#প্রনয়ের_প্রলয়
#মেহরিমা_সারা
পর্ব ৪০.
রাহা নেই—এই খবরটা যখন আদি জানতে পারে, তখন থেকেই ওর ভেতরে জমে ওঠে একরাশ ক্ষোভ, আতঙ্ক আর অস্থিরতা। সারাটা পথ আদির মুখে একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
— একা একা রাহাকে নিয়ে কেন গেল? আমাদের কাউকে একবার জানানোও কি এত কঠিন ছিল?
এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত একবার ওদের জানানো যেত। শানও ভীষণ বিরক্ত হয়ে আছে। তবে সেই বিরক্তির চেয়ে অনেক বেশি ছিল তার ভয়। পুরো রাত সে এক মুহূর্তের জন্যও নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। অসুস্থ বোনটাকে নিয়েই কেটেছে তার প্রতিটি মুহূর্ত। আর ভোরে ঘুম ভেঙে যখন রাহার ঘরে গিয়ে দেখে বিছানা ফাঁকা, বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে তার কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা একবারও কি কেউ ভেবেছে?
মা-হারা দুই ভাইবোন। ছোটবেলা থেকে একজনই আরেকজনের আশ্রয়, ভরসা আর পৃথিবী। একজনের সামান্য কষ্টও অন্যজনের সহ্য হয় না। সেখানে একজনকে না জানিয়ে অন্যজনকে দূরে নিয়ে যাওয়া—শানের কাছে সেটা মেনে নেওয়া অসম্ভব।
তবে সবার মাঝে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ইরা। সামিনের আচরণটা তার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকেছে। রাহাকে নিয়ে নীল একাই চলে গেছে, অথচ সামিন শুধু একবার কপাল কুঁচকে নীরব হয়ে গেল। না কোনো প্রশ্ন, না কোনো রাগ, না কোনো উৎকণ্ঠার প্রকাশ। যেন সবকিছুই সে আগেই অনুমান করে রেখেছিল। তার এই অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ইরার মনে আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিল।
শেষ পর্যন্ত আর দেরি করা হলো না। নিজেদের মতো দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে ঠিক সকাল দশটার দিকে সবাই রওনা দিল। রাহার আগের নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন গার্ডও সঙ্গে নেওয়া হলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়—এটা সবাই বুঝতে পারছিল।
আদি, ইরা আর রুদ্র এক গাড়িতে উঠল। অন্য গাড়িতে বসল সামিন, শান, তৃধা আর নিশা। গাড়ির ভেতর অস্বাভাবিক নীরবতা। কেউ প্রয়োজন ছাড়া একটি কথাও বলছে না। প্রত্যেকেই নিজের চিন্তায় ডুবে আছে।
কিয়ারা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত আদিদের গাড়িতেই উঠে বসল। তার ইচ্ছে ছিল শানের পাশে বসার। কিন্তু বড় ভাইয়া যদি সেটা লক্ষ্য করে, তাহলে অকারণ সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তাই নিজের ইচ্ছাকে চেপে রেখে নীরবে অন্য গাড়িতেই উঠে পড়ল।
শিফা আর পিয়াস অবশ্য সকাল সাতটার ফ্লাইটেই রওনা দিয়েছে। তাদের টিকিট অনেক আগেই রাহা বুক করে রেখেছিল। আর বাকিরা গাড়ি করেই যাবে। কারণ শানের উঁচুতে ওঠার সমস্যা আছে। তাই সবার পরিকল্পনা বদলে গাড়িতেই যাত্রা শুরু করা হয়েছে।
আসলে গত রাতের সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটলে সবাই দুপুরে রওনা দেওয়ার কথাই ছিল। কিন্তু ভাগ্য যেন হঠাৎ করেই সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। এখন আর কারও মনে সময় নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই।
________________________
রাহা আর নীল সবার আগেই পৌঁছে যায়। আদিরা গাড়িতে আসছে বলে স্বাভাবিকভাবেই ওদের পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর পুরোটা পথ নীল একবারের জন্যও রাহাকে হুইলচেয়ারে বসানোর কথা ভাবেনি। যেন কাউকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। বরং দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে আগলে রেখেছিল। রাহা কয়েকবার আপত্তি করলেও নীল কোনো কথাই কানে তোলেনি।
ঢাকার আকাশটাও আজ যেন মানুষের মনের মতোই ভারী। দুপুর পেরোলেও চারপাশে এমন অন্ধকার নেমে এসেছে, যেন সন্ধ্যা অনেক আগেই নেমে বসে আছে। ঝুমঝুম করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁচে আছড়ে পড়ে অস্পষ্ট করে দিচ্ছে শহরের সব দৃশ্য। রাস্তার অনেক জায়গায় পানি জমে আছে, যানজটও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
নীল একটি উবার ডেকে রাহাকে নিয়ে উঠে বসে। গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত এক নীরবতা। রাহা ক্লান্ত শরীরটা সিটে এলিয়ে দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির রেখাগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎই তার মনে পড়ে বাকিদের কথা।
মুখ না ফিরিয়েই শান্ত গলায় বলল,
— ওদের কল দাও। আবহাওয়া ভালো না... কোথায় আছে, একবার জেনে নাও।
রাহার কথায় নীল যেন হকচকিয়ে যায়। একটু আমতা আমতা করে পকেট থেকে ফোন বের করে ইরার নম্বরে কল দেয়। কল রিসিভ হতেই সে একটাও কথা না বলে ফোনটা রাহার দিকে বাড়িয়ে দেয়। রাহা ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে আদির গলার ঝড় শুরু হয়ে যায়।
— এই তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? কাউকে না জানিয়ে এভাবে চলে গেলি কেন? তোদের কিছু হয়েছে? কোথায় আছিস? রাহা এখন কেমন আছে?
একটানা বলে যাওয়া কথাগুলো শুনে রাহা ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নীলের দিকে তাকায়। নীল অপরাধী শিশুর মতো চুপচাপ বসে আছে। মাথাটা সামান্য নিচু, চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি। সেই মুখটা দেখে রাহার ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটুখানি হাসি ফুটে উঠলেও মুহূর্তেই সেটা লুকিয়ে ফেলে। যেন কিছুই হয়নি, এমন ভাব করে আবার জানালার বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকায়।
তারপর শান্ত, স্থির কণ্ঠে আদিকে বলে,
— আমরা ঠিক আছি। কোনো সমস্যা হয়নি। নীল খুব সাবধানে সব সামলেছে। অযথা এত দুশ্চিন্তা কোরো না।
আরও কিছুক্ষণ ওদের অবস্থান, রাস্তার অবস্থা আর কখন পৌঁছাবে সেসব নিয়ে কথা বলে কলটা কেটে দেয়। ফোনটা নিজের কাছে রেখে দেওয়ার বদলে নীলের হাতেই ফিরিয়ে দেয়। নীল ফোনটা পকেটে রেখে ধীরে ধীরে রাহার আরও কাছে সরে আসে। কাঁধে কাঁধ লেগে যায়। রাহা বিষয়টা টের পেলেও কিছু বলে না। মনে হলো, আজ নীল কে বকাঝকা করার শক্তিটুকুও যেন নেই।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই নীল এমন একটা কাজ করে বসে, যাতে রাহা স্পষ্টই চমকে ওঠে।
এক হাত দিয়ে আলতো করে রাহার হাত জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয়। তারপর নিঃশব্দে মাথাটা এনে রাখে রাহার কাঁধে। রাহা বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায়।
— নীল...!
কথাটা পুরোপুরি বলার আগেই নীল ক্লান্ত, নিস্তেজ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
— ভাইয়া... কাল আমার ওপর খুব রাগ করেছে। রাগ করাটাই স্বাভাবিক। হয়তো কষ্টও পেয়েছে... হয়তো আমার জন্য খুব দুশ্চিন্তা করেছে। আমার সেই শান্ত, ভদ্র ভাইটা... আমাকে বাঁচানোর জন্য কাল নিজের নিয়ম ভেঙে বেআইনি ভাবে টাকা খরচ করেছে। শুধু আমার জন্য। কিন্তু আমি জানি... ব্যাপারটা এত সহজে শেষ হবে না। ওরা আমাকে এত সহজে ছেড়ে দেবে না। বিষয়টা অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে।
রাহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করল,
— এত কিছু বুঝেও এমন করলে কেন?
প্রশ্নটার কোনো উত্তর দিল না নীল। বরং আরও একটু মুখ গুঁজে পড়ে রইল রাহার কাঁধে। তার উষ্ণ নিশ্বাস ছুঁয়ে যেতে লাগল রাহার ঘাড়। অস্বস্তিতে শরীরটা কেঁপে উঠল রাহার। বিরক্তিও লাগছিল, কিন্তু সেই বিরক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল ছেলেটার নিঃশব্দ ভেঙে পড়া।
অনেকক্ষণ নীরব থেকে রাহা ধীরে ধীরে বলল,
— নীল... তুমি আমার ভাইয়ের বয়সী। এখনও অনেক ছোট। আবেগে নিজেকে ভাসিয়ে দিও না। তোমার সামনে অনেক বড় ভবিষ্যৎ পড়ে আছে। নিজের ক্যারিয়ারে মন দাও। খুব সুন্দর একটা জীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার পেছনে এভাবে নিজের জীবন নষ্ট কোরো না। আমাকে নিয়ে এতটা ভাবা... এবার ছেড়ে দাও।
কথাগুলো বলার সময় রাহার গলায় ছিল কঠোরতা, কিন্তু সেই কঠোরতার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা—যেটা সে নিজেও প্রকাশ করতে চায় না। নীল কোনো উত্তর দিল না।
একইভাবে নিশ্চুপ হয়ে রইল। মাথাটা রাহার কাঁধেই রেখে দিল। রাহাও আর কিছু বলল না।
সে খুব ভালো করেই জানে, এই একগুঁয়ে ছেলেটাকে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। যতই দূরে ঠেলে দিতে চায়, নীল ততই যেন তার দিকে ফিরে আসে। আর অদ্ভুতভাবে, রাহাও হয়তো আর আগের মতো জোর দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে পারছে না।
হয়তো নিজের অজান্তেই, অস্বীকার করতে করতেই, সে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে নীল নামের সেই অদ্ভুত, একগুঁয়ে ছেলেটার অনুভূতির গভীরে।
আরমান চৌধুরী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে অফিসে যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন। চিকিৎসক যেমন বারণ করেছেন, তেমনি সাজিদ খানও কঠোরভাবে বলে দিয়েছে—অসুস্থ শরীর নিয়ে আর কোনোভাবেই অফিসে যাওয়া চলবে না। এত বছর ধরে কাজের মধ্যেই যাঁর জীবন কেটেছে, তাঁর জন্য ঘরে বসে থাকা যেন এক অদৃশ্য শাস্তি। তবুও পরিবারের চাপে এখন বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই কাটে।
তেমনি আজ বিকেলের নিস্তব্ধ সময়। ড্রয়িংরুমের সোফায় হেলান দিয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছিলেন। চারপাশে অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। ঠিক তখনই— কেউ এসে তাঁর পাশেই বসে পড়ল। তিনি পত্রিকার আড়াল থেকে মুখ তুলে তাকাতেই দেখলেন নওরিন চৌধুরী। হাতে ওষুধের বক্স, মুখটা শক্ত করে ফুলিয়ে রেখেছে। নাক-মুখ দিয়ে ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলছে। দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রেগে আছে।
আরমান চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আরে! এমন কী হলো? তিনি তো আজ এমন কিছুই করেননি, যাতে এই মানুষটা এতটা রেগে যায়! মৃদু হেসে পত্রিকাটা ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। তারপর একটু শরীর ঘুরিয়ে নওরিনের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে অত্যন্ত নরম, স্নেহমাখা কণ্ঠে ডাকলেন,
— নওরিন... কী হয়েছে?
সেই পরিচিত আদুরে ডাকটা যেন মুহূর্তেই নওরিনের সমস্ত রাগের আগুনে এক ফোঁটা বৃষ্টির জল হয়ে পড়ল। মুখটা এখনও গোমড়া, তবু ভেতরের ঝড়টা খানিকটা থেমে গেল। ওদিকে আরমান চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটার কথা মনে পড়ছে...
সেও তো ঠিক মামুনির মতোই। সামান্য একটু ভালোবাসা, একটু আদর পেলেই মুহূর্তে নরম হয়ে যায়। শুধু পার্থক্য একটাই— রাহা মনের সব অনুভূতি খুব যত্ন করে লুকিয়ে রাখতে জানে।
নওরিন মুখ ফুলিয়েই গজগজ করে বলল,
— আপনি আমাকে দু'দণ্ড শান্তি দেন না। একটু দুপুরে ভাত ঘুম দেব, সেই উপায়ও রাখেন না। আমি মনে করে না দিলে আপনি সময়মতো ওষুধও খান না। তারপর অসুস্থ হলে কষ্ট তো আমাকেই করতে হয়।
বকাঝকার ভেতরেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যত্নের গভীরতা। অভিযোগগুলো রাগের নয়, ভয়ের। মানুষটাকে হারানোর ভয়। আরমান চৌধুরী মলিন এক হাসি হাসলেন। সেই হাসির ভেতরে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অপরাধবোধের ছায়া। ধীর কণ্ঠে বললেন,
— তোমাকে তো শুধু আমার ওষুধের দায়িত্বটাই দিতে পেরেছি... এর বাইরে আর কী-ই বা দিতে পেরেছি? তোমার প্রাপ্য কোনো সুখই তো দিতে পারিনি।
কথাটা শুনেই নওরিনের চলন্ত হাত থেমে গেল।
ওষুধ বের করতে গিয়ে আঙুলগুলো কেঁপে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আরমান চৌধুরীর চোখ এড়াল না সেই সূক্ষ্ম কাঁপুনি। তিনি ধীরে ধীরে নিজের হাত বাড়িয়ে নওরিনের হাতের ওপর রেখে দিলেন। হাতদুটোই যেন সময়ের ভারে ক্লান্ত। নিস্তেজ, ভারী কণ্ঠে বললেন,
— নওরিন... আমাকে ক্ষমা করে দিও। সত্যি বলছি, তোমাকে আমি কোনোদিনই একটা পূর্ণ সংসারের সুখ দিতে পারিনি। শুধু দায়িত্ব, অপেক্ষা আর না-পাওয়াই দিয়েছি। কখন যে... তোমার বোনের কাছে চলে যাই, সেটাও তো জানি না...
শেষ কথাগুলো বলতে গিয়েই গলাটা কেঁপে উঠল তাঁর। নওরিনের চোখ মুহূর্তেই টলমল করে উঠল।
কিন্তু কান্নাটা সে কোনোভাবেই বেরোতে দিল না।
হালকা ধমকের সুরে, অথচ ভেতরে গভীর ভালোবাসা লুকিয়ে রেখে বলল,
— দয়া করে আর কখনও এমন কথা বলবেন না। আমি কি কোনোদিন আপনার কাছে কোনো অধিকার চেয়েছি? কোনো অভিযোগ করেছি? আপনার কাছে কোনো হিসাব চেয়েছি?
একটু থেমে গভীর শ্বাস নিয়ে আবার বলল,
— আপনার পাশে থাকতে পেরেছি—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এর চেয়ে বড় সুখ আমার কখনও দরকার ছিল না, আজও নেই।
আরমান চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মাত্র চল্লিশ বছরের এই নারী... যে নিজের যৌবনের সমস্ত রঙ নিঃশব্দে বিসর্জন দিয়েছে। যে কখনও দাবি করেনি, অভিমান করেনি, নিজের প্রাপ্যটুকু চেয়ে হাত বাড়ায়নি। শুধু দূর থেকে, নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থভাবে একজন মানুষকে ভালোবেসে গেছে।
এমনভাবে ভালোবেসেছে যে সেই ভালোবাসা কখনও কারও ওপর বোঝা হয়ে ওঠেনি। এমনকি যার জন্য এতটা ভালোবাসা, সেই মানুষটাকেও পুরোপুরি বুঝতে দেয়নি নিজের হৃদয়ের গভীরতা।
আর সেই নীরব ভালোবাসার সামনে বসে আজ আরমান চৌধুরীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। কারণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অনুভূতিগুলো হয়তো কখনও উচ্চস্বরে বলা হয় না—সেগুলো নিঃশব্দেই একটি জীবন পেরিয়ে যায়।
এহেম...! এহেম...!
হঠাৎ ভেসে আসা কারও গলা খাঁকারির শব্দে নওরিন চৌধুরী আর আরমান চৌধুরী দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকালেন। পরের মুহূর্তেই দুজনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীল। আর তার দুই বাহুর শক্ত বাঁধনে একেবারে বুকের সঙ্গে মিশে আছে রাহা। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপরই নওরিন চৌধুরীর দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো রাহার ব্যান্ডেজ করা পায়ের দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই মুখের সব রং উধাও হয়ে গেল।
— রাহা...!
আরমান চৌধুরীও আর স্থির থাকতে পারলেন না। দুজনেই প্রায় দৌড়ে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন।
এদিকে নীল বাড়িতে ঢুকেই চারপাশে তাকিয়ে বুঝল, ড্রয়িংরুমে আর কেউ নেই।
আর তারপরই চোখে পড়ল—দুজন মানুষ একদম নিজেদের জগতেই ডুবে আছেন। মুহূর্তেই নীলের ভ্রু বাঁকিয়ে যায় ইশ! দুজন যুবক-যুবতী... না না, ভুল হলো... বুড়ো-বুড়ি দিব্যি রোমান্স করছে! মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার নিজের জীবনে এখনও ঠিকমতো একটা রোমান্টিক মুহূর্ত জোটে না, আর এদিকে এরা এই বয়সেও দিব্যি প্রেম করছে! এই দৃশ্য দেখে চুপ করে থাকার মতো ছেলে নীল নয়। তাই ইচ্ছা করেই জোরে গলা খাঁকারি দিয়েছিল। আর তাতেই ধরা পড়ে গেলেন দুজন। অন্যদিকে রাহা সেই হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই এক কথা বলছে—
— আমাকে নামাও। আমি নিজেই হাঁটতে পারব।
কখনও কড়া চোখে তাকিয়েছে, কখনও ধমক দিয়েছে, কখনও বিরক্তি প্রকাশ করেছে। কিন্তু নীল যেন কানে তুলো গুঁজে রেখেছে। যে সিদ্ধান্ত একবার নিয়েছে, সেটা বদলানোর মানুষ সে নয়।
শেষ পর্যন্ত রাহাকে বুকেই আগলে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। হাঁটতে হাঁটতেই নিচু গলায় বিড়বিড় করে বলল,
— শালার জীবনে যে আর কত কী দেখতে হবে কে জানে! শ্বশুরের রোমান্সও দেখে ফেললাম!
রাহা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়।
— কী বললে?
নীল সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পাপ মুখ বানিয়ে নাটকীয় স্বরে বলল,
— হায় আল্লাহ! এই বয়সে এমন রোমান্টিক দৃশ্যও দেখতে হবে! অথচ রোমান্স করার আসল বয়স তো আমার! ভাগ্যটাই খারাপ!
রাহা বিরক্ত হয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
— অসভ্য!
নীল একচুলও বিচলিত না হয়ে মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— অসভ্য মানুষের কাছ থেকে সভ্যতা আশা করবেন না।
রাহা অসহায়ের মতো একবার চোখ বন্ধ করল। এই ছেলেটার সঙ্গে কথায় জেতা অসম্ভব। নীল খুব যত্ন করে রাহাকে সোফায় বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই নওরিন চৌধুরী আর আরমান চৌধুরী একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে লাগলেন।
— কী হয়েছে? কোথায় লেগেছে? ডাক্তার কী বলেছে? এত বড় ব্যান্ডেজ কেন?
রাহা বুঝতে পারছিল, সত্যিটা বললে সবাই আরও ভয় পাবে। তাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে হালকা হাসল।
— ছোট্ট একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। নাথিং এলস। এখন আমি একদম ঠিক আছি।
কিন্তু তার "ছোট্ট" শব্দটায় কেউ বিশ্বাস করল না।
রাহার মুখ যতই স্বাভাবিক থাকুক, পায়ের মোটা ব্যান্ডেজ অন্য কথাই বলছে। ঠিক তখনই ভেতর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলেন ইয়াসমিন চৌধুরী। রাহাকে ওই অবস্থায় দেখেই তাঁর মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখ দুটো টলমল করে উঠল। আর একটু হলেই হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়তেন। ইয়াসমিন চৌধুরী বরাবরই ভীষণ কোমল মনের মানুষ। কারও কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না। বাড়ির সবাইকে হাসিখুশি দেখতেই ভালোবাসেন। সেখানে বাড়ির প্রাণের মেয়েটাকে আহত অবস্থায় দেখে বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। রাহা বারবার বলছিল,
— আমি ঠিক আছি। এত চিন্তা করার কিছু নেই।
কিন্তু তার কথা শোনার মতো অবস্থায় কেউ নেই।
সবাই মুহূর্তের মধ্যে শুধু তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাহা বুঝিয়ে শান্ত করে সবাইকে।এদিকে পাশের সোফায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে নীল। মুখে চাপা হাসি।
হাতে ফোন থাকলেও সেটার দিকে তাকানোরও প্রয়োজন মনে করছে না। বরং দিব্যি বসে বসে পুরো "ফ্যামিলি ড্রামা" উপভোগ করছে। তার চোখে-মুখে এমন একটা তৃপ্তির ছাপ, যেন এই দৃশ্যটাই সে দেখতে চেয়েছিল। আরমান চৌধুরী নিজের কোলের ওপর খুব সাবধানে রাহার আহত পা তুলে নিয়ে বসে আছেন। বারবার ব্যান্ডেজের দিকে তাকাচ্ছেন, আবার মেয়ের মুখের দিকেও তাকাচ্ছেন। চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ। অন্যদিকে নওরিন চৌধুরী ইতিমধ্যেই রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেছেন।
কারণ ওদের তো সন্ধ্যার দিকে আসার কথা ছিল।
সেই হিসাবেই রান্নাবান্নার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
এখন এত আগে চলে আসায় তড়িঘড়ি করে নতুন করে সবকিছু গুছিয়ে নিতে হবে। ইয়াসমিন চৌধুরীও আর দেরি করলেন না। দুজন মিলে দ্রুত রান্না বসিয়ে দিলেন।
বাচ্চারা এলে যেন কেউ খালি পেটে না থাকে—এই চিন্তাই এখন তাঁদের মাথায়। বিশেষ করে বাড়ির সবচেয়ে চঞ্চল, প্রাণবন্ত মেয়ে তৃধাকে তো তাঁরা খুব ভালো করেই চেনেন। বাড়িতে ঢুকেই সবার আগে তার একটাই প্রশ্ন থাকবে—
"খাবার কোথায়?" আর সেই প্রশ্নের উত্তর যেন হাসিমুখেই দেওয়া যায়, তাই দুই মায়ের ব্যস্ততা আবার নতুন করে শুরু হয়ে গেল।
রাহা নিঃশব্দে বসে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
শুধু তাকিয়েই নয়—খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল মানুষটাকে। এই কি সেই মানুষ, যে একসময় তার মাকে পাগলের মতো ভালোবাসত?
যে মায়ের হাসির জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে পারত? কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আরমান চৌধুরী আর নওরিন চৌধুরীকে পাশাপাশি বসে, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখার পর থেকেই রাহার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে আছে।
অকারণেই রাগ হচ্ছে। রাহা জানে, এই রাগের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। তবুও নিজেকে থামাতে পারছে না। কারণ সে শুধু বাবার মেয়ে নয়—সে তার মায়েরও মেয়ে। নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে কল্পনা করাও তার কাছে অসহনীয়। এই কারণেই তো দেশে ফিরে বাড়িতে না উঠে প্রথমেই নিজের জন্য আলাদা একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল। কারও কাছে সেটা স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত মনে হলেও, সত্যিটা ছিল ভিন্ন। রাহা পালিয়ে থাকতে চেয়েছিল। এই বাড়ির বাস্তবতা থেকে... সেই দৃশ্যগুলো থেকে... যেগুলো তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দিত, তার মা আর এই বাড়িতে নেই।
মায়ের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অদৃশ্য এক শূন্যতা যেন মুহূর্তেই রাহাকে গ্রাস করল। ঠিক তখনই নওরিন চৌধুরী হাতে একটি প্লেটে হালকা নাস্তা নিয়ে এগিয়ে এলেন। মুখে আগের মতোই মমতা যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু তাঁকে দেখেই রাহার মুখ শক্ত হয়ে গেল। এক মুহূর্তও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ ফিরিয়ে নিল। তারপর বাবার কোল থেকে আস্তে করে নিজের পা নামিয়ে নিয়ে যতটা সম্ভব নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— বাবা... আমি ঘরে যাব। একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার।
নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই নীল ঝুঁকে এসে কোলে তুলে নিল। রাহা বিরক্ত হয়ে তাকালেও নীল কোনো সুযোগই দিল না। রাহাকে বুকের সঙ্গে আগলে নিয়ে আরমান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আঙ্কেল, আমি রুমে পৌঁছে দিই।
আরমান চৌধুরী শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।
নীল ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
রাহা যাওয়ার আগে একবারও নওরিন চৌধুরীর দিকে তাকাল না। সেই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দৃশ্যটা নওরিন চৌধুরীর বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল। চোখ দুটো টলমল করে উঠল। তবু তিনি কিছু বললেন না। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আরমান চৌধুরী মেয়ের সেই আচরণ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কারও ওপরই রাগ করতে পারলেন না। কাকে দোষ দেবেন? এখানে তো সবাই কোনো না কোনোভাবে ভুক্তভোগী।
নওরিন চৌধুরী প্লেটটা হাতে নিয়েই ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। আরমান চৌধুরী পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলেন,
— নওরিন... শোনো...
কিন্তু তিনি থামলেন না। শোনার ভানও করলেন না। শেষ পর্যন্ত আরমান চৌধুরীও দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁর পিছু নিলেন। ওদিকে নীলের কাঁধে মাথা রেখে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতেও রাহা নিচের সবকিছু নীরবে পর্যবেক্ষণ করে গেল। রান্নাঘরে ঢুকতেই ইয়াসমিন চৌধুরী আরমান চৌধুরীকে দেখে দুষ্টু হাসলেন। চুপিচুপি নওরিন চৌধুরীকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে চোখ টিপে ইশারা করলেন।
এমন মজা তিনি প্রায়ই করেন। ঘরের ভারী পরিবেশটাকে হালকা করার চেষ্টা করেন সবসময়।
কিন্তু আজও নওরিন চৌধুরী শুধু ফিকে একটা হাসির চেষ্টা করলেন। হাসিটা ঠোঁট পর্যন্ত এলেও চোখ পর্যন্ত পৌঁছাল না। কারণ তিনি জানেন—
যে সম্পর্কটা বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখায়, ভেতরে ভেতরে সেট কতটা শূন্য। আরমান চৌধুরী ধীরে ধীরে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোনো ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা নয়। সবসময়ের মতোই সরাসরি বললেন,
— নওরিন, কেন এমন বাচ্চামো করো? তুমি তো জানো রাহা কেমন। যে জিনিসটা ওর ভালো লাগে না, সেটা কেন বারবার করো? নিজেই শুধু কষ্ট পাও।
তিনি নিজের মেয়েকে খুব ভালো করেই চেনেন।
রাহার বিদেশে চলে যাওয়ার পেছনের বড় কারণ ছিল নওরিন। নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে দেখতে না পারার যন্ত্রণা থেকেই রাহা এই বাড়ি থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। আরমান চৌধুরীর কথাগুলো শুনেই নওরিন চৌধুরীর চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। নিঃশব্দে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
জীবনের সেই একটিমাত্র সিদ্ধান্ত... আজও তাকে প্রতিটি মুহূর্তে শাস্তি দিয়ে যাচ্ছে। যদি জানতেন শেষটা এমন হবে... তাহলে হয়তো কোনোদিনই সেই পথে পা বাড়াতেন না। আরমান চৌধুরী ধীরে ধীরে তাঁর হাতটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলেন। ক্লান্ত, বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন,
— নওরিন... এখনও তোমার পুরো জীবন পড়ে আছে। চাইলে আজও নতুন করে শুরু করতে পারো। আমি তোমাকে আটকাব না... ফিরিয়েও দেব না। সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তোমার।
নওরিন চৌধুরী বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরমান চৌধুরী কষ্ট মেশানো একটুখানি হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল পরাজয়, ছিল অপরাধবোধ, ছিল মুক্তি দেওয়ার এক নিঃশব্দ চেষ্টা।
— সমাজের চোখে আমরা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু আমরা দুজনেই জানি... আমাদের সম্পর্কটা কখনও সেই অর্থে স্বামী-স্ত্রীর হয়ে ওঠেনি। আর আমি... আমি আর কদিনই বা বাঁচব?
কথাটা শেষ হতেই নওরিন চৌধুরী আচমকা তাঁর টি-শার্টের কলার দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন।
চোখভরা জল নিয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
— একদম এমন কথা বলবেন না! আর কোনোদিনও না!
গভীর শ্বাস নিয়ে, বুকভরা অভিমান আর ভালোবাসা একসঙ্গে মিশিয়ে বললেন,
— যেখানে যৌবনের শুরুতে হাজারটা প্রস্তাব, হাজারটা স্বপ্ন, হাজারটা পুরুষের আকাঙ্ক্ষা আমি শুধু আপনার জন্য ফিরিয়ে দিয়েছি... সেখানে আজ এই বয়সে এসে আপনাকেই ছেড়ে চলে যাব—এটা আপনি ভাবলেন কী করে?
কথাগুলো শেষ হতেই রান্নাঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। আরমান চৌধুরী কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নওরিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর হাতদুটো নিজের কলার থেকে সরিয়ে দিলেন। কিছু বললেন না। শুধু এক দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে নীরবে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পেছনে দাঁড়িয়ে রইলেন নওরিন চৌধুরী—
হাতে এখনো তাঁর শার্টের স্পর্শের উষ্ণতা, আর চোখে এক জীবনের না-বলা ভালোবাসার অশ্রু।
নিজের ঘরে ঢুকেই আরমান চৌধুরী দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিলেন। ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দীর্ঘক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন নিজেকে।
কানের পাশ ঘেঁষে কয়েক গুচ্ছ চুল কবে যে সাদা হয়ে গেছে, তা আর খেয়ালই করা হয়নি। থুতনির খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোতেও রুপালি রঙের ছোঁয়া লেগেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির কালচে ছাপ, কপালে সময়ের গভীর ভাঁজ। বয়স যেন ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতির স্বাক্ষর রেখে গেছে শরীরের প্রতিটি কোণে। শুধু একটা জিনিসই কখনও তার জীবনে জায়গা করে নিতে পারেনি—ভুঁড়ি। সারাটা জীবন দৌড়ঝাঁপ, ব্যবসা, সংসার আর দায়িত্বের পেছনে ছুটতে ছুটতেই কেটে গেছে। নিজের শরীরকে আর আলাদা করে সময় দেওয়ার সুযোগই হয়নি। আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তিনি ধীরে ধীরে তাকালেন দেয়ালে টাঙানো একটি ছবির দিকে। সেই চিরচেনা হাস্যোজ্জ্বল চেহারার নীলিমা। যে হাসিটা একসময় পুরো বাড়িটাকে আলোয় ভরে রাখত। আরমান চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে ছবিটা আলতো করে খুলে হাতে নিলেন।
আঙুলের ডগা দিয়ে ছবির ওপর জমে থাকা অদৃশ্য ধুলো মুছে দিলেন। তারপর বিছানার ধারে গিয়ে ধীরে বসে পড়লেন। অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছবির ভেতরের সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখটার দিকে।
মনে হলো, মানুষটা এখনও ঠিক আগের মতোই তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। একসময় বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাঙা, অসহায় কণ্ঠে বললেন,
— তুমি তো খুব সহজেই চলে গেলে, নীলিমা... কিন্তু আমাকে এমন এক দায়িত্বের ভেতর ফেলে গেলে, যেটার ভার আজও ঠিকমতো বইতে পারলাম না।
চোখদুটো অদ্ভুতভাবে ভিজে উঠল।
— তোমার মেয়ে, তোমার ছেলে... তাদের দায়িত্ব কোনোভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তুমি যাওয়ার আগে আমার কাঁধে যে আরেকটা দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলে... সেটা আজও পূর্ণ করতে পারলাম না।
ছবিটার দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলেন তিনি।
কণ্ঠটা আরও নিচু হয়ে গেল।
— তোমার আদরের ছোট বোন... তাকে আমি কখনও একজন স্ত্রীর প্রাপ্য ভালোবাসা দিতে পারিনি। যতটা সম্মান, যতটা নিরাপত্তা, যতটা দায়িত্ব দেওয়া উচিত ছিল—সেটুকু দিয়েছি হয়তো। কিন্তু ভালোবাসা... সেই অধিকারটা কোনোদিন দিতে পারিনি।
এক ফোঁটা অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়ল তাঁর গাল বেয়ে।
— যদি কোনোদিন আমাদের আবার দেখা হয়... যদি সত্যিই পরকাল বলে কিছু থাকে... তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, নীলিমা। আমি চেষ্টা করেছি... কিন্তু সব দায়িত্ব পালন করা মানুষের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। শুধু দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে বেজে চলল। তবুও নিজের মনকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করুন না কেন, একটা সত্য আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এতগুলো বছর... একই ছাদের নিচে, একই সংসারে, একই সুখ-দুঃখের ভেতর দিয়ে পথ চলতে চলতে...
নওরিন চৌধুরী ধীরে ধীরে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটা প্রেম কি না—তিনি জানেন না। হয়তো অপরাধবোধ, হয়তো মায়া, হয়তো গভীর অভ্যাস...
অথবা হয়তো এসবের চেয়েও জটিল কোনো অনুভূতি। তবে এটুকু তিনি নিঃসংকোচে স্বীকার করতে পারেন— নওরিন চৌধুরীর চোখের জল এখন আর তাঁর কাছে নির্লিপ্ত কোনো দৃশ্য নয়।
তার কষ্টে তাঁর বুকও ভারী হয়ে ওঠে। তার নীরবতায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। আর এই দুর্বলতাটুকু যতই লুকিয়ে রাখুন, নিজের হৃদয়ের কাছে তিনি আর মিথ্যে বলতে পারেন না।
__________________________
— পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষেরই একটা স্বতন্ত্র জায়গা থাকে। ঠিক তেমনি, মানুষের মনেও প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা আলাদা স্থান থাকে, যে স্থানটা আর কেউ কখনও দখল করতে পারে না।
ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা। রাহা বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে। আহত পাটা সামনে ছড়িয়ে রাখা। মুখটা অস্বাভাবিক শক্ত, চোখে জমে আছে অদৃশ্য এক অস্থিরতা। কিছুক্ষণ আগেই সে দেখেছে, নওরিন চৌধুরীর পেছন পেছন বাবা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। দৃশ্যটা তার ভালো লাগেনি, একদমই না। কেন ভালো লাগছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না। শুধু বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে আছে।
অন্যদিকে নীল দিব্যি আরাম করে বিছানার পাশে রাখা লম্বা বালিশে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে আছে। এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ছাদের দিকে তাকিয়েই কথাটা বলেছিল।
রাহা ভ্রু কুঁচকে নীল এর দিকে তাকাল।
— একটা মনে কয়জনের জায়গা হতে পারে?
নীল এবার মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
— কেন হবে না? মানুষের মনে তো অনেকেরই জায়গা থাকে। বাবা-মায়ের জন্য একরকম, ভাইবোনের জন্য আরেকরকম, বন্ধুর জন্য আলাদা, শ্রদ্ধার মানুষের জন্য আলাদা... প্রতিটা অনুভূতির নিজের একটা স্থান আছে। একটার জায়গা অন্যটা নিতে পারে না।
রাহা মুখ গম্ভীর করেই বলল,
— ফাও কথা বলবে না।
নীল মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
— ফাও কথা বলছি না। সত্যিটাই বলছি। আপনার উচিত আঙ্কেলের দিকটাও একটু বোঝার চেষ্টা করা।
রাহার ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।
— মানে?
প্রশ্নটা করতেই নীল হঠাৎ উঠে বসল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রাহার একেবারে কাছাকাছি এসে পড়ে। রাহা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল। অবচেতনভাবেই মাথাটা একটু পিছিয়ে নিল। আজকাল এই ছেলেটার ওপর ভরসা করা যায় না। কখন কী দুষ্টুমি করবে, তার কোনো ঠিক নেই। তার ওপর এখন পায়ের এই অবস্থায় চাইলে প্রতিরোধও করতে পারবে না। রাহার সেই সতর্ক মুখভঙ্গি দেখে নীলের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে আস্তে করে বলল,
— মানে... আপনি শুধু নিজের দিকটাই ভাবছেন। কখনও কি ভেবে দেখেছেন, আঙ্কেল আর আন্টিও মানুষ? তাঁদেরও তো অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে, না-বলা অনেক কথা আছে। বাইরে থেকে একটা সম্পর্ককে দেখে ভেতরের সব সত্য বোঝা যায় না।
রাহা চুপচাপ তাকিয়ে রইল। কিন্তু নীলের দুষ্টুমি যে এখানেই শেষ নয়, সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
সে চোখ টিপে আরও নিচু গলায় এমন একটা মন্তব্য করে বসল— এখনো ওনারা ভার্জি..
পরের মুহূর্তেই... রাহার হাতের জোরালো এক চড় সোজা এসে পড়ল নীলের গালে। নীল নাটকীয় ভঙ্গিতে "আহ" বলে উঠল। রাহা চোখ রাঙিয়ে তর্জনী তুলে বলল,
— তোমাকে আমি....! সব সময় আজেবাজে কথা বলতে হবে?
নীল আহত হওয়ার ভান করে নিজের গালে হাত বুলিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আচ্ছা আচ্ছা... ভুল হয়ে গেছে। এত রাগারাগির কী আছে!
একটু থেমে আবার খুব আস্তে, এমনভাবে বিড়বিড় করল যেন নিজেকেই বলছে,
— বেচারা শ্বশুরমশাই... এই মেয়ের রাগ সামলাতেই তো জীবনের অর্ধেক কেটে গেছে! বাসর কখন করবে?
কথাটা শুনে রাহা এবার বালিশ তুলে ওর দিকে ছুড়ে মারল। নীল হেসে দ্রুত সেটা ধরে ফেলল।
চলবে...