রৌদ্র_মেঘের_জুটি
#লেখিকা_মহিনি_সুলতানা_মুন
পর্ব : ০১
বিঃদ্রঃ কপি_করা_নিষিদ্ধ
চারিদিকে কেমন অদ্ভুত কোলাহলে পরিপূর্ণ। অথচ এখন রাতের তৃতীয় প্রহর চলছে । কিছু যুবক ছেলেদের অটট্টহাসির শব্দ আসছে আশপাশ থেকে , জোয়া-মদে জমেছে হয়তো। তাদের কাজই তো এটা , সারাদিন ধান্দা-বাজি করে যা টাকা পায় তা রাতের অন্ধকারে নিষিদ্ধ জিনিসে উড়িয়ে দেওয়া ।
বস্তির বাড়িগুলো সাধারণত এইরকম হয় যে এক ঢালা বাড়ি , কোনো বাড়িতে বেড়া নেই, যেকোনো ফাঁক - ফোকর দিয়ে ঘরে ঢোকা যায় ভ্যাঁবসা গন্ধ কেমন একটা বিশ্রী অবস্থা। অথচ এখানে হাজার হাজার মানুষ অবলিলায় বাস করছে।
বস্তির ভেতরে এমন একটি ভাঙাচোরা বাড়ির মাটির বারান্দায় বসে আছে একটি মেয়ে । মেয়েটার কি "ভয় করছে না"?এতো রাতে বস্তির মতো একটা জায়গায় একা বসে আছে ।
“জানে কি ভয় ডর নেই নাকি?” চারিদিকে শেয়ালের মতো জানোয়ার রুপি কতো মানুষের অবস্থান এখানে । তারা তো থাকেই মেয়েটার মতো সুন্দর, পবিত্র ফুলেদের নষ্ট করার জন্য। মেয়েটা কি কিছু বুঝতে পারছে না?
ঘন্টাখানেক আগে যেভাবে বসেছিলো ঠিক সেভাবেই বসে আছে । এতো কিসের চিন্তার মগ্ন যে রাত - বিরাতের পার্থক্য বুঝতে পারছে না। মেয়েটার যেনো ধ্যান, কাল ,সময় সম্পর্কে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
কিছুক্ষণ পরপর সেই ঘর থেকে এক ষাটোর্ধ্ব মহিলা বেরিয়ে এসে মেয়েটিকে দেখে যাচ্ছে। বৃদ্ধ মহিলাটি এবার বসে থাকা মেয়েটির উদ্দেশ্য বললো,,,
কিরে তুই আর কতক্ষন এইহানে বইয়া থাকবি, ঘুমাইতি না। অপর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। কিছু সময় দুইজনের শুধু নিঃশ্বাস এর শব্দ শোনা গেল। বৃদ্ধ মহিলা আবারও বললেন কিরে ছেমড়ি শুনতাছোস না নাকি ?
“আরেকটু সময় থাকি,,,!”
তোর আরেকটু সময় কহন শেষ হইবো , রাত শেষ হইয়া আবার দিন চইলা আইতাছে তাও তোর আরেকটু সময় হয়তাছে না হেএ,,।
_তুই আইছোস আইজকা চৌদ্দ দিন হওয়া গেলো তোরে আমি এক রাইতেও ঘুমাইতে দেহি নাই। “নিজের দিকে তাকাইয়া দেখছোস দিন দিন যে পাটকাঠির লাহান হইয়া যাইতাছোস।” চোখ দুইডার নিচে করা পইড়া গেছে ।
ও মেহেন শুনতাছোস আমার কথাডা , ওঠ না চল ঘরে যাইয়া বইয়া থাক তোর ঘুমাইতে হইবো না তাও তুই ঘরে গিয়া থাক।
বৃদ্ধ মহিলার সাথে মেহেনূরের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই তাও , “মহিলাটি তাকে রক্তের সম্পর্কের মানুষের চেয়েও বেশি আপন করে নিয়েছে"।
এটা কি কম পাওয়া নাকি মেহেনূরের জন্য, যেখানে রক্তের সম্পর্কের মানুষেরা প্রতারক , ধোঁকা দেয় সেখানে এই অচেনা বৃদ্ধ মহিলা তাকে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখছে। অথচ এই কাজটা করার কথা ছিলো আপন মানুষগুলোর।
“কথাগুলো মনে মনে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।” এখন আর কেনো যেনো এইসব বিষয় নিয়ে কাঁদতে ভালো লাগে না। অবুঝের মতো মনে হয় এই বিষয় নিয়ে কাঁদলে ।
বৃদ্ধ মহিলা মেহেনূরের পাশ ঘঁষে বসে কাঁধে হাত রেখে বললেন ,
“আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে তোর মাস্টার তুই কি যেনো কস সার নাকি যাই হোক তোর জামাই তোরে এইহান থাইকা লইয়া যাইবো।” দেখিস তোরে লইতে আইবো আমার মনে হইতাছে । এতদিন তোরে খুঁইজা পাইতাছে না দেইখা লইয়া যাইতে পারতাছে না। তুই দেখিস ঠিক তোরে খুঁইজা লইয়া যাইবো ।
মেহেনূর শুনলো মনোযোগ দিয়ে বৃদ্ধের কথাগুলো,,,
সত্যি যদি এমন হয় তাহলে তার থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার আছে নাকি । অনির্বাণ দাস "তাকে খুঁজবে" , কেনো খুঁজবে সে তো ভালোবাসে না তাকে। এই ভালোবাসার দহনে তো শুধু সেই পুড়ছে, তার ভালোবাসা তো সেই পাষাণ পুরুষ গ্ৰহণ করেনি। “তাহলে তাকে খুঁজবে কিসের আশায় ? কোনো তো কারণ নেই তাকে খোঁজার।”
__^. .^__
দাদা ( বড় ভাইকে বোঝানো হয়েছে) লোকেশন ট্রাক করা যাচ্ছে না । আজ থেকে আরো তেরো দিন আগে ফোনটা খোলা ছিলো তারপর আর এই তেরো দিনে একবারের জন্যও ফোন ওপেন হয়নি।
Shit,,,
আমি যদি প্রথম দিনই ফোন ট্রাক করতাম তাহলে এতো কিছু হতো না । দাদা তুমি একটু শান্ত হও , ডাক্তার তোমাকে "কোনো কিছু নিয়ে উত্তেজিত হতে নিষেধ করেছে" ।
কোনো একটা ব্যবস্থা বের হয়ে যাবে । আমরা বৌদিকে ঠিকই খুঁজে পাবো । তুমি বেশি টেনশন করলে আবার তোমার প্রেসারফল করবে ।
কিভাবে টেনশন করবো না বল , আমি টেনশন করতে না চাইলেও মন যে মানতে চায় না । কিভাবে ঠিক থাকবো বল ?
"ঐ ছোটো পিচ্চি মেয়েটা আজকে আমাকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করাবে আমি কল্পনাতেও ভাবি নি" । কিভাবে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে আমাকে ।
কি ভেবেছে প্রত্যেকবার ছলনা করবে , আর আমি সেটা সহ্য করবো । না এবার শুধু একবার হাতের কাছে পায় তখন বোঝাবো ছলনা কাকে বলে?
“ছলনাময়ী”
একবার ছলনা করে “ বুকের বাঁ পাশ দখল করলো” । এখন আবার ছলনা করছে দূরে চলে যেতে চায়।
যখন তখন কাছে এসে “মায়া” বাড়িয়ে আবার চলে যাবে । কেনো আমাকে কি মানুষ মনে হয় না মেয়েটার । আমার ও তো কোনো অনুরাগ , অনুভূতি থাকতে পারে নাকি ?
ওই ছোটো মেয়েটা তার দাদার মতো কঠিন ব্যক্তিত্বের মানুষের মনে জায়গা করলো কিভাবে সেটাই ভেবে পাই না সৌরভ।
যেখানে তার দাদা প্রয়োজন ব্যাতিত একটা কথার জায়গায় দুইটা কথা বলে না সেখানে সারাদিন বকবক করে বেড়ানো বাচাল মেয়েটা তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়ছে ।
সে কোনোদিন তার দাদাকে এইভাবে ভেঙে পড়তে দেখি নি সে যত বড়ই বিপদ আসুক না কেনো । আর এই মেয়ে কিনা অনির্বাণ দাসের মতো “লৌহমানবকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে”।
"ভালোবাসা মানুষকে"কোথা থেকে কোথায়" নিয়ে যায় বলা দায় "।
মেয়েটাকে খুঁজে পাক সব গল্পই শুনবে সে , তার পানসে মুখো দাদাকে কিভাবে এই মেয়ে "ভালোবাসার বেড়াজালে" আবদ্ধ করলো।
কিন্তু এইসব জানতে হলে যে আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে ।
মেয়েটাকে খুঁজে না পেলে যে তার দাদা বাঁচতে পারবে না। তার জন্য হলেও মেয়েটাকে খুঁজে আনতে হবে যেকোনো মূল্যে।
সৌরভ বাবা তোর দাদাকে বল না খেয়ে যেতে , আমি আজ তেরো দিন ধরে হাজার চেষ্টা করেও খাওয়াতে পারিনাই ।
তুই একটু বলে দেখ না বাবা অনিবার্ণকে একটু খাওয়াতে পারিস কিনা ?
ছেলেটা যে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এই অভাগী, মুখ পোড়া মেয়েটার জন্য আমার ছেলেটার কি অবস্থা হচ্ছে দিন দিন। এই বয়সে কেউ প্রেসারফল করে ওই মেয়েটার জন্য আমার ছেলেটা তাও করেছে।
আমার মনে হয় কি জানিস ঐ ছোটো লোক মেয়েটা আমার ছেলের উপর কোনো কালোজাদু করেছে , নাহলে আমার অনির্বাণ এমন ছিলো না।
সন্ধ্যা রানী দাসের কথায় সৌরভ সতর্কতা মিশ্রিত কন্ঠে বললো মা একথা যদি দাদা শুনতে পায় খাওয়া তো দূরে থাক তোমার সামনেও আসবে না।
অনির্বাণ তো আমার সাথে কথা বলে না । ও মনে করে আমি ঐ অপয়া মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।
তুমি বৌদিকে এমন করে বলছো কেনো মা ? মেয়েটার কি দোষ বলো দাদা যখন মেনে নিয়েছে সেখানে তোমার সমস্যা কোথায়।
যেখানে সংসার করবে ওরা , একসাথে থাকবে ওরা সেখানে আমাদের সমস্যা থেকে লাভ আছে ।
সবসময় "আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে চলে না , বিবেক" বলতে একটা জিনিস আছে সেটা দিয়েও একটু চিন্তা করে দেখো ।
দাদা তো আর অবুঝ না, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে না ।
আর একটা কথা, " অনির্বাণ দাস কখনো খারাপ জিনিস ছোঁয়া তো দূরের কথা সেদিকে চোখ ও মারায় না।”
সৌরভের কথা শুনে সন্ধ্যা রানীর মুখে অন্ধকার নেমে এলো । তবুও তিনি মনে মনে আওরালেন ওই মেয়েকে কোনো অজুহাতেই এই বাড়িতে তুলবেন না।
ততক্ষণে সৌরভ অনির্বাণের রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে , কিছু একটা ভেবে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই ফোনটা বেজে উঠলো।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো “আতিফ”, ফোন রিসিভ করে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে আতিফের কথা শুনে সৌরভ চিৎকার করে বলল,,
কিহহহহহ,,, সত্যি!
সৌরভের এমন চিৎকার শুনে অনির্বাণ রুম থেকে বের হয়ে এসে দেখল সৌরভ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে ।
সৌরভের খুশি যেন ধরে না, ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটি কি এমন বললো যে এতো খুশি সৌরভ ।
এতক্ষণে সৌরভের চোখ পড়ল তার থেকে হাত খানিক দূরে অনির্বাণ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অনির্বাণ কিছু বলার আগেই সৌরভ গিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। অনির্বাণ ও ভাইকে হালকা হাতে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে ,কিছু সময় যেতেই অনির্বাণ অনুভব করলো সৌরভের হাত কাঁপছে সাথে তার কাঁধের কাছটার শার্ট ভিজে গেছে।
সৌরভ কাঁদছে , সেটা বুঝে উঠতে কিছুটা সময় লাগলো অনির্বাণের । কিন্তু কেনো কাঁদছে এই না কেবল ছেলেটা কি নিয়ে চিৎকার করছিলো খুশিতে ।
অনির্বাণ এবার সৌরভকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে সামনে দাঁড় করিয়ে জিগ্যেস করলো,,
“কি হয়েছে ?” এভাবে কাঁদছিস কেনো ?
এই সৌরভ কাঁদছিস কেনো? ততক্ষণে সৌরভের চিৎকার করা শুনে সন্ধ্যা রানীও সেখানে উপস্থিত হয়েছেন ।
ফোনের ওপাশে আতিফ হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে কখন থেকে সেই একটা কথা শোনার পর থেকে সৌরভের আর খেলায়ই ছিলো না কোনো দিকে ।
কখন যে হাত থেকে ফোনটা পড়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সৌরভ ঠিকই পাইনি । এদিকে ফোন কেটে যাওয়ার আতিফ অবাক হলো , পুরো কথাতো না শুনেই ফোন কেটে দিলো যাহ বাবা।
সন্ধ্যা রানী ছোটো ছেলেকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ছেলের কাছে পিঠ , মাথায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করলেন কি হয়েছে বাবা এভাবে কাঁদছিস কেনো ?
সন্ধ্যা রানী ভেবে পায় না ছেলেটা এভাবে কাঁদছে কেনো? ছেলেকে বুকে আগলে নিলেন তিনি। মমতাময়ী পরম যত্নের সাথে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন ,কি হয়েছে বাবা?
_বল কি হয়েছে?
বার বার কল দিলেও সৌরভের ফোনটা বন্ধ দেখালো । ভেবে পেলো না আতিফ এই খুশির খবর শুনে আবার ফোন বন্ধ করে রাখে কে ?
সে তো প্রথমে অনির্বাণের ফোনে কয়েক বার ফোন দিয়েছে কিন্তু বার বার ফোন বেজে কেটে গিয়েছে ,শেষে উপায় না পেয়ে সৌরভকে কল দিয়েছিল আতিফ । এখন এই ছেলেটার ফোনও বন্ধ।
দিশা না পেয়ে আবারও কল করলো অনির্বাণকে আতিফ । ভাগ্যক্রমে এবার ফোনটা রিসিভ হলো।
আতিফের কথা গুলো শুনে অনির্বাণও স্তব্ধ হয়ে গেছে ।
অনির্বাণ যেনো কথা বলতে ভুলে গেলো এদিকে আতিফ নামের ছেলেটা হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। বহুকষ্টে অনির্বাণ বললো আমরা আসছি,,
এটুকু বলতে গিয়ে তার গলা আটকে আসছিল।
To be continue......!!!!