#গল্প_তুই_আমার_৭_মিনিট
#লেখিকা_ঐশী_আফরিন
জনরা:(থ্রিলার + রোমান্টিক + সাসপেন্স + রিভেঞ্জ)
#১ম_পর্ব
.
সালটা ১৯৭৬। বর্ষাকাল চলছে। প্রকৃতিতে মিষ্টি হাওয়া বইছে। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি হবে হবে ভাব। গ্রামের পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে মেয়েটি। সে কলেজে গিয়েছিলো। এমনিতে সে সচরাচর কলেজে পা রাখেনা। আজ গিয়েছিলো। ইম্পরটেন্ট ক্লাস ছিলো।সে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছিল। হঠাৎ ক্লাসের মাঝেই প্রহরী এসে বলল বাড়ি থেকে নাকি টেলিফোন এসেছিল এক্ষুনি যেতে বলেছে গেটে গরুর গাড়ি দাড়ানো। অগত্যা সে ক্লাসের মাঝেই চলে আসে। কিছুদূর আসতেই গরুর গাড়ির একটা চাকা ভেঙে যায়। ড্রাইভার কাকু বলেছিল একটু অপেক্ষা করতে পাশের ছোট্ট ছুপরি থেকে সারিয়ে আনবে। প্রহরী গাড়ি ঠিক করতে যেতেই সে একপ্রকার পালিয়ে এসেছে।
একমাত্র কলেজ ছাড়া তাকে আর কোথাও বের হতে দেয়া হয় না। যেদিন যায় সেদিন তার বান্ধবী অপুর সাথে যায়। আসার সময়ও তার সাথেই আসে। কিন্ত সাথে প্রহরী থাকায় তেমন মজা করতে পারে না। তাই আজ সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসেছে। অবশ্য এখন সাথে অপু নেই তবুও একা একাই যাচ্ছে।
কিছুটা ভয় করছে। কিন্ত সে ভিতু না সে সাহসী। ভয়তো সে কারো বাপকেউ পায় না কিন্ত সেটা যদি হয় তার গুনধর বাবা মাহফুজ চৌধুরী তাহলে ভিন্ন কথা। মাহফুজ চৌধুরী আজ বাড়ি নেই। এমনকি বাড়ির সব পুরুষরা শহরে গিয়েছে। তাই তো সে আজ একা আসার সাহস করেছে।
দুপুরের দিকে হওয়ায় রাস্তা-ঘাট নিরব। নইলে গ্রামের প্রতিটা মানুষ তাকে চেনে। মুখ কেউ না দেখলেও উপরে পরা জুব্বা দেখে মানুষ ঠিক তাকে চিনে ফেলবে। চিনবে নাই বা কেন একে তো সে গ্রামের জমিদারের মেয়ে আরেকে গ্রামের কোন মেয়ে তার মত এভাবে বের হয় না । বোরকা , নেকাব, হাতে পায়ে মৌজা এমনকি চোখগুলো পর্যন্ত ঢাকা থাকে। এখন কেউ দেখার চান্স নেই সবাই এখন যে যার বাড়ি। আর এখন বাড়ি গেলে মিথ্যা বলে মেনেজ করা যাবে। এখন সমস্যাটা ঐ প্রহরী উরফে আলুর বাপকে নিয়ে । ওটাকে পটাতে পারলে এবারের মত বেচেঁ যাবে। এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে সে এক মনে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ভরাট পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসলো,
'আপনি কী জমিদার মাহফুজ চৌধুরীর মেয়ে মাধবীলতা চৌধুরী'
মাধবীর বুকটা ধক করে উঠল। পুরুষদের সাথে তার কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। না জানি কোন আপদ এসেছে তাকে বাড়িতে বাশ খাওয়ানোর জন্য।
মাধবী গলার স্বরটা যথেষ্ট কর্কশ করে পেছনে না ফিরে জবাব দিলো ' জী কেন বলুন তো '
ছেলেটা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো। একটা মেয়ে গলার স্বর এতটা সুন্দর কিভাবে হতে পারে। অবশ্য সে শুনেছে এই মেয়ের রূপ,গুন , কন্ঠ সহ সবকিছুই নাকি অসম্ভব সুন্দর। কিন্ত তাই বলে এত??
এই রে এভাবে বলেও কাজ হলো না । এই লোকেরাও সবার মত একই অবস্থা । ভেবেই মাধবী তাড়া দিলো 'যা বলার তাড়াতাড়ি বলে বিদেয় হোন'
ছেলেটার হুশ আসলো 'জী আমি শান্ত, শান্ত চৌধুরী'
মাধবীর ইচ্ছে হলো ছেলেটাকে ধরে আছার মারতে । রাস্তার মধ্যে তাকে ডেকেছে নিজের নাম বলার জন্য। সে নিজের ইচ্ছেটা কে পাশে রেখে বললো
' তা আপনি যে চৌধুরীই হন না কেন আমাকে কেন ডাকলেন আগে সেটা বলুন। কিন্ত দশটার বেশি শব্দ যেন ব্যবহার করা না হয় । আমার তাড়া আছে। '
শান্ত বুঝলো মেয়েটা চটপটে স্বভাবের । সে বললো
'আপনার বাসা থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য '
মাধবী গুনলো ছেলেটা দশ শব্দই বলেছে । সে বললো
'ওহ নতুন প্রহরী বুঝি? আচ্ছা ভালো হয়েছে এসেছেন ।'
বলেই সে পাশে থাকা গরুর গাড়িটায় উঠে বসে। শান্তকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না। শান্ত ভ্যাবাচেকা খেলো । তাকে কিনা প্রহরী বানিয়ে দিলো? তবুও সে কথা না বারিয়ে সামনের দিকে উঠে বসলো। কিছু দুর যাওয়ার পর একটা বিশাল সাইনবোর্ড চোখে পড়লো। সাইনবোর্ড টিতে বড় বড় করে লেখা
" মুক্তাগাছা রাজবাড়ি "
স্থান: ময়মনসিংহ জেলা গ্রাম : মুক্তাগাছা
স্থপতি: ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ আয়তন: ১০০ একর প্রতিষ্ঠাতা: রাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী
বর্তমান পরিচালক: মাহফুজ চৌধুরী
সাইনবোর্ডটার পাশে বেশ খানিকটা জায়গা খালি রেখে পুরো বাড়িটির চারপাশে বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা। খালি জায়গায় গেট ফুল দিয়ে একটা সাধারণ গেট করা। এখান থেকেই শুরু হয় রাজবাড়ির এরিয়া। তারপর বিশাল মাঠ পেরিয়ে সাদা গাড়িটি থামলো বড় ফটকের সামনে। ফটকের ডালপাশে পাথরের উপর খোদাই করে লেখা "রাজবাড়ি" । পুরো বাড়িটি সুউচ্চ বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। তার চারপাশে ছেয়ে আছে ঘন জঙ্গল।
মাধবীকে দেখে ফটকের সামনের দুটো দাড়োয়ান সালাম দিয়ে গেট খুলে দিলো। ফটকটি খুলতেই দেখা মিললো চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের । সামনে একটি যাতে ফুটে আছে আসংখ্য শাপলা। পুকুরটির চারপাশে রয়েছে ৬ টি প্রাসাদ। আর সামনে রয়েছে একটি বিশাল আকারের উচু প্রাসাদ। মূল ফটক থেকে রাস্তাটি শুরু হয়ে প্রতিটি প্রাসাদের সামনে দিয়ে গেছে বড় প্রাসাদটি পর্যন্ত। রাস্তার দুই পাশে ফুলের গাছ।
মাধবীদের গাড়িটি গিয়ে থামলো বড় প্রাসাদটির সামনে। প্রাসাদটির দরজার উপরে লেখা "অন্দরমহল"।
অন্দরমহলের ডান দিকের প্রাসাদটির নাম "নূরমহল"।
তার ডানদিকের প্রাসাদটির নাম "রংমহল" । রংমহলের পরে সামান্য জায়গা ফাকা রেখে "ছাঁয়ামহল"। তার পাশে বেশ খানিকটা জায়গার পরে মূল ফটক। একিভাবে অন্দরমহলের বাঁপাশে "অতিথিমহল" তার পাশে "বিচারমহল" তার পাশে সামান্য জায়গা ফাকা রেখে "শর্বরীমহল" । তার পাশে বেশ খানিকটা জায়গা খালি রেখে মূল ফটক। খালি জায়গা বললে ভুল হবে ছাঁয়া আর শর্বরী মহলের চারপাশের জায়গাগুলোতে বড় বড় গাছপালা লাগানোর ।
মাধবী গাড়ি থেকে নেমেই অন্দরমহলে চলে যায় । শান্ত কিছুক্ষণ অন্দরমহলের দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে যায় অতিথিমহলের দিকে। বাড়ির পুরুষরা ছাড়া অন্য কোন পুরুষ অন্দরে ঢোকা নিষিদ্ধ। মাধবী অন্দরে ঢুকতেই কেউ তাকে হেচকা টান দিয়ে পাশে নিয়ে যায় । মাধবী প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও সামনের মানুষটিকে দেখে শস্থির নিশ্বাস ফেলে।
' উফ আম্মা এরকম টানাটানি করতাছো কেন '
ঝুমা চৌধুরী এবার মেয়ের হাতটা ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে ' কার লগে আইছোত '
এবার মাধবী কিছুটা ভয় পায় । ঐ আলুর বাপ কী বলে দিলো বাড়িতে। পরক্ষণেই মনে পড়লো সেতো ঐ নতুন প্রহরী শান্ত না টান্ত তার সাথে এসেছে। সে বললো
' নতুন প্রহরীর লগে '
' নাম কি শান্ত '
' হুম '
' আরে বলদ ওটা প্রহরী না '
' তাইলে '
' তোর আছিয়া ফুফু পাত্রপক্ষ নিয়া আইছে '
' কিহহহ ' মাধবী যেন আকাশ থেকে পরলো।
' আরে হতচ্ছারি আস্তে '
' আব্বা জানলে কি করবে ভাইবা দেছছো '
' তোর বাপরে এইবার রাজি করাই ছারুম। ছেরারে আমার পছন্দ হইছে। আর ছেরার পরিবারও আমাগো পরে গ্রামের সচ্ছল পরিবার। '
' তোমার এতই পছন্দ হয়া থাকলে বিয়াডা তুমিই করো '
' থাপ্পড় খাবি ফাজিল মাইয়া। তুই বৈঠক খানায় যাইয়া হেগোরে সালাম দিয়া বইবি। হেরা খালি তরে দেখবো। '
' কেন আমি কি কোরবানীর গরু?'
' আরে না বিয়াতে এমন একটু আকটু দেখা দেখি হয় । আর আমার যে মাইয়া এক দেখাতেই হ্যা কইয়া দিবো। যা মা যা নেকাবডা আর বেগডা আমার হাতে দিয়া তুই যা'
'উফফফ' মাধবী বিরক্ত হয়। ঝুমা চৌধুরী আবার বলেন ' এই মাইয়া মুখের ভাষা ঠিক কর তর বাপে হুনলে আমারে বকবো '
' তোমার টাও ঠিক করো '
মাহফুজ চৌধুরী এসব ভাষা শুনলে আস্ত রাখবে না।তিনি সবসময় শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন আর বাড়ির সবাইকেউ তিনি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে বলেছেন। মাধবী মাঝে মাঝে তার বাবা বাড়ি না থাকলে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে।
মাধবীর মেজাজ এমনিতেই আজ খারাপ। তার উপর এই আরেক ঢং। মাধবীর এখন ইচ্ছে করছে তার মা আর ফুফুকে ধরে আরো চৌদ্দ বার বিয়ে দিতে। তবুও এখন কিছু করার নেই। মাধবী নিজের বিরক্তি ভাবটা আড়াল করে মাথাটা ঢেকে এগিয়ে যায় । আর নিজেকে মনে মনে কিছুক্ষণ সাশালো যেন তার মুখটা বন্ধ থাকে নয়তো কী বলতে কী বলে ফেলবে । তার মুখতো আবার ডিজিটাল বুলেটের চেয়েও আগে আগে চলে।
_______________
এদিকে ঝুমা চৌধুরী ঠাঁয় দাড়িয়ে রইলেন। এই মেয়েকে ওনার মানুষ মনে হয় না । কারণ আর যাই হোক কোন সাধারণ মেয়ে এরকম সৌন্দর্যের অধিকারী হতে পারে না । মাঝে মাঝে তিনি সত্যিই ভাবেন হয়তো কোন পরী সেদিন রাতে তার বাচ্চার সাথে নিজের বাচ্চা বদল করে নিয়েছিলো। তাই তো এই মানুষের দুনিয়ায় ভূবন মহিনী সুন্দরী পরী মানুষ রূপে চলা ফেরা করছে। কিন্ত এতো সৌন্দর্য কী এই অন্ধকার পৃথিবীর বুকে সইবে। এই আলোই কী আধার কে কাটিয়ে পুরোটা আলোকিত করতে পারবে ? নাকি অন্ধকার নিজের ক্ষমতার দখলে আলোকে হ্রাস করে নেবে।
ঝুমা চৌধুরী এগিয়ে গেলেন তিনি জানেন বৈঠক খানার অবস্থা আগের মত থাকবে না। হয়তো কারো চোখ ঝলসে যাবে নয়তো কারো নিশ্বাস আটকে যাবে। যেমনটা সবসময় হয়। ওরা যদি মহিলা না হয়ে পুরুষ হতো নির্ঘাত মেয়েটার চোখে নিজের মৃত্যু দেখতো। তবে মহিলা হয়েছে তো কী হয়েছে চোখতো সবার একি। যেকোন মহিলাকেও তো ভষ্ম করে দেয়ার ক্ষমতা ঐ পরীর আছেই ।
চলবে..........