ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফেলে আসা সেই লাস্ট বেঞ্চ

১ম পর্ব

লেখক: Afifa Maksura Esha

"ফেলে আসা সেই লাস্ট বেঞ্চ"

লেখক: আফিফা মাকসুরা এশা
পাঠ–১ 
বিকেলের শেষ আলোটা তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। স্কুল ছুটির ঘণ্টা অনেক আগেই বেজে গেছে। তবুও স্কুলের সামনের রাস্তায় এখনও ছেলে-মেয়েদের ভিড়।
কেউ দল বেঁধে হাঁটছে।
কেউ বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে হেঁটে যাচ্ছে।
কেউ আবার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি কিনে খাচ্ছে।
আমি দূর থেকে ওদের দেখছিলাম। কেন জানি না, হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
ওদের দেখে মনে হলো, আমি যেন আর এই সময়ে নেই। চোখের সামনে থাকা স্কুলটা ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে পাঁচ বছর আগের সেই স্কুল হয়ে গেল। সেই একই রকম ইউনিফর্ম।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল আমাদের কথা। আমাদের ছয়জনের একটা গ্রুপ ছিল—আমি, সাদিয়া, ইফতি, রিমি, হিমি আর হাফসা।
এক সময় আমরাও ঠিক ওদের মতোই ছিলাম। আমাদেরও মনে হতো, এই বন্ধুত্ব এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে না; অন্তত ক্লাস টেন পর্যন্ত তো একসঙ্গে থাকবই। একজন স্কুলে না গেলে বাকিদেরও স্কুলে যেতে ইচ্ছে করত না। স্কুলে যাওয়ার আসল কারণটাই ছিল—সবাই একসঙ্গে থাকা। কেউ একদিন স্কুলে না এলে প্রথম প্রশ্নটাই হতো, "ও আজ আসেনি কেন?"
পাঠ–২ 
আমাদের সকালের শুরুটা হতো সকাল ছয়টায়। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে, তৈরি হয়ে বেশিরভাগ দিন না খেয়েই বের হয়ে যেতাম। তখনই শুরু হতো মায়ের কড়া বকুনি! কখনো কখনো খেয়ে বের হতাম, তবে বেশিরভাগ দিনই না খেয়ে ছুটতাম সবাই।
গণিত প্রাইভেট শেষ করে আবার স্কুলের পথ ধরতাম। স্কুলে যাওয়ার পথটাই ছিল দুষ্টুমি আর মজায় ভরা। চুপিচুপি একজন আরেকজনের ব্যাগের চেইন খুলে দেওয়া ছিল নিত্যদিনের কাজ। আমাদের সাথে ৩-৪ জন ছেলে ক্লাসমেটও ছিল। ওদের দুষ্টুমির তো কোনো সীমা ছিল না! ওরা সুযোগ পেলেই ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে ইট, চিপস আর চকোলেটের খালি প্যাকেট বা ময়লা রেখে দিত। এই ভয়ে আমরা ব্যাগটা বুকের সামনে নিয়ে হেঁটে যেতাম।
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সাদিয়া মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে ফেলত, তাই প্রাইভেটে যেতে পারত না। আমরা সবাই স্কুলে গিয়ে দেখতাম সাদিয়া ক্লাসের বাইরে চুপচাপ বসে আছে।
পাঠ–৩ 
আমরা সবাই ক্লাসে ব্যাগ রেখে সোজা চলে যেতাম ক্লাসরুমের পাশে থাকা সেই বিশাল বট গাছটার নিচে। সেখানে বসে আমাদের কত রকম গল্প জমে উঠত!
সকাল ৯টায় ইংরেজি ম্যাম আসতেন প্রাইভেট পড়াতে, তখন ক্লাসে যেতাম। তবে কখনো কখনো ফাঁকিও দিতাম—আমি, ইফতি আর সাদিয়া। ম্যাম যখন মন দিয়ে পড়াতেন, মাঝে মাঝে আমি আর সাদিয়া ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলতাম ম্যাম এর সেই পরিচিত কথাটা—
—“হ্যাঁ, এটা পড়ো! সারা জীবন কাজে লাগবে। মরার আগেও কাজে লাগবে, মরার পরও কাজে লাগবে!”
একথা বলেই আমরা দৌড় দিতাম।
১০টায় মূল ক্লাস শুরু হতো। প্রথম ক্লাসটাই ছিল ইংরেজি, যা একদম মজা আর ফাজলামিতে কেটে যেত। একবার তো ইফতির ভাই আমার ব্যাগে অর্ধেকটা ইট রেখে দিয়েছিল! আমি জানতাম না কে রেখেছে। ইফতি আর সাদিয়া বানিয়ে বলল, রিফাত নাকি রেখেছে। আমি রেগে গিয়ে ম্যাম এর কাছে বিচার দিলাম, আর বেচারা রিফাত মার খেল! পরে ইফতি হেসে বলল ওর ভাই এই কাজ করেছে। এরপর আর কী বলব, সবাই মিলে হাসাহাসি করলাম।
পাঠ–৪ 
টিফিনের সময় হলে সবাই একসঙ্গে স্কুলের বাইরের দোকান থেকে সমুচা, সিঙ্গারা আর ঝালমুড়ি কিনে নিয়ে আসতাম। তারপর আমাদের ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে গোল হয়ে বসে ভাগাভাগি করে খেতাম।
আমি স্কুলে মাঝে মাঝে ফোন নিয়ে যেতাম। টিফিন শেষ হলে ফোন নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ইফতি কার সাথে যেন কথা বলত, আর আমি আর সাদিয়া বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতাম। কেউ আসছে দেখলে ইশারা করতেই ইফতি ফোন লুকিয়ে ফেলত।
মাঝে মাঝে ওরা সবাই মিলে মাঠে খেলত, আর আমি একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখতাম; নিজে খেলতে যেতাম না।
পাঠ–৫ 
একদিন টিফিনের পর ছিল আমাদের এক কড়া স্যারের ক্লাস। সবাই মিলে বুদ্ধি করলাম, কীভাবে ক্লাসটা এড়ানো যায়। প্ল্যান অনুযায়ী পুরো ক্লাসরুম ঝাড়ু দেওয়া শুরু করলাম, যাতে ধুলোবালির জন্য ওই স্যার আর ক্লাস নিতে না পারেন। ওইদিন সত্যিই স্যারের ক্লাস আর করা লাগেনি!
ক্লাসের ফাঁকে আমাদের আরেকটা দুষ্টুমি ছিল—একজন আরেকজনের হিজাবে গিট দিয়ে রাখা, বোরকার ফিতায় গিট লাগানো কিংবা চুপিচুপি ফিতা খুলে ফেলা। মাঝে মাঝে তো আমরা স্কুল পালিয়েও যেতাম। কত যে মজা, ভন্ডামি আর দুষ্টুমিতে ভরা ছিল সেই দিনগুলো!
পাঠ–৬ 
আমরা ভেবেছিলাম ক্লাস নাইনেও এভাবেই একসঙ্গে থাকব। কিন্তু কে জানত, ক্লাস নাইন থেকেই আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে!
ক্লাস নাইনে ভর্তির সময় সবাই সায়েন্স নিল—সাদিয়া, ইফতি, রিমি, হিমি আর হাফসা। কিন্তু আমি নিলাম আর্টস। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল, একা একা খুব কান্নাকাটি করলাম। তবে কিছুদিন পর রিমি আর হিমি আর্টসে চলে আসল। তখন একটু শান্তি পেলাম যে না, আমার সাথে রিমি আর হিমি তো আছে!
কিন্তু নাইনে উঠে আগের মতো আর কেউ ঠিক করে ক্লাস করতাম না, শুধু পরীক্ষাগুলো দিতাম। হাফসা নতুন বান্ধবী বানিয়ে ফেলল, আমাদের সাথে আর আগের মতো আসত না। আর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা দেওয়ার পর শুধু আমি আর ইফতি স্কুলে যেতাম। সাদিয়া তখন আর ময়মনসিংহে নেই, ঢাকায় চলে গেছে। রিমি আর হিমিও স্কুলে নিয়মিত আসত না। আগের মতো আর কিছুই ঠিক ছিল না; কেমন যেন অন্ধকারে সব ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল।
পাঠ–৭ 
স্কুলজীবন শেষ হয়ে গেল। সময়ের ব্যবধানে আমরা আজ একেকজন একেক জায়গায় ছিটকে পড়েছি; কারও সাথে কারও দেখা নেই। শুধু অনলাইন গ্রুপে মাঝে মাঝে কথা হয়।
সব ভাবনার ইতি টেনে একদিন বাড়ি ফিরে আমাদের অনলাইন গ্রুপে মেসেজ দিলাম—সবাই একদিন একসঙ্গে দেখা করার ব্যাপারে। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল কারো উত্তর "হ্যাঁ", আবার কারো "সময় নেই"। শেষমেশ আমি, সাদিয়া, ইফতি, রিমি আর হিমি মিলে একটা তারিখ চূড়ান্ত করলাম—সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ।
ফোনটা রেখে পাশে থাকা বোনের সাথে গল্প জুড়লাম। আমি ভীষণ খুশি! বোনকে বলতে লাগলাম, "সাদিয়া সেই ড্রামা পাগলি মেয়েটা কি এখনো ড্রামার নায়কদের নিয়ে পাগলামি করে, নাকি বদলে গেছে? ইফতি হয়তো আগের মতোই আছে। আর রিমি-হিমি ওরা?"
আমার বোন হেসে উঠে বলল, "আরে এশা আপু! এগুলো এখন বাদ দাও, যখন দেখা হবে তখন দেখা যাবে। আজ তো দুই তারিখ, আর মাত্র দুদিন বাকি।"
আমি বললাম, "হুম, ঠিকই বলেছিস বনু।"
পাঠ–৮
অনলাইন গ্রুপে কথা বলতে বলতে সবাই খুব এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিলাম। দেখতে দেখতে এল সেই ৫ সেপ্টেম্বর।
বাড়ি থেকে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যে জায়গায় ছুটির দিনে প্রাইভেট শেষে আড্ডা দিতাম, সেই টিএসসি-তে গিয়ে দেখি সাদিয়া আর ইফতি আগেই এসে অপেক্ষা করছে। বরাবরের মতো আজও আমি লেট, অভ্যাসটা বদলায়নি! ওদের সামনে যেতেই চোখের কোণে পানি চলে এল—কতদিন পর দেখা!
ততক্ষণে রিমি আর হিমিও এসে হাজির হলো। সময় বদলেছে, হয়তো তার সাথে আমরাও কিছুটা বদলেছি। পাঁচজন একসঙ্গে বসে কতক্ষণ গল্প করলাম। আগে যেমন ফুচকা আর ভেলপুরি খেতাম, আজও খেলাম; কিন্তু মনের ভেতরে আগের মতো সেই নির্ভাবনার শান্তিটা পেলাম না।
পাঠ–৯ 
খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমরা পাঁচজন স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম আমাদের পুরনো স্কুলে। এতদিন পর স্কুলে পা রাখলাম—স্কুলটা কেমন যেন বদলে গেছে, নাকি আমরাই বদলে গেছি?
পরিচিত কিছু স্যার-মেডামের সাথে কথা বলে চলে গেলাম আমাদের সেই পুরনো ক্লাস এইটের ক্লাসরুমে। কাঠের বেঞ্চে খোদাই করে লেখা আমাদের নামগুলো আজও স্পষ্ট রয়ে গেছে! ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে পাশে গিয়ে দেখি, সেই বিশাল বটগাছটা আজও ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
স্কুল থেকে বেরিয়ে আমরা হাতে ঝালমুড়ি নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আগেও এভাবেই ঝালমুড়ি খেতে খেতে অর্ধেক রাস্তা হেঁটে যেতাম। হাঁটতে হাঁটতে পুরনো দিনের কথা বলছিলাম, ঠিক তখনই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। মনে পড়ে গেল, ক্লাস এইটে থাকতেও একদিন এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সবাই বাড়ি ফিরেছিলাম।
পাঠ–১০ 
হঠাৎ কোথা থেকে একটা তীব্র গতির গাড়ি ছিটকে চলে এল আমাদের দিকে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিকট শব্দ... আর তারপর সবকিছু এক মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল!
রাস্তার জমা বৃষ্টির পানি নিমেষেই লাল রক্তে মিশে যেতে লাগল। সাদিয়া আর ইফতির গায়ে সবচেয়ে বেশি আঘাত লেগেছিল। চারপাশের মানুষ ছুটে এসে সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল; রিমি আর হিমিও রক্তাত্ত অবস্থায় পড়ে আছে। 
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দের মাঝে আমার চারপাশটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই জীবনের সব স্মৃতিগুলো শেষবারের মতো ভেসে উঠছিল চোখের সামনে—সেই সব পুড়নো সৃতি ,  সবার সাথে কাটানো কিছু সুন্দর মুহূর্ত গুলো , লাস্ট বেঞ্চ, আর আমাদের ক্লাস এইট...
হাসপাতালে নিতে নিতেই নিঃশ্বাস থেমে গেল। হাত থেকে পড়ে গেলো সেই ছোট্ট চিরকুট টা সেখানে লিখা ছিলো লাস্ট বেঞ্চ আর সেই বট গাছ আমাদের দৌড়াদৌড়ি, দুষ্টুমির, গল্পের সাক্ষী  আর এভাবেই, চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে গেল ওদের বন্ধুত্বের গল্পটি।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসতো মেয়েটা সেই বৃষ্টির মধ্যেই প্রান গেলো।
— সমাপ্ত —

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন