ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রনয়ের প্রলয়

৫০তম পর্ব

লেখক: মেহরিমা সারা

#প্রনয়ের_প্রলয় 

#মেহরিমা_সারা 
পর্ব ৫০. ( প্রথমাংশ) 
গাড়িতে বোমা লাগানো হয়েছে—এই বিষয়টা নীল নিজেও জানত না। জানলে কোনো অবস্থাতেই সে রাহাকে নিয়ে ওই গাড়িতে উঠত না।
সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ নীলের চোখ পড়ে গাড়ির এক অস্বাভাবিক অংশে। মাত্র এক ঝলক দেখেই ওর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই মাথায় সব হিসাব মিলতে শুরু করল। লাময়াক!
এত দূরের নির্জন জায়গায় ডাকার কারণটা এবার পরিষ্কার হয়ে গেল। শহর থেকে এতটা দূরে আসতে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় লাগবে। আর মাঝপথে যদি বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে সেটা নিছক দুর্ঘটনা বলেই ধরে নেওয়া হবে। সাহায্য পাওয়ারও কোনো সুযোগ থাকবে না। এমনকি অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ জানতেও পারবে না ঠিক কী ঘটেছে।
এক সেকেন্ডও দেরি করেনি নীল।‌ রাহাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুযোগ বুঝে নিজেও চলন্ত গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে। কারণ তখন থেকেই ওর মনে হচ্ছিল— কিছু একটা ভয়ংকর ভুল হচ্ছে।
মাটিতে পড়ে গিয়ে শরীরজুড়ে অসহ্য ব্যথা ছড়িয়ে পড়লেও নীল নিজেকে সামলে নিল। পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তের মধ্যেই নিজের পুরো পরিকল্পনা বদলে ফেলল।
কিছুক্ষণ পরই কয়েকজন অস্ত্রধারী লোক এসে রাহাকে তুলে নিয়ে গেল। নীল দূর থেকে নিঃশব্দে তাদের অনুসরণ করতে লাগল। সুযোগ বুঝে পেছনে থাকা লম্বা গড়নের একজন লোককে আচমকা মুখ চেপে ধরে টেনে আড়ালে নিয়ে গেল।
লোকটা কিছু বোঝার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
তারপর শুরু হলো নীলের আসল খেলা।‌ দ্রুত নিজের পোশাক বদলে লোকটার পোশাক পরে নিল। আর নিজের পোশাক পরিয়ে দিল সেই অচেতন লোকটাকে।
এরপর লোকটাকে বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির সামনের দিকে এমনভাবে ফেলে রাখল, যেন দূর থেকে দেখলে মনে হয় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে নীলই। বিস্ফোরণের ধাক্কায় লোকটার শরীর এমনিতেই মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। নীলের ধারণাই সত্যি হলো। রাহাকে নিয়ে যাওয়ার প্রায় আধঘণ্টা পর ওরা ফিরে এসে নীলকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু তারা নীলকে নয়—
নীলের পোশাক পরা সেই অচেতন লোকটাকেই নীল ভেবে তুলে নিয়ে চলে গেল।
ঠিক সেই সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় সামিন। লোকেশন ট্র্যাক করেই সে সেখানে এসেছে।
নীলকে জীবিত দেখে প্রথমে সে নিজেই হতভম্ব হয়ে যায়। কিন্তু তার থেকেও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল।
সামিনের সঙ্গে নিশাকেও দেখে নীল প্রায় চিৎকার করে উঠল।
— আপনি নিশাকে এখানে এনেছেন কেন? আপনার মাথা ঠিক আছে?
সামিন তখন আর কোনো যুক্তিই শুনতে রাজি নয়। সবকিছু ফেলে শুধু রাহার কাছে যেতে চায়। কিন্তু নীল বারবার তাকে আটকে দেয়। একপর্যায়ে রাগে দু'জনের মধ্যে হাতাহাতির পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়। নীল দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে,
— আমার বউয়ের চিন্তা তোর থেকে বেশি আমার হয়!
কথাটা শুনে নিশা যেন আরেকটা বজ্রাঘাত খেল।
একটার পর একটা শুনে নিশার মাথাই কাজ করছে না। কিন্তু যখন দেখল দু'জন সত্যিই মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছে, তখন বাধ্য হয়ে মাঝখানে গিয়ে দু'জনকে আলাদা করল।
কিছুটা শান্ত হওয়ার পর শুরু হলো নতুন পরিকল্পনা। এর মধ্যেই ওরা বুঝে গেল— লাময়াক এখানে নেই। পুরো ঘটনাটাই ছিল একটা সুপরিকল্পিত ফাঁদ।
অফিসার মাহিন এবং বাকি পুলিশ সদস্যদের যারা মুহূর্তের মধ্যে কাবু করে ফেলতে পারে, তারা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। আর থুইসিং...
তাকে তো অনেক আগেই হত্যা করা হয়েছে।
এর মানে একটাই। লাময়াকের হাত অনেক ওপরে পর্যন্ত পৌঁছায়। লাময়াককে শুধু শক্তি দিয়ে হারানো সম্ভব নয়। তার বিরুদ্ধে লড়তে হলে প্রয়োজন ধৈর্য, কৌশল আর বুদ্ধি। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতেই হঠাৎ তারা আরেকটা অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখল।
আদি আর ইরাকেও বন্দি করে আনা হয়েছে।
এর থেকেও বড় বিপদ— সামিনের সঙ্গে থাকা প্রায় সব লোককেই আগেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে।
অর্থাৎ সামনের রাস্তা দিয়ে এগোনো মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। তাই বাধ্য হয়েই তারা পাহাড় বেয়ে পেছনের গোপন পথ ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল।
পৌঁছানোর পর লাময়াকের প্রতিটি কথা নীল নিঃশব্দে শুনছিল। কথাগুলো শুনে ওর পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল।
যাকে সে ছোটবেলা থেকে বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করেছে... আজ তাকেই এমন অসহায় অবস্থায় দেখতে হচ্ছে। এ কষ্ট কোনো ছোট ভাইয়ের পক্ষেই সহ্য করা সহজ নয়। তবে আদির পরিচয় নিয়ে সে খুব বেশি অবাক হয়নি। কারণ রাহার পিছু নিতে গিয়েই অনেক আগেই তাদের জীবনের অর্ধেক সত্য জেনে গিয়েছিল। বাকিটুকু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সবশেষে যখন ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তখন নীলের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তাই অনেক স্মৃতি ওর কাছে ঝাপসা। ঠিক তখনই... লাময়াক এর কথার মাঝেই হঠাৎ পুরো ঘর ঘন ধোঁয়ায় ভরে গেল।
কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে ওই লোকগুলো রোবটিক ভাবে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিল। আদি রাহা ইরা তিনজন মিলেও কিছু করতে পারছিলো না, এতো বিষাক্ত লাগছিল যে কয়েক সেকেন্ডে চোখ মুখ জ্বলা শুরু করেছে। নীল সামিন পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত নিজেদের কাজ করে ফেলে। রাহা ইরা আদিকে বের করে আনল। 
এই অল্প সময়েই তারা একটা বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে— লাময়াককে শক্তি দিয়ে হারানো যাবে না।
তাকে হারাতে হবে তার নিজের খেলাতেই। বুদ্ধি দিয়ে। কৌশল দিয়ে। আর কখনো কখনো বিশাল, শক্তিশালী কোনো শিকারিকে শেষ করার জন্য সবচেয়ে ছোট অস্ত্রটাই যথেষ্ট হয়। নীল মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে— লাময়াকের পতনও হবে ঠিক তেমনভাবেই। একটি তুচ্ছ, অবহেলিত জিনিস দিয়েই শেষ হবে ওর মতো মানুষ রূপী জানোয়ার এর খেলা। এখন শুধু সেই পরিকল্পনাটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অপেক্ষা।
______________________________
বর্তমানে রাহার অবস্থান নীলের দুই বাহুর নিরাপদ বৃত্তের ভেতর। ছোট কোনো শিশুর মতোই রাহাকে কোলে আগলে বসে আছে নীল। রাহা নিঃশব্দে নীলের ঘাড়ে মুখ গুঁজে তার প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনছিল। সত্যিই... আজ রাহা থুইসিংয়ের জন্য আবেগের বশে বড় একটা ভুল করে ফেলেছিল। কারন থুইসিং নীলিমার সাহায্য কারী ছিল। কিন্তু আর না। এবার আর কাউকে আগে আঘাত করার সুযোগ দেবে না। রাইদা চৌধুরী রাহা এবার ওদের আগেই আঘাত হানবে। সেই হিংস্র দুনিয়াকে এবার সে বুঝিয়ে দেবে। কিছুটা দূরে পাশাপাশি বসে আছে নিশা, ইরা, আদি আর সামিন। তবে সবার থেকে খানিকটা দূরে বসেছে নীল আর রাহা।
নীল ধীরে ধীরে দুই হাতে রাহার মুখ তুলে ধরল। অনেকক্ষণ নীরবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কপালে, দুই গালে, নাকে আর থুতনিতে আলতো করে একের পর এক চুমু এঁকে মৃদু হেসে বলল,
— ভয় পেয়েছিল বুঝি আমার সাহসী রাহা?
রাহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
— বেশি কথা বলো না। আমি কাউকে ভয় পাই না। আজ সঙ্গে আদি আর ইরা না থাকলে হয় আমি মরতাম... নয়তো ওদের মেরে ফেলতাম।
নীল হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তাতে কী লাভ হতো? আসল অপরাধী তো সেখানে ছিলই না।
রাহা ঠোঁট বাঁকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে জানে নীল ঠিকই বলছে। তবুও বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা এত সহজে কমার নয়। ঠিক তখনই হঠাৎ রাহার গালে টুপ করে উষ্ণ এক ফোঁটা পানি পড়ল। রাহা চমকে উঠে মাথা তুলল। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি। কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে মুহূর্তেই অস্বস্তিতে তাড়াহুড়ো করে নীলের কোল থেকে সরে আসতে চাইল সে। কিন্তু নীল ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।
রাহা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল। চোখ পাকিয়ে নিচু গলায় শাসালও।
কিন্তু নীল যেন সেসবের কোনো গুরুত্বই দিল না।
উল্টো আগের মতোই আগলে রাখল।
হঠাৎ আশপাশে সবার উপস্থিতির কথা মনে হতেই রাহার কান আর গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।মনে মনে নিজেকেই ধমকাল। ছিঃ! সে তো কোনোদিন এতটা নির্লজ্জ ছিল না। তাহলে আজ এমন হচ্ছে কেন? পরক্ষণেই নিজের মনেই উত্তর পেয়ে গেল। সব ওই নির্লজ্জ নীলের দোষ। এই ছেলেটার সঙ্গে থাকতে থাকতে তার প্রভাব যে নিজের ওপরও পড়ে গেছে, সেটা বুঝতেই পারেনি।
ওদিকে মানুষ যেমন প্রচণ্ড শোকে অনেক সময় পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে যায়, ঠিক তেমনই অবস্থা হয়েছে আদির। এতক্ষণ ধরে সে শুধু নির্বাক হয়ে বসে আছে। মস্তিষ্ক যেন কোনোভাবেই সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটার সঙ্গে অতীতের স্মৃতিগুলো মেলাতে পারছে না।‌বারবার ফ্যালফ্যাল করে ইরার দিকে তাকাচ্ছে। ইরা আদির দৃষ্টি বুঝে ধীরে মাথা নাড়ল। কিন্তু তাতেও আদির বিস্ময় কমল না। তার যতদূর মনে পড়ে— নীল আর রাহার সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলের মতো। একজন আগুন হলে অন্যজন প্রেট্রোল। একজন ভীষণ গম্ভীর, অন্যজন বেপরোয়া। একজন শান্ত, হিসেবি। অন্যজন ঝড়ের মতো অস্থির। একজন ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অন্যজন রাগের মাথায় সবকিছু ওলটপালট করে দিতে পারে।
তাহলে... তাদের মধ্যে এত গভীর বোঝাপড়া কবে তৈরি হলো? কীভাবে হলো? এর শুরুটাই বা কোথায়? কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে না। আদি আবার আড়চোখে তাকাল। দেখল, নীল এখনও রাহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।
আর আশ্চর্যের বিষয়— রাহাও বিশেষ কোনো আপত্তি করছে না। শুধু মাঝেমধ্যে চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে। ব্যস, এতটুকুই। এ কেমন সমীকরণ?আদি দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা তার বহু বছরের সমস্ত ধারণাকেই ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। 
অন্যদিকে সামিনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল। হয়তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।একদিন রাহাই তাকে বলেছিল— এটা নামমাত্র সম্পর্ক। সেই কথাটাই এতদিন বুকের ভেতর নিঃশব্দে আগলে রেখেছিল সে। কিন্তু আজ বুঝতে পারছে— ভুলটা আসলে তার নিজেরই ছিল। যে মেয়েটার চোখে সে কোনোদিনই কাজিন ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় খুঁজে পায়নি, সেই মেয়েকে নিয়ে অন্যরকম স্বপ্ন দেখা শুরু করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় বোকামি। মিথ্যে আশাকে আঁকড়ে ধরে থাকার ফল শেষ পর্যন্ত এটাই হয়। বুকের ভেতর তীব্র কষ্ট হলেও সামিন মুখে কিছুই প্রকাশ করল না। শুধু নিঃশব্দে চোখ ফিরিয়ে নিল। কারণ সে বুঝে গেছে— কিছু সম্পর্ককে যতই নিজের করে চাই, সেগুলো কখনও নিজের হয় না।
হঠাৎ নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে নড়েচড়ে বসল। কপালে কয়েক ফোঁটা পানি পড়তেই হাত বাড়িয়ে ধরল। মৃদু স্বরে বলল,
— ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোনো নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়া উচিত।
সামিন ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— অন্য কোথাও যাওয়ার কী দরকার? যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় ফিরে যাওয়াই ভালো।
নীল মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল,
— আপনি যেতে পারলেও বাকিরা পারবে না, ভাইয়া। আমাদের গাড়িগুলো কোথায় আছে, সেটাই জানি না। ওরা নিশ্চয়ই সব সরিয়ে ফেলেছে। এই এলাকায় এখন গাড়ি বা কোনো যানবাহন পাওয়াও সহজ হবে না। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই, সাহায্য চাওয়ারও উপায় নেই। তাই আপাতত কাছাকাছি কোনো জনবসতি খুঁজে আশ্রয় নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে।
একটু থেমে রাহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
— তাছাড়া রাহার পায়ের অবস্থাও ভালো নয়। কয়েক দিন আগেই ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। এই ভেজা মাটিতে বেশি হাঁটলে ক্ষত আরও খারাপ হয়ে যেতে পারে। ভাবি আর নিশাও ভীষণ ক্লান্ত। আর আপনার মাথার আঘাতটাও অবহেলা করার মতো নয়। আগে সবার নিরাপদে থাকা দরকার।
সামিন চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— কিন্তু আশেপাশে আদৌ কোনো জনবসতি আছে কি না, সেটাই তো জানি না।
নীল একটু দূরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
— ওদিকে দেখুন।
সবাই তাকাতেই দেখতে পেল নিচ দিয়ে একটা সরু খাল বয়ে গেছে। খালের ওপরে বাঁশ দিয়ে বানানো একটা ছোট সাঁকো, আর কাদার মধ্যে মানুষের ও গরুর পায়ের ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।নীল বলল,
— শুধু খাল না। ওই সাঁকোটা দেখুন। বাঁশগুলো একেবারে নতুন। মানে নিয়মিত মানুষ চলাচল করে। এখানে কিছুটা দূরে চাষের জমিও আছে। এই সব কিছু ইঙ্গিত করে আশেপাশেই একটা গ্রাম আছে। এসব অঞ্চলের মানুষ সাধারণত পানির উৎসের কাছেই বসতি গড়ে তোলে। তাই খাল ধরে এগোলেই কোনো না কোনো গ্রামে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
সবাই নীরবে চারপাশে তাকাল। নীলের যুক্তিটা অস্বীকার করার মতো কিছুই ছিল না। ইরা কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করল,
— কিন্তু আমরা যাব কোথায়?
নীল মৃদু হেসে বলল,
— খালের পাশের সরু পথটা দেখছেন? ওটা মানুষের হাঁটার পথ। এই পথ কোথাও না কোথাও গিয়েই শেষ হবে। আমরা ওই পথ ধরেই এগোব।
ঠিক তখনই নিশা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— মেঘ আরও ঘন হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির বেগ যেকোনো সময় বেড়ে যেতে পারে। আমাদের দেরি করা ঠিক হবে না।
সামিন গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। সবাই ঠিকই বলছে। নিজের শরীরটাও যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। মাত্র কয়েক দিন আগে বড় অপারেশন হয়েছে। শরীর এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। আর সময় নষ্ট না করে নীল হঠাৎ রাহাকে দুই হাতে তুলে কোলে নিল।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানাল।
— নীল! আমাকে নামাও। আমি নিজে হাঁটতে পারব।
কিন্তু নীল যেন কিছুই শুনল না। সবাই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আদি এখনও অনেকটাই অন্যমনস্ক। কিন্তু এবার দৃশ্যটা দেখে তার ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তি হঠাৎ রাগ হয়ে বেরিয়ে এল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
— নীল, এটা কী হচ্ছে? রাহাকে কোলে নিয়ে হাঁটছিস কেন? নিচে নামা। দেখতে একদমই ভালো লাগছে না।
আদির কথায় সবাই একসঙ্গে ওদের দিকে তাকাল। নীল ধীরে ধীরে চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু অটল দৃঢ়তা। রাহাও বারবার নিচে নামতে চাইছে।
তবু নীলআরও শক্ত করে বুকের কাছে আগলে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
— রাহার পায়ের অবস্থা বেশি ভালো না। ও এখন বেশি হাঁটতে পারবে না। আর আমি চাইও না ও হাঁটুক।
কথাগুলো এতটাই স্পষ্ট, দৃঢ় আর নির্ভার ছিল যে আদি আর কিছু বলার সুযোগই পেল না। সে চুপ করে গেল। নীল আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। রাহাকে কোলে নিয়েই খালের পাশের সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। আদি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখে-মুখে অদ্ভুত এক অস্বস্তি।
ইরা সব বুঝতে পারছিল। ধীরে ধীরে তার কাছে এসে বাহুতে আলতো হাত রাখল। নরম গলায় বলল,
— আদি... এসব নিয়ে পরে কথা হবে। এখন আমাদের আগে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানো দরকার।
আদি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ইরা তার উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে আলতো টেনে সামনে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বাধ্য হয়েই আদি ওদের সঙ্গে এগোল। পেছনে নিশা আর সামিন ধীরে ধীরে হাঁটছিল। সামিন মাঝে মাঝেই বুকে হাত চেপে ধরছে। মুখের ক্লান্তিটা নিশার চোখ এড়াল না। নিশা একটু কাছে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
— আপনার কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?
সামিন মৃদু হাসার চেষ্টা করল।
— না... আমি ঠিক আছি।
কথাটা বললেও তার কপালে জমে থাকা ঘাম আর ভারী শ্বাসপ্রশ্বাস অন্য কথাই বলছিল।
প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট হাঁটার পর দূরে কোথাও ক্ষীণ হলুদাভ আলোর ঝিলিক চোখে পড়ল। অন্ধকার রাতের মধ্যে সেই ছোট আলোটা যেন আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলছিল। নীল থেমে দূরের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— ওদিকে আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে লোকজন আছে। চলুন, আরেকটু এগিয়ে দেখি।
ক্লান্ত শরীর নিয়েও সবাই সামনে এগোতে লাগল। কাছাকাছি যেতেই বোঝা গেল, সত্যিই একটা ছোট গ্রাম। দূরে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটা টিনের বাড়ি। কোথাও কুপি জ্বলছে, কোথাও সোলার লাইটের মৃদু আলো। কোনো বাড়ির উঠানে বাঁধা গরু, কোথাও মুরগির খাঁচা, আবার কোথাও শুকনো কাঠের গাদা। রাতের নীরবতায় শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে কোথাও কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসছে। রাহার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। এভাবে সবার সামনে নীলের কোলে করে ঘুরে বেড়ানো তার মোটেও ভালো লাগছে না।
বারবার নামতে চাইলেও নীল একটুও পাত্তা দেয়নি। তবে এটাও সত্যি, রাহার পায়ের ব্যথাটা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কয়েক কদম হাঁটলেই ব্যথা তীব্র হয়ে উঠছে। গ্রামের একেবারে কাছে পৌঁছাতেই নীল নিচু স্বরে বলল,
— একটু নামতে হবে।
রাহা প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতেই নীল বলল,
— আগে আমি গিয়ে পরিস্থিতিটা দেখি। মাঝরাতে এতজন অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে ঢুকে পড়লে ওরা ভয় পেতে পারে।
রাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে না-সূচক ইশারা করল।
অর্থাৎ— কেউ একা যাবে না। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পর কাউকে একা ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
রাহার জেদ দেখে নীল আর আপত্তি করল না। ধীরে ধীরে তাকে নামিয়ে দিল। রাহা দাঁড়াতেই ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল, কিন্তু কিছু বলল না।
ছোট ছোট টিনের ঘরগুলো একে অপরের থেকে বেশ খানিকটা দূরে দূরে। সম্ভবত আগুন লাগার ঝুঁকি কমাতেই এভাবে বাড়িগুলো বানানো হয়েছে।
চারপাশ দেখে নীল সবচেয়ে বড় বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। বাড়িটার সামনে টিনের গেট। ভেতরে একটা বড় উঠানও দেখা যাচ্ছে। নীল গিয়ে আলতো করে গেটে টোকা দিল। টিনের গেটে টোকা পড়তেই রাতের নিস্তব্ধতায় শব্দটা অস্বাভাবিক জোরেই প্রতিধ্বনিত হলো। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে লণ্ঠনের আলো নিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক লোক বেরিয়ে এল। গেট খুলেই সন্দেহভরা চোখে একবার সবাইকে পর্যবেক্ষণ করল।
এত রাতে একসঙ্গে কয়েকজন অচেনা মানুষ দেখে স্বাভাবিকভাবেই সে সতর্ক হয়ে গেছে। নীল বিনীত কণ্ঠে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম, চাচা। আমরা একটু বিপদে পড়েছি। আপনার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি।
লোকটা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— কিসের সাহায্য?
নীল শান্তভাবেই সবটা সংক্ষেপে বলল।
— আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। যোগাযোগেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। এই রাতের মধ্যে শহরে পৌঁছানো সম্ভব না। যদি ভোর পর্যন্ত একটু আশ্রয় দিতেন...
লোকটা কোনো উত্তর দিল না। শুধু একদৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দ্বিধা। এই সময় ভেতর থেকে একজন মধ্যবয়সী মহিলা বেরিয়ে এলেন। হাঁটতে হাঁটতেই বললেন,
— কে আইছে এত রাইতে?
বেরিয়ে এসে এতগুলো মানুষকে দেখে তিনিও থমকে গেলেন। মহিলা প্রশ্নবোধক চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন। লোকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে নিচু গলায় বলল,
— চিনি না, জানি না। কোথা থেইকা আইছে। এখন কইতাছে একটু সাহায্য লাগে।
মহিলা কিছুক্ষণ সবাইকে ভালো করে দেখলেন।তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— আচ্ছা, বাইরে দাঁড় করাইয়া রাখবেন ক্যান? এত রাইতে মানুষ বিপদে পড়ছে। ভিতরে আইসেন। আল্লাহ ভরসা।
লোকটা মুখে কিছু না বললেও আর বাধা দিল না।
সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। রাহা, আদি, সামিন সবার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। অচেনা মানুষের বাড়িতে এভাবে আশ্রয় নেওয়ার অভ্যাস ওদের নেই। তবুও পরিস্থিতির কাছে তারা অসহায়। লোকটা পাশের একটা ঘর দেখিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
— আপাতত এই ঘরডায় থাকেন।
সবাই ঘরে ঢুকে চারপাশে তাকাল। টিনের ঘর হলেও বেশ বড়। মাঝখানে বিশাল একটা কাঠের খাট। একপাশে স্টিলের আলমারি, পাশে পুরোনো একটা ওয়ারড্রোব, দেয়ালে কাপড় রাখার আলনা, কোণে ধান রাখার বড় ড্রাম, আর সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
ঘরের প্রতিটা কোণ এত পরিপাটি করে সাজানো যে বোঝাই যায়, বাড়ির মানুষগুলো খুব যত্নশীল।সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। দুই হাত পেছনে রেখে সন্দেহের চোখে ওদের পর্যবেক্ষণ করছে।
নীলও আড়চোখে লোকটার প্রতিটি অভিব্যক্তি লক্ষ করছিল। হঠাৎ নীল উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— চাচা... আমি একটু ফ্রেশ হব।
লোকটা প্রথমে বুঝতেই পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নীল হেসে দুই হাত দিয়ে মুখে পানি দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল,
— একটু হাত-মুখ ধোব। কোথায় পানি পাব, দেখিয়ে দেবেন?
এবার লোকটা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। সামনে হাঁটতে শুরু করতেই নীল হঠাৎ পেছন ফিরে আদির হাতের ঘড়িটা খুলে নিল।‌ তারপর সামিনের দিকে তাকাল। সামিনের হাতে কোনো ঘড়ি নেই দেখে রাহার কব্জি থেকে ঘড়িটাও খুলে ফেলল।রাহা আর আদি দুজনেই বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— এই! কী করছ?
কোনো উত্তর দিল না নীল। হাঁটতে হাঁটতেই শুধু বলল,
— মানুষটা আমাদের এত বড় উপকার করল। যাওয়ার সময় ঘড়ি দুটো ওনাকে দিয়ে যাব। বিক্রি করলে কিছু টাকা পাবে।
সবাই অবাক হয়ে শুধু তার চলে যাওয়া দেখল।
কেউ বুঝতেই পারল না—এটা সত্যিই কৃতজ্ঞতা, নাকি নীলের মাথায় আরও কোনো পরিকল্পনা চলছে। কিছুক্ষণ পর হাত-মুখ ধুয়ে নীল ফিরে এল। সবাই তখন খাটের চারপাশে বসে আছে।
রাহা বিরক্ত মুখে বলল,
— কী আজব জায়গা! আমার একদম ভালো লাগছে না। আমাদের চলে যাওয়াই উচিত ছিল।
নিশা মাথা নাড়ল।
— আমারও কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে।
ইরা সম্মতি জানাল।
— জানি না কেন... কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু একটা ঠিক নেই। লোকটা প্রশ্ন বিহীন আমাদের থাকতে দিলো বিশ্বাস হচ্ছে না। 
ঠিক তখনই সেই মহিলা একটা স্টিলের ট্রেতে করে চিঁড়ে ভাজা, সঙ্গে গুড় আর কলসি ভরা পানি এনে সামনে রাখলেন। মমতাভরা গলায় বললেন,
— ঘরে আর তেমন কিছু রান্ধা নাই। এইডা আগে খান। পরে দেখি কী করা যায়।
আদি আড়চোখে কখনও রাহার দিকে, কখনও নীলের দিকে তাকাচ্ছিল। মাথার ভেতর যেন একগাদা প্রশ্ন জট পাকিয়ে গেছে। এদের দু'জনকে এভাবে শান্ত, নিশ্চুপ, পাশাপাশি বসে থাকতে দেখে তার যেন কিছুতেই হিসাব মিলছে না।
রাহা আর নীল দুজনেই আদির সেই অদ্ভুত দৃষ্টি টের পেয়েছে। তবু কেউ মুখ খুলল না। এখানেই বা বলার কী আছে? আদিও শেষ পর্যন্ত কিছু জিজ্ঞেস করল না।
ঘরের ভেতর তখন এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ত নীরবতা। সবাই কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বসেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে চার-পাঁচজন মহিলা ঘরে ঢুকে পড়ল।
এত আকস্মিকভাবে লোকজন ঢুকে পড়ায় সবাই চমকে উঠল। মহিলাদের প্রত্যেকেই শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। শুধু দুটো চোখ দেখা যাচ্ছে। সেই চোখগুলোতেই যেন অদ্ভুত এক কৌতূহল। মুহূর্তের মধ্যেই রাহা, আদি, সামিন, নিশা, ইরা—সবাই সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
শুধু নীল যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবেই বসে রইল। নির্লিপ্ত মুখে আরাম করে চিড়া মুখে তুলছে, যেন চারপাশের অবস্থার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। কমহিলাদের এমন হুড়োহুড়ি দেখে সামিনের মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই তাই মুখ ফসকে ঘরের মহিলা কে বলে উঠলো,
— চাচি... আমরা চলে যাই! আরেকদিন আসব!
সামিনের কথায় ঘরের সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিন নিজেও বুঝতে পারল কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলেছে। অপ্রস্তুত হেসে মাথা চুলকাতেই ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল এক ভারী, গম্ভীর কণ্ঠ—
— আরেক দিনের ব্যাপার পরে হবে। আজ যেহেতু এসেছেন, আপ্যায়ন ছাড়া আপনাদের যেতে দিই কীভাবে?
চলবে... 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন