ফন্ট সাইজ:
থিম:
শতাব্দী পেরিয়েও তুমি

১২তম পর্ব

লেখক: জুঁই আক্তার

#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি

#পর্ব১২
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
খাবার টেবিলে আজ তুলকালাম কান্ড। বাড়ির সব ছেলেরা একসাথে খেতে বসেছে। অনেকদিন পর মামাবাড়িতে এসেছে মুগ্ধ, তাই না খেয়ে যাওয়া তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। সে গিয়ে বসল বিষানের পাশে। হালিমা খাতুন যখন সস্নেহে ছেলেদের পাতে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন, ঠিক তখনই উপর থেকে নেমে এলো তৃধা। বেশ খিদে পেয়েছে তার।
কাউকে কোনো পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল। বাড়ির অন্য সব মহিলারা তখনও দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন, আর এই মেয়ে নিঃসংকোচে বসে পড়ল দেখে মুগ্ধ বেশ অবাক চোখে তাকাল। তবে পরক্ষণেই ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সে।
হঠাৎ মুগ্ধর দিকে চোখ পড়তেই তৃধা বলে উঠল, "আরে, মুগ্ধ ভাই?"
মুগ্ধ মিটিমিটি হেসে বিষানের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ, আমিই! বেঁচে আছি এখনও।"
"আপনি কিন্তু আমার ওই খাতাটা দিলেন না! আর আপনার সেই সুন্দর সইটা কোথায় করে দিলেন?" তৃধার প্রশ্ন।
মুগ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই বিষানকে দেখিয়ে বলল, "তোমার কলিজার ভাই তো খাতাটাই ফেলে দিয়েছে!"
শুনেই তৃধা বিরক্তভরা চোখে বিষানের দিকে তাকাল।
পুরো ব্যাপারটা দেখে দাদু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কিসের সই?"
মুগ্ধ কিছু খোলসা করার আগেই তৃধা উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, "আরে দাদু, মুগ্ধ ভাই না দারুণ সই করতে পারে!" মুগ্ধ ওর কথার ঢং দেখে অবাক হয়ে তাকাল। কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তৃধা আবার মন খারাপের ভান করে বলল, "তবে উনি আমাকে সইটা করে দিতে পারেননি..."
"কেন?" দাদুর কৌতূহল বাড়ল।
এবার তৃধা অত্যন্ত করুণ মুখ করে বিষানের বাবার দিকে তাকাল, "চাচ্চু?"
বিষানের বাবা অবাক হয়ে বললেন, "হ্যাঁ মা, বলো?"
তৃধা ধুরন্ধর এক অসহায় সুর তুলে বলল, "বিষান ভাইয়া আমার সবকটা খাতা ফেলে দিয়েছে!"
খাবারের মাঝপথেই বিষান এমনভাবে কেশে উঠল যেন গলায় খাবার আটকে গেছে! আর মুগ্ধ মুখ চেপে ধরে হাসি সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
বিষানের বাবা কড়া চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন, "কী রে বিষান, তুই কি এখনও ছোট আছিস নাকি? সারা দিন মেয়েটার পেছনে লেগে থাকিস!"
বিষান চোখ পাকিয়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠল, "আমি তো তোর একটাই খাতা ফেলেছি! বাকি খাতাগুলোর কী হলো?"
তৃধা একেবারে নিষ্পাপ একখানা মুখ বানিয়ে বলল, "ওইগুলো তো শেষ হয়ে গেছে, এটাই তো শেষ খাতা ছিল!"
বিষানের বাবা নরম গলায় তৃধাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "আহা মা, তুই কেঁদো না। আমি আজকেই তোকে অনেকগুলো নতুন খাতা এনে দেব। ওই বদমাইশটার কথা শুনতে হবে না, তুই শান্ত হয়ে ভাত খা।"
"ঠিক আছে চাচ্চু..." তৃধা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নিচু করে বলল।
পরমুহূর্তেই মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে সে এক বিজয়ের শয়তানি হাসি দিল! এবার আর মুগ্ধ নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, শব্দ করেই হেসে ফেলল। তৃধাও তার হাসিতে যোগ দিল।
খাওয়ার মাঝপথে তৃধা আবার হালিমা খাতুনকে ডেকে বলল, "চাচি!"
"হ্যাঁ, বল?"
"আমি ওই লেগপিসটা খাব!"
"তো খা! তোকে কে বারণ করেছে?" হালিমা খাতুন হেসে বললেন।
তৃধার এই চটপটে রূপ দেখে মুগ্ধ শুকনো এক ঢোক গিলল। তারপর বিষানের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
 "এটা সত্যি সেই নন্দ্রিতা তো? ও না ঘর থেকেই বের হতো না কখনো? এত বদলে গেল কী করে?"
বিষান খেতে খেতেই বিরক্ত মুখে বলল,
 "আমাকে ফাঁসানোর নতুন সব ফন্দি! আর কিচ্ছু না।"
মুগ্ধ অবাক হয়ে বলল, 
"ফন্দি হলেও এতদূর?"
"হ্যাঁ, ওর দ্বারা এখন সবই সম্ভব!" বিষান বিরতিহীনভাবে বলে গেল।
ওদের এই গোপন আলোচনার দিকে তৃধার অবশ্য কোনো খেয়াল নেই। সে আপন মনে, বেশ তৃপ্তি নিয়ে নিজের মতো খেয়ে যাচ্ছে!
—
দুই দিন ধরে তৃধা চরম মনসুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। আনন্দের মহাসাগরে ডানা মেলে ভাসবে না-ই বা কেন বল তো? পুরো একটা লেখা গল্পের চিত্রনাট্য আর করুণ ট্র্যাজেডির মোড় এভাবে ক’জন মানুষ বদলাতে পারে?!
আর সবচেয়ে বড় কথা,ইফতেখার বিষাণ সরকারের মতো একটা পাষাণ ও কঠিন স্বভাবের লোক, যে কি না কারো কোনো কথাই কানে তোলে না, নিজের ছাড়া আর কারো মতামতকে পাত্তাই দেয় না... সেই লোকটাকে নিজের ইশারা আর বানানো নাটকে এক পায়ে নাচিয়ে ছেড়েছে! তাকে পেটের ব্যথার ভুয়া রোগ দেখিয়ে হাসপাতালে আটকে রেখেছে, আবার শেষমেশ নিজের মিষ্টি কথায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সেই রক্তক্ষয়ী মিটিংয়ে যাওয়া পর্যন্ত বাতিল করিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয়েছে! এর চেয়ে অবাক করা, রোমাঞ্চকর আর বিশাল কৃতিত্বের কথা তৃধার জীবনে আর কী-ই বা হতে পারে, বলো?!
কিন্তু... এই বিজয়ের পরম আনন্দের সাগরে ভাসতে ভাসতেই হুট করে একটা রূঢ় ও বরফশীতল বাস্তবতা তৃধার মাথার ওপর ঠাস করে এসে আছড়ে পড়ল।
গল্প না হয় সে কোনোমতে বুদ্ধি খাটিয়ে বদলে দিল, রক্তারক্তি থেকে বিষাণকে বাঁচিয়েও দিল... কিন্তু তারপর কী?!
সে কি শেষমেশ তার নিজের চেনা ও আসল জগতে ফিরে যেতে পারবে?
যদি ফিরেই যেতে হয়, তবে কীভাবে যাবে? আর কোথায়ই বা যাবে? ধ্যাৎ! কেন যে সেদিন রাতে অত আরামে ঘুমিয়ে পড়তে গেলাম!
তৃধার মাথায় এখন একের পর এক দুশ্চিন্তার জটিল জট পাকাতে শুরু করেছে। এই বইয়ের দুনিয়ার গল্প বদলে নিজের আদেও কী লাভটা হলো, যদি সে তার নিজের চেনা মানুষগুলো, নিজের ঘরবাড়ি আর বাস্তব দুনিয়ায় ফিরে যেতেই না পারে?! আর নিজের চেনা সেই চেনা জগতে ফিরতে হলে তাকে নিশ্চয়ই বসে থাকলে চলবে না, কিছু না কিছু তো করে যেতেই হবে!
এসব আকাশ-পাতাল ভাবনা মাথায় নিয়ে আকুল ব্যাকুল হয়ে সে রুম থেকে বাইরে বের হলো।বের হতেই চোখে পড়ল,রিধিকা ভাবি কৌতূহলী চোখে তার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে।
তৃধা ভ্রূ কুঁচকে শুধাল, 
"কী হলো?"
ভাবি একটু কাছে এসে সংশয়ের সুরে বলল, 
"মানে... দুই দিন ধরে তোকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে রে!"
তৃধা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, 
"কী?!"
"হ্যাঁ! বিষাণ এমন কী করল যে দুই দিন ধরে তোর মুখের ওই চওড়া হাসি আর কমছেই না?"
তৃধা সামনে সামান্য ঝুকে বেশ রহস্যময় ও নিচু স্বরে বলল, 
"উনি কিছু করেনি ভাবি, যা করার তা আমিই করেছি!"
ভাবি চোখ বড় বড় করে বলল,
 "কী?!"
"হ্যাঁ!"
"কী করেছিস তোরা এত রাত পর্যন্ত, হ্যাঁ?"
তৃধা এবার একদম চরম লাজুক কনের ভাব ধরে ওড়নার কোণা টেনে নিজের মুখটা অর্ধেক ঢেকে ফেলল। তারপর কৃত্রিম লজ্জায় গলে গিয়ে বলে উঠল, 
"ইশশশ! এসব কথা এভাবে মুখে বলে নাকি?! লজ্জা! ভীষণ লজ্জা!"
ভাবি মহাবিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
 "তোরা এসব কাণ্ড ঘটাতে পারিস, আর আমি শুধু জানতে চাইলেই দোষ, তাই না?!"
তৃধা মনে মনে শব্দ করে হেসে উঠল,‘এই মহিলাগুলো জীবনেও শুধরাবে না! এদের মনটা এত ডার্ক!ছি! শেষে কিনা আমাকেও বিশ্বাস করতে পারছে না!ভাবছে আমরা অন্য কিছু করে বসে আছি!’
ভাবি পেছন থেকে আবার হাঁক দিয়ে ডাকলেও তৃধা আর সেদিকে কান দিল না, সোজা বাড়ির উঠান পার হয়ে বাইরে খোলা বাতাসে বেরিয়ে গেল।
রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে দু-পাশে হাত দুলিয়ে হেঁটে হেঁটে চারপাশের গ্রাম্য রূপ আর অচেনা পরিবেশটা খতিয়ে দেখতে লাগল সে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার এই অঞ্চলটায় একটা জিনিস বড্ড বেশি চোখে পড়ে,অসংখ্য পুকুর আর ডোবা! একদম চিকন আর সরু একটা ইটের রাস্তা, আর তার দুই পাশে বিশাল বিশাল সব টলটলে পানির পুকুর। পুকুরে পানির গভীরতা আসলে বেশি নাকি কম, তা দূর থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় চোখ দিয়ে মাপা বড্ড দায়!
হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের শান্ত পুকুরের পানির দিকে তাকাতেই তৃধার মাথায় হুট করে কিছু কে-ড্রামার কথা মনে পড়ে গেল!
কে-ড্রামাগুলোতে তো নায়িকারা পানিতে বা সুইমিং পুলে এক ডুব দিলেই টুপ করে অন্য টাইমলাইনে, অতীত কিংবা ভবিষ্যতে অথবা নিজের আসল চেনা দুনিয়ায় গিয়ে ধপাস করে ল্যান্ড করে!আমার ও কি এমন কিছু হবে?
তৃধা মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত ও আশান্বিত হয়ে ভাবল,
‘হ্যাঁ! একদম তো ঠিক! আমিও কি তবে এই পুকুরের পানির ভেতর ঝাঁপ দিয়ে ডুব দিলেই নিজের আসল বিছানায়, নিজের চেনা ঘরের জায়গায় ফিরে যেতে পারব?! কিন্তু... কিন্তু এক মিনিট! আমি তো আবার সাঁতারই কাটতে জানি না! এবার আমি কী করব?! ধ্যাৎ! লাফ দিয়ে পানির নিচে ডুব মারলে কি সত্যি সত্যি নিজের দুনিয়ায় পৌঁছাব, নাকি জলজ্যান্ত ডুবে গিয়ে সোজা আল্লাহর দরবারে গিয়ে ল্যান্ড করব?! ইশশশ, কী যে হবে আমার আর কী যে করব আমি!’
এসব ভাবতে ভাবতে তৃধা চারপাশে তাকাতেই হুট করে দেখতে পেল, তাদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই একটা বড় পুকুর রয়েছে। তবে এটা একদম পেছনের দিকে। সে বাড়ি থেকে এটা দেখে নি।তৃধা কৌতূহলী হয়ে হেঁটে আবার নিজের বাড়ির পেছনের অংশের দিকে গেল। কিন্তু অবাক কাণ্ড! 
বাড়ির ভেতর থেকে তো পুকুরটা আর দেখা যাচ্ছে না!
"অদ্ভুত তো!",তৃধা বিড়বিড় করল। এত গাছপালা তো ছিল না! তৃধা গাছগুলোর ফাঁক গলে আর একটু ভেতরে ঢুকে গেল। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল বিশেষ সেই জায়গাটি! বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু বাড়ির ভেতরের ঝোপঝাড়ের আড়ালে সুন্দর একটা লুকানো কোণ তৈরি হয়ে আছে। আরও ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল সিমেন্ট দিয়ে তৈরি সোফার মতো বসার সুন্দর ব্যবস্থা,ঠিক পুকুরের পাড় ঘেঁষে।
তৃধা চারপাশটা ভালো করে দেখে মনে মনে বলল, জায়গাটা কিন্তু বেশ ভূতুড়ে! পুকুরের দিকে এক নজর উঁকি দিয়েই খসখসে গলায় শুকনো ঢোক গিলল সে। জীবনে দেখা সব হরর সিনেমার দৃশ্য একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
"উফ, এই পানিতে তো নিশ্চিত সব আত্মা আর ভূতদের আড্ডা! আমি সব জানি! এই হরর সিনেমাগুলো থেকে আমরা কত কী শিখতে পারি বলুন তো?
 আহা, আপনারা তো আর বলতে পারবেন না, আমিই বলছি,এই পুকুর থেকে যত দূরে থাকবেন, তত দিন সুস্থ আর জীবিত থাকবেন! হি হি!দেখলেন তো, আমি কত বুদ্ধিমান?"
তৃধা নিজেকেই নিজে বাহবা দিল। তবে পুকুরের গা ছমছমে পরিবেশ দেখে ভয়ে আর পেছনে না তাকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটা দিল। কিন্তু ঠিক তখনই শক্ত কোনো একটা কিছুর সাথে ধপাস করে ধাক্কা খেল সে!
"আহহ!",তৃধা ভয়ে চিৎকার করে উঠতে গেল।
কিন্তু চিৎকারটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই একটা শক্ত ও চওড়া হাত এসে তার মুখটা চেপে ধরল! তৃধা ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল। কাঁপা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাস আটকে এলো, আর চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখল দাঁড়ানো লম্বা, চওড়া লোকটাকে।
ধীরে ধীরে শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, 
"বিষাণ ভাই!"
বিষাণ মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিল। তৃধা মাথা নিচু করে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
 "আপনার সমস্যাটা কী বলবেন?"
বিষাণ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, 
"তোর কী সমস্যা?"
"কেন সবসময় আমার পিছে পিছে ঘুরঘুর করেন?"
বিষাণ অবাক হওয়ার ভান করে বলল, "আমি তোর পিছে পিছে ঘুরি?"
"হ্যাঁ! তা না হলে এই নির্জন জায়গায় হুট করে কোত্থেকে আসলেন?"
"আমি?"
"হ্যাঁ!"
বিষাণ একধাপ তার দিকে এগিয়ে আসতেই তৃধা ঢোক গিলে তড়িঘড়ি করে দু-পা পিছিয়ে গেল। তারপর তোতলাতে তোতলাতে বলল,
 "মানে... আমি তো তাই বুঝেছি!"
"এখানে তুই কী করছিস?"
তৃধা আবার ঢোক গিলে বলল,
 
"দেখতে দেখতে চলে এসেছি! আপনি এখানে কী করছেন?"
বিষাণ পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরে ধরাল, তারপর ধোঁয়া ছেড়ে নিরাসক্ত গলায় বলল,
 
"আমি তো এখানেই থাকি!"
তৃধা চোখ বড় বড় করে বলল, 
"কী?!"
"হ্যাঁ, জানিস না?"
"অদ্ভুত! আমি কীভাবে জানব?"
বিষাণ আর কথা না বাড়িয়ে পুকুরের পাড়ে সিমেন্টের তৈরি সেই বসার জায়গাটিতে গিয়ে বসে পড়ল। তৃধা একটু ভেবে নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল, 
"আপনার সাথে জায়গাটা কিন্তু বেশ মিলেছে!"
বিষাণ সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না, তার দিকে তাকালও না। তৃধা আর সামনে এগোল না। যদিও ভয় লাগছিল, তবে আশেপাশে একজন অন্তত মানুষ আছে ভেবে ভয়টা কিছুটা কমল। সে জায়গাটা বেশ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর বিষাণ হাতের সিগারেটটা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরপায়ে পুকুরের দিকে এগোতে লাগল। তৃধা তা দেখে অবাক হয়ে শুধাল, 
"বিষাণ ভাই, কোথায় যাচ্ছেন?"
"চোখে দেখেও আবার জানতে চাইছিস কেন?"
তৃধা পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, 
"পানির রঙটা কেমন সবুজ সবুজ না?"
"পুকুরের পানির রঙ তো এমনই হয়।"
তৃধা আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, 
"তো? এতে কত কোটি জীবাণু আছে আপনি জানেন?"
বিষাণ বিরক্তি নিয়ে তার দিকে একঝলক তাকাল। তৃধা আবার শুকনো ঢোক গিলে হাত নেড়ে বলল, 
"আহা, আমি কিন্তু কিছু বলিনি!"
তৃধা হালকা সাহস সঞ্চয় করে আরও একটু সামনে এসে দাঁড়াল। পুকুরের পানিতে নামার জন্য বাঁশ দিয়ে সুন্দর মইয়ের মতো করে বানানো আছে,সম্ভবত এটা দিয়েই পানির নিচে নামতে হয়। তৃধা হুট করেই মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে বসল,
 
"আপনি কি সাঁতার পারেন?"
বিষাণ মহাবিরক্ত হয়ে তাকাল,এই মেয়েটার সমস্যাটা কী আসলে? তারপর তার দিকে চেয়ে বলল,
 "তোকে সাঁতার কাটা কে শিখিয়েছে?"
"মানে?"
"তোকে সাঁতার কাটা কে শিখিয়েছে বল?"
তৃধা কপালে কোঁচকানো ভাঁজ নিয়ে তাকাল, 
"কে?"
বিষাণ গম্ভীর ধমক দিয়ে বলল, 
"আমি আর কে!"
"ওহ্! আমি সাঁতার কাটতেও পারি?",
তৃধা কৃত্রিম হাসি হাসার চেষ্টা করে বলল, "আপনি না বললে তো জানতামই না! হি হি!"
বিষাণ তার অবুঝ কাণ্ডকারখানার দিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে গায়ের গেঞ্জিটা টেনে খুলে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তৃধা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল! বিষাণ সেদিকে না তাকিয়ে একদম অনায়াসে পুকুরের পানিতে নেমে গেল।
তৃধা আড়চোখে একটুখানি চোখ খুলল। না চাইতেও চোখ দুটো সোজা গিয়ে আটকালো পানিতে নামা লোকটার দিকে! তৃধা মাথায় হাত দিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, তারপর বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে বোঝাতে লাগল,
"কিচ্ছু হবে না তৃধা, শান্ত হও! লোকটা অন্য কারোর, আমাদের না! চোখ মিয়া, তুমি কিন্তু দিন দিন বেশ দুষ্টু হয়ে উঠছ! এভাবে অন্যের বরকে দেখতে নেই! আমরাও একদিন দেখব, যেদিন আমাদের আসল বর আসবে! বুঝলে? হ্যাঁ, আমার সোনা চোখ দুটো বুঝে গেছে, একদম ঠিক!তাই না?"
তৃধা চোখ বন্ধ রেখেই উঁচু গলায় বলে উঠল,
 "বাড়িতে অত বড় কল থাকতে আপনি এই পুকুরে কেন নামলেন?"
"আমার ইচ্ছা!"
তৃধা চরম বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলল, তারপর বলল, "ইচ্ছা! আমাকে নিজের শরীর দেখানোর এত ইচ্ছা না আপনার?"
বিষাণ ভ্রূ টিপে বলল, 
"কে কাকে দেখাচ্ছে?"
"আপনি আমাকে দেখাচ্ছেন!"
"কী দেখাচ্ছি?"
"ঐ যে আপনার... ছি ছি!"
বিষাণ ক্ষীন হেসে বলল, 
"আমার দিন অতটাও খারাপ হয়নি যে তোকে দেখাতে হবে!"
তৃধা রেগেমেগে চেঁচিয়ে উঠল,
 "আপনি কি আমাকে অপমান করলেন?!"
"হ্যাঁ, এখনও বুঝিসনি? তা ঐ 'ছি ছি' মানে কী,?"
“ছি ছি মানে ছি ছি!”
বিষান হাসলো বোধহয়!তবে তৃধা আর কোনো কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর পুকুরের পানির দিকে চোখ রেখে বলল, 
"এখানে কি মাছ আছে?"
"না, থাকার কী আছে?"
"কত বড় বড় মাছ হবে?"
"তোর চেয়ে বড় বড় মাছও আছে।"
তৃধার চোখ দুটো একমুহূর্তে বড় বড় হয়ে গেল! সে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল, 
"তাহলে আপনি পানির নিচে কেন নেমেছেন?! ওরা তো আপনাকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে!"
বিষাণ তাকে কোনো পাত্তাই দিল না। তৃধা যেন ভুলেই গেল সে কোথায় আছে আর কী করছে! সে একদম চিন্তিত কণ্ঠে বলতে লাগল,
 "আপনি জানেন? ঐ যে মনস্টারের সিনেমাগুলোতে কী হয়?"
বিষাণ চুপচাপ পানিতে শরীর ডুবিয়ে রাখল।
তৃধা নিজেই উত্তর দিল,
 "ওখানে কত বড় বড় রাক্ষসে মাছ থাকে, যারা আস্ত মানুষকে গিলে খেয়ে ফেলে!"
বিষাণ তাও চুপ। তৃধা অধৈর্য হয়ে বলল, 
"আপনি কোনো কথা বলছেন না কেন?"
"কী বলব?"
তৃধা মাথায় হাত দিয়ে একটু চুলকাল,আসলেই তো! লোকটাই বা কী বলবে, সে নিজেই তো অনবরত বকবক করে যাচ্ছে!
তারপর হুট করে আবার মুখ ফসকে বলে উঠল, 
"আচ্ছা বিষাণ ভাই, এখানে যদি কোনো কারণে শার্ক (হাঙ্গর মাছ) চলে আসে, তখন কী করবেন?"
বিষাণ চরম বিরক্তি নিয়ে চোখমুখ খিঁচিয়ে ধমকে উঠল,
 
"হাঙ্গর সমুদ্র ফেলে রেখে এই পুকুরে তোর সাথে দেখা করতে আসবে?!"
সেই বিকট ধমকে তৃধা সামান্য কেঁপে উঠল। তারপর সামনে তাকাতেই দেখল, বিষাণ পুকুর থেকে উঠে আসছে। পানি চুইয়ে পড়ছে তার শরীর থেকে। তৃধা শুকনো ঢোক গিলল,পুকুর থেকে উঠে আসা বিষাণের শক্ত-পোক্ত শরীরের খাঁজ আর চওড়া কাঁধ থেকে সে চোখ সরাতে পারল না।
হঠাৎ করেই পেটের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো, যেন শত শত প্রজাপতি ডানা ঝাপটাচ্ছে!
"এ কী হচ্ছে আমার?!",তৃধা নিজের পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ল, দুই হাতে চোখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠার ভঙ্গিতে বলে উঠল, 
"এই লোকটা আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে, আল্লাহ! কী অসভ্য লোক! জীবনে খারাপ কিছু না করে মরে গেলেও, এসব দেখার অপরাধে আল্লাহ আমাকে সোজা জাহান্নামে পাঠাবে! হে আল্লাহ!"
বিষাণ তার দিকে আসতে আসতে বিরক্তি নিয়ে বলল, "সর সামনে থেকে!"
তৃধা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ রেখেই চেঁচাল,
 "আমি সরতে পারব না!"
"তোকে সরতে বলেছি!"
"আমি সরবই না!”
চোখের পাতাদুটো ভারী হয়ে বুজে রাখলো। নিথর নিস্তব্ধতার বুকে তৃধা তখন শুধুই নিজের বুকের ধুকপুকানিটুকু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। হঠাৎই একঝাঁক হিমশীতল জলের স্পর্শ বিঁধে গেল তার চুলে আর গায়ে।
চকিতে আঁখি মেলতেই বুকটা আতঙ্কে হিম হয়ে এলো,একেবারে তার দিকে ঝুঁকে আছে বিষান!
ভয়ের চোটে ধপাস করে ভেজা মাটিতে বসে পড়ল তৃধা। দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল বিষানের উজ্জ্বল, বাদামী এক জোড়া চোখের গভীরতায়। সদ্য স্নান সেরে ওঠা চুল বেয়ে টুপটুপ করে ঝরছে জলকণা। অদ্ভূত তো! মানুষটাকে হঠাৎ এত সুন্দর লাগছে কেন? অসুরের রূপ কি কখনো এমন মুগ্ধকর হতে পারে?
 তবে পরমুহূর্তেই নিজের মনের ওপর বিরক্তি এলো, অসুর আবার সুন্দর হয় কীভাবে?
নিজের মনের এই অচেনাপনায় কেমন যেন অস্বস্তি হলো তৃধার। বিষান কিছু বুঝে ওঠার আগেই, 
নিজের গালে নিজেই কষিয়ে মারল এক জোরদার থাপ্পড়!
বিষান চমকে উঠে এক পা পিছিয়ে গেল। আচমকা এই কাণ্ডে তার গাঢ় ভ্রূ জোড়া কুঁচকে উঠেছে। তৃধা নিজের মাথাটা সজোরে ঝাঁকিয়ে একপ্রকার চেঁচিয়ে উঠল, 
"এই নন্দিতার ব্রেইনটা নির্ঘাত আমার ব্রেইন হ্যাক করে ফেলছে,বিষান ভাই!বের হ আমার ব্রেইন থেকে!"
বিষান এখনও অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তৃধা এবার রাগে ফুঁসে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আপনি... আপনি বারবার আমার সামনে এভাবে উলঙ্গ হয়ে যান কেন, হ্যাঁ?"
"কী?!" বিষানের গলায় চরম আশ্চর্য।
"একদম না জানার ভান করবেন না!বেয়াদব!"
"মানে?"
"লজ্জাশরম কি আল্লাহ আপনাকে এক ফোঁটাও দেননি? নাকি বানানোর সময়ই দিতে ভুলে গেছেন?"
বিষান চোয়াল শক্ত করে এক পা এগিয়ে এলো। তৃধা তড়পে উঠে বলল,
 "আমার কাছে আসার খুব শখ, তাই না আপনার?"
বিষান আবার হেঁটে আরও কিছুটা কাছে এগিয়ে গেল। বিষানের গলার স্বর এবার নিচু কিন্তু কড়া, 
"তোর কাছে আসার খুব শখ আমার? হ্যাঁ?"
তৃধা না ভেবেই পিছাতে যাবে, অমনি টের পেল আর এক পা পেছালেই সোজা অথৈ জলে ঝাঁপ! তার খেল খতম!
বিষান চোখে চোখ রেখে ধমকে উঠল, 
"কী হলো? উত্তর দিচ্ছিস না কেন?"
সে আরও কাছে আসতেই তৃধা ভয়ে আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল,
 "আপনি আমার গায়ে পানি ঢাললেন কেন?"
"আমি কখন পানি দিলাম?"
"ঐ যে! আমি ওখানে বসে ছিলাম!"
বিষান তার দিকে তাকিয়ে বলল, 
"তোকে তো সরতে বলেছিলাম। কিন্তু তুই তো নড়লি না! আমি ওখানকার গাছের ডালে গামছা রেখেছিলাম, তাই জল ছিটেছে।"
তৃধা শুকনো ঢোক গিলে গাছের দিকে তাকিয়ে দেখল,সত্যিই তো! গাছের নিচেই সে বসে ছিল, আর ওখানে কাপড়ও রাখা। তার মানে লোকটা এই কারণেই তাকে সরতে বলছিল? ইশ! অকারণেই কত কী উল্টাপাল্টা বলে ফেলল সে! এবার তো এই লোক তাকে মেরেই ফেলবে!
তৃধা মুহূর্তের মধ্যে মুখটা একদম নিষ্পাপ শিশুদের মতো বানিয়ে ফেলল, 
"আমি... আমি বুঝতে পারি নি। ভুলে গেছি! আপনি তো আসলে অনেক ভালো..."
বিষান সামনে থেকে আরও কাছে এগিয়ে এলো। তৃধার আর পিছে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, পিছে গেলেই সোজা পানিতে পড়তে হবে। সে চরম ভয় পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, 
"আমি সাঁতার জানি না বিষান ভাই! এখান থেকে পড়লে সত্যি মরে যাব, বিশ্বাস করুন!"
বিষান কোনো কথা না শুনেই তৃধার কাঁধে ধরে একটা ধাক্কা দিল। তৃধা চিৎকার করে উঠল, 
"আমি পড়ে যাব, বিষান ভাই! আমি পড়ে যাব! প্লিজ, বুঝুন!"
"পড়ে গিয়ে মরে যাবি!" বিষানের কড়া জবাব।
বিষান আবার একটা ধাক্কা দিতেই তৃধা আর কিছু না ভেবে অন্ধের মতো বিষানকে শক্ত করে ধরে ফেলল। কিন্তু বড় একটা শান্তির শ্বাস নেওয়ার আগেই বিষান চরম বিরক্তিতে ধমকে উঠল,
 "আমার লুঙ্গি ছাড়!"
তৃধা ঠিকভাবে তাকাতেই চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল,
 
"আল্লাহ! আমি কখন এসব করলাম?!"
বিষান তৃধার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে গালে একটা থাপ্পড় দিতেই তৃধা ব্যালেন্স হারিয়ে সোজা পানিতে পড়ে গেল!
তৃধা চেঁচিয়ে কিছু বলার আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেল। বিষান রাগে তীরের দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠল, "ইচ্ছে করছে তোকে পানি থেকে উঠিয়ে একটা আছার মারি!"
কিন্তু হুট করে কিছু একটা মনে হতেই বিষান খটকা খেল। এই মেয়ে পানিতে পড়ে এত চুপ করে আছে কেন?
বিষান সামনে গেল, কিন্তু পানিতে কোনো নড়াচড়া না দেখে অবাক হলো। তারপর রাগে চেঁচিয়ে উঠল, 
"এই নাটক না করে উঠ!"
পানির উপরিভাগ নড়লও না পর্যন্ত!
বিষান রাগে ধমকে উঠল, 
"তোকে বলেছি উঠতে!"
বিষান প্রচণ্ড বিরক্ত হলো, তারপর রেগে চিৎকার করে উঠল, 
"এই মেয়ে! এবার না উঠলে আমি তোকে আক্ষরিক অর্থেই জ্বালিয়ে ফেলব!"
নন্দ্রিতা উঠল না। বিষানের আরো রাগ বাড়ছে,এবার বিষান আর কিছু না ভেবে সোজা আবার পানিতে ঝাঁপ দিল!
পানির নিচে তৃধা ছটফট করতে চাইল, কিন্তু না চাইতেও পানি সোজা পেটে চলে যাচ্ছে। তার মূল সমস্যা হলো সে একদম শ্বাস আটকে রাখতে পারে না! পুরো শরীরে তীব্র ঠান্ডা লাগছে, শ্বাস আসছে না, বুক ফেটে যাওয়ার মতো কষ্ট হচ্ছে। ভয়টাও চেপে বসেছে চারপাশ থেকে। এই জায়গাটা কেমন যেন সব ঘোলাটে লাগছে, মনে হচ্ছে সে মরে যাচ্ছে!
তাহলে কি সে সত্যি সত্যি মরে যাচ্ছে? সে কি আর কোনোদিন নিজের চেনা জায়গায় ফিরে যেতে পারবে না? নাকি তার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে?
'আমি মরে যাচ্ছি, কেউ বাঁচাও!',তৃধা মনে মনে চিৎকার করলেও তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হচ্ছে না। এই গভীর পানির ভেতর কে শুনবে তার আকুতি? তবে কি এবার সত্যিই কিছু বদলাবে?
হুট করেই তৃধা দেখল, এই ঘোলা পানির ওপর দিক থেকে একটা আলো নেমে আসছে! তৃধার শ্বাস আটকে আসছিল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, সে তার অসাড় হাতটা বাড়িয়ে দিল ওপর থেকে আসা সেই আলোটার দিকে! তৃধা তার নিস্তেজ হাতটা ওপরে বাড়াতেই কেউ একজন পানির গভীরতায় শক্ত করে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল! পানির অতল গহ্বরে তৃধার আর কোনো কিছু স্পষ্ট মনে রইল না, ধীরে ধীরে তার পুরো চেতনা হারিয়ে গেল ঘোর অন্ধকারে...
বিষাণ তার হাত ধরে সজোরে একটা টান দিতেই তৃধা পানির ভেতরের প্রবল টানে ভেসে উঠে সোজা বিষাণের চওড়া বুকের ওপর এসে ধাক্কা খেল। বিষাণ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তাকে এক টানে পানির ওপর তুলে আনল। তৃধার নিষ্প্রাণ, ঢলে পড়া শরীরটা এক হাতে আগলে ধরে বিষাণ ওর ভিজে যাওয়া মুখটা চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
"এই নন্দ্রিতা! চোখ খোল বলছি!"
তৃধার তখনো কোনো হুঁশ নেই, হাত-পা একদম নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে। বিষাণ ক্ষণিকের জন্য ভীষণ ঘাবড়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তার মেজাজ তিরতির করে সপ্তমে চড়তে শুরু করল। সে নিজে সাঁতার শেখানোর পরও এই মেয়ে এমন ফালতু আর দায়িত্বজ্ঞানহীন নাটক করতে গিয়ে একদম সত্যি সত্যি মরতে বসেছিল! সত্যি, ইচ্ছে করছে তাকে এখনই পানি থেকে তুলে আবার একটা সজোরে আছাড় মারতে!
বিষাণ ডাঙার কাছে এসে তৃধার পেটে হাত দিতেই চমকে উঠল। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই মেয়ে এত পানি কখন পেটে পুরল?! বিষাণের মাথার রগ রাগে আর দুশ্চিন্তায় ফুলে উঠছে, সে ভেবে পাচ্ছে না এই আজব আর বিপদের খনি মেয়েটাকে নিয়ে সে এখন কী করবে!
বিষাণ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে তৃধাকে পাঁজকোলা করে পুকুর থেকে ডাঙায় তুলে নিয়ে এলো। তৃধার পুরো শরীর ততক্ষণে শীতে আর পানিতে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে, আর পেটে জমে আছে জলজ্যান্ত এক পুকুর পানি। বিষাণের রাগের মাথায় আবার ইচ্ছে করছিল ওকে তুলে পানিতে ফেলে দিতে, কিন্তু এখন রাগ সামলে ওকে বাঁচানোটা বেশি দরকার!
সে তৃধাকে ভেজা মাটিতে শুইয়ে পেটে হালকা চাপ দিয়ে দেখল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না,পেট থেকে পানি বের হচ্ছে না। বিষাণ আর কোনো উপায় না দেখে নিজের হাতের দুটো আঙুল সরাসরি তৃধার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে গলার কাছে চাপ দিল। সাথে সাথেই তৃধা কাসতে কাসতে এক গাদা পুকুরের পানি বমি করে দিল! বিষাণ আবার একই কাজ করল, তৃধা ওক তুলে আবারও একরাশ পানি ছেড়ে দিল।
বিষাণ শুধু বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল,এই পুঁচকে মেয়েটা কীভাবে এত পানি গিলে বসে আছে! নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে একাকার হয়ে পানি বের হতে লাগল। এভাবে বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর শেষমেশ পেটের ভেতরে আটকে থাকা সবটুকু পানি বের হয়ে এলো।
বিষাণ তৃধার ভেজা গাল দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরল, তারপর ওর মুখের কাছে ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"এই নন্দ্রি, এই,চোখ খোল বলছি! এত সহজে আমার কাছ থেকে তুই রেহাই পেয়ে যাবি?!স্বপ্নেও না!"
তৃধার শরীরে তখনও কোনো সাড়াশব্দ নেই, সে অচৈতন্য হয়ে পড়ে রইল। বিষাণ আর এক মুহূর্তও না সময় নষ্ট করল না, দাঁড়িয়ে তৃধাকে শক্ত করে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল।
—
প্রায় দুই দিন পর,
তৃধা ধীরে ধীরে চোখের পাতা দুটো মেলল। ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই সে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল,কব্জিতে ক্যানুলা দিয়ে স্যালাইন চালানো হচ্ছে। একরাশ চরম বিরক্তি আর অস্বস্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল সে।
ঠিক তখনই সামনে বসে থাকা শিরিন তৃধাকে নড়াচড়া করতে দেখে যেন খুশিতে একপ্রকার আত্মহারা হয়ে গেল! তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বলে উঠল,
"আফা! আপনে ঠিক আছেন তো?!"
তৃধা শুকনো গলায় খুবই ধীরস্বরে বিড়বিড় করে শুধাল, 
"কী...?"
"আরে আফা, আপনে তো পুকুরের পানিতে পইড়া গেছিলেন! ভুইলা গেছেন নাকি?!"
শিরিনের মুখ থেকে ‘পুকুরের পানি’ শব্দ দুটো শুনতেই তৃধার মনে কালচে সেই ঘোলা পানির দৃশ্যটা ভেসে উঠল। সেই পুকুরের পানি যে তার পেটে ঢুকেছে,কথাটা মাথায় আসতেই তৃধার গা গুলিয়ে উঠল! সে তক্ষণি ওক তুলে বমি করে ফেলল। তবে গত দুই দিন ধরে না খেয়ে অনবরত শরীরে স্যালাইন চলায় পেট থেকে পানির বদলে শুধু পিত্তরস বের হলো!
শিরিন ভীতি আর আনন্দে চিৎকার করে দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। নিচের দিকে মুখ করে চেঁচিয়ে বলতে লাগল,
"চাচি গো! আফা জ্ঞান পাইছে! আফা বমি করতাছে, তাড়াতাড়ি আসেন!"
তৃধা মুখ মুছে বেশ কষ্ট করে উঠে বসল। দুর্বল শরীরটা ভেঙে আসছে, তাও সে নিজের দিকে তাকাল। হুট করেই তার মনে পড়ে গেল পুকুরের অতল জলে হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের কথাগুলো। হাতের স্যালাইনের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল,কব্জির ঠিক ওপরে একটা ছোট কালো তিল!
তৃধা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। অবাক হয়ে মনে মনে ভাবল, *‘আরে! আমারও তো ঠিক এই জায়গাটাতেই একটা তিল ছিল!’*
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে নিজের জামাটা হালকা একটু নিচে টেনে ধরল। অবাক কাণ্ড! বুকের এক পাশেও ঠিক একই জায়গায় একটা কালো তিল জ্বলজ্বল করছে!
তৃধা এবার আর স্থির থাকতে পারল না। দ্রুত নিজের পায়ের সেলোয়ারটা টেনে হাঁটু পর্যন্ত তুলল। কালশিটে পড়া হাঁটুর নিচে একই দাগ, আরেক পায়ের হাঁটুতে ঠিক একই জায়গায় চেনা তিলটা! তৃধার সন্দেহ আরও গাঢ় হলো। সে কাঁপা কাঁপা হাতে সেলোয়ারটা আরও কিছুটা টেনে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত তুলতেই মহাবিস্ময়ে থমকে গেল,সেখানে তার সেই জন্মদাগটা অবিকল একই রূপে বিদ্যমান!
তৃধার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। বুকটা ধড়ফড় করতে লাগল অচেনা এক আশঙ্কায়।
*‘অদ্ভুত তো! নন্দ্রিতার সাথে আমার এত হুবহু মিল কীভাবে হওয়া সম্ভব?! তিল, দাগ,সবকিছু এমন একই জায়গায় কীভাবে থাকে? আসলে এখানে কী ঘটছেটা কী?!’*
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন