ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

২য় পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

২..

(বিশাল বড় পর্ব ভুলত্রুটি খবর সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)

—০—

এস.কে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চারপাশটা আজ রঙিন উৎসবে সেজেছে। আজ নবীনবরণ। চারদিকে তরুণ প্রাণের উচ্ছ্বাস, রঙিন বেলুন আর তরুণের ঝিকিমিকি। অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, মাননীয় মন্ত্রী শেহজাদ খানের। কিন্তু দলীয় জরুরি কাজের চাপে তিনি আসতে পারেননি, তাই নিজের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছেন ফারাজকে।

স্টেজে চলছে নাচ-গানের মহড়া।এরই মাঝে ভিড়ের মধ্যে এক কোণায় সিটে বসে আছে রুশদী। তার পাশে বসে সমানে বকবক করে যাচ্ছে তিথি। কলেজে রুশদীর একমাত্র বন্ধু বলতে এই তিথিই।

তিথি কনুই দিয়ে রুশদীকে একটা গুঁতো দিয়ে বলল, "ঐ দেখ, দেখ! ওই ছেলেটা কী সুন্দর না?"

তিথির এই ছেলে দেখার স্বভাব মোটেই পছন্দ না রুশদীর।ওচরম বিরক্তি নিয়ে একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল, "তোর দেখার শখ হয়েছে, তুই-ই দেখ।"

তিথি উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, "আরে দেখ না, কী স্টাইলিশ! বিশেষ করে চুলগুলো— জাস্ট ওয়াও!"

রুশদী এবার বাঁকা চোখে তাকাল, "তিথি, তুই ছেলেদের স্টক করছিস?"

তিথি বুক ফুলিয়ে জবাব দিল,যেন কোনো মহান কাজ করে ফেলেছে সে।

"দেখ ভাই, আমি হলাম পিওর সিঙ্গেল। তাই দুনিয়ার সব সুন্দর ছেলে আমার। এটাও আমার, ওটাও আমার!"

রুশদী বিড়বিড় করে বলল, "লুচ্চা মাইয়া একটা!"

"এখানে লুচ্চার কি হলো?আমার কি কেউ আছে যার প্রতি আমি লয়াল থাকবো? কেউ নেই তাই আমি সবার প্রতি দয়াল!"

রুশদী মুখ বাকালো, "মানবতার ফেরিওয়ালা।"

মঞ্চে প্রধান অতিথির নাম ঘোষণা করা হলো। মাইক্রোফোনে জানানো হলো তাঁর পরিচয়। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দিতে শুরু করলেন। কিন্তু মঞ্চের দিকে তাকাতেই রুশদীর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। গলার পানি যেন মুহূর্তেই শুকিয়ে কাঠ!

মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটিই অত্র স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান, যাঁকে গতকাল রুশদী রাগের মাথায় ক্যান ছুড়ে মেরেছিল! লোকটার কপালে একটা ছোট্ট টেপ লাগানো— যেটা রুশদীর কীর্তির প্রমাণ। রুশদী কল্পনাও করতে পারেনি যে কালকের সেই লোকটা আজ তার সামনে কলেজের চেয়ারম্যান হয়ে আবির্ভূত হবে।

রুশদীর খানিক ভয় হলো। যদি লোকটা তাকে চিনে ফেলে? যদি প্রিন্সিপালকে বলে এখনই টিসি দিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেয়? নবীনবরণের আনন্দ বিষাদে রূপ নিল মুহূর্তেই। সে ভাবল, "ভার মে যাক নবীনবরণ! এখানে এক মুহূর্ত থাকা মানেই বিপদ।"

রুশদী সিদ্ধান্ত নিল, সে আর এক সেকেন্ডও এখানে থাকবে না। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই তাকে পালাতে হবে।যেই ভাবা সেই কাজ। রুশদী ঠিক করল সে এখান থেকে এখনই কেটে পড়বে। কিন্তু সমস্যা হলো তিথিকে নিয়ে; ওকে না বলে গেলে ও রুশদীর জান নিয়ে ফেলবে। তিথি বোধহয় ক্লাসরুমের দিকে গেছে। রুশদী তড়িঘড়ি করে কলেজ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ওদের ক্লাস তৃতীয় তলায়। কিন্তু পুরো ফ্লোর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তিথির দেখা পেল না সে। বিরক্তি আর আতঙ্কে রুশদীর কপাল কুঁচকে এল।

কথায় আছে না— ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়’। তিথির দেখা তো মিললই না, উল্টো রুশদী যা এড়াতে চেয়েছিল, তার সাথেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার উপক্রম হলো। রুশদী যখন তৃতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল, ঠিক তখনই দ্বিতীয় তলার করিডোরে নজর পড়ল তার।

রেলিং ঘেঁষে পকেটে হাত দিয়ে অসম্ভব স্মার্টলি দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ। পরনে দামী কালো স্যুট-কোট, পায়ে চকচকে জুতো, আর হাতে ব্র্যান্ডের ঘড়ি। চোখে কালো সানগ্লাস।পাশে কয়েকজন শিক্ষক দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে আলোচনায় মগ্ন।

তাঁকে দেখেই রুশদীর কলিজা শুকিয়ে গেল। সে ঝট করে উল্টো ঘুরে আবার ওপরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ভাগ্য আজ তার সহায় নেই। পেছন থেকে পাথর চাপা দেওয়া গম্ভীর এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

"এই মেয়ে, এদিকে এসো!"

রুশদীর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের দিকে ইশারা করে নিঃশব্দে জানতে চাইল, তাকেই কি ডাকা হচ্ছে?

ফারাজ গম্ভীর মুখে বললেন, "হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। কাম হেয়ার!"

উপায় না দেখে রুশদী খুব ভদ্র মেয়ে সেজে ফারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কলেজের শিক্ষকদের সামনে তো আর বেয়াদবি করা যাবে না, আর এখন সে জেনেও গেছে যে এই লোকটাই কলেজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।রুশদী চোরের মতো কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, "জি স্যার!"

ফারাজ চশমার ওপর দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে মেপে নিয়ে বললেন, "চোরের মতো পালাচ্ছিলে কেন?"

"না স্যার... এমনি..." রুশদী আমতা আমতা করে জবাব দিল।

"নাম রুশদী, রাইট?"

"জি স্যার!"

"ফলো মি!"

কথাটা বলেই ফারাজ হনহনিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। রুশদী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। পাশে থাকা একজন শিক্ষক ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, "রুশদী, তুমি কি কোনো অঘটন ঘটিয়েছ?"

রুশদী খুব ভোলাভালা মুখ করে মাথা নেড়ে বলল, "না তো স্যার!"

"তাহলে উনি তোমাকে এভাবে ডাকলেন কেন?"

"জানি না স্যার।"

"উনি কলেজে আসলে কাউকে না কাউকে টিসি দিয়ে বিদায় করে।এবার হয়তো উনার টার্গেট তুমি!"

রুশদী আঁতকে উঠে বলল, "কিন্তু স্যার, আমি তো..."

"যাও দেখো উনি কী বলেন।"

রুশদী পা টেনে টেনে ফারাজের পেছন পেছন যেতে লাগল। তার মনে হলো, আজ বোধহয় তার কলেজের শেষ দিন!

কলেজের মিটিং রুমের ঠিক বিশাল কাঁচের টেবিলের ওপর আয়েশ করে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ফারাজ। তাঁর সামনে অপরাধীর ন্যায় কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে কলেজ ড্রেস পরিহিত মিস রুমাইসা হক রুশদী। ফারাজ বেশ বুঝতে পারছেন, রুশদীর শান্ত চেহারার আড়ালে এখন রাগের এক বিশাল আগ্নেয়গিরি ফুটছে; যেকোনো সময় অগ্নুৎপাত হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। দীর্ঘ ২০/৩০ মিনিট ধরে তাকে এই অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।

রুশদী এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত। মনে হচ্ছে ডান পা-টা বোধহয় এখনই শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে। ক্লান্তিতে শরীর যখনই একটু নুইয়ে পড়ছে, অমনি ফারাজের গমগমে কণ্ঠ গর্জে উঠছে, "এই মেয়ে, ঠিকঠাক দাঁড়াও!"

রুশদীর ইচ্ছে করছে এখনই লোকটাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খেতে! কিন্তু সামনে এইচএসসি পরীক্ষা। এই মুহূর্তে টিসি খাওয়া যাবে না। তাই রাগে দাঁত কিড়মিড় করেও সে সব সহ্য করে যাচ্ছে।নতুবা,এমন শাস্তি,এমন মানুষের কাছ থেকে মেনে নেওয়ার মেয়ে রুশদী না।

ফারাজ টেবিলের ওপর হাত রেখে আরাম করে বসে। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, "কালকের ওই কাজের জন্য তোমাকে কী শাস্তি দেওয়া উচিত বলো তো?"

রুশদী মিনমিন করে বলল, "মাফ করে দিন স্যার, আর কখনো এমনটা হবে না।"

ফারাজ মাথা থেকে পা পর্যন্ত রুশদীকে একবার পরখ করে নিলেন। তারপর বিদ্রূপের স্বরে বললেন, "খাটো পটল!"

"জি?"

"তোমার নাম খাটো পটল।"

"আমার নাম রুশদী, স্যার!"

"জানি। কিন্তু তোমার হাইট এর সাথে এই নামটাই বেশি মানানসই," ফারাজের গলায় তাচ্ছিল্য।

নিজের উচ্চতা নিয়ে এমন অপমান রুশদী আর সহ্য করতে পারল না।হাইট নিয়ে অনেকে অনেক সময় অনেকে বাজে কথা শুনিয়েছে৷ তাই এটা সহ্য হলো না রুশদীর।কান ছেড়ে দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে সে বলল, "আজব তো! আপনি আমার হাইট নিয়ে কথা বলছেন কেন, স্যার?"

এবার জমেছে।ফারাজ যেন তার বিরক্তি উপভোগ করছে।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে একের পর এক প্রশ্ন শুরু করলেন।

"বাসা কোথায় তোমার?"

"আসমানের নিচে, জমিনের উপরে।"

"বাবার নাম কী?"

"দাদার ছেলে।"

"বাবা কী করেন?"

"বাবার ব্যবসা।"

"মানে?"ফারাজ এর ভ্রু কুঁচকে গেল

"মানে দাদার ব্যবসা ছিল, আব্বু এখন ওটাই করেন।"

ফারাজ এবার সোজা হয়ে বসল,

"তোমার বয়স কত?"

"আপনাকে বলতে বাধ্য নই।"

"কয় ভাইবোন তোমরা?"

"মনে নেই!"

ফারাজ মেয়েটার সাহস দেখে সত্যি অবাক হচ্ছে, কলেজের চেয়ারম্যান জানা সত্বেও তার সঙ্গে এমন বেয়াদবি করছে? মানতে হবে বস, মেয়েটার সাহস আছে।ফারাজ কিছুক্ষণ থমকে থেকে বলে,

"তুমি কি সবসময়ই এমন ত্যাড়াব্যাকা কথা বলো?"

"প্রশ্ন সোজা করলে উত্তরটাও সোজা পাবেন।"

"সুন্দর করে কথা বলতে পারো না? কথার ধরন এমন তেতো কেন তোমার?"

"জন্মের পর কেউ মুখে মধু দেয়নি তো, তাই এমন তেতো রয়ে গেছে।"

ফারাজ ব্যঙ্গ করে বলল, "করলার রস দিয়েছিল বোধহয়!"

"আমারও তা-ই মনে হয়!"

ফারাজ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে ধমক দিলেন, "তুমি কান ছেড়েছ কেন? যাও, আবার কান ধরো!"

"না ধরলে?" রুশদীর চোখেমুখে এখন চ্যালেঞ্জের সুর।

"টিসি লাগবে তোমার?"

রুশদী এবার বেপরোয়া।রুশদীর ভিতর যেটুকু ডর ভয় ছিলো সব কেটে গেছে।সে আবার বেশিক্ষণ কাউকে ভয় পায় না।সে ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, "চাইলে দিতে পারেন স্যার, কোনো সমস্যা নেই!"

ফারাজের সুঠাম ভ্রু দুটো কুঁচকে গেল মেয়েটার স্পর্ধা দেখে।সে কিছুটা হেসেই বলল,

"তুমি তো দেখছি বেশ ত্যাড়া!"

"জন্মগত রোগ।"

ফারাজ একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,"আসলেই তুমি খাটো পটল, তাই মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি একটু কমই আছে।"

আবার হাইট নিয়ে বাজে কথা শুনে ছ্যাত করে উঠে রুশদী, "স্যার! আমার হাইট নিয়ে একটা কথাও বলবেন না।"

ফারাজ হঠাৎ ধমক দিয়ে উঠলেন, "এই পিচ্চি! তোমার বয়স কত শুনি? আমার সাথে গলা উঁচিয়ে কথা বলো? ভুলে গেছ আমি কে? কানের নিচে একটা দেব একদম! বেয়াদব মেয়ে, কানে ধরো বলছি!"

রুশদী স্বভাবগতই একটু বেয়াদব আছে। কথা হজম করতে পারে না।ফারাজের সাথেও নিজের বেয়াদবি দেখাতে চুল পরিমান ছাড় দিল সে, "আমি বেয়াদব তো আপনার কী? আপনাকে কে বলতে বলেছে? সাহস থাকলে মারেন দেখি আমার কানের নিচে একটা! আর পিচ্চি কাকে বলছেন? কোন দিক থেকে আমাকে পিচ্চি মনে হয় আপনার, হ্যাঁ?"

ফারাজ এবার টেবিল থেকে, চোখ ছোটো-ছোটো করে রুশদীকে মাথা থেকে পা অব্দি পরখ করে,আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে, "তোমাকে ওপর থেকে নিচ—সব দিক থেকেই পিচ্চি লাগে। বাড়িতে কি বাপ-মা খেতে দেয় না? এই যে বডি, হাড্ডি ছাড়া তো ভেতরে আর কিচ্ছু নেই। আস্ত একটা খাটো পটল!"

রুশদী সহ্য হচ্ছে না এসব।লোকটা যদি গতকালকের জন্য তাকে কোন শাস্তি দিতে ইচ্ছা করে,তবে দিক না।এসব কথা শোনাচ্ছে কেন?

"আপনি কিন্তু লিমিট ক্রস করছেন! কলেজের চেয়ারম্যান হয়েছেন বলে যা খুশি তাই বলতে পারেন না আমাকে।"

"করছি তো লিমিট ক্রস, কী করবে তুমি?বেশি চিৎকার করো না। শাস্তি তো মাফ করেছি, এখন যদি বেশি কথা বলো তবে স্টেজে নিয়ে গিয়ে সবার সামনে বাঁদরনাচ নাচাব। তিন ফুট দুই ইঞ্চির একটা মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচিয়ে কথা বলে!"

রুশদী এবার প্রায় গর্জে উঠল, "আমি তিন ফুট দুই না, আমি পাঁচ ফুট দুই! বুঝেছেন?"

"তফাৎ কী? দুটোই খাটো পটল।"

এই লোককে রুশদীর শিক কাব এর মতো পুড়িয়ে খেতে ইচ্ছা করছে।এই লোকের সমস্যা কি?উনি রুশদীর সঙ্গে এমন করছেন কেন?কালকের ঘটনার জন্য যদি শাস্তি দিতে ইচ্ছে হয়, দিয়ে দিক শাস্তি। মামলা চুকে যায়।এসব নাটক এর কি দরকার? রুশদী এবার তিতকুটে গলায় বলল, "স্যার, ছোটদের সাথে কথা বলার ন্যূনতম ম্যানার্সটুকুও আপনার নেই।"

ফারাজ এক মুহূর্ত চুপ থেকে একটা বাঁকা ও রহস্যময় হাসি দিল। তারপর নিচু স্বরে বললেন, "আমি তো ছোটদের কোলে নিয়ে চুমু খাই, তুমিও কি সেটাই চাও?"

কথাটা শুনেই রুশদীর বুকের ভেতর ঘৃণার এক তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। তার মনে হলো, সমাজের আর দশটা লম্পট পুরুষের মতো এই লোকটাও বোধহয় একই ধাতুতে গড়া।রাগ হলে রুশদী নিজেকে আর সামলাতে পারে না।সে কোনো ভয় না পেয়ে ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঘৃণাভরে বলল, "স্যার, আপনার বাসায় কি মা-বোন নেই? একটা মেয়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই শিক্ষাটা কি পাননি?"

ফারাজের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল। রুশদীর আক্রমণাত্মক প্রশ্নটা যেন সে উপভোগই করল। সে বেশ আয়েশ করে বলল, "মা-বোন তো আছে, তবে ঘরে কোনো বউ নেই। কেন, তুমি কি আমার বউ হওয়ার জন্য অ্যাপ্লিকেশন দিতে চাও নাকি?"

রুশদী রাগে স্তম্ভিত হয়ে গেল।কি নির্লজ্জ,লুচ্চা লোক রে বাবা।সে রুদ্ধশ্বাসে বলল, "স্যার, আপনার ভেতর যে বিন্দুমাত্র ম্যানার্স নেই, তা বোঝাই যাচ্ছে। একটা মেয়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেই নুন্যতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও আপনার নেই।"

ফারাজ হাসল,"ওহ! তার মানে এখন একটা খাটো পটলের কাছ থেকে আমাকে ভদ্রতা শিখতে হবে?"

রুশদী নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল, "একেবারে ম্যানারলেস!ক্যারেক্টারলেস!

ফারাজ টেবিল থেকে নেমে দাঁড়ালেন। তাঁর লম্বা ছিপছিপে শরীরের সামনে রুশদীকে আসলেই খুব ক্ষুদ্র দেখাচ্ছিল। ফারাজ গম্ভীর গলায় আদেশ দিলেন, "এই মেয়ে, আমার সাথে এসো!"

কথাটা বলেই ফারাজ বাইরের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। রুশদী তাঁর পেছন পেছন যেতে যেতে মুখঝামটা দিয়ে বিড়বিড় করে গালমন্দ করতে লাগল।এই ভদ্রলোকের সাজে থাকা অভদ্র লোকটা আসলে চাচ্ছে কি? করিডোরে পা রাখতেই যখন দেখল আশেপাশে লোকজন নেই, তখন রুশদীর দীর্ঘক্ষণ চেপে রাখা রাগটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।

সে মাঝপথে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, "আপনি একটা চরম বেয়াদব, একটা জঘন্য লুচ্চা লোক! আপনার ওপর ঠাডা পড়বে, মাঝরাস্তায় আপনার গাড়ির চাকা পাংচার হবে! নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবেন, তাই না? সাহস থাকলে টিসি দিয়ে দেখান, এই রুশদী আপনার মতো লোককেও ভয় পায় না আর আপনার ওই টিসিকেও তোয়াক্কা করে না!মারা খান আপনি!আজরাইল আপনার সঙ্গে দ্রুত সাক্ষাৎ করুক আমিন..সুম্মা আমিন!"

বলেই এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে রুশদী উল্টো দিকে দৌড় দিল। ফারাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে করিডোরের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ফারাজ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পেছনে ফিরে দেখলেন করিডোর এখন খাঁ খাঁ করছে, মেয়েটা উধাও। আচমকাই তাঁর গম্ভীর মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনে মনে ভাবলেন, "মেয়েটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং!"

--

কলেজের প্রোগ্রাম শেষ করে সরাসরি অফিসে চলে এসেছিল ফারাজ।অফিসের জরুরি কাজগুলো শেষ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন যে সন্ধ্যার ঘর ছুঁয়েছে, ফারাজ টেরই পায়নি। ইদানীং কাজের চাপটা একটু বেশি।ক্লান্তিতে ঘাড়ের রগগুলো ছিঁড়ে আসার উপক্রম, কিন্তু তাতে জিরিয়ে নেওয়ার কোনো জো নেই।

সন্ধ্যা পেরোতে অফিস থেকে বের হলো ফারাজ।গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেই ফোনটা বেজে উঠল,স্ক্রিনে ভেসে উঠল আহাদের নাম। আহাদ শুধু তার বন্ধুই নয়,বোনজামাইও বটে। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে আহাদের চটপটে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

"ফারাজ, জলদি ঢাকা বোট ক্লাবের রেস্টুরেন্টে চলে আয়। ক্যাপ্টেন সাখাওয়াত হোসেন রিটায়ার করছেন, আজ ওনারই ফেয়ারওয়েল পার্টি।"

ফোন রেখে ফারাজ গাড়ি ছোটাল উত্তরার দিকে।

উত্তরা হাইওয়ের ব্যস্ত জ্যামে গাড়িটা আটকে পড়ার মুখেই ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোনটা আবার সশব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে ফারাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির আলো ফুটে উঠল—'শের'। ছোট্ট শেরের একটা ট্যাব আছে, ওটা দিয়ে সে নিজেই পাপার নম্বরে কল দিতে পারে। ফারাজ ফোনটা রিসিভ করে সামনের মোবাইল স্ট্যান্ডে সেট করে দিল।স্কিনে ছোট্ট শেরের গোলগাল, নিষ্পাপ মুখটা ভেসে উঠতেই ওপাশ থেকে চিলতে রোদের মতো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

"হেই পাপা!"

"হ্যাঁ, পাপা বলো।"

শেরের কপালে সামান্য কুঞ্চন, ঠোঁট দুটো উল্টে একাকার। অভিমানী গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি কোথায় পাপা?"

"আমি তো মাত্র অফিস থেকে বের হলাম। এখন একটা বিশেষ দরকারে একটু বাইরের দিকে যাচ্ছি।"

"বাসায় আসবে কখন?"

"আফটার থ্রি আওয়ার্স!"

"নো পাপা!"—মুহূর্তেই শেরের মুখটায় যেন শ্রাবণের মেঘ জমে নামল। চোখের কোণটা কেমন আর্দ্র হয়ে উঠল তার। অনুনয় মাখানো গলায় বলল, "পাপা, তুমি এখনই বাসায় আসো, প্লিজ!"

ফারাজ ছেলের মন ভোলাতে চাইল, "ঠিক আছে বাবা, কাজটা শেষ করেই আমি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসার ট্রাই করব, কেমন?"

"নোওওওওওওওও!"—চিৎকার করে উঠল শের। তীব্র এক অভিমানে তার গলার স্বর কাঁপছে, "তুমি এখনই আসবে! শের তোমাকে খুব মিস করছে। তুমি এখন না আসলে শের অনেক কষ্ট পাবে। পাপা, তুমি কি চাও শের কষ্ট পাক?"

স্টিয়ারিংয়ের ওপর ফারাজের আঙুলগুলো শ্লথ হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল, তার রাজপুত্রও এখন তার পাপার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাটা চিনে গেছে। শের খুব ভালো করেই জানে—সে কষ্ট পাচ্ছে, এই একটা কথা শুনলে তার পাপার গোটা দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যায়।

ফারাজ ঠোঁটে হাসি চেপে বলল, "কিন্তু শের তো খুব বুঝদার ছেলে, তাই না? পাপার যে একটা খুব ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে, সেটা শের কেন বুঝছে না?"

শের এবার দুই গালে হাত দিয়ে মাথা নাড়ল। তার চোখ বেয়ে বুঝি এক ফোঁটা জল গড়াল। ওপাশ থেকে ভাঙা গলায় বলল, "শের কিচ্ছু বোঝে না! শের বোকা, শের স্টুপিড! শের শুধু পাপাকে চায়, পাপা..."

"আচ্ছা বাবা, এই তো পাপা চলে আসছি। আর কোথাও যাচ্ছি না।"

মুহূর্তেই শেরের মুখে হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল। স্ক্রিনের ওপাশ থেকে সে হাত নেড়ে বলল, "লাভ ইউ পাপা!"

"লাভ ইউ টু, মাই বয়!"

-

ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই ফারাজের চোখজোড়া শূন্যতা ছুঁয়ে গেল। চারিদিক কেমন নিঝুম।খান বাড়িতে লোক সংখ্যা কেবল ফারাজ, শের,ফারাজের মা রাইমা খান এবং বাবা শেহজাদ খান।এবং কাজের লোকেরা।এর মাঝে শেহজাদ খান ইদানীং রাজনৈতিক কাজের সূত্রে বাড়ির বাইরেই বেশি থাকে। ফারাজও ব্যবসার তাগিদে সকাল-সাজ ঘরের বাইরেই কাটিয়ে দেয়।

ফারাজ নিজের শোবার ঘরের দিকে এগোল। দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই ভেতরের নাতি আর দাদীর খুনসুটির মিষ্টি আওয়াজ কানে এলো। শের তার দাদুর সাথে কোনো একটা বিষয় নিয়ে দুষ্টুমিতে মেতেছে।

ফারাজ আলতো করে ভেজানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে শেরের উদ্দেশ্যে বেশ রসিকতার সুরে ডাকল,

"হেই মিস্টার শের!"

পাপার কণ্ঠস্বর কানে যাওয়া মাত্রই শেরের চোখের মণি দুটো চকচক করে উঠল। দাদুর কোল ছেড়ে সে এক ছুটে এসে আছড়ে পড়ল ফারাজের পায়ের কাছে। ফারাজ ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কোলে তুলে নিল। শের বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

"হেই মিস্টার পাপা!"

"পাপা তো চলে এসেছে। এখন মিস্টার শের খুশি তো?"—ফারাজ ছেলের নাকে নিজের নাক ঘষে জিজ্ঞেস করল।

শের বাবার বুকেই খুশিতে একটু লাফিয়ে উঠে বলল, "হুম, অনেক খুশি!"

ঠিক তখনই ফারাজ পকেট থেকে শেরের প্রিয় চকলেটটা বের করে তার সামনে ধরল। চকলেটটা দেখামাত্রই শেরের আনন্দের সীমা রইল না। সে গদগদ হয়ে ফারাজের গলাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর বাবার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বলল, "এ... থ্যাঙ্ক ইউ পাপা!"

রাইমা খান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য। ফারাজের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তোমার ছেলের নামে বিচার আছে, ফারাজ।"

ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে চোখের ইশারায় শেরের কাছে জানতে চাইল—কী কাণ্ড ঘটিয়েছে সে? শের দুই পাশে মাথা নেড়ে বোঝাল—সে কিচ্ছুটি করেনি, সে একদম ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না। ফারাজ হেসেই ফেলল। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

"আমার ছেলের জন্য সাত খুন মাফ, তোমার যা বিচার আছে, সব আজ মাটি চাপা দাও। আমার সিংহ কোনো অন্যায় করতেই পারে না।"

ফারাজের পুরো দুনিয়াটাই আসলে শেরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। শেরকে সে বড্ড একা হাতে, অনেক প্রতিকূলতার মাঝে বড় করেছে। নিষ্ঠুর ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে শের তার পাপার উজাড় করে দেওয়া সবটুকু ভালোবাসা পেলেও, নিজের জন্মদাত্রী মায়ের এক মাসের মমতাবাটুকুও তার কপালে জোটেনি। এক ফোঁটা দরদ বা মায়া জাগেনি বোধহয় সেই নারীর মনে এই ফুটফুটে নিষ্পাপ বাচ্চাটার জন্য! নিজের নারীত্ব আর কোলের ধনকে এভাবে একলা ফেলে সে কোন অজানায় পাড়ি জমিয়েছে, কেউ জানে না। হয়তো নিজের মতো করে খুব সুখে আছে সে।

কিন্তু ফারাজ সেই শূন্যতা শেরকে টের পেতে দেয়নি। সেই ছোট্টটি থেকে শেরকে নিজের বুকের ওপর শুইয়ে ঘুম পাড়ায় ফারাজ। শেরের ঘুম না আসলে মাঝরাত অব্দি তাকে কোলে নিয়ে পুরো ঘরে পায়চারি করে। কোনো আবদার যদি পূরণ না হয়, শেরের চোখে জল আসে। আর শেরের চোখের জল ফারাজের কলিজায় তিরের মতো বিঁধত। তাই তো নিজের সন্তানকে সে একদম মাথার মুকুট করে আগলে রেখেছে।

রাইমা বললেন, "শোনোই না আগে ও কী করেছে! শুনলে তুমি নিজেই রেগে ফায়ার হয়ে যাবে।"

ফারাজ ছেলের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, "কী করল আমার সিংহ?"

"সকালে তুমি ওকে যেটুকু খাইয়ে অফিসে গিয়েছিলে, তারপর থেকে ও পেটে একটা দানাও পুরেনি। দুপুরেও কিছু খায়নি।পাপা না আসলে সে কিচ্ছু খাবে না। টুনি আর আমি দুজনে মিলে কত চেষ্টা করলাম ওকে খাওয়ানোর জন্য।কিন্তু খাবে না। পাপা নিজের হাতে খাইয়ে না দিলে নাকি সে খাবে না। এবার বলো ফারাজ, এই ছেলের কী বিচার করবে তুমি?"

মায়ের কথায় ফারাজ শেরের দিকে তাকাল। শের তখন পাপার বুকে মুখ লুকিয়ে চকোলেটের খোসা ছাড়াচ্ছে। ফারাজের চোখের কোণটা এক অজানা আবেগে ভিজে উঠল। এই শিশুটি তাকে কতটা ভালোবাসে, কতটা নির্ভর করে তার ওপর!

শেরের এই স্বভাবটা অবশ্য আজ নতুন নয়, সেই ছোটবেলা থেকেই এমন। যখন সে একদম ছোট্ট একরত্তি শিশু, তখনও পাপার ছাড়া অন্য কারও হাতে ফিডার খেত না। পাপা ছাড়া অন্য কেউ কোলে নিলেই আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে কান্না জুড়ে দিত।ফারাজের চওড়া বুকে ওমে ভরা কোলটাই যেন ছিল তার পৃথিবীর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এলেও, মাঝেমধ্যেই তার এমন অদ্ভুত সব বায়না চাড়া দিয়ে ওঠে। পাপা বাসায় না থাকলে সে দানাপানি মুখে তুলবে না—ব্যস, এটাই তার শেষ কথা। পাপাকে ছাড়া যে তার পুরো দুনিয়াটাই ভীষণ পানসে লাগে!

ফারাজ ছেলেকে বিছানার ওপর বসাল, তারপর নিজে বসল শেরের ছোট্ট পা দুটোর মুখোমুখি। মায়ের দিকে তাকিয়ে ফারাজ ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটিয়ে বলল, "মিসেস শেহজাদ খান, আপনি দয়া করে একটু বাইরে যাবেন প্লিজ? আমার ছেলের সাথে একটা ভীষণ পার্সোনাল কথা আছে।"

রাইমা খান ঘর থেকে বের হতে হতে কৃত্রিম ধমকের সুরে বললেন, "বলো তোমরা! বাপ-বেটার যত পার্সোনাল কথা আছে, সব শেষ করো। কিন্তু আমি বলে রাখছি ফারাজ, শের যদি আর কোনোদিন এভাবে না খেয়ে থাকে, তবে তোমার ওই অফিস আর ট্রিপে যাওয়া আমি একবারে বন্ধ করে দেব। আমার নাতি না খেয়ে কষ্ট পাবে,তা হতে দেব না। এরপর এমন হলে তোমার খবর আছে বলে দিচ্ছি!"

কথাটা শেষ করেই রাইমা খান ধপ করে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে বাইরে চলে গেলেন। ফারাজ কপালে হাত দিয়ে মনে মনে হাসল—যাহ্ বাবা! এখানে তার দোষটা কোথায়? তবে এটাই হলো খান পরিবারের শেরের প্রতি ভালোবাসার ধরণ। এই বিশাল বাড়ির সবার চোখের মণি, সবার হৃদয়ের স্পন্দন যে এই একটা ছোট্ট মানুষ! তাই তাকে নিয়ে একটু উনিশ-বিশ হলেই বাড়ির সবাই কেমন যেন হাইপার হয়ে যায়।

ফারাজ এবার শেরের দিকে মনোযোগ দিল। সে আলতো করে ছেলের ছোট্ট, নরম হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল।

"না খেয়ে ছিলে কেন, পাপা?"

শের চট করে মাথা তুলল,

"শেরের পাপাকে ছাড়া খেতে একদম ভালো লাগে না, তাই শের খায়নি!"

"তা, শেরের পাপা ছাড়া আর কী কী ভালো লাগে না মিস্টারের?"

"কিচ্ছু ভালো লাগে না!"

"ওহ্! বিষয়টা তো ভারী চিন্তার দেখছি!"

পাপার গলার স্বরটা কেমন যেন অন্যরকম ঠেকল শেরের কাছে। তার মনে হলো, পাপা বোধহয় তাকে নিয়ে মজা করছে। শের তৎক্ষণাৎ তার পুঁচকে ভ্রু দুটো কুঁচকে ফারাজের দিকে তাকাল,

"তুমি কি আমার সাথে মজা করছ, পাপা?"

"হুমউহু, একদম না!"—ফারাজ দুই পাশে মাথা নেড়ে শেরের গাল দুটো আলতো করে টিপে দিল, "আমি বাসায় না থাকলেই তুমি যে এভাবে না খেয়ে থাকো, এটা কি ঠিক বলো? তুমি না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছ শুনলে পাপার নিজেরও তো ভেতরটা কেমন খারাপ লাগে, লাগে না?"

শের এবার অপরাধবোধ মাখানো চোখে বাবার মুখের দিকে তাকাল, "তোমার খারাপ লাগে?"

"হুম, ভীষণ খারাপ লাগে।"

শের কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যেন পাপার কষ্টটা সে নিজের ছোট্ট মন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করছে। তারপর লক্ষ্মী ছেলের মতো বলল, "ঠিক আছে পাপা, আর কখনো না খেয়ে থাকব না!"

ফারাজের ঠোঁটে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে শেরের কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল,

"দ্যাটস লাইক মাই গুড বয়!এবার নিচে চলো, খাবার খাবে!"

—

"আপা, ফারাজ কি আর বিয়ে-টিয়ে করবে না?"

সালমার আকস্মিক এই প্রশ্নের উত্তরে রাইমা খান মুহূর্তের জন্য বলার মতো কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।ছেলেকে তিনিও কতবার বুঝিয়েছেন, বিয়ের কথা বলেছেন। কিন্তু ছেলে নিজে থেকে যদি রাজি না হয়, মা হয়ে তিনি কীভাবে জোর করবেন? পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষকে কি আর জোর করে ছাদনাতলায় দাঁড় করানো যায়?

ভেতরের দীর্ঘশ্বাসটা চেপে রাইমা খান কিছুটা উদাসীন গলায় বললেন, "ওর ইচ্ছে! করলে করবে, না করলে নাই।"

"এটা কেমন কথা বললেন আপা—করলে করবে!ওর কি একটা ভবিষ্যৎ নেই? এত অল্প বয়সে ছেলেটার ডিভোর্স হয়ে গেল! এখনো তো ওর এমন কিছু বয়স হয়নি, চাইলে দেশে কি আর মেয়ের অভাব আছে? আপনারা মা-ই যদি ওর জন্য না ভাবেন, তবে কে ভাববে বলুন তো?"

রাইমা খান এবার একটু গম্ভীর হলেন। সোফার কুশনটা টেনে নিয়ে বললেন, "সালমা, ফারাজ কোনো বাচ্চা ছেলে না যে বুঝিয়ে রাজি করাব। আমি ওর সাথে এই নিয়ে কথা বলেছি। ও এখন কোনোভাবেই বিয়ে করতে রাজী নয়। ওর স্পষ্ট কথা—এখন বিয়ে করলে সেই নতুন বউ যদি শেরকে মন থেকে মেনে নিতে না পারে, তবে অশান্তি বাড়বে। শেরের কষ্টও ফারাজ সহ্য করতে পারবে না। তাই ও এই চ্যাপ্টারটাই বন্ধ রাখতে চাচ্ছে।"

সালমা আফসোসের ভঙ্গি করলেন। ঠোঁট উল্টে বললেন, "সেটাই তো ভাবি! ফারাজের মতো ছেলের জন্য কি আর মেয়ের অভাব হতো? রাজপুত্তুরের মতো চেহারা, অত বড় ব্যবসা আপনাদের—যেকোনো নামী-দামী ঘরের মেয়ে এক পায়ে খাড়া হয়ে যাবে ওকে বিয়ে করতে। ফারাজের তো সবই আছে আপা, শুধু খুঁত বলতে ওই একটাই!"

দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল ফারাজ। সালমার শেষ বাক্যটি তিরের মতো এসে তার কানে বিঁধল।সালমা 'খুঁত' বলতে ঠিক কাকে এবং কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা বুঝতে ফারাজের এক মুহূর্তও সময় লাগল না। পরক্ষণেই তার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এলো। চোখের মণি দুটো রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল।সোফায় বসে থাকা সালমা সম্পর্কে তার আপন মামি হন। এই মহিলাকে ফারাজ কোনোদিনই বিশেষ পছন্দ করে না। এর প্রধান কারণ ওনার এই কূটনামি স্বভাব আর কথায় কথায় বিষিয়ে দেওয়ার মানসিকতা।

মহিলা নেহাত তার মামি, তাই সম্পর্কের খাতিরে নিজের প্রচণ্ড রাগটাকে কোনোমতে চেপে, ভীষণ ঠাণ্ডা কিন্তু বরফশীতল স্বরে ফারাজ জিজ্ঞেস করল, "আপনি কাকে আমার খুঁত বলছেন, মামি?"

ফারাজের আকস্মিক কণ্ঠে সালমা বেগম বেশ ভালো রকমই ভড়কে গেলেন। সোফায় একটু গুটিয়ে গিয়ে, মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বললেন,

"না, মানে... আমি আসলে ওভাবে বলতে চাইনি..."

"আপনি শেরকে আমার খুঁত বলছেন!"

সালমার কথার মাঝখানেই বাঘের মতো গর্জে উঠল ফারাজ। আরও কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "আজ কান খুলে শুনে রাখুন, ও আমার কোনো খুঁত নয়। ও আমার ছেলে, আমার কলিজা, আমার পুরো পৃথিবী। আমার ছেলেকে নিয়ে কোনো রকমের বাজে কথা আমি এক সেকেন্ডের জন্যও সহ্য করব না। সে যেই হোক না কেন, আমার ছেলের দিকে আঙুল তুললে আমি তাকে এক চুলও ছেড়ে কথা বলব না, আম্মি!"

ছেলের এমন রেগে যেতে দেখে রাইমা খান বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি ফারাজকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,

"রাগছ কেন ফারাজ? শান্ত হও। তোমার মামি হয়তো ওভাবে বলতে চায়নি। ভুল করে মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে।"

সালমাও নিজের ভুল ঢাকতে বললেন,

"হ্যাঁ রে বাবা, আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম আজকালকার দিনে অমন একটা সন্তানসহ ছেলেকে কয়টা মেয়েই বা মেনে নেবে? সামনে তোর গোটা জীবনটা পড়ে আছে, একজন জীবনসঙ্গী কি সত্যিই দরকার নেই? আজকাল কি আর সেই যুগ আছে যে পরের ছেলেকে নিজের মনে করে সুন্দর করে গুছিয়ে সংসার করবে মেয়েরা?"

"না মানলে তাতে আমার কী বয়ে গেল?আমি কি একবারও ওনাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছি? আমি কি একবারও বলেছি যে আমি বিয়ে করতে চাই? আমি আমার পুরোটা জীবন একা, আমার এই ছেলেকে নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারব। আমার কোনো জীবনসঙ্গিনীর প্রয়োজন নেই। যে নারী আমার সন্তানকে নিজের করে মেনে নিতে পারবে না, তেমন জীবনসঙ্গীর আমার কোনো দরকারই নেই!"

"আহা ফারাজ, রাগের মাথায় এসব কথা বলে না! একা জীবন বড্ড কষ্টের,অভিশাপের। এখন তুমি জোয়ান আছ, শের ছোট আছে বলে বুঝতে পারছ না। একদিন তোমার মা-বাবা আমরা কেউই থাকব না। তোমার ছেলেও একদিন বড় হবে, নিজের বিয়ে-শাদি করে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তুমিও তো একদিন বুড়ো হবে, তখন তোমাকে দেখবে কে?"

ফারাজ নিজের ভেতরের বিরক্তিটুকু আর চেপে রাখতে পারল না। সে হাত তুলে সালমার কথা মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে বলল, "আমার বিয়ে কিংবা আমার বুড়ো বয়স নিয়ে আপনাকে এত না ভাবলেও চলবে, মামি। আমার জীবনটা কীভাবে চালাতে হবে, তা আমি খুব ভালো করেই বুঝি।"

"আরে পাগল ছেলে! শুধু শুধু রেগে যায়!শোন মামির কথা, মামি কখনো তোমার খারাপ চায় না। ভদ্র-সভ্য একটা মেয়ে দেখে এবার বিয়েটা করেই ফেলো। দুনিয়ায় এমনও অনেক ভালো মেয়ে আছে যারা তোর সন্তান থাকা সত্ত্বেও তোমাকে না করবে না। বিয়েটা করলে তুমিও একজন সঙ্গী পাবি, আর তোমার ছেলেও একজন মা পাবে।"

"শেরের পাপাই ওর জীবনের জন্য যথেষ্ট, মামি। ওর কোনো নতুন মায়ের দরকার নেই।"

কিন্তু সালমা তো তুমি যে ওর পাত্রী নন,

"আরে শোনোই না আমার কথা! আমার পরিচিতের মাঝে খুব ভালো একটা মেয়ে আ—"

"আম্মি!"—সালমাকে আর কথা শেষ করতে না দিয়ে ফারাজ নিজের মায়ের দিকে ঘুরল। তার কণ্ঠস্বরে এবার চরম অসন্তোষ এবং ক্ষোভ ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল, "তোমার ভাইয়ের বউকে পরিষ্কার করে বলে দাও—আমার হয়ে ওনাকে আর কোনো ঘটকালি করতে আসতে হবে না। ওনার এই বিয়ের প্যাঁচাল আমার একদম পছন্দ না!"

--

"তুমি কি সত্যি আর বিয়ে করবে না ফারাজ?"

ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে ফারাজ রাইমা খানের দিকে তাকাল। সে নিজের বিছানার হেডবোর্ডের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে আরাম করে বসল।

"তুমি হঠাৎ মাঝরাতে এসব পুরোনো কথা নিয়ে বসলে কেন, আম্মি?"

রাইমা খান ছেলের বিছানার এক কোণে বসলেন। ওনার চোখে-মুখে একরাশ মাতৃত্বের উদ্বেগ। বললেন, "বয়স তো আর এক জায়গায় থমকে নেই, দিন দিন গড়াচ্ছে। আর কবে করবে বিয়ে?"

"আমি তো নতুন করে বিয়ে করার কোনো প্রয়োজন দেখছি না!"—ফারাজ নির্বিকার গলায় জবাব দিল।

"ফালতু বোকো না তো ফারাজ!"—রাইমা খান এবার একটু বিরক্ত হলেন।

"আমার কোনো বউয়ের দরকার নেই।"

"তোর বউয়ের দরকার না থাকতে পারে, কিন্তু শেরের তো একজন মায়ের দরকার আছে!"

কথাটা শুনেই ফারাজের ভেতরের অহং বাঘের মতো জেগে উঠল। সে সোজা হয়ে বসে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কি পরোক্ষভাবে এটাই বলতে চাচ্ছ যে আমি শেরকে যথেষ্ট ভালোবাসি না? আমার ভালোবাসায় ঘাটতি আছে?"

"কথার ভেতরে এভাবে প্যাঁচ ধরবে না তো ফারাজ!শেরকে তোমার থেকে বেশি আর কে ভালোবাসে, তা কি আমি জানি না? কিন্তু ও এখন যে বয়সটা পার করছে, এই বয়সে ওর একজন মায়ের ভীষণ প্রয়োজন।"

"কেন, বাবা হিসেবে আমার দেওয়া ভালোবাসাই কি ওর জন্য যথেষ্ট নয়?"

"না, যথেষ্ট নয়!"—রাইমা খান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন।

"তবে আমি ওকে আরও বেশি ভালোবাসব! ওর জন্য আমি একাধারে বাবা হব, আবার মা-ও হব..."

"এই ত্যারামো দয়া করে কম করবে ফারাজ!এত শিক্ষিত হয়েও এমন অশিক্ষিতের মতো কথা বলবে না। বাবা আর মায়ের ভালোবাসা কখনো এক হয়? বাবা কখনো মায়ের জায়গা নিতে পারে না, আর মা-ও কখনো বাবার জায়গা পূরণ করতে পারে না। একজন মানুষ কখনো একা দুজনের ভূমিকা পালন করতে পারে না! গাধার কথা বলবে না ফারাজ। তুমি নিজেকে প্রশ্ন করো—নিজের ছেলেকে তুমি এত ভালোবাসো, অথচ ওর ভেতরের যে একটা বিশাল শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, সেটা কি তোমার চোখে পড়ে না? ও যে একটা মাতৃহীন শৈশব কাটাচ্ছে, সেটা কি তুমি দেখতে পাও না? কখনো কি ওকে একা ডেকে প্রশ্ন করেছিস—ওর মা নেই বলে ওর কি খারাপ লাগে? ও কি অন্য বাচ্চাদের মতো মায়ের ভালোবাসা পেতে চায় না? একবার জিজ্ঞেস করো ওকে! তারপর নিজের বিবেককে প্রশ্ন করো—তোমার কথার সাথে বাস্তবের কোনো মিল আছে কি না!"

—

পরদিন সকাল এগারোটা।

ফারাজ সকালে অফিসে এসেই হাতের জরুরি কাজগুলো মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছিল। ঘড়ির কাঁটা এগারোটা ছুঁতেই সে কোটটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল। আজ সে শেরকে স্কুল থেকে আনতে যাবে। প্রতিদিন এই দায়িত্বটা লুতু পালন করলেও, ফারাজ সময় পেলেই ছুটে যায়। পাপা নিজে তাকে স্কুল থেকে নিতে এসেছে দেখলে শেরের ভীষণ খুশি হয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল ফারাজ। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বেশ সাবধানে গাড়ি চালাতে লাগল।ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোনটা সশব্দে কেঁপে উঠল।স্ক্রিনে একটা আন্তর্জাতিক নম্বর জ্বলজ্বল করছে। ফারাজ কলটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে বাচ্চাদের মতো ভ্যা করে কেঁদে উঠল শান,

"ভাই-আ! ওহ্ ভাই-আ...!"

শান! ফারাজের আপন ছোট ভাই। বর্তমানে সুদূর আমেরিকায় নির্বাসিত। শানের এই কান্নায় ফারাজের মেজাজটা মুহূর্তেই খিটখিটে হয়ে গেল। সে কান থেকে ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে বিরক্ত গলায় বলল, "তোকে যদি হাতের নাগাল পেতাম শান, থাপ্পড় মেরে দুই গাল লাল করে দিতাম! এভাবে মরাকান্না জুড়েছিস কেন?"

ওপাশ থেকে শান নাক টানতে টানতে বলল, "থাপ্পড় দেওয়ার জন্য হলেও তুমি প্লিজ আমাকে দেশে নিয়ে যাও ভাইয়া! আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না। আমি মরে যাব, সত্যি মরে যাব!"

"যখন দেশে ছিলি, তখন তো এখানে থাকতে তোকে ভূতে কিলাচ্ছিল! এখন আবার কোন সাহসে দেশে আসতে চাচ্ছিস? ড্যাড যদি জানতে পারে তুই এসব পাগলামি করছিস, তোকে পিটিয়ে একদম দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবে।"

"আরে ভাইয়া, ড্যাডের কথা বাদ দাও! আমি এখানে থাকলে জাস্ট নষ্ট হয়ে যাব, খারাপ হয়ে যাব! প্লিজ, আমাকে আমার সোনার বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাও!আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি!"

শানের কণ্ঠে এবার খাঁটি দেশপ্রেমিকের আকুলতা।

ফারাজ কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,

"ওখানে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে কেন?"

"কী বলব ভাইয়া! এখানকার মেয়েরা বড্ড খারাপ! কেমন ছোট ছোট ড্রেস পরে ঘুরে বেড়ায়। আর আমাকে দেখলেই কেমন বাজে বাজে ইশারা করে! এরা এত দুষ্টু ভাইয়া, তুমি ভাবতেও পারবে না। ওরা যদি জোর করে আমাকে খারাপ বানিয়ে ফেলে? তুমি কি চাও তোমার এই অতি মাসুম, নিষ্পাপ ভাইটা নষ্ট হয়ে যাক? প্লিজ ভাইয়া, আমার দেশে আসার একটা ব্যবস্থা করে দাও না!"

শানের কথায় মন গলে না ফরাজের,

"তোর এত সমস্যা হলে তুই সরাসরি ড্যাডকে বল।"

"কী বলছ ভাইয়া!ড্যাডকে বললে উনি আমাকে সোজা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়নাঘরে রেখে আসবেন! ড্যাডের সাথে কথা বলার সাহস আমার নেই।"

"তাহলে আমারও কিছু করার নেই। ফোন রাখ!"

শান খুব ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে তার এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো তার বড় ভাই। ভাইয়াকে যদি কোনোমতে রাজি করানো যায়, তবেই দেশের মাটিতে পা রাখা সম্ভব। অন্যথায় এই পরবাসেই তাকে পচে-গলে মরতে হবে।

"ভাইয়া প্লিজ প্লিজ, ফোন কেটো না! ও ভাইয়া, তুমি অনেক ভালো, তুমি বেস্ট, ইউ আর দ্য গ্রেট ব্রাদার! এভাবে কঠোর কথা বোলো না, আমার বড্ড কষ্ট হয়। ফুলোঁ কা তারোঁ কা সাবকা

ক্যাহেনা হ্যায়, এক হাজারোঁ

মে মেরি বেহেনা... আই মিন,

মেরা ভাইয়া হ্যায়!"

"ফোন রাখ বেয়াদব!"

"ভাইয়া, প্লিজ রেখো না—"

শানের আকুতি শেষ হওয়ার আগেই ফারাজ কলটা কেটে দিল।দেখতে দেখতে প্রায় ছয়টা মাস কেটে গেল শান দেশের বাইরে। অবশ্য নিজের ইচ্ছেয় যায়নি সে, ড্যাড অর্থাৎ শেহজাদ খান জোর করে তাকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে আমেরিকায় নির্বাসন দিয়েছেন। কিন্তু শান তো শানই! সেখানকার চাকচিক্য আর আধুনিক জীবনও তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। দেশের মাটির টানে, আর ঘরের আড্ডার খোঁজে ছেলেটা এখন দেশে ফেরার জন্য পাগলামি জুড়ে বসেছে।

—

ফারাজের গাড়িটা দেখা মাত্রই স্কুলের দারোয়ান চট জলদি লোহার ভারী গেটটা খুলে দিল। ফারাজ গাড়িটা সোজা স্কুলের মাঠ প্রাঙ্গণে ঢুকিয়ে পার্ক করল। হাতঘড়ির ডায়ালে চোখ বুলিয়ে দেখল ১১টা ২৮ বাজে। আর ঠিক দুই মিনিট পরেই শেরের ছুটি। তাই ফারাজকে বেশি অপেক্ষা করতে হলো না।

ছুটির ঘণ্টা বাজতেই চারপাশটা বাচ্চাদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠল। ফারাজ এসি গাড়ি থেকে নেমে বাইরের কড়া রোদের মধ্যে এসে দাঁড়াল। দূরে লুতুর চওড়া কোলে চড়ে তার রাজপুত্র আসছে। ফারাজকে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই শের লুতুর কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করে উঠল। মাটিতে পা দেওয়া মাত্রই সে এক ছোট্ট হরিণ ছানার মতো দৌড়ে এসে আছড়ে পড়ল পাপার বুকের ভেতর, এক ঝটকায় চড়ে বসল তার চেনা কোলে।

শের দুই হাতে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরে কচি গলায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "পাপা, তুমি এসেছ?"

"হ্যাঁ সোনা, তোমাকে একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ দিতে আসলাম! খুশি হয়েছ মিস্টার?"

শেরের চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল, "হুম, অনেক খুশি!"

ঠিক তখনই লুৎফর(লুতু)ধীরপায়ে তাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।লুতুর আসল নাম লুৎফর হলেও, শেরের মুখে সেটা হয়ে গেছে 'লুতু'। ছোটবেলায় এই কঠিন নামটা উচ্চারণ করতে পারত না বলে সে ডাকত লুতু বলে, সেই থেকে বাড়ির সবার কাছেই লুৎফর এখন লুতু।ফারাজের দাদার আমলে লুতুর বাবা ছিলেন খান বাড়ির বিশ্বস্ত দারোয়ান। লুতুর জন্ম, বেড়ে ওঠা—সবই খান বাড়ির আঙিনায়। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরও সে এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায়নি। তার এই সততা আর বিশ্বস্ততার কারণেই শেরকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়ার দায়িত্বটা ফারাজ চোখ বন্ধ করে ওর ওপর সঁপে দিয়েছে।

৪২ বছর বয়সী লুতুর ব্যক্তিত্বটা বড় অদ্ভুত। শেরের সামনে সে এমন এক বোকা সেজে থাকে যেন দুনিয়ার কিচ্ছুটি বোঝে না। কিন্তু শেরের আড়াল হলেই সে গম্ভীর পুরুষ। বড্ড কম কথা বলে সে। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে মুখ থেকে 'হু' বা 'হা' ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শব্দ বের করা দায়।

শের কোলে বসেই হঠাৎ লুতুর দিকে একটা ছোট আঙুল তাক করে নালিশের সুরে বলল, "পাপা! তুমি লুতুকে একটু বকো তো!"

ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন বাবা? লুতু আবার কী করল?"

"লুতু অনেক পচা, আমার কোনো কথাই শোনে না।আমি যা-ই করতে চাই না কেন, ও বলবে—এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। আমি ওকে বললাম আমি স্কুলের ক্যান্টিন থেকে চিকেন সমুচা খাব, আর ও চোখ বড় বড় করে বলল—খাওয়া যাবে না, ওটা নাকি পচা, ভালো না!"

ফারাজ ছেলের চুলে বিলি কেটে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "লুতু তো ঠিকই বলেছে, ওসব বাইরের ভাজাভুজি আসলেই ভালো না।"

"কিন্তু আমি খাব পাপা!"

"নাহ্, একদম না!"

শের ফারাজের গাল দুটো নিজের দুই কচি হাত দিয়ে চেপে ধরে অনুনয় করল, "প্লিজ পাপা, শুধু একটা!"

"ঠিক আছে, সমুচা তো পাবেই না। তবে তার বদলে যদি মিস্টার শের চকোলেট মিল্কশেক খেতে চায়, তবে ১০ মিনিট টাইম দেওয়া হলো। লুতুর সাথে গিয়ে চট করে খেয়ে এসো। রাজি...?"

পাপার মন ঘোরার আগেই শের কোল থেকে ঝটপট নেমে লুতুর শক্ত হাতটা টেনে ধরল। তারপর নাচতে নাচতে, লুতুকে টেনে ক্যান্টিনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

ফারাজ গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। তার এই ছোট্ট রাজপুত্রটার মন জয় করা কত সহজ! নিজের মনমতো একটুখানি কিছু করতে দিলেই তার পুরো পৃথিবীটা কেমন খুশিতে ঝলমল করে ওঠে।

ফারাজ ভাবল, যেহেতু কলেজ প্রাঙ্গণে পা রেখেই ফেলেছে, তখন পুরো ক্যাম্পাসটা একবার ঘুরে দেখাই যাক। আগে থেকে খবর দিয়ে পরিদর্শনে আসলে তো সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ধুয়েমুছে একদম ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে অতর্কিত হাজির হলে আসল কন্ডিশনটা ঠিক কী, তা খুব সহজেই হাতেনাতে ধরে ফেলা যাবে।

এখানে পাশাপাশি দুটো সুউচ্চ ভবন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে—একটানা স্কুল সেকশন, অন্যটি কলেজ সেকশন। ফারাজ ধীরপায়ে কলেজ ভবনের দিকে পা বাড়াল।

কলেজ সেকশনের করিডোর একদম খাঁ খাঁ করছে।ক্লাস চলছে এখন।ফারাজ তৃতীয় ফ্লোরে এসে পৌঁছাল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় সে দুপাশের ক্লাসরুমগুলোর বন্ধ জানালার কাচ দিয়ে ভেতরের পরিবেশের ওপর তীক্ষ্ণ চোখ বুলাতে বুলাতে এগোতে লাগল।

ফারাজ এবার পাশের একটা ক্লাসরুমের খোলা দরজার সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল। ভেতরে তখন একজন মধ্যবয়সী শিক্ষক অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ক্লাস নিচ্ছিলেন। ফারাজ শান্ত চোখে ভেতরের শৃঙ্খলা আর পরিবেশটা পরখ করছিল। দরজায় ফারাজকে দেখে সামনের বেঞ্চের একটা ছাত্র আচমকা দাঁড়িয়ে বিনম্র সুরে সালাম দিয়ে বসল। ব্যস, তাকে দেখাদেখি মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসের শখানেক ছাত্র-ছাত্রী একযোগে বেঞ্চ ছেড়ে দাঁড়িয়ে সমস্বরে সালাম ঠুকল। ফারাজ ধীরপায়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।

ফারাজকে ক্লাসে ঢুকতে দেখেই একদম পেছনের লাস্ট বেঞ্চে বসা মেয়েটা যেন রীতিমতো বিষম খেল। চড়কগাছ হয়ে গেল তার চোখের মণি। সেই ঘটনার পর রুশদী টানা তিন দিন কলেজে আসেনি।নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল, কলেজের চেয়ারম্যানের সাথে ওভাবে মুখের ওপর তর্ক করার পর এতক্ষণে নিশ্চয়ই তার নামে টিসি ইস্যু হয়ে গেছে। কিন্তু কলেজ না যাওয়ার ঠিক তৃতীয় দিনের মাথায় বান্ধবী তিথি যখন তাকে ফোন করল, তখন রুশদী অবাক না হয়ে পারল না। তিথি ফোনে জিজ্ঞেস করেছিল, "কীরে রুশদী, তুই তিন দিন ধরে কলেজে আসছিস না কেন?"

রুশদী তখন উত্তর দিয়েছিল, "অলরেডি টিসি খেয়ে বসে আছি, এখন কোন মুখে কলেজে যাব বল?"

তিথি ফোনের ওপাশ থেকে আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গি করে বলেছিল, "তুই টিসি খাবি কেন? মাথা খারাপ হয়েছে তোর? তুই যদি টিসি-ই খেয়ে থাকিস, তবে আজ লতিফ স্যার কেন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করছেন যে রুশদী কেন কলেজে আসছে না!"

টিসি তাহলে সে এখনো খায়নি। চেয়ারম্যান স্যার বোধহয় ওসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে নিজের মাথা ঘামাননি বা ওটাকে পাত্তাই দেননি। যাক বাবা, বড় ফাঁড়া কেটে বেঁচে যাওয়া গেল! কিন্তু তিন দিন পর আজ যেই না সে কলেজে পা রাখল, অমনি লোকটারই মুখোমুখি হতে হতো তাকে? রুশদী আর তিথি একদম ঘরের শেষ প্রান্তের লাস্ট বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছিল। ফারাজকে ভেতরের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই রুশদী চট করে নিজের মাথাটা একবারে নিচু করে ডেস্কের সাথে ঠেকিয়ে রাখল।তাকে যেন দেখতে না পায়।

কিন্তু শত শত উৎসুক চোখের ভিড় পেরিয়ে ফারাজের তীক্ষ্ণ নজরটা ঠিক গিয়ে আটকে গেল একদম শেষ বেঞ্চে, যেখানে মাথায় হিজাব জড়িয়ে নুইয়ে রেখেছিল। ফারাজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা আর রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বেশ চড়া গলায় ডাকল, "এই তিন ফুট দুই ইঞ্চির খাটো পটল!"

মুহূর্তের মধ্যে রুশদীর পুরো শরীরটা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল।রুশদী জানে তাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলেছে ফারাজ।তবুও সে দাড়াল না৷

এদিকে পুরো ক্লাসের শত শত উৎসুক চোখ তখন চাতক পাখির মতো ডানে-বামে ঘুরে খুঁজতে ব্যস্ত—চেয়ারম্যান স্যার কাকে কথাটি বললেন? পুরো ক্লাসরুমের পরিবেশটা রুশদীর জন্য অস্বস্তিদায়ক হয়ে উঠলো। তার কেবলই মনে পড়ছিল সেই অভিশপ্ত দিনের কথা—কী ভয়ঙ্কর সব কড়া কথা সে এই ক্ষমতাধর লোকটার মুখের ওপর বলে এসেছিল! স্যার যদি আজ সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে পুরো ক্লাসের সামনে তাকে একচোট অপমান করে বসেন, তবে তার মান-সম্মানের আর কিছুই বাকি থাকবে না।

"রুশদী!"

নিজের নামটা ফারাজের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হতেই রুশদী বেঞ্চের ওপর হাত ভর দিয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল।নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত মৃদু স্বরে বলল, "জি, স্যার!"

"ভালো আছো?"

রুশদী ভড়কে গেল। এমন প্রশ্ন সে আশা করেনি।

"জ্বি...!"

ফারাজ দূর থেকেই রুশদীকে আপাদমস্তক একবার তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে নিল।মাথায় হিজাব পরিহিত মেয়েটিকে দেখতে একদম শান্ত, স্নিগ্ধ এক লতার মতো লাগছে। কী নরম আর মিষ্টি সুরে সে প্রতিটি কথার উত্তর দিচ্ছে! কিন্তু এই মেয়ের ভেতরের আসল রূপটা যে কতটা ধারালো তা তো ফারাজ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই খুব ভালো করে জানে।

ফারাজ আর কথা না বাড়িয়ে ক্লাসের ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকের দিকে ফিরল। অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে বলল, "স্যার, আপনি আপনার ক্লাস চালিয়ে যান। আপনাদের ক্লাসের এই মূল্যবান সময়টুকু ডিস্টার্ব করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।"

কথাটা শেষ করেই ফারাজ ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল।

—

কলেজ ছুটি হওয়ার পর রুশদী আর তিথি রোজকার মতোই একসাথে গেট দিয়ে বের হলো। বাড়ি ফেরার পথের একটা বড় অংশ তারা গল্প করতে করতে একসাথে পাড়ি দেয়, তারপর একটা মোড়ে এসে দুজন দুদিকে চলে যায়। তিথির এক হাতে কাগজের ঠোঙা, সেখান থেকপ ঝালমুড়ি মুখে পুরে চিবুচ্ছে সেরুশদীকে খাওয়ার জন্য সাধলেও সে মানা করে দিয়েছে।

ঠোঙা থেকে একমুঠো মুড়ি মুখে ফেলে তিথি কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ওই স্যার কি তোর আগে থেকেই পরিচিত রে?"

রুশদী মুখটা একটু কুঁচকে বলল, "কোন স্যার?"

"আরে, আমাদের কলেজের ওই হ্যান্ডসাম চেয়ারম্যান স্যার!"

"নাহ্! ওনার সাথে আমার আবার পরিচয় হতে যাবে কোন দুঃখে?"

"নাহ্, মানে... ক্লাসে ঢুকে তোকে যেভাবে জিজ্ঞেস করলেন যে 'ভালো আছো?', তা-ই ভাবলাম তোর হয়তো পূর্ব-পরিচিত কেউ হবেন।"

রুশদী একটু ইতস্তত করে বলল, "পরিচিত ঠিক না, তবে... এমনি চেনে আর কী!"

"এমনি চেনে মানে? খুলে বল তো!"

"আরে, রাস্তায় ওনার সাথে আমার একটা ঝামেলা হয়েছিল। রাগের মাথায় আমি ওনার মাথায় ক্যান ছুড়ে মেরে পালিয়ে এসেছিলাম। ব্যস! নবীন বরণের দিন ওনার সাথে কলেজে আমার দেখা হয়ে গেল। দেখামাত্রই উনি আমাকে চিনে ফেললেন আর শাস্তি হিসেবে তিরিশ মিনিট কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। এত বড় অপমান করায় আমারও মেজাজটা একবারে চটে গেল। আমিও ওনাকে মুখের ওপর আচ্ছা করে উল্টাপাল্টা কথা শুনিয়ে দিয়ে ওখান থেকে এক দৌড়ে পালালাম। ওই ভয়েই তো টানা তিন দিন কলেজে আসিনি।"

"আসলেই? তুই ওনার মতো মানুষের সাথে এমন কাণ্ড করেছিস!"—তিথি বিস্ময়ে হাঁ করে রইল, তার মুখের মুড়ি চিবানো বন্ধ হয়ে গেল।

"তোকে মিথ্যা বলতে যাব আমি কী খেয়ে? যা ঘটেছে তা-ই বলল!"

তিথি অভিমানের সুরে ঠোঁট উল্টে বলল, "কই, তুই তো এর আগে আমাকে এই নিয়ে কিচ্ছুটি বলিসনি! জানু, তুই আসলেই বড্ড বদলে গেছিস!"

'জানু' শব্দটা শোনা মাত্রই রুশদীর কপালে তিনটে ভাঁজ পড়ল। সে তিথির দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল, "খবরদার! আর একবার যদি আমাকে 'জানু' বলে ডেকেছিস, তবে সোজা লাথি দিয়ে রাস্তার পাশের ড্রেনে ফেলে দেব বলে দিচ্ছি!"

তিথি গাল হাসল, "আচ্ছা বাবা, থাক, রাগিস না! কিন্তু ভেবে দেখ, তোর আর চেয়ারম্যান স্যারের বিষয়টা কেমন সিনেমাটিক না? প্রথম দেখায় নায়ক-নায়িকার তুমুল ঝগড়া, এর পরে কলেজে এসে পরিচয় জানা গেল যে একজন স্টুডেন্ট আর অন্যজন খোদ চেয়ারপারসন! ওয়াও, হেব্বি তো স্টোরিটা! একদম ভালোবাসার গ্র্যান্ড বিগিনিং! আমি ড্যাম শিওর, ইন ফিউচার তোদের মধ্যে কিছু একটা হবেই হবে।"

রুশদী চোখ বড় বড় করে তাকাতেই তিথি কনুই দিয়ে ওকে একটা আলতো খোঁচা মারল, "তুই স্যারের সাথে লাইন মারা শুরু করে দে না! লোকটা কিন্তু মারাত্মক হ্যান্ডসাম আছে। একবার ভেবে দেখতে পারিস। প্রেমটা যদি করেই ফেলিস, তবে পরীক্ষার আগের দিন রাতেই সব প্রশ্নপত্র পেয়ে যাবি। তখন আমাকেও কয়েকটা দিয়ে দিস, কেমন?"

রুশদী এবার চরম কড়া চোখে কটমট করে তাকাল তিথির দিকে, "তিথি!"

"আরে, রাগছিস কেন তুই?"

"রাগব নাকি তোর এসব ফালতু কথা শুনে হাসব? এগুলো কী ধরনের কথাবার্তা, হ্যাঁ? এসব আজগুবি কথা আমার সামনে আর কখনো বলবি না, আমার বিরক্ত লাগে!"

তিথির উপর রেগে রুশদী পা চালিয়ে একটু জোরে হাঁটতে লাগল।তিথি পেছন থেকে প্রায় দৌড়ে এসে ওর সমানে এলো,

"তুই অল্পতেই এত রেগে যাস কেন বল তো? যাহ্, তোর ওই খ্যাপা স্যারের সাথে প্রেম করতে হবে না। এবার কুল ডাউন, কুল!"

রুশদী আর কোনো উত্তর না দিয়ে গটগট করে হাঁটতে থাকল। আসলে তিথির সাথে রুশদী নিজের রাগটা একটু বেশি উগরে দেয়। দুনিয়ার সবার সাথে তো আর রাগ দেখানো যায় না; নিজের ভেতরের আসল রূপ আর অভিমানটা কেবল খুব কাছের মানুষদের সামনেই মেলে ধরা যায়।তিথি ছাড়া রুশদীর আর রাগ দেখানোর মানুষ নেই।তিথিও রুশদীকে খুব ভালো করে চেনে। সে জানে রুশদী একটু রাগী স্বভাবের, অল্পতেই চটে যায়। তাই রুশদী রেগেমেগে কথা বললেও তিথি কখনো মন খারাপ করে না, বরং বান্ধবীকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।

তিথি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার নাটক করে বলল, "তোর ফিউচার হাজবেন্ডের কথা ভাবলে আমার বড্ড কষ্ট হয় রে দোস্ত! তোর মতো এই বোম্বাই মরিচকে সে কীভাবে এফোর্ড করবে, আল্লাহ-ই জানে! আমার সাথেই তুই এত রাগ দেখাস, না জানি জামাইকে কত নাচ নাচাবি! আমার বেচারা দুলাভাইটা তোর এই ত্যাড়ামি কীভাবে সহ্য করবে? লোকটার জীবন তো এক্কেবারে কয়লা হয়ে যাবে!"

রুশদী না চাইতেও ফিক করে হেসে দিল।

বান্ধবীর মুখে হাসির রেখা দেখামাত্রই তিথি এক লাফে এসে রুশদীর ঘাড় জড়িয়ে ধরল। তারপর দুই বান্ধবী চেনা পথ ধরে আবার খুনসুটি করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

—

প্রিমা ফারাজের ফুফাতো বোন।প্রিমার হাজব্যান্ড আহাদ ও ফারাজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়াশপ্রায়ই খান বাড়িতে ওদের যাতায়াত হয়।প্রিমা ফুপি এই বাড়িতে আসলে শের সাধারণত ওনাদের ধারেকাছেও ঘেষতে চায় না। এর আসল কারণ ওনাদের সাথে আসা ওনাদের আড়াই বছরের ছোট্ট কন্যাসন্তান প্রিমরোজ। প্রিমরোজকে শেরের মোটেও পছন্দ নয়, ওর চোখে পুচকুটা বড্ড পচা! প্রিমরোজ আসা মানেই তো তার পাপার সমস্ত আদরে ভাগ বসা। পাপার ভালোবাসায় অন্য কেউ অংশীদার হবে—তা এই ছোট্ট রাজপুত্র কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। তাই সারাদিন ঘরের ভেতর নিজেকে বন্দি করে রাখার পর, যখন সে ভাবল প্রীমারা বোধহয় এতক্ষণে চলে গিয়েছে, ঠিক তখনই সে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বের হলো।

শের হেলেদুলে দোতলার করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল।প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে একেবারে হিরো স্টাইলে এগোচ্ছিল সে। আচমকা তার চোখে পড়ল আড়াই বছরের ছোট্ট প্রিমরোজকে।গোলাপী রঙের ফ্রক পরা পিচ্চিটা টই টই করে হেঁটে এদিকেই আসছে। এই মেয়েটাকে দেখলে কেন জানি শেরের পিত্তি জ্বলে যায়; অসহ্য লাগে তার উপস্থিতি।

শের মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রিমরোজ আধো-আধো পায়ে এগিয়ে এসে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, "হেলু বায়া!"

শের তাকে পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আড়াই বছরের প্রিমরোজ কি আর অবহেলা বোঝে? সে উল্টো ছোট ছোট কদমে শেরের পিছু নিল। এক সময় কাছে এসে জামা টেনে ধরে আবদার করল, "বায়া, চলকেট দাও।"

শের ঝটকা মেরে তার হাত সরিয়ে দিয়ে ধমকে উঠল, "এই পিচ্চি! চকলেট বলতে পারিস না? চলকেট আবার কী? আমি কি চকলেটের দোকান খুলে বসেছি যে তোকে কিনে দেব? যা তোর আম্মুর কাছে যা। আমার পিছু পিছু আসবি না একদম, আসলে কিন্তু মারব!"

শের গটগট করে আবার হাঁটতে শুরু করল। এতগুলো কড়া কথা বললেও বাচ্চা মেয়েটা তার বিন্দুবিসর্গ বুঝল না। সে আবার শেরের পেছনে ছুটল চকলেটের জন্য।বিরক্ত হয়ে শের কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

"উফ, যা না এখান থেকে! আমার পিছু নিচ্ছিস কেন? তোকে কিন্তু ট্যাটোর কামড় খাওয়াবে।"

প্রিমরোজ এবার দুই হাত বাড়িয়ে বলল, "বায়া, কোলে নাও!"

সে যখন শেরের কোলে উঠতে চাইল, শের তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বসল। টাল সামলাতে না পেরে পিচ্চিটা মেঝেতে পড়ে গিয়েই তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল। বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনেই শেরের কলিজা শুকিয়ে গেল; ধরা পড়ার ভয়ে সে এক দৌড়ে সেখান থেকে চম্পট দিল। মেয়ের কান্নার আওয়াজ পেয়ে প্রিমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে প্রিমরোজকে কোলে তুলে নিজের বুকের ভেতর জাপটে ধরল।

প্রিমা মেয়ের সারা গায়ে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় জানতে চাইছেন, "কী হয়েছে আমার মায়ের? রোজ কেন কান্না করছে? কীভাবে পড়ে গেল সোনা আমার?"

রোজ তখন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর আদুরে গলায় 'মা... মা...' বলে ডাকছে।

দূরে আড়ালে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি দেখা মাত্রই শেরের ছোট্ট বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অজানা ব্যথায় মুচড় দিয়ে উঠল। তার মনে হলো—সে নিজে যখন কখনো এভাবে খেলতে খেলতে পড়ে যায়, তখন তো কখনো কোনো মা এভাবে পাগল হয়ে ছুটে এসে তাকে বুকে টেনে নেয় না! কখনো তো কেউ এমন ব্যাকুল হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুমু খায় না। এই তো আজ দুপুরে খাবার টেবিলে প্রিমরোজকে ওর মা কত রকম গল্প শুনিয়ে, কত বাহানা করে নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছিল;শেরের তো এমন মা নেই যে তাকে এভাবে ভালোবেসে খাইয়ে দেবে!

শের আজ পর্যন্ত তার নিজের মুখে কাউকে কোনোদিন 'মা' বলে ডাকেনি। অবাস্তব হলেও সত্যি, শের তো তার মাকে কখনো চোখেই দেখেনি! মায়ের কোনো স্মৃতি বা অবয়ব তার ছোট্ট মগজে কোথাও জমা নেই।

হঠাৎ করেই শেরের মনে পড়ে গেল পুরোনো একটা দিনের কথা। একবার পাপার সাথে একটা বড় পার্টিতে গিয়েছিল সে। সেখানে এক অচেনা আন্টি শেরের ফুটফুটে চেহারা দেখে আদর করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার বাবার নাম কী, বাবা?"

শের খুব গর্ব করে বুক ফুলিয়ে উত্তর দিয়েছিল, "শারফারাজ খান!"

আন্টি হেসে আবার জিজ্ঞেস করলেন, "আর তোমার মায়ের নাম কী?"

মুহূর্তের মধ্যে শেরের নিষ্পাপ চোখে-মুখে এক সংশয় আর অন্ধকার নেমে এসেছিল। তার মায়ের নাম কী, তা তো সে নিজেও জানে না! পাপা তো কখনো তাকে ওসব কথা বলেনি। শেরকে অমন নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেই আন্টি আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার মা নেই বুঝি? তোমার মা কি মারা গিয়েছেন?"

শের সেদিন আর কোনো কথা বলতে পারেনি। শুধু অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তো সত্যিই জানে না—তার মা কেন নেই, তার মা কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন! সত্যি সত্যিই তিনি মারা গিয়েছেন নাকি তাদের ছেড়ে দূরে কোথাও চলে গিয়েছেন, শেরের সেই অবুঝ মনে তার কোনো উত্তর জানা নেই। মা জিনিসটা আসলে কী, মায়ের গায়ের সুবাস কেমন হয়, তাও সে জানে না। সন্তানের জীবনে মায়ের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সে ধারণাও তার নেই।

তবুও আজ প্রিমরোজ আর তার মায়ের এই দৃশ্যটি দেখে শেরের অবুঝ মনের ভেতর কেমন যেন একটা খটকা আর তীব্র হাহাকার জেগে উঠল। তার মন বারবার প্রশ্ন করতে লাগল—রোজের মতো তার কেন মা নেই? তার নিজের মায়ের নামটাই বা কী? তার মায়ের আসলে কী হয়েছিল? দুনিয়ার সব মা-ই তো তাদের সন্তানদের এতটা ভালোবাসে, তবে তার মা কেন তাকে ভালোবাসে না?

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন