ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

৩৮তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#মেহরিমা_সারা 
৩৮.
নীল যেন এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতেই ভুলে গেল। বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে এলো। আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা নেই ওর‌। ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজা ঠেলে বাইরে ছুটে গেল। বৃষ্টি প্রায় থেমে গেছে, তবুও টুপটাপ ঝিরিঝিরি ফোঁটা পড়েই চলেছে। কিন্তু বৃষ্টির পরের সেই স্নিগ্ধ, শীতল আবহাওয়ার লেশমাত্র নেই। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে। কয়েক মুহূর্ত আগেই ছোড়া গুলির ধোঁয়া এখনো পুরো রাস্তা জুড়ে ধূসর কুয়াশার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। আধো অন্ধকারে সবকিছুই ঝাপসা লাগছে। সেই ধোঁয়াটে পরিবেশের মাঝেই নীলের চোখ গিয়ে আটকে রইল এক জায়গায়।
দুই হাতে শক্ত করে পিস্তল ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাহা। এক মুহূর্তও দেরি না করে নীল ওর দিকেই ছুটে গেল। আশপাশে কী হচ্ছে, কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—কোনো কিছুরই পরোয়া করল না। এই মুহূর্তে নীল এর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুধু একটাই বিষয়...
এদিকে সামিনের ফোন বারবার ডায়াল করেও কোনো সাড়া না পেয়ে বিরক্ত হয়েই বাইরে বেরিয়েছিল রাহা। কিন্তু দরজার বাইরে পা রাখতেই যেন পুরো পৃথিবীটা কেঁপে উঠল।
নিশা!
একটা বিশালদেহী কালো পোশাক পরা লোক নিশার দুই হাত নির্মমভাবে পেছনে মুচড়ে ধরে রেখেছে। অন্য হাতের পিস্তলের ঠান্ডা নলটা নিশার কপালে ঠেকানো। মুখ শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে রুমাল দিয়ে, ফলে চিৎকার করারও উপায় নেই।
রাহাকে দেখেই নিশার চোখ ভরে উঠল পানিতে। অসহায়ভাবে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। দৃশ্যটা মুহূর্তেই রাহার শরীরের রক্ত ঠান্ডা করে দিল।
লোক মোট ছয়জন। তিনজনের হাতে লোডেড পিস্তল। বাকি তিন'জনের হাতে ধারালো ছুরি।
তাদের চোখেমুখে এমন এক নির্দয়তা, যেন মানুষের প্রাণ নেওয়া তাদের কাছে নিছক খেলনা।
ঠিক তখনই কঠিন কণ্ঠে ভেসে এল সতর্কবার্তা—
— "রাহা... স্টপ। আর এক কদমও সামনে আসবি না।"
কণ্ঠটা চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না। সামিন রাহা বিস্ময়ে ওর দিকে তাকাল। সামিন তো আগেই এখানে! তাহলে গার্ড তাকে ফোন দিল কেন?
দ্রুত চারপাশে চোখ বুলাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল।
দুজন গার্ডকে হাত-পা শক্ত করে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। আর বাকিদের সম্ভবত কোনো ইনজেকশন বা স্প্রে জাতীয় কিছু ব্যবহার করা হয়েছে। সবাই অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছে।
চোয়াল শক্ত করে নিচু স্বরে রাহা বলল,
— "এরা নিশাকে পেল কীভাবে?"
সামিন চোখ না সরিয়েই জবাব দিল,
— "জানি না। আমিও পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। শুধু দেখেছি মেইন ডোর খুলে কেউ বের হয়েছে। সন্দেহ হওয়ায় পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু নিশা হবে... সেটা কল্পনাও করিনি।"
রাহার কণ্ঠে অস্থিরতা স্পষ্ট।
— "এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন? কিছু করছো না কেন?"
সামিন শান্ত, অথচ অস্বাভাবিক ঠান্ডা স্বরে বলল,
— "এই মশাগুলোর জন্য এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন? এরা চুনোপুঁটি। এদের মেরে কোনো লাভ নেই। এরা মারতে আসেনি... শুধু ভয় দেখাতে এসেছে।"
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— "এত নিশ্চিত হচ্ছো কীভাবে?"
সামিন ধীরে ধীরে বলল,
— "কারণ বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধি লাগে না। যদি সত্যিই ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে প্রথম টার্গেট হত তুই আর নীল। তোরা দুজনই নিচতলায় ছিলি। কিন্তু তা না করে এরা নিশাকে ধরে নিয়ে এসেছে। এর মানে এদের উদ্দেশ্য হত্যা নয়... বার্তা দেওয়া। আমাদের থামিয়ে রাখা। আমাদের ভয় দেখানো।"
কথাগুলো শুনে রাহা নিঃশব্দে ভাবল। সত্যিই তো...যুক্তিটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এরা চাইলে কয়েক মিনিট আগেই নীল বা রাহাকে আক্রমণ করতে পারত। কিন্তু করেনি। তাহলে নিশা? নিশা শুধু একটা মাধ্যম। একটা জীবন্ত হুমকি, একটা সতর্কবার্তা।
ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে নীল এসে রাহার পাশে দাঁড়াল। একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলো—রাহার শরীরে কোনো আঘাত লাগেনি। বুকের ভেতর এতক্ষণ আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো।
আকাশে ছোড়া গুলিগুলো ছিল শুধুই সতর্কবার্তা। চারপাশ নির্জন থাকায় বড় কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি। রাহা মুখ শক্ত করে সামনে তাকাল।
— "কী চাই তোদের?"
ওদের একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে হিসহিস করে বলল,
— "যা চাই... সেটা দিয়ে দে। তাহলে চলে যাব।"
রাহা আর সামিন একবার একে অপরের দিকে তাকাল। এরই মধ্যে দৌড়ে এসে পৌঁছাল আদি, শান আর রুদ্র। পরিস্থিতি বুঝে ওরা বাকি মেয়েদের বাড়ির ভেতরেই আটকে রেখেছে। এখন তাদের বাইরে আনা মানে বিপদ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। আদির হাতেও নিজের পিস্তল।চারজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আদি বিরক্ত স্বরে বলল,
— "হোয়াট রাবিশ! তোরা কী চাইছিস সেটা না বললে আমরা বুঝব কীভাবে?"
লোকগুলো কুৎসিতভাবে হেসে উঠল। তারপর তাদের মধ্যে যে লোকটা সম্ভবত নেতা, সে বাকিদের থামিয়ে ধীরে ধীরে রাহার দিকে আঙুল তুলে বলল,
— "তোদের মধ্যে ওই ব্যা*টাই সব জানে। ওর কাছেই আছে আমাদের জিনিস।"**
শব্দটা কানে যেতেই রাহার চোখ মুহূর্তে সরু হয়ে এলো। সামিন এর চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে গেল যে দাঁত কিড়মিড় করার শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।সামিন, আদি, শান—সবার অবস্থাই একই।
একটা ভুল সিদ্ধান্ত আর পরের মুহূর্তেই নিশার নিথর দেহ মাটিতে পড়ে থাকবে। এই লোকগুলো নিজেদের বাঁচানোর জন্য যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল তারও আগেই।
নীল যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।হঠাৎই হুংকার ছেড়ে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। শান আর আদি একসঙ্গে ওর দুই হাত চেপে ধরল। তবুও নীল সমস্ত শক্তি দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। চোখ দুটো রক্তিম হয়ে আছে। মুখের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।
দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করল সে,
— "ইউ বাস্টার্ড...! জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব তোর! যে শব্দটা তুই ওর জন্য ব্যবহার করেছিস... সেই একটা শব্দের দাম তোকে এমনভাবে দিতে হবে, সারাজীবন মনে রাখবি!"
— "নীল! চুপ কর!"
আদির বজ্রকণ্ঠ চারপাশ কাঁপিয়ে দিল। তারপর সে ধীরে ধীরে রাহার দিকে তাকাল। চোখে প্রশ্ন, সন্দেহ আর অস্বস্তির মিশ্র ছাপ।
— "ওরা কী বলছে? তোদের সঙ্গে এদের সম্পর্ক কী?"
রাহা গভীর একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল। পরিস্থিতি যত দ্রুত খারাপ হচ্ছে, তত দ্রুত সিদ্ধান্তও নিতে হবে। সে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু সামিনের দিকে তাকিয়ে হালকা ইশারা করল। সামিন ইশারাটা বুঝে গেল। ধীরে ধীরে দুই হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে গেল সে। কিন্তু চোখের ধার একটুও কমেনি। শীতল, ধারালো কণ্ঠে বলল—
— "ওকে ছেড়ে দে। যা চাইবি, তাই দেব। একটাও প্রশ্ন করব না। তবে আগে নিশাকে ছেড়ে দে..."
নিশার দিয়ে তাকিয়ে সামিন ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো। ধারালো ছুরির ফলাটা নেশার গায়ে চামড়ায় এতটাই চেপেছিল যে কোমল চামড়া কেটে লালচে রক্তের সরু রেখা ধীরে ধীরে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে সামিন দৌড়ে ভিতরে চলে গেল। ঠিক দুই মিনিট পর ফিরে এলো। তার হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ছোট একটা পেনড্রাইভ। রাহা শান্ত ধীর কন্ঠে বলল,
— ওকে ছেড়ে দে, তোদের জিনিস নিয়ে এখান থেকে চলে যাবি। যা চাইছিস সব তথ্য এই পেনড্রাইভে আছে। 
লোকটা হাত বাড়িয়ে নিতে চাইলে সামিন সঙ্গে সঙ্গে হাত গুটিয়ে নিলো চোখের ইশারায় বুঝালো আগে নিশাকে ছাড়তে। কয়েক মুহূর্ত দুই পক্ষের মাঝে চোখাচোখি হল তারপর লোকটা ওদের সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তেই ওরা নিশাকে ছেড়ে দিল। নিশাকে ছাড়তেই টলতে টলতে সামনে এগিয়ে এলে রাহা এক টানে নিশাকে সামনে নিয়ে আসে। 
ঠিক সেই মুহূর্তে সামিন বিদ্যুতের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটার হাতে ধরে থাকা পিস্তলের কব্জিতে আঘাত করতে সেটি শুন্যে ছিটকে উঠল। সামিন শুন্য থেকে নিজ হাতে সেটি নিয়ে নিল। ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে সবাই ঘটনায় হতবাক হয়ে গেল বুঝে আসতেই একে একে সবাই ঝাপিয়ে পড়ল। রাহা নিশার হাত শক্ত করে ধরে শানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— নিশাকে নিয়ে ভিতরে যা।
শান এক মুহূর্ত নষ্ট করলো না সে নিশাকে নিয়ে ঘুরতেই আবারো পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হয়ে উঠল।
আদি ইতিমধ্যে একজনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল দুজনের হাতাহাতিতেই পিস্তল এদিক ওদিক ঘুরে গেল পরের মুহূর্তে অসাবধানতাবশত ট্রীগারে চাপ লেগে গেল। একটি গুলি ছিটকে এসে রাহার পায়ের কাছ ঘেষে গেল। সবকিছু এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। চারপাশে নেমে এলো ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। নীল যাকে এতক্ষণ উল্টে ধরে রেখেছিল তাকে মুহূর্তেই ছেড়ে দিল। মুখের সমস্ত রং উধাও হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্যতায় ভরে গেল। 
কাপতে কাপতে দ্রুত রাহার সামনে এসে রাহাকে আগলে ধরে নিজের সাথে কণ্ঠ কাঁপছে গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না না। আতঙ্ক ভরা চোখ দুটো নিয়ে রাহাকে দেখে যাচ্ছে। এদিকে সামিনও আর দেরি করলো না যার কলার ধরে রেখেছিল তাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে দ্রুত রাহার কাছে আসে। রাহা হাত দিয়ে পা চেপে নিচে বসে পড়েছে। আদিও চোখ মুখ শক্ত করে ইচ্ছা মত পিটিয়ে যাচ্ছে। সামিন রাহার পা আগে দেখে। গুলি লাগেনি শুধু ছুয়ে গেছে হোয়াইট প্যান্ট রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে। 
নিশা দুই হাতে মুখে চেপে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে অপরাধবোধে বুক ভারি হয়ে এসেছে। যদি সে একা একা না আসতো তাহলে লোকগুলো পেত না ওকে আর এতো সমস্যা ও হতো না ওর জন্য আপুর আজ এই অবস্থা হয়েছে। শান দৌড়ে বোনের কাছে এসে ঠোঁট কামড়ে চোখের জল ছেড়ে দেয়।
— আ....আপুনি অনেক বেশি ব্যাথা..
শান কথা শেষ করার আগে রাহার দুই বাহু ধরে আগলে রাখা নীল এর কাঁধের উপর দিয়ে কয়েকবার ট্রীগার চেপে দেয়। ওদের মাঝে একজন লোক একটা ধারালো ছুরি নীলের দিকে তাক করে এগিয়ে আসছিল রাহা এক মিনিটও দেরি করেনা বুক বরাবর গুলি ছুড়ে দেয়। সবাই একের পর এক চমকে উঠছে এতো দ্রুত হচ্ছে সবকিছু। নীল ঠোঁট বাঁকিয়ে শান এর দিকে তাকায়।
— বোনকে নিয়ে ভিতরে যা কিয়ারা আছে ওখানে..
রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকায় কেমন যেন লাগছে নীল কে চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে। এক মুহূর্ত ও দেরি না করে তড়িৎ বেগে যেই লোকটা ছুড়ি নিয়ে এসেছিল সেটার হাত থেকে ছুড়ি নিয়ে এগিয়ে যায় ওই লোকটার দিকে যে রাহার দিকে গুলি ছুড়েছে। ইতিমধ্যে আদি আধমরা করে ফেলেছে। নীল আদির সামনে থেকেই বুক বরাবর লাথি দিয়ে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দিল। গলায় পা দিয়ে চেপে ধরে নিচু হয়ে চোখের পলকে ধারালো ছুরির ফলা দিয়ে এক সেকেন্ডে হাতের কব্জিতে চালিয়ে দেয়। লোকটা গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠল। সবাই থমকে যায় এমন কান্ডে। নিশা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে ওঠে। পরক্ষনেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। আদি দ্রুত নিশাকে ধরে ফেলল। রাহা অবাকের চূড়ায় পৌঁছে যায় এমন নির্দ্বিধায় নীল এর ছুরি চালানো দেখে, এমন ভাবে কাজটা করলো যেন কোন ফল কেটেছে। নীল ওই অবস্থায় ঘাড় ঘুরিয়ে শান এর দিকে তাকায়। শানসহ প্রত্যেক এর আত্মা কেঁপে উঠে নীল এর চোখ দেখে। নীল কে দেখে মনে হচ্ছে কোন অশরীরী আত্মা ভর করেছে।
— টেক হার অ্যাওয়ে। রাইট নাউ। অ্যান্ড হোয়েন আই সে রাইট নাউ, আই মিন দিস ভেরি সেকেন্ড!
রাহা পা চেপে উঠতে চায় কিন্তু শান সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পাঁজাকোলা করে ভেতরে নিয়ে যায়। রাহা ছটফট করে উঠলো। নীল স্বাভাবিক নেই। রাহা দেখতে পায় হাত কা** ছেলেটার ছটফটানি থেমে গেছে বাকিরা ওর অবস্থা দেখে যেভাবে পেরেছে দৌড়েছে তবে হয়তো পালাতে পারবে না কারন নীল ইতিমধ্যে এক হাতে ওদেরই পিস্তল আর অপর হাতে র*ক্ত মাখা ছুরি নিয়ে পিছু নিয়েছে। সামিন ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে। হ্যাঁ ঘোর! সামিন এতক্ষন ঘোরে ছিল কারন সেইম একইরকম প্যাটার্ন একই স্কিলের আরেকজন কীভাবে সম্ভব? এতোটা হুবহু মিল কীভাবে সম্ভব? সামিন ও পিছু নেয়। শান রাহাকে এনে সোফায় বসায় আগে। রাহা ছটফটিয়ে অস্থির হয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
— আদি! আদি কোথায়?
সোফার হাতলে হাত রেখে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, শরীর থেকে অনেক র*ক্ত বেরিয়েছে আর মানসিক চাপে শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ইরা কিয়ারা তৃধা শিফা সবাই দৌড়ে রাহার কাছে এগিয়ে আসে। একেক জনের ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার যোগাড়। আদি নিশাকে সোফায় শুইয়ে দেয়। কিয়ারা দেখে জানায় ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। আদি দ্রুত বলে রাহাকে দেখতে কিয়ারা দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স এনে রাহার পা উঠিয়ে দেখতে থাকে। রাহা ব্যথাকে অগ্রাহ্য করে আদির উদ্দেশ্যে কোনমতে বলল,
— আদি... নীল! গো.. প্লিজ স্টপ হার!!
আদি হতাশার শ্বাস ফেলে রাহার মাথায় হাত বুলায়।
— ভুল করেছো রাহা একদম উচিত হয়নি। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি যেন না হয় এটাই চাই..
আদিও দ্রুত পদক্ষেপে বেরিয়ে যায়। ইরা কিয়ারার দেখানো ব্যাথার ঔষুধ জোর করে খাইয়ে দেয়। ব্যাথায় রাহার সর্বকায়া নীল হয়ে গেছে। রাহা তপ্ত শ্বাস ফেলে মাথা ঠেকিয়ে দেয়। ইরা কিয়ারা তৃধা অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। শান আর যায়না ধপ করে নিশার মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। শান ভুলেনি... কিচ্ছু ভুলেনি...
___________________
 
থেমে থেমে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। কখনও মুষলধারে, কখনও ঝিরিঝিরি। যেন আকাশেরও থামার কোনো ইচ্ছে নেই। দূরে কোথাও হয়তো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে—আবহাওয়ার এমন উন্মত্ত রূপ দেখে সবারই তাই ধারণা।
বাড়ির সবাই এখন রাহার ঘরেই অবস্থান করছে।
কিয়ারা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে একটি ইনজেকশন দিয়েছে। আপাতত ব্যথা কিছুটা কমলেও সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এটা বেশিক্ষণ কাজ করবে না। ভোর হলেই কোনো বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। রাহার পায়ের জখমটা গভীর, অবহেলা করার মতো নয়।
নিশারও জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু নিশা যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে। কারও সঙ্গে একটি কথাও বলছে না, কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। নিথর হয়ে বসে আছে। এত অল্প সময়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনাগুলো ওকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিয়েছে। হয়তো এখনও সেই আতঙ্ক থেকেই বেরোতে পারেনি।
সামান্য বৃষ্টিতে সবাই ভিজে গিয়েছিল। তাই সবাই কাপড় বদলে নিয়েছে। ইরা নিজ হাতে রাহার পোশাক পরিবর্তন করিয়ে দিয়েছে। আর তৃধা সাহায্য করেছে নিশাকে।
সবাই ঘরে থাকলেও রাহার মন যেন কোথাও নেই।
সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও তীব্র হচ্ছে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে। অথচ যার জন্য বুকের ভেতর এত অস্থিরতা, সে এখনও ফিরল না। এখনও আসছে না কেন...?
অস্থির হয়ে আবারও দরজার দিকে তাকাল রাহা।
উফ... ঠিক এই সময়েই পায়ের এই অবস্থা হতে হলো! না পারছে বাইরে যেতে, না পারছে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে।
কিয়ারা কয়েকবার বুঝিয়ে বলেছে,
— একটা স্লিপিং পিল খেয়ে অন্তত একটু ঘুমান। না হলে ব্যথা আরও বেড়ে যাবে।
কিন্তু রাহা যেন কিছুই শুনছে না। শরীরের ব্যথার চেয়েও হৃদয়ের ভেতরের ঝড়টা আজ অনেক বেশি তীব্র। ঠিক তখনই ইরা বাইরে থেকে ফিরে এল। তার পেছনেই নীরবে ঘরে ঢুকল আদি। কোনো কথা না বলে একবার শুধু রাহার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ক্লান্তি, উৎকণ্ঠা আর অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা।
এক মিনিটেরও কম সময় পরে সামিনও এসে উপস্থিত হলো। দুই ঘণ্টা পর আদি আর সামিনকে একসঙ্গে দেখে রাহার মনে স্বস্তি আসার কথা ছিল। কিন্তু তার বদলে বুকের অস্থিরতা যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠল। কারণ...ওদের সঙ্গে নীল নেই। অসম্ভব!
নীল বাড়ি ফিরবে, অথচ রাহাকে একবারও দেখতে আসবে না—এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। যে ছেলেটা রাহার ছায়াকেও চোখের আড়াল হতে দিতে চায় না, সে কীভাবে এতক্ষণ রাহাকে না দেখে থাকতে পারে?
রাহার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। প্রশ্নভরা চোখে আদির দিকে তাকায়। আদি বিরক্তি আর ক্লান্তিতে ভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়াল। উদ্দেশ্য ছিল শুধু একবার দেখে যাওয়া। ইরা আগেই বলেছিল, রাহার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। সকাল হতেই বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আদি চলে যেতেই রাহার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে যায়। কথা না বললে এসেছে কেন!
হঠাৎই রাহা কঠিন কণ্ঠে বলে উঠল,
— Everyone, get out of my room. Now! I said get out, right now!
তার কণ্ঠে এমন কঠোরতা ছিল যে ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই আরও ভারী হয়ে উঠল। রাহাকে এতটা উত্তেজিত দেখে ইরা আর কিয়ারা কোনো কথা না বলেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সামিন নড়ল না। সে একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রাহা শক্ত চোখে সামিন এর দিকে তাকায়।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর সামিন ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল,
— অস্থির হওয়ার দরকার নেই। নীল ঠিক আছে... তবে একটা বড় সমস্যা হয়েছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আবার বলতে শুরু করল,
— কিছু মানুষের চোখে ঘটনাটা পড়ে গেছে। তারা পুলিশকে জানিয়েছে দূর না হওয়ায় ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছে যায়। লাশগুলো পুলিশের কাছে পৌঁছে গেছে মানে তো বুঝতেই পারছিস...আপাতত আদি অনেক টাকা খরচ করে বিষয়টা সামলেছে। তাই এখন নীল কে কিছু বলেনি, নীল সুস্থ স্বাভাবিক নেই। কিন্তু আমার মনে হয় না বেশিদিন চাপা থাকবে। দু-এক দিনের মধ্যেই বিষয়টা বড় আকার নেবে।
— আজ আমি যা দেখেছি... নীলকে দেখে মনে হয়েছে ও একটা মানসিক রোগী। ভয়ঙ্কর রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা দুজন না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
কথা বলতে বলতে সামিনের গলায় জমে থাকা রাগ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— আর এখানে তুইও একজনকে মেরে রেখেছিস। একবারও ভেবেছিস এরপর কী হতে পারে? যদি সবকিছু প্রমাণ হয়ে যায়, তাহলে নীলের পুরো জীবনটাই...
বাকিটা শেষ করতে পারল না। রাহা এতক্ষণ নিঃশব্দে সব শুনছিল। মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না, কিন্তু চোখদুটো ধীরে ধীরে আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। সে আর এক মুহূর্তও সামিনকে কথা বলতে দিল না।
শীতল অথচ কাঁপন ধরানো কণ্ঠে বলল,
— আউট!
সামিন যেন শুনেও শুনল না। আরও কিছু বলতে মুখ খুলতেই রাহা পাশে থাকা বালিশটা সর্বশক্তি দিয়ে তার দিকে ছুড়ে মারল।
চিৎকার করে উঠল,
— তুমি আছ কী করতে? যদি কিছুই ঠিক করতে না পারো, তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী লাভ? গেট আউট! এখনই বের হয়ে যাও!
ঘরের বাতাস মুহূর্তেই জমে গেল। সামিনও এবার নিজের রাগ আর ধরে রাখতে পারল না।
চোয়াল শক্ত করে একবার রাহার দিকে তাকাল, তারপর কোনো কথা না বলে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল। বাইরে বেরিয়েই দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
— এরা দুই পাগল খেলনার মতো মানুষ মারবে... আর সবকিছু ঠিক করার দায়িত্ব শুধু আমার! ধুর...
________________________________
হঠাৎই রাহার মনে হলো, যেন কেউ তাকে শক্ত করে আটকে রেখেছে। ঘাড়ের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাসের মৃদু স্পর্শ বারবার এসে লাগছে। প্রথমে আধোঘুমের ঘোরে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না সে...
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন