ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিশীথের ওপারে তুমি

৭ম পর্ব

লেখক: Adiba

—“মায়া, আমি তোমার বাবা নই... কিন্তু তোমার আসল বাবাকে আমি নিজের হাতে মেরেছিলাম।”

কথাগুলো শুনে মায়ার মনে হলো, চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে।

সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে নিচের মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।

লোকটা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মুখে কোনো অনুশোচনা নেই।

শুধু চোখ দুটো অদ্ভুত ঠান্ডা।

রায়ান সঙ্গে সঙ্গে মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।

—“ওর কাছ থেকে দূরে থাকুন।”

লোকটা মৃদু হাসল।

—“তুমি এখনও একই রকম, রায়ান।”

—“আর আপনি এখনও একই রকম খুনি।”

মায়া কেঁপে উঠল।

খুনি!

তাহলে লোকটা সত্যিই তার আসল বাবাকে হত্যা করেছে?

মায়া রায়ানের হাত আঁকড়ে ধরল।

—“রায়ান... সত্যি?”

রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“আমি জানি না।”

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“তুমি জানো না?”

—“আমি শুধু জানি, তোমার বাবা মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে... সেটা আমি দেখিনি।”

লোকটা এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

—“কারণ তোমাকে সত্যিটা কেউ কখনো বলেনি।”

মায়ার গলা কাঁপল।

—“তাহলে আপনি কে?”

লোকটা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

—“আমার নাম আদনান।”

মায়া নামটা শুনে থমকে গেল।

কোথাও যেন এই নামটা সে আগে শুনেছে।

আদনান বলল,

—“তোমার বাবা আমাকে বিশ্বাস করতেন।”

—“তাহলে তাকে মারলেন কেন?”

আদনানের মুখে অদ্ভুত হাসি ফুটল।

—“কারণ সে এমন একটা সত্য জেনে ফেলেছিল, যেটা তার জানার কথা ছিল না।”

মায়া এক পা এগিয়ে গেল।

—“কী সত্য?”

আদনান উত্তর দেওয়ার আগে রায়ান বলে উঠল,

—“মায়া, ওর কথা শুনবে না।”

মায়া ঘুরে তাকাল।

—“কেন?”

—“কারণ সে অর্ধেক সত্য বলে মানুষকে বোকা বানায়।”

আদনান হেসে বলল,

—“তুমি বরং পুরো সত্যটা বলো, রায়ান।”

রায়ান চুপ।

আদনান এবার মায়ার দিকে তাকাল।

—“তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে একটা জিনিস আমার কাছে রেখে গিয়েছিল।”

মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।

—“কী?”

আদনান পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল।

পুরোনো কাঠের বাক্স।

বাক্সটার ওপর খোদাই করা একটা চিহ্ন।

মায়া চিহ্নটা দেখেই থমকে গেল।

একই চিহ্ন সে তার মায়ের ডায়েরিতেও দেখেছিল।

রায়ানও চিহ্নটা দেখে কঠিন হয়ে গেল।

আদনান বলল,

—“এটার ভেতরে আছে তোমার জন্মের সত্য।”

মায়া হাত বাড়াল।

কিন্তু রায়ান তার হাত ধরে থামিয়ে দিল।

—“না।”

মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আবার না?”

—“হ্যাঁ।”

—“রায়ান, তুমি কি জানো আমি গত কয়েক ঘণ্টায় কতবার ‘না’ শুনেছি?”

রায়ান একটু থমকে গেল।

মায়া আঙুল গুনে বলল,

—“দরজা খুলো না। ওখানে যেও না। ওর কথা শুনো না। নিচে যেও না। এখন আবার বাক্স ছুঁয়ো না।”

রায়ান বলল,

—“কারণ এগুলো সব তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

মায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—“তুমি যদি আরও দুবার ‘বাঁচাতে’ যাও, আমি নিজেই তোমাকে মেরে ফেলব।”

আদনান হেসে ফেলল।

—“মেয়েটা তার মায়ের মতোই।”

রায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

—“তার মায়ের নাম মুখে আনবেন না।”

আদনান এবার শান্ত গলায় বলল,

—“তুমি এখনও ওকে সত্যিটা বলোনি?”

মায়া রায়ানের দিকে তাকাল।

—“কোন সত্য?”

রায়ান চোখ নামিয়ে ফেলল।

আদনান ধীরে বলল,

—“তোমার মা মারা যাননি।”

মায়ার চোখ বিস্ফারিত।

—“কি?”

রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“আদনান!”

আদনান থামল না।

—“তোমাকে বলা হয়েছিল তোমার মা মারা গেছেন। কিন্তু সত্যিটা হলো—”

সে একটু থামল।

তারপর বলল—

“তোমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”

মায়ার শরীর অবশ হয়ে গেল।

—“না...”

তার ঠোঁট কাঁপছে।

—“এটা মিথ্যা।”

আদনান বলল,

—“তাহলে তোমার মায়ের ডায়েরির শেষ পাতাটা তুমি কখনো পড়েছ?”

মায়া চুপ।

সে ডায়েরিটা বের করল।

শেষ পাতাটা খুলল।

পাতাটা ফাঁকা।

শুধু নিচে ছোট করে একটা লেখা—

“যদি কখনো আমাকে খুঁজতে চাও, নিশীথের ওপারে এসো।”

মায়ার চোখে পানি জমে উঠল।

একই কথা।

একই জায়গা।

কেন?

রায়ান ধীরে বলল,

—“মায়া...”

মায়া তার দিকে তাকাল।

—“তুমি জানতেছিলে?”

রায়ান নীরব।

মায়ার চোখে এবার অভিমান।

—“তুমি জানতেছিলে আমার মা বেঁচে আছেন?”

রায়ান ধীরে বলল,

—“হ্যাঁ।”

মায়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

—“আর আমাকে বলোনি?”

রায়ান এগিয়ে এলো।

—“কারণ তোমার মা নিজেই চেয়েছিলেন তুমি যেন—”

মায়া তাকে থামিয়ে দিল।

—“আমার মা আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন?”

—“না।”

—“তাহলে?”

রায়ান কিছু বলতে পারল না।

মায়া চোখ মুছে বলল,

—“আমি আর কাউকে বিশ্বাস করি না।”

এই কথাটা বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল।

রায়ান তার হাত ধরতে গেল।

মায়া হাত সরিয়ে নিল।

—“আমাকে ছুঁয়ো না।”

রায়ানের চোখে কষ্ট ফুটে উঠল।

আদনান নীরবে দুজনকে দেখছিল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

—“তোমরা দুজন একটা বিষয় ভুলে যাচ্ছ।”

মায়া ফিরে তাকাল।

আদনান বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিটা হাতে নিয়েই মায়ার চোখ স্থির হয়ে গেল।

ছবিতে তার মা।

তার কোলে ছোট্ট একটা শিশু।

আর পাশে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ।

মায়া পুরুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ছবিটা কাঁপতে কাঁপতে নিচে পড়ে গেল।

কারণ লোকটাকে সে চিনতে পেরেছে।

সে লোকটাকে আজও জীবিত অবস্থায় দেখেছে।

তার নিজের বাবার পাশে।

মায়া ফিসফিস করে বলল—

—“এটা... কীভাবে সম্ভব?”

আদনান ধীরে বলল,

—“কারণ তোমার জন্মের পর তোমাকে যে পরিবারে বড় করা হয়েছিল, সেটা তোমার আসল পরিবার ছিল না।”

মায়ার চোখে অন্ধকার নেমে এলো।

—“তাহলে আমি কে?”

আদনান উত্তর দিল না।

সে শুধু বাক্স থেকে আরেকটা কাগজ বের করল।

কাগজে লেখা—

“মায়া রহমান—জন্মের নাম: মেহরিন।”

মায়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

মেহরিন?

এই নামটা তার অচেনা নয়।

ছোটবেলায় ঘুমের মধ্যে মা তাকে মাঝে মাঝে এই নামেই ডাকতেন।

কিন্তু সে ভেবেছিল, সেটা কেবল স্বপ্ন।

মায়া ধীরে ধীরে রায়ানের দিকে তাকাল।

—“তুমি জানতেও?”

রায়ান চোখ বন্ধ করল।

—“হ্যাঁ।”

মায়ার চোখ ভিজে গেল।

—“তাহলে সাত বছর আগে তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে কেন?”

রায়ান এবার তার দিকে তাকাল।

তার চোখে এমন গভীর কষ্ট ছিল যে মায়া কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না।

রায়ান ধীরে বলল—

“কারণ সেদিন তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে... আমি তোমার মাকে হারিয়েছিলাম।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

মায়া কিছু বলার আগেই বাইরে হঠাৎ গুলির শব্দ হলো।

ধাঁই!

জানালার কাঁচ ভেঙে গেল।

আদনান সঙ্গে সঙ্গে মায়াকে নিচে টেনে ফেলল।

রায়ান অস্ত্র বের করে দরজার দিকে তাকাল।

বাইরে একাধিক মানুষের পায়ের শব্দ।

আদনান ফিসফিস করে বলল—

—“ওরা এসে গেছে।”

রায়ান দাঁত চেপে বলল—

—“এবার আর মায়াকে নিয়ে যেতে পারবে না।”

মায়া কাঁপা গলায় বলল,

—“কারা ওরা?”

আদনান তার দিকে তাকিয়ে বলল—

“যারা তোমাকে মেহরিন নামেই খুঁজছে।”

মায়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

আর ঠিক তখনই—

বাড়ির বাইরে থেকে একজন নারীর কণ্ঠ ভেসে এলো।

খুব পরিচিত কণ্ঠ।

খুব প্রিয় কণ্ঠ।

—“মায়া...”

মায়ার বুক কেঁপে উঠল।

সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

নারীটি আবার ডাকল—

“মেহরিন... মা, আমি এসেছি।”

মায়ার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।

কারণ সেই কণ্ঠ—

তার মায়ের।

চলবে...

মায়ার মা কি সত্যিই ফিরে এসেছে?
সাত বছর ধরে তিনি কোথায় ছিলেন?
আর কেন সবাই মায়াকে “মেহরিন” নামে খুঁজছে?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন