ফন্ট সাইজ:
থিম:
আঁধারি

১ম পর্ব

লেখক: দূর্বা এহসান

নিজেরই হবু বরের সাথে বোনের বিয়ে দেখছে তেজা।চোখের সামনেই একে একে সম্পন্ন হচ্ছে সব আচার-অনুষ্ঠান।আচ্ছা এই সময় তেজার কি করা উচিত? নিশ্চই কেঁদে কেটে পাগলপ্রায় হয়ে যাওয়ার কথা? কিন্তু তার কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না তেজার মাঝে।বরং বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে পায়ের উপর পা তুলে সে সেই বিয়ে দেখছে। 

বেশ কিছু মুহূর্ত আগেও এই মঞ্চে তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।অথচ এখন সে নিজেই হবু বর রেয়ান এর সাথে সৎ বোন তিয়াশার বিয়ে দিচ্ছে।সব সময় গম্ভীর মুখে থাকা তেজা মুখে এই সময় দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত হাসি।
তার ঠিক কয়েক হাত দূরেই কাজী সাহেব বিয়ে পড়াচ্ছেন।আশেপাশে উপস্থিত মানুষজন তারই বাড়ির লোক।আত্মীয়দের কিছুক্ষণ আগেই বিদায় করে দিয়েছেন বাড়ির কর্তা জসিমউদ্দিন খন্দকার। সম্পর্কে তিনি তেজা দাদা।
বারবার তাকাচ্ছেন তেজার দিকে। তার শান্ত থাকা তিনি মোটেও ঠিক ভাবে নিতে পারছেন না
 সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিল তেজা। ঠোঁটের কোণে সেটাকে আটকে লাইটার জ্বালাতেই ক্ষণিকের জন্য তার চোখদুটো আগুনের হলদে আলোয় চকচক করে উঠল। প্রথম টানটা নিয়ে ধোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে ওপরে ছেড়ে দিল সে।
অদ্ভুত ব্যাপার,নিজের বিয়ে ভেঙে গেছে, অথচ তার চোখে এক ফোঁটা জল নেই। বরং মুখের কোণে ঝুলে থাকা হাসিটা প্রতি মুহূর্তে আরও গভীর হচ্ছে।
পরনে লাল রঙের ভারী লেহেঙ্গার ব্লাউজ। কোমর থেকে নিচে আর লেহেঙ্গা নেই। তার বদলে কালো রিপড জিন্স। মাথার ওড়নাটা অনেক আগেই খুলে ছুড়ে ফেলা হয়েছে মেঝেতে।তার পাশেই পরে আছে লেহেঙ্গার বাকি অংশটা।সাজগোজের প্রতিটি অংশে বিয়ের কনের ছাপ থাকলেও, তার বসার ভঙ্গিটা যেন কোনো গ্যাং লিডারের।এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে বসে আছে সে।
চারপাশে উপস্থিত মানুষগুলো একবার কাজীর দিকে, আরেকবার তেজার দিকে তাকাচ্ছে। কেউ সাহস করে একটা শব্দও উচ্চারণ করছে না। কারণ সবাই জানে, তেজা কখন কী করবে, সেটা অনুমান করা অসম্ভব।শুধু দূরে দাঁড়ানো একজন মহিলা তেজার পানে চেয়ে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠছে।
জসিমউদ্দিন খন্দকারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এত বছর মানুষ দেখে তার একটা জিনিস শিখেছেন,যে মানুষটা সব হারিয়েও নিশ্চুপ থাকে, তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাওয়া উচিত।
কিন্তু তেজা শুধু নিশ্চুপ নয়।সে হাসছে।সেই হাসিতে কষ্টের ছিটেফোঁটাও নেই। আছে কেবল এমন এক শীতল উন্মাদনা, যা একজন স্বাভাবিক মানুষের শরীরে কাঁটা দিতে বাধ্য।
রেয়ান একবার আড়চোখে তাকাল তেজার দিকে।চোখাচোখি হতেই তেজা সিগারেটের ছাই ঝেড়ে খুব আস্তে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। সেই হাসিটাই রেয়ানের বুকের ভেতর অকারণ শীতল একটা স্রোত বইয়ে দিল।
 সে হঠাৎই অনুভব করল,তেজা সে যেন কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছে। এমন কিছুর, যা শুরু হলে এই বিয়ের আসরে উপস্থিত একজন মানুষও আর আগের মতো থাকবে না।
বিয়ে পড়ানো শেষ হলো।সিগারেট এর বাকি অংশটুকু ফ্লোরে ফেলে পা দাড়া পিষে ফেললো সেটাকে।ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলো সে নব দম্পতির দিকে।
তিয়াশা তেজাকে নিজের দিকে আসতে দেখে রেয়ানের এক হাত শক্ত করে ধরলো। সিঁটিয়ে গেলো সে রেয়ানের কাছে।যেনো বড্ড ভয় হচ্ছে তার। তেজার চোখ এড়ালো না তা। ক্ষীণ হাসলো সে।একদম তিয়াশার সামনে এসে দাঁড়ালো। ওর মুখের দিকে হাত বাড়ালো।তৎক্ষণাৎ রেয়ান যেনো তিয়াশাকে প্রোটেক্ট করার জন্য সামনে এসে দাঁড়ালো।
এবার তেজার হাসি চওড়া হলো। রেয়ানকে উপেক্ষা করে সে তিয়াশার কানের কাছে মুখ নিলো।
— মাই ডিয়ার লিটল সিস্টার,সুখী হও নতুন জীবনে।
তিয়াশার পুরো শরীর শিউরে উঠল। মেরুদণ্ড বেয়ে যেন হিমশীতল কিছু নেমে গেল। অকারণেই তার আঙুলগুলো আরও শক্ত হয়ে চেপে ধরল রেয়ানের হাত।
তেজা তখনও হাসছে।হঠাৎ সে খুব আস্তে তিয়াশার কানের পাশে ঝুলে থাকা একগুচ্ছ চুল আঙুলে পেঁচিয়ে আবার ছেড়ে দিল।
—ভয় পাস না ,আজ তোকে কেউ ছুঁবে না
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
—আজকের দিনটা শুধুই তোর।কিন্তু কাল!!
এক এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না তেজা।বাগানে বিশাল করে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সে সেই অবস্থাতেই নির্বিকার পায়ে সে পুরো বাগান পেরিয়ে মেইন গেটের সামনে এসে থামল পকেট থেকে ধীরে ধীরে চাবিটা বের করল। 
গেটের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল তার প্রিয় ম্যাট ব্ল্যাক Kawasaki Ninja ZX-10R,অন্ধকারেও যার আগ্রাসী অবয়ব আলাদা করে নজর কাড়ছে। ধারালো ফেয়ারিং, কার্বন-ফাইবারের ছোঁয়া, প্রশস্ত রিয়ার টায়ার আর কালো অ্যালয় হুইল মিলিয়ে বাইকটা তার মালিকের বেশ প্রিয়।
এক মুহূর্তও দেরি না করে তেজা বাইকের সিটে উঠে বসল। ইগনিশনে চাবি ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল শক্তিশালী ইনলাইন-ফোর ইঞ্জিন। সেই গভীর, ভারী শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। হেডলাইটের সাদা আলো সামনের অন্ধকার রাস্তা কেটে দিল, আর পরের মুহূর্তেই থ্রটল ঘুরিয়ে তেজা ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
___________
কয়েকজন কালো পোশাকধারী দেহরক্ষীর মাঝখানে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে একজন যুবক। পরনে নিখুঁত ফিটিংয়ের ব্ল্যাক কোর্ট, ভেতরে তুষারের মতো সাদা শার্ট, আর ব্ল্যাক ড্রেস প্যান্ট। কব্জিতে দামি ঘড়ি, আঙুলে সাধারণ একটি কালো রিং। ছয় ফুটেরও বেশি লম্বা দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, ধারালো চোয়াল, উঁচু নাসিকা আর তীক্ষ্ণ চোখ,যেন বরফের মতো শীতল।
তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক ব্যক্তি। কাঁপা হাতে বারবার ক্ষমা চাইছে, চোখে-মুখে বাঁচার আকুতি। কিন্তু যুবকের চোখে তার জন্য এক বিন্দু করুণাও ফুটে উঠল না। ধীর, স্থির ভঙ্গিতে টেবিলের ওপর রাখা পিস্তলটি হাতে তুলে নিল সে। ঠান্ডা দৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে ট্রিগারে চাপ দিল।
গুলির বিকট শব্দে মুহূর্তের জন্য পুরো প্রাইভেট রুম স্তব্ধ হয়ে গেল। উপস্থিত দেহরক্ষীদের মুখেও কোনো পরিবর্তন নেই, যেন এমন দৃশ্য তাদের কাছে নতুন কিছু নয়।
ঠিক সেই সময়ই প্রাইভেট রুমের দরজা ধাক্কা মেরে খুলে গেল।টলমল পায়ে ভেতরে ঢুকল তেজা। চোখ দুটো আধখোলা, মুখে নেশার স্পষ্ট ছাপ। চারপাশে কী ঘটেছে, কে বসে আছে, কারা দাঁড়িয়ে আছে,কোনো দিকেই একবারও তাকাল না সে। নিজের ভারসাম্য সামলাতে সামলাতে সোজা এগিয়ে গেল মাঝখানে বসে থাকা যুবকের দিকে।
পরের মুহূর্তেই কোনো দ্বিধা ছাড়াই তেজা গিয়ে যুবকের কোলের ওপর বসে পড়ল। মাথাটা আলতো করে তার বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল,
— ফাকিং লাভ।
আতঙ্কে চোখ মুখ কালশিটে হয়ে গেলো সব বডিগার্ডের। এই মেয়ে কে?সে জানে কার কোলে এসে বসেছে? জিন্দা ক ব রে যাওয়ার এত সখ?
সবসময় রুথলেস,কোল্ড হার্টেড নাম পাওয়া যুবক যেনো শান্ত হয়ে গেলো। অদ্ভুতভাবেই তার মুখ চোখে ফুটে উঠলো সাময়িক আশ্চর্য।নারী স্পর্শ থেকে দূরে থাকা যুবকের হাত আশ্চর্যজনক ভাবে মেয়েটার মাথায় চলে গেলো।আঙুল গুলো ছুঁয়ে দিলো লম্বা চুলগুলো।
তেজা হালকা নড়েচড়ে আরও একটু গা এলিয়ে দিল তার বুকে।
— উমম... ভালো লাগছে...
অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করতেই যুবকের চোখে এক ঝলক অচেনা অনুভূতি খেলে গেল। অনুভূতিটা এত ক্ষণস্থায়ী যে, পরের মুহূর্তেই আবার তার মুখ আগের মতোই পাথরের মতো নির্লিপ্ত হয়ে উঠল।সে ধীরে মাথা তুলে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দেহরক্ষীদের দিকে তাকাল।শুধু একবার।কোনো কথা বলল না।কিন্তু সেই এক দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।
মুহূর্তের মধ্যে সবাই মাথা নিচু করে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশাল প্রাইভেট রুমে রইল শুধু দু'জন মানুষ,একজন রুথলেস, কোল্ড-হার্টেড যুবক, আর তার বুকের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া এক মাতাল মেয়ে।
চলবে.......
#আঁধারি (গল্পের নাম)
#দূর্বা_এহসান
#সূচনা_পর্ব
#আঁধারি (🚫সতর্কতা: এই পর্বে এমন কিছু আছে যা দুর্বল হার্টের মানুষের এড়িয়ে চলা উচিত)
#দূর্বা_এহসান
#পর্ব —(২)
জানালার ভারী ধূসর পর্দার ফাঁক গলে দুপুরের সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। সোনালি রোদের সরু রেখাগুলো কখনো বিছানার সাদা চাদরের ওপর, কখনো মেঝের চকচকে মার্বেলের গায়ে পড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তির আবহ তৈরি করেছে। 
বিছানায় শুয়ে থাকা তেজা অস্বস্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল। চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠল কয়েকবার। যেন গভীর কোনো দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে বাস্তবে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। একসময় ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই কপালের দুই পাশ দিয়ে তীব্র ব্যথার ঢেউ বয়ে গেল। 
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঠোঁট ফাঁক হয়ে একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে এল।
— আহ
ডান হাতটা কপালের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করল সে। গলা এতটাই শুকিয়ে গেছে যে ঢোক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি। গত রাতের সবকিছু যেন কুয়াশায় ঢাকা। যতই মনে করার চেষ্টা করছে, স্মৃতিগুলো ততই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
তেজা ধীরে ধীরে উঠে বসল। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। তারপর চারপাশে চোখ বোলাতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।ঘরটা সম্পূর্ণ অপরিচিত।এটা তার ঘর নয়।
এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল সে। মাথা এখনও ঘুরছে, তবু নিজেকে সামলে নিল। তীক্ষ্ণ চোখে পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ঘরের প্রতিটি জিনিস নিখুঁতভাবে সাজানো। দেয়ালে কালো আর ধূসর রঙের মিনিমালিস্ট ডিজাইন, একপাশে বুকশেলফ, অন্য পাশে বিশাল কাঁচের জানালা। দামি কাঠের আসবাবপত্র।
তেজার বুকের ভেতর মুহূর্তেই সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠল।অভ্যাসবশত কোমরের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু খুঁজল সে। পরক্ষণেই বুঝতে পারল, সেখানে কিছুই নেই। বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দেখল। দরজা খোলা। তবে বাইরে সম্পূর্ণ নীরবতা।
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আবার ঘুরে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল বিছানার পাশের ছোট্ট কাঠের টেবিলটার ওপর।এক গ্লাস ঠান্ডা পানি।তার পাশে হ্যাংওভারের ওষুধ।
আর খুব যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা এক সেট নতুন পোশাক। কালো টি-শার্ট, গাঢ় নীল জিন্স আর এক জোড়া সাদা স্নিকার্স।
তেজা ধীরে ধীরে টেবিলটার কাছে এগিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত কোনো কিছু স্পর্শ করল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল জিনিসগুলোর দিকে। তারপর গ্লাসটা হাতে তুলে নিল। কাঁচের গায়ে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো দেখে বুঝতে বাকি রইল না,এগুলো বেশিক্ষণ আগে এখানে রাখা হয়নি।
অর্থাৎ তার ঘুম ভাঙার আগেই কেউ এই ঘরে এসেছিল।কেউ একজন জানত, ঘুম থেকে ওঠার পর তার কী লাগবে।তেজার চোখ দুটো ধীরে ধীরে সরু হয়ে এল।ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় হাসি।এতটা যত্ন!কার?
 দরজায় খুব হালকা একটা নক পড়ল। শব্দটা এতটাই মৃদু যে মনোযোগ না থাকলে হয়তো কানে পৌঁছাতই না। তেজা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর দরজাটা ভেতরের দিকে খুলে গেল। হাতে ধোঁয়া ওঠা।এক কাপ ব্ল্যাক কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল একজন নারী।পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে সার্ভেন্ট। ভেতরে ঢুকেই মাথা নত করল সে।
— গুড মর্নিং, ম্যাম।
তেজা কোনো উত্তর দিল না। শীতল দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকালো।নারী কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে বলল,
— স্যার বলেছেন, ঘুম থেকে ওঠার পর যেন আপনি এটা খেয়ে নেন। এতে মাথাব্যথা কিছুটা কমে যাবে।
স্যার?তেজার ঠান্ডা কণ্ঠ ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
— আমি কোথায়?
মহিলা বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন,
— আপনি রিশ প্যালেসে, ম্যাম।
— রিশ... প্যালেস?
নামটা যেনো চেনা অচেনা লাগলো তেজার কাছে। কৌতুহলবশত প্রশ্ন করলো,
— এটা কার?
মহিলা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,
— দুঃখিত, ম্যাম। স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
— আমাকে এখানে কে এনেছে?
— গত রাতে আপনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন। স্যার নিজেই আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।
মুহূর্তেই গত রাতের কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি মাথায় ভেসে উঠল। গুলির শব্দ,মদের ঝাঁজ,তারপর কারও বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলা।তারপর আর কিছুই মনে নেই।তেজা গভীর শ্বাস নিল।
— তিনি এখন কোথায়?
— অফিস এ।
আর প্রশ্ন করলো না তেজা।এসব তার সভাবে নেই।মহিলা চলে গেলেন।দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ঘর আবার নীরব হয়ে গেল।
তেজা কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একবার নিজের পরনের দিকে তাকাল। গত রাতের সেই লেহেঙ্গার চোলি , আর নিচে পরা ব্লু জিন্স।সবকিছুই আগের মতো আছে।
টেবিলের ওপর রাখা নতুন পোশাকের দিকে একবারও হাত বাড়াল না সে।
—I don't wear someone else's choice.
নিজের মনেই বিড়বিড় করে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।ঘর থেকে বেরিয়েই দেখতে পেলো, লম্বা করিডোর, কালো মার্বেলের ফ্লোর, উঁচু ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, দেয়ালে দামি পেইন্টিং আর চারদিকে নিঃশব্দে টহল দেওয়া ব্ল্যাক স্যুট পরা সিকিউরিটি।
কিন্তু সেদিকে একবারও তাকাল না তেজা।যে মানুষটা তাকে এখানে এনেছে, তার সঙ্গে দেখা করারও কোনো ইচ্ছে নেই।
সোজা সিঁড়ি দিয়েই নিচে নেমে এল সে। পথের মাঝে কয়েকজন সার্ভেন্ট তাকে দেখে সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করলেও সে কাউকে কোনো গুরুত্ব দিল না।
Main door ঠেলে বাইরে পা রাখতেই সকালের ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল।একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।লম্বা ড্রাইভওয়ে পেরিয়ে Main Gate-এর কাছে আসতেই তার হাঁটা থেমে গেল।
গেটের ঠিক পাশে, যেন তার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে ম্যাট ব্ল্যাক Kawasaki Ninja ZX-10Rচাবিটাও ইগনিশনেই লাগানো।তেজার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করল না। যেন সবাই আগেই নির্দেশ পেয়েছে।আর এক মুহূর্তও দেরি করল না তেজা।বাইকটার কাছে গিয়ে হেলমেট ছাড়াই সিটে উঠে বসল। এক ঝটকায় ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই ভারী গর্জনে কেঁপে উঠল চারপাশ।
পরের মুহূর্তেই থ্রটল ঘুরিয়ে Rush Palace-এর বিশাল গেট পেরিয়ে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল সে
ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার চলে যাওয়া দেখে হাসলো যুবক। টেবিলের উপর আঙুল গুলো একটা একটা করে ঠুকছে সে।শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করল।
— mine 
____________
গতকালের বিয়ের সব আয়োজনের চিহ্ন যেন রাতারাতি মুছে ফেলা হয়েছে খন্দকার বাড়ি থেকে। বাগানের আলোকসজ্জা খুলে নেওয়া হয়েছে, ফুলগুলো শুকিয়ে একপাশে ফেলে রাখা, অতিথিদের জন্য সাজানো টেবিল-চেয়ারও আর নেই। যেন এখানে কোনোদিন কোনো উৎসবই হয়নি।
তবু বাড়ির ভেতরের পরিবেশটা অস্বাভাবিকভাবে ভারী। দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। সার্ভেন্টরাও পা টিপে টিপে হাঁটছে।
ড্রইংরুমে বসে আছেন খন্দকার পরিবারের সবাই। প্রত্যেকের মুখে উৎকণ্ঠা। গত রাতের ঘটনার পর থেকে কেউই স্বাভাবিক হতে পারেনি।ঠিক তখনই বাইরে ভেসে এলো পরিচিত এক স্পোর্টস বাইকের গর্জন।
তেজা ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকতেই ড্রইংরুমে বসে থাকা সবার দৃষ্টি একসঙ্গে তার ওপর গিয়ে থামল।কয়েক সেকেন্ড কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।
পরের মুহূর্তেই এক নারী দ্রুত উঠে এসে তেজাকে জড়িয়ে ধরলেন।
— তুই কোথায় ছিলি, তেজা? সারারাত আমরা তোকে খুঁজেছি!
তেজা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।মহিলা সম্পর্কে তার চাচি।সে নিস্পৃহ চোখে সামনে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে রইল।ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— I'm fine. আমরা বলতে কাদের কথা বোঝালে মামনি?
তার কথার জবাবে কিছু বলতে পারলেন না শানজানা খন্দকার।তিনি ভালো করেই জানেন,তিনি ছাড়া বাড়ির একটা প্রাণীও তেজাকে নিয়ে চিন্তিত ছিল না।
জসিমউদ্দিন গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— সারারাত কোথায় ছিলে?
তেজা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে উত্তর দিলো,যদিও বা তার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না এই মানুষ গুলোর সাথে কথা বলার।
— মনে নেই।
— মানে?
— I was drunk.
শব্দ তিনটি এতটাই নির্লিপ্তভাবে বলল সে, যেন বিষয়টা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।তেজা আর কারও মুখের দিকে তাকাল না। সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বলল,
— আমি একটু রেস্ট নেব। পরে কথা হবে।
বলেই এক মুহূর্তও না থেমে ওপরে উঠে গেল। জমিসুদ্দিন ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।এই বাড়িতে তার ৪ জন নাতি নাতনির মধ্যে তেজাই একমাত্র এতটা উগ্র।হ্যাঁ তার ভাষ্যমতে এটা উগ্র। তার ছেলে যদি তেজার নামে বাড়ি,বাদবাকি প্রপার্টি লিখে না দিতো তাহলে হয়তো তিনি বা বাড়ির আর মানুষগুলো তেজাকে কবেই নিজেদের জীবন থেকে দুর করে দিতো।রাগে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে গেলো তার।পাশে বসা তার বড় ছেলে আসাদ খন্দকার আগুনে ঘি ঢেলে বললো,
— তোমার ছেলে তো মরেছে।আমাদের ও মারার জন্য এই একটাকে রেখে গেছে।
কিছু বললেন না জসিমউদ্দিন।ডাইনিং এ গিয়ে বসলেন।বাকিরাও বসলো গিয়ে তার সাথে।
_________________
ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁইছুঁই। পুরো শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ব্যস্ত রাস্তাগুলো এখন প্রায় জনশূন্য। দূরে কোথাও স্ট্রিট লাইটের হলুদ আলো মৃদুভাবে জ্বলছে, আর চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে যে বাতাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়।
ঠিক সেই নীরবতার মাঝেই প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় দৌড়ে চলেছে একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ। ভয়ে তার বুক ওঠানামা করছে, কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। বারবার পেছনে তাকাচ্ছে সে, কিন্তু যতবারই তাকাচ্ছে, বুকের ভেতরের আতঙ্ক ততই বেড়ে যাচ্ছে।
তার কয়েক গজ পেছনেই ধীর, স্থির পদক্ষেপে হেঁটে আসছে কালো পোশাক পরা এক রহস্যময় নারী। রাতের অন্ধকারে তার কোমর ছুঁয়ে নামা সাদা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, শিকার যতই দৌড়াক না কেন, শেষ পর্যন্ত পালানোর কোনো সুযোগ নেই।
লোকটা হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে পেছাতে পেছাতে বলল, 
"আমাকে ছেড়ে দাও... আমি আর কখনো..."
 কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই নারীটি তার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ স্থির চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত, বরফশীতল কণ্ঠে বলল, 
—যেসব মেয়ের জীবন তুই নষ্ট করেছিস, তাদের কান্নাও কি এভাবেই উপেক্ষা করেছিলি?
লোকটার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রমণী কোনো কথা বাড়ালো না।লোকটাকে একটা ইনজেকশন পুষ করলো।সাথে সাথেই যেনো নিস্তেজ হয়ে গেলো লোকটা। হারিয়ে ফেললো নড়াচড়া করার ক্ষমতা। কিন্তু ব্যথা পেলে তা বুঝতে পারছি।চিৎকার করতে পারছে।
রমণী ছোট একটা চা কু বের করলো। একে একে কেটে ফেললেও লোকটার শরীরের সকল কাপড়। বুকের উপর আলতো করে চা কু দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলো। শরীরের চামড়া ভেদ করে ঢুকে গেলো।নিচ দিকে টান দিল সে।কে টে গেলো একটু।তৎক্ষণাৎ পশুপাখির চামড়া ছি'লা'নো'র মতো হাতের পজিশন নিলো রমণী।
________
পরদিন ভোর হতেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আরেকটি চাঞ্চল্যকর খবর। একজন ধর্ষককে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে কোনো খুনির পরিচয় মেলেনি, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও নেই। শুধু আগের ঘটনাগুলোর মতো মা ন ব চা ম ড়া বিছিয়ে রাখা।আর তার উপরেই লেখা, 
     "আঁধারি ,তোদের বিনাশকারী।"
এটা ছিল একই লেখা বহন করা আরেকটি হত্যাকাণ্ড।এর আগেও একই ভাবে কয়েকবছর থেকে চলে আসছে।অথচ একটা কেসের ও সুরাগ মেলেনি।কি নির্মম হ ত্যা কা ণ্ড। প্রতিটা লা শে র রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায়,
জীবিত অবস্থাতেই প্রথমে শরীরের চা ম ড়া তুলে নিয়েছে। তারপর লবণ মরিচের গুরা লাগানো হয়েছে।এতেও যেনো ক্ষান্ত হয়নি, পু রু ষা ঙ্গ কে টে মৃতের মুখেই ঢু কি য়ে দেয়া হয়েছে। তবুও ক্ষান্ত হয়নি সেই আঁধারি, ক লি জা বের করে কে টে টু ক রো টু ক রো করেছে।
শহরের মানুষের মনে আবারও ফিরে এল সেই অজানা আতঙ্ক,কে এই আঁধারি, যে একের পর এক
 ধ র্ষ ক দের খুঁজে বের করছে, আর আইনের আগেই তাদের এই নির্মম পরিণতি দিচ্ছে।
চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন