#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি
#পর্ব১৭
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
তৃধার রেডি হওয়া শেষ হলে তাকে নিয়ে নিচে নামানো হলো। তৃধার কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। নিজের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলে ওঠে,
"এটা আমার বডি না, তাও আমার এমন লাগছে কেন? কেমন কান্না পাচ্ছে! বুকটা কেমন কাঁপছে!মনে হচ্ছে নিয়ে হয়ে যাচ্ছে!"
হুট করে তৃধার মনে হলো, বিষাণ ভাই থাকলে হয়তো কিছু একটা হতো! তারপরই তার মনে পড়ে গেল, উনি থাকলে তো খুশিই হতেন! ভালোই হয়েছে উনি নেই। তৃধা ঘামে ভেজা মুখটা হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুছে বলে ওঠে,
"এত কিছুর পরও আমি কেন উনার কথা মনে করছি?"
তৃধা সামনে যেতেই হালিমা খাতুন তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠে বললেন,
"সালাম দেও!"
তৃধা কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে সালাম দিল। সামনে তাকিয়ে দেখল, দুজন মহিলা আর তিনজন পুরুষ বসে আছে। তার ঠিক সামনে একটা ছেলে বসেছে। তৃধার হুট করেই বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে শুকনো একটা ঢোক গিলল, আজকের মতো শিক্ষা হলে আর জীবনেও এমন জায়গায় এসে বসবে না!
পাশে থাকা মহিলাটি বলে উঠলেন,
"কী গো, তোমার নাম কী?"
তৃধা মাথা উঁচু করে বলল, "নন্দ্রিতা সরকার!"
মহিলাটি কিছু বলার আগেই বাড়িতে ঢোকে বিষাণ। ঢাকা থেকে মাত্রই বাড়িতে এসেছে! নন্দ্রিতাকে এভাবে সাজুগুজু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভ্রূ কুঁচকে গেল। আরও অবাক হলো তার গায়ে নীল রঙের শাড়ি দেখে! এমনভাবে সেজে দাঁড়িয়ে আছে কেন বলদটা?
তৃধার পা দুটো যে কাঁপছে, সেটা তৃধাকে দেখেই বুঝে ফেলল বিষাণ। বিষাণ সামনে এলেও তৃধা খেয়ালই করল না, সে মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইল। বিষাণ চুপচাপ কোনো কথা না বলে সোফায় গিয়ে বসে পড়ল। বিষাণকে আসতে দেখে আজহার আর আকবর সরকার দুজন দুজনের দিকে তাকালেন। মফিজুর সরকার দেখেও কিছু বললেন না!
মহিলাটি তৃধার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
"তা, একটু হেঁটে দেখাও তো!"
তৃধা চরম অবাক হয়ে তাকায়। বিষাণ চুপচাপ বসে দেখছে। তৃধা বিরক্তি নিয়ে মাথা তুলল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। হালিমা খাতুনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা হেঁটে দাঁড়াল।মহিলাটি আবার দাঁড়িয়ে থেকে বলে উঠলেন,
"তোমার জুতো দুটো খোলো তো!"
"কী?"
"বুঝনি?"
তৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুতো খুলে ফেলল। মহিলাটি এবার মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলেন,
"মেয়ে তো অনেক খাটো দেখছি!"
তৃধার এবার আরও রাগ উঠে গেল! এই মহিলা তার বডি শেমিং করছে কোন সাহসে?! মহিলাটি আবার সামনে এগিয়ে এসে তৃধাকে না বলে তার মাথা থেকে শাড়ির আঁচল সরিয়ে ফেললেন। তৃধা অবাক হয়ে তাকায়, এই মহিলা আবার কী করছে?! মহিলাটি তার মাথার চুলগুলো সব খুলে দিল। তৃধার রাগে পুরো শরীর কাঁপছে। বিষাণ তখনও চুপ করেই বসে আছে!
মহিলাটি চুলগুলো দেখেও কিছু বলল না, গিয়ে বসে পড়ল। কিন্তু তৃধাকে বসার কথাও বলছে না! তৃধার বিরক্তিতে এবার কান্না পেয়ে যাচ্ছে, কী অসভ্য জাতি! সে বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।মহিলাটি এবার আরামে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে উঠলেন, "কী কী রাঁধতে পারো?"
তৃধা কিছু বলার আগেই হালিমা খাতুন বলে উঠলেন, "সব রান্না করতে পারে!"
তৃধা চরম অবাক হয়ে হালিমা খাতুনের দিকে তাকাল। উনি কী বলতে চাচ্ছেন? আমি তো কিছুই পারি না!
মহিলাটি আবার বলে উঠলেন,
"একটা সূরা কও তো মা!"
তৃধার রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার জোগাড়! সে তাও ধীরে ধীরে বলে উঠল, "সূরা ফাতিহা।"
মহিলাটি এবার আবার তৃধার দিকে এগিয়ে এলেন। তৃধা ঢোক গিলে একটু পিছিয়ে গেল। মহিলাটি তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নিজের ছেলের দিকে ইশারা করলেন!তৃধার এখন ভীষণ ঘৃণা লাগছে! এটা কোন ধরনের আচরণ? সে কি কোন গরু ছাগল নাকি?! অসহ্যকর মহিলা সমাজ! ঘৃণা হয় এদের ওপর!
মহিলাটি হুট করে উঠে দাঁড়ালেন, মফিজুর সরকারও সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন। মহিলাটি বলে উঠলেন, "আজকে আমরা আসি, অন্য দিন আবার আসব!"
দাদু শান্ত গলায় বলে উঠে,
“তো,কিছু না বলেই চলে যাবেন?
“হ্যাঁ,আমাদের আজকে একটা কাজ আছে! পরে জানিয়ে দিবো আমরা!
দাদু কিছু আর বললেন না!তবে তৃধা এবার আর চুপ থাকল না! সে সোজা বলে উঠল,
"কোথায় যাচ্ছেন? দেখা তো শেষ হয়নি আন্টি!"
মহিলাটি ভ্রু কুঁচকে বলে উঠে,
"না, দেখা তো আমাদের শেষ!"
মহিলা সহ বসে থাকা সবাই তৃধার দিকে তাকাল। বিষাণ পকেট থেকে সিগারেট বের করে হালকা হেসে মুখে দিল। তৃধার সেদিকে মোটেও খেয়াল নেই! সে হালকা হেসে বলে উঠল,
"আপনারা দেখেন, এখন আমরা দেখব না?"
"মানে...?"
"আপনার ছেলে কী করে? রান্না করতে পারে? পড়াশোনা কতটুকু করেছে? উচ্চতা কত ফুট? ঠিকমতো হাঁটতে পারে তো? আপনার ছেলে নাচতে পারে তো? আমার আবার ২৪ ঘণ্টায় ৪৮টা মুড সুইং হয়, তো সে কি সামলাতে পারবে?"
মহিলা ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। তৃধা থামলো না, বলতে লাগল,
"ওহ, ভুলেই গেছি! আপনারা তো এসব বুঝবেন না! আমার মেজাজ আপনার ছেলে সামলাতে পারবে তো? আমার মেজাজ কিন্তু সেকেন্ডে সেকেন্ডে চেঞ্জ হয়, পারবে তো সামলাতে? আর শুনুন, আমি কিন্তু রান্না করতে পারি না!"
হালিমা খাতুন তড়িঘড়ি করে তৃধার হাত ধরে পেছনের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করলেন। তৃধা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠল,
"আরেকটা কথা তো জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি! আপনার ছেলের ওপর দিয়ে তো সবই দেখলাম, শারীরিক সক্ষমতা আছে তো আপনার ছেলের? নাকি ওসবও সব অচল? আমি কিন্তু এটা বলতে চাইনি, তবে আসার পর থেকে আপনি একটাই সব কথা বলছেন আপনার ছেলে শুধু বসে আছে! আমি সাফ বলে দিচ্ছি, শারীরিক অক্ষমতা যে ছেলের আছে, আমি তাকে কিছুতেই বিয়ে করব না! আমারও তো একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে, তাই না?"
বিষাণ হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে গলার স্বর নিচু করে বলে উঠল,
"হ্যাঁ, বুঝেছি। এখন ঘরে যা!"
হুট করে বিষান এর আওয়াজ শুনে তৃধা কেঁপে উঠে পাশে তাকাল। লোকটা কখন এলো?! সে তো খেয়ালই করেনি! সে দাদুর রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে ঢুক গিললো,রাগের মাথায় অনেক বলে ফেলেছে!সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর সাহস পেল না। এক দৌড়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল!
দাদু কিছু বলার আগেই বিষাণ তাদের দিকে তাকিয়ে সটান বলে উঠল,
"আপনারা এখন আসতে পারেন!"
মহিলারা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না, রাগে গজগজ করতে করতে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় অবশ্য বিষাক্ত গলায় বলে গেলেন, "আপনাদের বাড়ির মেয়ে তো চরম বেয়াদব!"
দাদু আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা নিজের রুমে গিয়ে ধপ করে দরজা লাগিয়ে দিলেন। বিষাণও আর দাঁড়াল না, চটপট উপরে নিজের ঘরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর বিষাণ জরুরি কাজে রুম থেকে তড়িঘড়ি করে বের হতে যেতেই তৃধার সাথে ধাক্কা লাগতে লাগতে বেঁচে গেল! বিষাণ বিরক্তি নিয়ে চোখমুখ কুঁচকে ধমকে উঠল,
"কিরে! এত দৌড়াদৌড়ি করছিস কেন?!"
তৃধা নিজের নীল শাড়ির কুঁচিগুলো এক হাতে সুন্দর করে ধরে, নিষ্পাপ মুখে বিষাণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
"আপনাকেই তো খুঁজছিলাম!"
"কী?"
"হ্যাঁ!"
"কেন?"
তৃধা মুখে একটা শয়তানি আর দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল, "আপনার ফোনটা একটু দিবেন!?"
"কেন?"
"ছবি তুলব! এত কষ্ট করে এত সুন্দর করে সেজেছি, একটু ছবি তুলব না? স্মৃতি হিসেবে রেখে দেব!"
বিষাণ বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
"ওই ছেলের সাথে দেখা হওয়ার স্মৃতি?"
তৃধা মুখ কুঁচকে বলে উঠল,
"কী যে বলেন না! ওই মামাস বয়কে কে মনে রাখবে, হ্যাঁ?!"
বিষাণ ভ্রূ কুঁচকে শুধাল,
"কী? মামাস বয় মানে কী?"
তৃধা দাঁত বের করে তটস্থ হয়ে বলল,
"মায়ের অতি-ভক্ত!"
কথাটা শুনে বিষাণের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
"তা দাদু তো এখন চরম রেগে আছে! এবার কী করবি?"
তৃধা হালকা চালে বলল,
"যেটা হওয়ারই ছিল না, সেটা নিয়ে রেগে গেলে আমি আর কী করতে পারি, বলুন?"
"মানে?"
“বিয়ে হতো না!”
“তুই কি করে বুঝলি?”
তৃধা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে উঠল,
"আমার গায়ের রং যে এই জঘন্য সমাজের জন্য বেশ ময়লা! তাই!"
বিষাণ অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"ময়লা গায়ের রং?!"
"হ্যাঁ, এই ঘুণে ধরা সমাজের বিচারে বেশ ময়লাই! সব পুরুষের মতো তারাও ধবধবে ফর্সা নারী খুঁজছেন।"
"তুই কী করে জানলি?"
"ওদের লালসাভরা চেহারা দেখেও কি আপনি বোঝেননি? আমি অবশ্য প্রথম দেখাতেই বুঝে গেছি!"
বিষাণ ভ্রূ কুঁচকে একটু সময় নিয়ে বলল,
"এত বুঝিস কবে থেকে?”
তৃধা কিছু বলল না,বিষান আবার বলে উঠল,
“তা সব পুরুষই যদি খারাপ হয়, আর সবাই যদি ফর্সা চামড়ার অপেক্ষাতেই বসে থাকে... তাহলে তুই বলছিস তুই বিয়ে করবি না?"
তৃধা ফিক করে হেসে ফেলল,
"কী যে বলেন! অবশ্যই করব! আমাকে যার জন্য তৈরি করা হয়েছে, তার চোখে আমিই হব সবচেয়ে সেরা সুন্দরী! তার সামনে হাজারটা সুন্দরী নারী থাকলেও তার ব্যাকুল চোখ শুধু আমাকেই খুঁজবে! আর বাকি সবাইকে তার কাছে একবারে ফিকে মনে হবে!ঠিক এমনই হবে আমার উনি!"
বিষাণ হালকা চোখ ছোট করে বলল,
"এত কনফিডেন্স?!"
তৃধা বিরক্তি দেখিয়ে বলল,
"হ্যাঁ! এবার একটু ফোনটা দিন না, মাত্র দুটো ছবিই তো তুলব!"
বিষাণ তৃধাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একনজর মেপে দেখল। তারপর মুখটা গম্ভীর করে বলল,
"আর কোনোদিন শাড়ি পরবি না!"
"কেন?!"
"জঘন্য লাগছে দেখতে!"
তৃধার মেজাজটা খিঁচড়ে গেল! বিয়েটা ভেঙে গেছে এই খুশিতে মনটা এমনিতেই ফুরফুরে ছিল, আর এই লোকটা এসে সব বিষাদ করে দিল! সে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
"তাহলে,এখন থেকে তাহলে রোজ শাড়ি পরে আপনার পিছু পিছু ঘুরব, দেখে নিয়েন!"
বিষাণ সোজা নিজের ডান হাতটা উঁচিয়ে ধমকের সুরে বলে উঠল,
"আমার এই হাতটা কিন্তু তোর গাল খুঁজছে, নন্দ্রিতা! এদিকে আয় তো একটু!"
তৃধা অমনি নিজের দু-গালে হাত চাপা দিয়ে আঁতকে উঠল তারপর তড়িঘড়ি করে বলল,,
"প্লিজ! এমন করবেন না! একটু ফোনই তো চেয়েছি, এতে দোষের কী?!"
বিষাণ হাসল বোধহয়। তারপর পকেট থেকে একটা চকচকে জিনিস বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। তৃধা পরম আনন্দে লাফিয়ে উঠে সেটা নিতে গিয়েই থমকে গেল! তার চোখ দুটো বড় হয়ে কপালে উঠে গেল!
বিষাণ তার এমন ভূত দেখার মতো অবস্থা দেখে ভ্রূ কুঁচকে বলল,
"কী হলো তোর?"
তৃধার মুখ দিয়ে যেন কোনো কথাই বের হচ্ছে না! স্তব্ধ হয়ে গেছে সে! বিষাণের হাত থেকে ঝটপট ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে সে তোতলাতে তোতলাতে চেঁচিয়ে উঠল, "এটা... এটা কোত্থেকে পেলেন আপনি?!"
"কেন?!"
"এটা তো,,,!"
বিষাণ ফোনটার দিকে ইশারা করে গর্বের সাথে বলল, "এটা নতুন এসেছে বাজারে, স্মার্টফোন! বাটন ছাড়াই টাচ করে চলে!"
তৃধা হাতের ফোনটার দিকে তাকিয়ে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এটা তো ওই ২০২৫ সালের ফোনটা! এটা তো তার দাদুর সেই সবুজ রঙের ছোট ফোনটা! এখানে এসে কীভাবে এই ফোন আসলো?!
বিষাণ তৃধাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রূ কুঁচকে বলল,
"কী হয়েছে?"
তৃধা তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল,
"এই ফোন আপনি কোথায় পেলেন?!"
"দেশের বাইর থেকে আনিয়েছি! কেন, পছন্দ হয়নি?"
তৃধা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
"না... ভালোই!"
"আচ্ছা, ছবি তোলা শেষ হলে আমার রুমে রেখে আসিস।"
বিষাণ আর না দাঁড়িয়ে নিজের রুমে চলে গেল। কিন্তু তৃধা যেন পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পাচ্ছিল না। ফোনের স্ক্রিন অন করতেই সে দেখল,সবকিছু একদম হুবহু তার সেই স্মার্টফোনের মতোই সেটিং! কী অদ্ভুত এক মায়াজালে পা দিয়েছে সে?! মাথা ঝিমঝিম করে উঠল তৃধার, ব্যাকুলতায় কান্না পেয়ে গেল তার! কী হচ্ছেটা কী তার জীবনের সাথে?!
কোনো উপায় না পেয়ে তৃধা কাঁপা কাঁপা আঙুলে ঝটপট তার নিজের বাবার নম্বরটা ডায়াল করল। মনে মনে একটা অলৌকিক কিছুর প্রার্থনা করতে লাগল সে। কিন্তু কানে ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে আবার সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
"আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।"
তৃধা একটা গভীর ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফোনটা হাতে নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
‘দেখা যাক সামনে আরও কী কী অপেক্ষা করে আছে!’
—
তৃধা সকালে খেতে বসেছে,সবাই চুপ করে খাচ্ছে,আজ দাদু রেগে আছে! দেখেই বুঝা যাচ্ছে,কিন্তু এখন কি আর করার? এখনও
ওই বেয়াদব মহিলার কথা ভাবলেও গায়ে আগুন জ্বলে ওঠে,কি যে হবে তার!এই রাগ সামলাতে না পারায়, একদিন খুব বড় ঝামেলায় পড়বে সে! সে কোনো মতে খাচ্ছে,খেয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে যাবে স্কুলে! তারা কাজে গেলে আবার চলে আসবে! এটাই ঠিক হবে!নিজেকেই বলে মিটি মিটি হেঁসে উঠল,
“স্কুলে চলে যাব,তারপর আরামে বাড়ি চলে আসবো!”
__
তৃধা আর আবু ক্লাস শেষ করে একদম ক্লান্ত হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। তপ্ত রোদে হাঁসফাঁস লাগছিল, ঠিক তখনই দেখল রাস্তার কোণে এক লোক কুলফি বিক্রি করছে,একেবারে লাল-সবুজ রঙের কাঠের বাক্সে কুলফি! আর একেকটার দাম মাত্র ১ টাকা!
ঝটপট দুটি কুলফি কিনে তৃধা আর আবু খেতে খেতে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর হাঁটতেই তৃধার সামনে হুট করে এক অদ্ভুত দর্শন লোক এসে পথ আটকে দাঁড়াল। আবু পেছন থেকে ফিক করে হেসে উঠে বলল,
"আরে! তোর আশিক আইছে রে!"
তৃধা চমকে উঠে লোকটার দিকে তাকাতেই তার গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেল! এই ছেলের ড্রেসিং সেন্স নিয়ে সে তৃধা কে পটানোর কথা ভাবছে?এত বাজে কেন রে ভাই?! একদম আস্ত বাংলাদেশের পতাকা সেজে এসেছে! সবুজ রঙের এক গেঞ্জির নিচে লাল রঙের চকমকে লুঙ্গি পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা!কি অদ্ভুত!
তৃধা একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আবু পেছন থেকে তড়িঘড়ি করে বলল, "কিরে, চলি যাস ক্যান? কথা কবি না?"
তৃধা চোখ গরম করে আবুকে একটা ধমক দিল, "চুপচাপ নিজের বাড়ি যাও তো মেয়ে!"
আবু ভয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে থমকে গেল, আর একটা কথাও বলল না।পিছনের সেই পতাকা মার্কা আশিক হয়তো পিছু পিছুই আসছিল, তৃধা তাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। একটু শান্তির জন্য বাইরে এসেছিল, কিন্তু এই আশিক নাকি ফাসিক, এসে পুরো মুডটাই নষ্ট করে দিল!তৃধা দ্রুত পায়ে এগোতে থাকলে পেছন থেকে ছেলেটি ব্যাকুল গলায় ডেকে উঠল,
"নন্দ্রিতা!"
তৃধা থামল না, নিজের মতো টানটান পায়ে হাঁটতে লাগল। পাশে আবুই শুধু আড়চোখে তাকাচ্ছিল। ছেলেটি আবার পেছন থেকে বলে উঠল,
"রাগ করছো?"
তৃধার মাথায় যেন বাজ পড়ল! ‘সে রাগ করেছে মানে?!এই লোকের সাথে জীবনে তো কোনোদিন কথা ও বলেনি,তাহলে কেনো রাগ করবে!কী অদ্ভুত মেন্টালিটি!’ছেলেটি আবেগী গলায় বলল,
"আমি বিশ্বাসই করতে পারতাছি না, তুমি আমার চিঠিটা নিছো!"
তৃধা কোনো উত্তর দিল না। ছেলেটি আবার একটু এগিয়ে এসে বলল,
"কথা কও না ক্যান?"
তৃধা আর না পেরে গতির তীব্রতা বাড়িয়ে রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলল,
"নিজের কাজে যান! রাস্তায় অসভ্যতামী না করে সোজা হেঁটে চলে যান!"
"ক্যান?"
তৃধা এবার হুট করে দাঁড়িয়ে গেল। রেগে আগুন হয়ে বলল,
"কেন আবার কী?! রাস্তায় একটা মেয়েকে আপনি এভাবে হ্যারাসমেন্ট করছেন, জানেন না?"
ছেলেটি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
"হারে... কী যে কবা? কিরে আবু, ইডা কী কয়?"
আবু শুকনো ঢোক গিলে চুপ করে রইল। সে নিজেও জানে না এই ‘হ্যারাসমেন্ট’ বস্তুটা আবার কী জিনিস! আর তৃধার রূদ্রমূর্তি দেখে কিছু বলার সাহসও তার নেই।আশিক এবার তৃধার একবারে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল। তারপর গম্ভীর গলায় হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
"আমি কিন্তু সব শেষ কইরা লামু!"
তৃধা চরম অবাক হয়ে বলল,
"কী?!"
আশিক নিজের পকেট থেকে একটা ধারালো চকচকে ব্লেড বের করল! তৃধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে বলে উঠল,
"তুমি যদি আমার লগে প্রেম না করো, আমি এখন নিজ হাতে এই ব্লেড দিয়া হাত কাইটা ফেলমু!"
"মানে?!"
"হ!"
"এখনই প্রেম করো আমার লগে!"
তৃধা বিরক্তিতে একপাশে সরে যেতে যেতে বলল, "আমি করব না!"
"ক্যান করবা না?!"
তৃধা কথা না বাড়িয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ছেলেটি নাছোড়বান্দার মতো আবার সামনে চলে এলো। তারপর অনুযোগের সুরে বলল,
"তুমি আমার লগে এমন করতাছো ক্যান?"
তৃধা এবার একদম চিল- চিৎকার দিয়ে ধমকে উঠল,
"আমার রাস্তা ছাড়ুন!"
"না, চারমু না! আগে কও তুমি আমার লগে প্রেম করবা!"
তৃধা চরম ক্ষোভে বলল,
"মরতে না চাইলে সোজা দূরে গিয়ে দাঁড়ান!"
ছেলেটি বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় গলায় বলল,
"আমি তো মইরা গেছি কবেই!"
"তাহলে সামনে থেকে গিয়ে মরুন!"
"আজকে আবার নতুন কইরা মর্তাম?"
"মানে কী?!"
ছেলেটি ব্লেডটা উঁচিয়ে হিংস্র গলায় বলে উঠল,
"আমি হাত কাইটা ফেলমু, নিজেরে একদম শেষ কইরা লামু!"
তৃধা চ্যালেঞ্জ জানানোর গলায় বলল,
"করুন! দেখি কত বড় সাহস!"
"দেখবা তুমি?"
"হ্যাঁ, দেখান! আমিও দেখি আপনার ভালোবাসার দৌড় কতখানি!"
"সত্যি কইতাছি! আগে কও হাত কাটলে প্রেম করবা?"
"দরকার নেই! সরুন সামনে থেকে!"
সে না সরে আরও একধাপ সামনে এসে হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠল, "তুমি যেমনেই হোক, আমার লগে প্রেম করবা! নইলে কিন্তু আমি হাত কাইটা শেষ কইরা ফেলমু!"
"মরার শখ হলে করুন! আমার তাতে কী?!"
"আমি কিন্তু তোমারে ছাড়া বাঁচতাম না, নন্দ্রিতা!"
তৃধা বাঁকা হেসে দাপটের সাথে বলল,
"তাহলে আপনার আম্মারে বইলেন, আপনার চল্লিশার দাওয়াতটা যেন আমাকে দিয়ে যায়! আমি অবশ্যই যাব!"
তৃধা আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হনহন করে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু ছেলেটি আবার দৌড়ে এসে তার সামনে আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল! তৃধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই,ছেলেটি কোনো কিচ্ছু না ভেবে হাতের তালুতে ব্লেড দিয়ে কষে একটা হেঁচকা টান মারল!
‘সাঁই!’মুহূর্তের মধ্যে তাজা ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে বের হলো! তৃধা আতঙ্কে ও ভয়ে বিকট চিৎকার করে উঠল, “পাগল নাকি?!রক্ত পড়ছে তো! কী করেছেন এটা?!"
ছেলেটি রক্তাক্ত হাত উঁচিয়ে বলল,
"তুমি রাজি না হলে আমি আরও কাটমু!"
"পাগল নাকি আপনি?! হাসপাতালে যান, অনবরত রক্ত পড়ছে!"
"না! আগে বলো তুমি আমার লগে প্রেম করবা!"
"আমি পারব না!"
"তাহলে আমি আবার কাটমু! তুমি আমার না হলে আমি কিন্তু সত্যিই মরে যাইমু! এই দেখো হাত কাটছি, মরে যাব তাও তোমাকেই চাই!"
তৃধা আতঙ্কে পেছন ফিরে দ্রুত পিছু হটতে যেতেই কঠিন কারো বুক আর শক্ত দেহের সাথে ধপ করে ধাক্কা খেল! সে পড়ে যেতে নিলে বড় দুটো হাত চট করে তাকে শক্ত করে ধরে সামলে নিল। তৃধা ভীতিভরা চোখে মাথা তুলে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, বিষাণ ভাই!ভয়ে তৃধার গলার ভেতরে শুকনো ঢোক আটকে গেল! সে দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে আবুকে খুঁজল, কিন্তু মীরজাফরের বংশধর আবু বিষাণকে দেখা মাত্রই যে কোন চিপা দিয়ে পলায়ন করেছে, তার কোনো হদিসই নেই!
বিষাণ কিন্তু তৃধাকে ছেড়ে দিল না, এক ধাক্কায় সোজা একপাশে সরিয়ে দিল! তৃধা ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতেই আছড়ে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ভাগ্যবশত পাশের একটা আমগাছ শক্ত করে ধরে নিজেকে সামলে নিল।
বিষাণের কিছু না বলে ধীর পায়ে এসে আশিকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আশিক রক্ত দেখেও ভয় পায়নি, কিন্তু এই বিষাণকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আতঙ্কে গলার শুকনো ঢোক গিলল! রক্ত পড়ে মরে গেলেও হয়তো বাঁচা যেত, কিন্তু এই আস্ত অপদ টা কোত্থেকে এলো?! এখন তাকে কে বাঁচাবে?!
আশিক কথা না বাড়িয়ে চুপিচুপি সটে পড়ার চেষ্টা করতেই বিষাণ চটপটে এক হাতে আশিকের মুখ আর গাল শক্ত করে চেপে ধরল! অন্য হাত দিয়ে আশিকের হাতের জ্বলন্ত ব্লেডটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠল,
"আয়য়! হাতের সাথে তোর মুখের ফাড়াটাও আজ কেটে দেই! বেশ সুন্দর লাগবে দেখতে!"
ছেলেটি চরম আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে কাঁপা কাঁপা গলায় আকুতি জানাল,
"আমি আর কোনোদিন এমন করতাম না! আমি যাই গা বিষাণ ভাই! ছাইড়া দেন!"
কিন্তু বিষাণ বিন্দুমাত্র নড়ল না! তার চোখের মনি থমথমে, হিংস্র! সে হাতের ব্লেডটা ধীরে ধীরে আশিকের ঠোঁটের কোণে আর গালে বসিয়ে চাপ দিতে শুরু করল!
তৃধা দৃশ্যটা দেখে ভয়ে শিউরে উঠে চিৎকার করে উঠল,
"ইস, কী শুরু করেছেন আপনারা?! আর এই লোক দিনদুপুরে এসব কী করছে?!"
তৃধা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, দৌড়ে গিয়ে বিষাণের হাত ধরে টান মারল, "বিষাণ ভাই! ছাড়ুন উনাকে! কী করছেন এসব?!"
বিষাণ একচুলও নড়ল না! তার হাত ব্লেড দিয়ে চামড়া কেটে রক্ত বের করতে শুরু করেছে! আশিক যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে বিকট চিৎকার জুড়ে দিল!
তৃধা নিজের কপালে হাত দিল। ‘এখন যদি এই বেপরোয়া লোকটা নিজের মাথা গরম সামলাতে না পেরে সত্যি সত্যি ছেলেটার মুখের সাইডটা কেটে বাদ দিয়ে দেয়,তবে তো পুরো এলাকাতে পরিবারের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে! আর আমার সামনে এসব খুনখারাবি দেখলে তো আমি এমনিতেই হার্ট অ্যাটাক করে মরে যাব!’
তৃধা নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে বিষাণকে টেনে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু বিষাণ যেন এক ধ্যানে চামড়া কাটাতে ব্যস্ত! তৃধা চরম উপায়হীন হয়ে গভীর একটা শ্বাস নিল, তারপর দু-হাত দিয়ে বিষাণের পেট শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে সজোরে টান মেরে গগনবিদারি চিল-চিৎকার জুড়ে দিল,
"বিষাণ ভাইইইইই! শুনতে পাচ্ছেননন?! দাদু মেরেই ফেলবে এসব শুনলে! ছাড়ুন উনাকে!"
বিষাণ চরম বিরক্তিতে আর রাগে হাতের ব্লেডটা এত শক্ত করে চেপে ধরল যে তার নিজের আঙুলও হয়তো কেটে গেল! অন্য হাত দিয়ে আশিকের মুখ এত জোরে চেপে ধরল যে ছেলেটা আর গোঙানো ছাড়া বেশি জোরে চেঁচাতেও পারল না।
তৃধা আরও জোরে বিষাণের শরীর আঁকড়ে ধরে টেনে ধরে চিৎকার করে উঠল,
"বিষাণ ভাইইইইইই, এবার তো থামুন অন্তত!"
বিষাণ এবার আশিকের যে গালে ব্লেড চালাচ্ছিল, সেই গালে নিজের শক্ত হাতের সজোরে একটা কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিল!
আশিক আর এক মুহূর্তও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না! যন্ত্রণায় ও আতঙ্কে চোখের পলকে মাটিতে ধপ করে পড়ে গিয়ে একদম বেহুশ হয়ে গেল!
তৃধা মাটিতে পড়ে থাকা রক্তমাখা ছেলেটাকে দেখে ভয়ে দু-হাতে মুখ ঢেকে চেঁচিয়ে উঠল,
"আপনি এটা কী করলেন?! উনাকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে! নাহলে তো মরেই যাবে লোকটা!"
বিষাণ রক্তচক্ষু নিয়ে তৃধার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তৃ ধার ভয়ে ঢুক গিললো,তীব্র এক ধমক দিয়ে থমথমে গলায় বলে উঠল,
"চুপ করে সোজা বাড়ির দিকে হাঁট! নাহলে তোর পা গুলি আমি এখনি এখানেই কাটবো!”
চলবে...