#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
#পর্ব_৩
.
.
.
সকাল যখন প্রায় সাড়ে ৮ টা বাজে ঠিক তখন ইশার ঘুম ভাঙে। ইশা আস্তে আস্তে চোখ মেলে আশে পাশে তাকায়। রুমের মধ্যে ইশা একাই, এখনো সেই রাতের মতো সাজসজ্জা। বিছানার অন্য পাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে রাতে এখানে কেউ ঘুমিয়েছে। তেহরিদ ছাড়া অন্য কেউ নয় নিশ্চয়ই। ইসস কি ভুলটাই না হলো ঘুমিয়ে। যদি না ঘুমাতো তাহলে হয়তো কালকে লোকটার সাথে কথা সব ক্লিয়ার করা যেতো। সেই কালকে থেকে এসব ভারি শাড়ি পরে থাকায় এখন অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু ফ্রেশ হওয়ার জন্য তো জামা-কাপড় লাগবে। তবে পুরো রুমে চোখ বুলিয়েও কোথাও কালকে সাথে করে নিয়া আসা ট্রলিটা পেলো না। এখন কি করবে, কাকে ডাকবে?
ইশার সব টেনশন দূর করতে তখন কেউ দরজায় নক করে...
"ইশা, আসতে পারি?"
"জ্বি আসুন।"
তখন দরজা ঠেলে রিফাতের বউ তানভী ভিতরে আসে। ইশা ভালো করে তানভীকে দেখে... তানভীর পরনে জাম রঙা একটা শাড়ি, দুইহাতে স্বর্ণের চুড়ি, কানে দুল, গলায় চেন। ফর্সা শরীরে তানভীকে শাড়িটায় খুব মানিয়েছে।ইশা যখন তানভীকে পরখ করতে ব্যস্ত তখনই তানভী বলে...
"একি ইশা তুমি এখনো ফ্রেশ হওনি কেনো?"
"আসলে ভাবি আমি জানি না আমার জামা-কাপড় কোথায় রাখা হয়েছে। "
"ওহ এই কথা। তুমি তো আমাদের কাউকে ডাকতে পারতে।আচ্ছা যাই হোক তুমি গোসলে যাও সানী তোমার জন্য চাচির থেকে সব নিয়ে আসছে। আজকে তোমাকে শাড়ি পরতে হবে। শাড়ি পরতে পারো তুমি?"
"একা একা পারিনা। "
"আচ্ছা সমস্যা নেই তুমি গোসলে যাও। সানী আসলে আমি তোমাকে ব্লাউজ আর পেটিকোট দিবো সেগুলো পরে বেরিয়ে এসো। তারপর আমি আর সানি মিলে রেডি করিয়ে দিবো।"
"আচ্ছা। "
ইশা ওয়াশরুমে যায় আর তানভী খাটের উপর বসে থাকে। সানী সব কিছু নিয়ে আসলে তানভী ইশাকে ডেকে সব কিছু দেয়। ইশা উপরে ভেজা তাওয়াল জরিয়ে বেরিয়ে আসে। ইশা আসার পর তানভী আর সানী মিলে তাকে আগে খয়েরী রঙের শাড়ি পরিয়ে দেয়। এরপর হালকা সাজিয়ে দিয়ে মেহজাবিন সিকদারের দেওয়া গয়না গুলোও পরিয়ে দেয়। হাঁটু ছুঁইছুঁই লম্বা চুল গুলো আচঁরিয়ে ইশা তানভী আর সানীর সাথে রুম থেকে বেরোয়। সকালের নাস্তার সময় হওয়ায় সবাই তখন নাস্তার টেবিলে বসেছে। ইশা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আরো দুটো নতুন মুখের দেখা পায়। মেহজাবিন সিকদার ইশাকে নিয়ে আগে সোফায় বসায়। ইশাকে মেহজাবিন সিকদার দুজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। একজন হলো তেহরিদের ছোট চাচা #আফসার_সিকদার আর তার বউ #রোকসানা_সিকদার। তাদের এক ছেলে এক মেয়ে #ইমতিয়াজ_সিকদার_ফায়াজ #সিনথিয়া_সিকদার_সিমরান। ছোট চাচা চাচিকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলেন, বিয়ের কথা শুনে সকাল সকাল বাসায় চলে এসেছে।
তেহরিদ সকালে উঠে হাঁটতে বেরিয়ে এখন বাসায় ফিরে আসে। তেহরিদ যখন বাসায় প্রবেশ করে তখন ইশা মেহজাবিন সিকদারকে কিছু বলছিলো।তেহরিদ একবার সেইদিকে তাকিয়ে সোজা ডাইনিং রুমে চলে যায়। ইশাকে নিয়ে মেহজাবিন সিকদারকে আসতে দেখে মিসবাহ তেহরিদের পাশের চেয়ারে বসতে চায়। কিন্তু মিসবাহ বসার আগেই ইশাকে বসিয়ে দেয় তার শাশুড়ী। মিসবাহ রাগ নিয়ে অন্য চেয়ারে বসে পরে। সবার শেষে শামিমা সিকদার আসে।
"তা নতুন বউয়ের কি পেটে খিদে বেশি নাকি? যে সবার আগেই খেতে বসে পরেছে।"
" খিদে কম নাকি বেশি তা জেনে তুমি কি করবে।"
তেহরিদের কথার উত্তরে শামিমা সিকদার কি বলবেন বুঝতে না পেরে চুপ হয়ে যান। ইশার মন খারাপ হলেও তেহরিদ এর জবাব দেওয়ায় খুশি হয়। খাবার টেবিলে এখন নিরবতা সবাই চুপচাপ খাচ্ছে। খাওয়ার পর ইশাকে নিয়ে সব কাজিনরা হল রুমে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্যে, তবে তেহরিদ নিজের রুমে চলে যায়। বিয়ের খবর পেয়ে কিছু মহিলা আসে নতুন বউ দেখতে। কেউ ভালো বলে তো আবার কেউ মন্দ, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে সেলিনা ও শামিমা সিকদার আরো কথা শোনায়। মা-বাবা তুলেও অনেক কিছু বলে। ইশা শব্দবিহীন কান্না করতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে সানী বলে ইশাকে মেহজাবিন সিকদার ডাকছে.... এই বলে ইশাকে তেহরিদের রুমে নিয়ে যেতে থাকে। তেহরিদ ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে যাওয়ার সময় সব কথাই তার কানে আসে। কিন্তু কিছু বলে না। ইশা চোখ ভালো মতো মুছে ভিতরে যায়। তেহরিদ তখন ডিভানে বসা ছিলো। তেহরিদ চোখ তুলে ইশার দিকে তাকিয়ে থাকে। এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশা কিছুটা ভয় পায়।
"তুমি কি বোবা? কথা বলতে পারোনা তুমি?"
তেহরিদের এহেন কথায় ইশা ভড়কে যায়। কালকেই তো সে লোকটার সাথে গাড়িতে কথা বললো। আবার তার সামনেই তো কবুল বলে বিয়ে করেছে। লোকটা কি এখনি সব ভুলে গেলো নাকি? নাহলে হঠাৎ করে তাকে বোবা বলছে কেনো?
"আমি বোবা হবো কেনো? আমি কথা বলতে পারি। "
"তাহলে তখন মুখ দিয়ে কথা বের হলোনা কেনো?"
"মানে?"
"নিচে যখন সবাই মিলে এতো গুলো কথা বললো তখন তোমার মুখটা বন্ধ ছিলো কেনো? সবার কথা শুনতে খুব ভালো লাগছিল?"
"আমি কি বলতাম তখন"
"কি বলতে মানে?
" আমি তো কাউকে চিনি না। আর আসার সময় দাদি বলে দিয়েছে কারোর মুখের উপর জবাব কিংবা তর্ক না করতে। "
"তোমায় কাউকে চিনতে হবে না। তুমি যদি এভাবে মুখ বুজে সহ্য করো তাহলে সারাজীবন সহ্য করেই যেতে হবে। কাউকে উচিত জবাব না দিলে আরো সুযোগ পাবে কথা শোনানোর। এখন থেকেই ম্যাচিউর হও। তোমার লড়াই তোমাকেই করতে হবে টিকে থাকতে হলে।কেউ কোনো কটুকথা বললে এখন থেকে তার জবাব দিবে এই পারমিশন আমি দিলাম।মনে থাকবে?"
"হুম থাকবে মনে।"
★
এখন বিকাল ৪.০০ টা বাজে। ইশাকে নিয়ে তেহরিদের কাজিন মহল বাড়ির বাগানে হাঁটতে বের হয়েছে। রিফাত আর সিয়াম অফিসে, মিসবাহ তো আসবেই না। তেহরিদ নিজের রুমে লেপটপে কিছু করছে, ইশা আসার সময় দেখেছে। তেহরিদদের বাড়িটা দুতলা, ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়িটা অনেক বড় সামনে নানা দেশি-বিদেশি ফুলের গাছ লাগানো। বসার জন্য বেঞ্চি আর দোলনাও আছে।চারদিকে দেওয়াল করে আঁটকে দেওয়া এবং সামনে বিশাল বড় লোহার গেট। বাড়ির পিছনে অনেক বড় করে পুকুর খনন করা হয়েছে। পুকুরে নামার জন্য সিংড়ি দেওয়া হয়েছে, বসার জন্যেও জায়গা আছে।তবে এই পুকুরে কেউ গোসল করে না আনিসুর সিকদার লোক রেখে এখানে মাছ চাষ করেন।
সবাই মিলে পুকুর ঘাটে বসে গল্প করতে থাকে। ইশাও সবার সাথে ফ্রী হয়ে যায়। ইশার মনে হলো বাড়ির দু/একজন মানুষ ছাড়া সবাই খুব ভালো। তার খুব বেশি অসুবিধা হবেনা এখানে। আজকে সকালে তেহরিদ যখন তার সাথে কথা বলেছে তখন ইশার অনেক ভালো লেগেছে। আজকে রাতে তেহরিদের সাথে সরাসরি কথা বলবে বিয়ের বিষয় নিয়ে। এভাবে দুইজন চুপ করে থাকলে সম্পর্কের অবনতি ছাড়া উন্নতি হবেনা। কোনো একজনকে তো আগাতে হবে। ইশা ভেবেছে সেই আগে হাত বাড়াবে।অভিযোগ রেখে কি হবে যখন বিয়েটা হয়েই গেছে। এখন থেকে মানিয়ে নিতে হবে আস্তে আস্তে। আর সবার আগে তেহরিদের অতীত জানা জরুরি। ইশা চায় তেহরিদ নিজের মুখে সব বলুক সে অন্য কারো থেকে শুনতে চায় না।
সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সবাই বাড়ির ভিতরে চলে আসে।ইশা যখনে উপরে উঠবে তখনই পিছন থেকে শামিমা সিকদার বলে...
"এই মেয়ে কোথায় যাও?"
"কই আর যাবো আমার স্বামীর কাছে যাই। তা কিছু বলবেন..?"
"মুখে তো ভালোই বুলি ফুটছে। কিন্তু দেখে তো মনে হয়েছে ভাজা উল্টে খেতে জানো না। "
"You are wrong dadi. আমি তো শুধু ভাজা মাছ উল্টে খেতে না তার কাটাসহ খেতে জানি। "
#চলবে…..?