ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয়তমা

১৩তম পর্ব

লেখক: জায়ান ফারুক আদিল

গল্পঃপ্রিয়তমা

লেখক:- আদিল

পর্ব_১৩(শেষ পর্ব)

সবার চোখের আড়াল হয়ে কুটিল হাসি দিলো রকি।সাথে পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছে।কাল মেয়েগুলোকে বিক্রি করে সবটাকা মেরে আমেরিকায় গিয়ে উঠবে।বাবার সম্পত্তির দলিল অলরেডি নিজের নামে করে সেগুলো বিক্রি ও করে দিয়েছে।কৌশলে রুবির থেকে সাইন নিয়ে নিয়েছে।একবার আমেরিকায় গেলে আর বাংলাদেশের মুখোমুখি হবেনা।বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ কিছুইনা।নিজের ব্যবসার জন্য সেই কেসের একজন পুলিশ অফিসারের সম্পূর্ণ খবরাখবর তার জানা জরুরি ছিলো যা রুবির মাধ্যমে নিয়েছে।

এখনই নিজের আস্তানায় যাবে।যেটা তাদের গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে।যেখানে মেয়েগুলোকে গুম করে রেখেছে।

পরেরদিনই রকি তার আস্তানায় পৌঁছে যায়।মিরন হায়দারকে কল করে ঠিকানা জানিয়ে দেয়।আজ রাতেই মেয়েগুলোকে তার হাতে হস্তান্তর করবে।কল কেটেই লম্বা একটা ঘুম দেয়।

এদিকে কনস্টেবল নিজাম রূপককে কল করে জানিয়ে দেয় রকি মিরন হায়দারকে কল করেছিলো আর ঠিকানা দিয়ে আজ রাতেই যেতে বলেছে।

রূপক আর তরুণ সবাইকে নিয়ে তখনই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।আর সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যায়।

বাড়িতে না গিয়ে সোজা থানায় যায়।সেখান থেকে মিরন হায়দারকে নিয়ে রকির দেওয়া ঠিকানায় চলে যায়।সাথে রাজিব শেখকেও নিয়ে যাওয়া হয়।ওদের সাথে এসে ফারুখও যোগ দেয়।

আগে মিরন হায়দার ভেতরে ঢোকে।স্বাভাবিক ভাবেই রকির সাথে ফর্মালিটি শেষ করে পেমেন্ট সম্পন্ন করে।এরপর রকি মেয়েগুলোকে মিরন হায়দারের হাতে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য হাঁটা ধরে।মিরন হায়দার পিছুপিছু যায়।বিল্ডিং এর একেবারে শেষপ্রান্তে চলে যায়।মিরন হায়দার ভ্রু কুচকে তাকালেন এখানেতো কোনো রুম নেই তবে মেয়েগুলোকে কোথায় রেখেছে?

দেয়ালে পেইন্টিং আটকানো ছিলো মিরন হায়দার সেগুলোই দেখছিলেন।পেইন্টিং গুলো দেখে মনে হচ্ছে একেবারে জীবন্ত কোনো দৃশ্য।রকি একটা পেইন্টিং এর উপর হাত রাখলো।সেটি ঘুরিয়ে দিয়ে দেওয়ালে হাত রাখলো।সাথে সাথেই হাট করে একটা দরজা খুলে গেলো।মূলত পেইন্টিং এর পেছনে ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়া ছিলো।মিরন হায়দারকে নিয়ে রকি ভেতরে ঢুকলো।ভতরে গিয়ে আরেকটা দরজার লক খুলে দিলো।

তখনই পুলিশ পেছন থেকে পিস্তল তাক করলো।রকির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে দাঁড়ালো রূপক।সে দুহাত উপরে তুলে এদিক ওদিক তাকিয়ে ফন্টা আঁটার চেষ্টা করলো।কিন্তু এখান থেকে পালানোর রাস্তা নেই।একে একে সবগুলো মেয়েকে বের করে শেষে গিয়ে রূপক তরুণ দুজনেই চমকে গেলো প্রীতি,রবি,ফারিহা তিনজনকে দেখে।দ্রুত ওদের হাত মুখের বাঁধন ছাড়িয়ে রূপক জিজ্ঞেস করলো তোমাদেরকে কখন এখানে আনলো?

প্রীতি রূপকের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।ফারিহা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,বাবা বাড়িতে ছিলেননা।হঠাৎ কতগুলো লোক এসে আমাদেরকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসলো।মা বাঁধা দেওয়ায় উনাকে একটা রুমে ধাক্কা মেরে আটকে রাখেছে।

রূপকের মাথায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো।রকির নাক বরাবর একটা পাঞ্চ মারলো।গলগলিয়ে নাক দিয়ে রক্ত বের হলো।তরুণকে মেয়েগুলোকে নিয়ে যেতে বলল রূপক।ও প্রীতি আর ফারিহাকে নিয়ে পেছনে আসলো সাথে রুবিও আছে।

ফারুখ পুলিশ ফোর্সদের সাথে গেলো।আসামি তিনজনকেই ইচ্ছেমতো মারলো বেঁধে রেখে।রকির দুই পায়ের মাঝখানে জোরসে কয়েকটা লাথি মারলো।রকি একেবারে গুটিয়ে গেলো।রাজিব শেখকেও ছাড় দেয়নি ফারুখ।

রূপক আর তরুণ এসে ফারুখকে থামিয়ে দিলো।বলল,আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে।

রাজিব শেখ ঢুলুঢুলু চোখে প্রীতির দিকে তাকালেন।অস্ফুট স্বরে বলল,আম্মাজান।প্রীতি ঘৃণায় মুখ ফওরিয়ে নেয়।

রকি গা ঝেড়ে বলল,বন্দি পেয়ে নিজেদের ক্ষমতা জারি করছো?একবার শুধু বাঁধন ছুটিয়ে দাও তখন দেখবে আমি কি করি।

তরুণের রাগ উঠে গেলো।রকির হাত পায়ের বাঁধন ছুটিয়ে দিতে গেলো।হাতের বাঁধন খোলা হলেই রূপক আটকে দেয়।

বলল,এর কথায় কান দিয়ে কেসটাকে আর লম্বা করিসনা।আজই এই কেসের শেষ হবে।তরুণ সরে দাঁড়ালো।

রকি হাহা করে হেসে টিটকারি করে বলল,শালা এক-একটা কাপুরুষ।তরুণ আর দাঁড়িয়ে থাকলোনা।এবার বাঁধন খুলেই দিলো।সাথে রাজিব শেখের বাঁধন ও খুললো।উনার বাঁধন খুললেও তেমন কিছু করতে পারবেননা।উনার পায়ে গুলি লেগেছে।

রকি ওর পেছনে থাকা একজনের বাহুতে আঘাত করে পিস্তল নিয়ে নেয়।

বাঁকা হেসে পিস্তল প্রীতির দিকে তাক করে।প্রীতির প্রতি তার একটা ক্ষোভ আছে।একে মারলে রাজিব শেখ,ফারুখ,রকি তিনজনই জব্দ হবে।রূপক সাথে সাথে নিজের পিস্তল রকির দিকে তাক করে।রাজিব শেখ নিজেও একজনের থেকে পিস্তল নিয়ে রকির দিকে তাক করে বলল,আমার মেয়ের কিছু হলে তুই ছাড় পাবিনা।

রকি বাঁকা হেসে ট্রিগারে চাপ দিলো।কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই আওয়াজ হলো।রকি ধপ করে নিচে পড়ে গেলো।সারা শরীর রক্তে মাখামাখি।রাজিব শেখের পিস্তল থেকে গুলি বেরিয়েছে।রাজিব শেখ পরপর আরও তিনটি গুলি করে রকির বুক ঝাঁজরা করে দিলেন।

সবার বিস্ফোরিত দৃষ্টি সেদিকে।পেছন থেকে প্রীতির আর্তনাদ শুনে সবাই সেদিকে তাকালো।রূপক দেরি না করে দৌঁড়ে গিয়ে প্রীতির মাথা কোলে নিলো।

একসাথে দুজনের পিস্তল থেকে বুলেট বেরিয়েছে।রকির পিস্তল থেকে এসে প্রীতির পেটে বিঁধেছে আর রাজিব শেখের পিস্তল থেকে রকির বুকে।

রাজিব শেখ পা টেনে প্রীতির কাছে আসার আগেই রূপক প্রীতিকে কোলে তুলে দৌঁড় লাগালো।তার আগেই ফারুখ গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলো।

তরুণ ভেতরের সবকিছু সামলে নিয়ে সবাইকে নিয়ে থানায় চলে গেলো।রাজিব শেখের চোখ দিয়ে দু'ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো।এজন্যই বোধহয় হুমায়ুন আহমেদ বলেছিলেন—

–——পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে,কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই।

রূপকের কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে।প্রীতিকে শক্ত করে বুকে আগলে রেখেছে।অস্থির কন্ঠে ফারুখকে তাড়া দিয়ে বলল,আরও দ্রুত চালাও।ফারখ গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে আরও।রূপক চোখদুটো ক্রমশ লাল হয়ে আসছে।মনে হচ্ছে একটু পরই চোখ ভেঙে বর্ষণ নামবে।প্রীতি কাঁপা কাঁপা হাতে রূপকের গাল স্পর্শ করে বলল,আমি বাঁচতে চাই।আপনার সাথে বৃদ্ধ বয়স পার করতে চাই।আমি মরে গেলে যদি অন্যকেউ আপনার প্রিয়তমা হয়ে যায়।এটা আমি কিছুতেই মানতে পারবোনা।আমি খুব হিংসুটে স্বভাবের।আমিই শুধু আপনার প্রিয়তমা হবো আর কেউ নয়।

রূপকের চোখ দিয়ে গলাগলিয়ে পানি পড়তে লাগলো।কান্নামাখা কন্ঠে বলল,চুপ করো তুমি।তোরমার কষ্ট হবে কথা বললে।কিছুই হবেনা তোমার।আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি।তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।

সামনে ফারুখের চোখেও পানি।বারবার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে আর সে বারবার মুছে চলেছে।নয়তো ড্রাইভিং এ সমস্যা হতে পারে।

প্রীতি শ্বাসরুদ্ধ কন্ঠে বলল,আপনি কাঁদছেন কেনো?আমি আবার ফিরবোতো।আচ্ছা আমি যদি আর নাও ফিরি তাহলেও আপনি বিয়ে করতে পারবেননা।কথা দিন আমাকে।রূপক শব্দ করে কেঁদে উঠলো।প্রীতিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রীতির ঠোঁটে চুমু খেলো।সারামুখে পাগলের মতো চুমু দিয়ে বলল,কিছু হবেনা তোমার।তুমি আমার জন্য আল্লাহর দেয়া নিয়ামত,দামী উপহার।এই দামী উপহার আমি কখনো হারাতে দেবোনা।

প্রীতির শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো।.

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ।অস্তমিত সূর্যের লাল আভা পশ্চিম আকাশ জুড়ে বিস্তৃত।সমুদ্রের পানিতে এসে রক্তবর্ণ অন্তরিক্ষের ছায়া পড়ে তার সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে তুলেছে।আশেপাশে অনেকগুলো কপোত-কপোতী হাত ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে।মৃদুমন্দ বাতাসে দোলা দিয়ে যাচ্ছে মানবীর খোলা চুল।শাড়ির আঁচল বেশ লম্বা করে পেছনে ছড়িয়ে রাখা।বালির উপর দিয়ে এক পা এক পা করে প্রিয় মানবটির বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে হাঁটছে মানবী।চারদিকে কোলাহল হলেও ওই মানব মানবীর মধ্যে বিরাজ করছে নিরবতা।হঠাৎই নিরবতা কাটিয়ে মানবী কৌতুহলী কন্ঠে বলে উঠলো-আচ্ছা!আপনি আমার জন্মদিনে আমাকে উইশ করেননি কেনো?

নিরবতা কাটালো মানবটিও।মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল ঝাকুনি দিয়ে কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে বলল,জন্মদিনে উইশ করা কি বাধ্যতামূলক?

রূপক এমন খাপছাড়া এলোমেলো কথা শুনে প্রীতি মুখ ঘুরিয়ে নিলো।নিমিষেই মন খারাপ হয়ে গেলো তার।সবার জন্মদিনে তাদের স্বামীরা কত কত সারপ্রাইজ প্ল্যান করে আর ওর স্বামী সামান্য উইশটাও করলোনা।আবার বলছে উইশ করা কি বাধ্যতামূলক?

প্রিয়তমার মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাঁসলো রূপক।খ্যাঁক করে গলা পরিষ্কার করে বলল-"জন্মদিন মানে আনন্দ করার দিন নয়।জন্মদিন মানে তোমার জীবন থেকে আরো একটি বছর চলে যাওয়া।মৃত্যু আরও নিকটে চলে আসা।অথচ এই দিনটি সবাই কত আনন্দের সাথে পালন করে।কাড়িকাড়ি টাকা নষ্ট করে।আমি মনে করি এই দিনটি কখনো একজন মানুষের জন্য আনন্দের হতে পারেনা।আর যদি বলো ভালোবাসা প্রকাশের কথা?তাহলে আমি প্রতিদিন,প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকে ভালোবাসি।আর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত আমার ভালোবাসা একজনের নামে বরাদ্দ থাকবে।সে আমার প্রিয়তমা,সে আমার সন্তানের জননী,সে আমার বাম পাঁজরের হাড়,সে আমার সারাজীবনের চলার সঙ্গী।"

চোখে গভীর দৃষ্টি তাকিয়েও ভালোবাসা বিনিময় করা যায়।ভালোবাসাটা কিভাবে প্রকাশ করবে সেটা সম্পুর্ন তোমার নিজের উপর নির্ভর করে।লোকদেখানো কয়েকটা ট্রেন্ড ফলো করলেই ভালোবাসা প্রকাশ পায়না।

প্রীতি অপলক চোখে তাকিয়ে রইলো রূপকের দিকে।নেত্রপল্লব সামন্যতম সময়ের জন্যেও পলক ফেলছেনা।মন মস্তিষ্কে খেলছে,আসলেই তো কথাগুলোতো কোনোদিন গভীরভাবে ভেবে দেখিনি।জন্মদিন মানেতো জীবন থেকে সময় হারিয়ে যাওয়া।হায়াত ফুরিয়ে আসা।রূপকের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শাড়িতে পা বেজে পড়ার আগেই রূপক হাতের কব্জি ধরে সামলে নিলো প্রীতিকে।

রূপক এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রীতির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল-আগে রাস্তা দেখে হাঁটো।জামাটা তোমারই।দেখার জন্য সারাটা জীবন পড়ে আছে।

প্রীতি খানিকটা লজ্জা পেলো রূপকের কথায়।

বিয়ের পরপরই যেখানে মানুষ হানিমুনে আসে সেখানে রূপক প্রীতি বিয়ের দুইবছর পর এলো।

চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে আসছে,আঁধার ঘনিয়ে নিকটে আসছে।রূপক প্রীতি পাশাপাশি হেঁটে দুজন দুজনকে অনুভব করে চলেছে।

হাঁটতে হাঁটতে রূপকের স্মৃতির ফটকে ভেসে উঠলো এক বছর আগের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা।চোখের কোন ঝাপসা হয়ে এলো তার।

প্রীতির অবস্থা খুবই শোচনীয়।রূপক যেনো মুহূর্তেই অবুঝ হয়ে গেলো।এই মুহূর্তে তার কি করা উচিত সে উপলব্ধি করতে পারছেনা।প্রীতিকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে চলেছে।ফারুখ রূপকের কান্ডে অসন্তুষ্ট হলো।একজন পুলিশ অফিসারকে সব রকম মুহূর্তে শক্ত থাকতে হয় সেখানে রূপকের এমন করুণ দশা আশা করা যায়না।রূপক কেসগুলো কি সুন্দর হ্যান্ডেল করে অথচ এখন নিজেই ভেঙে পড়ছে।রূপক একটা ধমক দিয়ে ফারুখ বলল,কান্না থামিয়ে ওকে আশ্বস্ত করো।তোমাকে ভেঙে পড়তে দেখলে ও আরো ভয় পেয়ে যাবে।

একহাতে ড্রাইভ করে অন্যহাতে ফোন নিয়ে ফারুখ হাসপাতালে কল করলো।আগে থেকেই সব রেডি রাখার জন্য বলল।দ্রুত গাড়ি চালিয়ে প্রীতিকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো।

যেহেতু আগে থেকেই সব রেডি ছিলো তাই আর দেরি না করে প্রীতিকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো।রূপক ভেতরে যেতে চাইলেও ফারুখ যেতে দিলোনা।রূপক এখন যেই হালে আছে হয়তো ভেতরে সে প্রীতিকে ধরেই বসে থাকবে।ডাক্তারদের এগোতেও দেবেনা।অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই রূপক ফারুখকে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।ফারুখ নিজের চোখের পানি আড়াল করে রূপককে সামলাতে ব্যস্ত।বাড়িতে কেউ কিছুই জানেনা।আগে অপারেশন শেষ হোক পরে জানানো যাবে।

রূপকের পাগলামি দেখে ফারুখ স্তব্ধ।রূপক হাউমাউ করে কেঁদে বলছে,ওর কিছু হবেনা তো বলো?প্রীতির কিছু হলে আমার জীবনের সব রঙিন আলো নিভে অন্ধকার নেমে আসবে।জীবন থেকে সব রং মুছে গিয়ে সাদা কালো চাদরে ঢেকে যাবে।দ্বিতীয়বার কাউকে আমি হৃদয়ে স্থান দিতে পারবোনা।সে আমার প্রিয়তমা।সে হীনা অচল আমি।বেঁচে থেকেও মরার মতো হয়ে থাকবো।আমার এখনই মনে হচ্ছে দমটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।প্রাণটা প্রীতির কাছেই রয়ে গেছে।আল্লাহ যদি নিয়ে যায় তাহলে দুটো প্রাণ যেনো একসাথে নিয়ে যায়।

ফারুখ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রূপককে।ভালোবাসার মানুষ হারানোর যন্ত্রনা কতটা নিদারুণ সেটা ফারুখের চেয়ে আর কেউ ভালো জানেনা।বেঁচে তো আছে দেহটা।হৃদয়টা যে অনেক আগেই মরে গেছে।

হাসপাতালে আসা অনেকেই হাঁটার পথে ওদের দুজনকে দেখছে।কেউ কেউ এসে ভিড় জমিয়েছে।হয়তো অনেকেই জানার চেষ্টা করছে ওদের দুজনের কান্নার কারণ।হয়তো বা সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারছেনা।

ডাক্তার যখন বলেছিলো গুলি বের করা হয়েছে।রোগী এখন আউট অফ ডেন্জার তখন রূপকের দেহে যেনো প্রাণ ফিরে আসে।

ফারুখ দুই বাড়িতেই ফোন করে জানিয়ে দিলো।তারা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতালে এসে পড়েছেন।প্রীতিকে দেখার পালা একে একে সবাই শেষ করলো।ফারুখ সবাইকে সব ঘটনা বলতে ব্যস্ত রূপক সবে ধীর পায়ে কেবিনের দিকে পা বাড়ালো।প্রীতির এখনো জ্ঞান ফেরেনি।খুব বড় একটা অপারেশন হয়েছে।ডাক্তাররাই বলে দিয়েছে জ্ঞান ফিরতে দেরি হবে।

রূপক প্রীতির পাশে ফ্লোরে বসে পড়ে।ওর একটা হাতে ক্যানেলার লাগানো।অন্যহাত ধরে রূপক নিজের কাছে টেনে নেয়।কাঁপা কাঁপা হাতে স্পর্শ করে প্রীতির হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট ছোয়ায়।হাতটাকে নিজের বুকে চেপে ধরে বলল,আমি আর কখনো তোমাকে কোনো বিপদে পড়তে দেবোনা।সবসময় ছায়ার মতো তোমার পাশে থাকবো।তুমি কখনো আমাকে ছেড়ে যেওনা।

প্রীতি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।রূপকের বলা একটা কথাও তার কানে পৌঁছেনি।

পনেরোদিন হাসপাতালে থাকার পর রূপক এক প্রকার জোর করেই প্রীতিকে বাড়িতে নিয়ে যায়।ফিনাইলের গন্ধে প্রীতি অতিষ্ঠ হয়ে রূপককে বলল ওকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে।

এদিকে সব প্রমাণের ভিত্তিতে রাজিব শেখ আর মিরন হায়দারকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলো।সাথে রুবি আর ফারুখকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।রুবি অসৎ ব্যবসায় তার ভাইকে সাহায্য করেছে আর ফারুখ সব জেনেও পুলিশকে না জানিয়ে নিজে নিজে সব করার কারণে তাকেও একবছরের কারাদণ্ড দিলো।

প্রীতির কথায় ঘোর কাটলো রূপকের।প্রীতি ক্লান্তিমাখা কন্ঠে বলল,এবার হোটেলে ফিরে চলুন।আর হাঁটতে ভালো লাগছেনা।রূপক দুই ভ্রু কুচকে বলল,তুমিইতো বললে এখানে হাঁটাহাঁটি করবে।প্রীতি ঝিমিয়ে যাওয়া কন্ঠে বলল,এখন আর ভালোলাগছেনা।

রূপক দুষ্ট হেসে বলল,এখন হোটেলে ফিরে গেলে তুমি আমায় কি দিবে?

প্রীতি লজ্জা পেলেও কপট রাগ দেখিয়ে বলল-কচু দেবো আপনাকে।

রূপক কান পেতে বলল,কিহ!সারারাত ভালোবাসবে?আচ্ছা চলো আমি রাজি আছি।প্রীতি রূপকের বাহুতে কিল মেরে হাঁটা ধরলো।রূপকও হেসে দিয়ে পিছু পিছু গেলো।হোটেলে গিয়ে রুমের কাছাকাছি যেতেই রূপক প্রীতিকে কোলে তুলে নিলো।প্রীতি কিছু বলতে গেলেই রূপক চুপ করিয়ে দিয়ে বলল,আজ কোনো এক্সকিউজ চলবেনা।ভালোবাসা চলবে।

পরিশিষ্ট★

থানা থেকে এসে রুমে চলে গেলো রূপক।প্রীতি রূপককে দেখে একগ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে নিয়ে রুমে ঢুকলো।গ্লাসটা রূপকের দিকে বাড়িয়ে দিতেই রূপক মাথার ব্যারেট ক্যাপটা প্রীতির মাথায় পড়িয়ে দেয়।অর্ধেক শরবত খেয়ে বাকিটা প্রীতির দিকে বাড়িয়ে দেয়।প্রীতি দ্বিরুক্তি না করে নিমিষেই বাকি শরবতটুকু গিলে ফেলে।কয়েকবছর ধরেই এটা চলে আসছে।রূপক মুচকি হেসে প্রীতির ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা লেবুর কণাটুকু মুছে ওয়াশরুমে চলে যায়।

প্রীতি গ্লাস নিয়ে নিচে নেমে যায়।

তিনবছর ধরে রূপক আর প্রীতি চট্টগ্রামে থাকে।রূপকের বদলি হওয়াতে এখানে চলে এসেছে সবাই।বাবা মা কিছুদিন রাহাতের কাছে ঢাকায় থাকে কিছুদিন রূপকের কাছে থাকে।এখন রাহাতের বাসাতেই আছে তারা।রূপক আর প্রীতির দুটো জমজ ছেলে হয়েছে।রাহাতেরও জমজ দুইটা ছেলে হয়েছে।

তাই রূপকের বাবা গ্রামের বাড়িতে "জমজ ভীলা" নেইম-প্লেট লাগিয়ে দিয়েছেন।বছরে দুইবার ঈদে সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে যায়।

রূপক আর প্রীতির দুই ছেলের নাম ইফাজ আর ইয়াজ।চার বছর বয়স চলছে দুজনের।রূপক ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দুজনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়েছে।তিন বাপ ছেলে মিলে খাটের উপর লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে।ইফাজ পানি খেতে খাট থেকে নামলো।দরজার দিকে নজর যেতেই দেখলো প্রীতি আসছে।ইফাজ লাফিয়ে উঠে সবাইকে সাবধান করে বলল-হিটলারনী আম্মু আসতেছে!হিটলারনী আম্মু আসতেছে।

এতক্ষণ লাফালাফি হলেও মুহূর্তেই সব শান্ত হয়ে গেলো।সবাই চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।প্রীতি রুমে ঢুকে একপলক সব কিছু পরোখ করে চিৎকার করে উঠলো।

এই কি করেছো তোমরা বাপ ছেলে মিলে?বিছানার এই অবস্থা কেনো?এখানে কি গরু ঘুমায়?মনে হচ্ছে কুস্তি লড়েছো তিনজনে।

কেউ নড়চড় করছেনা।প্রীতি একটা শলার মুঠা এনে এলোপাতাড়ি সবাইকে পেটানো শুরু করলো।রূপক,ইফাজ,ইয়াজ তিনজনেই খাট থেকে নেমে দৌঁড়ে বাইরে চলে গেলো।

প্রীতি শলার মুঠা রেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো।ওরা বাবা-ছেলে তিনজনই দরজার কপাট ধরে উঁকি দিয়ে দেখছিলো।তারাও হেসে দিলো।এবার চারজনেই রুমের ভেতর পড়ে লড়াই শুরু করে দিলো।শেষে প্রীতি সোফায় বসে থেকে রূপক,ইফাজ আর ইয়াজের হাতেই বিছানা গোছালো।

আজ সবাই গ্রামের বাড়ি যাবে।কিছুদিন পরই মনির বিয়ে।গ্রামে থেকেই রূপকের বাবা মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করতে চাইছেন।রূপক প্রীতি বাচ্চাদের নিয়ে আগে ঢাকায় যাবে সেখান থেকে সবাই একসাথ হয়ে গ্রামে যাবে।

প্রীতি ছেলেদের রেডি করিয়ে দিলো।তারা বসার রুমে খেলছে।রূপক প্রীতিকে তাড়া দিলো ওর সামনে আসার জন্য।শাড়ী পড়ে রূপকের সামনে দাঁড়াতেই রূপক প্রীতিকে ঘুরিয়ে দিলো।অনেকদিন প্রীতিকে বেনুনি করতে দেখে দেখে নিজেও শিখে নিলো।এখন প্রীতির চুলে যত্ন করে বেনুনি করে দিলো।

সবাই মিলে গ্রামের বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালো।বাড়ির সামনের নেইম-প্লেটের দিকে তাকিয়ে সবাই একদফা হাসলো।কি সুন্দর গুটিগুটি অক্ষরে লিখা"জমজ ভীলা"।

বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসলো।ফারুখ আর তার মাও এসেছে।ফারুখ সোফায় বসে ফোন টিপছে।মনি একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।ছেলেটা বিয়ে করবেনা বলে পণ করেছে।যদি কখনো তাকে বিয়ের জন্য জোর করা হয় তবে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে বলে হুমকি দিলো সবাইকে।প্রথম প্রথম মনির ফারুখকে দেখে মায়া হতো।যখনই বাড়িতে আসতো তখনই দেখতো ফারুখ উদাসীন,মলিন চেহারা বানিয়ে ঘুরতো।সেই মায়াকে মনি ভালোবাসা নাম করণ করে ফারুখকে জানালে ফারুখ মনিকে বোঝালো,এটা ভালোবাসা নয় মায়া।যদিও ভালোবাসা হয়ে থাকে তবুও আমার কিছু করার নেই।আমি স্বপ্নাকে ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে মেনে নিতে পারবোনা।

সময়ের সাথে সাথে মনিও সরে আসে।ভালোবাসা হলে হয়তো ভুলতে পারতোনা।মায়া বলেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।

ইফাজ আর ইয়াজ মিলে ফারুখের চুলনিয়ে জুটি করছে।সে চুপচাপ বসে রইলো।প্রীতিকে দেখে ইফাজ ইয়াজ ভদ্র ছেলের মতো মামুর পাশে বসে রইলো।ফারুখ মিটিমিটি হাসছে।

অবশেষে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।বিবাহ সম্পন্ন করে বিদায় দেওয়ার পালা এসে গেছে।বিদায়ের পাট চুকিয়ে মেহমানরা সবাইও বিদায় নিলো।তরুণ আর রুবিও এসেছিলো বিয়েতে।

রাত্রি বারোটা।ফারুখ একটা গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে স্বপ্নার কবরের পাশে।আজও বলে চলেছে আমি তোমাকে ভালোবাসি প্রিয়তমা।

অপরদিকে রূপক প্রীতি একে অপরের ভালোবাসায় ডুবে আছে।রূপকের বলা ভালোবাসি প্রিয়তমা আর ফারুখের বলা ভালোবাসি প্রিয়তমার মধ্যে একটাই পার্থক্য।একজনের ভালোবাসা পৃথিবীর বুকে বিরাজমান অন্যজনের ভালোবাসা প্রাণহীন হয়ে মিশে আছে মাটির তলায়।

সমাপ্ত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন