আই লাভ ইউ বেব।’”
ইয়াশের চোয়াল ঝুলে গেল।
-"হোয়াট?”
তাসিফা চোখ পাকিয়ে বলল,
-“তোর ‘হোয়াট’ এর মায়েরে চুদলিংপং। এখন ডেয়ার পালন কর, যা।”
তাসনিম আর সাদও ইয়াশকে জোর করছে। উপায় না পেয়ে ইয়াশ এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।
মেয়েটার সামনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-"হেই আই লাভ ইউ বেব।”
মেয়েটা রেগে নিজের জুতা খুলে ইয়াশের দিকে ছুড়ে মারল।
-“চুদানিরপোয়া! ‘বেব’ মারাস?”
জুতার বারি খেয়ে এক দৌড়ে ইয়াশ নিজের বন্ধুদের কাছে এসে পড়ল। কটমট করে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জানোয়াররা! ওই মাইয়া আমারে ‘চুদানিরপোয়া’ কইছে তোদের লাইগা।”
আর অন্যদিকে ইয়াশের কথা শুনে তিনজন হো হো করে হাসতে লাগল। তাসিফার চোখে পানি চলে এসেছে হাসতে হাসতে।
--
সবাই যার যার বাসায় চলে এলো। তাসিফা বাসায় এসে দেখল আয়রা বেগম অনেক বড় পাতিলে করে গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করছেন। গরম মশলা, দারুচিনি আর গরুর মাংসের ঝাঁঝালো ঘ্রাণে পুরো রান্নাঘর ম-ম করছে। তাসিফার জিভে পানি চলে এলো।
পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
-"আজকে হঠাৎ গরুর মাংসের বিরিয়ানি?”
আয়রা বেগম হেসে বললেন,
-"আজ এতিমখানায় বিরিয়ানি পাঠাবো। অনেক দিন তো হলো সেখানে বিরিয়ানি বা কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। তাই আজ সে সাথে পাশের ফ্ল্যাটেও দিয়ে দিতে পারব।”
তাসিফা মায়ের কাঁধে থুতনি রেখে বলল,
-আচ্ছা।”
আয়রা বেগম বললেন,
-“যা এখন গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। তারপর আমি ডাক দিলে আসবি। আর ছাদের ওই ছেলেটাকেও বিরিয়ানি দিয়ে আসিস।”
কথাটা শুনে আচমকা তাসিফার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। আর কিছু না বলে ফ্রেশ হতে নিজের রুমে চলে গেল।
---
তাসিফা সবুজ রঙের চুড়িদার পরে নিল। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে পেঁচাল। কপালে ছোট্ট কালো টিপ দিল। ঠোঁটে হালকা লিপ-বাম লাগাল।
এর মাঝেই রান্নাঘর থেকে আয়রা বেগম ডাকলেন তাসিফাকে।
তাসিফা দৌড়ে গেলো রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।
---
আয়রা বেগম একটি বড় প্লেটে বিরিয়ানি বাড়ছেন। তাসিফা রান্নাঘরে আসতেই মা প্লেটটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
-"যা, গিয়ে বিরিয়ানিটা ছাদের ওই ছেলেটাকে দিয়ে আয়।”
তাসিফা মাথা দুলিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
#চলবে......