ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিশীথের ওপারে তুমি

১০ম পর্ব

লেখক: Adiba
 নিশীথের ওপারে তুমি
পর্ব — ১০
লেখিকা: আদিবা
রাত তখন প্রায় বারোটা।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ।
বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দে আকাশ কেঁপে উঠছে।
কিন্তু মায়ার চোখে ঘুম নেই।
বিছানায় বসে সে বারবার সেই ফোনকলটার কথা মনে করছে।
“তোমার ভাইকে দেখতে চাও?”
তারপর সেই হুমকি—
“রায়ানকে সঙ্গে নিলে... তোমার ভাই মরবে।”
মায়া জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
সাত বছর ধরে তার জীবনে একটা মানুষ ছিল না।
তার ভাই।
যার অস্তিত্ব সম্পর্কেই সে জানত না।
আজ হঠাৎ জানতে পারল, তার একজন ভাই আছে।
আর সেই ভাই নাকি তাকে ঘৃণা করে!
মায়া নিজের মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—“আমার জীবনটা এত জটিল কেন?”
ঠিক তখনই দরজায়—
ঠক ঠক।
মায়া চমকে উঠল।
—“কে?”
বাইর থেকে রায়ানের কণ্ঠ—
—“আমি।”
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—“কী চাই?”
—“দরজা খোলো।”
—“কেন?”
—“জরুরি কথা।”
—“রাত বারোটায় মানুষের জরুরি কথা থাকে?”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রায়ান বলল,
—“আমার থাকে।”
মায়া দরজা খুলে দিল।
রায়ান দাঁড়িয়ে আছে হাতে একটা কাপ নিয়ে।
মায়া কাপটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“এটা কী?”
—“দুধ।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—“আমি কি পাঁচ বছরের বাচ্চা?”
—“না।”
—“তাহলে দুধ কেন?”
—“তুমি ঘুমাচ্ছ না।”
—“তুমি কি ডাক্তার?”
—“না।”
—“তাহলে?”
রায়ান গম্ভীর মুখে বলল,
—“আমি তোমার পাহারাদার।”
মায়া কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
—“পাহারাদার নাকি দুধওয়ালা?”
—“তুমি চাইলে দুটোই হতে পারি।”
মায়া চোখ ঘুরিয়ে বলল,
—“তোমার আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হচ্ছে তোমার আয়না তোমাকে অনেক বেশি প্রশংসা করে।”
রায়ান মুচকি হাসল।
—“তুমি আমাকে নিয়ে এত ভাবো?”
—“না। তুমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকো বলে চোখে পড়ে।”
—“তাহলে চোখ বন্ধ করো।”
—“তোমার মুখটা না দেখলে শান্তি পাব কীভাবে?”
রায়ান হেসে ফেলল।
—“তুমি আমাকে মিস করেছিলে।”
মায়া থমকে গেল।
—“কী?”
—“সাত বছর।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
—“তুমি স্বপ্নে বেশি কথা বলো।”
রায়ান একটু চুপ করে থেকে বলল,
—“তুমিও আমাকে মিস করেছিলে।”
মায়া কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সত্যিটা হলো—
হ্যাঁ।
সে করেছিল।
অনেক।
কিন্তু সেটা স্বীকার করার মতো সাহস তার নেই।
রায়ান ধীরে বলল,
—“কাল আমরা ব্ল্যাকউড ম্যানশনে যাব।”
মায়া তাকাল।
—“আমি একা যাব।”
—“না।”
—“কেন?”
—“কারণ তুমি বিপদকে চুম্বকের মতো টেনে আনো।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আর তুমি?”
—“আমি বিপদ সামলাই।”
—“নিজেকে কী ভাবো?”
রায়ান একটু ভেবে বলল,
—“হিরো।”
মায়া হেসে ফেলল।
—“হিরো না, হিরোর বাজেট ভার্সন।”
রায়ান বুকের ওপর হাত রেখে ভান করা কষ্টের স্বরে বলল,
—“এত বছর পর ফিরে এসে এই অপমানগুলো শোনার জন্যই কি আমি বেঁচে ছিলাম?”
মায়া হেসে ফেলল।
—“হয়তো।”
হঠাৎ—
ঠক!
দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
দরজার বাইরে যেন কিছু একটা পড়ে গেল।
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।
সে মায়াকে পিছনে সরিয়ে দিল।
—“এখানে থাকো।”
—“কী হয়েছে?”
—“চুপ।”
রায়ান ধীরে দরজা খুলল।
বাইরে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে একটা কালো খাম।
সে সেটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
“মেহরিনের জন্য।”
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
—“আমার নাম... এখানে কে লিখেছে?”
রায়ান খামটা খুলল।
ভেতরে একটা ছোট কাগজ।
তাতে মাত্র এক লাইন—
“ব্ল্যাকউডে যাওয়ার আগে নিজের ঘরের আয়নাটা দেখো।”
মায়া কপাল কুঁচকে বলল,
—“আয়না?”
রায়ান ঘরের বড় আয়নার দিকে তাকাল।
দুজন ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
প্রথমে কিছুই দেখা গেল না।
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—“এটা কি কোনো ফালতু প্র্যাঙ্ক?”
রায়ান আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করতে লাগল।
—“একটু দাঁড়াও।”
হঠাৎ সে ফ্রেমের নিচের অংশে একটা ছোট্ট চিহ্ন দেখতে পেল।
একই চিহ্ন।
মায়ের ডায়েরিতে ছিল।
পুরোনো কাঠের বাক্সেও ছিল।
রায়ান আঙুল দিয়ে চিহ্নটার ওপর চাপ দিতেই—
ক্লিক!
আয়নার পাশের কাঠের অংশ খুলে গেল।
মায়া হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
—“আমার ঘরে গোপন কুঠুরি?”
রায়ান বলল,
—“তোমার মা অনেক কিছু লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
—“আমার মা কি গুপ্তচর ছিলেন?”
—“সম্ভব।”
মায়া তাকাল।
—“তুমি সিরিয়াস?”
—“তোমার জীবন দেখে এখন কোনো কিছুই অসম্ভব মনে হয় না।”
মায়া বলল,
—“এই কথাটা ঠিক।”
কুঠুরির ভেতরে ছিল একটা পুরোনো চিঠি।
মায়া কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল।
চিঠির ওপরে লেখা—
“আমার মেহরিনের জন্য।”
মায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সে চিঠিটা খুলল।
প্রথম লাইন—
“মেহরিন, যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে সত্যিটা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।”
মায়ার হাত কাঁপছে।
সে পড়তে লাগল।
“তুই এতদিন যে জীবনকে সত্যি ভেবেছিস, তার অনেকটাই মিথ্যা। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—তোর ভাই বেঁচে আছে।”
মায়া থেমে গেল।
রায়ানের দিকে তাকাল।
—“আমার ভাই... বেঁচে আছে।”
রায়ান চুপ করে রইল।
মায়া আবার পড়তে লাগল।
“তাকে খুঁজতে দূরে যাস না। তুই তাকে অনেক বছর ধরে চিনিস।”
মায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
—“আমি তাকে চিনি?”
রায়ান ধীরে বলল,
—“সম্ভবত।”
—“তুমি জানো?”
—“না।”
মায়া চোখ সরু করে তাকাল।
—“মিথ্যা বলছ?”
—“না।”
—“তোমার মুখ মিথ্যা বলছে।”
—“আমার মুখেরও কি আলাদা মতামত আছে?”
মায়া রাগী চোখে তাকাল।
—“তোমার মুখটা খুব বেশি কথা বলে।”
রায়ান হেসে বলল,
—“তোমার মুখের মতো?”
মায়া কুশন তুলে ছুড়ে মারল।
রায়ান সেটা ধরে ফেলল।
—“দেখলে? আমি প্রস্তুত ছিলাম।”
—“আজকে তোমাকে মেরে ফেলব।”
—“আগে সত্যিটা জেনে নাও, তারপর মারো।”
মায়া থেমে গেল।
সত্যি।
সত্যিটা জানতেই হবে।
ঠিক তখনই দরজার কাছে একটা ছায়া দেখা গেল।
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
মায়ার মা দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখ ফ্যাকাশে।
মায়া দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরল।
—“মা, তুমি জানো আমার ভাই কে?”
মা চুপ।
—“মা!”
মা ধীরে বললেন,
—“হ্যাঁ।”
—“কে?”
মা চোখ বন্ধ করলেন।
—“তুই তাকে অনেক বছর ধরে চিনিস।”
মায়া এবার মায়ের দুই হাত ধরে বলল,
—“নাম বলো।”
মায়ের চোখে পানি চলে এলো।
—“আমি ভয় পাচ্ছি।”
—“কিসের?”
—“তুই সত্যিটা জানলে আমাকে হয়তো ঘৃণা করবি।”
মায়া কেঁদে বলল,
—“আমি এত মিথ্যা শুনেছি যে এখন সত্যিটাই শুনতে চাই।”
মা ঠোঁট খুললেন।
—“তোর ভাইয়ের নাম...”
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে গাড়ির শব্দ।
সবাই থেমে গেল।
রায়ান জানালার দিকে তাকাল।
—“কেউ এসেছে।”
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
—“এই বাড়িতে মানুষজন কি দরজায় নক করে আসে না?”
রায়ান বলল,
—“সম্ভবত আমাদের গল্পের চরিত্রদের ভদ্রতা শেখানো হয়নি।”
মায়া তাকিয়ে বলল,
—“এখনও মজা করছ?”
—“তোমাকে ভয় পেতে দিতে চাই না।”
মায়ার মা হঠাৎ কাঁপা গলায় বললেন,
—“ওরা বাইরে আসেনি।”
রায়ান ঘুরে তাকাল।
—“কী?”
—“ওরা বাড়ির ভেতরে।”
ঘরটা নিস্তব্ধ।
তারপর—
নিচতলা থেকে একটা হাসির শব্দ।
মায়া থমকে গেল।
সে কণ্ঠটা চেনে।
খুব ভালো করেই চেনে।
—“সামির...”
রায়ানের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
তিনজন ধীরে ধীরে সিঁড়ির কাছে গেল।
নিচে ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে।
সোফায় বসে আছে সামির।
তার হাতে একটা কালো পাথরের আংটি।
মায়ার বুক ধক করে উঠল।
সামির ধীরে উঠে দাঁড়াল।
—“অবশেষে সত্যিটা খুঁজে পেয়েছ, মেহরিন?”
মায়া সিঁড়ি থেকে নিচে নামল।
—“তুমি এখানে কেন?”
—“তোমার জন্য।”
—“আমার জন্য?”
সামির মুচকি হাসল।
—“হ্যাঁ।”
রায়ান মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
—“ওর কাছ থেকে দূরে থাকো।”
সামির হেসে বলল,
—“তুমি এখনও একই রকম।”
—“আর তুমি এখনও বেঁচে আছ—এটাই আশ্চর্য।”
সামিরের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“তুমি জানো আমি কেন এসেছি।”
—“বল।”
সামির মায়ার দিকে তাকাল।
—“তোমার ভাইকে নিয়ে যেতে।”
মায়ার গলা শুকিয়ে গেল।
—“আমার ভাই কোথায়?”
সামির বলল,
—“তোমার খুব কাছেই।”
মায়া চারপাশে তাকাল।
—“কোথায়?”
সামির ধীরে রায়ানের দিকে তাকাল।
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—“না...”
সামির বলল,
—“রায়ান।”
মায়া রায়ানের দিকে তাকাল।
রায়ানের মুখে কোনো কথা নেই।
সামির আবার বলল—
—“ও-ই তোমার ভাই।”
মায়ার মাথা ঘুরে উঠল।
—“না।”
রায়ান চোখ বন্ধ করল।
মায়া এক পা পিছিয়ে গেল।
—“না... এটা মিথ্যা।”
রায়ান ধীরে বলল,
—“মায়া...”
—“চুপ!”
তার চোখে পানি।
—“তুমি বলেছিলে আমাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই!”
রায়ান মাথা নিচু করল।
—“আমি ভুল বলেছিলাম।”
—“ভুল?”
মায়া হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসিতে কান্না মিশে আছে।
—“মানুষ কি এমন একটা ব্যাপারে ভুল করে?”
রায়ান তার দিকে এগিয়ে এলো।
—“আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
—“আমাকে রক্ষা?”
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“তুমি জানো সাত বছর ধরে আমি তোমাকে কী ভেবেছি?”
রায়ানের চোখও ভিজে উঠল।
—“জানি।”
—“না, তুমি জানো না।”
মায়া মাথা নাড়ল।
—“তুমি জানো না আমি কত রাত তোমাকে খুঁজেছি।”
রায়ান চুপ।
—“তুমি জানো না তোমাকে ঘৃণা করতে গিয়ে কতবার তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
রায়ানের চোখে পানি জমে উঠল।
ঘরটা নিস্তব্ধ।
সামির যেন এই দৃশ্য উপভোগ করছে।
কিন্তু হঠাৎ মায়ার মা চিৎকার করে উঠলেন—
—“না!”
সবাই তার দিকে তাকাল।
তিনি কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
—“রায়ান ওর ভাই নয়।”
মায়া থমকে গেল।
সামিরের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
রায়ান অবাক।
—“আপনি কী বলছেন?”
মায়ার মা ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন—
“রায়ান তোমার ভাই নয়, মেহরিন। কিন্তু...”
তিনি থেমে গেলেন।
মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“কিন্তু কী?”
মা চোখ বন্ধ করলেন।
—“রায়ান হলো...”
ঠিক তখনই—
বাইরে গুলির শব্দ।
ধাঁই!
জানালার কাঁচ ভেঙে গেল।
সবাই নিচু হয়ে গেল।
সামির মাটিতে পড়ে থাকা অস্ত্র তুলে নিল।
রায়ান মায়াকে নিজের আড়ালে নিল।
আর মায়ার মা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বললেন—
“রায়ান তোমার বাবার ছেলে নয়—সে তোমার বাবার সবচেয়ে বড় শত্রুর ছেলে!”
সবাই স্তব্ধ।
রায়ান ধীরে মায়ার দিকে তাকাল।
মায়ার চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন—
“তাহলে তুমি আসলে কে?”
রায়ান উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে কারও কণ্ঠ ভেসে এলো—
“সত্যিটা জানতে চাইলে... নিশীথের ওপারে এসো।”
চলবে...
পর্ব ১১-এ
রায়ানের আসল পরিচয় কী?
তার বাবা কে?
মায়ার বাবার সবচেয়ে বড় শত্রুর সঙ্গে রায়ানের সম্পর্ক কী?
আর অন্ধকারে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে—সে কি মায়ার হারিয়ে যাওয়া ভাই?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন