বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোকে ছেড়ে বিদায় নিচ্ছে। আকাশে হালকা মেঘ। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
হাতে কয়েকটি বই নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল আদনান আরিস। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে আজ সরাসরি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ফিরছিল সে। নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে মনটা অদ্ভুত হালকা লাগছিল। ঠিক তখনই,,
-"আহ!"
ছোট্ট একটা ধাক্কা খেয়ে নিচে তাকাল আদনান।
চার-পাঁচ বছরের একটি মেয়ে মাটিতে বসে আছে। গোলাপি রঙের ছোট্ট ফ্রক, চুল গুলো ছাড়া, চোখ দুটো কাঁচের মতো স্বচ্ছ। হাতে ধরা আইসক্রিমটা মাটিতে পড়ে গেছে। আদনান তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে বসল।
-"ব্যথা পেয়েছ?"
মেয়েটা ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নাড়ল।
-"একটু"
আদনান হেসে বলল,
-"তাহলে নতুন একটা আইসক্রিম কিনে দিলে রাগ ভাঙবে?"
মেয়েটার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
-"দুইটা কিনে দিলে।"
হাসি চেপে রাখতে পারল না আদনান।
-"আচ্ছা, দুইটাই হবে।"
কয়েক মিনিট পর রাস্তার পাশের দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে এনে একটা তার হাতে দিল। মেয়েটা আনন্দে খেতে খেতে বলল,
-"আপনি খুব ভালো মানুষ।"
-"এত তাড়াতাড়ি বুঝে ফেললে?"
-"আম্মু বলে, ভালো মানুষদের চোখ দেখে চেনা যায়।"
কথাটা শুনে আদনান এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। কেন জানি না, ছোট্ট মেয়েটার কথা আর হাসিটা তার ভীষণ পরিচিত লাগছিল।
-"তোমার নাম কী?"
মেয়েটা গর্ব করে বলল,
-"আয়াত।"
-"বাহ! খুব সুন্দর নাম।"
-"আপনার নাম?"
-"আদনান।"
-"আদনান,, আঙ্কেল?"
ভ্রু কুঁচকে নাটকীয় গলায় বলল আদনান,
-"আঙ্কেল?"
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল।
-"তাহলে, আদনান ভাইয়া?"
-"এই তো, এবার ঠিক হয়েছে।"
দুজনের কথার মাঝেই দূর থেকে একটি কোমল কণ্ঠ ভেসে এলো।
-"আয়াত।"
ছোট্ট মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।
-"আম্মু!"
রাস্তার ওপাশে একটি ক্রিম রঙের আবায়া আর হিজাব পরা নারী দাঁড়িয়ে আছেন। সন্ধ্যার আলো আর ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। নারীটি তাদের একটু সমনে আসতেই আদনানের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আনমনে আদনান বলে উঠে,
-"তাহি...
নারীটাও থমকে দাঁড়ায়। আয়াত তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে,
-"আম্মু চল বসায় যাবো।"
-"হুম চল।"
নারীটা আয়াতের হাত ধরে ঘুরে অন্য রাস্তায় চলে যেতে থাকে। আদনান বলে উঠে,
-"তাহি... শোন।"
নারীটা কিছু না বলেই আয়াতকে নিয়ে চলে যায়। আদনান তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে।
ফ্লাস ব্যাক,,
বাড়ির বড় মেয়ে তাহিরা মেহজাবিন খুব চঞ্চল, হাসি খুশি একটা মেয়ে। কিন্তু সে একটু শান্ত স্বভাবের। সব সময় চঞ্চল থাকে না। ঘুম থেকে উঠেই সে তাড়াহুড়ো করে ভার্সিটি চলে যায়। তার বান্ধবী নাওমি, ইশা, আরিবা আগেই ভার্সিটিতে চলে এসেছে। তাহিরাকে আসতে দেখে নাওমি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। আরিবা বলে,
-"আজকেও এতো দেরি?"
তাহিরা ক্লাসের দিকে যেতে যেতে বলে,
-"হয়ে গেছেরে। তোরা মাধবিলতা ফুলের গাছের নিচে বস। আমি আসছি।"
ইশা,আরিবা,নাওমি তাদের আড্ডা দেয়ার জায়গা ক্যাম্পাসের মাঝখানে অবস্থিত মাধবিলতা গাছের নিচে গিয়ে বসে। তাহিরাও কিছু সময় পর চলে আসে।
আরিবা বলে,
-"তাহি, তোর ছোট আম্মু, ছোট বাবা কোন দিন আসবেন?"
-"মনে হয় ২-৪ দিন পর।"
-"ওহ্।"
-'হুম।"
নাওমি বলে,
-"আরিবা তোর ভাইয়া বাড়ি আসে নাই?"
-"তুই আমার ভাইয়া কে দিয়ে কি করবি?"
নাওমি একটু লজ্জা পেয়ে বলে,
-"আরে না এমনি।"
-"কিছুতো আছে। বলে ফেল আমাদের।"
-"আরে কিছু না।"
নাওমি উঠে ক্লাস এর দিকে হাঁটা দেয় আর ভাবে,
-"রিদয় কেন আমায় ইগনোর করছে? আমি কি করেছি। এটা তো আমার জন্য হয় নাই। ভুল ভাবে হয়ে গিয়েছে। আমরা কেউ কি এই সব জানতা হবে? তাহলে কেন সে আমায় মেনে নিতে পারছে না। বিয়েটাতো আমাদের অনিচ্ছায় হয়েছে। আমায় এখন মেনে নিলে কি হবে?"
নাওমি মন খারাপ করে ক্লাসে বসে থাকে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আরিবা,ইশা,তাহিরা ক্লাসে চলে আসে। নাওমির পাশে ইশা বসে সব সময় এর মতো। আর আরিবা, তাহিরা এক সাথে।
ভার্সিটি শেষে ইশা আর তাহিরা বাসায় যাবার জন্য একসাথে হাঁটতে থাকে। তাদের বাসা কাছাকাছি। ইশার বাসা তাহিরার বাসার অনেক আগে। তাহিরার বাসার অন্য দিকে ইশার বাসা। ইশা কে আগে তার বাসায় যেতে হয়। তারপর তাহিরা একা একা নিজের বাসায় যায়। রাস্তা হঠাৎ একটা ছেলে তাহিরার সামনে এসে দাঁড়ায় আর বলে,
-"আসসালামু আলাইকুম ম্যাম। কেমন আছেন?"
-"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো রিহাদ?"
-"এইতো ম্যাম আলহামদুলিল্লাহ ভালোই।"
-"অফিস শেষ আজকে?"
-"না ম্যাম। আমি চলে এসেছি। আমার কাজ শেষ।"
-"ওহ্। তো এখন কে সামলাচ্ছে কোম্পানি?"
-"ইফতেখার সাহেব এর হাতে আপাতত দায়িত্ব দিয়ে এসেছি। আপনি কোন দিন যাবেন কোম্পানিতে?"
-"দেখি কোন দিন যাওয়া যায়। যাবার আগে তোমায় বলবো। আমার অফিস পরিস্কার করে রাখবে।"
-"ওকে ম্যাম।"
-"তোমার বাসা তো মনে হয় ইশার বাসার একটু পরে তাই না?"
-"জ্বী।"
-"তাহলে তো তুমি ইশাকে বিকালে কোম্পানিতে যাবার সময় নিয়ে যেতে পারবে। আবার কাজ শেষে দু'জন একসাথে চলে আসতে। ইশা তো একা থাকে। একা একটা মেয়ে রাতে আসা তো একটা বিপদ। তুমি পারবে না ইশাকে নিয়ে যেতে সাথে আবার আসতেও?"
ইশা রিহাদের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু। সে কিছু বলছে না। রিহাদ ইশার দিকে চেয়ে বলে,
-"জ্বী ম্যাম পারবো।"
-"তাহলে এখন থেকে তাকে নিয়ে যাবে।"
ইশা বলে,
-"আরে ম্যাম, উফ! তাহিরা লাগবে না। আমি যেতে পারবো।"
-"এই ইশা তুই বেশি বুঝিস নাকি? যা বলছি তাই হবে।"
-"ঠিক আছে, তুই যেহেতু বলছিস।"
রিহাদ বলে,
-"ইশা এখন থেকে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, ওকে?"
-"ওকে।"
তাহিরা বলে,
-"রিহাদ তুমি নাকি গাড়ি কিনেছ?"
-"জ্বী ম্যাম।"
-"কোনটা কিনেছ?"
একটু দূরে দারিয়ে থাকা একটা মেরুন রঙের গাড়ি দেখিয়ে রিহাদ বলে,
-"ওইটা।"
-"সুন্দর তো।"
-"আচ্ছা ম্যাম আমি যাই। আর ইশাকে নিয়ে যাই। যেহেতু আমি বাসায় যাচ্ছি।"
-"হ্যাঁ নিয়ে যাও।"
ইশা বলে,
-"কিন্তু তুই একা কি করে যাবি?"
-"আমার চিন্তা করিস না। আমি রিকশা দিয়ে চলে যাব।"
রিহাদ বলে,
-"আমি রিকশা খুঁজে দিব ম্যাম?"
-"না না, আমি খুঁজে নিব। তোমরা যাও।"
-"ওকে, আল্লাহ হাফিজ ম্যাম।"
-"আল্লাহ হাফিজ।"
ইশাও তাহিরাকে বিদায় দিয়ে রিহাদের সাথে তার গাড়ি দিয়ে চলে যায়। তাহিরা কিছু সময় পর একটা রিকশা করে চলে যায়। রিহাদ গাড়ি চালাতে চলাতে ইশাকে বলে,
-"তোমার আমার সাথে আসতে-যেতে কোনো সমস্যা নাই তো?"
-"না। আপনার মনে হয় আছে।"
রিহাদ ইশার দিকে একবার তাকিয়ে আবার গাড়ি চালাতে মন দিয়ে বলে,
-"আমি বলছি?"
-"না।"
-"তাইলে তুমি কেন বললে?"
-"আমি মনে করেছি আপনি রাজি না তাতে। ম্যাম এর কথায় রাজি হয়েছেন।"
-"এমনটা না। আমি রাজি আছি। আর ম্যাম বলেছেন তো কি হয়েছে। ম্যাম তো তোমার ভালোর জন্য বলেছেন।"
-"হুম। আচ্ছা বড় স্যার এর সাথে কি কথা বলেছেন?"
-"না।"
-"ওহ্।"
রিহাদ গাড়ি থামিয়ে বলে,
-"গাড়ি থেকে নামো।"
-"কেন?"
-"তোমার বাসায় চলে এসেছি।"
-"ওহ,। আমার বাসায় আসেন কিছু খেয়ে যাবেন।"
-"না, এখন না। অন্য দিন আসবো। আজকে তুমি ভার্সিটি থেকে আসছো। আবার আমায় আমার বাসায় যেতে হবে।"
-"এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যান?"
-"অন্য দিন।"
-"ঠিক আছে। আল্লাহ হাফিজ।"
ইশা গাড়ি থেকে নেমে তার বাসার দিকে চলে যায়। যতক্ষণ না ইশা নিজের বাসার ভিতর যায় ততক্ষণ রিহাদ এক ধেনে ইশার যাওয়ার পানে তাকিয়ে ছিল। ইশা বাসায় ঢুকতেই রিহাদ গাড়ি চালু করে নিজের বাসার দিকে চলে যায়।
তাহিরা বাসায় আসতেই সাবিহা হাসান বলেন,
-"ফ্রেস হয়ে আয়। খাবার দিচ্ছি আমি।"
তাহিরা "আসছি" বলে নিজের রুমে চলে যায়। ব্যাগটা রুমের ছোট্ট সোফায় রেখে ফ্রেস হতে চলে যায়। ফ্রেস হওয়া শেষে নিচে খাবার খেতে যায়। তামিমও তার সাথে খাচ্ছে। সাবিহা হাসান তাদের খাবার বেরে দিচ্ছেন। তাহিরা তামিমকে বলে,
-"তুই এতো দেরি করে আজকে খাবার খাচ্ছিস কেন?"
-"এমনি।"
-"স্কুল এখন ছুটি হয় তোর?"
তামিম দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলে,
-"হি, হি, হি, যখন শেষ হয়।"
-"তোর তো স্কুল তিনটা বিশে শেষ হয়। এখন বাজে চারটা একুশ। এত দেরি, বলছি না এসেই খেয়ে নিবি।"
-"আরে আপু খা তো। আজকে তোর সাথে খাব তাই বসে ছিলাম।"
-"ওলে, ওলে, আমার সোনা ভাই রে। এখন খা।"
তাহিরা খাবার খেয়ে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পরে। পাঁচটার দিকে তামিম তাহিরার রুমে নক করে আসে। সে বিছানায় তাহিরার পাশে শুয়ে পরে।
-"আপু জানিস কি ওইছে?
-"কী?"
-"ছোট আম্মু আর ছোট বাবা আসছে।"
তাহিরা অবাক হয়ে তামিমের দিকে তাকিয়ে বলে,
-"কোনদিন?"
-"এইতো কালকে।"
-"কে বলেছেন?"
-"আম্মুকে মামা বলেছেন। ছোট আম্মু আমাদের সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য বলেন নাই। কিন্তু মামা বলে দিয়েছেন।"
-"ওহ্। তার মানে আকজে অনেক কাজ আছে।"
-"হুম। এইবাট নাকি আদনান ভাইয়াও আসছে।"
এটা শুনেই তাহিরার মুখের হাসি চলে যায়।
-"কেন? এত বছর পরে হঠাৎ?"
-"আরে এমনি। মেইবি তারা কেউ আর ফ্রান্স যাবেন না।"
-"ওহ্।"
তামিম তাহিরার সাথে আরও কিছু কথা বলে চলে যায়। তাহিরা ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ তার চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
একটা বিশাল উঠান।
চারপাশে কয়েকজন ছেলে-মেয়ে খেলছে। তাদের মাঝখানে ছোট্ট তাহিরাও আছে। বয়স তখন মাত্র সাত। হঠাৎ কেউ একজন পেছন থেকে তার হাত শক্ত করে টেনে ধরল। তাহিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটা তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তারপর,
"ঠাস!"
এক গালে চড়।
"ঠাস!"
আরেক গালে। ছোট্ট তাহিরা হতভম্ব হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো ধীরে ধীরে পানিতে ভরে উঠল। ছেলেটার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু রাগে শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল আর জ্বলন্ত চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। তাহিরা কাঁপা গলায় বলল,
-"তুমি আমাকে মারলে কেন?"
ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না। শুধু রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
দৃশ্যটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে গেল। তাহিরা ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠল। চোখ মেলে অন্ধকার ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। কয়েক মুহূর্ত পর ধীরে ধীরে উঠে বসল। হাত দিয়ে নিজের গাল ছুঁয়ে দেখল। কেন আজ এত বছর পর সেই দৃশ্যটা মনে পড়ল?
আর সেই ছেলেটা...
কে ছিল?
তাহিরা চোখ বন্ধ করল আবার। কিন্তু এবারও তার মনে ছেলেটার মুখটা ভেসে উঠল না।
শুধু সেই দুটো চড়ের শব্দ,
"ঠাস... ঠাস..."
তাহিরার আর ঘুম হলো না। সে বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গেল। ঠান্ডা খুলা হাওয়া তার গায়ে এসে লাগছে। সে আনমনে কিছু ভাবছে।
রাতে তাহিরা নিজের রুমে বসে আছে। মনের মধ্যে কেমন যেনো লাগছে তার। সে নিজেও জানে না। আজকে রাত সে জেগে থাকবে। আজকে তার আর ঘুম আসবে না। বই নিয়ে পড়তে বসে। ১ টা পর্যন্ত পড়ে আর পড়ায় মন বসে না তার। বইগুলো গুছিয়ে রেখে মোবাইল নিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরে। মোবাইলের মিসেজ গুলো আজকে সে পড়ছে। একটা ই-মেইল এর মধ্যে তার চোখ পরে। অচেনা আইডি-টা। ই-মেইল এর মধ্যে লেখা ছিল,
"বিষয়: আমার মিষ্টি বিপদের জন্য
মিষ্টি বিপদ,
জানি না আমাকে এখনো মনে আছে কি না। হয়তো নেই। এত বছর তো কম সময় নয়। তবে আমার তোমাকে মনে আছে। সেই ছোট্ট মেয়েটাকে, যে সামান্য কথাতেই রেগে যেত, আবার একটু পরেই সব ভুলে হাসতে শুরু করত।
আর হ্যাঁ, সেই দিনের কথাটাও মনে আছে। তোমাকে ওইভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য সত্যিই সরি। তখন রাগের মাথায় কী করেছিলাম, নিজেও বুঝিনি। তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করবে না। তবুও ক্ষমা চেয়ে রাখলাম।
আর একটা কথা, আমি আসছি। খুব তাড়াতাড়ি।
তখন হয়তো আমাকে চিনতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু আমি তোমাকে চিনে ফেলব।
ততদিন নিজের যত্ন নিও। পড়াশোনায় মন দাও। শুনেছি পড়াশোনায় তুমি নাকি খুব ভালো? দেখি তো, আমার মিষ্টি বিপদ কতটা ভালো ছাত্রী হয়েছে।
আর হ্যাঁ, আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ আমি নিজেই তোমার সামনে এসে দাঁড়াব।
টাটা, মিষ্টি বিপদ।
—একজন পুরোনো মানুষ"
তাহিরা ই-মেইল টা দেখে অবাক হয়। সে ভাবে,
-"এ আবার কোন পাগল। এইসব কি লিখেছে। মনে হয় অন্য কাউকে দিতে গিয়ে আমায় দিয়ে দিয়েছে। এই সব ভেবে আমার কাজ নাই। আমি দেখি এখন ঘুমাতে পারি কি না।"
পরক্ষণেই আবার ভাবে,
-"ছোট বেলায় আমায় থাপ্পড় দেয়া সেই ছেলেটা আবার নয়তো? ওই ছেলে হলে আমি তাকে দেখে নিব এইবার। কত বড় সাহস আমায় থাপ্পড় দেয়। আমি এখন ঘুমাই।"
তাহিরা মোবাইল রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিছু সময় পর ঘুমিয়ে যায়।
সকালে তাহিরা ভার্সিটি যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তখন সাবিহা হাসান তার রুমে আসেন।
-"আজকে ভার্সিটি যেতে হবে না।"
-"কেন?"
-"নাদিয়ারা আসছে তাদের আনতে যাব।"
-"আমি না গেলেও চলবে।"
-"না, তোর যেতে হবে। আমরা কিছু সময় পর এয়ারপোর্টে যাব। তৈরি হয়ে নে।"
-"ঠিক আছে।"
সাবিহা হাসান চলে যান। তাহিরা একটা ড্রেস পরে আর হিজাব পরে পার্স ব্যাগ নিয়ে নিচে চলে যায়। তাহিরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখল, তামিম সোফায় বসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। তাহিরাকে দেখেই তামিম মুখ তুলে বলল,
-"আপু, আজকে আবার এত সাজগোজ কিসের?"
তাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
-"এয়ারপোর্টে যাচ্ছি। মানুষজনের সামনে তোকে নিয়ে দাঁড়াতে হবে, তাই একটু ভালো হয়ে যাচ্ছি।"
তামিম হেসে বলল,
-"তুই ভালো হলে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে যাবে।"
-"তামিম!"
তাহিরা হাতের ব্যাগটা সোফায় রেখে ওর মাথায় হালকা একটা টোকা দিল। তামিম মাথা বাঁচিয়ে হেসে উঠল। ঠিক তখনই মাহমুদুল হাসান ডাইনিং থেকে বেরিয়ে এলেন।
-"সকালে সকালেই আবার শুরু হয়ে গেছে?"
তামিম সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের সুরে বলল,
-"বাবা, আপু আমাকে মারছে!"
তাহিরা চোখ বড় বড় করে বলল,
-"আমি মারলাম? নিজেই তো আমার সঙ্গে লাগতে আসছে!"
মাহমুদুল হাসান হেসে মাথা নাড়লেন।
-"তোরা দুজন ছোটবেলা থেকে একই রকম আছিস।"
তাহিরা একটু হেসে চুপ করে গেল। কিছুক্ষণ পর সাবিহা হাসানও নিচে এসে বললেন,
-"সবাই তৈরি তো?"
মাহমুদুল হাসান ঘড়ির দিকে তাকালেন।
-"হ্যাঁ। আর দেরি না করে বের হওয়া ভালো।"
তাহিরা চুপচাপ নিজের ফোনটা ব্যাগে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আজ কেন যেন তার মনটা অদ্ভুত রকম ভালো লাগছিল। আবার কোথাও একটা অকারণ অস্থিরতাও ছিল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে তখন বেশ ব্যস্ততা। একের পর এক গাড়ি এসে থামছে, যাত্রীরা লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে আসছে। চারপাশে মানুষের কোলাহল, ট্রলি ঠেলার শব্দ আর মাঝেমধ্যে মাইকে ভেসে আসা ঘোষণা।
তাহিরা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকাল। পাশে তামিম দাঁড়িয়ে ফোন দেখছে। সাবিহা হাসান আর মাহমুদুল হাসান একটু সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তাহিরা বিরক্ত মুখে বলল,
-"এতক্ষণ লাগে নাকি একটা ফ্লাইট আসতে?"
তামিম ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
-"আপু, তুই পাঁচ মিনিট পরপর একই কথা বলছিস।"
-"চুপ কর।"
-"আচ্ছা।"
তামিম আবার ফোনে মন দিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বিমানবন্দরের ভেতর থেকে পরিচিত কয়েকজনকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। সবার সামনে আরমান আরিস। পাশে নাদিয়া আরিস। তাদের সঙ্গে জাহানারা আরিস এবং আয়রা। আর সবার পেছনে ধীর পায়ে হাঁটছে একজন লম্বা যুবক। কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। এক হাতে ছোট একটা ব্যাগ, অন্য হাতে ফোন। বিদেশের দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মুখে থাকলেও চোখেমুখে সেই চেনা গাম্ভীর্য। তাহিরার চোখ হঠাৎ তার ওপর গিয়ে থামল। কেমন যেন অদ্ভুত লাগল।
কেন যেন লোকটাকে কোথাও দেখেছে বলে মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের চিন্তাকে পাত্তা দিল না সে। আরমান আরিসকে দেখেই মাহমুদুল হাসান এগিয়ে গেলেন।
-"আরমান! অবশেষে ফিরলি!"
দুই বন্ধুর ভাইয়ের মতো করে কুশল বিনিময় হলো। নাদিয়া এসে সাবিহাকে জড়িয়ে ধরলেন।
-"কত বছর পর দেখা হচ্ছে!"
আয়রা দৌড়ে এসে তামিমের সামনে দাঁড়াল।
-"আপনি তামিম, তাই না?"
তামিম হেসে বলল,
-"হ্যাঁ। আর তুমি আয়রা?"
-"হুম।"
দুজনের কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল। এদিকে আদনান লাগেজটা পাশে রেখে চারপাশে তাকাচ্ছিল। ঠিক তখনই তাহিরা তার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে অসাবধানতায় তার সঙ্গে ধাক্কা খেল।
-"ওহ, সরি।"
আদনান নিচে তাকিয়ে বলল,
-"দেখে হাঁটতে পারেন না?"
তাহিরা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।
-"কী বললেন?"
-"বললাম, সামনে দেখলে হয়তো ধাক্কাটা লাগত না।"
তাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"আপনিও তো সামনে তাকিয়ে হাঁটছিলেন। শুধু দোষটা আমার কেন?"
আদনান ঠান্ডা গলায় বলল,
-"কারণ ধাক্কাটা আপনি দিয়েছেন।"
তাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
-"বাহ! বিদেশ থেকে এসে প্রথমেই মানুষের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করেছেন?"
আদনান মুচকি হেসে বলল,
-"আর আপনি দেশে থেকেও কম যান না দেখছি।"
-"আপনি আমাকে চেনেন?"
-"না।"
-"তাহলে এত কথা বলছেন কেন?"
আদনান কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আরমান আরিস দূর থেকে ডাকলেন,
-"আদনান!"
তাহিরা থমকে গেল। "আদনান।" নামটা শুনে কেন যেন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আর আদনানও এক মুহূর্ত তাহিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"আপনার সঙ্গে পরে দেখা হবে।"
তাহিরা বিরক্ত হয়ে বলল,
-"দেখা না হলেই ভালো।"
আদনান হেসে লাগেজ নিয়ে চলে গেল। তাহিরা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-"কী অসহ্য মানুষ!"
পাশ থেকে তামিম সব শুনে হেসে ফেলল।
-"আপু, মনে হচ্ছে পাশের ফ্ল্যাটে নতুন ঝামেলা এসেছে।"
তাহিরা চোখ রাঙিয়ে বলল,
-"তামিম, একদম চুপ!"
আর দূরে হাঁটতে হাঁটতে আদনানের মুখে তখনও সেই মুচকি হাসি। আদনান আর তার পরিবার লাগেজ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তাহিরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। আদনানকে দেখলেই কেন যেন তার মেজাজটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আদনান পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ বলল,
-"এত রাগী মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"
তাহিরা সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
-"আমি রাগী মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি, নাকি আপনি অকারণে কথা বলছেন?"
আদনান মুচকি হাসল।
-"আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমতি লাগে নাকি?"
-"আমার সঙ্গে কথা না বললেই ভালো হয়।"
-"ঠিক আছে।"
বলেই আদনান চুপ করে গেল। তাহিরা ভেবেছিল এবার বোধহয় শান্তি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আদনান আবার বলল,
-"তবে আপনার রাগটা বেশ সুন্দর।"
তাহিরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
-"আপনি আবার শুরু করলেন?"
আদনান কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে চলে গেল। তাহিরা দাঁত চেপে বলল,
-"অসহ্য!"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তামিম হাসি চাপতে চাপতে বলল,
-"আপু, লোকটা তোকে মাত্র দশ মিনিটে রাগিয়ে দিল।"
-"তুইও চুপ কর।"
কিছুক্ষণ পর সবাই গাড়িতে উঠল। তাহিরা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। অন্যদিকে আদনান সামনের সিটে বসেছে। গাড়ি চলতে শুরু করতেই জাহানারা আরিস তাহিরার পাশে এসে বসলেন। তাহিরা সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে বলল,
-"দাদি, আপনি আমার পাশে বসবেন?"
-"কেন? আমার নাতনির পাশে বসতে কি অনুমতি লাগে?"
তাহিরা হেসে তার হাত ধরে বলল,
-"না, কিন্তু আপনি এতদিন পর আসছেন। আপনাকে ছাড়তে ইচ্ছা করছে না।"
জাহানারা মায়াভরা চোখে তাহিরার দিকে তাকালেন।
-"তুই তো একদম আগের মতোই আছিস।"
তাহিরা একটু অবাক হয়ে বলল,
-"আগে কেমন ছিলাম?"
দাদি হেসে বললেন,
-"দুষ্টু।"
তাহিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-"আমি কখনো দুষ্টু ছিলাম না।"
সামনের সিট থেকে আদনানের গলা ভেসে এল,
-"মিথ্যা কথা বলতে মানা করো দাদি।"
তাহিরা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
-"আপনি আবার কথা বলছেন কেন?"
আদনান নির্বিকার গলায় বলল,
-"আমি তো দাদির সঙ্গে কথা বলছিলাম।"
তাহিরা বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দাদি হেসে ফেললেন।
-"তোদের দুজনের ঝগড়া কি ছোটবেলা থেকেই এমন?"
তাহিরা থমকে গেল।
-"আমাদের?"
আদনানও এক মুহূর্ত চুপ করল। তারপর হেসে বলল,
-"দাদি, আপনি অনেক কিছুই ভুলে গেছেন।"
জাহানারা কিছুক্ষণ আদনানের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার তাহিরার হাত ধরে বললেন,
-"যাই হোক, আজ থেকে তোকে আমি আবার আমার কাছেই রাখব।"
তাহিরা মুচকি হেসে দাদির কাঁধে মাথা রাখল।
-"ঠিক আছে। তবে একটা শর্ত আছে।"
-"কী?"
-"আপনার নাতিকে আমার সঙ্গে বেশি ঝগড়া করতে দিতে পারবেন না।"
দাদি হেসে বললেন,
-"ওকে আমি সামলে নেব।"
আদনান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-"দাদি, আপনি কিন্তু আমার পক্ষ নেবেন।"
তাহিরা বলল,
-"দেখেছেন? শুরু হয়ে গেছে!"
গাড়ির সবাই হেসে উঠল। জাহানারা আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"তুই চুপ কর। আমার নাতনির সঙ্গে ঝগড়া করলে কিন্তু আগে তুই বকা খাবি।"
আদনান অবাক হয়ে বলল,
-"দাদি, আমি আপনার নাতি!"
-"তাই তো বলছি। নাতি বলেই বেশি বকা খাবি।"
তাহিরা হেসে দাদির হাত আরও শক্ত করে ধরল। অনেক বছর পর যেন পুরোনো একটা আপন সম্পর্ক আবার ফিরে এলো। কিছুক্ষণ পর গাড়ি তাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। সবাই একে একে নামতে শুরু করল। তাহিরা নিজের ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখন আদনান তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল,
-"সামনে দেখে হাঁটবেন কিন্তু। আবার ধাক্কা খেলে দোষ আমার হবে।"
তাহিরা দাঁড়িয়ে গেল।
-"আপনি কি সব সময় এমন কথা বলেন?"
আদনান হেসে বলল,
-"না। শুধু যাদের রাগাতে ভালো লাগে, তাদের সঙ্গে।"
তাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
-"আপনি—!"
আদনান ততক্ষণে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে চলে গেছে। তাহিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে লাগল।
আর পাশ থেকে দাদি হেসে বললেন,
-"তুই ওর কথায় এত রাগিস কেন রে?"
তাহিরা বিরক্ত মুখে বলল,
-"জানি না দাদি। মানুষটাই এমন!"
দাদি মুচকি হেসে বললেন,
-"হুম, বুঝলাম।"
তাহিরা কিছু বুঝতে না পেরে দাদির দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু দাদি যে কী বুঝলেন, সেটা তিনি আর বললেন না।
continue......