#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মদীদ
১২..
(যেকোনো ভুল পেলে আমাকে জানাবেন)
—০—
রুশদী সকাল সকাল উঠে পড়েছে কলেজ যাওয়ার জন্য।ভোরের মিঠে রোদ জানলার পর্দা ভেদ করে ঘরে এসে পড়েছে। রুশদী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরিপাটি হয়ে তৈরি হচ্ছে কলেজের জন্য। বিছানায় শের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আজ ওর কোনো ক্লাস নেই। ফারাজ ততক্ষণে একদম তৈরি, অফিসে যাবে।ওর পরনের শার্ট আর প্যান্ট দেখে রুশদী বুঝলো ফারাজ আজ অফিসে যাবে না হয়তো।ফারাজ এর গেটআপ তাই বলছে।রুশদী যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে, তখনই ফারাজ পাশে এসে দাঁড়াল।ডাকল,
"এই খাটো পটল, কলেজ যাবে?"
রুশদীও কম চট জলদি উত্তর ছুড়ে দিল, "জি খাম্বা মশাই!"
ফারাজ ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে বলল, "চলো, নামিয়ে দিয়ে আসি।"
রুশদী ভ্রু কুঁচকে আয়নায় ফারাজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "আপনার অফিস নেই? আমাকে নামাতে গেলে তো আপনার লেট হয়ে যাবে।"
"নাহ্!"
"ওকে!"
রুশদী আর কথা বাড়াল না।
ফারাজ ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু কী ভেবে যেন আবার চৌকাঠের কাছ থেকে ফিরে তাকাল। প্রশ্ন করল, "তুমি হিজাব করো না?"
রুশদী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "করি, তবে মাঝেমধ্যে করা হয় না, মাইগ্রেনের ব্যথা থাকলে একটু সমস্যা হয়।"
"এখন কি ব্যথা আছে?"
"নাহ্, এখন নেই।"
"তাহলে হিজাব করো! তোমাকে হিজাবে সুন্দর লাগবে," বলেই ফারাজ উত্তরের অপেক্ষা না করে নিচে নেমে গেল।
ফারাজের এই প্রশংসায় রুশদী কিছুটা ঘোরে পড়ে গেল।প্রশংসাটা ভালো লাগলো ওর।ইদানিং লোকটার কাছ থেকে প্রশংসা পেতে ভালই লাগছে, ঘটনা তো সন্দেহজনক।এই খাম্বার প্রেমে পড়লো নাকি আবার? ফারাজ কথা মতোই হিজাবটা সুন্দর করে মাথায় জড়িয়ে নিল সে। নিচে নেমে দেখল ফারাজ বাইকের ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে। রুশদী জিজ্ঞেস করল,
"বাইকে যাবেন? গাড়ির কী হলো?"
"গাড়ির কিছুই হয়নি! তুমি ওঠো তো।"
রুশদী আর দ্বিরুক্তি না করে বাইকের পেছনে উঠল। সামান্য ইতস্তত করে ভারসাম্য রাখতে ফারাজের কাঁধে আলতো করে হাত রাখল সে। বাইকটা স্টার্ট হতেই শহরের ব্যস্ত রাস্তা চিরে আপন গতিতে ছুটে চলল। বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে রুশদীর মুখে।
মাঝেমধ্যে ফারাজ লোকটাকে ভালোই লাগে তার। এমনকি ওদের মধ্যে হওয়া খুনসুটি আর তর্কাতর্কিগুলোও এখন ওর প্রিয় হয়ে উঠেছে। ফারাজ যখন ওকে খোঁচা দিয়ে কথা বলে, তখন রাগ লাগলেও দিনশেষে সেই ভালোলাগাটাই মনের কোণে জমা হয়।
কিন্তু হঠাৎ রুশদীর খেয়াল হলো, রাস্তাটা চেনা নয়। মিরপুর পার হয়ে যাচ্ছে ওরা, অথচ ওর কলেজের পথ তো ঠিক উল্টো দিকে। উৎকণ্ঠা নিয়ে রুশদী চেঁচিয়ে বলল, "এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? আমার কলেজ তো ওদিকে!"
ফারাজ হেলমেটের কাঁচটা নামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "চুপচাপ বসে থাকো। গেলেই দেখতে পাবে।"
"আরে, আমার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে তো!" রুশদী কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল।
ফারাজ আগের মতোই শান্ত স্বরে জবাব দিল, "বললাম তো চুপচাপ থাকো!"
প্রায় চল্লিশ মিনিটের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাইকটা যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল, রুশদীর বিস্ময় তখন চরমে। সাতসকালে এখানে আসার কোনো যৌক্তিক কারণ সে খুঁজে পেল না। ফারাজ বাইকটা পার্ক করল, তারপর সোজা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের দিকে পা বাড়াল।
রুশদী ওর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অধৈর্য গলায় প্রশ্ন করল, "এখানে আসার কারণটা কী বলবেন?"
ফারাজ সামনের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে
জবাব দিল, "ঘুরতে এসেছি!"
"কিন্তু আমার তো কলেজ আছে!"
ফারাজ নিজের হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিল। "এখন ৭টা ৪৯ বাজে। ৮টায় তোমার ক্লাস শুরু। এখন চাইলেও তুমি সময়ে পৌঁছাতে পারবে না।"
"তাতে আপনার কী? আমি কলেজে যাব, আপনি আমাকে নিয়ে চলুন!" রুশদী জেদ ধরল।
ফারাজ দাঁড়িয়ে রুশদীর দিকে তাকাল।বলল,
"সব সময় ত্যারামো করবে না তো রুশদী!"
"করবই!" রুশদী জেদ নিয়ে বলল।ফের বিরক্তি নিয়ে বলল,
"এই সকালে এখানে আসার মানে কী?কি করব এখানে?"
"ঘুরবে, আমার সঙ্গে!"
রুশদী মনে মনে হাসল,রুশদী বেশ খেয়াল করেছে ফারাজ সুযোগ পেলেই তাকে নিয়ে একা সময় কাটাইতে চাই।তাদের ভিতর সম্পর্কটা গভীরে করার চেষ্টা করে।বিষয়টা ভালো লাগে ওর।যদিও রুশদী এই বিয়ে মেনে নিয়েছে, এই সম্পর্ক মেনে নিয়েছে,আগের কথা ভুলে ফারাজকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছে।তবে একদিনেই তো আর কাউকে ভালোবেসে ফেলা যায় না!সে ক্ষেত্রে ফারাজের চেষ্টা, ভালো লাগার মতই।
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ পেরিয়ে ওরা বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে এগোতে লাগল। সকালের জাহাঙ্গীরনগর অন্যরকম যাদুকরী রূপ ধারণ করেছে। চারপাশটা একদম নিঝুম, কোনো ছাত্রছাত্রীর কোলাহল নেই।কুয়াশা মোড়ানো শিশিরভেজা ঘাসগুলো রোদের স্পর্শে মুক্তোর মতো চিকচিক করছে।বড় বড় গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে সূর্যের সোনালি আলো তির্যকভাবে মাটিতে আছড়ে পড়ছে। বাতাসে ভেসে আসছে বুনো ফুলের ঘ্রাণ আর নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির শব্দ। অদ্ভুত এক সতেজ ও শান্ত আবহাওয়ায় প্রকৃতি যেন নিজেকে মেলে ধরেছে।
রুশদী প্রশ্ন করল, "আপনি কি ঘোরার আর কোনো জায়গা খুঁজে পাননি?"
"না! আপাতত কোনো জায়গা মাথায় আসছিল না, তাই এখানেই চলে এলাম।"
"কিন্তু এই অসময়ে ঘুরতে আসার দরকারটা কী ছিল?"
ফারাজ এবার একটু থামল।বড়ো একটা শ্বাস টেনে আবার ছাড়লো।ফের হাঁটতে শুরু করল।রুশদী উত্তরের আশায় তার মুখ পানে তাকিয়ে।ফারাজ ওর দিকে তাকিয়ে খুব সহজ গলায় বলল, "মানুষকে ভালোবাসার আগে তাকে চিনতে হয়, জানতে হয়। তার সঙ্গে সময় কাটাতে হয়, তবেই মানুষটির প্রতি ভালো লাগা জন্মায়। আমি খেয়াল করেছি, তুমি আমার সঙ্গে থাকলে খুব অস্বস্তি বোধ করো। কিন্তু যার সঙ্গে সারা জীবনটা পার করতে হবে, তার সঙ্গে এমন জড়তা রাখলে চলে? তুমি আসলে আমাকে ঠিকঠাক চেনো না বা জানো না বলেই তোমার এমন হয়। আমি চাই তুমি আমাকে চেনো, আমাকে জানো। আর সেই একা সময়টুকু কাটানোর জন্যই তোমাকে এখানে নিয়ে আসা।"
ফারাজের কথাগুলো রুশদীর মন ছুঁয়ে গেল। কথাগুলো তো মিথ্যে নয়! আসলেই তো, এই মানুষটাকে ও কতটা চেনে? ঝগড়া আর তিক্ততা দিয়ে তো আর একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। সংসারের চাকাকে সচল রাখতে গেলে দুজনের মনের মিল হওয়াটা খুব জরুরি।
খানিকটা সময় নিয়ে রুশদী প্রশ্ন করল, "আমি তো আপনাকে সেভাবে চিনি না, কিন্তু আপনি কি আমাকে ভালোমতো চেনেন?"
ফারাজ ঠোঁটের কোণে হালকা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।সে চেনে না রুশদীকে?চেনে..চেনে!খুব কাছ থেকেই চেনে।মেয়েটির প্রতিটি অভ্যাস, ধরন তার মুখস্থ।অথচ মেয়েটি প্রশ্ন করছে,' আমাকে ভালোমতো চেনেন?'হাস্যকর! ফারাজ প্রতুত্তরে বলল, "তোমার থেকেও তোমাকে বেশি ভালো চিনি।"
"কীহ!"
"কিছু না।"
ওরা দুজনে শান্ত ছায়াঘেরা পথ ধরে হাঁটতে থাকল। সকালের এই স্নিগ্ধ আলোয় রুশদীর মনে হলো, হয়তো এই নতুন পথচলাই তাদের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।কেমন হবে রুশদী যদি সংসারী মেয়ে হয়ে ওঠে?কেমন হবে রুশদী যদি শুধু নামে না কাজেও শারফারাজ খানের বউ হয়ে যায়?
হঠাৎ করেই আকাশের মেজাজ বিগড়ে গেল। একটু আগেই ওরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন থেকে সকালের নাস্তা সেরেছে তারপর আবার চড়ুই পাখির মতো এদিক-সেদিক ঘুরে দেখা শুরু করেছে ক্যাম্পাসটা।সাথে তাদের ভিতর চলছে একে-অপরর প্রতি নানা প্রশ্ন ও তাদের উত্তর। কিন্তু আচমকাই নীল আকাশটা হালকা কালচে মেঘে ছেয়ে যেতে শুরু করল। চারদিকে বইতে লাগল এক চিলতে উদাস হওয়া, যে হাওয়ায় মিশে আছে ভেজা মাটির আগাম গন্ধ। ঘড়িতে সকাল নয়টা বাজলেও সূর্যের দেখা নেই, তার বদলে চারদিকে মেঘের এক ধূসর চাদর। প্রকৃতি যেন আজ এই দুই নবীন হৃদয়ের নতুন করে পথচলাকে আশীর্বাদ করার জন্য আয়োজন সাজিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা এমন এক নির্জন পথে এসে দাঁড়াল, যার দুই পাশে সারি সারি বিশালকায় মহীরুহ আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে শুধু পিচঢালা পথ। জায়গাটা এতটাই ছায়াঘেরা যে মনে হচ্ছে সবুজ কোনো সুড়ঙ্গ। খুব একটা মানুষ নেই সেখানে; অনেকক্ষণ পর পর দু-একটা রিকশা টুংটাং শব্দ করে বা কোনো বাইক শোঁ শোঁ শব্দে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই চারপাশটা আরও একটু অন্ধকার হয়ে এল এবং কোনো আগাম সংকেত ছাড়াই আকাশ ভেঙে নামল ঝুম বৃষ্টি।
বৃষ্টি নামতেই রুশদী যেন এক নিমিষে নিজেকে হারিয়ে ফেলল।বৃষ্টির প্রতিটি বড় বড় ফোঁটা যখন তপ্ত ধরণীর ধুলো উড়িয়ে নামল, ও থমকে দাঁড়িয়ে দু-হাত প্রসারিত করে দিল। আকাশের দিকে মুখ তুলে চোখ বুজে অনুভব করতে লাগল বৃষ্টির সেই স্নিগ্ধ শীতল ছোঁয়া। বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু ওর মুখের ওপর মুক্তোর দানার মতো আছড়ে পড়ছে, হিজাব ভিজে লেপ্টে যাচ্ছে কপালে। ও যেন কোনো এক অরণ্যবালিকার মতো বৃষ্টির তালে তালে ধীরপায়ে এগোতে লাগল। ওর চারপাশের পৃথিবীটা যেন এখন শুধু জল আর নূপুরের শব্দে ঘেরা।
ফারাজ একটু পিছিয়ে পড়েছিল। ও নিজের প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে ধীরপায়ে হাঁটছে আর সামনে বৃষ্টিতে ভেজা রুশদীর এই অদম্য উন্মাদনা দেখছে। ঠিক এই মেয়েটির মাঝেই তো ও একদিন নিজের সবটুকু সত্তা হারিয়ে ফেলেছিল। ফারাজ আজও ভেবে পায় না, রুশদীর ঠিক কোন রূপটা দেখে ও প্রেমে পড়েছিল—ওর চপলতা, নাকি এই বৃষ্টির মতো নির্মল মনটা? এই মেয়েটিই তো ওর হৃদয়ে বারবার ভালোবাসার কড়া নেড়েছিল।
ফারাজ আনমনেই হেসে উঠল। পকেট থেকে এক হাত বের করে ভেজা চুলগুলো আলতো করে এলোমেলো করে নিল ও। বৃষ্টির এই রোমান্টিক আবহে ফারাজের মনে হলো, তাদের গত হওয়া দিনগুলো ধুয়ে মুছে আজ যেন এক নতুন বসন্তের সূচনা হচ্ছে।
ফারাজের আরো মনে হলো, এই নির্জন পথ আর বৃষ্টিকে সাক্ষী রেখে যদি সারাটা জীবন এভাবে হেঁটে কাটিয়ে দেওয়া যেত, তবে মন্দ হতো না। ঠিক তখনই রুশদী যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে উঠল। আচমকাই ও ডানা মেলার ভঙ্গিতে দু-হাত ছড়িয়ে দিয়ে এলোমেলো পায়ে মৃদু দৌড়াতে শুরু করল। ওর এই বাঁধভাঙা পাগলামি দেখে ফারাজ থমকে দাঁড়াল। বৃষ্টির ছোঁয়ায় মেয়েটা কখন যে নিজের অজান্তেই এক চঞ্চল কিশোরী হয়ে উঠেছে, তা টেরই পায়নি।
দুজনেরই শরীর ভিজে একসার, কিন্তু সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রুশদীর ওই দূরন্তপনা দেখতে দেখতে ফারাজ ধীরপায়ে ওর পিছু নিল। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা নিজের অর্ধাঙ্গিনী দিকে তাকিয়ে ফারাজ গুনগুন করতে লাগল।
"সে বৃষ্টি ভেজা পায় সামনে,
এলে হায় ফোটে কামিনী
আজ ভিড়তে ভালো লাগে
শূন্য মনে জাগে, প্রেমের কাহিনি!
রিমঝিম এ ধারাতে, চায় মন হারাতে..!"
ফারাজের কণ্ঠে গানের কলি শুনে রুশদী আচমকা থেমে গেল। অবাক হয়ে পেছনে ফিরতেই দেখল, ফারাজ ওর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাটছে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় ফারাজের সাদা শার্টটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, আর সেই সিক্ত শুভ্রতায় ওর প্রশস্ত বুক আর বলিষ্ঠ গড়নটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফারাজের মুখে এক অমায়িক, স্নিগ্ধ হাসি। রুশদী সরু চোখে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।
ফারাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল রুশদীর একদম কাছে। ওর চোখের অতল গভীরে ডুব দিয়ে খুব সন্তর্পণে রাস্তার ধারের এক ঝোপ থেকে তুলে আনা একটি হলুদ অলকানন্দা ফুল গুঁজে দিল রুশদীর কানের ভাঁজে। ফারাজের এই আকস্মিক সান্নিধ্য আর কানের কাছে আঙুলের সেই মৃদু স্পর্শ রুশদীর হৃৎস্পন্দন এক পলকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। ও যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল, শুধু নির্বিকার হয়ে ফারাজের এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখল।
"ফুল পেলেন কোথায়?"
ফারাজ ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে একবার পেছনে সরিয়ে দিয়ে হালকা হেসে বলল, "রাস্তার পাশের একটা গাছ থেকে ছিঁড়লাম।"
ফারাজ ধীরপায়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল, রুশদীও ওর পদাঙ্ক অনুসরণ করে পা মেলাল। বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এলেও রিমঝিম শব্দটা থামেনি। ফারাজ সামনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে আড়ষ্টতা কাটিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
"তোমার হাতটা ধরি? এমন মেঘলা দিনে তোমার হাতটা ধরে হাঁটতে পারলে বেশ একটা রোমান্টিক ব্যাপার হতো!"
রুশদী গোপনে মৃদু হাসল। ফারাজ এর দিকে এক পলক তাকাল,
"সেদিন যখন ধরেছিলেন, তখন তো অনুমতি নেননি। তাহলে আজ হঠাৎ অনুমতি নিচ্ছেন কেন?"
"যদি রাগ করো!"
"সেদিন কি রাগ করেছিলাম?" রুশদীর এই পাল্টা প্রশ্নে সম্মতির আভাস পেয়ে ফারাজ আর দেরি করল না। ও রুশদীর নরম হাতটা নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে নিল।
ফারাজের হাতের উষ্ণতা রুশদীর হাতের তালু বেয়ে ওর সারা শরীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তির শিহরণ ছড়িয়ে দিল। রুশদী অনুভব করল, এই মানুষটার হাতের বাঁধনে কোনো এক আশ্চর্য নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে। ফারাজের মনের কোণেও তখন হাজারটা অনুভূতির আনাগোনা। যে মেয়েটির জন্য ওর হৃদয়ে এতদিন শুধু অদম্য তৃষ্ণা ছিল, আজ তাকে এভাবে পাশে পেয়ে ওর পৃথিবীটা পূর্ণ মনে হচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে ফারাজ বলে উঠল, "এই হাতটা ধরে অনেকটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আছে রুশদী। তুমি আমার শেষ ভরসার আশ্রয়। আমি তো খুব শক্ত করেই তোমার হাত ধরেছি, তুমি কখনো ছেড়ে দিয়ো না।"
রুশদী কোনো কথা বলল না, শুধু শান্ত দৃষ্টিতে ফারাজের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে হাজারো অভিযোগের বদলে আজ ছিল পরম নির্ভরতা। ফারাজ রুশদীর হাতটা আর একটু নিবিড়ভাবে চেপে ধরল। ওর গভীর চোখের মণি দুটো যেন রুশদীর মনের গহিন অবধি পড়তে চাইছে। রুশদী উত্তর দেওয়ার আগেই ফারাজ রুশদীর চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
"এই যে হাতটা আজ শক্ত করে ধরলাম, হাশরের ময়দানেও আমি এই হাতেরই সন্ধান করব। বিশ্বাস করো, জান্নাতেও আমি তোমার হাতটাই ধরে চাই।"
—০—
পাপার কাছে আজ অনেকদিন পর বকা খাচ্ছে শের। বেডরুমের বিছানার ওপর অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে ছোট্ট শের। ফারাজ তার সামনে দাড়িয়ে বকঝকা শুরু করেছে।শেরে’র থেকে কিছুটা দূরত্বে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে রুশদী। শিশুদের এমন বকাঝকা ওর দু-চোখের বিষ; বিশেষ করে ফারাজ যখন শেরকে বকছে। তাই সে রাগে অন্যদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
অফিসে কিছু ঝামেলা হয় আজকে ফারাজ এর মেজাজ এমনি খারাপ ছিল,এর উপর শের এর দুষ্টুমির খবর তার মেজাজকে আরেক স্তর বাড়িয়ে দিল।
"এগুলো কেন করেছ?তুমি কি দিন দিন পচা বাচ্চা হয়ে যাচ্ছ শের?আর ক্লাসে তোমার অ্যাটেনডেন্স এত কম কেন?আর তুমি তো রোজ স্কুলে গিয়েছো, তবে ক্লাসে উপস্থিত থাকোনি কেন?আমি শুনেছি তুমি নাকি নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তোমার মমের ক্লাসে গিয়ে বসে থাকতে! ঘটনা কি সত্যি? এই কারনে তোমার এই অবস্থা? কী হলো, উত্তর দিচ্ছ না কেন?"
রুশদী সহ্য করতে পারল না।সোজা ফারাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,"আপনি এইটুকু একটা বাচ্চাকে এভাবে কেন বকছেন?আপনি ওকে অযথা বকাঝকা করছেন কেন? খবরদার, আর একটা কথাও বলবেন না! অনেক হয়েছে আপনার শাসন।"
"এক চোর তো অন্য চোরকে সঙ্গ দেবেই! তোমরা দুজনই তলে তলে এসব করছ। ও যে নিজের ক্লাস বাদ দিয়ে তোমার ক্লাসে গিয়ে বসে থাকত, তুমি একবারও তাকে বাধা দিলে না কেন?"
এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার শের তার অবুঝ আর কালো হয়ে যাওয়া মুখটা তুলে পাপার দিকে তাকাল। গলায় একরাশ অভিমান মিশিয়ে সে বলল,"তো কী হয়েছে পাপা?"
ইদানিং শের অনেক বেশি দুষ্টুমি শুরু করেছে।বাচ্চারা যা করে আরকি,তবে এসবের জন্য তো একটু শাসন করতেই হবে।
"শের! তুমি আমার সাথে তর্ক করার সাহস পাচ্ছ কোথায়?"
শের অবিচল ভঙ্গিতে উত্তর দিল, "কেন? তোমার কাছ থেকেই পেয়েছি।"
"আবার তর্ক করছ!"
"তো তুমি প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দেব না?"
শের তর্ক করছে তার সঙ্গে,আগে ওর এই অভ্যাস ছিল না।ফারাজ কিছু বললে চুপ থাকতো,
"আবার মুখে মুখে কথা! শের, তুমি দিন দিন বড্ড পাজি হয়ে যাচ্ছ!"
শের শান্ত গলায় অবুঝের মতো বলল, "উত্তর তো মুখ দিয়েই দিতে হয় পাপা।"
ফারাজ আঙুল উঁচিয়ে শাসাল, "শের, আর একটাও পাল্টা কথা বলবে না আমার সাথে। আমার কিন্তু এখন প্রচণ্ড রাগ উঠছে!তর্ক বন্ধ করে।"
"আমি তো তর্ক করছি না," শের বিড়বিড় করল।
ফারাজ আর কথা না বাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোমার ট্যাবটা দাও।"
শের বাধ্য ছেলের মতো হাতের ট্যাবটা পাপার হাতে সঁপে দিল। ফারাজ সেটা একরকম কেড়ে নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল, "আজ থেকে তোমার ভিডিও গেমস খেলা, চকলেট খাওয়া আর টিভি দেখা—সব বন্ধ! কিচ্ছু পাবে না তুমি।"
শেরের বুক ফেটে কান্না আসছিল, কিন্তু সে অভিমানী স্বরে বলল, "ঠিক আছে, খাব না।"
"শের!"
"কী হয়েচে?" প্রায় কান্নাভেজা কণ্ঠে ভাঙা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল শের। কিন্তু ফারাজের কঠিন মন তাতে গলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাল না। সে উল্টো আরও কঠোর হয়ে বলল, "আজ থেকে তোমার সব দুষ্টুমি বন্ধ। কোনো আবদার নিয়ে আমার কাছে আসবে না একদম!"
শের ভেজা চোখে তাকালে বলল, "ঠিক আছে, আসব না।"
রুশদী আর থাকতে না পেরে ফারাজের সামনে এসে,শের কে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল
"হয়েছে এবার! আপনি কি এখন বাচ্চাটাকে কাঁদিয়েই ছাড়বেন?তখন থেকে ঘোড়ার ডিমের মতো পক পক করে যাচ্ছেন!অযথা বকে বাচ্চাটার মন ছোট করছেন কেন আপনি? অনেক হয়েছে, এবার যান তো এখান থেকে!"
ফারাজ কিছুক্ষণ রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আক্রোশ মেশানো গলায় বলল, "ঠিক আছে!তোমার এইচএসসির রেজাল্ট আসুক, তোমার টাও দেখব।"
রুশদীও মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল, "হ্যাঁ, দেখে নিয়েন!"
ফারাজ আর তর্কে না জড়িয়ে গজগজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
কালবৈশাখীর মেঘলা আকাশের মতো থমথমে হয়ে আছে ছোট্ট শেরের মুখটা। পাপার শাসনে অভিমানে বুকটা যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাদের কান্না বড় অদ্ভুত; তাদের চোখের জল যখন টুপটুপ করে ঝরে, তখন মনে হয় যেন পৃথিবীর সমস্ত নিষ্পাপতা ধুয়ে যাচ্ছে। লাল হয়ে যাওয়া নাক আর ফোলা ফোলা গাল দুটোর দিকে তাকালে যে কারোর বুক মায়ায় হু হু করে উঠবে।
রুশদী পুচকিটার এই বিষণ্ণ দশা দেখে তার নিজের মনটাও ভারী হয়ে আছে। সে আর সইতে না পেরে শেরকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। আষাঢ়ের ধারাপাতের মতো শেরের চোখ দিয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। কান্নার তোড়ে ঠোঁট দুটো কাঁপছে তিরতির করে। রুশদী পরম মমতায় ওর ভেজা গালে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
"আরে! বাবা একটু বকুনি দিয়েছে বলে এভাবে কেউ কাঁদে?আমি তো কক্ষনো কাঁদতাম না! তুমি না আমার স্ট্রং বয়? আমার এই অ্যাংরি বার্ডকে কি কান্নাকাটি করলে মানায়? অ্যাংরি মোডেই তো তোমাকে সবচেয়ে কিউট লাগে। কান্না থামাও তো সোনা!"
শের একটা লম্বা হেঁচকি তুলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, "পাপা কখনো আমাকে বকে না, যখন বকে একসাথে অনেক গুলা বকুনি দেয়।"
রুশদী ওর কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল, "তোমার পাপা কি শুধু বকুনিই দেয়? আদর করে না? এই যে তুমি যা চাও, পাপা কি তা এনে দেয় না? কত ভালোবাসে তোমাকে।বাসে না?"
শের ভেজা চোখে মাথা নেড়ে সায় দিল, "হুম, বাসে।"
"শোনো পাপা, এই দুনিয়ায় যারা যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাদের ছোট্ট ভুলগুলোতেই ভালোবাসার মানুষগুলো বেশি কষ্ট পায়।তুমি পচা বাচ্চাদের মত দুষ্টুমি করেছ তাই,পাপার খুব মন খারাপ হয়েছে, তাই হয়তো একটু বকে ফেলেছে। আচ্ছা বলো তো, পাপা কি খুব বড় ভুল করেছে?"
শের এবার দু-পাশে মাথা নেড়ে জানাল—না, পাপা ভুল করেনি। রুশদী ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল, "এই তো আমার গুড বয় বুঝে গিয়েছে! এবার একটু হাসো তো দেখি? তোমার হাসিমুখটা খুব মিস করছি। এভাবে মুখ কালো করে রাখলে তোমাকে একদম 'অ্যাংরি ব্ল্যাক ক্যাট'-এর মতো লাগে। আর আমি তো পছন্দ করি 'অ্যাংরি বার্ড'। জলদি হাসো এবার!"
বাচ্চাদের মন তো আর এক নিমেষে ভালো হয় না। শেরকে তবুও কিছুটা মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে রুশদী এবার নতুন এক ফন্দি আঁটল। সে দুষ্টুমিভরা চোখে শেরে'র দিকে তাকিয়ে, নরম গাল দুটো টেনে ধরে চঞ্চল সুরে গান গেয়ে উঠল,
"ফোলা ফোলা ফর্সা গালে,
জমেছে জল বর্ষা কালের।
ফোটা ফোটা মুক্ত দানা,
নানা সোনা আর কাঁদে না।
থাকো যদি গোমরা মুখে,
কাতুকুতু দেবো তোমাকে।"
(শের কে কাতুকুতু দিয়ে গাইলও এটুকু রুশদী)
মম এর মুখে এমন অদ্ভুত আর মজার গান শুনে শেরের অভিমানী মেঘ এক পলকেই কেটে গেল। সে খিলখিল করে হেসে কুটিপাটি হয়ে রুশদীর ওপর গড়িয়ে পড়ল।গলা জড়িয়ে ধরল রুশদীর।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল ফারাজ। আড়াল থেকে রুশদী ও ছেলের এই খুনসুটি দেখে, নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
—০—
ফারাজের ওপর আজ শেরের পাহাড় সমান অভিমান। রোজ যে ছেলেটি বাবার প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা না রাখলে ঘুমোতে পারে না, আজ সে নিয়মের বড় ব্যতিক্রম ঘটেছে। ফারাজের ওপর রাগ করে সে আজ পাপার সাথে ঘুমুই নি।সে রুশদীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন রুশদীই তার একমাত্র আশ্রয়। ফারাজ আর শেরের মাঝখানে আজ দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে শুয়ে আছে রুশদী।
ফারাজ ঘুমায়নি। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সে অন্ধকারের মাঝেও ছেলের অভিমানের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে। রুমের আলো নেভানো, কেবল নীলচে জিরো বাল্বের ম্লান আলোয় চারপাশটা আবছা দেখাচ্ছে।ফারাজ এক পলক ডানপাশে তাকাল। দেখল, শের এখনো জেগে আছে। সে রুশদীর সাথে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। কিন্তু ফারাজের দৃষ্টির আভাস পেতেই শের তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল।যেন পাপার দিকে তাকালেই তার কঠিন অভিমানটা গলে জল হয়ে যাবে।
ফারাজ গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় ডাকল,
"শের, আমার কাছে আসো।"
পাপার সেই রাশভারী কণ্ঠ শুনে শেরের ছোট শরীরটা কেঁপে উঠল। এক অজানা ভয়ে সে রুশদীকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, মুখটা লুকাল রুশদীর বুকের ভেতর। যেন সেখানে লুকিয়ে সে বাবার শাসন থেকে বাঁচতে পারবে। রুশদী আলতো করে শেরের মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,"যাও, পাপা ডাকছে তো।"
শের কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা ডানে-বাঁয়ে নাড়িয়ে তার নীরব অসম্মতি প্রকাশ করল। তার এই ছোট ছোট জেদ ফারাজের নজর এড়াল না।শের তো অভিমান করে তার থেকে দূরে সরে আছে, কিন্তু তার যে সয় না।শেরকে বুকের উপর নিয়ে না ঘুমালে তার ঘুম আসে না।সে আবার গম্ভীর স্বরে বলল,"আসবে তুমি?"
শের আরও কুঁকড়ে গেল। কিন্তু ফারাজের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া অত সহজ নয়। ফারাজ উঠে এসে রুশদীর থেকে এক প্রকার জোর করেই শেরকে তুলে নিল। নিজের বুকের ওপর শুইয়ে দিতেই শের ছটফট করে উঠল। তার ছোট্ট হাত-পা ছুড়ে সে আবার মম এর কাছে ফিরে যেতে চাইল। ফারাজ শক্ত হাতে তাকে আগলে ধরে ধমকের সুরে বলল,"চুপচাপ ঘুমাও শের। একদম নড়বে না।"
শেরের ঠোঁট উল্টে এলো অভিমানে। ধরা গলায় আধো-আধো স্বরে বলল,"না! আমি মম-এর সাথে ঘুমাবো। তোমার কাছে থাকব না।"
"কেন? আমার সাথে কেন ঘুমাবে না?"
শের কান্নার সুরে নালিশ জানাল, "তুমি... তুমি বকেছ। তুমি পচা!"
"বকেছি তো কী হয়েছে? পাপা তো বকতেই পারে।"
"আমি ঘুমাবো না তোমার সাথে। তুমি যাও!" বলেই সে আবারও ফারাজের বুক থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল।
ফারাজ শেরকে কোলে তুলে নিয়ে বারান্দায় চলে এল। বারান্দার ভারী পর্দাগুলো টেনে দিল সে, থাই গ্লাসের দরজাটা আটকে দিল যাতে ভেতর থেকে কেউ তাদের কথোপকথন শুনতে না পায় বা দেখতে না পায়।
বারান্দার কোণে রাখা দোলনাটার ওপর শেরকে বসাল ফারাজ। তারপর নিজে হাঁটু গেড়ে বসল ছেলের সামনে। শেরের নরম, তুলতুলে হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম গলায় বলল,
"এবার বলো,কী বলছিলে তখন?"
ফারাজের কণ্ঠ এখন তুষারের মতো শীতল আর শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত মেজাজ দেখে শের আরও ভয় পেয়ে গেল। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে, টলটল করছে নোনা জল। কাঁদো কাঁদো গলায় সে বলল,"না... তুমি আবার বকুনি দিবে।"
ফারাজ ঈষৎ হেসে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলল, "দিব না বকুনি। তুমি বলো কেন তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?"
শের এবার কান্নার তোড়ে ফুঁপিয়ে উঠল। ভেজা গলায় বলল,"তুমি অনেক পচা পাপা! তুমি আমাকে অনেক অনেক বকেছ। তুমি বলেছ আমি যেন তোমার কাছে কিছু না চাই। আমাকে চকলেট খেতেও মানা করে দিয়েছ।তুমি আমাকে ভালোবাস না!!"
ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট একটা মানুষের মনে কতশত অভিমান জমে আছে। সে শান্ত স্বরে আবারও প্রশ্ন করল,"আর কী বলেছি আমি? সব মনে আছে তোমার?"
শেরের কণ্ঠস্বর বুজে এলো। টলটলে চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে সে একরাশ অভিযোগ উগরে দিল, "তুমি ধমক দিয়ে কথা বলেছ। তুমি কত বড় একটা মানুষ, আর আমি কত ছোট! তুমি যখন ওত্ত জোরে ধমক দাও, আমি কি ভয় পাই না? আমার মনটা তখন একদম ছোট হয়ে গিয়েছিল। অনেক কান্না পাচ্ছিল আমার, ইচ্ছে করছিল জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদি।"
ছেলের এমন অকাট্য যুক্তির সামনে ফারাজ মুহূর্তেই নিরুপায় হয়ে পড়ল। তার শান্ত শীতল চোখে এক চিলতে অপরাধবোধ খেলে গেল।সে ধীরস্থির কণ্ঠে আবার শুধালো, "আর? আর কিচ্ছু বলিনি?"
শের মাথা নুইয়ে ফেলল। ছোট্ট মাথাটা দুপাশে দুলিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "নাহ।"
ফারাজ তার খুদে রাজপুত্তুরের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। জিজ্ঞেস করল, "এখনো রাগ করে আছো পাপার ওপর?"
শের কোনো উত্তর দিল না, শুধু ওপর-নিচ মাথা নেড়ে তার মৌন সম্মতি জানাল। বড় বড় অশ্রুবিন্দু তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
"রাগ কমানোর উপায় কী শুনি?"
শের নিরুত্তর। তার মৌনতা যেন ফারাজের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। ফারাজ নুইয়ে পড়ে শেরের ছোট্ট দুটো হাতের পাতায় পরম মমতায় চুমু খেল। কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল,
"সরি পাপা! তোমাকে বকার জন্য আমি অনেক অনেক সরি। আর কখনো বকব না, প্রমিস।"
এতটুকুতে কাজ হলো না দেখে ফারাজ আবারও অনুনয় করে বলল, "পাপা তো সরি বলেছে। এই যে তুমি সারাদিন আমার সাথে কথা বললে না, আমার থেকে দূরে দূরে থাকলে—আমার কি খারাপ লাগেনি? আমি কি এর জন্য তোমাকে বকেছি? বলো, বকেছি?"
শের মাথা নেড়ে বলল, "উঁহু।"
"তবে আর রাগ করে কেন? এবার একটু হাসো। পাপা তো সরি বলেছে, এই দেখো কান ধরেও সরি বলছি। প্লিজ মাফ করে দাও পাপাকে। প্লিজ..."
ফারাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই শেরের সব বাঁধ ভেঙে গেল। তার জেদ, তার আড়াল করার চেষ্টা—সব ধূলিসাৎ হয়ে গেল এক নিমেষে। সে ঝাপটে ধরে পাপার গলা জড়িয়ে ধরল। রাগ করে দূরে থাকলেও ওর ছোট্ট বুকটা সারাদিন ব্যথায় টনটন করেছে। মনে হচ্ছিল কেউ যেন তার মনটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টানছে।পাপার সান্নিধ্য ছাড়া তার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বিষাদময়।
পাপার স্নেহের পরশ পেতেই শের হু হু করে কেঁদে ফেলল। বাবার কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল, "লাভ ইউ পাপা! এত্ত এত্ত লাভ ইউ!"
ফারাজও শেরকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের পাঁজরে পিষে নিল। তখন রাগের মাথায় হয়তো একটু বকেছিল, কিন্তু এই ছোট্ট মুখটার দিকে তাকালে তার কলিজা ছিঁড়ে যায়। এই ছেলেটা ছাড়া তার জীবনে আর আছেই বা কী? ফারাজের দু'চোখ উপচে কয়েক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল ছেলের চুলে। সে চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, "আই লাভ ইউ টু, মাই পাপা।"
শের কান্নাভেজা গলায় আদুরে আবদার করল, "প্রমিস করো আর কখনো ধমক দিবে না।"
"প্রমিস।"
"সব সময় শুধু আদর করবে?"
"হ্যাঁ পাপা, সারাজীবন শুধু আদরই করব।"
রুমে বিছানায় বসে বাবা আর ছেলের মান-অভিমানের পালা আর তার পরবর্তী মধুর সন্ধি—সবটাই আড়ি পেতে শুনছিল রুশদী। যদিও কাঁচের ওপারটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু প্রতিটি শব্দই তার কানে স্পষ্ট পৌঁছাচ্ছিল। সে ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে উঠে দাঁড়াল। গুটিগুটি পায়ে বারান্দার থাই গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে টোকা দিল। তারপর আলতো করে মুখ বাড়িয়ে বলল,
"টুকি! আমি কি ভেতরে আসতে পারি?"
ফারাজ ছেলেরর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতেই ফিরে তাকাল।বলল, "কাবাব মে হাড্ডি হতে এসেছ?"
রুশদী ভ্রু কুঁচকে ভেতরে ঢুকে এল।
"মোটেই না! আপনাকে জরুরি একটা কথা বলতে এসেছি। সেটা বলেই আমি ভোঁ-দৌড় দেব, আপনারা আপনাদের মতো গল্প করুন।"
"ঠিক দুই মিনিট সময়। যা বলার বলে জলদি ফটো।"
"কালকে আপনি মার্কেটে যাচ্ছেন ওকে? "
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, "ওখে ম্যাডাম! "
'ম্যাডাম' সম্বোধনটা রুশদীর কানে কেমন লাগল। শের সামনে বসে আছে, তার সামনে এসব ডকাবাকি করাটা কেমন যেন দৃষ্টিকটু। সে চোখ রাঙিয়ে বলল,
"সুন্দর করে কথা বলতে পারেন না? ম্যাডাম আবার কেমন শব্দ?ভালো নামে ডাকবেন। "
"ওকে ডার্লিং!"
রুশদীর চোখ তো এবার কপালে! আগের ডাকটাই অন্তত সহনীয় ছিল, এটা তো আরও ভয়ানক। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
"কথার ধরন ঠিক করুন! বাচ্চার সামনে এসব কী আবল-তাবল বলছেন? নেক্সট টাইম আর ওসব নামে ডাকবেন না।"
ফারাজ খুব বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে বলল, "ওকে জানু!"
"জানু? আমি আপনার জানু লাগি?"
"হ্যাঁ, জানু।" ফারাজ বেশ নির্বিকার।
"কবে থেকে?"
"মাত্রই তো তুমিই তো বললে 'আমি আপনার জানু লাগি!"
"আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম!"
"আর আমি সেটাকে উত্তর ধরে নিয়েছি," ফারাজ হাসতে হাসতে জবাব দিল।
দোলনায় বসে শের এতক্ষণ মুখ চেপে ধরে পাপা আর মম-এর এই খুনসুটি মার্কা ঝগড়া উপভোগ করছিল। সে হয়তো সব বুঝছে না, কিন্তু মম-এর অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তার খুব মজা লাগছে। তার খিলখিল হাসি দেখে রুশদী এবার লজ্জা আর রাগে মিলে মিশে তাকে ধমক দিল, "এই শের! হাসি বন্ধ একদম!"
শের চট করে হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। বড়
বড় চোখে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, "ওকে মম! একদম হাসি বের হবে না।"
চলবে...