শিউলি প্রণয় কাব্য
৮ম পর্ব
চৌধুরী বাড়ির সামনে তখনও অদ্ভুত এক নীরবতা। কিছুক্ষণ আগের ঘটনায় বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সাইফুল চৌধুরী বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছেন। সাবিহা চৌধুরী ইশার ঘরে গিয়ে কিছু কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। আরিশ বাড়ির নিরাপত্তার লোকদের সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু ইশার মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে—রায়হান কবির আসলে কে?
জায়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইশার দিকে তাকিয়ে বলল, —“চলো।”
ইশা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, —“কোথায়?”
—“সিকদার বাড়িতে।”
—“আমি সেখানে কেন যাব?”
—“কারণ আজ রাতে তোমাকে এখানে রাখা নিরাপদ নয়।”
ইশা ঠান্ডা গলায় বলল, —“আপনার বাড়ি কি খুব নিরাপদ?”
জায়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। —“আমার বাড়িতে অন্তত আমি জানি, কার ওপর ভরসা করা যায়।”
ইশা কিছু বলল না।
সাইফুল চৌধুরী এগিয়ে এসে বললেন, —“ইশা, আজ রাতটা জায়ানের সঙ্গে যা। কাল সকালে সবকিছু নিয়ে কথা বলব।”
ইশা বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বাবার চোখে এমন এক অস্থিরতা সে আগে কখনো দেখেনি।
—“আব্বু, আপনি কি কিছু জানেন?”
সাইফুল চৌধুরী চোখ সরিয়ে নিলেন।
ইশা বুঝে গেল, উত্তরটা আবারও লুকিয়ে রাখা হলো।
জায়ান ধীরে বলল, —“ইশা, এখন প্রশ্ন করার সময় নয়।”
ইশা তার দিকে তাকিয়ে বলল, —“আমার জীবন নিয়ে যখন সবাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন প্রশ্ন করার সময় কখন?”
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, —“যখন তোমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাব।”
ইশা আর কথা বাড়াল না।
কিছুক্ষণ পর সে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। জায়ানও তার পাশে বসে দরজা বন্ধ করল। গাড়ি ধীরে ধীরে চৌধুরী বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
প্রথম কয়েক মিনিট দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না।
ইশা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। শহরের আলো একের পর এক পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন।
হঠাৎ সে বলল, —“আপনি কি সত্যিই জানেন রায়হান কবির কোথায়?”
জায়ানের হাত স্টিয়ারিংয়ের ওপর শক্ত হয়ে গেল।
—“হ্যাঁ।”
ইশা তার দিকে তাকাল। —“কোথায়?”
—“এখন সেটা বলা যাবে না।”
ইশা বিরক্ত হয়ে বলল, —“আবার সেই একই কথা!”
—“কারণ সত্যিটা বললে তোমার বিপদ আরও বাড়বে।”
—“আমার বিপদ ইতিমধ্যেই হয়েছে।”
জায়ান চুপ করে রইল।
ইশা আবার বলল, —“ছবিটায় আপনি আর রায়হান কবির একসঙ্গে। ছবিটা কত বছরের পুরোনো?”
—“অনেক বছরের।”
—“তখন আপনার বয়স কত ছিল?”
জায়ান কিছুক্ষণ ভেবে বলল, —“উনিশ।”
ইশা অবাক হলো। —“উনিশ বছর বয়সে আপনি রায়হান কবিরের সঙ্গে কী করছিলেন?”
জায়ান এবার তার দিকে তাকাল না। শুধু সামনে তাকিয়ে বলল, —“তখন আমি জানতাম না, বড়দের একটা ভুলের মূল্য আমাকে এত বছর দিতে হবে।”
ইশা কথাটা শুনে চুপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর জায়ান নিজেই বলল, —“রায়হান আমার বাবার ব্যবসায়িক সহযোগী ছিল। কিন্তু পরে এমন একটা ঘটনা ঘটে, যার পর সবকিছু বদলে যায়।”
—“কী ঘটনা?”
—“একটা বড় টাকা লেনদেন নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। তারপর রায়হান নিখোঁজ হয়ে যায়।”
—“আর সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে?”
—“হ্যাঁ।”
ইশা ধীরে বলল, —“কিন্তু আপনি জানতেন সে বেঁচে আছে?”
জায়ান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। —“কিছুদিন আগে নিশ্চিত হই।”
—“তাহলে এতদিন আমাকে বলেননি কেন?”
—“কারণ তখন তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কই ছিল না।”
ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“আর এখন?”
জায়ান তার দিকে তাকাল।
—“এখন তোমাকে হারানোর ঝুঁকি নিতে পারি না।”
ইশার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি সিকদার বাড়ির সামনে এসে থামল।
বাড়িটা বিশাল। সামনে বড় লোহার গেট, চারপাশে নিরাপত্তার লোক। গাড়ি ঢুকতেই ইশার মনে হলো, এই বাড়ির ভেতরে যেন একটা অদৃশ্য ভারী পরিবেশ রয়েছে।
জায়ান গাড়ি থেকে নেমে ইশার জন্য দরজা খুলে দিল।
ইশা নামতেই সামনে সুফিয়া সিকদার এসে দাঁড়ালেন।
মায়ের চোখে উদ্বেগ। —“ইশা মা, এসো।”
ইশা অবাক হয়ে বলল, —“আন্টি, আপনি জেগে ছিলেন?”
সুফিয়া মৃদু হেসে বললেন, —“তুই আসবি শুনে কীভাবে ঘুমাই?”
মায়া ও আদনানও সেখানে এসে দাঁড়াল।
মায়া ইশাকে জড়িয়ে ধরে বলল, —“ভয় পাস না। এখানে তুই নিরাপদ।”
ইশা কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখ গিয়ে থামল ইমরান সিকদারের ওপর।
জায়ানের বাবা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইশার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তার মুখে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখা গেল।
তিনি যেন ইশাকে দেখে পুরোনো কোনো স্মৃতিতে ফিরে গেলেন।
ইশা সেটা লক্ষ্য করল।
—“আঙ্কেল?”
ইমরান সিকদার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে বললেন, —“এসো মা।”
জায়ান বাবার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখাচোখিতে যেন নীরব কোনো কথা হয়ে গেল।
ইশার সন্দেহ আরও বাড়ল।
রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরে চলে গেল। ইশার জন্য অতিথি কক্ষ প্রস্তুত করা হলো।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই সে বিছানায় বসে পড়ল।
তারপর ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করল।
ছবির তিনজন মানুষ— ইমরান সিকদার। সাইফুল চৌধুরী। রায়হান কবির।
ইশা ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, —“তোমাদের মধ্যে আসলে কী হয়েছিল?”
ঠিক তখনই দরজায় হালকা শব্দ হলো।
ইশা ছবিটা দ্রুত লুকিয়ে ফেলল।
—“কে?”
দরজা খুলে জায়ান ভেতরে ঢুকল।
ইশা সঙ্গে সঙ্গে বলল, —“আপনি এখানে কেন?”
—“তোমাকে দেখতে।”
—“আমি ঠিক আছি।”
জায়ান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, —“জানি।”
—“তাহলে?”
—“তোমার সঙ্গে একটা কথা বলতে এসেছি।”
ইশা চুপ করে রইল।
জায়ান ধীরে ধীরে বলল, —“আজ রাতে যা ঘটেছে, সেটা নিয়ে কাউকে কিছু বলবে না।”
ইশা ভ্রু কুঁচকে বলল, —“কেন?”
—“কারণ যে লোকটা তোমাকে অনুসরণ করছে, সে চায় তুমি ভয় পাও।”
—“আপনি কি জানেন সে কে?”
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“হ্যাঁ।”
ইশার চোখ বড় হয়ে গেল। —“কে?”
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল, —“রায়হান কবির।”
ইশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—“কিন্তু সে তো—”
—“নিখোঁজ ছিল।”
—“আপনি বলেছিলেন সে বেঁচে আছে।”
—“হ্যাঁ।”
ইশা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। —“তাহলে সে আমাকে কেন টার্গেট করছে?”
জায়ান উত্তর দিল না।
ইশা এবার কঠিন গলায় বলল, —“জায়ান, সত্যিটা বলুন।”
জায়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, —“কারণ রায়হান মনে করে তোমার বাবা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।”
ইশা যেন বজ্রাহত হলো।
—“আমার বাবা?”
—“হ্যাঁ।”
—“আপনি কি সেটাই বিশ্বাস করেন?”
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, —“আমি জানি না।”
ইশার চোখে পানি চলে এলো।
—“তাহলে আমাকে কেন এই সবকিছুর মধ্যে টেনে আনা হচ্ছে?”
জায়ান ধীরে বলল, —“কারণ তুমি সাইফুল চৌধুরীর মেয়ে।”
—“এটা কি আমার অপরাধ?”
—“না।”
—“তাহলে?”
জায়ান এক পা এগিয়ে এসে বলল, —“তোমার কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু যারা প্রতিশোধ নিতে চায়, তারা সবসময় অপরাধী আর নির্দোষের পার্থক্য করে না।”
ইশা চুপ করে গেল।
জায়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে দরজার দিকে হাঁটল।
ঠিক তখন ইশা তাকে থামাল।
—“জায়ান।”
সে ফিরে তাকাল।
ইশা ধীরে বলল, —“আপনি কি আমাকে সত্যিই বিয়ে করতে চান?”
জায়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল, —“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
জায়ানের চোখে এবার আগের সেই কঠোরতা নেই।
—“কারণ এই সবকিছুর আগেই তোমাকে আমার ভালো লেগেছিল।”
ইশা চুপ করে রইল।
জায়ান আবার বলল, —“কিন্তু এখন একটা কারণে তোমাকে বিয়ে করতে চাই আরও বেশি।”
—“কী কারণ?”
—“কারণ তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখলে যারা তোমাকে আঘাত করতে চায়, তারা হয়তো তোমাকে দুর্বল ভাববে। আর আমি চাই না কেউ তোমাকে দুর্বল ভাবুক।”
ইশার চোখে পানি জমে উঠল।
—“আমি দুর্বল নই।”
জায়ান মৃদু হেসে বলল, —“জানি।”
সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
ইশা একা ঘরে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নিচে বাগানে একটা ছায়ামূর্তি দেখতে পেল।
লোকটা শিউলি গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ইশা ভয় পেয়ে জানালা থেকে সরে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার তাকাল।
লোকটা নেই।
কিন্তু শিউলি গাছের নিচে কিছু একটা পড়ে আছে।
ইশা দ্রুত দরজা খুলে নিচে নামতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে জায়ানের কণ্ঠ—
—“কোথায় যাচ্ছ?”
ইশা চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
—“ওখানে কেউ ছিল।”
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে জানালার দিকে তাকাল।
তারপর নিচে তাকিয়ে দেখল শিউলি গাছের নিচে একটি সাদা খাম পড়ে আছে।
জায়ানের মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
সে দ্রুত নিচে নেমে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর লেখা—
“জায়ান, এবার সত্যিটা তোমাকেও জানতে হবে।”
জায়ান খামটা খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র কাগজ।
কাগজে লেখা ছিল—
“রায়হান কবির তোমার শত্রু নয়। আসল শত্রু তোমার নিজের পরিবারে।”
জায়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
আর ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে ইশা সবকিছু পড়ে ফেলল।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
ইশা কাঁপা গলায় বলল,
—“জায়ান… তোমার পরিবারে কে?”
জায়ান কোনো উত্তর দিল না।
কারণ তার মাথায় তখন শুধু একজন মানুষের নাম ঘুরছে।
ইমরান সিকদার।
রানিং....!
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#শিউলি_প্রণয়_কাব্য_ #লেখনীতে_রিতু_মনি #৮ম_পর্ব