ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ বিকালের মুগ্ধতা

১৪তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান আফিয়া

#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা {পর্ব-১৩}

 #ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
বাসায় ঢোকার পর থেকেই আরিয়া একদম চুপচাপ। সে ভেবেছিল আহনাফ হয়তো বাসায় সবাইকে জানাবে, কিন্তু আহনাফ তেমন কিছুই করল না। সে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। আরিয়ানও আহনাফের সাথে গেল। এই রহস্যময় নীরবতা আরিয়াকে আরও বেশি চিন্তায় ফেলে দিল।
রাত তখন আনুমানিক সাড়ে বারোটা।
সাভারের এই বিশাল শিকদার বাড়িটা এখন পুরো নিঝুম। আরিয়া বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে আর উপন্যাস পড়ছে, কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের বাগানের দিক থেকে শুকনো পাতা মাড়ানোর একটা খড়খড় আওয়াজ হলো। কেউ একজন খুব সাবধানে জানালার কার্নিশ বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে!
আরিয়া জানালা দিয়ে উঁকি দিতে চাইল, কিন্তু তার আগেই ঘরের দরজা খুলে গেল। আরিয়া দেখল আহনাফ পুরো তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদা টি-শার্ট, প্যান্ট আর কোমরে গোঁজা একটা রিভলভার! তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে তার ভাইয়া আরিয়ান। আরিয়ানের পরনে নেভি ব্লু শার্ট, তার চোখেমুখেও চরম গাম্ভীর্য।
আহনাফ আরিয়ার মুখে হাত দিয়ে চেপে ধরে নিচু, কড়া গলায় বলল, “চুপ! একদম আওয়াজ করবি না। আমরা জানি কে এসেছে।”
আরিয়া চোখ বড় বড় করে দুই জনের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান আরিয়াকে নিজের ঘরের খাটে বসিয়ে দিয়ে বলল, “ছুটকি, এখানে চুপচাপ বসে থাকবি। বাইরে আসার চেষ্টা একদম করবি না।”
ঘর থেকে বের হতেই পেছনের দরজা ভেঙে অতি সাবধানে ড্রইংরুমে পা রাখল সেই কালো ক্যাপওয়ালা লোকটা। তার আসল নাম রাকিব চৌধুরী । সে এই অঞ্চলের মোস্ট ওয়ানটেড ড্রাগ স্মাগলার। রাকিবের হাতে চকচক করছে একটা ধারালো বড় ছুরি।
*খটাস!*
এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ড্রইংরুমের ফ্লাডলাইটগুলো জ্বলে উঠল। তীব্র আলোয় রাকিব চোখ কুঁচকে ফেলল। সামনে তাকিয়ে সে দেখল আরিয়ান আর আহনাফ দুজনে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে।
রাকিব বাঁকা হেসে বলল, “ভেবেছিলেন বর্ডার পার হয়ে এসে আপনার এই শান্ত শহরের বাড়িতে লুকিয়ে থাকবেন, অফিসার আরিয়ান? আর নেভি অফিসার আহনাফও দেখছি চলে এসেছে! ওই ফাইলটা কোথায়, যেটা আজ সকালে স্নেহা আপনাকে দিয়েছে?”
আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “তোমাদের মতো ড্রাগ স্মাগলারদের পুরো চেইনটা ভাঙার জন্যই ওই ফাইলটা তৈরি করা হয়েছে, রাকিব। তোমাদের খেলা আজ এখানেই শেষ।”
রাকিব হঠাৎ পকেট থেকে একটা স্মোক বোম মেঝেতে আছাড় দিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ড্রইংরুম সাদা ধোঁয়ায় ভরে গেল। ধোঁয়ার সুযোগ নিয়ে চালাক রাকিব আরিয়ানদের আক্রমণ না করে, সোজা আরিয়ার ঘরের দিকে দৌড় দিল। সে জানত, এই দুই দুর্ধর্ষ অফিসারের হাত থেকে বাঁচতে হলে আরিয়াকে জিম্মি করা ছাড়া উপায় নেই।
“আরিয়া, তূবা!” আরিয়ান আর আহনাফ একসাথে চিৎকার করে উঠল।
ধোঁয়ার মাঝেই রাকিব আরিয়ার ঘরের দরজা লাথি দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকল। আরিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাকিব পেছন থেকে এসে আরিয়ার গলা চেপে ধরে ধারালো চুরির চকচকে ফলাটা তার গলায় চেপে ধরল।
“একদম নড়বি না! নড়লেই গলা কেটে দেব!” রাকিব চিৎকার করে বলল।
ঠিক তখনই আরিয়ান আর আহনাফ ঘরের দরজায় এসে থমকে দাঁড়াল। আরিয়ার গলায় ছুরি দেখে দুজনেরই রক্ত মাথায় চড়ে গেল, কিন্তু আরিয়াকে বাঁচানোর জন্য তারা গুলি করতে পারছিল না।
রাকিব দাঁত বের করে হাসল, “কী অফিসার সাহেবরা? এবার অস্ত্র ফেলে দাও! নইলে তোমাদের আদরের বোনের লাশ পড়বে এখানে।”
আরিয়া চোঁখে তখন ভয় ছিল না, বরং তার মনে পড়ে গেল আজ স্কুলের গেটের কথা। তবে নিজের প্রাণের রক্ষায় সে কেন চুপ থাকবে? তাছাড়া সে শিকদার বাড়ির মেয়ে বলে কথা।
রাকিব যখন আরিয়ানদের দিকে তাকিয়ে অহংকারে হাসছিল, ঠিক সেই অসতর্ক মুহূর্তটার সুযোগ নিল আরিয়া। সে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে, পুরো শক্তি দিয়ে তার ডান পা পেছনে ছুড়ে মারল। আরিয়ার শক্ত পায়ের লাথিটা গিয়ে লাগল একদম রাকিবের দুই পায়ের মাঝখানে— তার মেইন পয়েন্টে!
“আহহহহহ!”
তীব্র ব্যথায় চোখ উল্টে গেল রাকিবের। হাত থেকে ছুরিটা ফসকে মাটিতে পড়ে গেল এবং সে দুই হাতে মেইন পয়েন্ট চেপে ধরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ব্যথায় সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল।
আরিয়া দ্রুত সরে আসতেই আরিয়ান আর আহনাফ বাঘের মতো এসে রাকিবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আহনাফ এক ঝটকায় রাকিবের হাত দুটো পিঠমোড়া করে ধরল আর আরিয়ান পকেট থেকে হ্যান্ডকাফ বের করে রাকিবের হাতে পরিয়ে দিল।
ঠিক তখনই ঘরের লাইট জ্বলে উঠল। এত বড় হট্টগোলে আব্বু-আম্মুসহ বাসার সবাই রুমে ছুটে এলেন।
মেঝেতে হাতকড়া পরা রক্তাক্ত রাকিবকে দেখে আব্বু চিৎকার করে উঠলেন, “আহনাফ! আরিয়ান! এসব কী হচ্ছে? এই লোকটা কে? আর তোমাদের হাতে অস্ত্র কেন?”
আরিয়ান সবার দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল, "ভাইয়া তুমি বলো, আমি একে টিমের হাতে গাড়িতে দিয়ে আসি।" বলেই সে রাকিবকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গেল।
বাইরে নিয়ে যেতেই হাতকড়া পরা রাকিব হিংস্রভাবে হাসতে হাসতে বলল, "তোর বোনকে আমি মেরেই ফেলব। আমি আবার আসব!"
রাকিবের কথা শুনে আরিয়ানের মাথা গরম হয়ে গেল, সে সজোরে এক লাথি বসিয়ে দিল রাকিবের বুকে। তারপর সামনে থাকা জুনিয়র অফিসারকে ডেকে বলল, "আরিফ, একে নিয়ে যাও। দেখো যেন কোনোভাবেই পালাতে না পারে!"
আরিফ বলল, "জি স্যার!" বলেই সে রাকিবকে নিয়ে গাড়ির দিকে রওনা হলো।
কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল ঠিক তখনই। আরিফ আর তার সাথে থাকা কনস্টেবলরা যখন রাকিবকে প্রিজন ভ্যানে তুলতে যাবে, তখনই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একটা কালো মাইক্রোবাস এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে কয়েকজন সশস্ত্র লোক নেমে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করল। আকস্মিক এই হামলায় আরিফরা কিছুটা পিছু হটতেই, সেই সুযোগে চতুর রাকিব চৌধুরী হাতকড়া পরা অবস্থাতেই মাইক্রোবাসে উঠে পালিয়ে গেল। গুলির শব্দ শুনে আরিয়ান আর আহনাফ ছুটে বাইরে এলো, কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটি রাতের অন্ধকারে হাওয়া হয়ে গেছে!
আরিয়ান ক্ষোভে ফেটে পড়ল। তবে আর কোনো উপায় না দেখে তারা ভেতরে ফিরে এলো।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে আরিয়ান দেখল সবাই গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। আহনাফ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা গভীর শ্বাস নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আব্বু, আম্মু… বাবাই, মামনি, আজ আমাদের আসল পরিচয়টা তোমাদের জানা দরকার। আরিয়ান কোনো সাধারণ চাকরি করে না, ও সিআইডি (CID) এর আন্ডারকভার অফিসার। আর আমি শুধু নেভি ডকইয়ার্ডে বসি না, আমি নেভির স্পেশাল উইংয়ের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসার।”
আরিয়া আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে গেয়ে উঠলো–
গভীর জলের ফিস,
ভাইয়া গভীর জলের ফিস 
পাপা তা-ই নাম রেখেছে 
আরিয়ান ৪২০।
আব্বু আর আম্মু পুরো আকাশ থেকে পড়লেন। বাসার সবাই যেন নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এতদিন ধরে তাদের ঘরের দুই ছেলে দেশের এত বড় বড় পদে কাজ করছে, অথচ তারা টেরই পায়নি!
আরিয়ান তখন এগিয়ে গিয়ে আরিয়াকে জড়িয়ে ধরল। “সাবাস ছুটকি! আজ তুই যা করছিস, আই অ্যাম প্রাউড অব ইউ। 
আরিয়া তখনো হাঁপাচ্ছিল, কিন্তু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা গর্বে ভরে উঠল। সে হেসে বলল, “ভাইয়া, তোমার বোন তো! একটু আধটু জোর তো আমার গায়েও থাকবে।”
বাসার সবাই তখন হতভম্ব ভাব কাটিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল। ঘরের দুই সিংহ আর এক সিংহী মিলে আজ এক মস্ত বড় অপরাধীকে কাবু করেছে। রোজিনা শিকদার এসে আরিয়ানের ও আহনাফের পিঠে দিলেন এক কিল। দিয়ে বললেন, “দুই ভাই কি মনে করিস, আমাদের কিছুই না বলে সব করবি? আরু আহু, তোরা আমাকে বললি না? এবার বলিস আমি তোদের বন্ধু, তখন বোঝাব মজা!” বলেই তিনি রাগ দেখিয়ে চলে গেলেন, যদিও মনে মনে তাঁর আনন্দের শেষ ছিল না।
নাজমুল শিকদার আরিয়ান ও আহনাফের সামনে এগিয়ে এসে বললেন, “কাল রাগ ভাঙবে। আজ ঘুমাতে যাও দুইজন।”
আরমান শিকদার গম্ভীর গলায় বললেন, “কাল সব কথা হবে। আজ যে যার মতো ঘুমাতে যাও।” তিনি বলার সাথে সাথে সবাই চলে গেল। আরিয়া রুমে যাওয়ার আগে আহনাফকে একটা ভেংচি কেটে গেল।
আহনাফ মনে মনে বলল, “মাসুম চেহারা দেখলে বোঝাই যায় না, কতটা ভালো সাজার অভিনয় করতে পারে! দুনিয়ার সবার সাথে ভালো কথা বলে, শুধু আমার কাছেই এসে পুরো খচ্চুরনি হয়ে যায়।”
......
দেখতে দেখতে একটা ১৫দিন কেটে গেল। সিআইডি আর নেভির চারদিকে জাল বিছিয়েও সেই ঘটনার পর থেকে রাকিব চৌধুরীকে আর খুঁজে পেল না। সে যেন একদম মাটির নিচে লুকিয়ে পড়েছে। তবে আরিয়ান ও আহনাফ তাদের সোর্স অ্যালার্ট করে রেখেছে। আস্তে আস্তে বাড়ির পরিবেশ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে এলো।
এরই মধ্যে সাভারের নামকরা স্কুল থেকে দেওয়া আরিয়া শিকদার তূবার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। রেজাল্ট আসতেই পুরো শিকদার বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেল। আরিয়া গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে! শুধু আরিয়াই নয়, ওর ফ্রেন্ডস মহলের সবাই খুব ভালো রেজাল্ট করেছে।
রেজাল্ট ভালো হওয়ায় সবার আবদার মেনে নিয়ে বাবা-মা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, আরিয়াসহ ওদের পুরো বন্ধুদের গ্রুপটাকে সাভারের সবচাইতে বেস্ট আর নামকরা কলেজেই ভর্তি করানো হবে। যেমন কথা তেমন কাজ, ফর্মালিটি শেষ করে আরিয়া আর ওর পুরো ফ্রেন্ডস সার্কেল একসাথে সাভারের সেই টপ কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেল।
নতুন কলেজ, চেনা বন্ধুদের আড্ডা আর একরাশ স্বপ্ন নিয়ে আরিয়ার জীবনের এক নতুন রঙিন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। কলেজে যাওয়ার আগের রাতে আরিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে ভাবল, "এখন আর কোনো ঝামেলা নেই, বন্ধুদের সাথে এবার কলেজ লাইফটা জমিয়ে উপভোগ করব!"
ঠিক তখনই জানালার বাইরে চোখ পড়তেই সে দেখল আহনাফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। আরিয়া মনে মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধি এঁটে জানালার পর্দাটা টেনে দিল। মনে মনে বলল, "হাতি হাতির মতোই থাকবে, খাড়ুস অফিসার! দেখ এবার কলেজে গিয়ে কী করি!"
চলবে...
(📌বেশি কমেন্ট চাইইই এই পর্বে)
(বড় একটা পর্ব দিলাম। বেশি বেশি রেসপন্স করার চেষ্টা করবেন,আমিও গল্প তাড়াতাড়ি দেব। আমি এখন কয়েকটাদিন ফ্রিইই আছি
খুব শীঘ্রই আসছে পরবর্তী পর্ব,
ধন্যবাদ সবাইকে)🫠🫶

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন