#এই প্রেমের ফাগুনে
#তানজিনা আক্তার অন্তরা
সকলের সঙ্গে ছায়ার পূর্বপরিচয় ছিল না। একমাত্র রিহাদ ছাড়া।
আলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পরই রিহাদের মাধ্যমে ছায়ার পরিচয় হয়েছিল সবার সঙ্গে। যদিও তারও বহু আগে, খুব ছোটবেলায় একবার চৌধুরী বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার।
কিন্তু সেই বয়সের স্মৃতিগুলো আজ ছায়ার মনে কেবলই ঝাপসা কিছু ছবির মতো—কিছু মুখ, কিছু হাসি, কিছু অস্পষ্ট মুহূর্ত। সময়ের স্রোতে যেগুলোর বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে।
তবে রিহাদের স্মৃতিতে সেই দিনগুলো এখনো বেশ জীবন্ত।
ছোটবেলা থেকেই রিহাদ ছায়াকে ছোট বোনের মতো ভাবত। তাদের সম্পর্কটাও ছিল ঠিক তেমনই—খুনসুটি, ঝগড়া, অভিমান আর মুহূর্তেই সব ভুলে গিয়ে আবার পাশাপাশি বসে পড়া। দুজনের মধ্যে ছিল বেশ গলায় গলায় ভাব। একজন আরেকজনকে সুযোগ পেলেই জ্বালাতন করত, আবার বিপদে পড়লে সবার আগে পাশে দাঁড়াত।
চৌধুরী বাড়ির মানুষজনও সিকদার বাড়িতে অপরিচিত ছিলেন না।
প্রায় দুই বছর আগেও তারা সিকদার বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু এরপর আর আসা হয়নি। সেই সময় ছায়া গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। ফলে তাদের সঙ্গে ছায়ার দেখাও হয়নি।
অথচ একটা সময় ছিল, যখন চৌধুরী বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে ছায়ার সম্পর্ক ছিল একেবারেই আপনজনের মতো।
খুব ছোটবেলায় চৌধুরী বাড়ির মানুষদের সঙ্গে ছায়ার বেশ গলায় গলায় ভাব ছিল। তাদের বাড়িতে গেলে সারাদিন হৈচৈ, হাসি-ঠাট্টা আর ছোটাছুটিতে কেটে যেত সময়। তখন সম্পর্কের মাঝে কোনো দূরত্ব ছিল না, ছিল না সময়ের হিসাব। সবাই ছিল সবাইকে ঘিরে।
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর।
একসময় যে মানুষগুলো ছিল খুব কাছের, সময়ের ব্যবধানে তারাই হয়ে যায় দূরের কোনো স্মৃতি। কিছু সম্পর্ক বেঁচে থাকে, অথচ তাদের মাঝের পথগুলো হারিয়ে যায়।
সায়র মির্জা, আসরাফ সিকদার আর মাহবুব চৌধুরী ছিলেন ছোটবেলার বন্ধু। তিনজনের বন্ধুত্ব ছিল সময়ের মতোই পুরোনো—অটুট আর গভীর।
সায়র মির্জা আর মাহবুব চৌধুরীর স্বপ্ন ছিল নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে সফল ব্যবসায়ী হওয়া। আর আসরাফ সিকদারের স্বপ্ন ছিল দেশের নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়া।
তিন বন্ধু তিনটি আলাদা স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেছিলেন। আর ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায় তিনজনই একসময় নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন।
তারপর একে একে বিয়েও করলেন তারা।
তাদের সংসার আলো করে এলো সন্তানরা। আরোহি চৌধুরী, ছারা সিকদার আর রুহানি মির্জা—তাদের বন্ধুত্বও যেন পরের প্রজন্মে এসে নতুন রূপ পেল। তিনজন একে অপরের এতটাই কাছের ছিল যে, তাদের বন্ধুত্ব দেখলে মনে হতো—এই সম্পর্ক বুঝি কোনোদিন ভাঙার নয়।
কাজের ফাঁকে একটু ছুটি পেলেই তিন পরিবার একত্র হতো। কখনো চৌধুরী বাড়িতে, কখনো সিকদার বাড়িতে, আবার কখনো মির্জা বাড়িতে।
আড্ডায় মেতে উঠত পুরো বাড়ি।
হাসি, গল্প, পুরোনো দিনের স্মৃতি আর ছোটদের দুষ্টুমিতে মুখর হয়ে থাকত চারপাশ। সেসব দিন যেন আজও পুরোনো অ্যালবামের পাতায় আটকে আছে—ছুঁয়ে দেখলেই বুকের ভেতর কোথাও একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।
সেই সময়টাতেই ছায়া আর রিশাদের সম্পর্কটা মোটেও ভালো ছিল না।
বরং তাদের সম্পর্ক ছিল একে অপরকে বিপদে ফেলার নিত্যনতুন ষড়যন্ত্রে ভরা।
রিশাদের কোনো জিনিস ছায়ার চোখে পড়লেই সেটা গায়েব হয়ে যেত। কখনো লুকিয়ে রাখত, কখনো চুরি করে নিয়ে যেত, আবার কখনো এমনভাবে অভিনয় করত যেন কিছুই জানে না। আর রিশাদও কম যেত না। সুযোগ পেলেই ছায়াকে জব্দ করার ফন্দি আঁটত।
তাদের সেই ছোটবেলার ঝগড়াগুলোতে রাগের চেয়ে দুষ্টুমিই ছিল বেশি।
কিন্তু জীবন সবসময় একই রকম থাকে না।
একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ছায়ার পুরো পৃথিবীটা বদলে দিয়েছিল।
সেদিন ছিল ছায়ার জন্মদিন।
তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য তার বাবা-মা কিছু না জানিয়েই ছোট্ট ভাই সৌরভকে সঙ্গে নিয়ে মার্কেটে বেরিয়েছিলেন। ছায়ার জন্য জন্মদিনের আয়োজন করবেন, পছন্দের জিনিস কিনবেন—এই ছোট্ট পরিকল্পনাটুকুই ছিল তাদের।
কিন্তু তারা কেউই জানত না, সেটাই হতে যাচ্ছে তাদের শেষ যাত্রা।
পথের সেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল ছায়ার বাবা-মাকে।
ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন তার বাবা।
তার মা গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আর মাত্র একদিন বেঁচেছিলেন তিনি।
আর চার বছরের ছোট্ট সৌরভ?
সৌরভের কী হয়েছিল, সে প্রশ্নের উত্তর আজও ছায়ার কাছে অন্ধকার।
সে জানে না তার ভাই বেঁচে আছে, নাকি সেই দুর্ঘটনাতেই হারিয়ে গেছে।
শুধু এটুকু জানে—সৌরভকে সে হারিয়েছে।
আর সেই হারানোর সত্যিটা মেনে নিতে পারেনি কোনোদিন।
আজও গোপনে সৌরভকে খুঁজে বেড়ায় ছায়া। কাউকে কিছু না জানিয়েই। বুকের ভেতর একটুকরো আশা বাঁচিয়ে রেখে—হয়তো কোথাও তার ছোট্ট ভাইটা বেঁচে আছে। হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘আপু।’
এই একটি শব্দ শোনার অপেক্ষাতেই যেন ছায়ার ভেতরের একটা অংশ আজও আটকে আছে সেই ছোটবেলায়।
হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন রুহানি মির্জা।
শেষ মুহূর্তে ছায়ার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ সারা সিকদারের হাতে। কাঁপা কণ্ঠে, বুকভরা অসহায়ত্ব নিয়ে বলেছিলেন—
“তুমি আমার বোনের মতো আমার মেয়েটার যত্ন নিও। ওকে কষ্ট দিও না। আর যদি কখনো ও কোনো সমস্যা করে, তাহলে ওকে ওর নানুর বাড়ি নোয়াখালীতে পাঠিয়ে দিও। আমার মেয়ে…”
কথাগুলো শেষ করতে পারেননি তিনি।
ছায়ার কোলেই মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন রুহানি মির্জা।
সেদিন ছায়া কেঁদেছিল।
এমনভাবে কেঁদেছিল যে তার কান্নার শব্দ হাসপাতালের দেয়াল পেরিয়ে যেন প্রতিটি দরজায় গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিল। তার বুকফাটা আর্তনাদ শুনে আশপাশের মানুষগুলোর চোখেও পানি এসে গিয়েছিল।
সেদিন তার কান্না থামছিল না।
মনে হচ্ছিল, মেয়েটার বুকের ভেতর জমে থাকা সবকিছু একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
সেই দিনের পর আর ছায়াকে কেউ কাঁদতে দেখেনি।
যেন তার চোখের সব পানি সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
ছারা সিকদার আর আসরাফ সিকদার তাকে বুকের মধ্যে আগলে নিলেন। নিজের মেয়ের মতো করে মানুষ করার দায়িত্ব নিলেন। ছায়া তাদের ঘরে আশ্রয় পেল, পেল নতুন পরিচয়, নতুন পরিবার।
কিন্তু তার অতীতটা?
সেটা তো আর এত সহজে মুছে যাওয়ার ছিল না।
রুহানি মির্জা আর সায়র মির্জা পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। সেই অপরাধে রুহানির পরিবার তাদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি। অভিমানে তারা রুহানির সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
তারা জানতই না, তাদের ছোট মেয়েটা আর পৃথিবীতে নেই।
জানত না, তাদের অভিমান করার মানুষটিই চিরতরে চলে গেছে।
হয়তো জানলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।
হয়তো শেষবারের মতো মেয়েটার মাথায় হাত রেখে তারা বলতে পারত—‘ফিরে আয়।’
কিন্তু জীবন কাউকে সব সুযোগ দেয় না।
আর কিছু ভুলের ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও মানুষ পায় না।
ছায়ার বাবা-মায়ের মৃত্যু সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা ছিল না—এমন সন্দেহও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। কারণ দুর্ঘটনার পরও একের পর এক ছায়ার ওপর হামলা হতে থাকে।
তখন সবাই বুঝতে পারে, সেই ভয়াবহ ঘটনার পেছনে কোনো অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে।
ছায়ার চাচা-ফুফুরাও ছিল। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কেউ তার খোঁজ নেয়নি। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও কেউ এসে দাঁড়ায়নি পাশে।
যে বয়সে একটা শিশুর মাথায় বাবা-মায়ের হাত থাকার কথা, সেই বয়সেই ছায়াকে শিখতে হয়েছিল—সব সম্পর্ক আপন হয় না।
কিছু মানুষ শুধু রক্তের সম্পর্কের হয়।
আর কিছু মানুষ হয়ে ওঠে হৃদয়ের।
ছায়ার জীবনে সারা সিকদার আর আসরাফ সিকদার সেই দ্বিতীয় ধরনের মানুষ হয়ে এসেছিলেন।
চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে অবশ্য পুরোপুরি যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। ছারা সিকদারের সঙ্গে তাদের ফোনে কথা হতো। দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্কের সুতোটা কোথাও যেন পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়নি।
তবুও ছায়ার কাছে এসব এখন কেবলই অতীত।
একটা বিষাক্ত অতীত।
যেখানে ভালোবাসা ছিল, হাসি ছিল, আপন মানুষ ছিল
—আর তারপর একদিন সবকিছু হারিয়ে গিয়েছিল।
কিছু স্মৃতি মানুষ ভুলে যেতে চায়।
কিন্তু কিছু স্মৃতি মানুষকে ভুলতে দেয় না।
ছায়ার জীবনও ঠিক তেমনই কিছু না বলা স্মৃতির ভার বয়ে চলেছে।
আলো আর রিহাদের সম্পর্কটা আজ থেকে নয়, প্রায় দুই বছর আগের। সেই প্রথম দেখাতেই দুজন দুজনের প্রেমে একেবারে উষ্টা খেয়ে পড়েছিল। তবে শুরুটা এতটা সহজ ছিল না। আলো প্রথমে কিছুতেই রাজি হতে চায়নি। কিন্তু রিহাদও নাছোড়বান্দা—ভালোবাসা, বোঝানো আর নানা রকম কসরত করে শেষ পর্যন্ত আলোকে রাজি করিয়েই ছেড়েছিল।
কিছুদিন আগেই তারা পরিবারের কাছে নিজেদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছিল। প্রথমে দুই পরিবারের কেউই বিষয়টা খুব সহজভাবে নেয়নি। নানা দুশ্চিন্তা, প্রশ্ন আর আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ভালোবাসার পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং দুজনের সম্পর্ক মেনে নিয়ে পরিবারের সম্মতিতেই কথা বলে শুক্রবার দিনটি ঠিক করা হয়েছে তাদের এনগেজমেন্টের জন্য।
চৌধুরী বাড়ির সবাই ভেতরে ঢুকতেই ছায়া, আরিয়ান আর চড়ুই একসঙ্গে তাদের দিকে তাকিয়ে লম্বা করে সালাম দিল।
—আসসালামু আলাইকুম।
সালামের জবাব দিয়ে সকলে শান্ত চোখে ছায়ার দিকে তাকাল।
ইশা, ইকরা আর অহনা যেন এতক্ষণ ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।তারা রিহাদের থেকে ছায়ার চোখ সম্পর্কে শুন ছিল সেই থেকে ছায়ার প্রতি আগ্রহ তাদের আরও বেশি বেড়ে গেল। ছায়াকে একবার সামনে থেকে দেখার। তিনজন একসঙ্গে এগিয়ে এসে ছায়াকে জড়িয়ে ধরল।
—তুমি ছায়া, তাই তো? আমি ইশা।
—আর আমি ইকরা!
—আর আমি অহনা। তোমার সঙ্গে আজকে কিন্তু অনেক গল্প করব!
তিনজনের এমন হইচইয়ে ছায়া প্রথমে খানিকটা ভড়কে গেল। এতগুলো নতুন মানুষের মাঝে হঠাৎ এমন আপন করে নেওয়াটা তার জন্য একটু অপ্রস্তুতকরই ছিল। তবে মুহূর্ত কয়েকের মধ্যেই অস্বস্তিটা কেটে গেল। মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে তাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করল সে।
সবাইকে ভেতরে বসার জন্য নিয়ে গেল ছায়া। একে একে সবাই বসে পড়লেও ছায়া তাদের পাশের চেয়ারটায় দাঁড়িয়ে রইল।
আরোহী চৌধুরী আর মাহবুব চৌধুরীও তখনো বসেননি। দুজনেই একবার ছায়ার দিকে তাকালেন। তারপর সারা সিকদারের দিকে চোখের ইশারা করলেন আরোহী চৌধুরী।
চোখের সেই ইশারার অর্থ বুঝে সারা সিকদারও ছায়ার দিকে একবার তাকালেন।
আরোহী চৌধুরীর চোখে তখন কৌতূহল।
নিচু গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
—ও কি সেই?
চলবে...........