ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমাদের কাজিন বাড়ি পাগলামির কারখানা

১ম পর্ব

লেখক: Adiba

আমাদের কাজিন বাড়ি, পাগলামির কারখানা

লেখিকা: আদিবা
পর্ব- ১

সকাল সকাল খান বাড়িটা দেখে মনে হবে, এখানে মানুষ থাকে না—একদল পাগল থাকে!

কারও হাতে বালিশ, কেউ দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, কেউ আবার চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে।

—“মা-আ-আ! আমার শার্টটা কে লুকাইছে?”

উপরতলা থেকে একটা মেয়ের গলা ভেসে আসতেই নিচে বসে থাকা সবাই একসঙ্গে কান চেপে ধরল।

সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন বাড়ির বড় সাহেব। বিরক্ত মুখে পত্রিকা নামিয়ে বললেন,

—“সকালবেলা আবার শুরু হয়ে গেল!”

পাশ থেকে একজন হেসে বলল,

—“চাচা, এটা তো প্রতিদিনের নিয়ম!”

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ শব্দ করে নেমে এলো মেহরিন।

চুল এলোমেলো, হাতে একটা বালিশ, চোখেমুখে রাগ।

—“কেউ আমার রুমে ঢুকেছিল?”

কেউ কোনো উত্তর দিল না।

মেহরিন সন্দেহের চোখে সবাইকে দেখতে লাগল।

—“আমি কিন্তু জিজ্ঞেস করছি—আমার রুমে কে ঢুকেছিল?”

সোফার একপাশ থেকে শান্ত গলায় উত্তর এলো,

—“আমি।”

মেহরিনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে গেল।

সোফায় পা তুলে আরাম করে বসে আছে আরিশ।

পরনে কালো টি-শার্ট, চুল এলোমেলো, মুখে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি।

মেহরিন তাকিয়ে বলল,

—“তুমি?”

আরিশ পত্রিকার আড়াল থেকে মুখ বের করে বলল,

—“হ্যাঁ, আমি। সমস্যা?”

—“আমার রুমে ঢুকেছিলে কেন?”

—“চুরি করতে।”

মেহরিন এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

—“কি?!”

আরিশ হেসে বলল,

—“তোমার শান্তি চুরি করতে।”

চারপাশে থাকা সবাই হেসে উঠল।

মেহরিন রাগে বালিশটা ছুড়ে মারল।

আরিশ মাথা নিচু করে বালিশটা এড়িয়ে গেল।

বালিশটা গিয়ে পড়ল পাশের ফুলদানির ওপর।

—“এই!”

বাড়ির বড় সাহেব চিৎকার করে উঠলেন।

মেহরিন থমকে গেল।

আরিশও চুপ।

দুজনেই ধীরে ধীরে ফুলদানিটার দিকে তাকাল।

ফুলদানিটা কাত হয়ে আছে।

বড় সাহেব চোখ বড় বড় করে বললেন,

—“ওটা কিন্তু তোমাদের দাদির প্রিয় ফুলদানি!”

মেহরিন ফিসফিস করে বলল,

—“আমি তো ইচ্ছা করে মারিনি…”

আরিশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

—“চাচা, ও ইচ্ছা করেই মারছে।”

মেহরিন ঘুরে তাকাল।

—“তুমি চুপ করো!”

—“আমি তো সত্যি কথাই বললাম।”

—“তোমার জন্যই হয়েছে!”

—“আমার জন্য?”

—“হ্যাঁ!”

—“তুমি বালিশ ছুড়েছো।”

—“তুমি আমার রুমে ঢুকেছিলে!”

—“তুমি আমাকে বালিশ মেরেছো।”

—“তুমি আমাকে রাগিয়েছো!”

—“তুমি এমনিতেই রাগী।”

—“আর তুমি একটা অসহ্য মানুষ!”

আরিশ মুচকি হেসে বলল,

—“ধন্যবাদ।”

—“ধন্যবাদ কেন?”

—“তুমি অন্তত আমাকে মানুষ বলেছো। আমি ভাবছিলাম তুমি আমাকে দানব বলবে।”

আবার হাসির রোল পড়ে গেল পুরো বাড়িতে।

মেহরিন দাঁত কড়মড় করে বলল,

—“আমি তোমাকে একদিন ঠিক করব!”

আরিশ উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

—“সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি।”

দুজনের চোখাচোখি হলো।

এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই মেহরিন আরিশের পায়ে পা দিয়ে দিল।

—“আহ!”

আরিশ লাফ দিয়ে উঠল।

মেহরিন দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে যেতে যেতে বলল,

—“শিক্ষা নাও!”

আরিশ পেছন থেকে চিৎকার করল,

—“মেহরিন! দাঁড়াও! আজ তোমাকে আমি ছাড়ব না!”

মেহরিন পেছনে তাকিয়ে জিহ্বা বের করে দিল।

—“পারলে ধরো!”

আরিশও দৌড় দিল।

—“আজকে তোকে আমি—”

—“এই এই! সকাল সকাল আবার শুরু করছিস?”

একজন মহিলা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

তিনি আরিশের মা।

আরিশ তাকে দেখেই দৌড় থামিয়ে ফেলল।

—“মা!”

মা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,

—“কী হচ্ছে এখানে?”

আরিশ একদম নিরীহ মুখ করে বলল,

—“কিছুই না, বুড়ি বস।”

মহিলার চোখ কপালে উঠল।

—“কী বললি?”

আরিশ হেসে বলল,

—“বুড়ি বস।”

—“তোর সাহস তো কম না!”

তিনি হাতে থাকা খুন্তি নিয়ে আরিশের দিকে এগিয়ে গেলেন।

আরিশ সঙ্গে সঙ্গে সোফার পেছনে লুকিয়ে পড়ল।

—“মা, তুমি কিন্তু তোমার ছেলেকে মারতে পারো না!”

—“আজ তোকে খুন্তি দিয়ে এমন শিক্ষা দেব, জীবনে আর কাউকে বুড়ি বস বলবি না!”

—“কিন্তু মা, তুমি তো আমার বস!”

—“চুপ!”

—“আর তুমি একটু বুড়িও…”

—“আরিশ!”

আরিশ হাসতে হাসতে দৌড়ে পালাল।

মেহরিন সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তার হাসি থামছিল না।

আরিশ হঠাৎ পেছন ফিরে তাকিয়ে তাকে দেখে ফেলল।

—“এই! হাসছিস কেন?”

মেহরিন দ্রুত মুখ গম্ভীর করে বলল,

—“না তো।”

—“তুই হাসছিলি।”

—“আমি? কখন?”

—“এইমাত্র।”

—“প্রমাণ আছে?”

আরিশ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,

—“আছে।”

—“কোথায়?”

আরিশ নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলল,

—“এখানে।”

মেহরিন কিছুটা থমকে গেল।

কিন্তু আরিশ সঙ্গে সঙ্গে হেসে যোগ করল,

—“আমার চোখ ক্যামেরার মতো। সব রেকর্ড করে।”

মেহরিন চোখ ঘুরিয়ে বলল,

—“তুমি সত্যিই অসহ্য।”

আরিশ মুচকি হেসে বলল,

—“তবুও তো আমার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করিস।”

মেহরিন উত্তর না দিয়ে চলে গেল।

কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা আরিশের চোখ এড়াল না।


দুপুরে

দুপুরের খাবারের টেবিলে সবাই বসেছে।

মেহরিন একপাশে চুপচাপ খাচ্ছে।

আরিশ ঠিক তার বিপরীতে।

মেহরিন যতবারই তাকাচ্ছে, আরিশ ততবারই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

শেষ পর্যন্ত মেহরিন বিরক্ত হয়ে বলল,

—“কী?”

—“কিছু না।”

—“তাহলে তাকিয়ে আছো কেন?”

—“তাকাতে কি টাকা লাগে?”

—“তোমার চোখ তুলে ফেলব।”

আরিশ ভ্রু তুলে বলল,

—“এত রাগ ভালো না।”

মেহরিন উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই বাড়ির এক কাজিন এসে মেহরিনের পাশে বসে বলল,

—“মেহরিন, আজ বিকেলে বাইরে যাবি?”

—“কোথায়?”

—“ক্যাফেতে। কয়েকজন মিলে যাব।”

মেহরিন হাসিমুখে বলল,

—“হ্যাঁ, যেতে পারি।”

আরিশের মুখের হাসিটা সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেল।

সে চুপচাপ ভাত নেড়েচেড়ে খেতে লাগল।

মেহরিন সেটা খেয়াল করল।

—“কী হলো?”

—“কিছু না।”

—“তাহলে মুখ এমন কেন?”

—“আমার মুখ আমার ব্যাপার।”

মেহরিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—“তোমার আবার কী হলো?”

আরিশ গম্ভীর গলায় বলল,

—“তুই আজ বাইরে যাবি না।”

মেহরিন অবাক।

—“কেন?”

—“এমনিই।”

—“তুমি কে যে আমাকে আটকাবে?”

আরিশ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।

তারপর গম্ভীর মুখে বলল,

—“আমি… আমি তোকে বলছি।”

মেহরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—“আমি যাব।”

আরিশ তাকিয়ে রইল।

তার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।

কিন্তু সে নিজের সেই অদ্ভুত অনুভূতিটাকে তখনও কোনো নাম দিতে পারল না।

শুধু মনে হলো—

মেহরিনকে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে হাসতে দেখলে তার কেন যেন একদম ভালো লাগে না।


বিকেলের দিকে মেহরিন তৈরি হয়ে নিচে নামতেই আরিশ সোফায় বসে ছিল।

মেহরিনকে দেখে সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।

তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল।

মেহরিন বলল,

—“কী হলো?”

—“কিছু না।”

—“আবার শুরু করেছো?”

—“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

—“বাইরে।”

—“কার সঙ্গে?”

মেহরিন মুচকি হেসে বলল,

—“কেন? জানতে এত আগ্রহ?”

আরিশ গম্ভীর।

—“হ্যাঁ।”

—“একজনের সঙ্গে।”

আরিশের ভ্রু কুঁচকে গেল।

—“ছেলে?”

মেহরিন ইচ্ছে করেই বলল,

—“হ্যাঁ।”

আরিশ উঠে দাঁড়াল।

—“তুই কোথাও যাবি না।”

মেহরিনও রেগে গেল।

—“তুমি আমাকে আটকানোর কে?”

আরিশ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

—“আমি জানি না।”

মেহরিনও থেমে গেল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

কেউ কিছু বলল না।

কিন্তু দুজনেরই মনে হলো—

আজকের ঝগড়াটা যেন অন্যরকম।

কোথাও একটা অদৃশ্য অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে…

যার নাম তখনও তারা কেউ জানে না।

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন