ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিস্তব্ধ রাতের কাব্য

১০ম পর্ব

লেখক: মিথিলা ইসলাম

#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য

#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম

#পর্ব_১০

.

.

.

দুপুর দেড়টা বাজে এখন। রান্না করা শেষ হয়ে গেছে। বাড়ির পুরুষেরা গোসল করে নামাজ পড়তে মসজিদে গেছে। তেহরিদের বাবাকে কল করা হয়েছিল বললো, আর আধঘন্টার মতো সময় লাগবে পৌঁছাতে। বাড়িঘর পরিষ্কারও করা হয়েছে একজন লোক দিয়ে। টেবিল সেট করা, প্লেট-গ্লাস সব সাজানো হয়ে গেছে। আসলেই সবাইকে খাবার দেওয়া হবে। আগে থেকেই সব গুছিয়ে রেখেছে পরে যেনো তাড়াহুড়ো না করতে হয়। ইশা আজকে কাতানের মধ্যে হালকা সবুজ রঙা একটা শাড়ি পরেছে। এখন তেমন শীত লাগছে না, আজকে শীতটা একটু কমই। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে খোপা করে ঘর থেকে বের হয়। মা-বাবার রুমে যেয়ে দেখে মা নামাজ পরছে তাই খাটের উপর বসে থাকে। মুনিরা শেখ নামাজ শেষ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন...

"কিছু বলবি?"

"হ্যাঁ। সালাদ তো কাটা হয়েছে, ট্রেতে সাজিয়েছ?"

" ভালো কথা মনে করেছিস আমি তো ভুলে গেছি।"

এই বলে বসা থেকে উঠতে নেয়।

"তুমি থাকো আমি গিয়ে দেখছি।"

ইশা রান্না ঘরে এসে সুন্দর করে সালাদের প্লেট ডেকোরেশন করে। নিজের শাশুড়ি কিছু না বললেও আরো ৪ জন খুঁত ধরার মতো মানুষ আছে। ইশা চায় না তার পরিবারের কেউ অপমানিত হোক তাদের কাছে। যতোটুকু পারছে, চেষ্টা করছে সব কিছু ঠিকঠাক করার। আয়রা বেগম জেদ ধরে আসেনি আজ তাকেও দাওয়াত করা হয়েছে। প্রায় দুইটা বাজে এমন সময় সবাই নামাজ পরে বাসায় আসে। সবাই যখন ঘরে প্রবেশ করবে তখন রাস্তায় গাড়ি থামার শব্দ শোনা যায়। ফরহাদ শেখ রাস্তায় যেয়ে দেখেন তার বাড়ির সব মেহমান চলে আসছে। সবাই ঘর থেকে বের হয়ে মেহমানদের সাথে কুশলবিনিময় করে ঘরে নিয়ে বসায়। চারজন বাদে সবাই এসেছে।

বোন আসার খবর পেয়ে তেহরিদের নানু, চার মামাও তাদের স্ত্রী সন্তান নিয়ে চলে আসে। এরপর খাওয়া-দাওয়া শুরু হয়। আগে পুরুষেরা খেয়ে উঠে এখন মহিলারা খেতে বসেছে। ইশাও মা চাচির সাথে সবাইকে বেরে খাওয়াচ্ছে। মেহজাবিন সিকদার ইশাকে জোর করে তার বসিয়ে নিজের প্লেট থেকে খাইয়ে দিতে থেকে, সাথে মুনিরা শেখ আর নাসরিন শেখকেও জোর করে বসায় খাওয়ার জন্য। মুনিরা শেখ মেয়ে এবং মেয়ের শাশুড়ির এতো সুন্দর বন্ডিং দেখে খুব খুশি হোন। শুধু মুনিরা না ইশার বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ খুব খুশি হয়।

" আর খাবো না পেট ভরে গেছে।"

ইশার কথা শুনে মেহজাবিন সিকদার হালকা করে ইশার পিঠে থাপ্পড় দিয়ে বলে...

" কোনো কথা শুনতে চাই না। সব খেতে হবে আপা(মুনিরা শেখ) তোমাকে কিছু না বললেও আমি কিন্তু ছাড় দিবো না।"

ইশা হাসতে হাসতে...

" পঁচা শাশুড়ি। "

"পঁচাই ভালো। এখন চিংড়ি মাছ দিয়ে খাইয়ে দিবো তারওর উঠবে।"

" আচ্ছা, তবে একটু।"

"না সব। "

খাবে না বললেও শাশুড়ি মায়ের হাতে তৃপ্তি করে খেয়ে নেয় ইশা। মেহজাবিন সিকদার নিজেও খেয়েছে ইশার পাশাপাশি। সবাই খাওয়ার সাথে গল্পও করছে।

সকলের খাওয়া শেষ হলে বাসন গুলো রান্নার ঘরে রেখে দেওয়া হয়। এগুলো পরে ধোয়া যাবে আপাতত মেহমানদের সাথে আড্ডা দিবে।

★

তেহরিদ নিজের ফোনে কি যেনো করছে। রিফাত আর সিয়াম এক সাথে বসে কিছু একটা আলোচনা করছে। ইশতিয়াক আর আদনান বাহিরে গেছে কোনো কারণে। তেহরিদের মামারা খেয়ে রেস্ট নিয়ে তাদের বাসায় চলে গেছে। সে বাড়িতে পিঠার আয়োজন করা হবে। তাই খেয়ে আর দেরি করেনি কেউ। ৪-৫ রকমের পিঠা তৈরি করতে বেশ সময় লাগবে। তানভী, সানী, তাসনিম, নাবিলা, সিমরান এবং ইশা সবাই বাহিরে বের হয়। উঠোন পেরিয়ে কিছুটা দূরে গেলেই একটা পুকুর আছে। তার উপরের সাইডে নানা রকম ফলের গাছ লাগানো সেখানে ৩টা বেঞ্চ পাতা। সবাই সেখানে বসে উষ্ণ কোমল রোদ গায়ে মাখতে থাকে। এরমধ্যে নাসরিন শেখ ট্রেতে করে ডেজার্ট নিয়ে আসে প্রত্যেকের জন্য। একে একে সবাইকে দিয়ে আবার চলে যায়।

“ বাবার বাড়ি ট্যুর কেমন লাগলো ইশা?”

তানভীর কথা শুনে ইশা বলে…

“মুটামুটি ভালোই কেটেছে ভাবি।”

“ মুটামুটি কেনো?”

“আপনার দেবর এখানে এসে অসুস্থ হয়ে গেছে।”

“ সবাই দেখেছ আমার দেবরের জন্য ইশার কত্তো চিন্তা।”

ফাজিল গুলো একসাথে বলে উঠে “হ্যাঁ টুরু লাভভভভ।” শেষের টুকু টান দিয়ে বলে।

ইশা বেচারি অনেক লজ্জা পায়।

~

“ বিয়াইরা কী করেন? মানে কাজের উৎস কী?”

প্রশ্নটা করেন মাহবুবুর সিকদার। ইশার বাবা উত্তরে বলেন…

“আমাদের অনেক জমিজমা আছে, বাবার থেকে পাওয়া। এখানের প্রায় অর্ধেক জমিই আমাদের, পাঁচটা বড় বড় পুকুর আছে। পুকুরে সব সময় মাছ চাষ করা হয়, লোক রেখেছি তারা দেখাশোনা করে। জমিতে ধান সহ সব রকমের সবজি চাষ হয়। আমাদের গ্রামে অনেক মানুষ কৃষি কাজ করেই বড় হয়েছে। তবে সবার তো আর জমি নেই নিজেদের। আমরা তাদের বছরের চুক্তি করে কাজে নেই।”

“বাহ! সব ফ্রেশ খাবার তাহলে।”

“জ্বি সব টাটকা। আমাদের শুকনো খাবার ছাড়া আর কোনো কিছু কিনতে হয় না।”

“ বছরের শেষে আয় কেমন?”

“আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো।”

আরো নানা রকমের গল্পগুজব হয়। বিকাল সাড়ে ৪ টা বেজে গেছে, শীতের দিনে ৫ টার মধ্যেই মাগরিবের আযান হয়ে যায়। টাইম দেখে মেহজাবিন সিকদার সবাইকে তাড়া দেয় রেডি হওয়ার জন্য। ইশা ঘরে এসে নিজের রুমে প্রবেশ করে। তেহরিদ আগে থেকেই সেখানে ছিলো। দুইজন চুপচাপ নিজেদের মতো রেডি হতে থাকে। ইশা আজকে কারচুপির কাজ করা গোল্ডেন এবং মেরুনের মধ্যে একটা বোরখা পরে। সুন্দর করে রেডি হয়ে নিজের আলাদা ব্যাগ গোছানো শুরু করে। প্রথমে নিজের এডমিশনের বই রাখে। যখনই কিছু ড্রেস আর ২ টা বোরখা আর হিজাব রাখতে যায় তখনই তেহরিদ বলে…

“ওগুলো নিচ্ছো কেনো?”

“কী?”

“ড্রেস আর বোরখা।”

“পড়ার জন্য নিচ্ছি। আর কোচিং ভর্তি হলে প্রতিদিন ক্লাস করতে হবে তখন বোরখা লাগবেই।”

“লাগবে সেটা আমিও জানি। এখানের গুলো এখানেই রাখো বাসায় গিয়ে তোমাকে নিয়ে শপিং মলে যাবো। যা যা লাগবে তখন কিনে নিয়ো এখন শুধু বই গুলোই নাও।”

“আচ্ছা ঠিক আছে।”

“মন খারাপ কেনো?”

“মা-বাবা কে ছেড়ে যেতে মন চাচ্ছে না।”

ইশা খাটে বসে কথা বলছিল তেহরিদও তার পাশে বসে বলে…

“মন খারাপ করো না। তোমার এডমিশনের পর আবার নিয়ে আসবো। আর মা-বাবা তো আমাদের বাসায় যাবেই তাই না।”

“হুম।”

“গুড গার্ল। এখন চলো সবার হয়ে গেছে আমরাই লেট।”

দেরি হয়ে যাওয়ায় কেউ আর তেহরিদের নানা বাড়ি যায়নি। তাই মামিরা সব পিঠা প্যাকেট করে নিয়ে এসে গাড়িতে রাখে। ফরহাদ শেখ বিয়াই এর সাথে মেয়ের ব্যাপারে অনেক কিছু বলে, ইশাকে দেখে রাখতে, ভুল হলে যেনো বুঝিয়ে বলে। মা-বাবার সন্তানদের নিয়ে অনেক চিন্তা। বিয়ের দিনের মতো আজকেও কান্না করতে থাকে মুনিরা শেখ। মেয়েটা আসলো দুদিন থেকেই চলে যাচ্ছে। সবাইকে কতো বললো আজকের দিনটা থাকার জন্য। আবার কবে আসবে কে জানে। ছোট থেকে মেয়েটাকে নিজের কাছেই রেখেছে। একরাতও অন্য কোথাও থাকেনি আজ সেই মেয়ে কতো দূরে চলে যাচ্ছে। মাকে বুঝাতে বুঝাতে ইশা নিজেও একসময় কান্না করে দেয়। নীল বোনের কোমর জড়িয়ে কান্না করতে থাকে। আপু আবার তাকে ছেড়ে চলে যাবে, এই দুদিন কতো আদর করলো। চলে গেলে এই আদর কে করবে? সে যেতে দিবে না আপুকে। সবাই গেলে যাক কিন্তু আপুকে রেখে যেতেই হবে।

“আপা আর কান্না করবেন না। আমাদের এইবার হাসি মুখে বিদায় দিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে।”

“আমার মেয়েটাকে দেখে রাখবেন আপা।”

“ আপনি চিন্তা করবেন না। ইশা যেমন আপনারও মেয়ে তেমনি আমারও মেয়ের। আর সন্তানের যত্নে মা কখনো ত্রুটি রাখে না। এবার আমরা আসি।”

“ আবার আসবেন কিন্তু।”

“ইনশাআল্লাহ। আপনারাও খুব তাড়াতাড়ি যাবেন আমাদের বাসায়।”

“ইনশাআল্লাহ।”

মাগরিবের আযান দিয়ে দেয়। সবাই বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। ইশা আর তেহরিদ আজকেও বাইকে যাবে। তেহরিদ জ্যাকেট পরলেও ইশা কোনো শীতের পোশাক পরেনি। তাসনিম ঘর থেকে চাদর এনে দিলে সেটা গায়ে জরিয়ে নেয় ভালো করে। সবাই কান্না বন্ধ করলেও নীল এখনো কেঁদে যাচ্ছে। সে বোনকে কিছুতেই যেতে দিবে না, হাত-পা ছুড়তে শুরু করে। আদনান জোর করে কোলে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। ভাইয়ের জন্য ইশার চোখেও পানি আসে। কিন্তু কিছু করার এটাই নিয়ম, এমনটাই হয়ে আসছে শুরু থেকে। কোনো ঘর মেয়েরা ছাড়া পরিপূর্ণ হয়না আবার মেয়েদের নিজের বলতে কোনো ঘর থাকে না। এটাই তো বাস্তবতা।

#চলবে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন