ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

৪৩তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#মেহরিমা_সারা 
পর্ব ৪৩.
হাসপাতালের সাদা বিছানায় আধমরা অবস্থায় পড়ে আছে সামিন। হাতে স্যালাইন চলছে, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকজুড়ে আড়াআড়িভাবে শক্ত করে বাঁধা ব্যান্ডেজ। চারপাশে ওষুধের গন্ধ আর মেশিনের ক্ষীণ বিপ্ বিপ্ শব্দ।
আধখোলা চোখে প্রথমে সিলিংটাই ধরা পড়ল তার। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরাতেই একজোড়া তীক্ষ্ণ, ধারালো দৃষ্টি এসে আটকে গেল চোখে। কয়েক মুহূর্ত কিছুই বুঝতে পারল না। মাথার ভেতর তীব্র চাপ অনুভব হতেই স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে এল।
এই দৃষ্টি... এই মুখ...মেহতাব খান নীল।
চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে বসে আছে। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে, এক হাত থুতনিতে ঠেকিয়ে ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি ঝুলিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে।
— তা, সামিন জামান... কেমন আছেন?
প্রশ্নটা শুনে সামিনের ইচ্ছে করল নিজের এই অসহায় শরীরটাকেই কয়েকটা গালি দিতে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরেছে, আর সেই সুযোগেই নীল ইচ্ছে করে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে।
নীল নিজেই আবার রয়েসয়ে বলে উঠল,
— সেদিন আমার বউকে বুকে জড়িয়ে যতটা শান্তি অনুভব করেছিলেন... তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিতে পারলাম তো? নাকি এখনও কম পড়ে গেছে?
সামিন দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলাল। "আমার বউ"— মাত্র দুটি শব্দ, অথচ বুকের ভেতর আগুন ধরিয়ে দিল। রাগে তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে ছেলেটার অস্তিত্বটাই পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে। সেদিন রাতের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
নীল উন্মাদের মতো লোকগুলোকে পিটিয়ে চলেছিল। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে গর্জে উঠছিল একটাই কথা—
— আমার রাহামনিকে মারতে চেয়েছিলি? আমার শান্তিকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিলি? আমার বউকে মারতে চেয়েছিলি? রাহামনি আমার স্ত্রী! ওর দিকে তাকানো প্রতিটি চোখের জন্য দুনিয়ার আলো নিষিদ্ধ!
প্রতিটি শব্দে ছিল অবিচল অধিকার, উন্মত্ত ভালোবাসা আর ভয়ঙ্কর দখলদারিত্ব। সামিন শতভাগ নিশ্চিত— নীল এসব করেছে রাহার অনুমতি ছাড়াই। যদি রাহা নিজে তাকে গ্রহণ করত, তাহলে কথা আলাদা ছিল। কিন্তু সেটা কখনোই সম্ভব নয়। রাহা রক্তমাংসের মানুষ নয়, প্রতিশোধে তৈরি এক জীবন্ত যন্ত্র। তার চোখে অনুভূতির ভাষা নেই, ভালোবাসার আলো নেই। আছে শুধু এক অদম্য প্রতিশোধস্পৃহা। সেই আগুন যা নিভে যাওয়ার আগে অন্য কোনো অনুভূতির জন্ম হওয়াই অসম্ভব।
ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নীল।
সোজা গিয়ে সামিনের মুখের কাছে ঝুঁকল। এক টানে অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— আফসোস... তোর মরে যাওয়া উচিত ছিল। তবে সমস্যা নেই। যেহেতু বেঁচে থাকার এতই শখ, বেঁচে থাক। আমার ছেলে-মেয়েরা বড় মামার আদর-যত্ন পাবে— একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে সুখবর আর কী হতে পারে?
মাস্ক খুলে নেওয়ায় বড় করে শ্বাস নিতে চাইল সামিন। কিন্তু বুকের ক্ষত যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে ছিঁড়ে যাচ্ছে। মনে মনে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করল—সাইকো!
কষ্টে কষ্টে শ্বাস নিয়ে সে বলল,
— বাবা-মা চলে গেছে... তবুও হাল ছাড়িনি। এখনও বেঁচে আছি। আমার একটা বোন আছে... ওর জন্য হলেও আমি বাঁচব, কাওয়ার্ড! আর একটা কথা মনে রাখিস... আমি রাহাকে ভালোবাসতাম, কারও স্ত্রীকে নয়।
মুহূর্তেই পুরো কেবিন কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল নীল। আঙুল তুলে সামিনের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপভরা কণ্ঠে বলল,
— তুই? ভালোবাসা? তোর ভালোবাসার যোগ্যতাই নেই! আর রাহার কাছে এসব ফাকিং ভালোবাসার কোনো মূল্যই নেই!
কথা শেষ করেই ধীরে ধীরে হাত রাখল সামিনের সদ্য ব্যান্ডেজ করা বুকের ওপর।
— আর কান খুলে শুনে রাখ! রাহামনি আমার... আমার বৈধ স্ত্রী! ছোটবেলায় ও আমাকে সামান্য এড়িয়ে গেলেও আমি পাগল হয়ে যেতাম। সেখানে ওকে অন্য কারও হতে দিয়ে আমি বেঁচে থাকব? নিজের মৃত্যুকেও মেনে নেব, তবু রাহাকে কাউকে দেব না!
অসহ্য ব্যথায় সামিনের চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে গেল। বুকের ক্ষত যেন আবার নতুন করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নীল ঠোঁট বাঁকিয়ে হাত সরিয়ে নিল।
— যার সামান্য ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা নেই... সে আবার রাহার মতো আগুনকে ভালোবাসে? হাস্যকর!
সামিনের বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। শ্বাসকষ্ট বাড়তে দেখে বিরক্ত মুখেই আবার অক্সিজেন মাস্কটা পরিয়ে দিল নীল। কেবিনের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে অস্থির পায়ে পায়চারি করতে লাগল। বারবার চুলে হাত বুলিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ থেমে গেল। দ্রুত পায়ে আবার সামিনের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত। হিসহিসে গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল—
— আম্মির মৃত্যুর রহস্য কী? আম্মিকে কেন খুন করা হয়েছিল?
সামিন কোনো উত্তর দিল না। শুধু ঠোঁটের কোণে একফোঁটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটাই যেন নীলের সমস্ত ধৈর্য ভেঙে দিল।
রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য হাতটা সামিনের দিকে উঠেও গেল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে থামিয়ে নিল সে। কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই কোনো কথা না বলে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
সকাল থেকেই অদ্ভুত এক অস্থিরতা রাহাকে গ্রাস করে রেখেছে। নিজের ভেতরটাকে যেন কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না। যতই নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে, ততই বুকের ভেতর জমে থাকা বিরক্তি আর রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অদ্ভুত ব্যাপার! রাগটা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। রাতে অন্য কারণে রাগ উঠেছিল, কিন্তু এখন রাগ হচ্ছে রাতের সেই উন্মাদ মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লেই। শেষ পর্যন্ত কী না ওই ছোট ছেলেটার প্রতিই দুর্বল হয়ে পড়ল? অসম্ভব!
মাথা ঝাঁকিয়ে চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলতে চাইল রাহা। ওহ গড...! যদি নীলের সব মনে থাকে? যদি ছেলেটা একে একে রাতের প্রতিটা ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করে? যদি জানতে চায়— "ওগুলো কী ছিল, রাহামনি?"
ভাবতেই অস্বস্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে।
— উফফ... প্লিজ! ছেলেটার যেন কিছুই মনে না থাকে... একদম কিছুই না।
ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে তুলল রাহা। ওপাশের মানুষের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলল। কথোপকথন শেষ হতেই ফোনটা পাশে রেখে বিরক্তিতে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
— অসহ্যকর একটা ছেলে! নিজে ঝামেলা পাকিয়ে আমাকে এদিকে অস্থির করে রেখেছে। আবার আমারই টাকা খোয়াতে হলো ওকে বাচাতে!
মুখ ফুলিয়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইল রাহা।
কিছুই ভালো লাগছে না। চারপাশের সবকিছুই যেন অসহ্য লাগছে। নীলের একরাতের বেপরোয়া বোকামির মূল্য তাকে গুনতে হয়েছে পুরো আট লাখ টাকা। টাকাটা শুধু কোনো ক্ষতিপূরণ ছিল না— সেই অর্থের বিনিময়েই লাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে, ঘটনাস্থলের সব প্রমাণ গোপন করা হয়েছে, আর পুলিশের মুখও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
একটা মাত্র ছেলের উন্মত্ততার খেসারত দিতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই উড়ে গেল আট লাখ টাকা। ভাবতেই রাহার বিরক্তি আর অস্থিরতা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ছেলেটা আস্ত এক ঝামেলা!! 
তারপর হঠাৎই হাত উঠিয়ে কাল রাতে নিজের উদরে নীল এর পাগলামির কিছু চিহ্ন দেখল। সেগুলোতে হাত বুলাতেই অজান্তে ঠোক বেঁকে গেলো। 
আজ খান বাড়ির সবাই এসেছে ইরাদের বাড়িতে। উদ্দেশ্য— আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকে দেখা এবং বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। তবে সবার অগোচরে সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল দরজায় প্রবেশ করার পরই। রুবিনা খানকে একনজর দেখেই ইরার মা সুনেরা যেন পাথর হয়ে গেলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল রুবিনার মুখে। বহু বছরের পুরোনো চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো যেন আচমকা মনের দরজায় কড়া নাড়ল। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বেড়ে গেল, চোখে ভেসে উঠল অতীতের অস্পষ্ট কিছু দৃশ্য। কিন্তু ঠিক কী মনে পড়েছে, তা যেন নিজেও ধরতে পারছেন না।
অন্যদিকে রুবিনা খান সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মুখে আগের মতোই স্থিরতা, চোখে অভিজাত নির্লিপ্ততা। চারপাশ শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, অথচ একবারও বোঝার সুযোগ দিচ্ছেন না তিনি কী ভাবছেন। ইরার বাবা গম্ভীর মুখে বসে আছেন। অতিথিদের যথাযথ সম্মান জানালেও তাঁর মধ্যে বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস নেই।
আরমান চৌধুরী একবার সাজিদ খানের দিকে, আবার ইরার বাবার দিকে তাকালেন। তারপর চোখের ইশারায় কিছু বোঝাতেই সাজিদ খান আর রাখঢাক না করে সরাসরি বললেন,
— ভাইজান, আপনার বড় মেয়েকে আমার বাড়ির বড় ছেলে শাহরিয়ার খান আদির জন্য চাইতে এসেছি। আশা করি আমাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন না।
ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ইরার বাবা আগের মতোই গম্ভীর। কোনো উত্তর না দিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এদিকে ইরার মা অজানা ভয়ের মিশেলে অনবরত ঘামছে । বারবার শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিচ্ছে।
রুবিনা খান হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, সুনেরা অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। মহিলাকে কোথায় যেন আগে দেখেছেন বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যতই মনে করার চেষ্টা করছেন, কিছুতেই সেই স্মৃতিটা পরিষ্কার হচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টা মাথা থেকে সরিয়ে আলোচনায় মন দিলেন। আরমান চৌধুরী আর সাজিদ খান বললেন, তাঁরা আগেই ইরাকে দেখেছেন। নতুন করে দেখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু রুবিনা খান আপত্তি তুললেন।
— আমার বড় ছেলের বিয়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব নিয়ম মেনেই হবে। কোনো আয়োজন বাদ যাবে না।
এদিকে সুনেরা দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকলেন। ইরা তখনও অস্থির হয়ে ঘরের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে পায়চারি করছে। দুই হাতের আঙুল একসঙ্গে জড়িয়ে বারবার মুচড়ে ধরছে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সুনেরার বুকটা হুহু করে উঠল। আলমারি খুলে যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা কলাপাতা রঙের শাড়িটা বের করলেন।
— এটা পরে তৈরি হয়ে নে, মা।
ইরা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল।‌কাঁপা হাতে কোনোমতে শাড়িটা পরে বেরিয়ে এলো। সুনেরা আবার আলমারির লকার খুললেন। বহু বছর ধরে দুই মেয়ের জন্য যত্ন করে তুলে রাখা গয়নার বাক্সটা বের করলেন। সেখান থেকে সাধারণ কিছু স্বর্ণালংকার নিজের হাতে মেয়েকে পরিয়ে দিলেন।
সবশেষে দুই হাত দিয়ে ইরার মুখটা আলতো করে তুলে কপালে গভীর একটা চুমু খেলেন। মায়ের এমন আচরণে ইরার চোখ ভিজে উঠল। ছলছল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল,
— মা... এমন করছ কেন? আমার তো আর এখনই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না।
সুনেরা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মেয়ের মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন। আসলে ছোটবেলা থেকেই ইরা বাবার প্রকাশ্য স্নেহ খুব একটা পায়নি। তবে ভালোবাসার অভাব হয়নি কখনো। তার বাবা সবসময় দূর থেকে, আড়াল করে মেয়ের যত্ন নিয়েছেন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেননি, কিন্তু ইরা জানে— মানুষটা তাকে অসম্ভব ভালোবাসেন। আর তার মা... সুনেরাই ছিল ইরার পুরো পৃথিবী। কিছুক্ষণ পর ইরাকে বসার ঘরে আনা হলো।
মাথা নিচু করে বসে আছে সে। লজ্জায় একবারও চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। রুবিনা খান গভীর মনোযোগে ইরাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।অজান্তেই তাঁর চোখে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ—রাহা।
ইরার চোখ রাহার তুলনায় একটু ছোট। চোখের মণি লাইট ব্রাউন, যেখানে রাহার ছিল ডার্ক ব্রাউন। রাহার চুলে হালকা লালচে আভা, আর ইরার চুল একেবারে কুচকুচে কালো। উচ্চতায় রাহা কিছুটা লম্বা, গায়ের রঙও বেশি উজ্জ্বল। ইরা তুলনামূলক শ্যামলা। অজান্তেই তিনি প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে রাহাকে মিলিয়ে দেখছেন। তিনি জানেন, এটা ঠিক নয়। তবুও নিজেকে থামাতে পারছেন না। তার কাছে রাহাই ছিল সবদিক দিয়ে নিখুঁত। এই কারণেই তো বহু আগেই মনে মনে বড় ছেলে আদির জন্য রাহাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
এমনকি সেই ভাবনা থেকেই রাহার পছন্দ-অপছন্দ জেনে তার জন্য একের পর এক হীরার গয়না কিনে জমিয়ে রেখেছিলেন। কারণ রাহা স্বর্ণ একদমই পছন্দ করত না। সোনালি রঙ তার ভালো লাগত না। কিন্তু ভাগ্য অন্য গল্প লিখেছে। ছেলের পছন্দ যখন ইরা, তখন মা হয়ে আর আপত্তি করে লাভ কী? মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগ খুললেন রুবিনা খান।
ভেতর থেকে অপূর্ব একটি হীরের নেকলেস বের করে নিজের হাতে ইরার গলায় পরিয়ে দিলেন। ঘরে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।এরপর সাজিদ খান ও আরমান চৌধুরী ইরার বাবার সঙ্গে বসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। সিদ্ধান্ত হলো, আদি যেহেতু খান পরিবারের বড় ছেলে, তাই বিয়েটা যথাসম্ভব জাঁকজমকপূর্ণ হবে। কোনো আয়োজনেই যেন সামান্য ঘাটতি না থাকে।
সব আলোচনা শেষে আগামী সপ্তাহে আংটি পরানোর দিন নির্ধারণ করা হলো। বিদায় নেওয়ার আগে সবাই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বেরিয়ে এল। আর এই পুরো আয়োজনের পেছনে সবচেয়ে বেশি তাড়া দিয়েছে একজনই— মেহতাব খান নীল। সামনেই তার পরীক্ষা। তাই সে বাড়িতে রীতিমতো ঘোষণা করে দিয়েছে,
— ভাইয়ার বিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দিবে। আমার এক্সামের আগে সব শেষ চাই!
ছেলের এই একরোখা স্বভাবের কাছে সাজিদ খানও শেষ পর্যন্ত হার মেনেছেন। ওর সঙ্গে তর্ক করে জেতা সত্যিই অসম্ভব। সবাই খাবার পর্ব চুকিয়ে চলে যায়। আরমান চৌধুরী কে সাজিদ খান নিয়ে আসেন যেহেতু হঠাৎ আসা তাই সবাই আসেনি। 
সবাই চলে যাওয়ার পর বাড়িটা আবার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। কিছুক্ষণ আগেও যে বসার ঘরে মানুষের কথাবার্তা, হাসি আর আনাগোনায় সরগরম ছিল, এখন সেখানে নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নীরবতা।
ইরা নিজের ঘরে বসে গলার হীরের হারটার দিকে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে থামলেন সুনেরা।
আজ সারাদিন ধরেই তাঁকে অস্বাভাবিক লাগছে। মুখে একরাশ ক্লান্তি, চোখে গভীর উদাসীনতা। যেন কোনো পুরোনো স্মৃতি তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসলেন তিনি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর হঠাৎই এমন একটা প্রশ্ন করলেন, যার জন্য ইরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
— ইরা... আদির সঙ্গে তোর সম্পর্কটা কেমন?
প্রশ্নটা শুনে ইরা বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকাল। মাকে ইরা সব খুলে বলেছে ওদের সম্পর্ক নিয়ে।
— মানে? কীরকম সম্পর্কের কথা বলছ, মা?
সুনেরা কয়েক মুহূর্ত মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর নিস্প্রাণ চোখ দুটো যেন কিছু খুঁজছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে বললেন,
— মানে... আদি কি নিজের ব্যাপারে সবকিছু তোকে বলে? কোনো কিছু লুকায় না তো?
ইরা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ... প্রায় সব কথাই তো বলে। কেন?
সুনেরা যেন আরও কিছু বলতে চাইলেন।
ঠোঁট নড়ল.
— আদির...
শব্দটা বলেই থেমে গেলেন। গলাটা যেন আচমকা শুকিয়ে এলো। ইরা এবার পুরোপুরি কৌতূহলী হয়ে উঠল।
ভ্রু কুঁচকে মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
— আদি? আদি কী, মা? কী বলতে চাইছ?
সুনেরা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর যেন নিজের ভেতরের সব সাহস এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেললেন।
কোনো উত্তর না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালেন। প্রায় পালিয়ে যাওয়ার মতো দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
— মা...!
ইরা ডেকেও কোনো সাড়া পেল না।
দরজার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সে।
মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। কী বলতে চেয়েছিলো মা? আদির ব্যাপারে ঠিক কী জানতে চাইছিলেন?
নাকি...
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন