ফন্ট সাইজ:
থিম:
শতাব্দী পেরিয়েও তুমি

২১তম পর্ব

লেখক: জুঁই আক্তার

#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি

#পর্ব২১ 
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
তৃধার দুটো হাত থরথর করে কাঁপছে। ভেতরে এক অজানা আতঙ্কের শীতল স্রোত বয়ে গেল,যেভাবেই হোক, রাহমিয়া আপুকে তাকে এভাবে শেষ হতে দেওয়া যাবে না! জেনে বুঝে একটা জ্যান্ত মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে কীভাবে?! কিছু একটা তো তাকে করতেই হবে!
রাহমিয়া হা করে তৃধার দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য সুর বলল, 
"সত্যিই বলছিস তুই?! যেতে দিবি আমাকে?!"
তৃধা রাহমিয়ার হাত দুটো শক্ত করে ধরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠছে। যদি সে আপুকে নিয়ে পালিয়ে যায়, আর সেই খবর জানাজানি হয়... তবে পরিস্থিতি সামাল দেবে কে?!
রাহমিয়া আকুল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আবার শুধাল, 
"তুই পারবি তো আমার আর আমাদের পুরো পরিবারটাকে সামলাতে?!"
কথাটা শোনামাত্রই তৃধা ধীরে ধীরে রাহমিয়ার ওপর থেকে নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিল। এক মুহূর্ত ভাবল সে,
‘আচ্ছা, যদি সৈকতের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার পরই রাহমিয়া আপুর সাথে সেই মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে?! তখন কী হবে?! গল্পের সেই পরিণতি যদি আরও মারাত্মক রূপ নেয়?! তখন আমি কী করব?!’
তৃধা রাহমিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল,
 "আপু... তুমি ঘুমাও এখন!"
রাহমিয়া অবাক হয়ে বলল, "কীইই?!"
"হ্যাঁ! কালকে তোমার বিয়ে, তুমি চুপচাপ ঘুমাও!"
তৃধা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে এল। বাইরের খোলা বাতাসে এসেও তার শ্বাস নিতে বড় কষ্ট হচ্ছে! জীবনটা যেন কেমন তেজপাতা হয়ে গেছে! যদি আগে থেকে জানত সে এভাবে কোনো গল্পের পাতায় ঢুকে পড়বে, তবে বই রিডিং না পড়ে পুরো গল্পটা মুখস্ত করে রাখত! নিজের ওপর চরম বিরক্তি লাগছে তৃধার,দুনিয়াজোড়া এত সুন্দর রোমান্টিক গল্প থাকতে সে পড়েছে শুধু সাইকোলজিক্যাল আর ডার্ক থ্রিলার! এত এত রহস্য যে কোনটা রেখে কোনটা সামলাবে বুঝে উঠতে পারছে না। কিন্তু কে জানত, তাকে শেষমেশ এমন এক অন্ধকার গল্পেই এসে নামতে হবে, যেখানে সবাই যেন মৃত্যুর খেলা খেলতেই বেশি ভালোবাসে?! আর সে কী না এসে পড়েছে পুরো কাহিনীর সবচেয়ে ফালতু আর জটিল ক্যারেক্টারটার ভেতরে!
তৃধা ধাস করে উঠোনের এক কোণের বেঞ্চে বসে পড়ল। বিয়েবাড়ি হওয়ার কারণে চারপাশের কোলাহল দেখে বোঝারই উপায় নেই,এখন কোনটা রাত আর কোনটা দিন! বাড়ির মহিলারা উঠোনের বড় আলোটার নিচে গোল হয়ে বসে বড় বড় ডিশে মাংস কাটছেন। তৃধা ওখানেই একমনে বসে রইল। সে মাথার ওপরে তারা ভরা কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
"আমি তাড়াহুড়ো করে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছি না তো?! যদি শেষে এর পরিণতি আরও কোনো ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন আমি কী করব?! নিজেকে কি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব?"
পুরো রাতে আর একফোঁটাও ঘুম এলো না তৃধার।
অন্যদিকে বিষাণ উঠোনের মাচায় মুগ্ধ আর সাফিদের সাথে কাজের হিসাব নিয়ে বসেছিল। কথার মাঝেই হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল দূরের বেঞ্চে বসে থাকা তৃধার ওপর। তৃধা নিথর হয়ে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, কপালে একরাশ চিন্তার ভাঁজ। বিষাণ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তৃধার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তবে মুখে টু-শব্দটিও করল না। ধীরে ধীরে আবার নিজের জমে থাকা কাজে মনোযোগ দিল!
—
আজ রাহমিয়া আপুর বিয়ের দিন। তৃধা সকাল থেকেই ঘরের বাইরে এক কোণে নিস্তেজ হয়ে বসে আছে। মনটা এক অজানা আতঙ্কে তোলপাড় করছে,সামনে কী অপেক্ষা করছে সে ছাড়া আর কেউ জানে না! আপুকে কি শেষমেশ কোনোমতে সৈকতের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া ঠিক হবে?! নাকি যা কপালে লেখা আছে, তা-ই হতে দেওয়া উচিত?! তৃধা দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরল। যা-ই হয়ে যাক না কেন, রাহমিয়া আপুকে এভাবে করুণ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না! সৈকত লোকটা ভালো না মন্দ সে জানে না, কিন্তু এটুকু তো নিশ্চিত যে এই বিয়ের পরই আপু মারা যাবে! তার মানে যেকোনো মূল্যে এই বিয়েটা আটকাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?! আজই তো বিয়ের অনুষ্ঠান! তৃধা মনে মনে নিজেকেই কষে একটা গাল দিল,
‘ইশ! আমি কেন পড়তে গেলাম এই থ্রিলার উপন্যাস?! আর কোনো সুন্দর রোমান্টিক গল্প পেল না নিয়তি আমাকে পাঠানোর জন্য?!’
সে বিরস মুখে রুমে ঢুকতেই দেখল রাহমিয়া চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। তৃধাকে দেখেও সে কোনো কথা বলল না। তৃধাও নিঃশব্দে এক পাশে বসে রইল।
একটু পরেই বাড়ির মুরুব্বি আর বয়স্ক মহিলারা রুমে ঢুকে রাহমিয়াকে বিয়ের নানান নিয়মকানুন আর হুকুম-আহকাম শেখাতে লাগলেন। রাহমিয়া নিথর হয়ে সব শুনে যাচ্ছে। হালিমা খাতুনের কড়া ধমক খেয়ে তৃধাও রেডি হয়ে নিল। পরনে কড়া ডার্ক গ্রিন রঙের ভারী কাজ করা একটা থ্রি-পিস, পিঠজুড়ে চুলগুলো খোলা। গায়ের জ্বরটা এখন না থাকলেও ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত অস্থিরতায় মুচড়ে উঠছে। আজ ঠিক কী হতে চলেছে,তা ভেবেই পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। রাহমিয়া আপুর ধারেকাছেও ঘেঁষা যাচ্ছে না, গমগম করছে মানুষ জন! আপুর চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। তৃধা তো ভালো করেই জানে এই কান্নার পেছনের হাহাকারটা কী, কিন্তু তার যে কিছুই করার নেই!
সবাই রুম থেকে বের হয়ে যেতেই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাহমিয়া বেশ আকুল গলায় বলে উঠল, "নন্দ্রিতা... আমাকে একটু সাহায্য করবি ?!"
তৃধা চমকে উঠে বলল,
 "কী?! কী সাহায্য?!"
"আমাকে যেকোনোভাবে একটা ফোন এনে দিবি?!"
"ফোন দিয়ে কী করবে, আপু?!"
রাহমিয়া মাথা নিচু করে চোখের পানি মুছে ফুঁপিয়ে বলল, 
"সৈকতের সাথে শেষবারের মতো একটু কথা বলব... আর কোনোদিন বলব না, সত্যি!"
তৃধা ভয়ে গলার শেষ ঢোকটুকু গিলল! এখন সে কী করবে?! সে কোনোমতে মাথা নেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। উঠোনের একপাশে গাছের মতো অচল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। জানা নেই সামনে কী ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটতে চলেছে! ইশ! গল্পটা যদি আরেকটু মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়ত, তবে আজ এই বিপদে পড়তে হতো না!
বিষাণ ভাইয়েরা হয়তো বাড়ির কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত, কিন্তু কাউকে না কাউকে তো সত্যটার একটু আভাস দিতে হবে! বিষাণ ভাইকে তো অন্তত বলা যাবে না, ওনার যা মেজাজ! তবে মুগ্ধ ভাইকে কি বলা যায়?! হ্যাঁ! মুগ্ধ ভাই নিশ্চয়ই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করবেন! তৃধা মেঠোপথে হেঁটে হন্যে হয়ে মুগ্ধ ভাইকে খুঁজতে লাগল। পথে আলিফ আর সাফির সাথে দেখা হলেও মুগ্ধ ভাইয়ের দেখা মিলল না।
রাস্তার আরেকটু সামনে এগোতেই তৃধা দেখল মুগ্ধ আর বিষাণ একসাথে হেঁটে আসছে। বিষাণকে দেখেই তৃধা বিরক্তিতে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তবে এখন নিজের জেদ দেখালে চলবে না!
দুই ভাই একসাথে তৃধাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার দিকেই এগিয়ে এল। মুগ্ধ ভাই একগাল হেসে বলে উঠল,
 "আরে নন্দ্রিতা! বেশ লাগছে তো তোকে আজ!"
বিষাণ ভ্রূ কুঁচকে আড়চোখে তাকাল, তবে মুখে কোনো কথা বলল না। তৃধা হালকা একটু কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, 
"ওহ... আপনারা এখানে কী করছেন?!"
মুগ্ধ এক চোখ টিপে বলল, 
"খুঁজছি!"
"কী খুঁজছেন?!"
"তোর ভাবীকে! কোথায় যে লুকিয়ে আছে!"
তৃধা চোখ বাঁকিয়ে বলল, 
"বিয়ের আগেই ভাবী?! বাহ্, বেশ তো!"
মুগ্ধ এবার মিষ্টি হেসে বিষাণের দিকে তাকিয়ে বলল, "তবে জানিস... মনে হচ্ছে আমি তাকে পেয়েই গেছি!"
তৃধা কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই বিষাণ চরম বিরক্তি নিয়ে কড়া গলায় বলল, 
"ফালতু নাটক করা বন্ধ কর তোরা!" তারপর তৃধার দিকে চোখ তুলে কাঠখোট্টা গলায় শুধাল,
 "তুই এখানে কেন এসেছিস?!"
তৃধা আবার ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে দুজনার দিকে তাকিয়ে বলল, 
"আমার... আমার একটা কথা ছিল।"
"কী কথা?!"
"মুগ্ধ ভাইকে বলতাম!"
বিষাণ রাগে চকচকে চোখে তাকাল। মুগ্ধ ভাই শব্দ করে হেসে উঠে একটা ভাব নিয়ে বিষাণকে বলল, "সর তো তুই ভাই! বল নন্দ্রিতা, কী বলবি।"
বিষাণ ওখানেই বাঘের মতো খাঁড়া হয়ে থাকা সত্ত্বেও তৃধা মুগ্ধ ভাইকে নিচু গলায় বলল, 
"একটু ওইদিকে আসবেন, প্লিজ?!"
মুগ্ধ মিটিমিটি হেসে তৃধার সাথে একটু সাইডে গিয়ে দাঁড়াল। বিষাণ পেছনে হা করে তাকিয়ে রইল,ঘটনা কী হচ্ছে এখানে?! রাগে ইচ্ছা করছে এই বেয়াদব মেয়েটাকে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে!
মুগ্ধ তৃধার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, 
"কী হয়েছে, বল এবার?"
তৃধা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুতেই বুঝতে পারছে না কী দিয়ে শুরু করবে, কোন কথাটা বলবে! সে তোতলাতে তোতলাতে শুধাল, 
"আপুর বিয়ের কথা যে ঠিক করেছেন... ওই ছেলেটা আর উনার পরিবার কেমন, জানেন কিছু?!"
"মানে?!" মুগ্ধ অবাক হলো।
"মানে... উনার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড কেমন?!"
"ভালোই তো! কেন বল তো?!"
"না! এমনিই জিজ্ঞেস করছিলাম..."
"কিছু হয়েছে নাকি, নন্দ্রিতা?!"
"না না! কিছু হয়নি!" তৃধা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হঠাৎ বেশ গুরুতর আর শান্ত মুখে বলল, 
"মুগ্ধ ভাই... আপনি যদি জানতেন, আগামী কয়েক ঘণ্টায় কী হতে যাচ্ছে... তবে কি করতেন?
“মানে?
“ধরেন,আপনি বুঝতে পারছেন, এটা করলে একজন বেঁচে যাবে!তবে মানুষ খারাপ বলবে,তখন কি করবেন?
মুগ্ধ কিছু বলার আগেই পিছে থেকে বিষান বলে উঠে,
"সমাজ আমাদের খাবার দেয়?দেয় না!তাহলে কেনো তাদের কথা ভেবে কাজ করতে হবে?এটা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়!"
বিষান দাঁড়ায় না,হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে।তৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুগ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
 "আপনি কী করতেন বলুন তো... যদি জানতেন আপনার চোখের সামনের মানুষটার মারাত্মক ক্ষতি হতে চলেছে বা সে আর বাঁচবে না?!"
মুগ্ধ কিছুক্ষণ নিথর হয়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা হেসে বলে উঠে,
 "তুই আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস, নন্দ্রিতা!"
"আমি নিজে ভয় পাচ্ছি, মুগ্ধ ভাই!"
মুগ্ধর মুখের হাসি এবার পুরোপুরি উধাও হয়ে গেল। সে সিরিয়াস গলায় শুধাল, 
"আসল ব্যাপারটা কী, বল তো আমাকে?!"
তৃধা কিছু একটা বলতে গিয়েও মাঝপথে আটকে গেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমি বুঝতে পারছি না,ঠিক করে বুঝাব!তবে!
তৃধা মুগ্ধর চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল,
 "তবে!আমি আমি পারছি না বলতে,কি বলবো?! "
মুগ্ধ কিছুক্ষণ পুরো নিস্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর বেশ ধীরকণ্ঠে বলল, 
"তুই কিছু একটা জানিস... তাই না?!"
তৃধা তড়িঘড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলল,
 "না না! কিচ্ছু না!"
"তাহলে কী বলতে চাইছিস তুই?!"
"বিয়ের সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে তো?!"
"হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক।"
তৃধা ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ হাসি ঝুলিয়ে বলল, "তাহলে তো ভালোই! আমি যাই এখন..."
তৃধা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বিষাণের ঘরে ঢুকার আগেই তার সামনে দিয়েই ঝড়ের বেগে দৌড়ে বাড়ির দিকে পালিয়ে গেল!
—
বিয়ের সময় একদম ঘনিয়ে এসেছে। তৃধা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না এখন তার কী করা উচিত। তবে হুট করেই তার মনে পড়ে গেল,রাহমিয়া আপু শেষবারের মতো একবার সৈকতের সাথে ফোনে কথা বলতে চেয়েছিল! সে আর দ্বিধা না করে তড়িঘড়ি হালিমা খাতুনের ফোনটা এনে রাহমিয়ার হাতে তুলে দিল।
রাহমিয়া যেন হাতে স্বর্গ পেল! একরাশ আকুলতা নিয়ে তৃধার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে নিল। তৃধা আস্তে করে রুমের দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল,কেউ ভেতরের ফিসফিসানি টের পাচ্ছে কিনা নজর রাখার জন্য। তৃধার মনের ভেতরটা তখন প্রচণ্ড দ্বন্দ্বে তোলপাড় করছে। এখন এই মুহূর্তে রাহমিয়া আপুকে পালিয়ে যেতে বলাটা কি আদৌ ঠিক হবে?! একটা মানুষকে কতটা ভালোবাসলে, কতটা নিঃশ্বাসের মতো আপন ভাবলে এভাবে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখানো যায়?!
ফোনের শুরুর দিকের কথাবার্তা তৃধার কানে পৌঁছায়নি। কিন্তু রুমের দরজার একটু কাছে এগোতেই সে শুনতে পেল রাহমিয়ার ভেজা চোখ আর ভাঙা গলার আকুতি,
"আমি যে আর সত্যি পারছি না...!"
ফোনের ওপাশ থেকে ছেলেটি ভাঙা আর ভারী কণ্ঠে বলে উঠল, 
"আমি তোমায় বিন্দুমাত্র জোর করব না, রাহু! তুমি যদি এই বিয়েতে রাজি থাকো, তবে আমি আর একটা শব্দও বলব না! আর যদি তুমি রাজি না থাকো... তবে আমি এখনই এই বিয়ের বাড়ির ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছি। তুমি শুধু একবার সাড়াশব্দ দাও, আমি তোমাকে নিয়ে বের হয়ে যাব! কিচ্ছু সাথে আনতে হবে না তোমার, শুধু তুমি আমার পাশে থাকলেই আমি দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ! বুঝলে তো, রাহু?!"
রাহমিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ডুকরে কেঁদে উঠল! মুখের বাকশক্তি যেন হারিয়ে গেছে তার। ওপাশে থাকা সৈকত হয়তো জোরে জোরে দু-তিনটে শ্বাস নিল, নিজেকে সামলে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে পরম মায়ায় বলল, "কেঁদো না তো, রাহু! কান্না করে না আমার ছোট পাখিটা..."
রাহমিয়া এবার আরও জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল! তৃধা আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ভেতরে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। রাহমিয়া কাঁপা হাতে কলটা কেটে দিল। সৈকতের সাথে আর একটা শব্দও কথা বলার শক্তি অবশিষ্ট নেই তার, আর হয়তো কয়েক ঘণ্টা পর এইটুকু অধিকারও চিরতরে কেড়ে নেওয়া হবে! এত নিষ্ঠুর কেন মানুষের নসিব?! জীবনে ভালোবাসার সেই মানুষটি ছাড়া আর কী-ই বা চেয়েছিল মেয়েটা?!
তৃধা জীবনে কোনোদিন বাস্তব চোখে এমন করুণ আর মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখেনি। হ্যাঁ, সে জীবনে অনেক শুনেছে বা পড়ে এসেছে,মেয়েরা ভালোবাসার টানে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু প্রেম যত সুন্দরই হোক, যত মধুরই হোক না কেন... বাবামার সম্মতি ছাড়া পালিয়ে যাওয়া তো অন্যায়! ভালোবাসার প্রথম দিনগুলোতে এই পাগলামি মিষ্টি লাগলেও, শেষ পরিণতি বিষের চেয়েও বাজেভাবে পুরো জীবনটাকে ধ্বংস করে দেয়। যারা এই সত্যটা বোঝে না, তারা জীবনের শেষ পরিণতিতে এসে চরম নির্মমভাবে হেরে যায়।
রাহমিয়া নিস্তেজ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সকাল থেকে পেটে একফোঁটা খাবারও পড়েনি, গলা দিয়ে পানিটুকুও নামছে না তার! কে জানে আজ রাতে তার কপালে ঠিক কী নির্মম ভবিষ্যৎ লেখা আছে!
তৃধা এক ফাঁকে বাইরে গেল। বরপক্ষ আর বর চলে এসেছে, চারপাশ আওয়াজ আর কোলাহলে মুখরিত। তৃধা বর দেখতেও গেল না, সোজা প্লেটে কিছুটা খাবার নিয়ে রুমে ফিরে এল। রাহমিয়া মুখ ঘুরিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল,
 "আমি কিচ্ছু খাব না, নন্দ্রিতা!"
তৃধা রাহমিয়ার হাত ধরে সোজা করে বসাল, তারপর ধমকের সুর মিলিয়ে বলল,
 "চুপচাপ খেয়ে নিন তো!"
"বললাম তো খাব না!"
"না খেলে এখন এই শরীর নিয়ে সৈকতের সাথে দেখা কীভাবে করবেন, হ্যাঁ?!"
কথাটা কানে যেতেই রাহমিয়া থমকে গিয়ে কান্না থামিয়ে তৃধার মুখের দিকে তাকাল। তৃধা প্লেটটা তার সামনে বাড়িয়ে ধরে স্বাভাবিক মুখে শুধাল
 "কী হলো?! যাবেন না উনার কাছে?!"
রাহমিয়া এবার তৃধার বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল!
তৃধা পরম মায়ায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আবার বলল, 
"কী হলো আপু, যাবেন না?!"
রাহমিয়া ফুঁপিয়ে বলতে লাগল,
 "না... আমি কীভাবে যাব বল তো?! মুগ্ধ ভাই আর বিষাণ... ওরা যে বাইরে পাহারা দিচ্ছে! ওরা যদি টের পায়?!"
"কিছু হবে না! ওদের সব সামলে আমি আপনাকে নিজে নিয়ে যাব!"
রাহমিয়া অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "কীইই?! তুই?!"
"হুম, আমি!"
"কিন্তু ওরা যদি আমাদের খুঁজে বের করে ফেলে?!"
তৃধা এবার একদম স্থির চোখে রাহমিয়ার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, 
"আমি ওদের কোনোদিন আপনাকে খুঁজে পেতে দেব না!"
"কিন্তু কীভাবে করবি এসব তুই?!"
"আমায় অন্তত এটুকু বিশ্বাস করেন তো, আপু?!"
রাহমিয়া দু-হাতে চোখ-মুখের পানি মুছে তৃধার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
 "হ্যাঁ... তোকে আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি!”
—
রাত ৯টা বাজে। রাহমিয়ার রুমের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ। বাইরে বাড়ির মহিলারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে ডেকে চলেছেন, কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। সময় যত গড়াচ্ছে, সবার উদ্বেগ তত বাড়ছে। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে আলিফকে ডেকে আনা হলো। আলিফ এসে দরজায় কয়েকটা প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে কাঠ ভেঙে ভেতরে ঢুকল।
কিন্তু রুমে পা রাখতেই ঘরের পরিবেশ এক নিমিষে বরফ হয়ে গেল!
রাহমিয়া রুমে নেই! খাট ফাঁকা, ওড়নাটা শুধু একপাশে পড়ে আছে। বউ সাজে সজ্জিত কনে উধাও!
মুহূর্তের মধ্যে খবরটা দাবানলের মতো পুরো বিয়েবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। চারপাশের হৈচৈ আর আনন্দের কলরোল এক পলকে কান্নাকাটি আর হাহাকারে রূপ নিল। বিষাণ আর মুগ্ধ এতক্ষণ বরপক্ষের তদারকিতে ব্যস্ত ছিল, খবর শোনামাত্রই সব কাজ ফেলে ঝড়ের বেগে ছুটে এল কনের রুমের দিকে।
মাঝ উঠোনে ছোট ফুফু মাটিতে বসে কপাল চাপড়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন, বিষাণ আর মুগ্ধ থমথমে মুখে রাহমিয়ার রুমে ঢুকাল। মুগ্ধর চোখের কোণ লাল হয়ে উঠেছে, অবিশ্বাস আর একরাশ হতাশা ঝরে পড়ছে তার মুখ জুড়ে। রাহমিয়া তো এমন মেয়ে নয়! নিজের ভাইয়ের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে এভাবে পালিয়ে যাওয়ার স্বভাব বা শিক্ষা তো তাকে দেওয়া হয়নি! তবে কী হলো আজ?!
মুগ্ধ আর বিষাণ ঘরের কোণায় কোণায় নজর বোলাতে লাগল। বিষাণ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে চতুর দিকে চোখ বুলাচ্ছিল। কিন্তু চারপাশের তীব্র বিশৃঙ্খলা আর চিৎকার-চেঁচামেচির মাঝেই বিষাণের তীক্ষ্ণ চোখ হঠাৎ থমকে গেল!
তার নজর এবার আর রাহমিয়ার ফেলে যাওয়া জিনিসের ওপর নেই। তার কপাল জুড়ে চিন্তার এক গহীন ভাঁজ ফুটে উঠল।
বিছানার এক পাশে চোখ পড়তে বিষাণের বুকের ভেতরটা হুট করে ধক করে উঠল! এই পুরো হট্টগোলের মাঝে একটা মারাত্মক জিনিস সে খেয়ালই করেনি!
বিষাণ একপা এগোতেই থমথমে গলায় ফিসফিস করে নিজেকেই শুধাল,
"নন্দ্রিতা কই?!”
                                -*-*-*-*-*-*-
রাহমিয়া নিজের প্রয়োজনীয় কাপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে সাবধানে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তৃধা তড়িঘড়ি করে ছিটকিনিটা আটকে দিল, তারপর ঝড়ের বেগে জানলা দিয়ে গলে বাইরে বেরিয়ে এল। 
বাইরে পা রাখতেই তৃধা দেখে রাহমিয়া একটু দূরেই শিউরে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে চারপাশটায় ঘুটঘুঁটে অন্ধকার নেমে এসেছে, মেঠোপথটা কেমন একটা ভূতুড়ে রূপ নিয়েছে। তৃধা দৌড়ে গিয়ে রাহমিয়ার হাত ধরে দ্রুত পা চালাল।
পুকুরপাড়ের বড় তেঁতুলগাছটার নিচে যেতেই দেখা মিলল সেই অপেক্ষারত মানুষটির। দীর্ঘদেহী, শ্যামলা ছিপছিপে এক পুরুষ। রাহমিয়াকে দেখামাত্রই ছেলেটি দ্রুত এগিয়ে এসে পরম ভালোবাসায় তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কেঁপে ওঠা গলায় শুধাল, 
"আমার রাহু পাখি ঠিক আছে তো?!"
রাহমিয়া চোখ মুছে মাথা নেড়ে বলল, 
"হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি!"
ছেলেটির নজর এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তৃধার ওপর পড়ল। সে রাহমিয়ার দিকে তাকিয়ে শুধাল, "এটা কে, রাহু?!"
"নন্দ্রিতা! ও-ই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।"
ছেলেটির চোখের কোণে হয়তো পানি চলে আসছিল, কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে একচিলতে হেসে বলল, "তোমাকে যে কীভাবে ধন্যবাদ দেব... অনেক ধন্যবাদ, ছোট শালী!"
তৃধা ফিক করে হেসে ফেলল। যাক বাবা! লোকটা আদতে মোটেই খারাপ নয়, বেশ ভালোই! সে রাহমিয়ার কাপড়ের ব্যাগটা ওদের হাতে তুলে দিতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক কড়া পুরুষালী আওয়াজ ভেসে এল,
"এখানে কী হচ্ছে?!"
তৃধা সহ বাকি দুজন শিউরে উঠে পেছনে তাকাল। রাহমিয়া আর সৈকত লোকটিকে চিনতে না পারলেও তৃধার চিনতে এক মুহূর্তও লাগল না,এ তো ওই মাহবুব! বড় পক্ষের,তৃধা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হাত জোড় করে মিনতি ভেসে বলল, 
"দয়া করে কাউকে কিছু বলবেন না! প্লিজ!"
মাহবুব ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
 "কী?! কিন্তু কেন?!"
"আমি আপনাকে পরে সব বলব! শুধু এখন একটু আমাদের সাহায্য করুন, প্লিজ!"
তৃধা রাহমিয়া আর সৈকতকে ঠেলে গাড়ির দিকে পাঠিয়ে দিয়ে বলল, "আপনারা এখনই এখান থেকে সরুন! এখানে আর কেউ টের পাবে না!"
মাহবুব আঁতকে উঠে বলল, 
"কোথায় যাচ্ছে ভাবি?!"
তৃধা রাগে গাল ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 
"বললাম তো, পরে বলব! আপনি কি এখন সিআইডিগিরি না করলেই নয়?!"
"কিন্তু উনি এত রাতে ওই অচেনা ছেলের সাথে কোথায় যাচ্ছেন?!"
তৃধা এবার হনহন করে মাহবুবের একদম কাছে এসে কড়া গলায় বলল,
 "নিজের বিয়ের দিন নাচতে যাচ্ছেন! আর কিছু জানতে চান, হ্যাঁ?!"
মাহবুব হা করে দাঁড়িয়ে রইল। মাথা-মুণ্ডু কিছুই ঢুকছে না তার! কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই তৃধা বলল, 
"চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন কেন?!"
"কী করব?!"
"ব্যাগটা ভারী, ধরুন এটা!"
মাহবুব সুবোধ বালকের মতো ব্যাগটা হাতে নিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, 
"দাঁড়াও... ওরা কি... পালিয়ে যাচ্ছে?!"
"হ্যাঁ!"
মাহবুব চেঁচিয়ে উঠল,
 "কীইই?! পাগল নাকি তুমি?!"
তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে দেয় তৃধা। গাড়িটাকে ছাড়তে দেখেই মাহবুবের জামার হাতা ধরে টানতে টানতে বলল, 
"তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে চলুন!"
"কেন?!"
"কারণ বাড়িতে এখন আপনি আর আমি ছাড়া দুনিয়ার সব মানুষ আছে!"
"তাহলে?!"
"বাড়িতে ঢুকলেই বিষাণ ভাই ধরে ফেলবে!"
"কেনো ধরবে?!"
"যে আপুর পালিয়ে যাওয়ার পেছনে আমি আর আপনি সাহায্য করেছি!"
মাহবুবের কালঘাম ছুটে গেল,
 "বিষাণ ভাই?!
“হ্যাঁ!
“উনি মেরে ফেলবে তো!"
দুজনে হাঁপাতে হাঁপাতে ঝড়ের বেগে দৌড়ে এসে বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই বিষাণ সামনে এসে দাঁড়াল! বিশাল দেহের ছায়াটা তাদের ওপর পড়তেই তৃধা ঢোক গিলল, পাশে মাহবুবও হালকা কাঁপতে লাগল।
বিষাণ চোয়াল শক্ত করে ঠাণ্ডা গলায় শুধাল, "কোথায় ছিলি তুই?!"
তৃধা মাহবুবকে অবাক করে দিয়ে এক সেকেন্ডের মধ্যে ফেস এক্সপ্রেশন বদলে কান্নাকাটি আর মাসুম মুখ বানিয়ে বলল,
 "শুনলাম আপুকে নাকি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না! তাই এইদিকে আমি আর মাহবুব ভাই চারিদিকে আপুকে খুঁজছিলাম!"
বিষাণ স্থির চোখে দুজনকে মেপে বলল, 
"ও কে?!"
তৃধা বেশ সুন্দর মিষ্টি গলায় বলল, 
"আমার আম্মার বান্ধবীর ছেলে, মাহবুব ভাই!"
মাহবুবও নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল বোকা হাসি ফুটিয়ে বলল, 
"জি, আমি মাহবুব! বিয়ে না হওয়া ভাবির চাচাতো দেওর!"
তবে বিষাণের শক্ত বরফ মুখটা একটুও গলল না। সে তৃধার কথার মাঝেই শীতল গলায় বলল
 "আপুকে পেয়েছিস?!"
"না তো!"
"ওহ!"
তৃধাকে আর পায় কে! সেখান থেকে চটজলদি চম্পট দিল সে। তৃধাকে দেখে দেখে মাহবুবও গা ঢাকা দিতে পালালো।
কিন্তু বাড়ির ভেতর পা রাখতেই বিকট চিৎকার-চেঁচামেচি আর হট্টগোলে কান পাতা দায় হয়ে উঠল! ততক্ষণে বিশাল ঝামেলা লেগে গেছে। বড় ফুফু আর ছোট ফুফু মাটিতে আছাড় খেয়ে কেঁদে দুনিয়া ভাসিয়ে দিচ্ছেন। মাহবুবও তৃধার পিছে পিছে এসে এক কোণায় একদম ইনোসেন্ট মুখ করে দাঁড়াল,বাড়ির কেউ যদি জানতে পারে সে কনেকে পালাতে সাহায্য করেছে, তবে তাকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে!
বরের বাড়ির লোকজনে পুরো ঘর গমগম করছে। কনের বাড়ির মানুষকে বিষোদ্গার করে যা নয় তা-ই শোনানো হচ্ছে। তৃধা চুপচাপ এক পাশে দাঁড়িয়ে মুখ করুণ করে চরম কান্নার নাটক চালিয়ে গেল।
বরপক্ষের এক মুরুব্বি গজগজ করে উঠে বললেন, "আপনাগো বাড়ির মাইয়ার যদি অন্য কাউকে পছন্দই থাকত, তবে এনে এত নাটক সাজিয়ে বিয়া ঠিক করেছিলেন কে?!"
মুগ্ধ নিচু গলায় বলল,
 "এমন তো কিছু ছিল না চাচা! আমাদের তো ও কোনোদিন কিছু বলেনি..."
"আপনারা ওর পরিবার! আপনাদের এটুকু দায়িত্ব ছিল না যে মেয়েকে জিজ্ঞেস করবেন?!"
কনের বাড়ির কেউ আর একটা শব্দও বলতে পারল না। এর মাঝেই বরপক্ষের এক হাড়জ্বালানো মহিলা নাক সিঁটকে বলে উঠলেন, 
"এখন আপনাদের এই কেলেঙ্কারির জন্য আমাদের সমাজের মান-সম্মান ধুলোয় মিশল! ছেলেকে বিয়ে করাতে এনে খালি হাতে কীভাবে ফেরত নিয়ে যাই, বলুন তো?!"
রাহমিয়ার বাবা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, 
"দয়া করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন... আমরা চারিদিকে লোক পাঠাচ্ছি, ও তো এমন মেয়ে না!"
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, কিন্তু রাহমিয়ার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।অবশেষে পরিবেশ চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠতেই বরের বাড়ির এক বয়স্ক মুরুব্বি উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললেন, 
"আপনার মেয়ে তো আমাদের মানসম্মানের মাথা খেয়ে পালিয়েছে! তা আপনাদের ওই আকবরের ভাইঝির (নন্দ্রিতা) তো এখন বিয়ের বয়স হয়েছে, তাই না?!"
রাহমিয়ার বাবা অবাক হয়ে তাকালেন, 
"হ্যাঁ...!"
"তাহলে এক কাজ করুন! ওই মেয়ের লগেই এখন আমগো পোলার বিয়েটা দিয়ে দিন! সুন্দর বিয়া ও হইবো,আর খালি হাতেও ফিরা যায়ুন লাগবো না!"
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন