আমাদের কাজিন বাড়ি, পাগলামির কারখানা
লেখিকা :আদিবা
পর্ব — ৬
খান বাড়িতে সকাল মানেই শান্তি নয়, বরং যুদ্ধের প্রস্তুতি। সূর্য উঠেছে অনেকক্ষণ আগে, কিন্তু বাড়ির বেশিরভাগ মানুষ এখনো ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আরিশ অবশ্য ঘুম থেকে উঠেই নিচে চলে এসেছে। হাতে এক কাপ চা, গায়ে সাদা টি-শার্ট, চুল এলোমেলো। সোফায় বসে সে মায়ের সঙ্গে গল্প করছে।
“বুড়ি বস, আজকে নাশতায় কী?”
মা রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যা রান্না হয়েছে তাই খাবি।”
“কী রান্না হয়েছে?”
“পরোটা, ডিম আর সবজি।”
আরিশ মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ডিম আবার কেন?”
“ডিম খেলে শক্তি হয়।”
“আমার শক্তি তো এমনিতেই অনেক।”
মা হেসে বললেন, “হ্যাঁ, সেটা তো সবাই জানে। তোর শক্তির জন্যই এই বাড়ির সবাই শান্তিতে থাকতে পারে না।”
আরিশ মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “তুমি কিন্তু আমাকে ভালোবাসো।”
“খুব।”
“কতটা?”
“তোর দুষ্টুমি সহ্য করার মতো।”
“মানে অনেক।”
“মানে মাথাব্যথার মতো।”
আরিশ হেসে ফেলল। ঠিক তখনই মেহরিনের মা নাসরিন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “সকাল সকাল মা-ছেলের এত আদর কিসের?”
আরিশ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “মামী, আপনার মেয়ে কোথায়?”
নাসরিন ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কেন?”
“ওকে একটু জিজ্ঞেস করতে হবে।”
“কী জিজ্ঞেস করবি?”
আরিশ গম্ভীর মুখ করে বলল, “ও আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না।”
নাসরিন হেসে বললেন, “তুই ওকে জ্বালাস না?”
“আমি? কখনো না।”
ঠিক তখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মেহরিন বলল, “মা, ওকে বিশ্বাস করো না। এই ছেলেটা জন্মগতভাবে বিরক্তিকর।”
আরিশ তাকিয়ে বলল, “শুভ সকাল, পাগলী।”
মেহরিন বলল, “শুভ সকাল, বালের ভাই।”
নাসরিন কিছুক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন। “তোরা দুজনের এই নামকরণ বন্ধ করবি?”
মেহরিন বলল, “মা, আগে ওকে বলেন আমাকে জ্বালানো বন্ধ করতে।”
আরিশ বলল, “আমি তো কিছুই করি না।”
মেহরিন বলল, “কাল কে আমার ফোন লুকিয়ে রেখেছিল?”
“আমি না।”
“তাহলে কে?”
“তুই নিজেই।”
“তুই জানিস কীভাবে?”
“কারণ তুই ভুলোমনা।”
মেহরিন এবার এগিয়ে আসতেই নাসরিন মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই সকালবেলা আবার শুরু করিস না।”
মেহরিন থেমে গেল।
আরিশ মুচকি হেসে বলল, “দেখেছো মামী, আমার ওপর অত্যাচার।”
নাসরিন বললেন, “তুইও কম যাস না।”
আরিশ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলে বুড়ি বস? কেউ আমাকে বোঝে না।”
মা হেসে বললেন, “আমি বুঝি।”
“শুধু তুমি।”
“হ্যাঁ, শুধু আমি।”
মেহরিন মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আহা! আবার শুরু হলো।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মাহবুব খানের গলা শোনা গেল।
“নাসরিন, চা তৈরি হয়েছে?”
নাসরিন বললেন, “হ্যাঁ, আসছি।”
মাহবুব খান ভেতরে এসে দেখলেন, আরিশ সোফায় বসে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে আছে। তিনি মুচকি হেসে বললেন, “এই ছেলেটা বড় হয়েছে, না এখনো পাঁচ বছরের?”
আরিশ উঠে বাবার কাছে গিয়ে বলল, “বাবা, তুমি মাকে আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চাও?”
মাহবুব হেসে বললেন, “না বাবা। তোর মায়ের সঙ্গে তোর বন্ধুত্ব দেখে আমারই ভালো লাগে।”
আরিশ বলল, “দেখেছো? বাবা আমাকে বোঝে।”
মেহরিন বলল, “তোমরা সবাই ওকে মাথায় তুলেছো বলেই এত বড় হয়েছে।”
মাহবুব মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর তুই তো কম না মা। তুই ছোটবেলায় আরিশের খেলনা ভেঙে পালিয়ে যেতিস।”
মেহরিন অবাক হয়ে বলল, “বাবা! আপনি ওসব এখনো মনে রেখেছেন?”
“সব মনে আছে।”
আরিশ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমার গাড়িটা ভেঙে দিয়েছিল।”
মেহরিন বলল, “তুই আমার পুতুলের চুল কেটে দিয়েছিলি!”
“ওটা দুর্ঘটনা ছিল।”
“কাঁচি হাতে নিয়ে পুতুলের চুল কাটাকে দুর্ঘটনা বলে?”
“আমি তখন ছোট ছিলাম।”
“আমি কি বড় ছিলাম?”
বাবা-মা দুজনেই হেসে ফেললেন।
মাহবুব বললেন, “তোদের ঝগড়া ছোটবেলা থেকেই এমন।”
আরিশ বলল, “তখনও ও আমাকে মারত।”
মেহরিন বলল, “কারণ তুই তখনও বিরক্তিকর ছিলি।”
নাশতার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে। বাড়ির ছোট-বড় সবাই। কেউ ডিম নিয়ে ঝগড়া করছে, কেউ পরোটা বেশি পেয়েছে বলে অভিযোগ করছে।
বড় আম্মু বললেন, “সবাই শান্ত হয়ে খা।”
একজন কাজিন বলল, “বড় আম্মু, শান্ত হয়ে খেতে হলে আরিশ ভাইয়াকে অন্য টেবিলে বসান।”
আরিশ বলল, “আমাকে কেন?”
“আপনি থাকলেই ঝামেলা হয়।”
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “একদম ঠিক।”
আরিশ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুইও তো ঝামেলা করিস।”
“আমি করি?”
“হ্যাঁ।”
“প্রমাণ?”
“তুই আমার জীবনেই আছিস, এটাই প্রমাণ।”
সবাই একসঙ্গে “ওওও…” করে উঠল।
মেহরিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “বেশি ডায়লগ মারিস না।”
আরিশ মুচকি হাসল।
নাসরিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেহরিন, তোর কলেজের পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“ভালো।”
মাহবুব বললেন, “আগামী সপ্তাহে তো পরীক্ষা, তাই না?”
“হুম।”
আরিশ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি পড়াব।”
মেহরিন অবাক হয়ে তাকাল। “তুই?”
“হ্যাঁ।”
“তুই আমাকে পড়াবি?”
“কেন? আমি পারি না?”
“তুই নিজে পরীক্ষায় পাশ করেছিলি কীভাবে, সেটা আগে বল।”
কাজিনরা হেসে উঠল।
আরিশ বলল, “আমার রেজাল্ট তোর থেকে ভালো ছিল।”
মেহরিন বলল, “কত ভালো?”
“অনেক ভালো।”
“কত?”
আরিশ থেমে গেল।
মেহরিন হেসে বলল, “মনে নেই?”
আরিশ বলল, “নম্বর মনে রাখি না, সম্মান মনে রাখি।”
বাবা হেসে বললেন, “এই ছেলের যুক্তির শেষ নেই।”
দুপুরে মাহবুব আর নাসরিন কিছু কাজ নিয়ে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নাসরিন মেয়েকে বললেন, “আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি। বিকেলের আগে ফিরব না। বাড়িতে থাকিস।”
মেহরিন বলল, “ঠিক আছে মা।”
মাহবুব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, “দুষ্টুমি করিস না।”
“আমি দুষ্টুমি করি না।”
পেছন থেকে আরিশ বলল, “এই কথাটা ইতিহাসে লিখে রাখা উচিত।”
মেহরিন ঘুরে তাকাল।
“তুই চুপ কর।”
মাহবুব হেসে বললেন, “তোদের দুজনকে রেখে যাচ্ছি। কোনো ঝামেলা চাই না।”
আরিশ বুক ফুলিয়ে বলল, “আমি আছি না বাবা?”
মাহবুব বললেন, “সেই জন্যই ভয়।”
সবাই হেসে উঠল।
মা-বাবা বেরিয়ে যেতেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল।
মেহরিন সোফায় বসে টিভি চালাল।
আরিশ এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “উঠ।”
“কেন?”
“আমি বসব।”
“অন্য জায়গায় বস।”
“এটা আমার জায়গা।”
“আজ থেকে আমার।”
আরিশ বলল, “তুই একদম বদমাশ।”
“ধন্যবাদ।”
“এটা প্রশংসা ছিল না।”
“আমি প্রশংসা হিসেবেই নিলাম।”
আরিশ সোফার অন্য পাশে বসে বলল, “আজকে একটা সিনেমা দেখব।”
“কোনটা?”
“ভূতের।”
“না।”
“কেন?”
“আমি ভয় পাই।”
আরিশ মুচকি হেসে বলল, “তাহলে তো আরও ভালো।”
“কেন?”
“ভয় পেলে আমার কাছে এসে বসবি।”
মেহরিন একদম চুপ হয়ে গেল।
তারপর বলল, “তুই খুব চালাক হয়ে গেছিস।”
আরিশ বলল, “তোর সঙ্গে থাকতে থাকতে।”
মেহরিন মুখ ঘুরিয়ে টিভির দিকে তাকাল।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
সন্ধ্যার দিকে বাড়ির ছাদে সবাই আবার জড়ো হলো। বাতাস বেশ সুন্দর। দূরে আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্প করছে।
মেহরিন ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে চুল খুলে দিল। বাতাসে তার লম্বা চুল উড়তে লাগল।
আরিশ একটু দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
এক কাজিন তার পাশে এসে বলল, “কী দেখছেন?”
আরিশ চমকে বলল, “কিছু না।”
“কিছু না মানে?”
“আকাশ।”
কাজিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আকাশ তো ওইদিকে।”
আরিশ কিছু বলল না।
কাজিন হেসে বলল, “বুঝেছি।”
“কী বুঝেছিস?”
“কিছু না।”
আরিশ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
ঠিক তখন মেহরিন ঘুরে তাকাল।
“কী করছিস?”
“কিছু না।”
“তুই আজকাল সবসময় কিছু না বলিস কেন?”
আরিশ হেসে বলল, “কারণ কিছু কিছু কথা বলা যায় না।”
মেহরিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, “সব কথা কি বলা যায় না?”
আরিশ উত্তর দিল না।
দূরে কেউ মোবাইলে গান চালিয়ে দিল। মৃদু সুরে গান বাজতে লাগল। বাতাসে মেহরিনের চুল উড়ছে, আরিশ চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তটা যেন হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে গেল।
কেউ কিছু বলল না।
শুধু দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল।
তারপর ছোট কাজিন দৌড়ে এসে চিৎকার করল, “আরিশ ভাই! নিচে চলেন! বড় আম্মু পিঠা দিচ্ছে!”
মুহূর্তটা ভেঙে গেল।
মেহরিন হেসে ফেলল।
আরিশ বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই সবসময় ভুল সময়ে আসিস কেন?”
কাজিন বলল, “কেন? কী হচ্ছিল?”
“কিছু না।”
মেহরিন হেসে বলল, “আকাশ দেখছিল।”
কাজিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “আবার?”
আরিশ মাথায় হাত দিল।
রাতে মেহরিন নিজের ঘরে ঢোকার সময় দরজার সামনে আরিশ দাঁড়িয়ে ছিল।
“কী?”
আরিশ বলল, “কাল থেকে তোর পড়াশোনা আমি দেখব।”
“না।”
“কেন?”
“তুই পড়ালে আমার মাথা নষ্ট হবে।”
“আমি খুব ভালো পড়াই।”
“তুই ভালো জ্বালাতে পারিস।”
আরিশ হেসে বলল, “ঠিক আছে। একটা শর্তে পড়াব।”
“কী শর্ত?”
“আমাকে আর বালের ভাই বলবি না।”
মেহরিন হাসল।
“অসম্ভব।”
“তাহলে পড়াব না।”
“না পড়ালেই বাঁচি।”
মেহরিন দরজা বন্ধ করতে গেল।
আরিশ হঠাৎ বলল, “মেহরিন।”
সে থেমে গেল।
“হুম?”
আরিশ একটু চুপ করে বলল, “কালকের মতো আর কখনো হবে না। আমি কথা দিচ্ছি।”
মেহরিনের মুখটা নরম হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল, “জানি।”
“সত্যি?”
“হুম।”
“তাহলে…”
“শুভরাত্রি, আরিশ।”
আরিশ মুচকি হেসে বলল, “শুভরাত্রি, মেহরিন।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
আরিশ কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলল,
“এই মেয়েটা আমার কী যে হয়ে যাচ্ছে…!”
আর অন্যদিকে দরজা বন্ধ করে মেহরিনও বিছানায় বসে নিজের অজান্তেই হাসল।
“বালের ভাইটা আজকাল এত ভালো কথা বলে কেন?”
চলবে…