কিরে ইশা শেষ পর্যন্ত ভাইজান তোকে এক ডিভোর্সি ছেলের সাথে বিয়ে দিলো?আমার রাকিনের জন্য ভাইজানের কাছে তোর হাত চাইলাম কিন্তু দিলোনা বললো... কোনো বখাটে, অভদ্র ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে না। কিন্তু এখন কি খুব ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিয়েছে? ছেলের চরিত্রের দোষ না থাকলে কি আর ডিভোর্স হতো? মানলাম ছেলের টাকা আছে, টাকা থাকলেই কি সব হয়? আমার ছেলেটা না হয় বখাটেই ছিলো কিন্তু ডিভোর্সি তো আর ছিলো না। একদিন ঠিকই বুঝবে কাকে হারিয়েছে হুহ!
উপরোক্ত কথা গুলো ইশাকে বললো তার একমাত্র ফুপ্পি #আয়রা_বেগম। ইশার পুরো নাম #ঈশিতা_ইশা। এবার এইচএসসি দিয়েছে এখন এডমিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ইচ্ছে সে একজন শিক্ষিকা হবে।কিন্তু এখন আর সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা আল্লাহ ভালো জানেন। কিছুদিন আগে একজন মহিলা তাকে দেখতে আসে তার ছেলের জন্য, পাড়াপ্রতিবেশী হিসেবে ফুপ্পি হয়।সেদিন তার পছন্দ হয় তাকে কথা ছিলো আজকে ছেলেসহ দেখতে আসবে কিন্তু দেখতে এসে যে বিয়ে পড়িয়ে ফেলবে এটা জানা ছিলো না ইশার। যতো কথা বাবার সাথেই হয়েছে তবে কেউ তাকে বলেনি ছেলে ডিভোর্সি। বাবা-মা তার সাথে এমনটা কিভাবে করলো? এমনতো না যে তার বাবা খুব গরিব তার খরচ বহন করতে সমস্যা হচ্ছিল। তাদের এই গ্রামের আর ৮/১০ ধনি ব্যক্তিদের মাঝে তার বাবাও একজন। বিয়েতে অমত করেছিলো কিন্তু কেউ তার কথা শুনলো না সবার একটাই কথা ছেলে ভালো, ছেলের পরিবার ভালো। ইশার নিজেরও কোনো পছন্দ ছিলো না তাই জোর দিয়ে কিছু বলেওনি।
এসব ভেবে ইশার চোখ বেয়ে পানি পরছে। চোখ মুছে মাথা তুলে দেখে ফুপ্পি তাকে এসব বলে এখান থেকে চলে গেছে। ইশা ঘরে এখন একা তার সাথে কেউ নেই সবাই ড্রয়িং রুমে। ড্রয়িং রুম থেকে কিছু মানুষের কথা শোনা যাচ্ছে। যতো দূর বোঝা গেলো এখন হয়তো তাকে বিদায় দেওয়া হবে কারণ সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর ছেলের বাড়ি যেতে দু'ঘন্টার মতো সময় লাগবে।ইশাদের বাড়ি গ্রামে আর ছেলের বাড়ি শহরে। গ্রাম হলে বেশ উন্নত জায়গাটা।কিছুক্ষন পর #ফরহাদ_শেখ মেয়ের কাছে এসে মাথায় হাত রেখে বলেন...
"বাবার উপর খুব রাগ আম্মু? রাগ করে থেকো না, তুমি রাগ করলে আমার ভালো লাগে না। বাবা যা করেছি তোমার ভালোর জন্যই করেছি। বাবার উপর একটু আগে ভরসা রেখো, বাবা তোমার খারাপ চাই না। ও বাড়ির সবার সাথে মানিয়ে নিয়ো। আর বাবাকে ভুল বুঝো না আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আমার আম্মু।"
কথা গুলো বলে ফরহাদ শেখ আড়ালে চোখ মুছেন। আস্তে ইশার রুমে তার মা, চাচি,ছোট ভাই, চাচাতো ভাই-বোন সবাই এসে দাঁড়ায়। ইশা চোখে পানি নিয়ে সকল কে দেখতে থাকে।
ভাবতেই তো কষ্ট হচ্ছে আজকের পর সে আর এই লোক গুলোর সাথে সবসময় থাকতে পারবে না। একসাথে আর আড্ডা দেওয়া হবে না, খাবার টেবিলে আর ঝগড়া করা হবে না কারো সাথে। বাবা বাহির থেকে খাবার জিনিস নিয়ে এসে আর আম্মু বলে ডাকবে না। নিজ হাতে খেতে ইচ্ছে না হলে মার মতো কেউ মুখে তুলে খাইয়ে দিবে না। হঠাৎ ইচ্ছে হলে তাসনিমের সাথে শাড়ি পরে ছবি তোলা হবে না। কিভাবে থাকবে এদের ছাড়া ওই দূরে?
ইশার মা #মুনিরা_শেখ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কান্না করতে থাকেন।
"মার উপর রাগ করে থাকিস না। যখন সময় পাবি তখনই মাকে কল দিবি। ইচ্ছা হলেই চলে আসবি এখানে। জামাইয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করবি। আমাদের জন্য চিন্তা করবি না। ভালো মতো খাওয়া-দাওয়া করবি। আমি আমার সোনা মেয়েটাকে অনেক মিস করবো।"
মুনিরা শেখ মেয়েকে জড়িয়ে আরো অনেক কথা বলেন।কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে লাল শাড়ি পরা তার পুতুলটাকে মন ভরে দেখতে থাকেন।
" আমি তোমাকে যেতো দিবোনা আপুনি। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। তুমি চলে গেলে আমাকে খাইয়ে দিবে কে? ঘুম পাড়িয়ে দিবে কে? গোসল করিয়ে দিবে কে? আম্মুর বকা থেকে বাচাবে কে? জানো ওরা সবাই বলছে তোমাকে নাকি ওই লম্বু ভাইয়াটা তার বাসায় নিয়ে যাবে। কিন্তু কেন? আর বললেই তো আমি নিতে দিবো না। আমার বোন আমার কাছেই থাকবে, কোথাও যাবে না।"
ছোট ভাই #রায়ান_শেখ_নীলকে জরিয়ে এবার ইশা শব্দ করে কেঁদে উঠে। একে একে তাসনিম বড় চাচি সবাই মিলে জরিয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। দেরি হয়ে যাওয়ায় এবার ছেলের বাড়ির মানুষ তাড়া দিতে থাকে। একে পাশে বড় চাচি আরেক পাশে তাসনিম ধরে ইশাকে উঠোনে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। ফরহাদ এবং মুনিরা শেখ বেয়াই-বেয়াইনের সাথে কথা বলে,মেয়েকে দেখে রাখতে বলে। ফরহাদ শেখ মেয়ের হাত জামাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলেন...
"আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। যত্নে রেখো, ও আমার বড় আদরের। যদি কখনো আমার মেয়েকে তোমার কাছে বিরক্ত মনে হয় তাহলে তাকে কষ্ট দিয়ো না। আমাকে শুধু একবার বলো আমি গিয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে আসবো।"
ইশা বাবার কথা কথা শুনে চুপচাপ চোখের পানি ফেলতে থাকে। ইশার বাড়ির সবাইও কাঁদতে থাকেন। এর মধ্যে ছেলে পক্ষ বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেন। ছেলের বাড়ির মোট দুইটা গাড়ি। একটায় ইশার শ্বশুর-শাশুড়ি আরেকটায় ইশা ও তার বর আর ছেলের নানা বাড়ি তো তাদের এলাকায় সেই বাড়ির মানুষও ছিলো।বিয়েতে তেমন কেউ উপস্থিত ছিলোনা। ড্রাইভার গাড়ি চালানো শুরু করে। ইশা বড় চাচা #নজরুল_শেখ এর কোলে থাকে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, একসময় চোখের আড়াল হয়ে যায়।
ইশা চোখে তোলে পাশের মানুষটার দিকে এক পলক তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলে। আচ্ছা মানুষটার নাম কাজী তখন যেনো কি বলেছিল? কিছুক্ষণ ভাবার পর মনে পরে কাজী বলেছিল... #তেহরিদ_সিকদার_তূর্জয়। তাহলে তার শ্বশুর বাড়ির মানুষ সিকদার পরিবারের। আচ্ছা লোকটা কি তাকে মেনে নিবে? নাকি এখনো তার প্রথম স্ত্রীকে ভালোবাসে? আর প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছিলো কি জন্য?
এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ইশা ঘুমিয়ে পরে।
তেহরিদ একবার ইশার মুখের দিকে তাকায়, যদিও মুখটা দোপাট্টা আড়ালে। মুখটা ভালো মতো দেখাও যাচ্ছে না একপাশে কাত হয়ে শুয়ে আছে। তেহরিদ চোখ সরিয়ে আবার সামনের দিকে তাকায়। আচ্ছা তার মা-বাবা তার অতীত সম্পর্কে সব জানিয়েছে তো? আর এখন না জানালেও কিছু করার নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। যদিও এখনই সে বিয়ে করতে চায়নি। নিজেকে আরো ২/৩ টা বছর সময় দিতে চেয়েছিলো এসবের জন্য। তেহরিদ বন্ধুদের সাথে টুরে গিয়েছিলো। হঠাৎ মা ফোন দিয়ে বলে নানি নাকি খুব অসুস্থ। তাই নানিকে দেখতে আসছিলো কিন্তু আসার পর এভাবে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দেয়।তেহরিদ চোখ বুজে সিটে মাথা এলিয়ে দেয়।
এই বিয়ের জন্য প্রস্তুতি ছিলো না এখন। সে এখনো নুসরাতের করা বেইমানির কথা ভুলতে পারেনি। তার কাছে এখন সবাইকে ফেইক মনে হয়, সবাই একই। আল্লাহ যেনো সব ভালো করেন। এখন একমাত্র আল্লাহ'ই ভরসা। তিনি ভালো জানেন সামনে কি হবে।
এভাবেই কখন যে ২ ঘন্টা কেটে যায় কেউ বুঝতে পারে না। ড্রাইভার গেইট দিয়ে বাড়িতে ঢুকে গাড়ি থামিয়ে দেয়। হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দেওয়ায় তেহরিদ চোখ খুলে দেখে বাড়িতে চলে এসেছে। কিন্তু মেয়েটা এখনো বেঘোরে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা সে কি মেয়াটাকে ডাকবে?কিন্তু কি বলে ডাক দিবে?
এর মধ্যে তেহরিদের মা #মেহজাবিন_সিকদার জানালায় টোকা দিয়ে তাদের নামতে বলেন। অনেক ভেবে তেহরিদ কিছুটা উঁচু গলায় গম্ভীর সুরে ডাক দেয়...
"এই মেয়ে উঠো আমরা বাসায় চলে এসেছি। "
#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
#সূচনা_পর্ব