#নিস্তব্ধ_রাতের_কাব্য
#লেখনীতে_মিথিলা_ইসলাম
#পর্ব_২৬
.
.
.
রাত ৭:৩০ মিনিট। খাওয়া-দাওয়ার পর ছবি তোলা, আড্ডা দেওয়া হয়েছে। এখন কনে বিদায় করা হবে। মুনিরা শেখ বড়ো বড়ো পাতিলে করে বিয়ে বাড়িতে রান্না হওয়া প্রত্যেক আইটেম বেড়েছে। এগুলো বিয়াই বাড়িতে পাঠানো হবে। বলতে গেলে এখানকার নিয়ম এটা। ইশার খুব খারাপ লাগছে। আজকে যদিও প্রথমবারের মতো বিয়ে না। সে মানুষটাকে চিনে, থেকেছে, বাড়ির সবাইকে চিনে। তবুও বিদায় নেওয়ার অনুভূতি সেই প্রথম দিনের মতোই। মনে হচ্ছে আজকেই প্রথম সবাইকে ছেড়ে বহুদূর চলে যাবে। কিন্তু যাবে খুব কাছেই। তবে মন মানছে না কিছুতেই। চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি পরছে। তেহরিদ ইশার কাছে নেই সে একটু আগেই উঠে কোথায় যেনো গেলো। ফরহাদ শেখ মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত রাখে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পরে ইশা।
" কান্না করে না মা। তুমি তো দুবাড়ি পরেই থাকবে। আর ছাড়া তুমি সবাইকে চিনো তোমার কোনো অস্বস্তি হবেনা সেখানে থাকতে। এত কান্না করলে মাথা ব্যথা করবে। কান্না থামাও, তুমি কাঁদলে আমি সহ্য করতে পারিনা। লক্ষী মা আমার কান্না বন্ধ করো।"
" বাবা! "
ফরহাদ শেখ মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে...
" বলো মা "
" অতিথিকে অবহেলা করতে হয়না বলেই কি ১৮টা বছর এত যত্ন করে পেলেপুষে বড়ো করো?"
মেয়ের কথায় থমকে যান ফরহাদ শেখ। তিনি কী উত্তর দিবেন? তার কাছে যে উত্তর নেই। মেয়ে তার কেমন প্রশ্ন করলো এটা? যেই প্রশ্নের উত্তর নেই। কি বলবেন ভেবে পেলেন না। মেয়ের মাথাটা বুকে নিয়ে চোখ বন্ধ করে নেন। দুফোঁটা পানি গড়ালো বোধহয়। তার কি কষ্ট হচ্ছে না মেয়ে বিদায় দিতে? মেয়ে তো তার কলিজার টুকরো। প্রথম বাবা ডাকটা তো এই মেয়ের মুখেই শুনেছেন। কাঁধে নিয়ে কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন! দেড় বছর হওয়ার পর বাজারেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। একটু চোখের আড়াল হলেই বুকটা আনচান করতো। মন চাইতো সারাক্ষণ চোখের সামনে বসিয়ে রাখতে। তার সেই ছোট্ট পুতুলটা এখন কত বড় হয়ে গেছে। বিয়েও হয়ে গেছে। দুদিন পর আরেকটা পুতুলের মা হবে। কিন্তু তার কাছে তো সেই ছোটই আছে। আচ্ছা এই নিয়ম-কানুন এত নিষ্ঠুর কেনো? বাবার থেকে তার কলিজার টুকরোকে আলাদা করে দেয়! এই নিষ্ঠুরতম নিয়মনীতি না থাকলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? কী হতো এমন দু'একটা নিয়মনীতি না থাকলে? মেয়েটা দূরে গেলে যে খুব বেশি বুক পুড়ে! আল্লাহ! তুমি ধৈর্য ধরার তৌফিক দাও।
তেহরিদ এসে দেখে ইশা কান্নাকাটি করে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। সে শ্বশুর-শাশুড়িকে বলে আপাতত তাদের সাথে যাওয়ার জন্য, পরে নাহয় চলে আসবে। ফরহাদ শেখ এবং মুনিরা শেখ প্রথমে রাজি হয়না। তেহরিদ অনেক জোর করে, তাদের যেতেই হবে। মেয়ের কান্না আর জামাইয়ের এতবার বলায় রাজি হয়। নীল ছাদে বাচ্চাদের সাথে খেলা করছে। এই সুযোগেই বের হতে হবে। নাহলে নিজেও কাঁদবে বোনকেও কাঁদাবে। তাই নীলকে কেউ আর ডাকে না।
ইচ্ছে ছিলো ঘুরে-ফিরে তারপর বউ নিয়ে বাসায় যাবে। কিন্তু ইশার অবস্থা দেখে আর যাওয়ার ইচ্ছে নেই। রেস্ট দরকার ইশার। সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়। বাড়ি যতই কাছে হোক বউকে তো আর হাঁটিয়ে নেওয়া যায় না। তেহরিদ ইশাকে বাইকে করে নিয়ে যায়। আর বাকি সবাই হেঁটেই যায়।
যাওয়ার পর টুকটাক নিয়ম-নীতি পালন করে বউকে ঘরে উঠানো হয়। মেহজাবিন সিকদার ইশাকে তার মায়ের রুমে নিয়ে যায়। রুমে তেহরিদের নানি শুয়ে আছে সে বুড়ো মানুষ তেমন হাঁটা-চলা করতে পারে না। মেহজাবিন সিকদার ইশাকে সেখানে বসিয়ে দেয়। এর মধ্যে তেহরিদ দুটো ঔষধ এগিয়ে দেয় ইশাকে খাওয়ানোর জন্য।
তেহরিদকে তার মামা ডাক দেওয়ায় সেখানে চলে যায়। ইশাকে তেহরিদের নানির পাশে শুইয়ে দেয়। বেচারি একটু রেস্ট নিক। এই রুমটাই একটু নিরিবিলি আর শান্ত। মেহজাবিন সিকদার রুম থেকে বের হয়ে বিয়াই বিয়াইন কে আপ্যায়ন করতে থাকে। অন্যদিকে ইশাও ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পরে। মেয়েকে এক পলক দেখে ফরহাদ শেখ এবং মুনিরা শেখ বাসায় চলে যান।
★
রাত ১২ টা বাজে। এখন আর তেমন হৈচৈ নেই। অর্ধেকের বেশি মানুষ ঘুমিয়ে গেছে। উঠানে আলো জ্বালানো। কষাইরা গরু কাটছে। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ছোটরা এখনো জেগে আছে। বড়ো ভাইয়ের বাসর ঘর সাজালো এত কষ্ট করে পারিশ্রমিক নিতে হবে না! কিন্তু জামাই বউয়ের কোনো খোঁজ খবর নেই। ইশা তো এখনো ঘুমে। রিয়াজ এবং মুশফিকের বউ এসে ইশাকে ঘুম থেকে তুলে। ধীরেধীরে হেঁটে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের সামনে আসে। বিচ্ছু বাহিনী সব এখানেই আছে।সারোয়ার, মেহরাজ, মুশফিক, রিয়াজ আর তেহরিদ ছাদে আছে। ইশাকে ভিতরে নিয়ে খাটের উপর সুন্দর করে বসিয়ে দেয়। সিমরান নাবিলা দুজনের খাবার রেখে চলে যায়।
ইশা বিছানার উপর বসে বাহিরের তর্কাতর্কি শুনছে। তেহরিদকে তার কাজিনরা ঘিরে ধরেছে পারিশ্রমিকের জন্য। কিন্তু তেহরিদ দিতে নারাজ। সিমরান বলে...
" দাও না ভাইয়া। প্রথমবার তো এক টাকাও নেই নি। "
"দিতেই হবে?"
" হ্যাঁ "
" কত?"
" বেশি না ৬০ হাজার দাও।"
" আমার কাছে এত টাকা নেই। "
" মিথ্যে বলে লাভ নেই। আমি জানি তুমি আজকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছ।"
সারোয়ার বলে...
" দে নারে ভাই। আর কত অপেক্ষা করাবি?"
" আচ্ছা দিচ্ছি তবে কত আছে জানি না। কিন্তু ৫০ এর উপরে আছে। "
" তাই দে। "
তেহরিদ ওয়ালেট বাড়িয়ে দিয়ে বলে...
" এই নে ধর "
মুশফিক বলে...
" টাকা আছে নাকি মিথ্যে বলছিস?"
তেহরিদ ওয়ালেট ফাঁকা করে দেখায়। সেখানে অনেক গুলো হাজার টাকার নোট আছে মনে হচ্ছে। টাকা গুলো দু'ভাজ করা। রাবার দিয়ে বেঁধে ভাজ করে রেখেছে। সবাই টাকা নিয়ে তেহরিদকে ছেড়ে দেয়। হাসতে হাসতে রুমে প্রবেশ করে।
দরজা লাগিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। ইশার মাথায় ঘোমটা টানা।
তেহরিদ বিছানার কাছে আসলে ইশা সালাম দেয়। ঘোমটা তুলে বুকে হাত দিয়ে শুয়ে পরে। ইশ! তার বউটা এত সুন্দর কেনো?
" এই কী হলো আপনার? "
" তুমি এত সুন্দর কেনো বউ? "
" মানে?"
" তোমার সৌন্দর্যে আমার চোখ ঝলসে যাচ্ছে। "
" ইশ! ঢং। উঠুন তো!"
তেহরিদ উঠে না উল্টো ইশার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পরে। ইশার দুই হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। এক সময় হাত ছেড়ে মুখে হাত বুলায়। একটা হাত ইশার ঘাড়ে রেখে মাথাটা নিচু করে কপালে একটা চুমু খায়। আস্তে আস্তে তেহরিদের চুল গুলো টেনে দেয়।
" এখন কেমন লাগছে তোমার?"
" আলহামদুলিল্লাহ ভালো "
" যাক আলহামদুলিল্লাহ। "
" তখন এত হাঁসছিলেন কেনো?"
" ওরা ভেবেছে আমি অনেক টাকা দিয়েছি। কিন্তু উপরে, মাঝে, নিচে হাজার টাকার নোট হলেও ভিতরে সব ১০, ২০ টাকার নোট। "
" আপনি এত্তো ফাজিল!"
" ওরা যেমন আমিও ওদের সাথে তেমন করেছি।
আচ্ছা উঠো ফ্রেশ হই। এভাবে থাকতে আর ভালো লাগছে না। "
তেহরিদ উঠে দাঁড়ায়। এরপর ইশার গহনাগাঁটি চুল-টুল খুলে দিতে শুরু করে। মাথার মধ্যে এত্ত ক্লিপ লাগিয়েছে! শাড়িটারি খুলে ইশা ফ্রেশ হতে যায়। তেহরিদ রুমেই শেরওয়ানি খুলে টি-শার্ট ট্রাউজার পরে ফেলে।
ইশা নরম একটা সুতির শাড়ি পরে বের হয়। তেহরিদ হাত-মুখ ধুয়ে এসে খাবার নিয়ে ইশার সামনে বসে। নিজেও খায় ইশাকেও খাওয়ায়। খাওয়া শেষ হলে তেহরিদ প্লেট গুলো রেখে আসে।
ইশা এবং তেহরিদ দুতলায় আছে। রুমের জানালা খোলা সেখান দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। তেহরিদের বুকের উপর শুয়ে রাজ্যের গল্প নিয়ে বসেছে ইশে। তার ঘুম আসছে না। তেহরিদও মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনছে। মাঝে মধ্যে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। গল্প করতে করতেই রাতটা পার করে দুজন। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যায়।
♡
বর বউ বসে আছে স্টেজে। সবাই ফটো তোলার পাশাপাশি নানা রকম গিফট দিচ্ছে। ঢাকা থেকেও অনেক আত্মীয় এসেছে। বিজনেস পার্টনারও আছে বেশ কয়েকজন। ইশা আজকে লেহেঙ্গার সাথে চুল গুলো ছাড়া রেখেছে। আজকেও খুব সুন্দর হয়েছে সাজ। তেহরিদ আজ ফর্মাল ড্রেসআপে। দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে। কে বলবে এই লোকের ৩০ বছর! দেখলে মনে হয় ২৫ কি ২৬ হবে।
ইশা হাঁসি মুখে সবার সাথে কথা বলে। সবাই বেশ প্রশংসাও করে তার।
#চলবে…?