ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নাও

৩১তম পর্ব

লেখক: samia akther nadia

পর্ব ৩১

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_সামিয়া
-----
সার্ভেন্ট বড় কালো লাগেজটি এনে সবার সামনে রাখল। হাসিব উঠে লাগেজটি খুলে ফেলল।
প্রথমেই সে একটি সুন্দর ভেলভেটের বক্স বের করল। বক্সটি খুলতেই ভেতরে থাকা একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি দেখা গেল। হাসিব চুড়িজোড়া হাফসার দিকে এগিয়ে দিল।
এরপর আয়রা বেগমের জন্য বের করল একটি দামি ডিজাইনার শাড়ি। তারপর মোজাম্মেল চৌধুরীকে দিল একটি নামী ব্র্যান্ডের ঘড়ি। আলমগীর আলমের জন্য বের করল প্রিমিয়াম লেদারের একটি ওয়ালেট।
এরপর লাগেজ থেকে বের করল অনেকগুলো চকোলেট। ফেরেরো রোশার, লিন্ডট, টোবলেরোন, গ্যালাক্সি, কিটক্যাট, স্নিকার্সসহ নানা ধরনের চকোলেটের বেশ কয়েকটি প্যাকেট।
সবশেষে হিয়ার জন্য বের করল পাঁচটি নামী ব্র্যান্ডের হ্যান্ডব্যাগ। হ্যান্ডব্যাগগুলো হাতে পেয়েই হিয়া খুশিতে নেচে উঠল।
তবে তাসিফার জন্য হাসিব কিছুই বের করল না।
বিষয়টা দেখে হাফসা বললেন,
-“তাসিফারটা কোথায়? সবার জন্য আনলি, আর ওর জন্য আনিসনি?”
হাসিব একবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ভুলে গেছিলাম। সরি।”
তাসিফা কিছু বলল না। আশ্চর্যজনকভাবে কথাটা শুনে তার মনও খারাপ হলো না।
ঠিক তখনই তার মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। তাসিফা মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, হোয়াটসঅ্যাপে জুয়িনের মেসেজ এসেছে। সে দ্রুত মেসেজটি ওপেন করল।
মেসেজটা পড়তেই অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল।
জুয়িন লিখেছে,
-“আফিম নয়, তোর চোখজোড়াই আমার আসল নেশা।”
মেসেজটা পড়ে তাসিফা মুচকি হেসে ফেলল। তবে এতক্ষণ পর জুয়িন কেন মেসেজ করল, সেটা ভেবেও অবাক হলো।
তাসিফা হেসে হঠাৎ মোবাইল থেকে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখল, সবাই হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তাসিফা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল,
-“আমি একটু রুমে যাচ্ছি। একটু পর আবার আসব।”
কথাটা বলেই সে নিজের রুমে চলে গেল।
---
রুমে এসে তাসিফা জুয়িনের মেসেজটার কী রিপ্লাই দেবে, সেটাই ভাবতে লাগল। মেসেজটা পড়লেই কেমন যেন লজ্জা লাগছিল তার।
কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে অবশেষে তাসিফা রিপ্লাই দিল,
-“এত সুন্দর কথা বলতে শিখলেন কবে থেকে, জুয়িন ভাইয়া?”
মেসেজটা পাঠিয়েই তাসিফা মোবাইলটা পাশে রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ল।তারপর নিজের অজান্তেই খুশিতে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল।
ঠিক তখনই হিয়া রুমে ঢুকল।তাসিফাকে এমন করতে দেখে হিয়ার চোখ কপালে উঠে গেল।
তাসিফা হিয়াকে দেখেই থেমে গিয়ে অপ্রস্তুতভাবে উঠে বসল আর বলল,
-"কী হয়েছে?”
হিয়া বলল,
-“খেতে আয়। সবাই নিচে অপেক্ষা করছে।”
তাসিফা মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর হিয়ার সঙ্গে আবার নিচে চলে গেল।
----
ডাইনিং টেবিলে হাসিবের সব পছন্দের খাবার সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বিশেষ করে গরুর মাংস হাসিবের ভীষণ পছন্দ। হাফসা যেন ছেলের পছন্দের কোনো খাবারই বাদ রাখেননি।
এক এক করে সবাই ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে। হিয়া আর তাসিফাও পাশাপাশি বসেছে। শুধু হাসিব তখনও ওয়াশরুমে।
কিছুক্ষণ পর সবাই বসে গেলেও হাসিবের অপেক্ষাতেই যেন খাওয়া শুরু হয়নি।
অবশেষে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে এসে হাসিব চারপাশে তাকাল। মাত্র একটি চেয়ারই খালি রয়েছে। আর দুর্ভাগ্যবশত, সেটাই তাসিফার পাশের চেয়ার।
হাসিব কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে রইল। উপায় না দেখে গম্ভীর মুখে গিয়ে তাসিফার পাশের চেয়ারটিই দখল করে বসে পড়ল।
পাশ ফিরে হাসিবকে দেখেই তাসিফা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হঠাৎ করেই যেন ভীষণ অস্বস্তি লাগতে শুরু করল তার। আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে না পেরে আচমকাই উঠে দাঁড়াল।
তাসিফা উঠে দাঁড়াতেই সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
তাসিফা হিয়ার দিকে ঝুঁকে আস্তে করে বলল,
-"হিয়া আপুই, তুই আমার চেয়ারটায় বস। আমাকে তোর চেয়ারে বসতে দে।"
হিয়া একবার হাসিবের দিকে তাকাল, তারপর তাসিফার দিকে। তাসিফার মুখ দেখে বোঝা গেল, সে একদম সিরিয়াস। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে হিয়া নিজের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে তাসিফাকে সেখানে বসতে দিল। আর নিজে এসে তাসিফার আগের চেয়ারটায় বসে পড়ল।
এদিকে হাসিবের মুখ থমথমে হয়ে আছে। তাসিফা তার পাশে বসতে চাইছে না দেখে তার মনে হলো, গিফট না দেওয়ায় হয়তো তাসিফা তার ওপর রাগ করেছে।
কথাটা ভাবতেই হাসিবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
হাফসা তখন সবার প্লেটে একে একে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। পাশে থাকা সার্ভেন্টও প্রয়োজনমতো এটা-সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। সবাই বেশ আনন্দের সঙ্গেই খেতে শুরু করল।
আজকের রান্নাটা যেন একটু বেশিই ভালো হয়েছে। খাবারের স্বাদে সবাই মুগ্ধ।
হাসিব নিজের প্লেটে থাকা গরুর মাংসের এক টুকরো মুখে দিয়ে মায়ের দিকে তাকালো। স্বাদে সন্তুষ্ট হয়ে হেসে বলল,
-"মা, সব রান্নাই অনেক মজা হয়েছে।"
হাফসা হেসে বললেন,
-"আর লাগলে বলিস।"
----
সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে একে একে ডাইনিং থেকে উঠে পড়েছে। তাসিফা আর হিয়াও শাড়ি বদলানোর জন্য নিজেদের রুমের দিকে চলে গেছে।
এদিকে হাসিবও নিজের রুমে ফিরে এল। রুমে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে বিছানায় গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই বারবার তাসিফার মুখটাই ভেসে উঠতে লাগল।
হাসিবের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। তাসিফার ছোটবেলার কথাগুলো মনে পড়তেই সে আস্তে করে বলল,
-"জান, দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেলি! আমার মতো অধমের কথা তো নিশ্চয়ই তোর মনে নেই।"
কথাটা বলেই নিজেই হেসে ফেলল হাসিব।
কিছুক্ষণ পর বালিশের পাশ থেকে নিজের মোবাইলটা তুলে নিল সে। স্ক্রিনে কয়েকবার টোকা দিয়ে গ্যালারিতে ঢুকে তাসিফার ছবিটা বের করল।
ছবিটায় নীল শাড়িতে তাসিফাকে যেন একেবারে অন্যরকম লাগছে। নীল শাড়ির সঙ্গে তার পুরো সাজটা মিলেমিশে তাকে আরও মায়াবী করে তুলেছে। ড্রইংরুমে সবার আড়ালে থেকেই ছবিটা ক্যামেরাবন্দি করেছিল হাসিব।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব রইল সে। তারপর নিজের অজান্তেই খুব আস্তে করে বিড়বিড় করে বলল,
-"আমার নীলাঞ্জনা।"
কথাটা বলার সময় তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
----
অন্যদিকে, জুয়িনও নিজের রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার নিজের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা এখনও তার মাথা থেকে বের হচ্ছে না।
তাসিফার ছবি দেখেই কীভাবে সে জ্ঞান হারাল, সেটাই ভেবে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার মনে হলো, সত্যিই কি ছবিটা দেখেই এমন হয়েছিল? নাকি ব্লাড সুগার কমে যাওয়ার কারণেই হঠাৎ মাথা ঘুরে গিয়েছিল?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই জুয়িন হেসে ফেলল।
তারপর দুহাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে জুয়িন বিড়বিড় করে বলল,
-"এভাবে হঠাৎ হঠাৎ ছবি পাঠিয়ে আমাকে হার্ট অ্যাটাক করানোর প্ল্যান করছে নাকি এই বেয়াদব মেয়েটা।"
----
তাসিফা শাড়ি বদলে নিতেই হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, ''ভন্ডপার্টি'' গ্রুপ থেকে ভিডিও কল এসেছে। তাসিফা হেসে কলটি রিসিভ করল।
সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশ চেঁচিয়ে উঠল,
-“কুত্তা! আমাদের তো একদম ভুলেই গেছিস! তোর মতো জানোয়ার আমি আমার লাইফে আর দেখিনি।”
তাসিফা হেসে বলল,
 -“ক্ষমা দোস্ত। একটু ব্যস্ত ছিলাম।”
-"ব্যস্ত ছিলি, নাকি আমাদের ভুলে গেছিস?” ইয়াশ মুখ বাঁকিয়ে বলল।
তাসিফা হেসে বলল, 
-“আরে না! তোদের কথা মনে পড়েছে।”
সাদ এবার বলল, 
-“তাসিফা, বল তো, তুই কবে ফিরবি? একদম ভালো লাগছে না বাল। তুই না থাকায় ভার্সিটিতেও যেতে ইচ্ছে করছে না।”
তাসিফা মুচকি হেসে বলল,
 -“হাসিব ভাইয়া আজই এসেছে। উম, মনে হয় কাল বা পরশু ফিরব। মা-বাবা তো এখান থেকে ফেরার নামই নিচ্ছে না।”
তাসনিম হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, -"আচ্ছা, তোর ফুফাতো ভাই কেমন দেখতে?”
তাসিফা একটু ভেবে বলল, 
-“উম, খারাপ না। দেখতে সুন্দরই। তবে জুয়িন ভাইয়ার থেকে বেশি সুন্দর না। তবে সুন্দর।”
তাসনিম শুধু বলল,
 -“ওহ।”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল, 
-“এই যে! তুলনাও করে ফেলেছিস।"
তাসিফা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,
 -“আহা, চুপ কর তো।"
তাসনিম আর সাদ হেসে উঠল।
এরপর চারজন আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা আর ভার্সিটির নানা বিষয় নিয়ে কথা বলল। 
বেশ কিছুক্ষণ পর তাসিফাই বলল, 
-“আচ্ছা, এখন রাখি। পরে আবার কথা হবে।”
সবাই বিদায় নিয়ে কলটি রেখে দিল।
-----
রাতে তাসিফা আর হিয়া একসঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘরের দরজায় অবশ্য কোনো ছিটকিনি নেই। হিয়া বরাবরই দরজা আটকে ঘুমাতে ভয় পায়। তাই প্রতিদিনের মতো আজও দরজাটা শুধু ভেজানো ছিল।
দুজন দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। সারাদিনের ব্যস্ততায় অকারণেই যেন দুজনেই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
রাত তখন প্রায় দেড়টা।
হঠাৎ ভেজানো দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। নিঃশব্দে একজন ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সে তাসিফার বিছানার পাশে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে তাসিফার দিকে ঝুঁকে পড়ল সে।
তাসিফা তখন গভীর ঘুমে। তবুও হঠাৎ তার কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল। মনে হলো, আশপাশে কেউ একজন আছে। ঘুমের মধ্যেই কপালটা সামান্য কুঁচকে গেল তার।
পরক্ষণেই আচমকা চোখ মেলে তাকাল তাসিফা।
চোখের সামনে থাকা মানুষটাকে দেখেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
তাসিফা কখনোই কল্পনা করেনি, এই মানুষটা মাঝরাতে এভাবে তার ঘরে এসে দাঁড়াবে।
তাসিফা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
-“আপনি এই সময় এখানে কেন?”
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন