ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিশীথের ওপারে তুমি

১৩তম পর্ব

লেখক: Adiba
নিশীথের ওপারে তুমি
পর্ব — ১৩
লেখিকা: আদিবা
“তবে আমি সেই আরমান নই, যাকে তুই সাত বছর আগে চিনতিস।”
কথাটা শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না।
একই চোখ।
একই ভ্রু।
একই চোয়ালের গড়ন।
শুধু আগের সেই শিশুসুলভ কোমলতা নেই।
চোখের গভীরে জমে আছে অদ্ভুত এক শীতলতা।
মায়ার ঠোঁট কাঁপল।
—“তুমি... সত্যিই আরমান?”
লোকটা মৃদু হাসল।
—“তুই এখনও আগের মতোই প্রশ্ন করিস।”
মায়ার চোখে পানি চলে এলো।
—“আমি তোকে কত বছর খুঁজেছি জানিস?”
আরমানের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“আমি জানি।”
—“তাহলে একবারও আমার কাছে আসিসনি কেন?”
আরমান উত্তর দিল না।
মায়া এক পা এগিয়ে গেল।
—“আমি তোকে মৃত ভেবেছি!”
আরমান নিচু গলায় বলল,
—“সেটাই তো চেয়েছিলাম।”
—“কেন?”
—“কারণ তুই যদি জানতে পারতি আমি বেঁচে আছি, তাহলে তুইও নিরাপদ থাকতি না।”
মায়া চোখ মুছে বলল,
—“সবাই একই কথা বলে! আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে সবাই আমার কাছ থেকে সবকিছু লুকায়!”
রায়ান ধীরে মায়ার পাশে এসে দাঁড়াল।
—“মায়া...”
মায়া ঘুরে তাকাল।
—“তুমিও চুপ করবে না। আজ কেউ চুপ করবে না।”
আরমান রায়ানের দিকে তাকাল।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তেই পরিবেশ বদলে গেল।
আরমানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
—“তুই এখানে কেন?”
রায়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
—“মায়ার সঙ্গে।”
—“আমি তোকে জিজ্ঞেস করিনি মায়ার সঙ্গে কেন এসেছিস।”
রায়ান এক পা এগিয়ে গেল।
—“তাহলে কী জিজ্ঞেস করছিস?”
আরমানের চোয়াল শক্ত হলো।
—“তুই এখনও ওর পাশে দাঁড়ানোর যোগ্য কিনা।”
মায়া বিরক্ত হয়ে দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।
—“দুজনেই থামো!”
আরমান ভ্রু তুলল।
মায়া বলল,
—“আমি সাত বছর পর ভাইকে ফিরে পেয়েছি। প্রথম পাঁচ মিনিটেই তোমরা দুজন এমনভাবে তাকাচ্ছ যেন পুরোনো শত্রুতার ফাইনাল ম্যাচ শুরু হবে!”
রায়ান মুখ চেপে হাসি থামাল।
আরমানও হালকা হাসল।
—“তুই একটুও বদলাইসনি।”
মায়া চোখ রাঙাল।
—“আর তুমি বদলে গেছ।”
আরমানের মুখ আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—“হ্যাঁ।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মায়া ধীরে বলল,
—“বাবা তোমাকে গুলি করেছিল?”
আরমানের চোখে মুহূর্তেই অন্ধকার নেমে এলো।
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“কারণ আমি এমন একটা সত্য জেনে গিয়েছিলাম, যেটা জানার কথা আমার ছিল না।”
—“কী সত্য?”
আরমান মায়ার দিকে তাকাল।
—“তুই কি সত্যিই সব জানতে প্রস্তুত?”
মায়া মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
—“সব?”
—“সব।”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“তাহলে ভেতরে আয়।”
নিশীথের বাড়ির ভেতর
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই মায়ার শরীর কেঁপে উঠল।
কোথাও যেন অদ্ভুত পরিচিত একটা গন্ধ।
পুরোনো কাঠ।
ভেজা মাটি।
আর কোথাও একটা মিষ্টি ফুলের গন্ধ।
মায়া ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকাল।
একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে দুটো শিশু।
একটা ছেলে।
একটা মেয়ে।
মায়া ছবিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
তার আঙুল কেঁপে উঠল।
—“এটা আমি।”
আরমান পাশে এসে দাঁড়াল।
—“হ্যাঁ।”
—“আর তুমি।”
—“হ্যাঁ।”
মায়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
—“তখন তুমি এত ছোট ছিলে।”
আরমান বলল,
—“তুইও।”
—“আমি সুন্দর ছিলাম।”
আরমান হেসে বলল,
—“তুই তখনও অনেক কথা বলতি।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
—“এখন বেশি বলি?”
—“অনেক বেশি।”
রায়ান পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—“এ ব্যাপারে আমি আরমানের সঙ্গে একমত।”
মায়া দুজনের দিকে তাকাল।
—“তোমরা দুজন আজকে আমার বিপক্ষে জোট বেঁধেছ?”
আরমান বলল,
—“দেখলি? এখনও সবাইকে নিজের বিরুদ্ধে মনে হয়।”
মায়া ভেংচি কাটল।
—“চুপ।”
রায়ান নিচু গলায় বলল,
—“তোমার ভাইকে পাওয়ার পরও তোমার মেজাজ ঠিক হয়নি।”
মায়া বলল,
—“তোমার জন্যই হয়নি।”
—“আমি কী করলাম?”
—“তুমি জন্মেছ।”
আরমান হেসে ফেলল।
—“তুই এখনও ভয়ংকর।”
মায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
—“আমার ভাই আমার পক্ষ নেবে ভেবেছিলাম।”
আরমান বলল,
—“আমি তোকে সাত বছর পর পেয়েছি। এখনই তোর সব অত্যাচার সহ্য করতে রাজি না।”
মায়া কপট রাগে বলল,
—“তুমি খুব খারাপ ভাই।”
আরমান মৃদু হেসে বলল,
—“তবুও তোর ভাই।”
কথাটা শুনে মায়ার চোখ আবার ভিজে উঠল।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর সবাই একটা বড় ঘরে বসে।
আরমান টেবিলের ওপর কয়েকটা পুরোনো ফাইল রাখল।
—“এগুলো তোমার বাবার।”
মায়া ফাইলের দিকে তাকাল।
—“এগুলোতে কী আছে?”
—“তোমার পরিবার নিয়ে সত্য।”
সামির এতক্ষণ চুপ ছিল।
সে বলল,
—“আরমান, সবকিছু বলার আগে একটা কথা মনে রাখ।”
আরমান তার দিকে তাকাল।
—“কী?”
—“সবাই এখানে সত্য শুনতে প্রস্তুত নয়।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“আমি প্রস্তুত।”
আরমান মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে।”
সে প্রথম ফাইলটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।
একজন অচেনা পুরুষ।
মায়া ছবিটা হাতে নিয়ে বলল,
—“উনি কে?”
আরমান বলল,
—“তোমার বাবার ব্যবসায়িক অংশীদার।”
—“নাম?”
—“জাহিদ রহমান।”
রায়ান হঠাৎ ছবিটার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।
মায়া সেটা লক্ষ্য করল।
—“তুমি তাকে চেনো?”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
—“হ্যাঁ।”
—“কীভাবে?”
—“আমার বাবা তাকে চিনতেন।”
মায়া এবার আরও অবাক।
—“তোমার বাবা?”
রায়ান মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
আরমান ধীরে বলল,
—“এখানেই আসল সমস্যা।”
সে দ্বিতীয় ফাইলটা খুলল।
সেখানে একটা পুরোনো নথি।
আরমান বলল,
—“জাহিদ রহমান শুধু তোমার বাবার অংশীদার ছিল না।”
মায়া তাকিয়ে রইল।
—“তাহলে?”
আরমান বলল,
—“সে রায়ানের বাবারও সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল।”
ঘর নিস্তব্ধ।
মায়া ধীরে রায়ানের দিকে তাকাল।
—“তাহলে তোমাদের দুই পরিবারের সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল?”
রায়ান মাথা নাড়ল।
—“হ্যাঁ।”
—“আর সেটা সবাই আমার কাছ থেকে লুকিয়েছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
মায়া বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
—“আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।”
আরমান তাকাল।
—“কী?”
—“আমার জীবনে এত গোপন দরজা কেন?”
সামির বলল,
—“তোর পরিবার খুব নাটকীয় ছিল।”
মায়া তাকাল।
—“ছিল?”
সামির চুপ।
মায়া চোখ সরু করল।
—“‘ছিল’ বললে কেন?”
সামির কিছু বলার আগেই—
ধাম!
বাইরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
সবাই চমকে উঠল।
রায়ান উঠে দাঁড়াল।
—“কেউ এসেছে।”
আরমান জানালার দিকে গেল।
—“অসম্ভব।”
—“কেন?”
—“এই বাড়ির অবস্থান কেউ জানে না।”
সামির ধীরে বলল,
—“কেউ জানে।”
আরমান তার দিকে তাকাল।
—“কে?”
সামির বলল,
—“যে আমাদের অনুসরণ করছিল।”
রায়ান অস্ত্র বের করল।
—“সবাই নিচু হও।”
মায়া ফিসফিস করে বলল,
—“আবার গুলি?”
রায়ান তাকাল।
—“ভয় পেয়েছ?”
—“না।”
—“মিথ্যা বলছ।”
—“হ্যাঁ।”
রায়ান হেসে বলল,
—“এটাই ভালো।”
মায়া ফিসফিস করে বলল,
—“তুমি এখনো মজা করতে পারো?”
—“তুমি ভয় পেলে বেশি কথা বলো। তাই তোমাকে কথা বলিয়ে রাখছি।”
—“আমি ভয় পাইনি।”
—“ঠিক আছে।”
—“আমি শুধু...”
—“জানি।”
—“কী জানো?”
—“তুমি ভয় পেয়েছ।”
মায়া এবার চুপ করে গেল।
বাইরে পায়ের শব্দ কাছে আসছে।
একজন।
দুজন।
তিনজন।
আরমান ধীরে দরজার পাশে দাঁড়াল।
রায়ান তার পাশে।
সামির অন্যদিকে।
মায়া মাঝখানে।
হঠাৎ—
দরজা খুলে গেল।
একজন কালো পোশাক পরা লোক ভেতরে ঢুকল।
তার হাতে অস্ত্র।
কিন্তু সে কাউকে লক্ষ্য করল না।
সোজা মায়ার দিকে তাকাল।
তারপর বলল—
—“মেহরিন।”
মায়া তাকিয়ে রইল।
লোকটা ধীরে মুখের মাস্ক খুলল।
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
রায়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
সামির এক পা পিছিয়ে গেল।
কারণ লোকটা ছিল—
মায়ার বাবা।
মায়ার ঠোঁট কাঁপল।
—“বাবা...”
লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তুই এখানে কেন এসেছিস?”
মায়ার চোখে পানি।
—“আমার ভাইকে দেখতে।”
তার বাবা আরমানের দিকে তাকালেন।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ কথা বলল না।
তারপর মায়ার বাবা বললেন—
—“আমি তোকে বলেছিলাম, আরমান। ওকে কখনো সত্যিটা বলবি না।”
আরমান ঠান্ডা গলায় বলল,
—“অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
মায়ার বাবা এবার মায়ার দিকে তাকালেন।
—“তুই জানিস না তুই কী করেছিস।”
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
—“আমি কী করেছি?”
—“তুই নিশীথে এসেছিস।”
—“তাতে কী?”
তার বাবা ধীরে বললেন—
“এই বাড়ির নিচে এমন একটা জিনিস লুকানো আছে, যেটার জন্য তোর পুরো পরিবার একে অপরকে মেরে ফেলতেও প্রস্তুত।”
মায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“কী?”
তার বাবা উত্তর দেওয়ার আগেই—
মেঝের নিচ থেকে একটা ভারী শব্দ হলো।
ধুপ!
তারপর আবার—
ধুপ!
যেন নিচে কেউ দরজায় আঘাত করছে।
মায়া ধীরে মেঝের দিকে তাকাল।
আরমানের মুখ ফ্যাকাশে।
রায়ান ফিসফিস করে বলল,
—“না...”
মায়া তাকাল।
—“কী?”
রায়ান বলল,
—“ওটা অসম্ভব।”
মেঝের একটা অংশ ধীরে ধীরে ফেটে উঠল।
নিচে অন্ধকার সিঁড়ি দেখা গেল।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো—
একজন নারীর কান্নার শব্দ।
মায়া কেঁপে উঠল।
—“কে কাঁদছে?”
আরমান ধীরে ধীরে বলল,
—“আমি জানি না।”
মায়ার বাবা চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন—
“ও তোর মা।”
মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“কিন্তু মা তো...”
সে হঠাৎ থেমে গেল।
কারণ তার মনে পড়ল—
তার মা তো অন্য গাড়িতে ছিল।
তাহলে—
নিচে কে?
রায়ান মায়ার হাত শক্ত করে ধরল।
—“আমার সঙ্গে থাকো।”
মায়া কাঁপা গলায় বলল,
—“যদি সত্যিই মা হয়?”
রায়ান বলল,
—“তাহলে আমরা তাকে নিয়ে বের হব।”
আরমান সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কিন্তু নিচে যাওয়ার আগে একটা কথা জানা দরকার।”
মায়া তাকাল।
—“কী?”
আরমানের চোখে ভয়।
—“এই বাড়ির নিচে শুধু তোর মায়ের ঘর নেই।”
সে ধীরে বলল—
“সেখানে সাত বছর ধরে একজন মানুষ বন্দি আছে।”
মায়ার বুক কেঁপে উঠল।
—“কে?”
আরমান নিচের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল—
“যাকে তুই এতদিন মৃত ভেবেছিস।”
মায়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন