ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

২৮তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#কলমে_মেহরিমা_সারা 
#পর্বঃ২৮ 
বৃষ্টির ধারা যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ঝড়ো বাতাসের দাপটে হাঁটাটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা ভিজতে ভিজতে পথ পেরিয়ে অবশেষে তারা রাস্তার একটি মোড়ে এসে পৌঁছায়। নীল চারপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে দেখে—দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনো গাড়ির দেখা নেই। জনমানবশূন্য রাস্তা যেন বৃষ্টির চাদরে ঢেকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে।
রাহাও ক্লান্ত চোখে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু বৃষ্টির তীব্র আঘাতে চোখ মেলে রাখা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। তাই বাধ্যতামূলক নীল এর ঘাড়ের দিকে মাথা হেলিয়ে দিয়েছে। এটাই বোধহয় ওর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় ছেলেটার শরীর থেকে এক অদ্ভুত সুবাস আসছে যেটা রাহাকে ক্ষনে ক্ষনে পাগল করে দিচ্ছে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে, এই ঠান্ডা বৃষ্টির মধ্যেও নিঃশ্বাস গরম হয়ে উঠছে। শুনশান নিরব রাস্তায় বৃষ্টির আওয়াজ এর সাথে এমন নিরবতা রাহাকে কাবু করে নিচ্ছে। নিজের অজান্তেই রাহা নীলের গলা জড়িয়ে রাখা হাত গুলোকে আরো শক্ত করে ধরে নাক খানিকটা নীল এর কাছাকাছি নিয়ে যায় যেন সুবাস টা ভালো ভাবে পায়। নাসারন্ধ্রে হু হু করে সুবাস যাচ্ছে যা রাহা কে মাতাল করে তুলছে।
 নীল দাত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে, রাহার মতিগতি বুঝতে পারছে না। মেয়েটার একেকটা পদক্ষেপে যে নীল এর ধৈর্য চুরমার হচ্ছে সেটা কি জানে? উঁহু জানলে এমন করতো না, রাহার গরম নিঃশ্বাস নীল এর ঘাড়ে পড়ছে যা ওকে পাগল করে দিচ্ছে ইচ্ছে করছে দুনিয়ার সব নিয়ম ভেঙে জোর করে এই মেয়েটাকে নিজের করে ফেলতে। নেই রাহা আজ নিজের মাঝে নেই নয়তো এরকম তো দুঃস্বপ্নেও করতো না। তবে আজ নীল ও কিছু করবে না, আজ কেন কখনোই কিছু করবে না এমন ব্যবস্থা করবে যেন রাহা নিজেই ওর কাছে আসে।
রাহা পাগলের মতো শুধু নিঃশ্বাস টেনে নিচ্ছে যেন এটা কোন খাবার। এখন না খেলে আর পরে পাবে না। দাঁতে দাঁত চেপে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেকে, নীল অনুভব করতে পাচ্ছে বৃষ্টির মধ্যেও শরীর ধীরে ধীরে গরম হয়ে যাচ্ছে। 
বৃষ্টির ফোঁটা গুলো রাহার ওই রেড চেরি লিপ এর উপর দিয়ে চিবুক বেয়ে নরম কোমল গলা দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। রাহার হালকা ব্লু কালারের টপটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে এতে শরীরের প্রতিটি বাক স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। নীল এর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। টপের নিচে থাকা কালার ম্যাচিং করে পড়া কাপড় টাও স্পষ্ট। 
রাহার মুখ ওপাশে থাকায় রাহা নীল এর ওই কামুক দৃষ্টি দেখতে পারছে না দেখলে হয়তো নিজেকে নীল এর মাঝে লুকিয়ে ফেলতো যেভাবে চাদ নিজেকে মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে। নীল একটুও দ্বিধা না করে নিজের মতো করে প্রেয়সীর শরীরে পূর্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে যাচ্ছে যেন এই সব কিছু শুধুমাত্র তারই। আসলেই কি তার হবে? মনের এই প্রশ্নে নীল দৃঢ় গলায় প্রতিত্তর করে,
— অবশ্যই সব আমার, আমার পিওনির মন দেহ সব। আমার ওখানে কেউ তাকালেও তার চোখ উপড়ে ফেলবো।
নীল এর মনের বাকবিতন্ডা মনেই রয়ে গেলো রাহা নামক রমনী পর্যন্ত কিছুই পৌছালো না।
রাস্তার মোড়ে এসেও গাড়ি না পাওয়ায় নীল দাঁড়িয়ে থাকেনি, ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছে, আশেপাশে ছোট ডাল ভেঙে বাতাসে উড়ে এখান থেকে সেখানে যাচ্ছে। যদি রাহার গায়ে উড়ে এসে লাগে তাই নীল দুই হাতে রাহার শরীরকে নিজের মাঝে আরো টেনে নেয়। রাহার চিবুক এবার নীল এর ঘাড়ে ঠেকে। রাহার শরীর সময়ের সাথে ঠান্ডা হচ্ছে। নীল এর এবার ভয় করছে যেভাবেই হোক কিছু করা দরকার এভাবে থাকলে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়বে, এখনো বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে অভ্যস্ত হতে পারেনি। আর রাহা তো প্রিয় সুবাস গ্রহণ করেই যাচ্ছে।
ভাগ্য বোধহয় সহায় ছিলো তাই কিছুটা আগানোর পরে নীল দেখে সামনে অনেক গুলো টেক্সি আছে। দ্রুত সেখানে এগিয়ে যায়। টেক্সি ড্রাইভার দের ওদের ঠিকানা বললে যেতে রাজি হয়না কারন ওই জায়গা অনেক ভিতরে বৃষ্টির মধ্যে যাওয়া কষ্টকর। নীল বলে ভাড়া যতো চাইবে ততোই দিবে। এবার একজন রাজি হয়ে যায় কারন ছেলে মেয়ে গুলোর পোশাক দেখে বড়লোক মনে হচ্ছে। নীল রাহাকে সম্পুর্ণ শক্তি দিয়ে নিজের বুকে মিশিয়ে রাখে যেন কেউ রাহার শরীরে চোখ বুলাতে না পারে। রাহার ধ্যান তো ওদের কথোপকথনেই ভেঙ্গে গেছে। কি করছিলো মাথায় আসেনি তবে এতো টুকু বুঝতে পারছে নীল এর থেকে দূরে সরতে হবে তবে নীল তো সরানো দূর আরো বেশি জোরে ধরে রেখেছে রাহা পা নাড়ানো ব্যতীত কিছুই করতে পারছে না।
নীল রাহাকে ওভাবে নিয়েই টেক্সিতে বসে পড়ে। রাহা কটমট করে তাকায় বলে,
— নীল ছাড়ো।
নীল ও একই ভঙ্গিতে থাকি বলে,
— নিজের জিনিস অন্যকে দেখাতে আগ্রহী নই।
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ভাবে, কি বললো আর নীল কি বললো। রাহা গলা জড়িয়ে থাকা হাত সামনে এনে নীল এর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
—তুমি একটা বেয়াদব! লজ্জা করে না বড় একজন মানুষ কে এভাবে রাখতে।
— না করে না লজ্জা। বড় মানুষের সারা রাস্তা আমার কোলে চড়তে লজ্জা না করলে আমার কেন করবে??
— আমি বলেছি কোলে নাও।
— না আপনি কেন বলবেন আমিইই নিয়েছি অনেক শখ ছিলো তো তাই।
রাহা থমথমে মুখে কিছু বলতে গিয়ে পারে না তার আগেই চোখ নিজের পোশাকে চলে যায়। রাহা একবার নীল এর দিকে তাকিয়ে সরে আসার চেষ্টা করতে নিলেই ড্রাইভার পিছনে ঘুরে বলে,
— ভাড়া বেশি দেওয়া লাগবো।
নীল সহসা রাহাকে দুই হাতে জড়িয়ে বলে,
—যতো চান ততোই দিবো এখন শুধু সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালান।
রাহা ড্রাইভার আছে বুঝা মাত্রই নীল এর দিকে নিজেই সেটে যায়। নীল এর শার্টের এক কোন আকড়ে চুপ করে পড়ে থাকে। চল্লিশ মিনিট লাগে পৌছাতে এর মাঝে কেউ কোনো কথাই বলে না কারন নীল নিজেও ক্লান্ত বৃষ্টির মধ্যে হাটা সহজ না। সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। রাহা একপল তাকায় নীল এর দিকে ফর্সা চেহারা রক্তিম হয়ে আছে চুল গুলো সব চোখের সামনে এসে পড়েছে।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই নীল সাবধানে রাহাকে নিয়ে নেমে আসে। দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে থাকার ফলে রাহার শরীর প্রায় অবসন্ন হয়ে পড়েছে। নীল একবার গাড়ির দিকে, একবার নিজের পকেটের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল ভাড়া কীভাবে মেটাবে। এমন সময় রাহা ক্লান্ত কণ্ঠে কেয়ারটেকার রোমজু মিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
তবে রোমজু মিয়াকে আর ডাকার প্রয়োজন হলো না। গাড়ির শব্দ শুনেই প্রবীণ লোকটি ছাতা হাতে বেরিয়ে এসেছেন। তার সঙ্গে দৌড়ে এসেছে ইরানীও। দুজনের চোখেই স্পষ্ট উদ্বেগ।
নীল সংক্ষেপে ভাড়ার বিষয়টা রোমজু মিয়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে রাহাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির করিডোর পেরিয়ে সে একদম শেষ প্রান্তের ঘরটার দিকে এগিয়ে যায়। ঘরটা একসময় রাহার মায়ের ছিল। যখনই তারা এখানে আসত, রাহার মা এই ঘরেই থাকতেন।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঘরটার প্রতিটি কোণ নীলের কাছে পরিচিত। হয়তো রাহা নিজেও জানে না কতবার সে এই ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অজুহাতে বন্ধুদের সঙ্গে কয়েকবার এখানে আসা হয়েছিল তার। তখনকার অনেক স্মৃতি আজও দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে আটকে আছে। ছোটবেলায় সবাই মিলে এখানে সময় কাটালেও রাহার মায়ের মৃত্যুর পর আর সেই একসঙ্গে আসা হয়নি। কেবল কাজের সূত্রে মাঝে মাঝে আরমান আর সাজিদের আসা-যাওয়া ছিল।
ঘরে ঢুকেই নীল সাবধানে রাহাকে কাউচে বসিয়ে দেয়। এতক্ষণ তাকে আগলে রাখার পর নিজের কাঁধটাও যেন ভারমুক্ত হলো। ক্লান্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে সে বলে,
— উফ! আপনাকে নিয়ে পুরো পথটা পার হওয়া সহজ ছিল না।
কথাটা শুনে রাহা মাথা তুলে কটমট করে তার দিকে তাকায়। নিজের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে এমনিতেই বিরক্ত ছিল সে। নীল সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে পিছিয়ে যায়। ঘর থেকে বের হতে হতে বলে,
— আপনি কালার ম্যাচিং ভালো বুঝেন।
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকে পড়ে ইরা। শেষের কথাটুকু তার কানে পৌঁছেছিল।
সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কী বলছিলে?
রাহা চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নেয়। মাথাটা যেন এখনো ঝিমঝিম করছে।
— কিছু না।
তারপর একটু থেমে বলে,
— আমার ব্যাগ গাড়িতে রয়ে গেছে। তোর একটা ড্রেস দে। কিছু জিজ্ঞেস করার হলে পরে করিস।
ইরার কৌতূহল কম ছিল না। তবুও রাহার ক্লান্ত মুখ দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। আলমারি থেকে দ্রুত একটি শুকনো পোশাক বের করে তার হাতে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘরে একা হয়ে রাহা ধীরে ধীরে ভেজা কাপড় বদলে নিল। কাপড় পরিবর্তন করতে গিয়েই পায়ের দিকে চোখ পড়ল তার। গোড়ালির আশপাশ ফুলে উঠেছে। দীর্ঘ পথ, ভিজে রাস্তা আর অবিরাম চাপের প্রভাব এখন স্পষ্ট।
এদিকে নীল নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ থেকে শুকনো কাপড় বের করে বদলে নেয়। আদির গাড়িতেই তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল। পোশাক পরিবর্তনের পর ব্যাগ খুলে কয়েক ধরনের ওষুধ আর একটি পেইন-রিলিফ স্প্রে বের করল। অভ্যাসবশত সে সবসময় প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখে।
সবকিছু হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফোনটা বের করল সে। দ্রুত কারও কাছে একটি বার্তা পাঠিয়ে স্ক্রিন বন্ধ করে দিল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে রাহার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
রাহার ঘরের সামনে অস্থির পায়ে পায়চারি করে চলেছে ইরা। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আবার করিডোরের শেষ প্রান্তে চোখ ফেলছে। মনটা অকারণেই কেমন অশান্ত হয়ে আছে।
আদি আর রুদ্র কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে। নীল আগেই আদিকে মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছিল তাদের গাড়ি মাঝপথে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তাই ফিরতে দেরি হবে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। পরিস্থিতি বিবেচনা করে আজকের মিটিংও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
ঠিক তখনই করিডোরের অন্য প্রান্ত থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল নীলকে। ভেজা চুল এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। এক হাতে ওষুধ আর স্প্রে, অন্য হাতে ফোন।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু'হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে কড়া গলায় বলল,
— কোথায় যাচ্ছ?
হঠাৎ পথ আটকে দেওয়ায় নীল থামল। তারপর মাথা তুলে এক পলক ইরার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— আপনার ছোট জা পায়ে ব্যথা পেয়েছে। ওষুধ দিতে যাচ্ছি। পথটা ছাড়ুন, ভাবি।
কয়েক সেকেন্ড ইরা শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বিস্মিত স্বরে বলল,
— আমার... কী?
— ছোট জা।
নীল এমন ভঙ্গিতে বলল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাটা বলছে। নীল ঠোঁট উল্টে বলে,
— হাজব্যান্ডের ভাইয়ের বউকে তো জা-ই বলে, তাই না? অন্তত মা আমাকে তাই বলেছেন।
ইরার চোখ আরও সরু হয়ে এলো।
— তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
নীল কাঁধ ঝাঁকাল।
— অনেক আগেই।
— মজা করো না।
ইরা এবার এক কদম সামনে এগিয়ে এল।
— একবার তোমাকে বাঁচিয়েছি বলে ভেবো না যে সবকিছু এড়িয়ে যেতে পারবে। বলেছিলে পরে বলবে। এখনই বলো, কী চলছে?
নীল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
— উফ! ভাবি, আপনার ধৈর্য বলে কিছু নেই?
— নেই।
— আমি লক্ষ্য করেছি।
— উত্তর দাও।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে এলো।
অবশেষে নীল পাশ কাটিয়ে সামনে এগোতে চাইল।
ঠিক তখনই ইরা ধীর গলায় প্রশ্নটা করল,
— রাহার থেকে কি চাও??
প্রশ্নটা শুনে নীলের পদক্ষেপ থেমে গেল।করিডোরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।নীল পেছনে ফিরল না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, স্থির কণ্ঠে বলল,
— জানি না মানুষ যেটাকে ভালোবাসা বলে, সেটা আমার মধ্যে আছে কি না।
ইরা নিঃশব্দে তার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল।নীল ধীরে ধীরে সামনে তাকিয়েই বলল,
— তবে একটা বিষয় জানি। কিছু মানুষ থাকে, যাদের উপস্থিতি একটা অস্থির মানুষকে শান্ত করে দেয়। হাজার মানুষের ভিড়েও যাকে খুঁজে বেড়াতে ইচ্ছে করে। দিনের শেষে যার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরের যুদ্ধটা একটু থেমে যায়।
তার কণ্ঠস্বর আরও নিচু হয়ে এল।
— আট বছর ধরে আমি একটা অনুভূতির পেছনে ছুটেছি। জানতাম না কী খুঁজছি, কোথায় খুঁজছি। শুধু জানতাম, কিছু একটা হারিয়েছি।
করিডোরের জানালায় বৃষ্টির শব্দ এসে আঘাত করছিল। নীল মৃদু হেসে বলে,
— তারপর একদিন বুঝলাম, আমি কোনো জিনিস খুঁজছিলাম না। একজন মানুষকে খুঁজছিলাম।
নীল এক মুহূর্ত থেমে ফিসফিস করে বলে,
— রাহা চৌধুরী আমার কাছে শুধু একজন মানুষ না। সে আমার বিশৃঙ্খলার মাঝে পাওয়া শান্তি। আমার ক্লান্তির শেষে পাওয়া বিশ্রাম। আমার সমস্ত অস্থিরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো প্রশান্তি।
কথাগুলো বলে নীল আর দাঁড়াল না। ধীর পায়ে রাহার ঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।
আর ইরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল করিডোরে।
_________________
— “নীল গেল, তুই কেন গেলি না?”
শানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল মিলি।
শান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “আমি কি নীলের জোড়াসঙ্গী? ও যেখানে যাবে, আমাকেও কি সেখানে যেতে হবে?”
তীক্ষ্ণ উত্তর শুনে মিলি খানিকটা কুঁকড়ে গেল। তবু ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
— “না, মানে... তুই তো জানিস নীল কেমন! যেখানেই যায়, মেয়েরা ওর পেছনে ঘুরঘুর করে।”
সিজাত ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। হাতে ধরা শুকনো ডালটা ছুড়ে মারল পাশের পানিতে।
— “মেয়েরা এতটা বোকা না যে সেধে এসে ছ্যাঁকা খাবে। নীলই আগে তাদের ম্যানিপুলট করে, তারপর ওরা জড়িয়ে পড়ে।”
কথাটা শুনে কেউ কিছু বলল না। ভার্সিটিতে আসার পর থেকেই সবাই লক্ষ করছে, মিলি অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ। আগের মতো হাসছে না, গল্প করছে না। কোথাও যেন হারিয়ে থাকে।
রকি চুপচাপ কোল্ড ড্রিংকে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে তাকাল ওর দিকে।
প্রচণ্ড গরমে মিলি চুলগুলো উঁচু করে খোঁপা করেছে। কয়েকটা অবাধ্য চুল কপাল ছুঁয়ে চোখের সামনে নেমে এসেছে। গরমে ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধ, মায়াভরা মুখটাকে দেখে অকারণেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল রকির।
মেয়েটার জন্য সত্যিই খারাপ লাগছে।
যেদিন মিলি জানতে পারবে, যার জন্য সে এতটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, যার ছোট ছোট খেয়ালগুলোও বুকের ভেতর যত্ন করে জমিয়ে রাখে, সেই মানুষটা ইতোমধ্যেই অন্য কারও ভালোবাসায় ডুবে আছে—সেদিন ওর কেমন লাগবে?
এখানে নীলেরও বিশেষ কোনো দোষ নেই।
সে তো কখনোই মিলিকে ভুল আশা দেয়নি। একজন বন্ধুর মতো যত্ন নিয়েছে, খোঁজ নিয়েছে। অথচ সেই সামান্য যত্নই মিলির মনে অজান্তে অনুভূতির বীজ বুনে দিয়েছে। দিন দিন সেই অনুভূতির শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করছে।
রকির মনে প্রশ্ন জাগল—
নীলকে কি মিলির ব্যাপারে বলা উচিত?
নাকি মিলিকে নীলের সত্যিটা জানিয়ে দেওয়া উচিত?
কিন্তু মিলিকে বললে কথাটা শানের কানেও পৌঁছাবে। আর শান যদি বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে?
না... যে ছেলেটা সবার বিপদে সবার আগে ছুটে আসে, সবাইকে আগলে রাখে, তাকে এমন একটা বিষয়ে বিপদে ফেলা উচিত হবে না—যেখানে সে সবচেয়ে বেশি অসহায়।
সবাই না দেখলেও রকি দেখেছে।
দেখেছে গত আট বছর ধরে নীল কীভাবে নিঃশব্দে পুড়েছে। দেখেছে কীভাবে সবার সামনে প্রাণখোলা হাসি নিয়ে থেকেও দিন শেষে নিজের ঘরে ফিরে নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে।
দেখেছে কত অসংখ্য রাত নির্ঘুম কেটেছে, কত জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছে, কত মানুষের দরজায় কড়া নেড়েছে শুধুমাত্র একজন মানুষের খোঁজ পাওয়ার আশায়।
আশপাশের প্রভাবশালী পরিবারের এমন কোনো মেয়ে ছিল না যার সঙ্গে নীল সম্পর্কের অভিনয় করেনি—শুধু সেই নিষ্ঠুর মহিলার কাছে পৌঁছানোর সূত্র খুঁজতে।
এই তো কয়েক মাস হলো। ছেলেটা আবার মন খুলে হাসতে শিখেছে। আবার বেঁচে থাকার মতো বাঁচছে। রকি নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবে সেই হাসিটুকু অটুট রাখতে।
এর জন্য যদি শান আর মিথির সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্টও হয়ে যায়, তবুও কোনো আফসোস থাকবে না।
এদিকে শান বারবার কব্জির ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আজকের পুরো দিনটা সে কিয়ারার সঙ্গে কাটাবে। আদি নেই, নীল নেই, রাহাও নেই।
কেউ নজরদারি করবে না, কেউ বাধা দেবে না।
কথা বলতে বলতে হঠাৎই তার মনে পড়ল—নীলের সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার।
নীল আসলে কাকে পছন্দ করে? এই প্রশ্নের উত্তর তাকে জানতেই হবে।
অবশেষে প্রতীক্ষিত সময় আসতেই শান সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।
কেউ কিছু না বললেও সবাই বুঝে গেছে সে কোথায় যাচ্ছে। রকিও বেশিক্ষণ বসল না।
গতরাতে নীল যে কাজটা পাঠিয়েছিল, সেটা আজই শেষ করতে হবে।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর কিয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে শানের জন্য অপেক্ষা করছিল।
মুখে অজান্তেই হাসি লেগে ছিল।
হঠাৎ সামনে এসে থামল একটি গাড়ি। কিয়ারার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
সে ভেবেছিল শান এসেছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল।
একটি লাল মার্সিডিজের দরজা খুলে নেমে এল শিরিন খান।
কিয়ারার বুক ধক করে উঠল।
মা? এখানে?
আজ তো তার এখানে আসার কথা ছিল না!
শিরিন ধীরে ধীরে সানগ্লাস খুলে মেয়ের দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময়, প্রশ্ন আর অদ্ভুত এক অনুসন্ধান।
কিয়ারা মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল।
মায়ের প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বলল,
— “মা, আজ শরীরটা ভালো লাগছিল না। তাই বাকি কোচিংগুলো করিনি। তুমি এখানে কী করছো,,,,,,,
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন