ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

৫ম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

৫

রাত বাড়ার সাথে সাথে রুশদীর ব্যস্ততাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। নাহিদার ফরমায়েশের অত্যাচারটা ইদানীং সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রুশদী একটু পড়ার বই নিয়ে বসলেই ওনার হাজারটা নাটক শুরু হয়।কখনও মাথা ব্যথা, কখনও পা ব্যথা। পা টিপে দেওয়া থেকে শুরু করে অবেলায় রান্না বসানো, সবটা যেন রুশদীকে কাজে রাখার জন্য। রুশদীর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ওই মহিলার গলাটাই টিপে দিতে।

রুশদী মুরগির মাংস রান্না করে রেখেছে, এখন ঘাম ঝরিয়ে রুটিগুলো সেঁকছে।

সবাই যখন ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার নিয়ে খোশগল্পে মত্ত, রুশদী তখন একা হাতে রান্নাঘরের হাড়ি-পাতিল মাজছে। খিদের জ্বালায় পেটটা কামড়াচ্ছে ওর, শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ও একবার ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। সবাই খুব আয়েশ করে গরম গরম রুটি আর মাংস দিয়ে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে।

বাবার দিকে তাকিয়ে রুশদীর বুকটা হু হু করে উঠল। বাবাও সবার সাথে দিব্যি গল্প করতে করতে খাচ্ছেন। অথচ একবারও কি মনে পড়ল না তার মেয়েটার কথা? বাড়ির কাজের মেয়ের মতো যে মেয়েটা সারাদিন খাটল, সে কিছু মুখে দিয়েছে কি না, এই সামান্য প্রশ্নটাও কি বাবার মস্তিষ্কে একবারের জন্য খেলল না? নিজের শৎ ছেলে,স্ত্রী আর শাশুড়িকে নিয়ে বাবা আজ বড় সুখী, অথচ সেই সুখের ভিড়ে রুশদী যেন এক অবহেলিত অস্তিত্ব। অবহেলার বিষে ওর মনটা তেতো হয়ে গেল। তবে খারাপ লাগতে লাগতে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, খারাপ লাগাটাও আজকাল বেশি খারাপ লাগে না।

কাজ শেষ করে রুশদী ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। ততক্ষণে সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে। নাহিদা, আনাস আর ওনার মা মিলে ড্রয়িংরুমে বসে আয়েশ করে টিভি দেখছেন। রুশদী খাবারের পাত্রের ঢাকনা তুলে দেখল একদম শূন্য! অবশিষ্ট কিছুই নেই, কেবল তলায় সামান্য ঝোল আর কিছু এঁটো থালাবাসন পড়ে আছে। ওর হাত-পা রাগে কাঁপতে শুরু করল।

ও বুঝতে পারল, নাহিদা বেগম ইচ্ছে করেই রুশদীকে অভুক্ত রাখার পরিকল্পনা করেছেন। বাবার চোখের সামনে এমন অন্যায় অত্যাচার সহ্য করাটা অসহ্য হয়ে উঠছে ওর কাছে। শুধু বাবার কথা ভেবে ও চুপ করে আছে, কিন্তু আজ যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে রুশদী নিজের খিদের চেয়েও বেশি অনুভব করল এক গভীর একাকিত্ব। এই বাড়িতে সে যেন থেকেও নেই।

রুশদী শূন্য পাতিলটার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেটের ক্ষুধাটা তখন যেন হৃদয়ের হাহাকারের কাছে হার মেনেছে। ঝাপসা চোখে সে একবার ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল, যেখানে হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অথচ এই হাসির রাজ্যে সে যেন এক পরিত্যক্তা। রুশদীর খুব ইচ্ছে করল চিৎকার করে বাবাকে বলতে,'বাবা, আমি কি এই বাড়ির কেউ না? কাজ শেষে আমার জন্য কি এক টুকরো রুটিও জুটবে না?' কিন্তু কথাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। চোখের কোণে এক ফোঁটা লোনা জল জমা হলো, যা গড়িয়ে পড়ার আগেই সে মুছে ফেলল।

ক্ষুধার চেয়েও রুশদীর ভেতরে এখন রাগটা তীব্র হল। সে অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমিয়ে রাখল।পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং টেবিলে পানি খেতে এলেন নাহিদা। রুশদী শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, "আমার খাবার কোথায়?"

নাহিদা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে নির্লিপ্ত মুখে বললেন, "খাবার কোথায় মানে? শেষ হয়ে গেছে।"

"মানে কী? আমি কী খাব তবে?"

রুশদীর কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভ ফুটে উঠল।

নাহিদা এক চুমুক পানি খেয়ে অবহেলার স্বরে বললেন,

"সবাই খেয়ে ফেলেছে, তুই এখন মুড়ি-টুরি কিছু একটা খেয়ে নে। না হলে নতুন করে ভাত রাঁধ।"

এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না রুশদী। সে চিৎকার করে উঠল, "মজা করছেন আমার সাথে? রাত একটা বাজে এখন, আমার কি ক্ষুধা লাগে না? আমার কি পেট নেই? সারাদিন খাটুনি খেটে যখন খেতে বসলাম, তখন বলছেন খাবার নেই! আমার ভাগের খাবারটা কি আলাদা করে রাখা যেত না? আমি কি এখন এই মাঝরাতে মুড়ি খেয়ে থাকব?"

রুশদীর চিৎকারে নাহিদা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, "তুই আমার ওপর চড়া গলায় কথা বলিস! তোর সাহস তো কম না। খাইতে মন চাইলে নিজে রেঁধে খা, না হলে পানি খেয়ে ঘুমিয়ে যা। আমাকে রাগাবি না।"

রুশদী এবার করুণ চোখে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। বাবা সেখানে আয়েশ করে বসে টিভি দেখছেন। রুশদীর কানফাঁটা চিৎকার নিশ্চয়ই তার কানে পৌঁছেছে, অথচ তিনি পাথরের মতো নির্বিকার। রুশদী চিৎকার করে বলল, "আব্বু! তুমি কি কিচ্ছু বলবে না?"

আানাস হক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। কোনো মমতার ছিটেফোঁটাও নেই সেই দৃষ্টিতে। তিনি রুক্ষ গলায় বললেন, "তোর মা তো বললই ভাত নেই। ক্ষুধা লাগলে রান্না করে খা, চিল্লাচিল্লি করছিস কেন?"

"আব্বু!"

নাহিদা এবার রাগে ফুসে উঠলেন,

"তোর আব্বু আমাকে কী বলবে শুনি? তুই দিন দিন অনেক বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস। তোর একটা উচিত শিক্ষা হওয়া দরকার!"

বলেই তিনি আশেপাশে রুশদীকে মারার জন্য কিছু খুঁজতে লাগলেন। শেষমেশ রান্নাঘর থেকে রুটি বেলার বেলুনটা হাতে নিয়ে রুশদীকে আঘাত করতে শুরু করলেন।

রুশদী প্রথমে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল বাবার দিকে। আানাস হক নির্বিকারভাবে টিভির পর্দায় তাকিয়ে আছেন। নিজের মেয়েকে চোখের সামনে সৎ মা এভাবে মারছে, অথচ তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রুশদী হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।সে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল। নাহিদার প্রতিটি আঘাত তার পিঠে নয়, যেন তার বাবার প্রতি জমে থাকা শেষ মায়াটার ওপর পড়ছে।

নাহিদ এসে অবশেষে মাকে থামাল, কিন্তু আানাস হক তখনও শান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে বাবার প্রতি রুশদীর হৃদয়ে এক চরম ঘৃণার জন্ম নিল। এই লোকটার মায়ার জন্য সে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিতে চেয়েছিল? ছিঃ! নিজের ওপর ধিক্কার জন্মালো ওর। রুশদী বুঝতে পারল, সে এক ভুল মানুষের পেছনে আবেগের অপচয় করছিল। যে বাবা তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারে না, সেই বাবার প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকার মানে হয় না।

রুশদী সিদ্ধান্ত নিল সে ফারাজকে বিয়ে করবে। এই বন্দিশালা থেকে সে মুক্তি চায়। তারও তো একটা জীবন আছে, তারও তো একটু হাসিখুশি থাকার অধিকার আছে।রুশদী স্থির চোখে বাবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল এই দৃষ্টিতে আর মায়া নেই, আছে কেবল এক বিদঘুটে ঘৃণা। সে এবার নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজিয়ে নেবেই।

--

খান বাড়ির লনজুড়ে এখন সাজসাজ রব। আলোকসজ্জা আর ফুলের সুবাসে চারপাশটা এক অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে।এনগেজমেন্টের আয়োজন চলছে।

এদিকে এনগেজমেন্টের শপিং সারতে ফারাজ ও শান এসেছে বসুন্ধরা সিটি মলে। সাথে আছে ছোট্ট শের আর রুশদী।রাইমা খান নিজে গাড়ি পাঠিয়ে রুশদীকে আনিয়েছেন, যাতে শপিংয়ের এই পর্বে সেও সঙ্গী হতে পারে।

বসুন্ধরা মলের তৃতীয় তলার প্রতিটি ঘুরে দেখছে তারা। শের বেশ উৎফুল্ল, রুশদীর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। তারা অনেকটা আগে আগে হাঁটছে। তাদের ঠিক পেছনেই ধীরলয়ে হাঁটছে ফারাজ আর শান। শপিং পর্ব সাঙ্গ করে তারা মলের ভেতরেই একটি রেস্টুরেন্টে হালকা খাবার খেয়ে নিল।

শান অবিরাম বকবক করে গেলেও রুশদী শুধু হ্যাঁ বা হুঁ বলে সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছে। অকারণে একটি কথাও খরচ করছে না সে।

কাজ শেষ করে মল থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। শহরজুড়ে নিয়ন আলোর ঝলকানি। শান আর শের একসাথে পার্কিং এরিয়া থেকে গাড়ি আনতে গেল। মলের প্রবেশপথের সামনে তাদের অপেক্ষা করছে ফারাজ আর রুশদী।

ফারাজ প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণ চিরে বেরিয়ে আসছে মৃদু শিসের শব্দ,

একটা প্রেমের গান লিখেছি

আর তাতে তোর নাম লিখেছি

মাঝরাতে বদনাম হয়েছে মন

যেই না চোখের ইচ্ছে হলো

তোর পাড়াতে থাকতে গেল

ডাক নামে তোর ডাকতে গেল মন!

কি করি এমন অসুখে?

জমেছে মরন এ বুকে!

পাশে রুশদী হাত বগলদাবা করে উদাসীন চোখে আশেপাশের ব্যস্ততা দেখছে। ফারাজের শিসের শব্দটাা তার কানেও পৌঁছাচ্ছে। সে একবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকালো।

উনত্রিশ বছরের এই পুরুষের অবয়বে এক ধরণের আভিজাত্য মিশে আছে। গায়ে একটা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। গায়ের রংটা ঠিক শ্যামলা নয়, আবার একদম টকটকে ফর্সাও বলা যায় না।দুটোর মাঝামাঝি। মাথার ঘন চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে। রুশদীর চোখ গিয়ে আটকাল ফারাজের গালে। একদম ক্লিন শেভ করা মুখ।এটা রুশদীর পছন্দ হলো না, তার মতে ছেলেদের দাড়িতে বেশী সুন্দর লাগে।ফের রুশদী দৃষ্টি আটকে গেল ফরজের চোখে।চোখের পাপড়ি গুলো ঘন সাথে বড় বড়।চোখের মনিটা হালকা স্কাই ব্লু এর মত, যেন শান্ত এক সমুদ্র। ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা ফারাজও তার দিকে তাকালো।দুই জোড়া চোখ এক হলো। মুহূর্তের জন্য সময়টা যেন থমকে গেল। ফারাজ শিস বাজানো থামিয়ে দিল। রুশদী কিছুটা চমকে উঠলেও তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল না। বরং নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিক রেখে, অতি ধীরস্থির ভঙ্গিতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সামনের জনসমুদ্রের দিকে।

"কংগ্রেচুলেশন মিস রুমাইসা হক রুশদী।"

ফারাজের শীতল কণ্ঠস্বরটা আচমকা রুশদীর কানে এসে পৌঁছালো। রুশদী তার চোখের কোণে একরাশ অনাগ্রহ নিয়ে ফারাজের দিকে তাকাল। নিস্পৃহ কণ্ঠে শুধাল, "কেন?"

ফারাজ সরাসরি রুশদীর চোখের দিকে তাকাল। একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে আপাদমস্তক পরখ করে নিল সে। রুশদীর পরনে আজ আকাশী রঙের একটি থ্রি পিস, ওড়নাটা একপাশ থেকে অবহেলায় কাঁধে ফেলা। মুখে মেকাপের লেশমাত্র নেই।রুশদীর অব্দিপিঠ চুলগুলো খুলে রেখেছে। দেখতে রুশদীকে খুব শান্ত আর কোমল মনে হলেও তার চাহনিতে এক অদ্ভুত দাপট আর একরোখা জেদ মিশে আছে। মেয়েটা রূপসী,সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথম দেখায় হয়তো কারো মনে না ধরলেও, কারো চোখে ধরা পড়তে সে বাধ্য। ফারাজও প্রথম দেখায় হয়ত এক মুহূর্তে তার এই রূপেই থমকে হয়তো গিয়েছিল।

ফারাজ কয়েক পা এগিয়ে এল রুশদীর দিকে। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন এক হাত। রুশদীর উচ্চতা ফারাজের বুক সমান। সে মাথা উঁচু করে ফারাজের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ফারাজ কিঞ্চিৎ ঝুঁকে নিজের মুখটা রুশদীর কানের কাছে নিয়ে গেল। অতি মৃদু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল,

"কারণ, তুমি শারফারাজ খানকে পাচ্ছ। তুমি কিন্তু জিতে গেছ!"

ফারাজের এত কাছে আসাটা রুশদীর জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর ছিল, কিন্তু সে তা প্রকাশ করল না। নিজেকে সামলে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল সে। শান্ত স্বরে উত্তর দিল,

"আমার কাছে কিন্তু ঠিক তেমনটা মনে হচ্ছে না।"

"কেন?"

রুশদী ফারাজ এর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে,উল্টা প্রশ্ন করল,

"আচ্ছা দুনিয়ায় এত মেয়ে থাকতে আমার মত একটা সাধারণ মেয়েকে কেন বিয়ে করছেন আপনি? "

"তুমি নিজেই যদি নিজেকে তুচ্ছ মনে করো, দুনিয়ায় আর কি কদর করবে তোমার?"

"আমি মোটেই নিজেকে তুচ্ছ মনে করছি না,আমি শুধুই জানতে চাচ্ছি আমার মধ্যে কি এমন বিশেষত্ব আছে?যার জন্য একজন মন্ত্রীর ছেলে হয়েও সে আমাকে বিয়ে করছে!"

তার কথায় ফারাজ মৃদু হাসল,তাৎক্ষণিক উত্তর দিল না।রুশদী উত্তরের অপেক্ষায় তার দিকে তাকিয়ে।কিঞ্চিত হাসি ঠোঁটের কোনে রেখে ফারাজ বলল,

"বিশেষত্ব তো আছেই।কোথাও বিশেষত্ব না পেলে মানুষ ওপথে আগায় না।সেখানে কোন বিশেষত্ব না পেলে কি আমি এমনি তোমাকে শারফারাজ খান এর জীবনসঙ্গিনী করছি?"

--

আজকের দিনটি রুশদীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়। আজ শারফরাজ খানের সাথে তার বাগদান। এই দিনটি আসার আগে কত ঝড়ই না বয়ে গিয়েছে তার মনের ওপর দিয়ে। কত নাটক, কত অজুহাত আর কত শত কৌশলী চাল সে চেলেছিল এই বিয়েটা ভাঙার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্যকেই সে মেনে নিয়েছে,নিজের সুখ কে বেছে নিয়েছে।

রুশদী বুঝেছে, অন্যকে ভালো রাখার মিথ্যে মরীচিকার পিছে ছুটে নিজেকে মানসিক যন্ত্রণার নীল বিষে নীল করার চেয়ে, নিজের সুখটুকু আঁকড়ে ধরে বাঁচা হাজার গুণ শ্রেয়। যে ত্যাগের কোনো কদর নেই, যে বিসর্জনের কোনো মূল্য নেই,সেই ত্যাগ করা কেবল বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। জীবনের এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রুশদী আজ নিজের সুখটাকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, আর এই অবাধ্য মন আজ শান্ত।

খান বাড়ির সুবিশাল লন আজ অসংখ্য ফেরি লাইটের মৃদু আলোয় সাজানো হয়েছে।লনের সব কিছু ডেকোরেট করা হয়েছে হোয়াইট থিমের উপর।আমন্ত্রিত সকল অথিতিদের পরনেও সাদা পোশাক দেখা যাচ্ছে। দেশের নামী-দামী রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী শিল্পপতি আর মিডিয়া লোক জলে ভরে উঠেছে খান বাড়ির লন।

মন্ত্রী শেহজাদ খান স্মিত হাসিতে অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছেন। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ফারাজ। বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেও সবার সাথে কথা বলছে। শেহজাদ খান নিজের বড় ছেলেকে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।অন্যদিকে রাইমা খান ব্যস্ত অতিথিদের আপ্যায়নে।সবকিছুই তদারকি করছেন তিনি।

এই জাঁকজমকপূর্ণ ভিড়ের এক কোণে একটি টেবিলে বসে আছেন আনাস হক ও নাহিদা বেগম। চারপাশের এই আড়ম্বর দেখে তারা যেন কিছুটা বিমূঢ়। পরিচিত সব বড় বড় রাজনীতিবিদ আর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের চোখের সামনে ঘুরতে দেখে বারবার অবাক হচ্ছেন তারা।

আনাস হক ও নাহিদা এক কোণে বসে থাকলেও যেন তারা সেখানে অদৃশ্য। রাইমা খান কিংবা শেহজাদ খান কারও যেন তাদের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হচ্ছে না। শেহজাদ খান, সাধারণ জনগণের সাথে মন্ত্রীর যে ব্যবধান, তা আজ তিনি নিজের হবু আত্মীয়দের সাথে বজায় রেখেছেন। তাদের অবহেলার আচরণে একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না যে, তারা হবু আত্মীয়।

এমনকি ফারাজও, যার সাথে রুশদীর জীবনের বন্ধন হতে যাচ্ছে, সেও একবারের জন্য প্রয়োজন বোধ করেনি হবু শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে গিয়ে দুটো সৌজন্যমূলক কথা বলার। এই অপমান আনাস হক ও নাহিদাকে ভেতরে ভেতরে অপমানের বিষে নীল করছিল।তবে এতে তাদের কিছু যায় আসছিল না, সম্মান দিয়ে তারা কি করবে তাদের যা দরকার সেটা দিলেই হবে।তাদের দরকার টাকা।

--

শহরের নামকরা এক বিউটি পার্লারের এসির বাতাসে বসে আছে রুশদী। দেশের সেরা মেকআপ আর্টিস্টের হাতের ছোঁয়ায় তার রূপ আজ এক অন্য মাত্রা পেয়েছে।

সাজ শেষ করে রুশদী যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই হয়তো মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পরনে নিরেট কালো রঙের একটি সিল্কের গাউন। গলার কাছে চিকচিক করছে হিরের একটি নেকলেস, কানে পরেছে ছোট্ট হিরের টপ,সবচেয়ে সুন্দর লাগছে তার কেশসজ্জা। পিঠ অব্দি ছড়ানো ঘন কালো চুলগুলোকে নিখুঁতভাবে ফেয়ারি স্টাইল বিনুনি করা হয়েছে। সেই বিনুনির খাঁজে খাঁজে গুঁজে দেওয়া হয়েছে তাজা কিছু সাদা ফুল।

মেকআপের প্রলেপটা অত্যন্ত নিখুঁত, সৌন্দর্যের হাতছানি।

পার্লারের ওয়েটিং রুমে তখন অধীর অপেক্ষায় বসে ছিল শান আর ছোট্ট শের। মেকআপ রুমের ভারী দরজাটা যখন ধীরে ধীরে খুলে গেল, ভেতর থেকে বেরিয়ে এল রুশদী। তার পরনের গাউনটি সামলাতে একজন পাশ থেকে সাহায্য করছিল। গাউনটি বেশ ভারী হওয়ায় রুশদী নিজেও দুই হাতে সেটা কিছুটা উঁচিয়ে ধরে ধীরলয়ে এগিয়ে আসছিল।

রুশদীকে দেখামাত্র সোফা ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল শান আর শের। শের আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রেখেছিল। সে একছুটে এসে রুশদীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, ঠিক যেভাবে রূপকথার রাজপুত্ররা রাজকুমারীদের প্রস্তাব দেয়। শেরের পরনেও আজ কালো রঙের ছোট্ট একটা স্যুট-কোট, যা তাকে এক খুদে জেন্টলম্যানের রূপ দিয়েছে। তার ছোট্ট হাতে ধরা ছিল একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ। ফুলের তোড়াটা রুশদীর দিকে উঁচিয়ে ধরে আদুরে গলায় সে বলে উঠল,

"হেহ মম, তুমি কি আমার পাপার বউ হবে?"

শেরের এই অভাবনীয় আর মিষ্টি প্রপজালে রুশদী নিজেকে সামলাতে পারল না। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মুক্তোঝরা এক চিলতে হাসি। সেই হাসির স্নিগ্ধতা দেখে ছোট্ট শেরের মুখেও জয়ের হাসি ফুটে উঠল। রুশদী আলতো করে শেরের হাত থেকে গোলাপের তোড়াটি নিল এবং স্নিগ্ধ ঘ্রাণ নিয়ে একটি মৃদু চুমু খেল ফুলে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে থাকা সেই খুদে রাজপুত্রের চোখের দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, "শিওর!"

সম্মতি পাওয়ামাত্রই শের আনন্দে আত্মহারা হয়ে রুশদীকে জড়িয়ে ধরল। ভারী গাউনের কারণে রুশদী পুরোপুরি নিচু হতে পারল না ঠিকই, তবে সে তার হাঁটু অবধি শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। রুশদীর আগে থেকেই বাচ্চা বেশ পছন্দ, বিশেষ করে যারা একটু চঞ্চল আর বয়স অনুযায়ী যে বাচ্চা গুলো একটু বুদ্ধিমান হয়।

শের ঠিক তেমনই এক বাচ্চা। বয়সের তুলনায় তার এই পরিপক্বতা আর প্রখর আই-কিউ লেভেল তাকে বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই রুশদীর হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে এই খুদে জাদুকর।

শান্ত মেজাজের শান এতক্ষণ একদৃষ্টে রুশদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখেমুখে বিস্ময় আর মুগ্ধতা এমনভাবে খেলা করছিল যে, সে যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে। শানের এই দৃষ্টি দেখে রুশদী কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সে কিছুটা দ্বিধা মেশান গলায় বলল,"আমাকে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?"

রুশদীর কথায় শানের ঘোর কাটল। সে একগাল হেসে বলে উঠল, "খারাপ লাগছে মানে? কী যে বলছ ভাবি! তোমাকে দেখি যদি ভাইয়া যদি ফিট না খেয়েছে, তাহলে আমাকে বলো।তোমাকে অমায়িক সুন্দর লাগছে।অনুষ্ঠানে কেউ আজকে তোমার দিকে চোখ ফেরাতে পারবেনা।ভাই কিন্তু জিতছে ভাবি!"

শানের কথা বলার ভঙ্গি আর, ভাইয়া ফিট খাবে এমন রসিকতায় রুশদী আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে সশব্দে হেসে উঠল।শান ফারাজের ৭-৮ বছরের ছোট, রুশদী থেকে বড়। তবুও সে রুশদীকে ভাবি বলে ডাকে।রুশদী যদিও বলেছে, চাইলে তার নাম ধরে ডাকতে পারে।তাও শান ভাবি বলেহ ডাকে।শান ভিষণ চঞ্চল ও মিশুক,তাই খুত তাড়াতাড়িই তার ভাবির সঙ্গে তার জোস বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।

শান এর গাড়িটা যখন খান বাড়ির বিশাল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, রুশদীর বুকের ভেতরটা অজানা এক শঙ্কায় দুরুদুরু করছিল। এই প্রথম সে খান বাড়িতে পা রাখল। চারপাশের সবকিছুই তার কাছে একদম অচেনা, অজানা। শান গাড়িটা প্রধান ফটক দিয়ে না নিয়ে পেছনের গেট দিয়ে প্রবেশ করাল, যাতে আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিড় এড়িয়ে সরাসরি ভেতরে যাওয়া যায়। সেখানে নির্জনে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন রাইমা খান।

গাড়িটা থামতেই রাইমা খান ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে এসে নিজেই গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। রুশদী গাড়ি থেকে নামার সময় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে সালাম দিল। রাইমা খান সস্নেহে রুশদীর হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করলেন। রুশদী পা মাটিতে রাখা মাত্রই রাইমা খান যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তিনি পলকহীন চোখে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সেই নিবিড় দৃষ্টি রুশদীকে কিছুটা সংকুচিত করে তুলল। অস্বস্তি কাটাতে রুশদী যখন কিছু একটা বলতে চাইল, ঠিক তখনই রাইমা খান মুগ্ধ গলায় বলে উঠলেন,

"মাশাআল্লাহ! আমি জানতাম আমার পুত্রবধূ সুন্দরী, কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি সাত আসমানের হুর মা! মাশাআল্লাহ, কারো নজর যেন না লাগে।এর জন্য আমারা ছেলের মাথাটা নষ্ট হয়েছে।"

রাইমা খানের কথায় রুশদী লজ্জা পেল। রাইমা খান তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "চলো, ভেতরে চলো।"

ভারী গাউন আর লম্বা ট্রেইল হওয়ার কারণে রুশদীর হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। রাইমা খান সেটা বুঝতে পেরে আগলে ধরে।রুশদী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। লোকমুখে সে শুনেছিল, মন্ত্রী শেহজাদ খানের স্ত্রী নাকি ভীষণ অহংকারী মানুষ। অথচ সেই মানুষটিই একজন সাধারণ মেয়ের ড্রেস টেনে ধরে পথ চলতে সাহায্য করছেন! এমন কাজ করতে গিয়ে অনেক উচ্চবিত্তেরই আত্মসম্মানে বাঁধবে,কিন্তু রাইমা খানের মাঝে সেই লেশমাত্র নেই। প্রথম সাক্ষাতেই রুশদীর মনে রাইমা খানের জন্য একটি সফট কর্নার তৈরি হয়েছিল, আর আজকের এই অতি সাধারণ একটি আচরণ সেই জায়গাটুকুকে আরও গভীর করল। আসলে যারা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার হয়, তারা সামান্য একটু ভালোবাসা বা গুরুত্ব পেলেই তা আগলে রাখতে চায়।

এখন রুশদী রাইমা খানের বিশাল রাজকীয় বেডের ওপর বসে আছে। ঘরটা সব বিলাসবহুল আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। রাইমা খান জরুরি কোনো কাজে একটু বাইরে গিয়েছেন।

এমন সময় কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলেন শেহজাদ খান। তাকে দেখামাত্রই রুশদী দাঁড়িয়ে পড়ল। এর আগে কখনো সরাসরি দেখা না হলেও, পাঞ্জাবি পরিহিত এই গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ববান মানুষটিকে চিনতে রুশদীর এক মুহূর্ত দেরি হলো না,তিনিই মন্ত্রী শেহজাদ খান। রুশদী মাথা নিচু করে তাকে বিনয়ের সাথে সালাম দিল।

শেহজাদ খান স্মিত হেসে সালামের উত্তর নিলেন বললেন, "আমাদের তো এই প্রথম দেখা হলো মা। তুমি সালাম দিলে, এখন তো তোমাকে সালামি দিতে হয়।"

এই বলেই তিনি রাইমা খানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "রাইমা, তোমার কাছে ক্যাশ আছে না?"

রাইমা খান মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, "জি আছে।" তিনি আলমারির লকার খোলার জন্য পা বাড়ালেন।

রুশদী বুঝে ফেলল এর কারন। সে কিছুটা সংকুচিত হয়ে শেহজাদ খানকে উদ্দেশ্য করে বলল, "সালামি কেন দিচ্ছেন আঙ্কেল? আপনি আমাকে মা বলে ডেকে আপন করে নিয়েছেন, এটাই আমার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সালামি।"

"আঙ্কেল? আঙ্কেল বলে তো আমাকে পর করে দিচ্ছ মা!"

শেহজাদ খান খানিকটা রসিকতার সুরে বললেন।

রুশদী তাৎক্ষণিক নিজের ভুল বুঝতে পারল। লজ্জা আর কুণ্ঠায় সে জিভ কেটে বলে উঠল, "ছি ছি! আপনাকে পর করে রাখব কেন? ভুল করে আঙ্কেল বলে ফেলেছি।"

শেহজাদ খান এবার বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন, "ঠিক আছে, এবারের মতো মাফ করলাম। কিন্তু নেক্সট টাইম এই ভুল করলে আমি কিন্তু খুব মাইন্ড করব, বুঝতে পেরেছ?"

রুশদী মাথা নিচু করে বলল, "জি, বুঝতে পেরেছি।"

---

রাইমা খান রুশদীকে আগলে ধরে বাড়ির লনে সাজানো সেই ঝকঝকে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে এলেন। উপস্থিত শত শত মানুষের গুঞ্জন ছাপিয়ে তখন মাইক্রোফোনে তাদের বাগদানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। রাইমা খান তাকে নিয়ে সোজা চলে আসলেন স্টেজে।

সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শেহজাদ খান এবং তার পাশেই দাঁড়িয়ে ফারাজ। ফারাজের পরনে একটি কালো স্যুট-কোট।পাপার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে শের।রুশদী একবার আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই এক অজানা সংকোচে চোখ সরিয়ে নিল। তার বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক স্পন্দনে কাঁপছে।

তারা এখন একদম মুখোমুখি। দুজনের হাতেই দুটি আংটি, যা তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রস্তুত। রুশদী স্থির চোখে অপলক তাকিয়ে রইল ফারাজের মুখের দিকে। সে হয়ত কিছু খুচ্ছে তা কি কোনো লুকানো ভালোবাসা? নাকি আগামী দিনের কোনো নিশ্চিন্ত ভরসা?এক অদ্ভুত আশায় রুশদীর মন তখন তোলপাড়।সে কি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে?সে ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছে, এই ভয় কি তার মনে কাজ করছে?

রুশদীর মৌনতা আর দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা দেখে ফারাজ নিচু গলায় বলে উঠল, "আংটি পরানোর ইচ্ছা আছে নাকি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে?"

ফারাজের আকস্মিক কথায় রুশদীর ধ্যান ভাঙল। সে চমকে উঠে ফারাজের প্রসারিত হাতের দিকে তাকাল। আর কোনো দ্বিধা নয়, আর কোনো পিছুটান নয়—রুশদী ফারাজের রিং ফিঙ্গারে আংটিটি পরিয়ে দিল। এবার ফারাজের পালা। ফারাজ যখন রুশদীর হাতটি নিজের হাতের ওপর রাখল, সেই স্পর্শে রুশদীর সারা শরীরে এক স্রোত বয়ে গেল। ফারাজ রুশদীর আঙুলে আংটিটি পরাতে পরাতে,

"নাও, তোমাকে দলিল করে নিলাম, এবার সময় করে বিয়েটা সেরে ফেলব।"

--

এনগেজমেন্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুশদীরা যখন নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা পার হয়ে গেছে। উৎসবের কোলাহল স্তিমিত হতেই ফারাজ তার কালো রঙের বাইকটি নিয়ে বের হলো, সামনে বসিয়ে নিল ছোট্ট শেরকে। নিঝুম রাতের ফাঁকা ঢাকা শহর চষে বেড়ানো বাবা-ছেলের এক পুরনো অভ্যেস। শের বাইকে চড়তে বড্ড ভালোবাসে; দুচোখ বুজে খোলা হাওয়া গায়ে মাখার আনন্দই আলাদা।নিস্তব্ধ নগরীর বুক চিরে ফারাজের বাইকটি আপন গতিতে ছুটে চলেছে। শের বসেছে সামনে, ফুয়েল ট্যাংকের ওপর। মাথায় তার ছোট্ট একটা হেলমেট। দুই হাত ডানার মতো দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে সে রাতের চঞ্চল বাতাসকে ছুঁতে চাইছে।হঠাৎ বাতাসের শোঁশোঁ শব্দকে ছাপিয়ে চিৎকার করে উঠল শের,

"পাপ-পা, ইউ আর দ্য বেস্ট পা ইভার! লাভ ইউ পাপা!"

ছেলের উচ্ছ্বাস দেখে ফারাজের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে বাইক চালানোয় মনোযোগ ধরে রাখল। শের আবার বলল,

"থ্যাংক ইউ পাপা!"

ফারাজ এবার হেলমেটের কাচ ভেদ করে একটু নিচু গলায় শুধাল, "ওয়েলকাম! বাট থ্যাংকস ফর হোয়াট?"

"তুমি আমাকে একটা মম এনে দিলে! ইটস আ ভেরি বিগ সারপ্রাইজ ফর মি!"

শেরের গলায় তখন উপচে পড়া আনন্দ।একটা মা পাচ্ছে, কতখানি খুশি হওয়ার কথা তার?ফারাজ বাইকের গতি অপরিবর্তিত রেখেই জিজ্ঞেস করল, "খুশি তুমি?"

শের দুই হাত আরো উঁচিয়ে বলল,

"হুম, অন্নেক অন্নেক খুশি আমি!"

ফারাজ আর কিছু বলল না।তার বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি, আর চোখের সামনে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন।হঠাৎ গলা ছাড়ল,

"যদি কেড়ে নিতে বলে কবিতা

ঠাসা খাতা, যেন কেড়ে

নিতে দিব না।যদি ছেড়ে যেতে

বলে শহুরে কথকতা,যেন আমি

ছাড়তে দেব না!

আর আমি আমি জানি জানি

চোরাবালি কতখানি "

ফারাজ এর সঙ্গে শেরও চিৎকার করে গানটা গাইতে লাগলো।বাপ ছেলের পছন্দের গানগুলোর তালিকার মধ্যে এটি একটি।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন