ক্লাস শেষ করে মেঘ আর মিম একসঙ্গে বের হলো। আজকে আর ক্লাস করবে না তারা। প্রথম দিনের ক্লাসেই বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছে দুজন। তাই ঠিক করল, যার যার বাসায় গিয়ে একটু বিশ্রাম নেবে।
ভার্সিটির গেটের সামনে এসে মেঘ বলল,
—আচ্ছা, তুই তাহলে বাসায় যা। কাল দেখা হবে।
মিম ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বলল,
—হুম। তুইও সাবধানে যাস।
—তুইও।
দুজন দুইদিকে চলে গেল।
মিম বাসায় আসতেই তার মা মনোয়ারা খান দরজার কাছে এসে বললেন,
—কিরে, তোর ভার্সিটিতে প্রথম ক্লাস কেমন গেল?
মিম জুতা খুলতে খুলতে বলল,
—ভালোই, মা।
মনোয়ারা খান মুচকি হেসে বললেন,
—নতুন জায়গা কেমন লাগল?
—ভালোই। তবে অনেক নতুন মানুষ। সবাইকে তো আর একদিনে চেনা সম্ভব না।
—নতুন কোনো বন্ধু হয়েছে?
মিম একটু হেসে বলল,
—হুম, মেঘ তো আছেই।
—আচ্ছা, যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি।
মিম আর কিছু বলল না। নিজের রুমে গিয়ে ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে বসতেই মনোয়ারা খান তার সামনে খাবার এগিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি যেন কিছু একটা বলতে চেয়েও বলছেন না।
মিম সেটা বুঝতে পেরে বলল,
—মা, কী হয়েছে? কিছু বলবে?
মনোয়ারা খান একটু ইতস্তত করে বললেন,
—একটা কথা বলব, রাগ করিস না।
মিম খেতে খেতে বলল,
—বলো।
—তোর জন্য ভালো একটা সম্বন্ধ এসেছে।
কথাটা শুনতেই মিমের হাত থেমে গেল। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
—আবার শুরু করলে?
—আরে, আগে পুরো কথাটা তো শুন।
—কী শুনব? বলেছি না, আমি এখন বিয়ে করব না!
মনোয়ারা খান শান্তভাবে বললেন,
—আমি তো বলিনি এখনই বিয়ে করতে হবে। শুধু ছেলেপক্ষ থেকে কথা এসেছে।
মিম বিরক্ত হয়ে বলল,
—আমার এসব একদম ভালো লাগে না। আমি এখন পড়াশোনা করব। বিয়ে-শাদির চিন্তা আমার মাথায় নেই।
—কিন্তু ছেলেটা নাকি ভালো।
—সবাই নিজের ছেলেকে ভালোই বলে!
মনোয়ারা খান হেসে বললেন,
—তুই আগে দেখবি তো!
মিম মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—না, কিছুই দেখব না। ধুর! বিয়ে-শাদির কথা ভালো লাগে না। আর খাব না।
এই বলে সে উঠে দাঁড়াল।
মনোয়ারা খান বললেন,
—আরে রাগ করিস না। খেয়ে যা না।
মিম আর কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেল।
অন্যদিকে মাহদিব তার এক বন্ধুকে ডেকে বলল,
—ওই মেয়েটার ফুল বায়োডাটা চাই।
বন্ধু অবাক হয়ে বলল,
—কোন মেয়ে রে?
মাহদিব বলল,
—আরে, ওই যে নতুন এসেছে। যেটার কথা তোকে বললাম।
—ওই তারকাটা মেয়েটা?
—হুম, ওইটাই।
বন্ধু একটু হেসে বলল,
—হঠাৎ ওই মেয়ের বায়োডাটা দিয়ে কী করবি?
মাহদিব গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—যা বলেছি, সেটা কর। এত প্রশ্ন করিস কেন?
বন্ধু মুচকি হেসে বলল,
—আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়।
মাহদিব আর কিছু বলল না। তবে তার মুখের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
পরের দিন সকাল
আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। কখনো ঝিরঝির, আবার কখনো একটু জোরে। বৃষ্টির কারণে চারপাশটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
মিম ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বৃষ্টি দেখল। বৃষ্টি তার খুব একটা খারাপ লাগে না। বরং বৃষ্টি শেষে যখন আকাশ পরিষ্কার হয়ে ঝলমলে রোদ ওঠে, তখন তার আরও ভালো লাগে।
কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশের মেঘ সরে গিয়ে সূর্যের আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
মিমের সাদা রং খুব পছন্দ। তাই আজ সে আলমারি খুলে তার প্রিয় সাদা রঙের একটি জামা বের করল।
জামাটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল। তারপর চুলগুলো ঠিক করে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তায় তখনও বৃষ্টির পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও কাদা-পানি ছোট ছোট গর্তের মতো হয়ে আছে।
মিম খুব সাবধানে হাঁটছিল। কারণ তার সাদা জামাটা একদম নতুন।
কলেজের গেটের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ পেছন থেকে একটা বাইকের শব্দ শোনা গেল।
মিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই শাঁ করে তার পাশ কাটিয়ে ছুটে গেল একটি বাইক।
বাইকটা চালাচ্ছিল মাহদিব।
রাস্তার কাদা-পানি বাইকের চাকার নিচে পড়ে ছিটকে সরাসরি এসে লাগল মিমের সাদা জামায়।
মিম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে নিজের জামার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তার মুখের চেহারা মুহূর্তেই বদলে গেল।
—এই বাঁদর! লেজকাটা হনুমান! আমার সঙ্গে আপনার কোন জন্মের শত্রুতা আছে?
মাহদিব কিছুটা সামনে গিয়ে বাইক থামাল। তারপর ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
মিমকে রাগে ফুঁসতে দেখে সে বাইক থেকে নেমে এল।
মাহদিব কিছু বলার আগেই মিম বলল,
—আপনি বাইক চালান, নাকি মানুষকে গোসল করান?
মাহদিব মিমের জামার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল কী হয়েছে। কিন্তু মিমের রাগী মুখ দেখে তার মুখে হাসি চলে এল।
সে ফিক করে হেসে ফেলল।
মিম যেন এতে আরও রেগে গেল।
—হাসছেন কেন?
মাহদিব বলল,
—আরে, ভুল হয়ে গেছে।
—ভুল? এটা আপনার কাছে ভুল?
—হুম।
—আপনার জন্য আমার পুরো জামাটা নষ্ট হয়ে গেছে!
মাহদিব বলল,
—এত রাগ করার কী আছে? পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মিম রাগে বলল,
—আপনি চুপ করুন!
তারপর আরও রেগে গিয়ে বলল,
—চাইনিজ চামচিকা! বার্মিজ বাঁদর! তোকে আমি দেখে নেব। আমার প্রিয় জামাটা তুই নষ্ট করে দিয়েছিস!
মাহদিব এবার কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। এত সুন্দর একটা মেয়ে যে এত রাগী হতে পারে, সেটা হয়তো সে ভাবেনি।
মিম আর দাঁড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে গেল।
মাহদিবও বাইকে উঠে কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুদূর যেতেই মিমের সঙ্গে মেঘের দেখা হলো।
মিমকে দেখে মেঘ এগিয়ে এসে বলল,
—কিরে, তুই এভাবে কাকে বকছিস? আর তোর পোশাকের এই অবস্থা কেন?
মিম রাগে গজগজ করে বলল,
—ওই পার্শিয়ান হাতির ডিমটা করেছে!
মেঘ অবাক হয়ে বলল,
—এটা আবার কে?
মিম দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—আরে, ওই কাল্লু বাঁদর!
মেঘ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল,
—ওহ! মাহদিব?
—হ্যাঁ! আর ওর নামও আমার সামনে নিবি না।
—কী করেছে সে?
মিম পুরো ঘটনাটা মেঘকে বলল।
সব শুনে মেঘ হাসি চেপে বলল,
—আচ্ছা, যা হয়েছে হয়েছে। মন খারাপ করিস না। চল, ড্রেসটা পরিষ্কার করে আসি।
মিম জামার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—আমার এত পছন্দের জামাটা!
মেঘ তার হাত ধরে বলল,
—চল, ঠিক হয়ে যাবে।
মিমও মেঘের কথায় সায় দিয়ে বলল,
—হ্যাঁ, চল, চল।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
তবে মিমের মাথায় তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
এই মাহদিবকে সে কিছুতেই ছাড়বে না!
আর অন্যদিকে মাহদিবের মুখে তখনও সেই মুচকি হাসি।
কিন্তু মিম জানত না, আজকের এই ছোট্ট ঝগড়াটাই হয়তো তাদের গল্পের শুরু।
আর মাহদিবও জানত না, যে মেয়েটাকে আজ সে রাগিয়ে দিয়েছে, সেই মেয়েটাই হয়তো একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।
চলবে❔
হঠাৎ প্রেম
লেখক: শাওন ইসলাম রাজ
❗ লেখকের অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❗