ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমাদের কাজিন বাড়ি পাগলামির কারখানা

৮ম পর্ব

লেখক: Adiba
আমাদের কাজিন বাড়ি, পাগলামির কারখানা
লেখিকা: আদিবা
পর্ব — ৮
সকালের খান বাড়ি।
বাড়ির সবাই তখন নাশতা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ পরোটা নিয়ে টানাটানি করছে, আবার কেউ চুপিচুপি অন্যের প্লেট থেকে ডিম সরিয়ে নিজের প্লেটে নিয়ে যাচ্ছে। আর এই পুরো অপারেশনের নেতৃত্বে আছে বাড়ির ছোট কাজিনগুলো।
আরিশ ডাইনিং টেবিলের এক পাশে বসে মায়ের সঙ্গে গল্প করছিল। হাতে চায়ের কাপ, মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
আরিশ খান—খান বাড়ির অন্যতম বড় পাগল। বাইরে বেশ গম্ভীর দেখালেও বাড়ির মানুষদের সামনে একেবারে বাচ্চা হয়ে যায়। বিশেষ করে তার মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। মাকে সে আদর করে ডাকে “বুড়ি বস”, আর মায়ের কাছে নিজের সব অভিযোগ নিয়ে হাজির হওয়া তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
আরিশ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“বুড়ি বস, আজকে কিন্তু আমাকে একটা কাজে সাহায্য করতে হবে।”
মা চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
—“কী কাজ?”
—“গুরুত্বপূর্ণ কাজ।”
—“কী?”
আরিশ একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—“মেহরিনকে আজকে আমার সঙ্গে কোথাও যেতে হবে।”
মা হেসে ফেললেন।
—“তুই আবার মেহরিনকে নিয়ে কী প্ল্যান করছিস?”
—“কিছু না।”
পাশ থেকে মেহরিন বলে উঠল,
—“ওর ‘কিছু না’ মানেই বড় কোনো বিপদ।”
আরিশ তাকিয়ে বলল,
—“তুই চুপ কর, গোলমালের রানি।”
মেহরিন চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
—“তুই আগে নিজের চেহারা আয়নায় দেখ, দুই টাকার হিরো।”
—“আমার চেহারা খুব সুন্দর।”
—“স্বপ্ন দেখা ভালো জিনিস।”
—“তুই হিংসে করিস।”
—“তোর ওপর?”
—“হুম।”
মেহরিন পরোটা মুখে দিয়ে বলল,
—“তুই একটা হাবলা।”
আরিশ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“বুড়ি বস, দেখেছ? সকাল সকাল আমাকে অপমান করছে।”
মা হেসে বললেন,
—“তোরা দুজন একসঙ্গে থাকলেই আমার বিনোদন হয়ে যায়।”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
কয়েক মুহূর্ত পর ভেতরে ঢুকল একটি মেয়ে।
তানহা—মেহরিনের সমবয়সী কাজিন এবং বেশ চঞ্চল স্বভাবের। সবসময় হাসিখুশি থাকে, আর অন্যের ঝামেলায় নাক গলানো তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। বিশেষ করে আরিশ আর মেহরিনের ঝগড়া দেখলে সে কখনোই চুপ থাকতে পারে না।
তানহা ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে দিয়ে বলল,
—“আহা! আমি কি ভুল বাড়িতে চলে এসেছি? সকাল সকাল যুদ্ধ শুরু?”
মেহরিন বলল,
—“তুই এসে গেছিস বলেই এখন যুদ্ধ আরও বড় হবে।”
তানহা হাসতে হাসতে বলল,
—“আমি তো শান্তির দূত।”
আরিশ বলল,
—“তুই শান্তির দূত না, তুই ঝামেলার সহকারী।”
তানহা জিভ বের করে বলল,
—“চুপ কর, পাগলা ডিম।”
সবাই হেসে উঠল।
আরিশ মাথা নাড়িয়ে বলল,
—“এই বাড়ির কাউকে দিয়ে আমার সম্মান থাকবে না।”
কিছুক্ষণ পর সবাই উঠোনে জড়ো হলো।
আরিশ হাততালি দিয়ে বলল,
—“শোন সবাই! আজকে আমরা পিকনিকে যাব।”
একজন কাজিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“কোথায়?”
—“নদীর পাড়ে।”
তানহা বলল,
—“বাহ! আমি যাব।”
মেহরিন বলল,
—“আমিও যাব।”
আরিশ তাকিয়ে বলল,
—“তুই?”
—“হ্যাঁ। সমস্যা?”
—“না। তবে আমার গাড়িতে উঠবি না।”
মেহরিন চোখ বড় করে বলল,
—“কেন?”
—“তুই বেশি কথা বলিস।”
—“তাহলে তোর গাড়িতে আমি উঠবই।”
—“কেন?”
—“তোকে জ্বালানোর জন্য।”
আরিশ হেসে বলল,
—“ঠিক আছে, জ্বালাতনের কারখানা।”
মেহরিন বলল,
—“আর তুই আমার মাথার পোকা।”
সবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
নাসরিন মেহরিনের ব্যাগে খাবার আর পানির বোতল গুছিয়ে দিচ্ছিলেন।
—“সাবধানে থাকিস।”
মেহরিন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
—“মা, তুমি চিন্তা করো না।”
নাসরিন বললেন,
—“আরিশের সঙ্গে বেশি ঝগড়া করিস না।”
মেহরিন মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—“ও আগে শুরু করে।”
ঠিক পেছন থেকে আরিশ বলল,
—“মিথ্যা কথা।”
মেহরিন ঘুরে বলল,
—“তুই কখন এলি?”
—“যখন তুই আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করছিলি।”
নাসরিন দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“তোমরা দুজন একসঙ্গে গেলে আমার কেন যেন ভয় লাগে।”
আরিশ বলল,
—“মামী, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আছি।”
নাসরিন হেসে বললেন,
—“সেই জন্যই তো ভয়।”
সবাই হেসে উঠল।
গাড়িতে ওঠার সময় নতুন আরেকজনের আগমন হলো।
রিদওয়ান—আরিশের ছোট চাচাতো ভাই। বয়সে আরিশের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, কিন্তু দুষ্টুমিতে কোনো অংশে কম নয়। সুযোগ পেলেই আরিশকে নিয়ে মজা করে এবং বাড়ির গোপন খবর সবার আগে জেনে যায়।
রিদওয়ান গাড়িতে উঠে আরিশের পাশে বসে বলল,
—“ভাই, মেহরিন ভাবি কোথায়?”
আরিশ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—“কী বললি?”
রিদওয়ান ভান করে অবাক হলো।
—“কী বললাম?”
—“আবার বল।”
রিদওয়ান হেসে বলল,
—“মেহরিন ভাবি কোথায়?”
পেছন থেকে মেহরিন চিৎকার করে বলল,
—“রিদওয়ান!”
সবাই হেসে ফেলল।
আরিশ রিদওয়ানের মাথায় হালকা একটা টোকা দিয়ে বলল,
—“বেশি পাকামি করিস না।”
রিদওয়ান বলল,
—“কেন? ভুল তো বলিনি!”
আরিশ গম্ভীর মুখে বলল,
—“চুপ কর।”
মেহরিন দূর থেকে সব দেখছিল। তার মুখে মুচকি হাসি।
তানহা ফিসফিস করে বলল,
—“কিছু একটা আছে।”
মেহরিন বলল,
—“কিছুই নেই।”
তানহা বলল,
—“তাহলে আরিশের মুখ এত লাল কেন?”
মেহরিন আরিশের দিকে তাকাল।
সত্যিই আরিশ অস্বস্তিতে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
মেহরিনের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
নদীর পাড়ে পৌঁছানোর পর সবাই মিলে হৈচৈ শুরু করে দিল।
কেউ ছবি তুলছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ খাবারের প্যাকেট খুলে ফেলেছে।
মেহরিন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাতাস উপভোগ করছিল। হঠাৎ তার ওড়নাটা বাতাসে উড়ে গিয়ে পাশের ঝোপে আটকে গেল।
সে সেটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল।
আরিশ দূর থেকে দেখে এগিয়ে এল।
—“দাঁড়া, আমি করছি।”
মেহরিন বলল,
—“আমি পারব।”
—“তুই পারবি না।”
—“আমি পারব।”
—“তুই জেদি।”
—“তুই মাথামোটা।”
—“তুই পাগল।”
—“তুই গাধা।”
আরিশ হাসতে হাসতে ওড়নাটা ছাড়িয়ে দিল।
মেহরিন সেটা হাতে নিয়ে বলল,
—“ধন্যবাদ।”
আরিশ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“এই প্রথম তুই আমাকে ধন্যবাদ দিলি।”
—“প্রতিদিন দিলে তোর মাথা আরও বড় হয়ে যাবে।”
—“এখনই তো বড়।”
মেহরিন হেসে ফেলল।
দুজনের মাঝে হঠাৎ কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল।
পেছনে সবাই হাসাহাসি করছে। নদীর পানিতে রোদের ঝিলিক পড়ছে। বাতাসে মেহরিনের চুল উড়ছে।
আরিশ আস্তে করে বলল,
—“মেহরিন।”
—“হুম?”
—“আজকে তোকে একটা কথা বলব?”
—“বল।”
আরিশ কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রিদওয়ান দূর থেকে চিৎকার করল—
—“ভাই! ভাবির সঙ্গে একা একা কী হচ্ছে?”
আরিশ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মেহরিন মুখ চেপে হাসছে।
আরিশ ঘুরে চিৎকার করল,
—“রিদওয়ান! তোকে আজকে আমি—”
রিদওয়ান দৌড়ে পালিয়ে গেল।
তানহা হাসতে হাসতে বলল,
—“আহা! প্রেমের মুহূর্ত নষ্ট হয়ে গেল!”
মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“কোন প্রেম?”
আরিশও বলল,
—“কোন প্রেম?”
দুজন একসঙ্গে বলায় সবাই আবার হাসতে শুরু করল।
আরিশ মেহরিনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
—“তোর জন্যই আমার জীবনটা একটা সার্কাস হয়ে গেছে।”
মেহরিন মুচকি হেসে বলল,
—“আর তুই সেই সার্কাসের প্রধান জোকার।”
আরিশ হেসে বলল,
—“আর তুই?”
মেহরিন চোখ টিপে বলল,
—“আমি তো সার্কাসের মালিক।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
কেউ তখনও জানত না—এই হাসি, এই খুনসুটি আর এই অদ্ভুত টানটা খুব শিগগিরই তাদের দুজনের জীবনকে এমনভাবে বদলে দেবে, যেটা তারা কল্পনাও করেনি।
চলবে… 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন